লিখেছেন: স্বপন মাঝি

world-to-winছাত্রছাত্রীরা চলে যাবার পর ছাপড়ার ঘরটার মধ্যে সে একা হয়ে যায়। ভাঙ্গা বেড়া, ভাঙ্গা জানালা। এ ঘরের মালিক একজন কোটিপতি। কোটিপতিদের কেউ এখানে থাকেন না। লজিং মাস্টারদের জন্য নির্মিত এ ঘরটা তার কাছে বেশ লাগে। জানালার কাছে বসলে পশ্চিমের আকাশ দেখা যায়। বুড়িগঙ্গার ওপর দিয়ে যখন বড় কোন জাহাজ যায়, তার মাস্তুল পর্যন্ত দেখা যায়। তার কাছে এ এক বিশাল প্রাপ্তি। একটা চাকরি হলে পরে নদীর পাড়ে ঘর ভাড়া নেবার ইচ্ছে, তার বহুদিনের। সেই চাকরি এখনো হয়নি, হওয়ার সম্ভাবনাও নেই।

চাকরি খুঁজতে খুঁজতে অচিরে সে বুড়ো হয়ে যাবে। তারপর আগাছার মত মরে যাবে একদিন। মৃত্যুর পূর্বে হাতে গোনা কয়েকটা দিন, একটু পেট ভরে খেয়ে মরতে পারলে মন্দ হতো না। এ ভাবনা তার মাথায় এসে ইঁদুরের দৌড়াতে শুরু করলে, তার মনে হয়; পেট ভরলে না হয় একজন সঙ্গীর কথা ভাবা যেত। সেও বেশিদিনের জন্য নয়। তারপর সমুদ্র পার থেকে ফিরে এসে, হয়তো মরতে মন চাইতো না। তবুও এখনকার মত এত খারাপ লাগতো না।

না, না, কথাটা ঠিক নয়। মানুষ দুঃখে থাকলে মরে যাবার আগে সুখ পায়, আর সুখে থাকলে মরে যাবার আগে দুঃখ পায়। এখন সে মরে গেলে কেউ দুঃখ পাবে না। এমনকি কাকপক্ষীর কন্ঠ থেকেও কোন ধ্বনি উদ্গত হবে না। অথচ একটা সময় গেছে, যখন তার মৃত্যুতে কয়েকটা হরতাল হয়ে যেতে পারতো। অথবা দেশবাসী তার মৃত্যুতে গভীর শোক সাগরে ভেসে যেতে পারতো। যেমন হয়েছিল নুর হোসেনের বেলায়। জাফর জয়নাল, দীপালি, নুর হোসেন সহ আরো কতজন তাকে বাঁচিয়ে রেখে গেছে, ব্যক্তিগত গাড়ি হাঁকিয়ে চলার জন্য। অথচ তার পেটে ভাত নেই। ঘর থেকেও নেই। একজন সঙ্গী, সেও নেই। শুধু নেই আর নেই। মাঝে মধ্যে মনে হয়, এখন একটা হুলস্থুল বেঁধে গেলে মন্দ হত না। তাহলে সেও নায়ক হয়ে উঠবার চেষ্টা করতে পারত। তার চেনা জানা অনেক মেয়ে হয়ত, তার কথা ভেবে গোপনে চোখের জল ফেলত। সে সুযোগ আর আসবে না। এখন গণতন্ত্র এসে গেছে। এরশাদ সামরিক আসন থেকে নেমে এসে, গণতান্ত্রিক নেতানেত্রীদের পাশে ঠাঁই নিয়েছেন। তিনি, নিজেও এখন গণতান্ত্রিক। গণতন্ত্রের জন্য আর লড়াই হবে না। তাহলে হুলস্থুল বাঁধবার সম্ভাবনাও নেই।

তবুও সে গৌরবময় মৃত্যুর স্বপ্ন দেখে।

এর নাম হল স্বপ্ন।

চাইলেই কি আর এখন হুলস্থুল বাঁধানো যাবে? যেমন বাঁধিয়েছিল ১৫ ফেব্রুয়ারি। জল কামান আর বন্দুক নিয়ে ছুটে এসেছিল দেশের অতন্দ্র প্রহরী। তারা গুলি চালিয়ে, খুন করে, নির্যাতন চালিয়ে, গণ গ্রেফতার করে দেশকে উদ্ধার করেছিল আসন্ন অন্ধকারের হাত থেকে। যদিও পেটে ভাত না জুটে যাবার কারণটা ভিন্ন।

তো এখন মরে গেলে, সে মৃত্যুতে কোন গৌরব থাকবে না।

নিজেই নিঃশব্দে হাসল। পরক্ষণে হাসিটুকু গোধূলি বেলার ফিকে আলোর মত দীর্ঘশ্বাসের আঁধারে ডুবে গেলো। অলস হাতে উঠে এলো পুরনো নথিপত্র। এটা একটা বাতিকে রূপ নিয়েছে। অতীতের পাতা উল্টে উল্টে ঘুরে বেড়ানোর নেশা। সিগারেটের ধোয়ার মত পাক খেয়ে খেয়ে সবকিছুকে ঝাপসা করে রাখে।

এই যেন ভাল।

আবেদন পত্রের অনেকগুলো ফটোকপি, এখনো সযত্নে রেখে দিয়েছে। এক সময় ভাবত বিয়ে করবে, সন্তান, নাতিনাতনিদের দেখাবে। এখন আর ভাবে না। আবেদনপত্রগুলো উল্টে পাল্টে দেখে, আর এলোমেলো কিছু চিরকুট। তারপর হাতে উঠে আসে প্রথম যৌবনের কবিতার মত করে লেখা, আকুতি মাখানো প্রেমপত্র। যাকে উদ্দেশ্য করে লেখা, দে’য়া হয়নি। আজো সযত্নে রেখে দিয়েছে। গৃহশিক্ষতার অবসরে এই হল তার জগত, তার সংসার।

ছবিটা দেখে। যতবার দেখে, ততবারই সে চমকে যায়। এ চমকটুকু আছে বলেই বারবার দেখে। ভাঁজ করা একটা কাগজের ভেতর, খুব যত্ন করে রাখা। টগবগে এক তরুণ, চোখে মুখে প্রতিরোধের আগুন। প্রতিবারের মত এবারও ছবির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে সেটি জীবন্ত হয়ে উঠে। ছবিটা একখন্ড কাগজ থেকে বেরিয়ে সদর্পে এগিয়ে যায়। খালি গা। শার্টটা প্যান্টের ওপর বাঁধা। বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে আছে পুলিশের মুখোমুখি। চারদিক থেকে ভেসে আসে প্রতিরোধের শ্লোগান। ইটপাটকেল, টিয়ার গ্যাস তারপর ‘মহান শাসক’দের প্রিয় বুলেট, প্রতিষ্ঠান রক্ষার বুলেট, দেশ রক্ষার বুলেট, গদি রক্ষার বুলেট, শান্তি রক্ষার বুলেট, জানমালের নিরাপত্তা রক্ষার বুলেট সবগুলো বুলেট একসাথে ছুটে এসেছিল। চারদিকে ভয়াবহ আর্তনাদ, ছুটোছুটি। সে হতভম্ব হয়ে ভাবছিল, খাকি পোশাক পড়লেই কি মানুষ পাল্টে যায়? হুকুমের দাস হয়ে যায়? ব্রিটিশ, পাকিস্তানি আর বাঙ্গালীতে কোন ভেদ থাকে না?

হেঁচকা টানে তার চৈতন্য এসেছিল। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল কনক। তারপরই তার কানে এল কর্কশ ধ্বনি, ভাগ হারামজাদা, সব পাগলা কুত্তা অইয়্যা গেছে।

তার কথা শেষ না হতেই মফিজ যার সাথে রাজনৈতিক মতপার্থক্য অনেক, হাত চেপে ধরে দৌড়াতে শুরু করল। দোয়েল চত্বরের সামনে এসে হাঁফাতে হাঁফাতে মফিজ বলল, কবিতা মারাচ্ছিলি, যা সোজা হলে চইলা যা, হলে গিয়া কাপড়চোপড় বদলায়া আয়।

তখনো ঘোর। নিজের দিকে তাকিয়ে দেখল, তার সর্বাঙ্গ লাল। কখন যে জলকামানের হামলা হয়েছিল, মনেই করতে পারল না।

হলের সামনে এসে দেখল, চারদিক কেমন নিঝুম। ভাবল, রুমে কেউ নেই। তবুও কড়া নাড়ল। দরজা খুলে বেরিয়ে এল আরমান। তাকে দেখেই চমকে গেল, কি ব্যাপার, কি হয়েছে? উত্তরের অপেক্ষা না করে তাকে নিয়ে গেল পাশের রুমে।

ক্লান্ত কন্ঠে সে বলল, গুলি হয়েছে, জাফর, জয়নাল. দীপালিসহ অনেকে মারা গেছে।

কি লাভ এসব করে? আরমান রুমে ঢুকতে ঢুকতে বলল।

সে আরমানের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখল, হাঁফাচ্ছে। তার শরীরে বিন্দু বিন্দু ঘাম। সে বিড়বিড় করে বলল, এ রক্ত বৃথা যাবে না।

আরমান বললো, সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে গিয়ে কি করতে পারবি তোরা, আমি বুঝি না।

সে বলল, আমাকে একটা প্যান্ট আর একটা শার্ট দে, রঙ মাখা কাপড় নিয়ে বেরুলে গ্রেফতার করা সহজ হয়ে যাবে।

পাশের রুম থেকে রেজোয়ান বেরিয়ে এল। তার দিকে তাকিয়ে দেখল, সেও হাঁফাচ্ছে, খালি গা, তার শরীরেও বিন্দু বিন্দু ঘাম। পরক্ষণেই ভেসে এলো নারী কন্ঠের হাসি।

আরমান চলে গেল তার রুমে। সে তার পিছু নিতেই রেজোয়ান তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, আপনি এখানেই বসেন।

সে ঘাড় নীচু করে বসে রইল।

আরমান তার শার্টপ্যান্ট নিয়ে এলে সে সেগুলো পড়ে বেরিয়ে গেল।

কোথায় যাচ্ছিস?

অপরাজয়ের পাদদেশে।

মিছিলে মিছিলে এ যেন এক অন্য রকম ক্যাম্পাস। সবাই অধীর হয়ে অপেক্ষা করছে জাতীয় নেতাদের জন্য। চারদিকে গুঞ্জন, আমরা সামরিক আইন ভেঙেছি, এবার তোমরা এসে হাল ধর।

তার পেটে তখন আগুন। সকালে পায়ে হেঁটে এসেছিল ক্যাম্পাসে। দেখা হয়ে গেল বারেক ভাইয়ের সাথে। কটন মিলের শ্রমিক। বারেক ভাই তার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, মুখ তো শুকনা, কিছু খান নাই?

সে ঘাড় নাড়ল। কোথা থেকে আবার কনক এসে হাজির। বারেক ভাই বলল, মিছিলমিটিং তো সারাদিনই চলবো মনে অয়, চলেন খাইয়া আই।

সে আর কনক এক সঙ্গে বললো, পকেটে পয়সা নাই।

বারেক ভাই মুচকি হেসে বললো, চলেন, পয়সার চিন্তা কইরেন না।

ডালভাত খেয়ে শাহবাগের মোড় থেকে চারুকলার সামনে আসতে না আসতে দেখতে পেল, ক্যাম্পাস থেকে ছাত্ররা পাগলের মত দৌড়ে যে যেদিক পারছে, পালাচ্ছে। তাদেরকে হেঁটে আসতে দেখে চিৎকার করে কয়েকজন বলে উঠল, ঐ দিক যায়েন না, মিলিটারি হামলা করছে।

এটা কি ’৭১? কিন্তু সে তো গত হয়েছে অনেকদিন। মিলিটারি হামলা করেছে? ভাষ্যকাররা ভুল দেখেনি তো?

সে এগিয়ে যেতেই বাঁধা দিল বারেক ভাই।

কনক আর বারেক ভাই চট করে তাকে নিয়ে পার্কের ভেতর ঢুকে পড়ল। ওখানে ছোট ছোট অনেক জটলা। সবাই দেখছে, ছাত্রদের লাঠিপেটা করতে করতে একটার পর একটা ট্রাকে করে নিয়ে যাচ্ছে। ছোট জটলার ভেতর থেকে সে তীব্র ঘৃণায় একটা ঢিল ছুড়ে মারল। অমনি চারদিক থেকে আওয়াজ এল, ঢিল মারে কে, অহন ঢিল মারলে পার্কেও হামলা করব।

অক্ষম ক্রোধে সে কাঁপছিল।

বারেক ভাই বলল, খালি হাত আর একটা দুইটা ঢিল মাইরা কি করবেন, কিচ্ছু করতে পারবেন না। বন্দুকের বিরুদ্ধে বন্দুক ধরতে অইব। বারেক ভাই সব সময় গরম গরম কথা বলে। কিন্তু মাথাটা থাকে ঠান্ডা।

সে বারেক ভাইয়ের এই বিপ্লবী কথায় কান দিল না।

কনক চিৎকার করে বলল, বীর বাঙালী অস্ত্র ধর, সামরিক জান্তা খতম কর। তার এ কথায় কেউ আমল না দিলে সে দু’একবার বলে থেমে যায়।

জাতীয় নেতারা আসেননি?

আইছে আর গেছে, তারপরই এই কান্ড।

আরেকজন রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল, আমরা আন্দোলন করুম, আর উনারা হের ফল ভোগ করব কিন্তু বিপদের সময় হেগোর দেহা পাইবেন না।

ট্রাক তখনো যাচ্ছে। এর যেন শেষ নেই। এ যেন যুদ্ধরত দেশ। সৈনিকদের চোখে মুখে বিজয়ের আভা।

ট্রাকের পেছনে হঠাৎ আরমানকে দেখে আঁতকে উঠলো সে। প্রথম বিশ্বাস হয়নি, ঘাড় বেঁকে যতক্ষণ দেখা গেল, তাকিয়ে রইল এবং নিশ্চিত হল এ আরমানই। মনে হল, কাতরাচ্ছে।

নিজের অজান্তে তার চোখ ভিজে গেল।

রোকেয়া হলের সামনে পাগলের মত দাপিয়ে বেড়াচ্ছে মোহন রায়হান। এ যেন মাঝিবিহীন নৌকা। চারদিকে খন্ড খন্ড মিছিল। হাল ধরবার কেউ নেই। ১৫ ফেব্রুয়ারি হরতালের ঘোষণা মোহন রায়হানের কন্ঠ থেকে।

জগন্নাথ কলেজের ক্যান্টিনে সে, কনক আর রহিম ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে ধর্মঘটের কথা ছড়িয়ে দিতেই একটা জটলা, তারপর লাঠি নিয়ে কোর্ট চত্বরে, কোর্ট চত্বর থেকে রাস্তায়। দেখতে দেখতে পুলিশ ফিরে গেল। দেশ রক্ষার সেনাবাহিনী এল। গুলি আর জল কামানে রাস্তা আবারো রণক্ষেত্র হয়ে উঠল। ছাত্রদের লাশ পড়ল। দেশ রক্ষা শেষে সেনাবাহিনী ফিরে গেল ব্যারাকে।

স্যার, কি দেখতাছেন অমন মনোযোগ দিয়া?

চোখ তুলে তাকায় সে। জগতটা অচেনা লাগে। চোখ আর মগজের কোষে তখনো ঘোর। নিশার কথায় সম্বিত ফিরে পায় সে। না, তেমন কিছু না। নিজের একটা ছবি।

কই, দেহি, দেহি, বলে এগিয়ে এল নিশা।

সে তাকে ছবিটা দেখাতে চাইল না, বলল, ছবিটা না দেখালে কিছু মনে করবে?

কার ছবি…?

পত্রিকার কাটিং ভাঁজ করে রাখতে রাখতে বললো, আমার ছবি।

বুঝছি। মুচকি হেসে নিশা চলে গেল।

নিশা চলে গেলে সে মনে মনে ভাবল, এসব ছবির মানুষগুলো বাস্তব জগতে রয়ে গেছে বলেই পালাবদলের নাটকে কেউ কেউ খুব ভাগ্যবান হয়।

নিশা বেরিয়ে যেতেই দরজার ফাঁক দিয়ে ওর বাবাকে যেতে দেখল। মূল বাড়ি থেকে আলাদা এই ছাপড়ার ঘরটায় পড়াবার বিনিময়ে সে থাকতে আর খেতে পায়। বড় কৃতজ্ঞবোধ করে সে। বড় দয়ালু আর মহান এই ধন কুবের। একদিন তুমুল ঝড়ের সময় তার নিজের ছেলেকে পাঠিয়ে, তাকে জোর করে নিয়ে গিয়েছিলেন, মূল বাড়িতে। ঝড় থেমে গেলে সে আবার চলে এসেছিল ছাপড়ার ঘরে। এটা ছিল তার সারাজীবনের শ্রেষ্ঠতম পাওয়া। এখানে থাকা খাওয়া হারাবার ভয়ে সে খুব সাবধান। কারো সাথে নিজের মনের কথাটি খুলে বলে না। বলা যায় না।

ছয়জন ছাত্রছাত্রী। কে কখন এসে যায়, বলা যায় না। এ ভয় থেকেই কেউ আসবার আগেই কাগজগুলো গুছিয়ে রাখতে শুরু করে। চোখ দু’টো আবারো আটকে যায় ছবির উপর। সেনাবাহিনীর বন্দুকের গুলি খেয়ে যারা সেদিন জগন্নাথ কলেজের প্রতিবাদী মিছিলে মরেছিল, তাদের মৃত্যুর জন্য সেনাবাহিনী নয়, যেন সে নিজেই দায়ী। জাতীয় নেতারাও দায়ী নয়। তারা তো আন্দোলন করতে বলেনি, নিজেরাও করেনি। পরে সেই আন্দোলনকে শুধু হাইজ্যাক করেছে। নাটকের শেষ অংকে তারা হয়ে গেল আপোষহীন নেত্রী, নেতা।

ছবিটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে সে ভাবে, কে জানে বারেক ভাই আজ কোথায়? কটন মিল বন্ধ হয়ে যাবার পর সে যে কোথায় চলে গেল, কেউ জানে না।

সামরিক জান্তাকে উচ্ছেদ করতে গিয়ে কনক নিজেই উচ্ছেদ হয়ে গেল পৃথিবী থেকে।

ছবিটার উপর দিয়ে রহিম হেঁটে চলে গেল চালের আড়তে।

এক সপ্তাহ পর রক্তাক্ত দাগ নিয়ে মুক্তি পেয়েছিল আরমান। সে এখন বড় ব্যবসায়ী। দামী গাড়ি হাঁকিয়ে চলে।

স্বপন ভাইয়ের গাড়ির তীব্র হর্নে ছবিটা সরে যায় রাস্তার একপাশে, জাতীয় পতাকা উড়িয়ে গাড়ি রাজকীয় ভঙ্গিতে এগিয়ে যায় সংসদ ভবনে।

বাদশা ভাই এখনো আন্দোলনের মাঠে ক্লান্ত হাতে বৈঠা ধরে বসে আছে, কখন আবার যাত্রী আসবে। বাদশা ভাই বোকা। সে জানে না, ব্রিটিশ আমল থেকে হাইজ্যাক হয়ে যাওয়া আন্দোলনের ফসল দেখতে দেখতে মানুষ এখন আর নড়ে না, চড়ে না। পাথরের মত চুপ।

শিবলী ভাই কোথায়? হায় বেচারা! সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে প্রথম গ্রেফতার হল। সামরিক শাসন গেল, শিবলী ভাইয়ের পালিয়ে বেড়ানোর দিন আর শেষ হল না। সে ঠিক মনে করতে পারল না, কতদিন আগে শেষবার দেখা হয়েছিল। কন্ঠে তার সেই আগুন। আশ্চর্য মানুষ। সে ভেবে পায়নি কেমন করে ওরা হাইজ্যাকারদের রুখবে।

ছাপড়ার ঘর থেকে বেরিয়ে আসতেই তার চোখের উপর দিয়ে উড়ে যায় অসংখ্য মাছি। সে হাঁটতে থাকে। হাঁটতে হাঁটতে চলে আসে বুড়িগঙ্গা সেতুর নীচে। সেতুর নীচে ভাসমান নাগরিকদের বসবাস। কার কাছে যেন শুনেছিল, এখানে টুকাইগুলোকে বিনা পয়সায় পাওয়া যায়। তার ভয় হয়, তবুও সে এগোয়। কিছুদূর যেতে না যেতে সে থমকে দাঁড়ায়।

বিদ্যুৎ ছিল না বলেই হয়তো মশাল মিছিলটাকে উজ্জ্বল দেখাচ্ছিল। সে চট করে ঘুরে আসে। মিছিলটা গর্জন করতে করতে এগিয়ে আসে। সে দাঁড়িয়ে থাকে, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আলোর কম্পন দেখে। মিছিলটা নৌকার মত দুলতে দুলতে এগিয়ে আসে। একেবারে সামনে এসে যায়। কিন্তু সেটি না থেমে এগিয়ে যায়, এগিয়ে যেতে যেতে তার চোখের আড়াল হয়ে যায়। কিন্তু মিছলে উত্থিত শব্দগুলো তখনো বাতাসে ভাসতে থাকে, দুনিয়ার মজদুর…..।”

তাদের আন্দোলন শেষ হয়ে গেছে সেই কবে। এরশাদের পতনের পরপরই। বিপুল বিজয় উৎসবের মধ্য দিয়ে। যাত্রা শুরু হয়েছে নতুন বাংলাদেশের। নতুন দেশটাকে দেখবার জন্য সে আবারো পা বাড়ায় অন্ধকার সেতুর নীচে।।

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s