দুই নেত্রীর ফোনালাপ, নাগরিকের ব্যক্তিগত পরিসর, রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা এবং আমাদের বুদ্ধিবৃত্তির সীমানা

Posted: অক্টোবর 31, 2013 in মন্তব্য প্রতিবেদন
ট্যাগসমূহ:, , , , , , , , , , ,

লিখেছেন: বাধন অধিকারী

red-telephone-3শাহদীন মালিক আমার খুব প্রিয় মানুষদের একজন। প্রথাগত একজন আ্নিজ্ঞ হয়েও ভিন্নভাবে ভাবতে পারেন তিনি। আমার মনে আছে; সেনাকর্পোরেট কর্তৃত্বের জরুরি ক্ষমতার সরকারের সময় বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রবিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে একপর্যায়ে নিম্ন আদালত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চার শিক্ষকের দণ্ডাদেশ দিলে তিনি এক অসাধারণ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন এক জাতীয় দৈনিকে। লেখার শিরোনাম দিয়েছিলেন “ন্যায়বিচার হয়নি”। স্বীকৃত বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে র্যাব প্রশ্নে কঠোর অবস্থান যাদের; শাহদীন মালিক তাদের অগ্রগণ্য। অনেক লেখাতেই সীমানা ভেঙেছেন তিনি। তবে আমাদের ‘দুই নেত্রীর ফোনালাপ’ ডিসকোর্সে তাঁর সরবরাহকৃত উপাদান আহত করলো। ওনার মতো মানুষ কী করে নাগরিকের গোপনীয়তার সঙ্গে দুই নেত্রীর ফোনালাপের মতো রাষ্ট্রীয় ইস্যুকে গুলিয়ে ফেললেন! তিনি বললেন; এতে নাগরিকের যোগাযোগের গোপনীয়তার অধিকার ক্ষুণ্ণ হয়েছে। আইন লঙ্ঘিত হয়েছে। কাজটা বেআইনী হয়েছে। প্রায় একই ধরনের মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক; অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম। তিনি বলেছেন; তারাই নাকি এই ফোনালাপ ফাঁস করেছেন; যারা ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি তৈরী করতে চাইছে

শাহদীন মালিকও বলেছেন; “রাষ্ট্রের দুজন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির টেলিফোন সংলাপ যারা রেকর্ড করেছেন, তারা বেআইনি কাজ করেছেন। সরকারের উচিত হবে, কারা সেটি রেকর্ড করেছেন এবং গণমাধ্যমে প্রকাশে সহায়তা করেছেন তা খুঁজে বের করা”। একজন আইনজ্ঞ আরেকজন শিক্ষক, খুব সবিনয়ে জানতে চাই, উদ্ধৃত এই দুই বুদ্ধিজীবীর কাছে, খালেদাহাসিনার নিজেদের মতো আপনারাও কি এই দেশটাকে তাদের ব্যক্তিগত মালিকানার সম্পত্তি বিবেচনা করেন নাকি? যে দেশের ভবিষ্যত প্রশ্নে বলা তাদের কথাগুলো তাদের ব্যক্তিগত আলাপ হয়ে যায়!

তবে আইনের দৃষ্টিতে কাজটা বেআইনী হতেই পারে! যখন শাহদীন মালিক বলেছেন; তখন সেটাকে গুরুত্ব না দিয়ে উপায় নাই। ফেইসবুকে শাহদীন মালিকের বক্তব্যকে কেন্দ্র করে আমার এক প্রতিক্রিয়ার জবাব দিয়েছেন এক আইনের শিক্ষার্থী। তার আলাপ থেকে এবং নিজের বোঝাপড়া থেকে ফোনালাপ ফাঁসের আইনগত দিক নিয়ে একটু আলাপ সেরে নিতে চাই। ইভিডেন্স অ্যাক্ট১৮৮২এর ৭৪এর() ধারা অনুযায়ী সরকারী দলিল বিবেচনায় এই ফোনালাপ পাবলিক প্রপার্টি। তবে আইনের মারপ্যাচ তো আছে। এই আইনের ব্যাখ্যায় এবং দন্ডবিধি, ১৮৬০ এ বলা হয়েছে private document তখনই public document এবং প্রকাশিতব্য যখন সেটা রাষ্ট্র,সমাজ, কোনো নির্দিষ্ট ব্যাক্তি, গোষ্ঠী বা মতাবলম্বীদের জন্য মারাত্মক হুমকি স্বরুপ। আর এই জায়গাটাই ধরেছেন শ্রদ্ধেয় শাহদীন মালিক। তিনি বলেছেন; রাষ্ট্রের নিরাপত্তা হুমকির আশংকা হলে সরকার আদেশ দিয়ে কারো টেলিযোগাযোগ বা পত্র যোগাযোগ রেকর্ড করতে পারে। কিন্তু পাগলও বোঝে, দুই নেত্রীর এই টেলিসংলাপ রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য হুমকি নয়। সেকারণে কাজটা বেআইনি হয়েছে বটে! তবে বেআইনী কাজ মাত্রই যে খারাপ নয়; সেটা আমরা জানি। আমাদের ঐতিহাসিকতার সুমহান আখ্যান একাত্তরের জনযুদ্ধটাও রচিত হয়েছে উপনিবেশিক পাকিস্তানের আইনকে লঙ্ঘন করেই। তাই ফোনালাপ ফাঁসের এই বেআইনি কাজটা নাজায়েজ বলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয়া যাচ্ছে না আপাতত।

পাঠক আসুন, এবার একটু আইনের চশমাটা খুলে রেখে নিজের চোখ দিয়ে দেখার চেষ্টা করি। ভাবতে চেষ্টা করেন তো, খালেদাহাসিনার ফোনালাপ যদি রাষ্ট্রের জন্য হুমকিই না হয়, তাহলে সেটা ফাঁস করায় কি ক্ষতিটা হইলো? আর কী আলাপ করেছিলেন দুই নেত্রী? তারা নিজেদের ছেলেমেয়ের বিয়ের আলাপ করেননি, মেয়েবেলার গল্প শেয়ার করেননি পরস্পেরর সঙ্গে। সোজা অর্থে বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন এবং নির্বাচনকালিন সরকার নিয়ে আলোচনা করেছেন। তো সেই আলাপ কী করে ব্যক্তিগত ফোনালাপ হইলো? এবার আমি যদি বলি, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় হাসিনাখালেদা দেশের জনগণের কাছে গোপন করে নিজেদের মধ্যে খোদ দেশের ভবিষ্যত নিয়ে আলাপ করতে পারেন না! কেননা প্রজাতন্ত্রের মালিক জনগণ। মালিকের অজান্তে দেশের ভবিষ্যত আলোচ্য হয় কী করে? আমাদের বুদ্ধিজীবীদের বিবেচনায় এই তবে মালিকানার ধরণ? এই তাহলে তাদের কাঙ্ক্ষিত গণতন্ত্র; যেখানে দেশ পরিচালনার ভবিষ্যত নিয়ে দেশের দুই প্রধান প্রতিনিধি কথা বলবেন, সেই কথা জনগণের জানার বৈধতা থাকবে না!

আগামি ৫বছরের জন্য কারা দেশটাকে লুটেপুটে খাবে; সেই সিদ্ধান্তের মীমাংসা করতে না পেরে প্রধান দুই দলের স্বৈরতান্ত্রিক দুই প্রতিনিধি; এই দুই নেত্রী বিপর্যস্ত করে তুলেছেন মানুষকে। জনগণের শ্রমঘামকরের টাকায় একদিকে বড়লোক হচ্ছে একটা শ্রেণী; আরেকদিকে সেই জনগণকে হরতালপিকেটিংপুলিশি হয়রানিআইনের খপ্পরে ফেলে প্রতিদিনকার অশান্তিতে ঠেলে দেয়া হয়েছে। সেই অশান্তির মাত্রা কতোটা ভয়াবহ, সেটা রাস্তাঘাটে হরতালের দিনগুলোতে বের হলেই টের পাওয়া যায়। আরও যাবে কয়েকদিন পর। মানুষ বড্ড অসহায়। তাদের দেশ, তাদের মালিকানা, অথচ সেই দেশটাকে দখল করেছে রাজনীতিকেরা। তারাই সিদ্ধান্ত নিচ্ছে এটা কীভাবে চলবে। মানে কীভাবে এটাকে লুটেপুটে খাওয়া হবে। তবুও শাহদীন মালিকরা বলবেন, সেই দেশের ভবিষ্যত নিয়ে আলাপটা দুই নেত্রীর ব্যক্তিগত আলাপ।

দেবেন গোপনীয়তার/প্রাইভেসির তত্ত্ব। বাংলাদেশসহ খোদ মার্কিন মুল্লুকে মানুষ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়াই করছে ব্যক্তিগত পরিসরকে রক্ষার জন্য। প্রাইভেসিকে প্রিয় শিক্ষক সেলিম রেজা নিউটন বলেছেন ব্যক্তিগত আব্রু। এই ব্যক্তিগত আব্রু হাসিনাখালেদার আলাপে দরকার হয় কী করে। একটা রাষ্ট্রীয় বিষয়ে? আবারও সবিনয়ে বলছি, শাহদীন মালিকরা দুই নেত্রীর ফোনালাপকে ব্যক্তিগত বলার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রকে আরও গোপন হবার মতাদর্শ সরবরাহ করছেন পরোক্ষে। যে গোপনীয়তা ভয়ঙ্কর। যে গোপনীয়তা জনগণের অজান্তে গণবিরোধী কর্মকাণ্ডকে মসৃণ করে। ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষার নামে শাহদীন মালিকরা প্রকারন্তরে এই রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তার পক্ষে সাফাই গাইছেন। অথচ সত্যিকারের গণতন্ত্রের প্রাথমিক শর্তই হলো তথ্যের ওপেননেস। তবু আমাদের বুদ্ধিজীবীরা ওই হাসিনাখালেদার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত আকারেই পাঠ করবেন; দেশের ভবিষ্যতকে! আমাদের আর কী করার আছে। যাদের দেশ, যারা নাগরিক, তারাই জানতে পারবে না, দেশ কোন দিকে নিয়ে যাচ্ছেন স্বৈরাচারী ক্ষমতাতন্ত্রের দুই সুমহান প্রতিনিধি; ভালো তো, ভালো না!

এই হলো আমাদের বুদ্ধিবৃত্তির নমুনা। এই আমাদের গণতন্ত্র। জনগণের উপর ক্ষমতার পালাবদলে জেঁকে বসা জনবিরোধী শক্তির এই দুই প্রধান প্রতিনিধি কথা বলবেন খোদ আগামি দিনের দেশ পরিচালনার পদ্ধতি নিয়ে; আর সেখানে সেটাকে পাবলিক করা যাবে না। তবে গণতন্ত্র মানে কি হাসিনাখালেদাতন্ত্র? দোহাই আপনাদের, আমাকে আওয়ামী লীগ কিংবা জাসদ ভাববেন না; সঙ্গত কারণেই আমি তথ্যমন্ত্রীর সঙ্গে একমত যে; জনগণের এটা জানার অধিকার আছে। সঙ্গে সঙ্গে আমি আনন্দিত এই কারণেও যে; ফোনালাপ ফাঁসের মধ্য দিয়ে দুই নেত্রী আসলে কী জিনিশ তা জনগণের সামনে খানিকটা হলেও স্পষ্ট হয়েছে।

বাজারের যুগে বাজারের স্বার্থে কিংবা স্বীয় রাজনৈতিক বাসনায়; যে কারণেই হোক, যারা ফোনালাপ ফাঁস করেছেন; তাদের অভিনন্দন।।

রচনাকাল: ৩০ অক্টোবর, ২০১৩

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.