রাজনৈতিক সংস্কৃতি নির্মাণে শাসক শ্রেণীর ভূমিকা

Posted: অক্টোবর 31, 2013 in দেশ

লিখেছেন: আবিদুল ইসলাম

political-culture-2একটি নির্দিষ্ট ধারণাপ্রসূত বক্তব্য ইদানিং প্রায়শই মানুষজনের মুখে শুনতে পাওয়া যায়। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে এই কথা বলছি, এবং আমার ধারণা অনেকেই এ বিষয়ে আমার সাথে একমত হবেন যে, এই বক্তব্যের সাথে তারাও কমবেশি পরিচিত। কথাটা মোটামুটি এ রকম: “আমাদের দেশের মানুষ খারাপ, তাই এ দেশের শাসকও খারাপ।” অনেকেই ধর্মগ্রন্থ থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে এ কথা বলে থাকেন যে, যে দেশের মানুষজন নৈতিকভাবে অধঃপতিত হয়, সৃষ্টিকর্তা সে দেশের ওপর খারাপ শাসক চাপিয়ে দেন। এই ‘বিশ্লেষণ’ থেকে অবধারিতভাবে যে সিদ্ধান্ত বেরিয়ে আসে তা হলো: নিজে ভালো হলে দেশের শাসকও ভালো হবে, রাজনীতি ভালো হয়ে যাবে, দেশের উন্নয়ন সাধিত হবে অতএব সর্বপ্রথম নিজের ভালো হওয়াটা দরকার ইত্যাদি ইত্যাদি এ দেশের একটি অন্যতম জনপ্রিয় এবং প্রচার সংখ্যায় শীর্ষে থাকার দাবিদার দৈনিক পত্রিকা থেকে উত্থিত শ্লোগান হলো: “বদলে যাও, বদলে যাও।” অর্ন্তবস্তুর দিক থেকে এর মর্মার্থ হলো: মানুষ নিজে পরিবর্তিত হলে তার পরিবেশ বদলে যাবে, রাজনীতি এবং রাষ্ট্রব্যবস্থা বদলে যাবে। অর্থাৎ পরিবর্তনের সবক দিতে গিয়ে তারা ব্যাষ্টিক স্তর থেকে বিষয়টির সূচনা করবার দিকে আলোকপাত করে থাকে। এ কথা বলাই বাহুল্য যে, এই চিন্তা এ দেশের মানুষের, বিশেষত মধ্যশ্রেণী হিসেবে পরিচিত শিক্ষিত একাংশের মধ্যে প্রভাব বিস্তার করে আছে, এই চিন্তার দ্বারা অধিকৃত হয়েই তাদের অনেকে রাজনীতিসংক্রান্ত বিভিন্ন কথাবার্তা বলে থাকেন।

কোনো নির্দিষ্ট দেশের রাজনীতি, বিশেষত মূলধারার রাজনীতি কীভাবে নির্ধারিত হয়, তার সাথে গণমানুষের আচারআচরণ কীভাবে সম্পর্কিত থাকে এবং একে অপরের ওপর কীভাবে তা প্রভাব বিস্তার করে থাকে এই বিষয়টি বিশ্লেষণের দ্বারা উপর্যুক্ত বক্তব্যের সারগর্ভতা সম্পর্কে ধারণা লাভ করা যায়। সেটা করতে হলে রাজনৈতিক সংস্কৃতির অন্তর্বস্তু এবং এর উপাদানগত তাৎপর্যকে একটু গভীরভাবে অনুধাবন করা প্রয়োজন।

একটি নির্দিষ্ট দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি অনেকগুলো বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। তার ভৌগোলিক অবস্থান, জলবায়ু, ধর্ম, ভাষা, স্থানিক পুরাতন ঐতিহ্য প্রভৃতির প্রভাব তার ওপর থেকে যায়। কিন্তু এগুলো কোনো নির্ধারক প্রভাব নয়, আচরিত রাজনৈতিক সংস্কৃতি মূলত নির্ধারিত হয় সেই দেশের বিদ্যমান সমাজ ব্যবস্থায় মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্কের ধরন, পরস্পরের প্রতি আচরণ প্রভৃতির ভিত্তিতে। সমাজে মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্ক আবার নির্ভর করে সেই সমাজে বিদ্যমান উৎপাদনসম্পর্ক এবং অর্থনৈতিক কার্যাবলি অর্থাৎ উৎপাদনবিনিময়ভোগবণ্টন ক্ষেত্রে কোন প্রক্রিয়া জারি আছে তার ওপর। এই কথা থেকে যেটা বেরিয়ে আসে তা হলো, রাজনীতি হচ্ছে অর্থনীতিরই ঘনীভূত রূপ। এ কারণেই পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অধীন রাষ্ট্রে যে ধরনের রাজনৈতিক অবস্থা দেখা যায়, সামন্তবাদী ব্যবস্থায় সেটা সেভাবে ছিল না। আবার সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাজনৈতিক সংস্কৃতিও দেখা দেবে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার থেকে ভিন্নরূপে।

কিন্তু রাজনৈতিক সংস্কৃতি বিষয়টা এতো সরল অংক দিয়েও বোঝা যাবে না। যেমন পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় রাজনৈতিক সংস্কৃতি সম্পূর্ণরূপেই পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক কাঠামো দ্বারা নির্ধারিত হবে বিষয়টি এমন নয়, যদিও তার প্রভাব সেখানে নির্ধারক ভূমিকাতেই থাকবে। কিন্তু সংস্কৃতি যেমন কোনো বদ্ধ কিংবা অনড় বিষয় নয়, একে যান্ত্রিকভাবে দেখাটাও তাই অনুচিত এবং এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে অবধারিতভাবেই ভ্রান্ত সিদ্ধান্তে আসার সম্ভাবনা থাকে। সংস্কৃতি যে কোনো অনড় বিষয় নয় এটা মানব সভ্যতার ইতিহাস এবং বিকাশধারার দিকে লক্ষ্য রাখলেই ভালোভাবে বোঝা যায়। যদি সেটাই হতো তাহলে মানুষ তার আর্থরাজনৈতিক বিকাশের প্রাথমিক স্তরেই এখনো থেকে যেতো, তার কোনো উত্তরণ ঘটত না। একটি নির্দিষ্ট আর্থসামাজিক ব্যবস্থার গর্ভ হতে যখন নতুন ব্যবস্থার উদ্ভব হয় এবং পুরাতন উৎপাদনসম্পর্কের স্থলে প্রতিস্থাপিত হয় নতুন উৎপাদনসম্পর্ক তখন অবধারিতভাবেই তার শরীরে সে বহন করে পুরাতন ব্যবস্থার অনেক চিহ্ন। এ কারণেই পুঁজিবাদী ব্যবস্থার উদ্ভবের পর তার মধ্যে অনেক সামন্ত অবশেষের (remains) দেখা পাওয়া যায়। একই কথা সত্য সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা সম্পর্কেও। সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার অর্থ এটা নয় যে, তার দ্বারা রাতারাতি পুঁজিবাদী সকল প্রতিষ্ঠান, সকল সম্পর্ক এবং তদীয় সকল সংস্কৃতি নিঃশেষিত হয়ে যাবে। সেটা হতে অনেক বছর, ক্ষেত্রবিশেষে অনেকগুলো দশকও লেগে যেতে পারে, যা নির্ভর করে বৈশ্বিক ও স্থানিক বহু বস্তুগতঅবস্তুগত উপাদানের উপস্থিতিঅনুপস্থিতির ওপর।

কার্ল মার্কস তার গোথা কর্মসূচির সমালোচনানিবন্ধে উল্লেখ করেছেন: What we have to deal with here is a communist society, not as it has developed on its own foundations, but, on the contrary, just as it emerges from capitalist society; which is thus in every respect, economically, morally and intellectually, still stamped with the birth marks of the old society from whose womb it emerges. এখানে প্রথমেই বলে নেয়া দরকার কমিউনিস্ট, অর্থাৎ সাম্যবাদী সমাজ বলতে মার্কস এখানে সাম্যবাদের প্রাথমিক স্তর অর্থাৎ সমাজতন্ত্রের কথাই বুঝিয়েছেনযেখানে শ্রেণী থাকবে, রাষ্ট্রব্যবস্থাও রয়ে যাবে কিন্তু তা বিদ্যমান থাকবে সর্বহারা শ্রেণীর একনায়কত্ব প্রয়োগের যন্ত্র হিসেবে। সাম্যবাদী সমাজের উচ্চস্তর অর্থাৎ শ্রেণীহীন সমাজ, যেখানে রাষ্ট্র ক্ষয় হতে হতে বিলীন হয়ে যাবে‘- তার আলোচনা মার্কস এখানে করছেন না। উপর্যুক্ত উদ্ধৃতির সারবস্তু হচ্ছে এটাই যে, সাম্যবাদী সমাজের প্রাথমিক স্তরে (অর্থাৎ সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায়) উত্তরণের পরপরই এটি তার স্বীয় ভিত্তির ওপর দাঁড়াবে না, বরং ঘটবে তার বিপরীতটিঅর্থাৎ যে ব্যবস্থা সদ্য পুঁজিবাদী ব্যবস্থার গর্ভ হতে জন্মলাভ করেছে তা অর্থনৈতিক, নৈতিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিগতভাবে তার প্রসূতি পূর্বতন সমাজ ব্যবস্থার জন্মচিহ্নই নিজের শরীরে ধারণ করবে। সমাজ ব্যবস্থার বিকাশের এই শর্তের প্রতি লক্ষ্য রেখেই লেনিন তার ‘রাষ্ট্র ও বিপ্লব’ গ্রন্থে বলেন: Communism cannot as yet be fully ripe economically and entirely free from traditions or traces of capitalism.

এটা হলো সমাজ ব্যবস্থার বিকাশের একটি দিক। এর আরেকটি দিক হচ্ছে, যেকোনো নির্দিষ্ট ব্যবস্থার বিকাশের সাথে সাথে এর মধ্যে পূর্বতন উৎপাদনসম্পর্কের অবশেষ উপাদানসমূহ যেমন ধীরে ধীরে নিঃশেষ হতে থাকবে, তেমনি এর মধ্যে দেখা যাবে নতুন, অর্থাৎ উচ্চতর ব্যবস্থায় উত্তরণের শর্ত, পুরাতন উৎপাদনসম্পর্ককে উচ্ছেদ করে নতুন উৎপাদনসম্পর্ক দ্বারা তা প্রতিস্থাপনের তাগিদ। এভাবেই উৎপাদিকা শক্তির সাথে উৎপাদনসম্পর্কের দ্বন্দ্বের এক পর্যায়ে পুরাতন ব্যবস্থা ভেঙে দেখা দেবে নতুন ব্যবস্থা, কিন্তু সেটি একদমেই পুরাতন ব্যবস্থার সকল উপাদানকে উচ্ছেদ করতে পারবে না, যেমনটি সত্য তার পূর্বের যেকোনো স্তরের ক্ষেত্রেও।

ওপরের এতোগুলো কথা বলার উদ্দেশ্য হলো, রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি নির্দিষ্ট দিক সম্পর্কে কিঞ্চিৎ ধারণা দেয়ার চেষ্টা করা। যারা আগে থেকেই বিষয়গুলো সম্পর্কে অবহিত তারা আরেকবার ঝালাই করে নেয়ার সুযোগ পাবেন। এখন প্রশ্ন হলো, এই রাজনৈতিক সংস্কৃতি একটি নির্দিষ্ট দেশে কীভাবে নির্ধারিত হতে পারে? এটা অবশ্যই সত্য যে, সমাজ ব্যবস্থা পরিবর্তনে জনগণই সম্মিলিতভাবে অংশগ্রহণ করে, নিজেদের উৎপাদিকা শক্তির বিকাশের ধারায় তারা পুরাতন সম্পর্কের উচ্ছেদ ঘটিয়ে তার স্থলে নতুন ব্যবস্থা নির্মাণ করে। কিন্তু ঐ ব্যবস্থাটিতে রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রযুক্ত হয় মূলত শাসক শ্রেণীর দ্বারাই। ওপরের আলোচনা থেকে বোঝা যায়, সংস্কৃতি কোনো একরৈখিক বিষয় নয়তার মধ্যে স্থানিক, আন্তর্জাতিক, ঐতিহ্যগত বহু উপাদানের সংশ্লেষ রয়েছে; তেমনি সেটি অনড় কিছুও নয়, তার ভেতর অতীতের এবং ভবিষ্যতের উৎপাদন সম্পর্কের উপাদানসমূহও ক্রিয়াশীল। কিন্তু তারপরও এই সত্যকে কিছুতেই অস্বীকার করা যাবে না যে, রাজনৈতিক সংস্কৃতি ক্ষেত্রে রাজত্ব তথা প্রভুত্ব করে শাসক শ্রেণীর রাজনীতি, তার আচরিত সংস্কৃতি। শাসক শ্রেণীর এই রাজনীতির চরিত্র নির্ভর করে তার অর্থনৈতিক কার্যাবলির ধরনের ওপরযা দৃশ্যমান হয় ঐ শ্রেণীর রাজনৈতিক প্রতিনিধি দলগুলোর দ্বারা প্রযুক্ত নীতি ও কর্মকাণ্ডের দ্বারা। প্রভু শ্রেণীটির আচরিত সংস্কৃতির প্রভাবই চুঁইয়ে পড়ার (trickle down) মাধ্যমে প্রবাহিত হয় সমাজের ব্যাপক জনসাধারণের মধ্যে, নির্মাণ করে তাদের মনস্তত্ব ও যাবতীয় কর্মকাণ্ডের ভিত্তিসমূহ।

ওপরের আলোচনা থেকে আমরা এই সিদ্ধান্তেই উপনীত হতে পারি যে, “দেশের মানুষ খারাপ, তাই এ দেশের শাসকও খারাপ“- বিষয়টা এভাবে ঘটে না, বরং তা সংঘটিত হয় বিপরীতক্রমেই, অর্থাৎ দেশের শাসক শ্রেণী যদি দুর্নীতিগ্রস্থ এবং অপরাধপ্রবণ হয় তাহলে তার নীতি, কর্মকাণ্ড, আচরিত সংস্কৃতি সব কিছুর প্রভাব জনগণের ওপর ক্রিয়াশীল হয়ে তাদের একটি বড় অংশকেই দুর্নীতি ও অপরাধের মধ্যে নিমজ্জিত করতে পারে। বাংলাদেশের দিকে যদি আমরা তাকাই তাহলে দেখতে পাই, ১৯৭১ সালে এ দেশ স্বাধীন হওয়ার পর যে শ্রেণীর রাজনৈতিক প্রতিনিধিরা এখানে ক্ষমতাসীন হয়েছিল তাদের কর্মকাণ্ডের মধ্যে উৎপাদনশীল উপাদান বলে বিশেষ কিছু ছিল না। যে শ্রেণীর প্রধানতম রাজনৈতিক প্রতিনিধি হিসেবে আওয়ামী লীগ সংগঠিত হয়েছিল, তারা না ছিল কোনো শিল্পোদ্যোক্তা, না ছিল শ্রমিক। পূর্ব বাংলায় পুঁজিপতি বলতে যারা ছিল তাদের লেজ বাঁধা ছিল পাঞ্জাবকেন্দ্রিক শাসক গোষ্ঠীর রাজনৈতিক খুঁটিতে। আর শ্রমিক শ্রেণীর স্বার্থও কখনোই আওয়ামী লীগের রাজনীতির মধ্যে নিজেদেরকে সংহত করতে পারে নি। প্রশাসনযন্ত্রের পরিচালক হিসেবে নিয়োজিত যে আমলা গোষ্ঠী ১৯৭০৭১ সালে, অর্থাৎ দেশ স্বাধীনের সন্ধিক্ষণে আওয়ামী লীগের দিকে নিজেদের কেবলা ঘুরিয়েছিল তারাও এর আগেড় পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় কর্মচারী হিসেবে ছিল পশ্চিম পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর স্বার্থের সেবাদাস। আওয়ামী লীগের চরিত্র গঠনে এবং তার ভেতর নিজেদের স্বার্থ গঠনের দিক থেকে তাদের কোনো উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল না। স্বাধীনতার পর এখানকার পুঁজিপতি গোষ্ঠী দেশ ছেড়ে পলায়ন করেছিল। সংবিধানে সমাজতন্ত্রকে একটি অন্যতম নীতি হিসেবে ঘোষণা করে আওয়ামী লীগ তাদের পরিত্যক্ত কলকারখানার দখল গ্রহণ করেছিল। এর পরিচালনায় তারা মধ্যশ্রেণী থেকে আগত নিজেদের লোকজনদেরই, তাদের আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবদেরকেই বসিয়েছিল।

কিন্তু মালিক কিংবা শ্রমিকএই দুই শ্রেণীর কোনোটি হিসেবেই গঠিত না হয়ে চাকরিবাকরির মাধ্যমে এবং গ্রামাঞ্চলে ফড়িয়া ব্যবসায়ের দ্বারা নিজেদের অর্থনৈতিক জীবনকে সংগঠিত করার কারণে উৎপাদনশীলতার পরিবর্তে মধ্যস্বত্বভোগী (comprador) উপাদানই তাদের চরিত্রকে অধিকার করে রেখেছিলযার বশবর্তী হয়ে কলকারখানা সঠিকভাবে পরিচালনার পরিবর্তে সেগুলোকে লুটপাটের মাধ্যমে নিজেদের অর্থনৈতিক জীবনকে সমৃদ্ধ করার কাজে তারা নিয়োজিত হয়েছিল। গ্রামাঞ্চলে সংগঠিত এই শ্রেণী কৃষকদের পরিশ্রমের ফসলকে ফড়িয়া ব্যবসার দ্বারা অপহরণ করে নিজেদের স্ফীত করে তুলেছিল। এর সাথে যুদ্ধের বিভীষিকাময় সময়ে প্রাণভয়ে দেশত্যাগ করা হিন্দু ধর্মাবলম্বী জনগোষ্ঠীর বড় অংশের ভূসম্পত্তিকে অর্পিত সম্পত্তি আইনের বলে তারা নিজেদের দখলে নিয়েছিল। এর বাইরে টেন্ডারবাজি, পারমিটবাজি চোরাচালানি এসব ছিল তাদের অর্থোপার্জনের অন্যতম উপায়। এই সমস্ত কাজ করতে গিয়ে তারা আশ্রয় নিয়েছিল দুর্নীতিসন্ত্রাসের। দেশময় ব্যাপক হারে নৈরাজ্যবিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে তারা নিজেদের তৈরি সংবিধানকেও অনেক ক্ষেত্রে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন মারফত সেটাকে পদদলিত করেছিল। জনগণের আইনের আশ্রয় লাভের অধিকারকে তারা বন্দি করেছিল নিজেদের স্বার্থের শৃঙ্খলে। এই সমস্ত কাজের অবধারিত ফল হিসেবে স্বাধীনতার পর ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত শাসক শ্রেণী নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করেছিল নতুন এক ধনিক শ্রেণী হিসেবেলুটপাটদখল প্রভৃতিই ছিল যাদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ভিত্তি।

আওয়ামী লীগ কর্তৃক কথিত এবং তাদের বুদ্ধিজীবীদের দ্বারা সর্বদা প্রচারিত সমাজতন্ত্র প্রকৃতপক্ষে কী বস্তু ছিল সেই বিস্তারিত আলোচনায় গিয়ে বর্তমান রচনাকে প্রলম্বিত না করলেও চলে, যদিও সেই আলোচনা একেবারে অপ্রাসঙ্গিক নয়। কিন্তু মূল বক্তব্যকে শাসক শ্রেণীর কর্মকাণ্ড এবং তাদের আচরিত সংস্কৃতির মধ্যে কেন্দ্রীভূত রেখে এ কথা অবশ্যই বলা যায় যে, সমাজে দুর্নীতিসন্ত্রাসবিশৃঙ্খলানৈরাজ্যের মাধ্যমে নব্যগঠিত শাসক শ্রেণী যেভাবে বাংলাদেশে তাদের যাত্রা শুরু করেছিল এর দ্বারা তারা সমাজের অন্যান্য স্তরেও ছড়িয়ে দিয়েছিল অপরাধমূলক সংস্কৃতির উপাদান। শাসকদের কর্মকাণ্ড ও আচরণ জনগণের এক বড় অংশকেও ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে তাদেরকে অপরাধমুখী হিসেবে গড়ে তুলেছিল। বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের পর বিএনপি, জাতীয় পার্টি, জামায়াতে ইসলামী প্রভৃতি শাসক শ্রেণীর অপরাপর প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোও ঐ একই সংস্কৃতির ধ্বজাবাহী হিসেবে রাজনৈতিক সংস্কৃতির অভ্যন্তরে নব নব উপাদানের সংযোজন ঘটিয়েছে। এই প্রক্রিয়া গত চার দশক ধরেই বাংলাদেশে সক্রিয় রয়েছে। জনগণ যখন দ্যাখে যে আইন যাদের দ্বারা প্রযুক্ত হওয়ার কথা তারাই নিজেদের সৃষ্ট আইন ভঙ্গ করছে, দুর্নীতিসন্ত্রাসনৈরাজ্যের ঘরের বাসিন্দা হিসেবে নিজেদের কর্মকাণ্ডকে পরিচালনা করছে, তখন তাদের উল্লেখযোগ্য অংশও যে এ কাজে উৎসাহিত ও প্রবৃত্ত হবে এটাই স্বাভাবিক। বাংলাদেশে এই স্বাভাবিক ঘটনাটিই ঘটেছে। এ কারণেই দেখা যায় শুধু সরকার কিংবা শাসক শ্রেণীর অন্যান্য দলই নয়, জনগণের মধ্যেও আইন ভঙ্গ করা, নিজেদের সঙ্কীর্ণ স্বার্থে দুর্নীতিনৃশংসতা সহ অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করার প্রবণতা বৃদ্ধি লাভ করেছে। বাংলাদেশে এখন গৃহপরিচারিকা নির্যাতন থেকে শুরু করে ধর্ষণঅপহরণ, ঘুষদুর্নীতি এমনকি পারিবারিক অপরাধ পর্যন্ত ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

এ সমস্ত কাজ এমন লোকজনদের দ্বারা সংঘটিত হচ্ছে যাদের নাম পুলিশের খাতায় নেই। অর্থাৎ আনুষ্ঠানিকভাবে তারা ক্রিমিনাল হিসেবে পরিচিত নয়। কিন্তু তাদের বিভিন্ন অপরাধের মধ্যে নৃশংসতার মাত্রা শরীরে শিহরণ তোলার মতো। সন্তান ও অভিভাবকদের হাতে পরস্পরের খুন হওয়া, সামান্য অর্থ, মোবাইল ফোন কিংবা কম্পিউটারের জন্য স্কুলকলেজপড়ুয়া বন্ধুবান্ধবদের দ্বারা হত্যাঅপহরণের ঘটনা, ধর্ষণঅ্যাসিড সন্ত্রাস সহ নারীর ওপর সহিংসতার ঘটনাগুলো এখন নিকটজনদের মধ্যেই ঘটছে। সমাজের মানুষগুলো যেন হিংস্র নখর নিয়ে পরস্পরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছেচারদিকের ঘটনাবলি এমন এক প্রেক্ষাপটই আমাদের সামনে উপস্থিত করছে। কিন্তু এই বিষয়গুলো তো আকাশ থেকে পড়ে নি। একটি সমাজের অভ্যন্তরে যে ধরনের কর্মকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার শর্ত বিদ্যমান থাকে তার ফলাফল তো তেমনই হওয়ার কথা। পূর্বেই বলা হয়েছে সমাজে মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্ক নির্ধারিত হয় সেই সমাজে বিদ্যমান উৎপাদনবিনিময়বণ্টনভোগ ব্যবস্থার সংস্কৃতির দ্বারা। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বর্তমানে কিছু উৎপাদনশীল উপাদান থাকলেও তার অবস্থান এতোটাই প্রান্তিক, ভূমিকা এতোই গৌণ যে তা সমাজের সাধারণ সংস্কৃতিকে নির্ধারণ করতে পারে না। শাসক শ্রেণীর আচরণের মধ্যে যে লুটতরাজমূলক কর্মকাণ্ডের অবস্থান কতোটা প্রভাবশালী সেটা এ দেশের জনগণ নিজেদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা এবং পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদ মারফত অবহিত আছেন। এ বিষয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই। কিন্তু তাদের এই কর্মকাণ্ডের সাথে জনগণের মধ্যে অপরাধপ্রবণতার বিস্তারের সম্পর্ক, এর আদানপ্রদানের ধরন সম্পর্কে বেশির ভাগ মানুষেরই কোনো ধারণা নেই। শাসক গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ডই যে প্রভাবক হিসেবে সমাজের গভীরে দুর্নীতি ও অপরাধসংস্কৃতির বিস্তারে প্রধান ভূমিকা রাখছে সে বিষয়ে খুব কমই অর্থপূর্ণ আলোচনা হয়। এই আলোচনা এবং চিন্তাভাবনার অভাবেই জন্মলাভ করে “দেশের মানুষ খারাপ, তাই দেশের শাসকও খারাপ”এ ধরনের বিভ্রান্তিকর উপপাদ্য।

সুতরাং নিজে বদলে যাও, পারিপার্শ্বিক বদলে যাবে“- প্রচারযন্ত্রের এ ধরনের পাদ্রীসুলভ বক্তব্যের (sermon) দ্বারা কিছু বাহবা পাওয়া সম্ভব হলেও এর মাধ্যমে সমাজের কোনো ইতিবাচক পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই। সেটি হচ্ছেও না। সমাজকে পরিবর্তন করতে হলে তার জন্য এর প্রাণবিন্দুকেই লক্ষ্যবস্তু হিসেবে নির্ধারণ করতে হবে। রাজনৈতিক সংগ্রামের মাধ্যমে বর্তমান শাসন ব্যবস্থাকে পরিপূর্ণ উচ্ছেদ করে তাকে নতুন ব্যবস্থার দ্বারা প্রতিস্থাপিত করার দ্বারাই সমাজের এই অবস্থার ইতিবাচক পরিবর্তনের সম্ভাবনা সৃষ্টি হতে পারে। কোনো জনপ্রিয় বাণী, হিতোপদেশ, সমাজসেবার দ্বারা তা কখনোই হবে না। শাসক শ্রেণীর বিদ্যমান রাজনীতির বিপরীতে দেশের ব্যাপক নির্যাতিত জনগণের রাজনৈতিক সংগ্রামে বিজয় অর্জনের তাৎপর্য এখানেই নিহিত।।

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s