লিখেছেন: সাফ্‌ফাত হোমায়রা

art works-10-হয়তো আমি জাতিস্মর নই,

তবুও দিব্য করে বলে দিতে পারি

গতজন্মে নির্ঘাত মানুষরূপে পৃথিবী চষেছি

নইলে এ জন্মে কি আর কুকুর হই!

 

এইতো, গতজন্মের কথা, “প্যাম”

আমার মেয়ের পোষা খরগোশের জন্মদিনে

ওর গাল ফোলানো বায়না– ‘এবার কিন্তু উৎসব

করতেই হবে, সাথে পাঁচ তারকা হোটেলের সুস্বাদু কেক’।

ওমনি এক লহমায় সাজসাজ রব

লালনীল মরিচ বাতি, আলোর রোসনাই

চারিদিকে কোরমা রেজালার ম’ম’ গন্ধআরো কত কি!

ছোট ছেলের প্রিয় টমির জন্যেও সেদিন

বরাদ্দ ছিল দু’টুকরো রোস্ট। বিশ্বাস করো

একবর্ণ বানিয়ে বলছি না।

বেশ ফুরফুরে মেজাজে ছিলাম সেদিন,

দেশের কত মান্যগন্য ব্যক্তি আসবেন, আনন্দে হয়তো

গুনগুন করে একটুআধটু সুর ভাজছিলাম আপন মনেসত্যি।

এমনকি ঐ ভিখিরি মা এসে, হাড্ডিসার ছেলে কোলে,

দু’টাকা চাইলোপ্রতিদিনের মতো ধমকে উঠিনি। কিন্তু

হঠাৎ যখন দেখলাম টমির খাবারে ভাগ বসাচ্ছে

বস্তির ছেলেটা, ভীষণ রাগ হলো আমার। এত্ত বড় সাহস!

মনে হলো দু’গালে কষে দু’টো চড় দিই ছেলেটার।

দেয়া হয়নিমাননীয় অতিথিরা ছিলেন কিনা! শুধু

ঘাড় ধরে বের করে দিয়েছিলাম রাস্তায়, আর

মনে মনে বলেছিলাম– “বেজন্মা, কুত্তার বাচ্চা”।

সামনেই নির্বাচনমুখে একটু রাশ না টানলে কি আর চলে!

 

প্রায় ভাবি মানবজন্মটা হয়তো ভালো ছিল,

তবে কুকুরজীবনটাও খারাপ নয়। বরং

হয়তো এটাই ভালো হলোমাথার উপর ঈশ্বর নেই

তাই ঘিতেলে প্রদীপ জ্বালাবার দায় নেই,

নেই উপরওয়ালাকে খুশি করার বালাই।

কেবল হেঁটে যাওয়াদেখে যাওয়া, আর

একার ভীড়ে স্বাধীন জীবনের স্বাদ নেয়া।

এইতো গতকাল রাতে; শুয়ে আছি ল্যাম্পপোস্টের নিচে,

ভাবছিলামনিজের কথা, পূর্বজন্মের কথা।

অভিজ্ঞতার দাঁড়িপাল্লায়, কে বেশি ভালো, হিসেব কষছিলাম

মানুষের বাচ্চা”, নাকি “কুত্তার বাচ্চা”! হঠাৎ ভাবনার দরজায়

কড়া নাড়লো অন্ধকার রাতের এক অতিথির

ফোলা চোখ..লাল ব্লাশনের গাল ধুয়ে যচ্ছিল কান্নায়।

পাশে বসে নিজের মনেই কথা বলছিল আগুন্তুক,

উদ্দেশ্য সৃষ্টিকর্তা, আর দাবী বিচারের।

ঘরে চালডাল বাড়ন্ত, একফোটা দুধের অভাবে

মাস কয়েকের বাচ্চাটা কাল থেকে অভূক্ত,

অসুস্থ পঙ্গু স্বামীওষুধ কিনতে হবে। অথচ

টহলদার পুলিশটা টাকা না দিয়েই শরীর খুঁড়লো।

আহা! মানুষ হলে মেয়েটার মাথায় হাত বোলানো যেত।

আচ্ছামানুষ হলেই কি হাত বোলায় ?

গতজন্মে আমি তো মানুষই ছিলাম, কই দিই নি তো!

বরং ফুটফুটে মেয়েটার জীবন দিয়ে কিনেছিলাম আমার

বখে যাওয়া ধর্ষক ছেলের নিরাপত্তা, আর নিজের সন্মান।

নাআমি মারিনি। লোক দেখানো ভালো মানুষ আমি

হাসপাতালে ক্ষতবিক্ষত মেয়েটাকে দেখে

মনে মনে শুধু বলেছিলাম– “মর, কুত্তার বাচ্চা”। তারপর

উপর মহলের নির্দেশে ডাক্তারই মেয়েটাকে

বুঝতেই পারছো, জলের মত টাকা ঢেলেছিলাম সেদিন।

থানাপুলিশহাসপাতাল, নেতাপার্টিবিরোধীদল,

কিছুই বাদ দিই নি। এমনকি ঐ আদর্শবাদনারীবাদের

বড় বড় বুলি আওড়ানো টিয়াপাখিগুলো পর্যন্তসবাই চুপ।

তা একটু করতেই হলো। মন্ত্রী হবো যে,

সামনেই নির্বাচনএটুকু না করলে কি আর চলে!

 

নাহ্‌, কুকুর হয়ে বড্ড বেশি ভাবছি আজকাল।

কই, মানুষ হয়ে তো এত ভাবনা ছিল না!

অবশ্য তা থাকবেই বা কেনো, আর সময়ই বা কোথায় ?

মানুষের কত কাজসাজস্বপ্ন,

এত স্বপ্নমোহের ভীড়ে কখন যেন

নিরুদ্দেশ হয়ে যায় জীবন,

হারিয়ে যায় মনুষ্যত্বহারায় প্রেম।

আমি তো মানুষ নইকুকুর। তাই

আমার কোনো সাজ নেইমোহ নেই,

নেই মনুষ্যত্ব বিকিয়ে দেয়ার খেলা। কুকুর আমি

কেবল শুনে যাই, চোখ পেতে দেখে যাই।

 

সেদিন দেখলাম দাউদাউ করে জ্বলছে মানুষ,

আগুন শরীর ছুটছে দিগ্বিদিক্‌, পোড়া চোখে জীবনের খোঁজ,

বাঁচার আকুতিতে হাহাকার একফোটা পানির।

পানি কোথাও নেই..বাঁচানোর কেউ নেই।

কি অসহ্য যন্ত্রনায় পুড়ে গেলো মানুষটা,

একটু একটু করে ছাই হলোউড়ে গেল।

দেখার কেউ নেই..কাঁদার কেউ নেই।

 

একি! আমার চোখে পানি।

কুকুর হয়ে কেনো কাঁদছি আমি!

যেদিন মানুষ ছিলাম..কাঁদি নি তো! বরং

সেদিন আমিও পুড়িয়েছি মানুষ,

আগুনে ছাই করেছি অবুঝ শিশুটার কৌতুহলী চোখ।

একদুইতিন করে ঝলসে দিয়েছি আরো কত মানুষ,

হয়তো বিশ, অথবা ত্রিশ, অথবা পঞ্চাশ ছাড়িয়ে অগুনতি।

জীবনে নয়, সংখ্যায় গুনেছি মানুষ।

মেরেছি সেই ছেলেটিকে

মানুষ হয়ে যে দাঁড়িয়েছিল মানুষের বিরুদ্ধে।

বুক চেতিয়ে বলেছিলসমতা চাই।

গণতন্ত্রের স্লোগানে ঢেউ তুলেছিল জনমনে,

দৃপ্ত পদক্ষেপে হেঁটেছিল গলি থেকে রাজপথ, আর

বজ্র কন্ঠস্বরে…”নিরাপদ জীবন চাই,

মানুষ হয়ে বাঁচতে চাই। “অথচ

আমি থামিয়ে দিয়েছিলাম তার চলা,

রুদ্ধ করে দিয়েছিলাম সেই কন্ঠ।

রাতের গাঢ় অন্ধকার চিরে একটি বুলেট যখন

এফোঁড়ওফোঁড় করে দিয়েছিল ছেলেটির বুক,

সত্যি বলছিআমার হাত কাঁপেনি, চোখ পড়েনি।

শুধু মনে মনে বলেছিলাম, ”শালা, কুত্তার বাচ্চা”।

আশ্চর্য! ছেলেটার মৃত চোখে বাঁচার আকুতি ছিলনা কোনো,

ছিল কেবল একরাশ ঘৃণার আগুন!

বিশ্বাস করোআমি এভাবে মারতে চাইনি।

তবু মারতে হলো, পোড়াতে হলো ওদের।

নইলে যে আমার ক্ষমতা যায়। জানো তো

সামনেই নির্বাচনএকটু না পোড়ালে কি আর চলে!

 

অনেক রাত হলো, ঘুমোতে হবে।

কাল আবার আমাদের কুকুর সমিতির মিটিং আছে।

এবার পার্টি থেকে আমায় মনোনীত করা হয়েছে,

কয়েকদিন পরেই নির্বাচনমন্ত্রী হবো।

সাফ জানিয়ে দিয়েছি, মন্ত্রী হবো নাসেও ভালো। তবু

কুকুরত্ব হারাতে পারবো নাকিছুতেই না।

গতজন্মে মন্ত্রীত্বের লোভে খুইয়েছিলাম মনুষ্যত্ব,

গুম করেছি, খুন করেছি, উল্লাস করেছি লাসের উপর।

টাকার অঙ্কে কিনেছিলাম ক্ষমতা।

যারা আমার কাছে চেয়েছিল সোনার দেশ,

সেই নিরীহ মানুষের রক্তে স্নান করে মুছে দিয়েছিলাম,

লেবাসধারী গণতন্ত্রকামী দেশপ্রেমীদের সাথে আমার

মধ্যরাতের গোপন অভিসারের শেষ চিহ্নটুকু।

কামুক বিছানার সঙ্গমে ভেবেছিলাম

সামনেই নির্বাচনএটুকু বেঈমান না হলে কি আর চলে!

 

গতজন্মের প্রায়শ্চিত্ত করছি কুকুর হয়ে। তাই

এবার কুকুরত্ব হারিয়ে, আর যাই হোক, ক্ষমা করো,

আবার কোনো “মানুষের বাচ্চা” হতে চাই না।

কুকুর হয়ে জন্মেছি, কুকুর হয়েই মরবো। জানি

তাহলেই পরজন্মে ঠিক ঠিক মানুষ হবো,

কোনো গৃহপালিত “মানুষের বাচ্চা” নয়।।

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s