মঙ্গলধ্বনি’র ৩য় সংখ্যা সম্পর্কে কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর-এর মতামত ও আমাদের জবাব

Posted: নভেম্বর 12, 2013 in মতাদর্শ
ট্যাগসমূহ:, , , , , , , , , , , , , , ,

mongoldhoni-cover-1আপনাদের ছোটকাগজ ‘মঙ্গলধ্বনি’ পড়ছি। একবার পড়েছি। আরো পড়তে হবে, মানে সংগ্রহে রাখতে হবে। অনেক দরকারি কাজ হয়েছে। এ্ইভাবে কাজ তো তেমন হয় না। তাই প্রথমেই যারপরনাই প্রীতি জানায়। প্রাণপ্রকৃতিপ্রতিবেশের বিষয়সমূহ ভালোই আছে। এতে একধরনের মিশ্রণ হয়েছে। একেবারে রাজনীতির কাগজও নয়, কেবল নৈতিকতা আছে তাও নয়। আবার দেখা গেল, দুইতিনটা কবিতা বিনে সাহিত্যের আর কিছু নাই। ফলে এর শিল্পসংস্কৃতির চরিত্রটা নির্ণয় করা গেল না।

সব লেখায় আছে মার্কসীয় নৈতিকতার নির্যাস, ফলে অন্যদিকে দেখার কোনো সুযোগ নাই। মার্কসবাদ আর ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানেই এমনকি হয়, এর বাইরে আর কিছু নাই বলে আমাদের ধারণা নিতে হয়। সেইদিক থেকে কোরানশরীফ আর মার্কসবাদের একধরনের মিলটা দেখার মতো।

প্রথম লেখাটিই অনেকবার পড়ার মতো। সংস্কৃতিসমাজদ্বান্দ্বিকতা ইত্যাদির চরম বিশ্লেষণ আছে। দর্শন, রাজনীতি, বিজ্ঞান কিভাবে পুজিঁ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে তার কথন ভালোই আছে। উদ্ধৃত্ত মূল্যের যথাযথ বা শ্রেণীহীন বিন্যাসই তো সমাজতন্ত্রের মৌলিক কাজ। সুদীপ্ত অর্ক দাসকে এ লেখাটির জন্য স্পেশাল থ্যাঙ্কস। তবে এখন সমাজতন্ত্রের এই অবস্থা কেন, মার্কসের বাইরেও যে গ্রিক দর্শন, এমনকি বাইবেলেও শ্রেণীর ইতিহাসভিত্তিক প্রমাণ আছে তা তো একচেটিয়াভাবে বিসর্জনের কোনো কারণ দেখি না। মানুষকে অতিমানব করার তো কোনো কারণ নাই। কিন্তু তাই করা হয়। আজ সময় এসেছে সমাজতন্ত্র কেন এমন অবস্থায় পড়েছে, পার্টিক্যাডারশিপ, ব্যক্তিকে দাবিয়ে রাখার প্রচেষ্টা কেন হয়. নান্দনিকতার স্বতঃস্ফূর্ত বিকাশকে সমাজতন্ত্র কতভাবে নিয়ন্ত্রণ করে তা দেখতে হবে। ইন্টারনেট আর ক্যাবল নেটওয়ার্কের যুগে দরজাজানালা বন্ধ করে ইয়া নফসি করার দিন শেষ।

বাঙলাদেশের কৃষি, সন্ত্রাস দমন আইনে মানবতাকে পেষণের কথাও ভালোভাবে লেখা হয়েছে। হাসনাত কাইয়ূমের লেখাটি বেশ তথ্যনির্ভর। আহমদ জসিমও সাহিত্যের মতাদর্শিত বিতর্ক নিয়ে আলোচনা করেছেন। তার লেখায় পাঠস্বাদুতা আছে। ব্যক্তিস্বাধীনতাকে একেবারে দাসত্বের সাথে কেন তুলনা করলেন তিনি তা বোঝা গেল না। সাহিত্য নিয়ে তার ব্যাকুলতা ভালোই লাগল। সুন্দরবনে কয়লাবিদ্যুৎ বিষয়ে কল্লোলের লেখাটি সুন্দর। টুকরো সংবাদ দিয়ে ভারতকে চেনানোর লেখাটি বেশ উপভোগ্য। দরকারি। ণিপুরের দাবি আদায়ের নেত্রী ইরোম শর্মিলাকে নিয়ে লেখা বেশ তথ্যবহুল, খুবই দরকারি, অনেক কিছু জানা এবং বোঝা গেল, শাহেরীন আরাফাতকে অনেক অনেক ধন্যবাদ। ভারত রাষ্ট্রের সন্ত্রাসী চেহারাটা তা থেকে চেনা যায়।

নেসার আহমেদের লেখা গার্মেন্টস সম্পর্কীয় লেখাটিও অনেক তথ্যবহুল। বিশেষ করে গার্মেন্টস মালিকদের নানান বজ্জাতি, শ্রমনিপীড়ন, আগুনে পুড়ে মরা ইত্যাদি সম্পর্কে ভালোই ধারণা হলো। তবে একটা বিষয়, এই যে গার্মেন্টেসে পুড়ে এত ক্ষতি হয়, মালিকের কি কিছুই হয় না? তারা যে অল্প টাকা ক্ষতিপূরণ দেয় তা লেখা হলো, তা ঠিকাছে, আচ্ছা, তারা কি মানুষ নয়, তাদের জীবন নাই? আগুনে তাদের কানো লস হয় না। একটা গার্মেন্টেসে আগুন লাগলে তাদের কত ক্ষতি হয়! তাদের কোনো অশ্রুপাত থাকে না? তারা পথে বসে না? তাদের কোনো স্মৃতি নাই? তাদের আত্মীয়স্বজন, বউপোলাপান নাই? তারা কি বন্য জীব? বামপন্থি কোনো নেতা বা তাদের কেউ কি তাদেরকে মিনিমাম সববেদনা জানাতে পারে না? শ্রেণীক্রোধ এত জান্তব হতে হবে কেন? এ প্রশ্নটা আমি সবাইকে করলাম। জানি, তাতে অনেকেই অবাক হবেন! আমাকে প্রতিবিপ্লবী বলবেন, কারণ এটি মার্কসবাদীদের বলতে এক সেকেন্ড লাগে না। কিন্তু মানবতার কথাটা ভাবতে সমস্যা কোথায়?

এটির মাঝে মাঝে এতে কম্পোজ সমস্যা বা বানানের ভুল আছে। তবে সম্পাদনা পরিষদ কর্তৃক এর কাজটি মোটামুটি ভালোই হয়েছে। আগামীতে আরও সংখ্যা পাঠের অপেক্ষায়

 

কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর

সম্পাদক : কথা

০১৭১১৭৮১১১৫

 

 

মঙ্গলধ্বনি’র জবাব

অসংখ্য ধন্যবাদ আপনার ইমেইলের জন্য। মঙ্গলধ্বনি’র ৩য় সংখ্যার লেখাগুলো আপনাকে আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয়েছে জেনে প্রীত হলাম। তবে এ সম্পর্কে আপনার মূল্যায়নকে সাধুবাদ জানাই, তবে আপনার ইমেইলে কিছু বিষয়ের অবতারণা ঘটেছে, যার জবাব দেওয়াটা আমরা জরুরী বলে মনে করছি।

প্রথমত, আপনি বলেছেন – “দুইতিনটা কবিতা বিনে সাহিত্যের আর কিছু নাই।”, কিন্তু শিল্পসাহিত্য সম্পর্কিত লেখা রয়েছে চারটি (দুইটি কবিতা), সংস্কৃতির আগ্রাসী রূপ ও রাজনীতির প্রকাশ (মতিন বৈরাগী), ওরা গুম হয় ওরা খুন হয়! (সুস্মিতা চক্রবর্তী), মানুষতো জেগে আছে (জাহেদ সরওয়ার), সাহিত্যে একটি মতাদর্শিক বিতর্ক – (আহমদ জসিম)। একটা ছোট কাগজ, যা কেবল শিল্পসাহিত্য সম্পর্কিত নয়, তাতে শিল্পসাহিত্য সম্পর্কিত এই পরিমাণ লেখা আমরা অধিক না মনে করলেও তা সংখ্যায় খুব কম বলেও মনে করি না।

দ্বিতীয়ত, মতাদর্শগতভাবে মঙ্গলধ্বনি মার্ক্সবাদকে ধারণ করে। আর মার্ক্সবাদকে ধর্মের সাথে তুলনা করাটা হয়তো আপনার ইচ্ছাকৃত “খোঁচা” দেওয়া, বা তা আপনার মতাদর্শিক অবস্থান। আমরা এমনটাও মনে করি না যে, মার্ক্সবাদ অচল, নিথর কোন যান্ত্রিক মতাদর্শ, বরং মার্ক্সবাদ দর্শনগতভাবেই একটি ক্রমবিকাশমান বৈজ্ঞানিক মতাদর্শ। মার্ক্সবাদকে আমরা সমাজ বিশ্লেষণ, সমাজ বিনির্মাণের হাতিয়ার বলে মনে করি। আর এ কারণেই মঙ্গলধ্বনি’র প্রায় লেখাতেই দ্বান্দ্বিক ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদের ছোঁয়া পেতে পারেন। শিল্পসাহিত্য বা কোন বিশ্লেষণধর্মী লেখাতেও লেখক, কবি, সাহিত্যিকদের সেই মতাদর্শগত অবস্থান উঠে আসবে, সেটাই স্বাভাবিক। আর মার্ক্সবাদকে ধর্মের সাথে তুলনা করাটা কারো রাজনৈতিক দৈন্যদশাকেই নির্দেশ করে বলে আমরা মনে করি।

তৃতীয়ত, একটা শ্রেণী বিভক্ত সমাজে একজন ব্যক্তি কোন না কোন শ্রেণীর অধীনেই বাস করে, সেই শ্রেণী চেতনা ধারণ করে, সেই শ্রেণীর স্বার্থকেই ঊর্ধ্বে তুলে ধরে। আপনি মালিকদের গার্মেন্টস পুড়ে যাওয়ার “কষ্টের” কথা উল্লেখ করলেন, এটা হতে পারে মালিক শ্রেণীর পক্ষে আপনার অবস্থান, অথবা আপনার অগ্যতা। কারণ, পত্রপত্রিকা মারফত এটি আমাদের নিকট সুস্পষ্ট যে, মালিক শ্রেণী গার্মেন্টস পুড়ে যাওয়ার ন্যূনতম সময়ের মধ্যে তার বিশাল অংকের ক্ষতিপূরণ আদায় করেছে বীমা কোম্পানি থেকে, এমনকি ক্ষতিপূরণ আদায়ের জন্য গার্মেন্টসে নিজেদের লোকজন দ্বারা পরিকল্পিতভাবে আগুন লাগানোর ঘটনাও গার্মেন্টস সেক্টরে ঘটতে আমরা দেখেছি।

এখানকার গার্মেন্টস মালিকেরা সর্বোতভাবে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির দালাল, বা দেশীয় দালাল বুর্জোয়া শ্রেণী। আর এই দালাল শ্রেণী তাদের সাম্রাজ্যবাদী প্রভুদের স্বার্থেই নিজেদের পরিচালিত করে, তারা সর্বাত্মকভাবে এ দেশের রাজনীতিকে নিজেদের স্বার্থে নিয়ন্ত্রণও করছে। আশা করি আপনি নিশ্চয় অবগত যে, সারা বিশ্বে বাংলাদেশের গার্মেন্টস শ্রমিকদের মজুরি সর্বনিম্ন, আর এই মজুরিও দিতে ওই দালাল শ্রেণীর কতো গড়িমসি! মজুরি বৃদ্ধির দাবীতে আন্দোলনকে “সন্ত্রাসী কর্ম”, “অন্যায় আন্দোলন”, “ষড়যন্ত্র” প্রভৃতি নানা নামে আখ্যায়িত করে থাকে দালাল বুর্জোয়া শ্রেণী ও তার দোসরেরা। আর বিভিন্ন সময়ে কোন কোন “সুশীলদের” কাছ থেকে গার্মেন্টস শিল্প ধ্বংসের রব তুলে মালিক শ্রেণীর পক্ষে সাফাই গাওয়া, মালিকদের প্রণোদনা দেওয়া, আর কুম্ভীরাশ্রু বিসর্জনের ঘটনাও আমরা বহুবার প্রত্যক্ষ করেছি।

না, আপনাকে বিপ্লবী, প্রতিবিপ্লবী কোন ট্যাগ লাগানোর ইচ্ছা আমাদের নাই। আপনি নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন, যা প্রকাশের অধিকার আপনার রয়েছে। মতপ্রকাশের অধিকারে মঙ্গলধ্বনি আস্থাশীল। তবে গার্মেন্টস মালিক আর শ্রমিককে এক কাতারে দাঁড় করিয়ে আপনি কিন্তু আপনার শ্রেণীগত অবস্থানটাও তুলে ধরেছেন সুস্পষ্টভাবেই। এজন্য ধন্যবাদ আপনাকে।।

 

সম্পাদনাপর্ষদ

মঙ্গলধ্বনি

ইমেইল: mongoldhoni@gmail.com

ওয়েবসাইট: http://www.mongoldhoni.net

————————————————

প্রকাশিত হলো মঙ্গলধ্বনির ৩য় সংখ্যা

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s