লিখেছেন: পাইচিংমং মারমা

CHT-8-মনে করুন আপনি কোথাও বাসে চলেছেন। কানে হেডফোন গুঁজে প্রিয় একটা গান চালাতেই আপনার পাশে বসা সহযাত্রী হর হর করে বমি করে দিলো আপনার কোলের উপর। আপনার গান শোনা আর জানলা দিয়ে প্রকৃতি দেখা বমির টক গন্ধে, বিবমিষায় ভরে গেলো। এরপর সেই পার্শ্ববর্তী যাত্রী আপনার সামনে, আপনার পাশে বারবার বমি করলো। আপনার গোটা যাত্রাপথটাই সে নোংরা করে দিলো। কানে গুঁজে দেওয়া মিষ্টি মিষ্টি প্রেমের গানগুলো সে বমির গন্ধে টক বানিয়ে দিলো। কেমন লাগবে?

অথবা আপনার পার্শ্ববর্তী যাত্রীটি জানলা দিয়ে কাশি ঝাড়তে গিয়ে হলুদ কফ মেখে দিলো স্বচ্ছ জানলায় আর তার কিছু অংশ ছিটকে পড়লো আপনারই ক্রিম লাগানো মুখেকেমন লাগবে??

খুব খারাপ লাগবে। আমরা আমাদের প্রেমাস্পদের কথা ভাবতে ভাবতে, প্রিয় কোন স্মৃতি বা সুখের কথা ভাবতে ভাবতে যাত্রাকালীন সময়টা কাটাতে চাই। তাহলে কিভাবে আমরা এই যাত্রাকালে আপদের ব্যাপারগুলো ভুলে থাকতে পারি?

একটাই উপায়, অচেতন হতে হবে। খুব ভালো উপায় হচ্ছে মরার মতো ঘুমিয়ে পড়া। মরফিন টাইপের কিছু হলে ভালো হয় আপনি গান শুনতে শুনতে মরফিনের ঘুমে পারিপার্শ্বিক সব ভুলে মরার মতো ঘুমাতে পারবেন।

এবার ভাবা যাক আপনারআমারআমাদের জীবনযাত্রার কথা। আমরা সবাই আমাদের জীবনটাকে সিনেমার মত স্বপ্নীল করতে চাই। আমরা চাই এই যাত্রাপথে স্বপ্নে দেখা সব দৃশ্যের প্রাচুর্য্য থাকবে চারপাশে, পাশে থাকবে কাঙ্ক্ষিত সহযাত্রী। কিন্তু আমার বা আপনার পাশে যদি আধশোয়া হয়ে থাকে আমাদেরই কোন আপনজনের কঙ্কাল তাহলে?

খুব নিশ্চিতভাবেই সেই যাত্রা হবে বিভীষিকাময়। কেননা আপনার পাশেই আধশোয়া হয়ে আছে আপনারই আপনজন আপনার মাসি, আপনার কাকা, আপনার ভাইবোনবন্ধুপরিজনের দেহাবশেষ

তখন কি হবে??

বাসের দুলুনিতে আরামের ঘুম সেরে উঠার পরই আপনি যখন দেখবেন আপনার বোনটা

যাকে ধর্ষণ করে মেরে রেখে গিয়েছিলো কোন এক সেটেলার জন্তুতারই কোটরে বসা কাতর চোখ আপনারই দিকে তাকিয়ে যেন বলছে আমাকে বাঁচাও!কি করবেন???

অথবা আপনি হঠাৎ খেয়াল করলেন যে আপনার সহযাত্রী অচেনা কেউ নয়। আপনারই হারিয়ে যাওয়া সেই ছোট কাকা বা মেজদিদি যাকে গণহত্যায় ম্যসাকার করে মেরে ফেলেছিলো এদেশেরই “সার্বভৌমত্বের” রক্ষক “দেশপ্রেমিক” সেনাবাহিনীনিশ্চিত, আপনি স্থির থাকতে পারবেন না যদি মানবিক বোধের ন্যূনতম অবশিষ্ট থাকে আপনার হৃদয়ে।

আপনি অস্থির হবেন, বিচলিত হবেন। আপনি হতবিহবল হয়ে আঁতিপাতি করে বোধ আর অনুভূতির অতলে ডুবে ডুবে নিজেকে খুঁজবেন।

আপনি বিদ্রোহে ফেটে পড়বেন। রাগে, ক্ষোভে, জিঘাংসায় চিৎকার করে উঠবেন।

আপনি মিছিলে যাবেন। আপনি পিকেটিং করবেন। আপনি এই গণহত্যা, এই মানবতার হত্যা, এই বঞ্চনানিপীড়নের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠবেন গর্জে উঠবেন প্রতিশোধের জিঘাংসায় হাতে নেবেন অস্ত্র অধিকারের জন্য লড়বেন।

কিন্তু

আপনি বা আপনারা বা আমি এসবের কিছুই করবোনা,

যদি

আপনি বা আপনারা বা আমি প্যারালাইজড হইশারীরিকভাবে বা মানসিকভাবে। শারীরিক প্যারালাইসিস কেমন আমরা জানি, কিন্তু মনের প্যারালাইসিসটা কেমন?

কেমন হয় বোধের প্যারালাইসিস?বুদ্ধির প্যারালাইসিস?অনুভূতি এবং চেতনার প্যারালাইসিস?

হ্যাঁ, এইসবেরও প্যারালাইসিস হয়। যেমন অনুভূতির প্যারালাইসিস হলে ইংরজীতে বলে Numbঅর্থাৎ, কিনা নিঃসার যার অনুভূতি মরে গেছে। স্পর্শে সাড়া দেয়না শরীর, ক্রোধে হাত উঠে আসেনা, চুম্বনে শরীর জাগে নাদ্রোহ, ক্রোধ, ঘৃণা, ভালোবাসা, কাম, সহানুভূতি, শোক এসব অনুভব করতে না পারার একটা শূণ্য অবস্থা। অনুভূতির প্যারালাইসিস বিকারগ্রস্থদের মধ্যে খুব দেখা যায়। নিঃসার আর বিকারগ্রস্থ মানুষ আমরা কমবেশি অনেক দেখেছি। আরেক ধরনের প্যারালাইসিস আজ জাতীয় ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে

চেতনার প্যারালাইসিস। চেতনার প্যারালাইসিসে আক্রান্ত আমাদের মধ্যজীবি সমাজ একটা প্রতিবন্ধী প্রজন্মের জন্ম দিয়েছে এই শূণ্য দশকে

চেতনার প্রতিবন্ধী

মুশকিলটা হচ্ছে পক্ষঘাতগ্রস্থ কাউকে আমরা দেখেই চিনতে পারি। হাত নড়ছে কিন্তু আঙ্গুল নড়ছেনা, একটা পা হাঁটছে কিন্তু আরেকটা পা চলছেনা ছেঁচড়ে ছেঁচড়ে চলেছে আধা বিকল একটা শরীরব্যস এটুকুই যথেষ্ট একজন প্যারালাইসিসে আক্রান্ত মানুষকে চেনার জন্য কিন্তু চেতনার প্রতিবন্ধীদের চেনা দুষ্কর। কেননা তারা বিশেষ কেউ নয়আলাদা কেউ নয়তারা আমরাই। হ্যাঁ আমরাই। আমরা যারা বলি ‘আই হেট পলিটিক্স, পলিটিক্স সাক্স’। আমরা যারা বিদেশ পালাতে চাই। আমরা যারা আদিবাসী দাবি করি কিন্তু সরকার যখন উপজাতি কোটায় বিসিএস ক্যাডার ঢোকাতে যায় আমরা ঘুষের লোভে আর মিথ্যা সামাজিক মর্যাদার লোভে লাইনে দাঁড়িয়ে কৌটাবন্দি হয়ে যাই। আমরা যারা মিছিল করতে ভয় পাই, মিটিংমিছিলসমাবেশ থেকে শত মাইল দূরে থেকে প্রেমের সুরায় চুমুক দিই। আমরা যারা দেশপ্রেমে কেঁপে উঠার পরপরই পর্নোগ্রাফি দেখে লিঙ্গ কাঁপাই। আমরাই যারা মাটিমানুষমাতৃভূমিজাতিমানবতার কথা ভুলে শুধু নিজেরটা গোছাই। আমরাই যারা চোখের সামনে নিজের ধ্বংস দেখেও প্রতিবাদ করিনা। তাইন্দংএর তিন হাজার মানুষ স্বাধীন দেশের নাগরিক হয়েও রিফিউজি হয়ে যায় আর আমরা শহরে মদ খেয়ে পার্টি করিহ্যাঁ আমরাই চেতনার প্রতিবন্দী। আমরাইযাদের পূর্বপুরুষ কাপ্তাই বাঁধের ফলে রিফিউজি হয়েছিলো, যাদের পূর্বপুরুষ সেটেলারের দখলে মাটি হারিয়ে অন্যত্র পালিয়ে জীবন যাপন করছে।

আমরাই যাদের বাবা, কাকা, মামি, মাসি, জ্যেঠা আর্মি বা সেটেলার বা রাষ্টীয় বাহিনীর হাতে কুকুরের মতো মরেছে গণহত্যায়; কিন্তু আমরা বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে প্রমোদে ঢেলে দিয়েছি শরীরমন।

আমরা যারা ইতিহাস ভুলে, অপমাননিপীড়ন ভুলে, গণহত্যা ভুলে, বোনের ধর্ষণের দুঃসহ স্মৃতি ভুলে বেঁচে আছি প্রাত্যহিক সুখে। আমরাই সেই প্যারালাইজড প্রজন্ম। আমরাই সেই বোধ প্রতিবন্ধী মানুষ নামের মেরুদন্ডহীন প্রাণী

আমরাই সেই মাস্টার্স পাস করা মুর্খ, বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী, যারা নিজেদের অস্তিত্ব হুমকির মুখে জেনেও নড়ে চড়ে জেগে উঠছিনা।

আমরাই সেই নেশায় বুঁদ হয়ে থাকা মানুষ, যারা আসন্ন ধ্বংসের কথা জেনেও ব্যক্তিগত ভোগের ঘোরে আত্মহারা।

এবার একটু ভেঙ্গেখুলে দেখা যাক আমরা কেমন বোধপ্রতিবন্ধী

১৯৭৯ সাল থেকে ২০১৩ পর্যন্ত একটা টাইমফ্রেমে পাহাড়ের ঘটনাগুলোকে মেলানো যাক। ঘটনাগুলোকে জোড়া লাগালে আমাদের অস্তিত্বের প্রশ্নে রাষ্ট্রের অবস্থান ক্লিয়ার হয়ে যাবে। রাষ্ট্রের সুনির্দিষ্ট, দীর্ঘপ্রসারী এবং কার্যকর একটা পলিসি আছে। কেতাবী ভাষায় এই পলিসির নাম ‘এথনিক ক্লিনজিং পলিসি’। একে কার্যকর করতে আর্মিরা শুরুতে ‘অপারেশন দাবানল’ তারপর ‘অপারেশন উত্তরণ’ আর গত দশক থেকে ‘অপারেশন শান্তকরন’ নামে এখানে মিশন চালিয়ে আসছে। এখানে এত ক্যান্টনমেন্ট, গ্যারিসন, ক্যাম্প, ব্যাটালিয়ান মাগনা মাগনা রাখা হয় নাই।

অপারেশন দাবানল’ দিয়ে অরন্যে আগুন লাগানো হলো তেরোটা গণহত্যায় অনেকে মরলো, ৭০,০০০ মানুষ আগুনের ভয়ে ভারতে পালালো। ‘উত্তরণ’ দিয়ে পাহাড়ের চূড়ায় পাহাড়িদের মাটি বেদখল করে সেটেলারদের বসতি গড়ে তোলা হলো। তারপর শান্তিচুক্তি দিয়ে আমাদের সংগ্রামকে তালা মেরে দেওয়া হল।

গোল করেনা, গোল করেনা খোকন ঘুমাও মোনঘরে

যাও বাবা লেবেনচুষ চুষো আর এনজিও এনজিও খেলো।

এরপর আসলো ‘অপারেশন শান্তকরন’। UNDP-CHTDFএর peace buildingকর্মসূচি আসলো।

গাদা গাদা এনজিও তৈরি হলো। আমাদের উন্নত প্রাণী বানাতে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার আর ডলারে বেতন গোনার কর্মচারীরা আসলো। একবার ভাবুনতো বাবুমশাইরা,

কেন ফখরউদ্দিনের আর্মিরা ২০০৯ সালে তৃতীয় পর্যায়ে CHTDFএর ‘শান্তি গড়ার’ কর্মসূচিকে (Third Phase of peace building program)ছাড়পত্র দিয়েছিলো?যে আর্মিরা লোগাং, বাঘাইহাট, নাইন্নারচর, লঙ্গদু গণহত্যায় আদিবাসীদের পাখির মত মেরেছে তারা হঠাৎ আমাদের উন্নত বানাতে উঠে পড়ে লাগলো কেন?

এই পোড়া সময়ে আমাদের কি শান্তিউন্নতি দরকার নাকি স্বাভাবিক জীবনের গ্যারান্টি এবং স্বাভাবিক মৃত্যুর নিশ্চয়তা দরকার?

সাম্প্রতিককালে কি দেখা গেলো?৩২তম স্পেশাল বিসিএস পরীক্ষায় ২০৩ জন উপজাত ভাবিঘুষখোর কেরানী কোটায় কৌটাবন্দি হতে পারেনি বলে ঢাকায় মিছিল করেছে। অথচ তাইন্দংয়ে স্মরকালের জঘন্যতম জাতিগত হামলায় যখন তিন হাজার মানুষ ঘরছাড়া হলো তাদের একটাকেও রাস্তায় নামতে দেখা গেলো না।

তারা কেউ ন্যূনতম প্রতিবাদ করেনি রাস্তায় বা ঘরে বা লেখায় বা সামাজিক মিডিয়ায়। আমরাও ত্রাণ তুলতে গিয়ে পোলাপান পাইনি। সবাই মত্ত ছিলো ঈদ ভেকেশনে। এসব কিসের আলামত?

সবসময় তরুনেরাই অন্যায়ের প্রতিবাদ করে। এটাই যুগে যুগে হয়ে আসছে। সেই তরুন সমাজকে প্যারালাইজড, আত্মকেন্দ্রিক, ভোগবাদী, উন্নাসিক, উদাসীন বানানো গেলে অর্থাৎ ‘শান্তকর’ করা হলে কে অন্যায়ের প্রতিবাদ করবে?

পাড়া জুড়ালো খোকা ঘুমালো শান্তি এলো দেশে

ভাগ হলাম, লড়ে মরলাম তিনটা দল এসে

আমার টাকায় বন্দুক কিনে

আমাকেই মারছো শেষে

সেটেলাররা মাটি কেড়েছে চাঁদা দিবো কিসে?

আমি নব্বই দশকের উত্তাল সময়ে বড় হয়েছি। আমার দাদা ছিলো সেসময়ের অবিভক্ত পিসিপি নেতা। তাকে ধরতে আমাদের বাড়িতে প্রায়ই রেইড দিতো আর্মিপুলিশেরা। তার বাবা মানে আমার জ্যাঠাকে প্রলোভন দেখানো হয়েছিলো, যদি দাদা রাজনীতি ছেড়ে দেয়, তাহলে তাকে ফুড ইন্সপেক্টারের চাকুরি দেওয়া হবে। দাদা শান্তির জন্য রাজনীতিতে ক্ষান্তি দেয়নি, শান্ত হয়নি। কিন্তু তার অনেক পর সে আওয়ামী লীগে জড়িত হয়।

এটাই বর্তমান সময়ের ট্রাজেডি। সেসময়ে যারা ঘরদোরের মায়াডোর ভেঙে লড়াইসংগ্রাম করেছিলো, তারা সবাই হতাশ হয়ে ক্ষান্তি দিয়ে শান্ত হয়েছে। অনেকে নির্লজ্জভাবে রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘের হয়ে কাজ করছে। খাগড়াছড়ির এমপি যতিন্দ্রলাল একদিন শান্তিবাহিনীতে ছিলেন আর আজ তিনি কি করছেন?আওয়ামীলিগের নেতা হয়ে রাষ্ট্রীয় পলিসি পালন করছেন। রাষ্ট্রের পাহাড়ি নিধনের নকশায় গুটি হয়ে ব্যবহৃত হচ্ছেন। রাষ্ট্রের সুচতুর ফাঁদে পড়িয়া জেএসএসইউপিডিএফ লিডাররা কান্দে রে!

তারা টের পাচ্ছেন যে, রাষ্ট্র তাদের সবদিক থেকে চক্রব্যুহে ঘিরে ফেলেছে। তারা লড়তেও পারছেনা, নড়তেও পারছেনা। লড়তে গেলে প্রতিপক্ষের গুলির পরোয়া করতে হয়, রাষ্ট্রের পরোয়ানার কথা ভাবতে হয়। নড়তে গেলেও তাই। তাই তারা নিজেদের অস্তিত্ব এবং দলের অস্তিত্বের প্রশ্নে রাষ্ট্রের সাথেই আঁতাত করে টিকে আছে। কিন্তু অদূর ভবিষ্যতে এর পরিনাম কি হবে???

এখন পাহাড়ে পাহাড়িদের চাইতে সেটেলাররাই বেশি নিরাপদ। দিঘীনালা উপজলার সীমান্তবর্তী এলাকা নারাইছড়ি, যেখানে জেএসএসএর আস্তানা সেখানে একজন সেটলার নির্ভয়ে ঘুরে বেড়ায়। তাকে চাঁদা দিতে হয়না। অথচ একজন আদিবাসী ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী নারাইছড়ি থেকে ফল, সবজি পাশের বাজারে বেচতে আসলেই তাকে দুবার চাঁদা দিতে হয়। জেলা সদরের বাইরে চাকুরিরত একজন মধ্যবিত্তকে চাঁদা দিতে হয় তিন পার্টিকেই। দিতেই হবে!নাহলে বাঁচা যাবেনা।

তিন পার্বত্য জেলার আজকের মধ্যবিত্তরা আশির দশকে গড়ে উঠেছে। নিদারুণ রাজনৈতিক পরিবেশে তারা প্রচন্ড নিস্ক্রিয় থেকেছেন অর্থাৎ ‘শান্তিতে’ থেকেছেন। অর্থাৎ, প্যারালাইজড হয়ে চুপচাপ থেকেছেন। শান্তিবাহিনী ফেরত, পিসিপি ফেরতদের চাকুরিতে ঢুকিয়ে শান্ত করা হয়েছে। পিসিপির ধান্দাবাজ কর্মীগুলো রাজনৈতিক আশ্রয়ের নামে ইউরোপে পাড়ি জমালো। তারা এখন উইকএন্ডের জুম্ম এক্টিভিস্ট!

তার মানে ‘শান্তকরণ’ কর্মসূচির উদ্দেশ্য কি এরকম যে, তরুণ সমাজ ক্যারিয়ারের জন্য নোট মুখস্ত করবে, শান্তিতে আমোদ ফুর্তি করবে, ভোগবাদে ডুবে থাকবে, চাকুরি করবে, ঘুষ খাবে, ঘরসংসার করবে, বাচ্চা পয়দা করবে; কিন্তু বাচ্চাদের জন্য মাতৃভূমি পাহাড়কে বাসযোগ্য করতে কোন ভূমিকা রাখবেনা?আই হেইট পলিটিক্স” বলবে এবং কোন বিদ্রোহ করবেনা??তারা শান্ত হয়ে শান্তিতে ধ্বংসের অপেক্ষা করবে???

তার মানে হচ্ছে, যারা প্রতিবাদ করে সেই তারুণ্য চুপচাপ প্যারালাইজড হয়ে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখবে আর উন্মত্ত ভোগের নেশায় ডুবে থাকবে। আরে ভাই পলিটিক্স কি কোন ভালোবাসার বা ঘৃণা করার মতো জিনিষ নাকি, এটা কি কোন জিনিষ?

রাজনীতি হচ্ছে চেতনার চর্চা। “আই হেইট পলিটিক্স” বলার মধ্য দিয়ে সে প্রকাশ করে যে, আসলে রাজনীতিক বোধে সে চেতনাহীন।

আমাদের সমস্যাটা রাজনৈতিক সুতরাং একে রাজনীতি দিয়েই ঠিক করতে হবে

কোন ডাক্তারের ডাক্তারি বিদ্যা ভালো না জানার জন্য যদি একজন রোগী মারা যায়, তার জন্য মেডিক্যাল সায়েন্সকে দোষ দেয়া যায়না। দোষটা ডাক্তারি শাস্ত্রের নয়, ডাক্তারের। সুতরাং আজ যারা সমাজের দায়ভার নিয়েও তাদের দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করতে পারছেনা, ল্টো সমাজেই রোগ ছড়াচ্ছে, আমাদের উচিৎ তাদের কাজ করে দেখিয়ে দেওয়া যে, এরকম নয় এভাবে করতে হয়। সুতরাং আমাদের সামাজিক দায় নিতেই হবে। দায় না নিয়ে শুধু তাদের গালি দিলে কাজ হবেনা।

এই ‘শান্তকরণ’ কর্মসূচি আসলে একটা নিরব আগ্রাসন। দাবানলের আগুন দেখা যায়। কিন্তু যদি অদৃশ্য ধোঁয়ায় চারপাশটা অন্ধকার হয়ে যায় আর ধোঁয়ায় আমরা ধীরে ধীরে দমবন্ধ হয়ে মারা যাই তাহলে কে জানবে যে আমরা কোন আগুনে পুড়ে মরছি?ঠিক তাই হচ্ছে এখন। এখন এখানে খুব শান্তি আছে শ্মশানের শান্তি। যখনই আগুন লাগে দ্রুত তা নিভিয়ে ফেলা হচ্ছে যাতে সেখান থেকে বিদ্রোহের আগুন না ছড়ায়। যেমন ২০১০ এর জাতিগত হামলার পরপরই সরকারি কর্মচারিদের শান্তি মিছিলে নামানো হয়েছে। ২০১১ তে রাঙ্গামাটিতেও তাই হয়েছে।

তাইন্দংয়ে হামলার পরদিন যারা ভারতে পালাতে চেয়েছিল তাদের দেশে ফেরানো হয়েছে। তাদের শান্ত করতে মন্ত্রীরা ছুটে গিয়েছে। কিন্তু তাদের ফিরে এসে লাভটা কি হয়েছে? তারাতো জীবন থেকে পালিয়ে পালিয়ে বেঁচে আছে।

কিন্তু ভেতরে ভেতরে কি হচ্ছে পাহাড়ে?

সেটেলার পুনর্বাসন, পাহাড়িদের ভিটেমাটি থেকে উৎখাত করা, সেটেলার কতৃক আদিবাসি পাহাড়ি নারীদের ধর্ষণ, অস্তিত্ব সংকটআত্মপরিচয় সংকটের মধ্যে আমরা সবাই শান্ত হয়ে শান্তিতে বেঁচে আছি। একটা কোন অন্যায়, প্রাণসংহার, ধর্ষণ, হত্যা দেখে আমরা দ্রোহে ফুঁসে উঠিনা। আমরা দু’দিন পরেই ভুলে যাচ্ছি কি হয়েছিলো। আমরা চেতনার বিকলাঙ্গতায় ভুগছি। এটাই শান্তকর কর্মসূচি, এরই নাম শান্তিসম্প্রীতিউন্নতি। এরই নাম চেতনার প্যারালাইসিস। এরই নাম বোধ প্রতিবন্ধীতা।

আমাদের তরুনদের সামনে কোন আদর্শ নেই, তাই তারা গড্ডালিকায় গা ভাসাচ্ছে

যেকোন সংগ্রামের জন্য সংগ্রামের কর্মীদের নৈতিক জোর থাকাটা আবশ্যক। যেই ব্যাটা ভোগে ডুবে আছে, ঘুষ খাচ্ছে, উন্নয়ন আর জনসেবার নামে টাকা মেরে খাচ্ছে, তাকে দিয়ে কোন নৈতিক সংগ্রাম সম্ভব কি?তার গলায় জোর আসবে কি করে?কেননা সে নিজেওতো এই চুরির সিস্টেমের অংশ সেওতো চোর। সেও তো ধরে খাওয়ামেরে খাওয়াপাছা মেরে খাওয়া সংস্কৃতির অংশ।

শান্তকর মানে হচ্ছে তুমি সিস্টেমের সাথে গা ভাসাও। যেমনে পারো মেরে খাওধরে খাওছিবলে খাওছুলে খাওল্যাংটা হয়ে খাও। খেয়ে দেয়ে শান্তিতে ঘুমিয়ে থাকো আর আমরা তোমাকে ধ্বংস করবো।’

আমি জানি, আপনি জানেন, সবাই জানে পাহাড়ে তিনটা দলের সহিংস কাইজ্যার পেছনে রাষ্ট্রীয় মদত আছে। এখানে পরোক্ষে আরেকটা বড় ধরনের ক্ষতি হচ্ছে মনস্তাত্ত্বিক ক্ষতি। তাদের জংলী রাজনীতির ফলে তরুণ সমাজApolitical, Apatheticহচ্ছে। সবাই যার যার সুখদুঃখের ভারে এতই ভারাক্রান্ত যে, সমাজের দায়ভার নিতে পারছে না। চারপাশে এত হতাশা দেখে যার সামর্থ্য আছে, সেই বিদেশবিভূঁইয়ে পাড়ি জমাচ্ছে।

আগামী দশ বছর পর আমি আমার ভিটায় থাকবো, নাকি সেখানে সেটেলাররা ছাগল চড়াবে সেটা আগে থেকেই তেনারা ঠিক করে রেখেছেন। আমরা কি ঠিক করেছি?আপনি কি ভেবেছেন একবারও?দিব্যি তো রংমহলে রঙ্গতামশা করছেন। দশপনেরো বছর পর কই যাবেন?বিদেশে পাড়ি দিবেন?ভারতে পালাবেন, মানে আবার রিফিউজি হবেন?ঘরদোর বেচে শহরে উঠবেন?ভাবুন, দাদাদিদিরা এখুনি ভাবুন। শহরে পাঁচতলা বিল্ডিং বানাচ্ছেন, বাগানবাগিচা করছেন শহরতলীতে সেটেলার পল্লী যে ফুলেফেঁপে উঠছে সেটা খেয়াল করেছেন?বাড়ীর মেয়েটা এখন সন্ধ্যার আগে আগে বাসায় না ফিরলে দুশ্চিন্তা হয়। বিশ বছর আগে আপনার গ্রামে থাকতে এসব উৎপাত হতো কী?

আপনারা ‘করেনাকো উৎপাত/খায় শুধু দুধভাত’ করে ছেলেমেয়েদের বড় করছেন, আপনাদের দুধপাতে উৎপাত করতে মাছি আসবেনা দৈত্যাকার কৃমিগুলোই হামলে পড়বে সেখানে। সম্প্রতি জেনেছি এই দুয়েক বছরেই পানছড়ি, দীঘিনালা আর খাগড়াছড়ি জেলা শহরের কয়েকশ’ অবস্থাপন্ন পরিবার তল্পিতল্পা গুটিয়ে ভারতবাসী হয়েছে। এখনই ঠিক করুন কি করবেন টিকে থাকতে প্রতিরোধ করবেন, নাকি বাঁশ খেতে পাছা পেতে দেবেন, নাকি পাছায় মখমলে কাপড় পড়ে ঘুড়ে বেড়াবেন?

To exist to resist or to be escapist???

রাষ্ট্রের পরিস্কার এথনিক ক্লিঞ্জিং পলিসি আছে। তারা পনেরোপঁচিশ বছর পর এখানে যা দেখতে চায় তাই করে চলেছে। পলিসির অংশ হিসাবে Democide, Ethnocide, Cultural extinction, Alienation Planবাস্তবায়ন করে চলেছে। আমাদের নির্মূল করার পরিস্কার পলিসি আছে তাদের অথচ আমাদের প্রতিরোধের কোন পরিকল্পনা নাই!!!

আমাদের দলগুলো একে অপরকে হত্যা করে চলেছে, আমরা চাকুরি করছি, ছেলেমেয়েরা পড়াশোনা করছে ডাক্তারইঞ্জিনিয়ার হবার জন্য। অথচ আমরা সবাই অবচেতনে একটা আতংক বয়ে চলেছি অথচ আতংক কাটানোরপ্রতিরোধের এবং প্রতিরোধ সংগ্রামের সব পথ অবরোধ করে এগিয়ে চলেছি অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে। এরকম অপরিনামদর্শিতার ফল কতটা ভয়াবহ হবে আমরাই তার সাক্ষী হবো হয়তো একদেড় দশকের মধ্যে এবং তার সবচেয়ে বড় ভিক্টিম হবে আমাদের পরবর্তি প্রজন্ম যারা এখন স্কুলে “টুইঙ্কেল টুইঙ্কেল লিটিল স্টার” পড়ছে। আমরা তাদের জন্য নিদারুণ এক পৃথিবী রেখে যাচ্ছি সচেতনেই, সযতনে!!

বন পাহাড়ের বুকের উপর দিয়ে সাপের মতো এঁকেবেঁকে পিচের রাস্তা যে বরাবর গেছে, সেখানেই সবার আগে আগে আসন গেড়েছে আর্মি ক্যাম্প। তাদের পর পর সেখানে গড়ে উঠেছে বিজিবি ক্যাম্প, পুলিশ ফাঁড়ি। এক সময়ের রিজার্ভ ফরেস্ট সাজেক পর্যন্ত চলে গেছে পিচের রাস্তা। আর্মিরাই নিয়ে গেছে রাস্তা এবং “উন্নয়ন”। ২০১০ সালে সাজেক যে থানার অন্তর্গত সেই বাঘাইহাটে সেটেলারদের সেটলমেন্ট করার চেষ্টা করেছে আর্মিরা। গণপ্রতিরোধের মুখে যদিও তাদের প্রয়াস সফল হয়নি, কিন্তু প্রাণ হারিয়েছে অজ্ঞাত সংখ্যক আদিবাসী।

পাহাড়ে প্রতি দশ জন সিভিলিয়ানের বিপরীতে একজন সৈন্যের অনুপাত বিদ্যমান। আর্মি, বিজিবি, আনসার, পুলিশ জেঁকে বসলে সেখানে তারপর সেটেলারদের সেটলমেন্ট করা হয়। উদ্দেশ্য, পাহাড়িবাঙালি জনসংখ্যার অনুপাত সমান করা। ১৯৭৯ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত এটাই হয়ে আসছে।

আদমশুমারি যাই বলুক, আমরা বলিসেটেলাররাও বলেএখানে বাঙালি:পাহাড়ি = ৫৩:৪৭, তাহলে আগামী ১০/১৫ বছর পর অনুপাতটা কি দাঁড়াবে?৮৫:১৫?নাকি ০.:৯৯.?

সব আগের মতো হলে প্রথম অনুপাতে জনসংখ্যার বিন্যাস হবেই হবে। দ্বিতীয় অনুপাতে জনসংখ্যার বিন্যাস হবারও সমূহ সম্ভাবনা আছে। একটা কোন গণ্ডগোল হবে সেটেলাররা ঝাঁপিয়ে পড়বে, প্রশাসন আফিমের ঘুম দেবে। তারপর সবাই বলবে শান্তিউন্নতিসম্প্রীতিসার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে!

এই জীবন্ত হরর সিনেমাটা আমার মত সবাই অচেতনে, অবচেতনে দেখি

আমি ঠোঁটকাটা, বোকাচোদা বলে চুপ থাকি না। তাই সবাই যখন ফেসবুকে সুখি মানুষের কিত্তিকম্মো দেখাতে ব্যস্ত, আমি তখন চিৎকার করে তাদের শিৎকারে বাধ সাধি।

জীবন আমিও ভালোবাসি, তাই বার বার বলি, জীবন আমাদের নয়”

এটা মানুষের জীবন হতে পারেনা, কিছুতেই না। বৈরী বাতাসে সাম্প্রদায়িকতার বিষ খেয়ে তিলে তিলে মরাটা মানুষের জীবন হতে পারেনা। আমার জীবন আর সবার মতো নয়। আমি এটা সচেতনে বিশ্বাস করি।

মেট্রোপলিটান স্বপ্নে পাওয়া একটা ফ্ল্যাটবাড়ি, একটা গাড়ি, মেপল লিফ বা স্কলাস্টিকায় পড়া ছেলেমেয়ে, এক চিলতে বারান্দা, উইকএণ্ডে বাইরে খাওয়া, ঘুড়া এবং দাম্পত্যক্রিড়া, সেভিংস থাকা

নাএটা আমার স্বপ্ন হতে পারেনা। আমার শেকড় যখন খেয়ে ফেলছে রাষ্ট্রীয় উইপোকা, এই মেট্রোপলিটান স্বপ্ন তখন জীবনবিচ্ছিন্নশেকড়বিচ্ছিন্ন একটা ঘোরের জীবন ছাড়া আর কিছু নয়। ফাস্ট ফুডে, এফএম, কর্পোরেট স্বপ্নে পাওয়া সিনথেটিক সুখ, আমার স্বপ্ন হতে পারেনা আর তাই কর্পোরেট জব আর বসের ব্লোজব, বলিঊডহলিঊডের নীলচে টোনের দিনরাত, আমার স্বপ্ন হতে পারেনা। ডিজিটাল ক্যামেরা দিয়ে তোলা আমোদফুর্তিপ্রমোদ ভ্রমণের ছবি আমরা যতোই আপলোড করি, যতোই মগজে কসমোপলিটান স্বপ্ন ডাউনলোড করি না কেন, আমাদের বিনাশ যখন অনিবার্য তখন এসব সুখের ছল আমাদের বিবশ চেতনা এবং প্রতিবন্ধী বোধের মারণ ব্যাধি ছাড়া আর কিছু নয়। হ্যাঁ, যারা নিজের শেকড়, মাটিমানুষের কথা ভুলে রাষ্ট্রের খাস চাকর মানে বিসিএস ক্যাডার হওয়াকে জীবনের পরম পাওয়া মনে করে, যারা ভিনদেশের ডলার কামিয়ে একটা সুন্দরীকে বগলদাবা করাকে জীবনের পরম প্রাপ্তি মনে করে আমি বলবো এরা প্রত্যেকেই চেতনার প্রতিবন্ধী।

আমাদের বিনাশ যখন অনিবার্য তখন প্রতিরোধের অস্ত্রে শান না দিয়ে বিদেশ পালানো ভীরুতা। আমাদের বিনাশ যখন অনিবার্য তখন চেতনায়বোধেবুদ্ধিতে শান না দিয়ে প্রতিবোধে (Anti intellectualism, Apathy)জরাগ্রস্থ, বিবশ হওয়াটা তাদের কাছে পরাজিত হওয়া। কেননা তারাও তাই চায়।

আর তাই আমাদের জাগতে হবে। জাগতেই হবে।

প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে চিন্তায়, বোধে, মননে, সংস্কৃতিতে, অরণ্যে। এখনো সময় ফুরায়নি।।

—————————————-

বিবিধ প্যাঁচাল :: মুড়ির ঠোঙা অথবা দ্রোহের মন্ত্রণা

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s