লিখেছেন: অন্বেষা বসু

art-1-ছুটি,

শুকনো পাতার মত সন্ধ্যে নামছে আমার শহরে। শীতের সন্ধ্যে। মনকেমনের সন্ধ্যে। আমার পাড়ায় এখন বিষণ্ণতার আলো। দাদা বাড়ি ফেরেনি এখনও। বাবার ঘরে রেডিও চালানো। গজল। মীর্জা গালিব।

হাজারোঁ খ্বাহিশে অ্যায়সি কি হর খ্বাহিশ পে দম নিকলে

বহুত নিকলে মেরে আরমান লেকিন ফির ভি কম নিকলে”

রান্নাঘরে মা। রুটি আর বেগুনপোড়ার গন্ধ আর দূর থেকে ভেসে আসা ট্রেনের বাঁশি মিশে যাচ্ছে আমার গোপন নোনাজলে। পড়ার টেবিলে বসে ক্লাস নাইনের খাতা দেখছি। বাংলা ব্যাকরণ। সন্ধিসমাস। মন বসছে না কিছুতেই। মনে হচ্ছে ,ওই দূরপাল্লার ট্রেন ধরে চলে যাই অনেক অনেক দূরে। ভীষণ মন কেমন করছে জানিস? তোর কথা খুব মনে পড়ছে। খুব। কেমন আছিস রে তুই? খবর পেলাম তুই বিয়ে করেছিস। চাকরীর খবরটাও দেবায়ুধের মুখে শুনলাম। না, অভিমান করি না আর। সে বয়স অতিক্রম করেছি। আর বোধহয় সেই দাবীটুকুও।

জানিস ছুটি? শীত পড়লেই তোর কথা খুব মনে পড়ে। মনে পড়ে, আমাদের ছাদে দুপুরবেলা মাদুর পেতে অঙ্ক কষতাম একসাথে। আমাদের পিঠে রোদ্দুর এসে পড়ত। আর, তোর বাড়ি গেলেই কাকিমা দার্জিলিং এর কমলালেবু খাওয়াতেন। আর কখনো, নতুন গুড়ের পায়েস। আহা! কী তার স্বাদ! এখনও মুখে লেগে আছে। তোর সেই সোয়েটারটা জানিস এখনও আমার আলমারির এক কোণে সযত্নে ভাঁজ করে রাখা। ওই ফিরোজা রং এর সোয়েটারটা তোর বড় প্রিয় ছিল না রে? ওই রং টা তোকে মানাতও বেশ। ক্লাসিক জিন্‌স এর সাথে সাদা কুর্তা আর ওই সোয়েটারটা পরতিস যখন, আমি অপলক চেয়ে থাকতাম তোর দিকে। তোর কোমর ছাপিয়ে নেমে যাওয়া চুল, চোখে রিম্লেস চশমা, কানে রুপোর বালি। আমি অপলক দেখতাম তোকে। দেখতাম তোর ঋজু, সাবলীল চলা। তোর সহজ হাসি। আর হাসলে তোর গালের গভীর দুটো টোল। আমি দেখতাম তোকে। মুগ্ধ চোখে। কিন্তু তুই দেখিস নি আমায়। না আমায়, না আমার এই দেখাদের। না রে, ঝগড়া করবো বলে চিঠি লিখছি না। হয়ত বা নতুন করে আলাপ করবো বলেই। হয়ত বা, পুরনো বন্ধুত্ব ঝালিয়ে নেওয়া?

রয়েছি সবুজ মাঠে,ঘাসে__

আকাশ ছড়ায়ে আছে নীল হয়ে আকাশে আকাশে।

জীবনের রঙ তবু ফলানো কি হয়

এই সব ছুঁয়ে ছেনে!__ সে এক বিস্ময়

পৃথিবীতে নাই তাহা__ আকাশেও নাই তার স্থল__

চেনে নাই তারে ওই সমুদ্রের জল!

রাতে রাতে হেঁটে হেঁটে নক্ষত্রের সনে

তারে আমি পাই নাই, কোনো এক মানুষীর মনে

কোনো এক মানুষের তরে

যে জিনিস বেঁচে থাকে হৃদয়ের গভীর গহ্বরে!

নক্ষত্রের চেয়ে আরো নিঃশব্দ আসনে

কোনো এক মানুষের তরে এক মানুষীর মনে!”

জীবনানন্দ দাশ। ধূসর পাণ্ডুলিপি। তুই দিয়েছিলি। মনে আছে? আমাদের জন্মদিন গুলো কাছাকাছি হওয়ায়, আমরা একসাথে বই কিনতাম। জন্মদিনের উপহার। দুটো বই। দুটোই তোর, দুটোই আমার। মনে আছে? মনে আছে তোর খাটের নীচের ওই মস্ত ট্রাঙ্কটার কথা? যেখানে তোর প্রচুর বইপত্তর থাকতো? আমরা দুজন মিলে সমস্ত বই রোদ্দুরে শুকোতে দিতাম। সেই বই গুলোর হলদেটে পাতা এখনও চোখ বুজলেই দেখতে পাই জানিস? সেইসব পুরনো বইয়ের গন্ধ প্রশ্বাসে মিশে রয়েছে এখনও। কখনো কখনো ভুলতে চাইলেই ভুলে যাওয়া যায়। আর কখনো কখনো ভুলতে চাইলে বোধহয় আরও বেশি করে মনে পড়ে। তাই না?

আচ্ছা, বলতে পারিস? সব ভালবাসাতেই মানুষ মানুষী কেন আসে? সবসময় কেন নারী পুরুষ? দুজন নারী ভালবাসতে পারে না বুঝি? অথবা দুজন পুরুষ? ক্লীবরাই বা দোষ করলো কিসে? একজন মা তার মেয়েকে ভালবাসে না? মেয়ে মাকে? অথবা দুই বোন? দুই ভাই? বাবা আর ছেলে? দুই বন্ধু? দুই বান্ধবী? দুই বান্ধবী__? আমি ভালবাসিনা তোকে? তুই ভালবাসিস না আমায়? আমরা কেউ নই? আমরা কিচ্ছু নই? আমরা অশালীন? আমরা অবৈধ? ভালোবাসায় সত্যিই কোনও বিধি হয়? তাই?

জানিস? আজ আমার দেশের সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছে সমকামিতা অবৈধ। সমকামিতা পাপ। আমার দেশে একটি শিশু জন্মানোর সাথে সাথেই জাতবস্ত্র সরিয়ে দেখে নেওয়া হয় তার যৌনাঙ্গ। সারাজীবনের জন্য তার শরীরে অদৃশ্য শিলমোহরে লেখা হয়ে যায় সে পুরুষ, নাকি মেয়ে? পুরুষ মানে অবশ্যই পুরুষালী। আর, মেয়ে মানে মেয়েলী। অবশ্য, যে দেশে লিঙ্গকে দেবতা রূপে পূজা করা হয়, সে দেশে বোধহয় এটাই স্বাভাবিক। উত্তরআধুনিকতাবাদে বলে ফ্যালগোসেনট্রিসম। আমি এতো কিছু বুঝি না রে। কিন্তু এটা জানি, পুরুষ মানে শক্তি। পুরুষ মানে দাবী, অধিকার। পুরুষ মানে ধন, মান, বিত্ত। আর নারী মানে সমর্পণ। নারী মানে করুণা, অবহেলা, শোষণ। ও হ্যাঁ, আদর সোহাগ ও আছে। নারীর সোহাগ পুরুষের সাথে। নয়তো পুরুষ নির্যাতন করবে কাকে? আদরের নামে নিগ্রহ করবে কাকে? বিয়ের নামে বৈধ বেশ্যাবৃত্তি তবে কাকে দিয়ে সম্পন্ন হবে? নারী ছাড়া? স্বজাতির ওপর এসব চলে নাকি? ধুর! এই আমার পোড়া দেশ। আমার ভারতবর্ষ। আমার স্বাধীন দেশ। দেশ মানে কী শুধুই ভূখণ্ড? দেশ মানে মানুষ নয়? তাদের স্বাধীন করবে কে? আর মনগুলো? তাদেরই বা মুক্ত করবে কে? সমকামিতা যে অপরাধ নয়, অপ্রকৃত নয়, অস্বাভাবিক নয়, অসুস্থতা নয়, কে বোঝাবে এইসব অন্ধ, প্রাচীন, পুরুষতন্ত্রের ধারক ও বাহকদের? ছুটি, আমি মুখ্যুসুখ্যু মানুষ। কোনমতে একটা স্কুলের চাকরী জুটিয়ে নিয়েছি। স্বল্পই জ্ঞান আমার। আমি জুডিথ বাটলার পড়িনি। আমি এদ্রিয়ান রিচ পড়িনি। আমেরিকার গে হিস্ট্রি ও জানিনা। কিন্তু আমি খাজুরাহ দেখেছি। আমি ভারতবর্ষের মাইথলজি পড়েছি। আমি দুটো মহাকাব্য পড়েছি। আমার দেশে, আমার ধর্মে কোনোদিন সমকামিতা পাপ ছিল না। শুধু তাই নয়, পুরুষ মাত্রেই পুরুষালী, মেয়ে মাত্রেই মেয়েলী, এটাও কিন্তু আমাদের পুরুষতন্ত্রের চাপিয়ে দেওয়া। কী অদ্ভুত না? শিব বলতেই আমরা শুধু তাঁর রুদ্র মূর্তির কথা ভাবি। ভাবি তাঁর তেজের কথা। কিন্তু সেই শিব ও তো পার্বতীর সাথে মিলিত হয়ে অর্ধনারীশ্বর হয়েছিলেন। আমরা তাঁকে পূজা করি নটরাজ রূপে। অথচ, দেখ, পুরুষ নৃত্যশিল্পী দেখলে আমরা আড়ালে হাসি, নাক সিটকোই। আর, যে আমরা শক্তি পূজা করি, সেই আমরাই নারী কে বলি অবলা। এই আমাদের সভ্যতা। তবু, আমার দেশেই ভুল করে জন্মান ঋতুপর্ণরা। যারা বলতে পারেন, “যার যা স্বভাব, সেটাই তো স্বাভাবিক!” তাই, ছুটি, আমাদের ভালোবাসা অস্বাভাবিক নয় রে। আমাদের ভালোবাসা পাপ নয়।

ছুটি, তুই হয়ত ভুলে গেছিস সব। হয়ত বা ভুলিস নি। অথবা, মনে রাখার মত করে মনে রাখিস নি। কিন্তু, আমি যে কিছুতেই ভুলতে পারি না রে। এখনও বৃষ্টি পড়লেই মনে পড়ে আমাদের একসাথে বৃষ্টি ভেজা দিনগুলো। হাঁটুজল রাস্তায় নেমে পরা। তারপর এলোমেলো হেঁটে যাওয়া। অলিগলি দিয়ে। পাড়ার মোড়ে চায়ের দোকান। মাটির ভাঁড়ে চা আর গরম গরম তেলেভাজা! মনে আছে? আমার জীবনের প্রথম ফুচকা খাওয়া তোর সাথেই। সত্যি বলতে কি আমার প্রায় সব প্রথমেরই সাক্ষী তুই। প্রথম থিয়েটারে যাওয়া। প্রথম সিনেমা দেখতে যাওয়া। প্রথম নৌকোয় চড়া। প্রথম ট্রামে চড়া। প্রথম চেনা কোলকাতা কে। প্রথম নিউমার্কেটে দরাদরি। প্রথম হাতিবাগানে কানের দুল। প্রথম গরিয়াহাটের সেল। প্রথম কফিহাউসে ইনফিউশান। প্রথম সিগারেট। প্রথম মদ। আমার জীবনের প্রথম প্রেমপত্র ও আমার আগে তুইই পড়েছিলি। প্রথম প্রেমিকের স্পর্শের কথাও শুধু তুইই জানতিস ছুটি। প্রথম বিচ্ছেদের যন্ত্রণাও সেই বিকেলে তোর কাঁধেই ঢেলে দিয়েছিলাম মনে করে দেখ। এমনকি, যেদিন দাদার বন্ধু আমায় বন্ধ ঘরে__ সেদিন তুই হঠাৎ নোটস নিতে না এলে__ খুব কেঁদেছিলাম সেদিন। ভয়ঙ্কর যন্ত্রণা। কেউ জানেনা সেসব। তুই ছাড়া। কেউ বোঝেনি আমায় ছুটি। তুই ছাড়া। কেউ চেনেনি আমায়। একমাত্র তুই ছাড়া।

আমি বরানগরের মেয়ে। এঁদো গলির নোনা দেওয়ালের পুরনো দোতলা বাড়িতে আমার বাস। একতলায় দুই ঘর ভাড়াটে। একটাই কলতলা। বরষায় হাঁটু সমান জল উঠে যায়। বাড়ির সামনেই মস্ত বড় ঝিল। অথচ, কেউ আমায় সাঁতার শেখায়নি। আমার দাদার ক্লাস এইট থেকে সাইকেল। কিন্তু আমার বেলায়__ “না”। আমি সেই ক্লাস এইট থেকে সালওয়ার কামিজ। বুকে ওড়না। আমি সেই নাইন থেকে লম্বা বিনুনি। আমার তেলচিটে মাথা। আমার গায়ের রং কালো। আমি বাংলা মিডিয়াম। আমি পড়াশোনায় মাঝারি। কেউ তাই ভালবাসেনা আমায়। কেউ ফিরেই তাকায়না। তুই তাকিয়েছিলি। আমার নিস্তরঙ্গ জলে প্রথম তরঙ্গ তুলে ছিলি তুইই। আমি তখন নবম শ্রেনি, আমি তখন শাড়ি। শিলিগুড়ি থেকে তোরা চলে এলি কোলকাতায়। আমাদের পাড়ায় বাড়ি ভাড়া নিলি। আমাদের স্কুলেই অ্যাডমিশন নিলি। তুই ইংরিজি মিডিয়াম। তুই স্মার্ট। তোর শ্যাম্পু করা চুল। চোখে চশমা। ফর্সা গায়ের রং। মুখে চিউইং গাম। আর চেহারায় বুদ্ধিমত্তার ছাপ। সেই তুই কিনা সটান এসে বসলি আমার পাশে। সেই প্রথম আলাপ। সেই প্রথম চেনা তোকে। প্রথম ছুঁয়ে দেখা ঝড় কে। তছনচ হয়ে যাবার আগে চিনে নেওয়া নিজেকে। তুইই আমার অচলায়তনে প্রথম ফাটল ধরিয়েছিলি। তুইই ছিলি আমার রঞ্জন, আমার বাঁশিওয়ালা। তুই নিয়ম ভাঙতে শিখিয়েছিলি আমায়। শিখিয়েছিলি প্রশ্ন করতে। শিখিয়েছিলি মাথা উঁচু করে বাঁচতে। শিখিয়েছিলি সহজ, সুন্দর হতে। তুই আমার আয়না ছিলি ছুটি। তুইই আমার সব সত্যি না হওয়া স্বপ্নেরা। তুই আমার ভিতরের অন্য এক আমি। তুই আমার না জন্মানো মেয়ে। তুই এসব কিছুই জানিস না ছুটি। কোনোদিন জানবিও না। তবু আমি লিখবো। কারণ, লিখতে আমায় হবেই।

জানিস ছুটি? তুই যেদিন আমায় প্রথম রুদ্রর কথা বললি, খুব মনখারাপ হয়েছিল। তখন আমরা ক্লাস টুয়েলভ। সেদিন বৃষ্টি পড়ছিল। তোর আমার বাড়ি খিচুড়ি আর ইলিশমাছ ভাজার নেমন্তন্ন ছিল। মা রান্নাঘরে ব্যস্ত। বাবা টিভিতে ক্রিকেট দেখছিল। দাদা বন্ধুদের সাথে ক্যারম খেলছিল। তুই আর আমি আমার ঘরে। আমরা গান শুনছিলাম। সুমন। আর এলোমেলো গল্প করছিলাম। হঠাৎ তুই বললি, তুই একজনকে ভালোবেসে ফেলেছিস। রুদ্রকে। তুই দেখতে পাসনি, কিন্তু আমার চোখ জলে ভরে উঠেছিল। তুই দেখতে পাসনি। কোনোদিন দেখতে পাসনি। সেদিনের পর মাঝেমাঝেই আমাদের আড্ডায় চলে আসতো ওর কথা। কবে তুই আর ও কফিহাউসে গিয়েছিলি একসাথে। কবে তোরা শ্যামবাজারে পাপড়িচাট খেয়েছিস। কবে তোরা রাত জেগে গল্প করেছিস এসএমএস এ। কবে প্রথম তোর হাত ধরেছিল ও। কবে তুই ওর কাঁধে মাথা রেখেছিস। কবে ও প্রথম চুমু খেয়েছিল তোকে। সব বলতিস তুই। সব। তোদের সব আদর, সব ভালবাসাবাসি, সব অভিমান, ঝগড়া। সব বলতিস তুই আমায়। আর আমার কষ্ট হতো। যন্ত্রণা হতো ভীষণ। যে জায়গাটা আমার একার ছিল, সেটা রইল না আর। তুই আর আমার বাড়ি বড় একটা আসতি না। আমার সাথে সিনেমাথিয়েটার এও যেতিস না। জন্মদিনে আর বই পাওয়াও হতো না আমার। একদিন বিকেলে, মনে আছে, তুই ওর কথা বলছিলি। ওর আদরের কথা। তোর চোখে চিকচিক করছিল মিঠে নোনাজল। তবু তুই কোন ফাঁকে দেখে ফেলেছিলি আমার চোখেও জল। কাঁধে হাত রেখে জানতে চাইলি, “কী হয়েছে?” আমি কান্নায় ভেঙে পড়লাম তোর বুকে। বললাম, “কেউ ভালবাসেনা আমায়”। তুই আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললি, “ভালবাসবে। নিশ্চয়ই ভালবাসবে। অপেক্ষা কর”। তুই বুঝলি না কিছুই। আর আমিও বোঝাতে পারলাম না। আজও পারছিনা হয়তো। ভালোবাসা তো বোঝানো যায় না রে। বুঝে নিতে হয়।

তোরা যেদিন শিলিগুড়ি ফিরে গেলি সেদিন আমি সারারাত কেঁদেছি। শুধু তুই চলে গেলি বলে নয়, আমার মনে হয়েছিল তুই আমার থেকে আমাকে নিয়ে চলে গেলি। আমার স্বাধীনতা নিয়ে চলে গেলি। আমার সব আনন্দ, ভালোলাগা, সবটুকু নিয়ে চলে গেলি পাহাড়ের কাছে। তারপরেও অবশ্য বেশ কিছুদিন যোগাযোগ ছিল। কথা হতো ফোনে। কিন্তু সেটা কমতে কমতে একেবারে নেই হয়ে গেলো। তোর পুরনো নাম্বারে বেশ কয়েকবার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু ওটা বোধহয় আর ব্যবহার করিস না তুই। দেবায়ুধের সাথে তোর যোগাযোগ আছে জানি। কিন্তু, আমার ইচ্ছে করে না তোর খবর অন্য কারুর থেকে জানতে। তুই বলেছিলিস অপেক্ষা করতে। আমি তাই এখনও অপেক্ষা করি। অপেক্ষা করি সেই দিনটার, যেদিন তুই হঠাৎ ফোন করবি আমায়। অথবা, কোনও এক বৃষ্টির দিনে হঠাৎ চলে আসবি আমার বাড়ি। যেমন ক্লাস নাইনে হঠাৎ এসেছিলি কালবৈশাখী ঝড় হয়ে। তেমন করেই আসবি তুই। আমি অপেক্ষা করে আছি সেই মুহূর্তটার জন্য। তুই তো এখন রুদ্রকে বিয়ে করে কোলকাতায়। আমি তোর ঠিকানা জানিনা। কিন্তু, তুই তো জানিস আমার ঠিকানা। চলে আয় না! তুই না আসা অবধি এই চিঠিটা যত্ন করে রেখে দেব। কোথায় রাখি বল তো? তোর সেই ফিরোজা রং এর সোয়েটারটার পকেটে?

ছুটি, তুই নিশ্চয়ই ভালোই আছিস রুদ্রর সাথে। ভালো থাক তুই। ভালো থাক তোরা। তোর সাজানো ঘর দেখতে বড় সাধ হচ্ছে এখন। তুই কি এখন ঘোরতর সংসারী? নাকি, আগের মতই উড়নচণ্ডী? চাকরীর খবর তো পেলাম। বলেছিলি যে, রিসার্চ করবি, তার কি হল? এখন আর লেখালিখি করিস? কী ভালো হাত ছিল তোর! আর গান? সেটাও কি ছেড়ে দিয়েছিস? গলার কাছটা কেমন ব্যাথা করছে রে ছুটি। তোকে সত্যি সত্যিই ভীষণ দেখতে ইচ্ছে করছে জানিস? দেখতে ইচ্ছে করছে সিঁদুর পরলে তোকে কেমন দেখায়। আমার বেশ কিছু বিয়ের সম্বন্ধ এসেছিল জানিস? ভাগ্যিস আমি দেখতে খারাপ। তাই আমাকে কারোর পছন্দ হয়নি। শুধু, তোকে ভালোবাসি বলে নয় রে, কনেদেখার নামে ঠিক পণ্য হয়ে যেতেও চাইনি আমি। আমি বিয়েতে বিশ্বাস করি না। আমি এই প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ককে বিশ্বাস করিনা। আমি পারব না পুরুষের কাছে নিজেকে সঁপে দিতে। আমি মুক্তি চাই রে ছুটি। এই স্বাধীন দেশে সত্যি সত্যি স্বাধীন হয়ে বাঁচতে চাই আমি। আমি শুধুই একটা শরীর নই। শুধুই সেক্সুয়াল প্রেফারেন্স আমার পরিচয় নয়। আমার পরিচয় আমি নিজে। আমার সত্তাই আমার পরিচয়। আমার মনন, আমার চেতনা, আমার মেধা, আমার ক্রিয়েটিভিটি __ এগুলোই আমি। তাই, কারো কাছে মাথা নোয়াবোনা আমি। কক্ষনো না। কোনোদিন না। তবে, একজন আছে জানিস। তোরই মত পাগল। আমায় বড় ভালোবাসে। ভীষণ ভালো লেখে ও। গলা ছেড়ে গান গায়। সবুজ মাঠে ছুটে যায় বল পায়ে। ওর দুচোখ ভরা স্বপ্ন। দিনবদলের স্বপ্ন। ও গান বাঁধে। আগামীর গান। নতুনের গান। ওর গীটারে বিপ্লব ভাষা পায়। ওর কলমে ধরা দেয় প্রেম। ও কখনো আমার ভাই, কখনো আমার বন্ধু, কখনো আমার না হওয়া ছেলে, কখনো বা প্রেমিক। হ্যাঁ ও পুরুষ। কিন্তু, ও পুরুষতান্ত্রিক নয়। শ্রমণ, ওর নাম। ও ভিক্ষু। ও কাঙাল। ও ভালোবাসার কাঙালি। ওকে আমি বলেছি তোর কথা। ও সম্মান করে আমায়। ও আমায় বাঁধতে চায় না, আমিও চাই না ওকে বাঁধতে। ও আমায় অধিকার করতে চায় না, আমিও চাইনা ওকে অধিকার করতে। তবু আজীবন পাশে থাকবো আমরা। একে অন্যের। বন্ধুর মত। একসাথে লড়ব আমাদের লড়াই। আমাদের সক্কলের মুক্তির লড়াই। সহযোদ্ধা হয়ে। আমরা ঠিক পারব দেখিস। আমরা পারবো নতুন দিন আনতে। আমরা যদি বা নাও পারি, আগামী প্রজন্ম পারবেই। আজকের এই লজ্জার দিনটা আর কেউ মনে রাখবেনা সেদিন। সেদিন হয়তো তোর মেয়ে আর আমার মেয়ে হাতে হাত রেখে হেঁটে যাবে রাজধানীর পথ দিয়ে। কেউ ওদের বাধা দেবে না। ওরা প্রকাশ্যে চুমু খেলে কেউ ওদের জেলে পুরবে না। ওরা স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক হয়ে মাথা তুলে বাঁচবে। কিন্তু লড়াইটা শুরু হওয়ার দরকার। এখুনি। এই মুহূর্তে। আর, তুই তো রক্তকরবী পড়েছিস। জানিসই তো, নন্দিনীদের লড়তেই হয়!

 

ইতি

নন্দিনী

১১ ই ডিসেম্বর, ২০১৩

কোলকাতা

__________________

অন্বেষা বসু

১১/১২/২০১৩

ডানকুনি

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s