লিখেছেন: ফারহান হাবীব

election-2013এই লেখাটা যখন লেখা শূরু করেছিলাম তখন প্রায় রাত সাড়ে দশটা। লেখা শুরুর প্রায় মিনিট দশেক আগে ঔষধ কিনতে বের হয়েছিলাম। অনেক খোজাখুজি করে একটি দোকানে ঔষধ পাই। পল্টন এলাকা সাধারণত রাত ১টা পর্যন্তও সরগরম থাকে। কিন্তু আজ চিত্রটা পুরোই ভিন্নরকম। রাত সোয়া দশটায় ঢাকাকে একটা মৃত্যুপুরী মনে হয়েছে আমার। দু’একটা রিকসা চলছে আর অল্প কিছু মানুষ। হঠাৎ জোরে সাইরেন বাজিয়ে পুলিশের সাজোয়া যান চলে গেলো মুখের সামনে ধুলো উড়িয়ে। যেন অঘোষিত কারফিউ চলছে শহর জুড়ে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে চলমান হরতালের কারণেই এমন অবস্থা এটা সবাই জানেন। তবে এমন হরতাল এর আগে দেখিনি। মজার বিষয়, এমন চিত্র অবশ্যই প্রমাণ করে না যে জনগণ এই দাবিতে একমত পোষন করেছে বিরোধীদলের সাথে। যদি তাই করতো তাহলে সবাই গত ২৫ তারিখেই রাস্তায় নেমে যেত। হাসিনা সরকার এক মূহুর্ত আর গদি আকড়ে বসে থাকতে পারতো না।

আমার কাছে মনে হয়েছে এই অঘোষিত কারফিউর মুল কথা ‘আতংক’। মানুষ নিজের জীবন নিয়ে শঙ্কিত। ঘর থেকে বের হলে বাঁচবে কি মরবে তার নিশ্চয়তা কে দিবে? এ কারণেই আমার চিরচেনা পল্টন এত নিস্তব্ধ। এমনটা সারা ঢাকা জুড়েই। এমন পরিস্থিতি থেকেই বোঝা যায় আমরা জনগণ কতটা জিম্মি রাজনৈতিক দল গুলোর কাছে।

বিরোধীদল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে অনড় অবস্থানে। সরকার পুরো উল্টো অবস্থানে। এমন পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রি যখন বিরোধীদলীয় নেত্রীকে সংলাপের জন্য দাওয়াত করলেন তখন আমরা আনন্দে আত্মহারা। হওয়াটাই স্বাভাবিক। এমন অচল আর আতংকিত অবস্থা নিরসনে এমন উদ্দ্যোগ সবার মনে সস্তি এনেছে। মানুষ ভেবেছে এইবার হয়তো বরফ গলতে শুরু করবে। কিন্তু বরফ তো গলেনি বরং আরো জমাট বেঁধেছে।

এত বরফ গলা না গলার মাঝে আমার প্রশ্ন অন্য যায়গায়। আমরা কেন আনন্দে আত্মহারা হবো? তত্ত্বাবধায়ক হলে অথবা না হলে, সর্বদলীয় সরকার হলে অথবা না হলে আমাদের জনগণের কি লাভ? আমরা কি তারেক রহমান গংদের খাম্বা বিজনেস, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি, পদ্মা সেতু, বিশ্বজিত, হলমার্ক, রামপালে বিদ্যুত কেন্দ্র স্থাপন, টিকফা চুক্তি, দ্রব্যমুল্যের উর্ধ্বগতি, রাজাকার বাঁচানোর হরতালে মানুষ মারা, স্বৈরাচার এরশাদের পাহাড়সম দুর্নীতি, সব ভুলে যাবো? নাকি এই সবগুলোর সমাধান হবে? কিছুই হবে না। তাহলে কিসের আশায় এই আনন্দ? এই ব্যাপারগুলো পরিস্কার হবার আগে কেন আমরা এদের আবার ভোট দিয়ে নির্বাচিত করবো? এই বিষয়গুলোর মীমাংশা হওয়া জরুরী নয় কি? নাকি এক জালিমের হাত থেকে আরেক জালিমের হাতে নিজেদের বারবার সোপর্দ করবো?

বিষয়টা কিন্তু খুবই সাধারণ। জাস্ট ক্ষমতা হস্তান্তর। আর এই সাধারণ একটা বিষয়কে আমাদের সামনে অসাধারণ আর দুর্বোধ্য করে তুলছেন আমাদের দু’জোটের মহান (!)নেতারা। গদিটা আমার দেখার খুব শখ। কি আছে এই গদিতে? বাংলাদেশের ইতিহাসে কেউ সহজে গদি ছাড়তে চায় না। একবার বসলে কোনো না কোনো ভাবে তারা গদিতে চিরকাল বসে থাকতে চায়। আমাদের জনগণকে বোকা পেয়ে মূল বিষয় থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নেয়। আর তাদের গদি দখলের যুদ্ধে আমাদের মনোনিবেশ করায়। এটাই তাদের রাজনীতি। কিন্তু গদি দখলের আগে কিছু বিষয় মীমাংশা না করে নির্দলীয় না সর্বদলীয় মূলা ঝুলানোকে কি ধরনের রাজনীতি বলে তা একটু জানা দরকার। এই রাজনীতির অবসান কখনোই আসবে না যতদিন জনগণের পার্টি ক্ষমতায় আসবে। তাই আনন্দে মাতোয়ারা না হওয়াই উত্তম, একই সাথে বুদ্ধিমানের কাজ।

বামপন্থি দলগুলো এই সময় শক্ত অবস্থান নিতে পারে। অবশ্যই তারা ক্ষমতায় যেতে পারবে না। কিন্তু জনগণের মাঝে এই বার্তাটা পৌছানো দরকার এই দুই জোট দিয়ে আর হবে না। কিন্তু কিছূদিন যাবৎ সিপিবির সভাপতিকে দুই জোটের মিলন ঘটানোর জন্য বেশ তৎপর দেখা যাচ্ছে। অর্থাৎ এরাও দুই দল বা জোটের সীমানা প্রাচীর ডিঙানোর সাহস করে না। আওয়ামীলীগ যে বামপন্থিদের বন্ধু না তা আর কি করে প্রমাণ করতে হয় আমার জানা নেই। সেটা সিলেটে ছাত্রলীগ সিপিবি সভাপতিকে মেরে নতুন করে প্রমাণ করেছে। আর সূচনাতো সবার জানা। সেই ৭৫এ শেখ মুজিবুর রহমানের সিরাজ শিকদারকে ক্রসফায়ারে দিয়ে সংসদে দম্ভোক্তি, কোথায় সিরাজ শিকদার”

আসলে এদের বন্ধু ভাবার কথা কোনভাবেই কল্পনা করা যায় না। দুটি দুই রাজনৈতিক আদর্শ। বন্ধু হবার প্রশ্নই ওঠে না। সেটা আওয়ামীলীগ বুঝলেও বামপন্থিরা বোঝে না। তবু সিপিবিবাসদ তাদের রাজনৈতিক মিত্র মনে করে আওয়ামীলীগকে। নয়তো সেদিন সিপিবির সভাপতিকে ছাত্রলীগ সন্ত্রাসীরা যেভাবে সিলেটে মেরেছে, তাতে ভেবেছিলাম তারা হার্ডলাইনে যাবে। কিন্তু আশ্চর্যজনক বিষয় একটা টু’শব্দ হলো না।

মজার বিষয় হলো, জামাত ঠেকানোর জন্য নাকি এই বন্ধুত্ব। জামাত যে একটা সন্ত্রাসী দল। এরা যে বাংলাদেশের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে না তা এদেশের অধিকাংশ মানুষই জানে। জামাত ঠেকাতে আওয়ামীলীগের লেজ ধরার কোন মানে হয় না। নিজেদের রাজনৈতিক দেউলিয়াপনার কারণেই জামাত আজ এত দম্ভ দেখাচ্ছে। চিন্হিত রাজাকারদের পক্ষে কথা বলছে। কয়েক বছর আগেও এমন ছিলো না। বামপন্থিরা যতো দুর্বল হয়েছে ততোই তারা শক্তিশালী হয়েছে। কোন কিছুই শুণ্য থাকে না, এই কথা আমাদের প্রগতিবাদীরাভুলে যান।

অন্য বামপন্থি দলগুলোর অবস্থা আরো খারাপ। ভাঙতে ভাঙতে হাজার টুকরো। এরা জনগণকে এক করবে কি? নিজেরাই ভেঙে চুরমার। বামপন্থিরা একমাত্র জাতীয় কমিটির কোন কর্মসূচি ছাড়া আর কোন কিছূতেই জোটভুক্ত হতে পারেনি। এমন কি জাতির এই ক্রান্তিকালেও। যারা দ্বিদলীয় বৃত্ত ভাঙার কথা বলে তারাই যেন সেই বৃত্তের ভেতরে অবিরাম ঘুরপাক খাচ্ছে।

এমন বাস্তবতায় বলাই যায়, দেশের মানুষের জন্য কাজ করবে এমন রাজনৈতিক দল বাংলাদেশে নাই। জনগণের পার্টি যাকে বলে, সেই পার্টি হারিকেন দিয়ে খুঁজলেও পাওয়া যাবে না। বামপন্থিদের নিয়ে এত কথা বললাম কারণ তাদের জনগণের কাছের কেউ ভেবেছিলাম। কিন্তু তারাও দিন দিন হতাশ করছে। সবচেয়ে মজার বিষয় বিশ্বব্যাপী বামপন্থার নতুন করে হাওয়া বইতে শুরু করেছে। সেই হাওয়া বাংলাদেশের বামরা এখনো গায়ে লাগাতে পারেনি। কিউবা, ভেনিজুয়েলা, উত্তর কোরিয়া, বলিভিয়া, চিলি, ভারত, নেপাল, ভিয়েতনাম, চীন, রাশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে হয় বামপন্থি সরকার ক্ষমতায় অথবা কোথাও কোথাও ক্ষমতা দখলের লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে জনগণকে সাথে নিয়ে। সেই অবস্থায় দাঁড়িয়ে আমাদের বাম রাজনীতিকরা কি করছেন? আসলেই সত্যিকার জনগণের পার্টি নেই এদেশে। একটিও না, আর এটাই আফসোস।।

ঢাকা, ২৮ অক্টোবর ২০১৩

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s