লিখেছেন: সামিউল আলম রিচি

world-to-winজয় সর্বহারা স্লোগান প্রশ্নে একটি মতামত প্রকাশ করেছেন ছাত্র গণমঞ্চের আহ্বায়ক শান্তনু সুমন(জয় সর্বহারা” শ্লোগানের সঠিকতা ও বেঠিকতা প্রসঙ্গে)তার বক্তব্য হলোবাংলাদেশের বিপ্লবের স্তর গণতান্ত্রিক এবং এই পর্যায়ে বিপ্লবের চারটি মিত্রশক্তি শ্রমিকশ্রেণী, কৃষক (প্রধানতঃ দরিদ্র কৃষক) শ্রেণী, ক্ষুদে বুর্জোয়া শ্রেণী ও জাতীয় বুর্জোয়া (মাঝারী বা মধ্য) শ্রেণীকে অবশ্যই ঐক্যবদ্ধ হতে হবে’ এবং এই ঐক্য বজায় রাখার জন্য সর্বহারা শ্রেণীরদল বা পার্টিকে গণতান্ত্রিক বিপ্লবের স্তরে ‘জয় সর্বহারা’ স্লোগানটি ত্যাগ করতে হবে তা নাহলে ঐক্য বিনষ্ট হবে, শত্রুকে সুযোগ দেয়া হবে ও শত্রুকে আড়াল করা হবে এবং বিপ্লবের স্তরকে অতিক্রম করে বিপ্লবের বর্তমান স্তরকে অস্বীকার করে হবে মার্কসবাদকে বিকৃত করা, সংশোধন করা হবে’। পুরো লেখাটিই চরম প্রতিক্রিয়াশীল বিবেচনায় এই বিষয়ের উপর মতামত প্রদানের প্রয়োজনীয়তা বোধ করছি।

*শুরুতেই বলা দরকার এই মূহূর্তে বাংলাদেশে জাতীয় বুর্জোয়া বলে কোন শ্রেণীর অস্তিত্ব আছে বলে আমরা মনে করিনা। বাংলাদেশের লুন্ঠনজীবী বুর্জোয়াদের গঠন, তাঁদের পুঁজির বিকাশ, শিল্পপুঁজির উপর বাণিজ্যিক পুঁজির আধিপত্য এইসব বিবেচনায় সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী জাতীয় বুর্জোয়া হিসেবে কোন শ্রেণীর বিকাশের পরিস্থিতিই চিন্তা করা যায়না। আজকের দিনে বাংলাদেশের এই লুটেরা বুর্জোয়াদের পুঁজি সাম্রাজ্যবাদী পুঁজির সাথে অঙ্গাঅঙ্গীভাবে সম্পর্কিত (organically related)। ফলে শ্রমিক শ্রেণীর নেতৃত্বে কৃষকের মৈত্রীর ভিত্তিতে সাম্রাজ্যবাদের দালাল লুটেরা বুর্জোয়াদের পুঁজিকে উচ্ছেদ করাই এই মূহুর্তের সঠিক রণনৈতিক লক্ষ্য।

*কিন্তু যদি হাইপোথিটিক্যালি ধরেই নিই বাংলাদেশে তথাকথিত জাতীয় বুর্জোয়ার অস্তিত্ব আছে এবং এরা বাংলাদেশের শ্রমিকশ্রেণীর মিত্রশক্তি তাহলেও কি শান্তনু সুমনের কথা অনুযায়ী ঐক্যের খাতিরে আমাদেরকে ‘জয় সর্বহারা’ শ্লোগানটি পরিত্যাগ করতে হবে?

*আমরা একটু যুক্তফ্রন্ট গঠনের ইতিহাসের দিকে তাকাই। ১৯২০ সালে কমিন্টার্ন তার ২য় কংগ্রেসে বলেছিল যে কমিউনিষ্ট পার্টি এবং বিপ্লবী বুর্জোয়া পার্টিগুলোকে একটি যুক্তফ্রন্টের আওতায় আনা প্রয়োজন। আর এই যুক্ত ফ্রন্টের মধ্যে মৈত্রী গড়ে তোলাই হল আসন্ন সংগ্রামের চাবিকাঠি। এটি ছিল লেনিনের মতবাদেরই একটি বিষয়চিন্তা। ১৯২১ সালের জুন জুলাইতে কমিন্টার্নের ৩য় কংগ্রেসে এই মতবাদের পুনরাবৃত্তি করা হয়। যেখানে উপস্থিত ছিলেন সদ্য গড়ে ওঠা চীনা কমিউনিষ্ট পার্টি এবং চীনের বুর্জোয়া পার্টি কুওমিন্টাং মিলে ৩৫ জন চীনা প্রতিনিধি। এই কংগ্রেসে চীনা বুর্জোয়াদের সাথে একটি ‘সাময়িক এবং সতর্কদৃষ্টিসম্পন্ন’ মৈত্রী গড়ে তোলার ইঙ্গিত করা হয়েছিল। ১৯২৩ সালে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির রাজনৈতিক ব্যুরোর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ডঃ সান ইয়ে সেন এর কুমিন্টাং দলের সাথে যুক্তফ্রন্ট গঠিত হয়। ১৯২১ সালেই লেনিন বলেছিলেন, বুর্জোয়ারা জাতীয় বিপ্লবী আন্দোলন কব্জা করতে ও নিয়ন্ত্রণ করতে চেষ্টা করবে। যা হোক তাঁরা চরমপন্থী বলে ধ্বনিত হলেও তাদের শ্রেণীস্বার্থেই এই বিপ্লবের সাথে বেঈমানী করবে এবং শেষ পর্যন্ত সাম্রাজ্যবাদের সাথে আপোস করবে। তাই কমিউনিষ্ট পার্টি যুক্তফ্রণ্টে থেকেও তার নিজস্ব স্বাধীনতা বজায় রাখবে এবং তাছাড়াও শ্রমিক ও কৃষক শ্রেণীর নেতৃত্ব ও নিজের হাতে রাখবে।

* মাও সেতুঙ ১৯২২ সালেই যুক্তফ্রন্টের পক্ষে পথ বেছে নেয়ার ইংগিত দেন। তবে তিনি অত্যন্ত জোরের সাথে বলেন, চীনের কমিউনিষ্ট পার্টিকে অবশ্যই নিজ হাতে তার কাজ করার স্বাধীনতা এবং শ্রমিক শ্রেণী ও কৃষক সম্প্রদায়ের নেতৃত্ব বজায় রাখতে হবে। কেননা বিপ্লবের নেতৃত্ব কুওমিনটাং এর উপর ছেড়ে দেয়া যায়না।লেনিন এর যুক্তফ্রন্টের নীতির সাথে মাও এর চিন্তার ঐক্যই এই বক্তব্যে প্রতিফলিত হয়। লক্ষ্যণীয়, এটা মাও বলছেন ডঃ সান ইয়েত সেনের ১৯২২ এর সেই কুওমিনটাং এর সম্পর্কে যে সান ইয়াত সেনের পার্টিকে লেনিন ১৯১২ সালে ‘বুর্জোয়া হলেও বিপ্লবী’ আখ্যায়িত করেন। লেনিন এবং মাও স্পষ্টতই এখানে সতর্ক করে দিচ্ছেন যে বুর্জোয়াদের সাথে এই ঐক্য হবে ‘সাময়িক বং সতর্ক’ কারণ তারা দোদুল্যমান এবং এই সতর্কতার মানে হলোশ্রমিক শ্রেণীর নেতৃত্বের প্রশ্নটি পরিষ্কারভাবে ফয়সালা করা আর মার্ক্সবাদের ছাত্র মাত্রেই জানে, শ্রমিক শ্রেণীর নেতৃত্ব মানেই ‘শ্রমিকশ্রেণীর মতাদর্শিক নেতৃত্ব’ যার প্রকাশ ঘটবে তার স্লোগানে, তার কর্মসূচীতে। জয় সর্বহারাবা দুনিয়ার মজদুরএক হওহচ্ছে সেই স্লোগানগুলো যা শ্রমিক শ্রেণীর রাজনৈতিক মতাদর্শকে ধারণ করে। যেখানে যুক্তফন্টে কাজ করতে গিয়ে এই সতর্কতা রাখার জন্য লেনিন এবং মাও বারবার বলে গেছেন সেখানে এর উলটোটা অর্থাৎ ‘জয় সর্বহারা’ শ্লোগান ত্যাগ করে বুর্জোয়া দের কাছে পুরোপুরি আত্মসমর্পণের সবক দিচ্ছেন শান্তনু সুমন! প্রকারন্তরে লেনিনমাও এর যুক্তফ্রন্টের নীতিকেই সংশোধনবাদী (!) আখ্যা দিচ্ছেন।

১৯২৬ এর মার্চে ‘এনালাইসিস অফ ক্লাসেস ইন চাইনিজ সোসাইটি’ প্রবন্ধে দোদুল্যমান (vacillating)বুর্জোয়ারা যুক্তফ্রণ্টের ভেতর যাতে বিভ্রান্তি তৈরী করতে না পারে সেজন্য ঐক্যের ভেতরেই নিজেদের বর্ম তৈরী করার কথা (we must be constantly on our guard)বলে গেছেন মাও। আর সেই বর্ম কিভাবে তৈরী হবে? অবশ্যই শ্রমিক শ্রেণীর নেতৃত্ব তথা মতাদর্শিক নেতৃত্বের পতাকা উর্ধ্বে তুলে ধরে (The leading force in our revolution is the industrial proletariat. Our closest friends are the entire semi-proletariat and petty bourgeoisie. As for the vacillating middle bourgeoisie, their right-wing may become our enemy and their left-wing may become our friend but we must be constantly on our guard and not let them create confusion within our ranks.)

*শান্তনু সুমন বলছেন, সর্বহারা শ্রেণী বাংলাদেশ তথা পূর্ববাংলার সমাজে শ্রেণীগত ভাবে সংখ্যালঘু এমনকি সমাজতান্ত্রিক সমাজেও একটি পর্যায় পর্যন্ত সংখ্যালঘু থাকবে। এ অবস্থায় সর্বহারাশ্রেণী কিভাবে দেশের সকল জনসাধারণকে নেতৃত্ব দেবে?’হাতুড়েপনার কি দৃষ্টান্ত! সর্বহারা শ্রেণী সংখ্যালঘু থাকবে বলে তার নেতৃত্ব স্থগিত রাখতে হবে? মাও যখন চিংকাংশানে ঘাঁটি এলাকা গড়ে তোলার কাজ করছেন তখন চীনে শ্রমিক ছিলেন ৪০ লক্ষ আর কৃষক ছিলেন ৫০ কোটি। তিনি একবারের জন্য কি কখনো শ্রমিক শ্রেণীর নেতৃত্বের প্রশ্নটি স্থগিত রেখেছেন? জাপবিরোধী সংগ্রামে রণকৌশল নির্ধারণের ক্ষেত্রে (ON TACTICS AGAINST JAPANESE IMPERIALISM, December 27, 1935), চীনা কমিউনিষ্ট পার্টির ২৮ তমবার্ষিকীর সেই বিখ্যাত বক্তৃতা (ON THE PEOPLE’S DEMOCRATIC DICTATORSHIP, June 30, 1949)সহ আরো আরো সব প্রবন্ধে যুক্তফ্রন্ট প্রসঙ্গে শ্রমিক শ্রেণীর নেতৃত্বের প্রশ্নটি বারংবার উচ্চারণ করেছেন তিনি। (উদ্বৃতি দিয়ে পাঠকের ধৈর্যচ্যুতি ঘটাতে চাইনা, প্রবন্ধগুলো নেটে সহজপ্রাপ্য)

কেন? কারণ মার্ক্সবাদের অতুলনীয় ছা্ত্র হিসেবে মাও জানতেন, সংখ্যায় অল্প হলেও সর্বহারা শ্রমিক এমনই মেহনতি শ্রেণী যারা উৎপাদন ব্যবস্থার সবচেয়ে প্রগতিশীল রূপ, বৃহদাকার উৎপাদন ব্যবস্থার সাথে যুক্ত থাকার দরুণ তারা মহান ভবিষ্যতের অধিকারী বিপ্লবী ও অগ্রসর শ্রেণী। ফলে শ্রমিক শ্রেণীর নেতৃত্বের প্রশ্নটি বিপ্লবী আন্দোলন এবং সমাজ বিকাশের ক্ষেত্রে অতি জরূরী অনুষঙ্গ। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষের দিকে রাশিয়ার নারদনিকরাই শ্রমিকশ্রেণীর এই নেতৃত্বমূলক ভূমিকার তাৎপর্য বুঝতে ব্যর্থ হয়েছিল এবং পরিণতিতে নৈরাজ্যবাদীতে পরিণত হয়েছিল। এই নারদনিকদের বিরুদ্ধে প্লেখানভ এবং লেনিন যে তাত্ত্বিক সংগ্রাম চালিয়েছিলেন তা মার্ক্সবাদের বিকাশের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। ১০০ বছর পরে সেই নারদনিকদের ভুত শান্তনু সুমন কেন আবার পুনরুজ্জীবিত করতে চাচ্ছেন এটা আমার কাছে অবাক করা ব্যাপার।

*শান্তনু সুমন বলছেন, ‘……সেখানে কি সর্বহারা শ্রেণী নিজ শ্রেণীর নামে নিজের শ্রেণীর বিজয় হোক এই শ্লোগান দিতে পারে সমগ্র মানবগোষ্ঠীকে মুক্ত না করে, সর্বহারাশ্রেণী কি নিজে বিজয় লাভ করতে পারে বা মুক্ত হতে অন্য নিপীড়িত শ্রেণীসমূহকে মুক্ত না করে,পারে কি ঐক্যকে বিনষ্ট করতে, মিত্রশক্তির মধ্য বিভেদ সৃষ্টি করে শত্রুশ্রেণীকে সুযোগ করে দিতে, সামাজিক বিকাশকে বাধাগ্রস্থ করতে না পারেনা……একি সর্বনাশা কথাবার্তা!! মানবজাতির মুক্তির প্রাথমিক শর্তই তো হলো বুর্জোয়া শ্রেণীর উপর শ্রমিক শ্রেণীর বিজয় এবং শুধু বিজয় নয় সর্বহারা শ্রেণীকে বিজয় সংহত করার জন্য নির্মম বলপ্রয়োগের আশ্রয় নিতে হয়। কতদিন পর্যন্ত? ততদিন পর্যন্ত যতদিন বলপ্রয়োগের উচ্চতর পর্যায়ে একসময় বলপ্রয়োগের প্রয়োজনীয়তা এবং বলপ্রয়োগকারী সর্বহারার রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তাটা বিলুপ্ত হবে। রাষ্ট্র শুকিয়ে মরবে এবং মানবজাতির সার্বিক মুক্তি নিশ্চিত হবে। ফলে সেই পর্যন্ত সর্বহারার বিজয়ধ্বনি বা ‘জয় সর্বহারা’ উচ্চারণ করতে হবে মানবজাতির সার্বিক মুক্তির ঐতিহাসিক লক্ষ্য অর্জনের জন্যই। মানবমুক্তির এই পথেই সমাজের বিকাশ ঘটবে। লেনিন বলছেন, সর্বহারার একনায়কতন্ত্র আরোপ করে নিপীড়ক, শোষক, পুঁজিপতিদের স্বাধীনতার উপর একের পর এক বাধা নিষেধ। মজুরী দাসত্ব থেকে মানবজাতিকে মুক্ত করতে হলে এদেরকে আমাদের অবশ্যই দমন করতে হবে, বলপ্রয়োগের দ্বারা এদের প্রতিরোধ অবশ্যই চূর্ণ করতে হবে, একথা স্পষ্ট যে যেখানে বলপ্রয়োগ আছে সেখানে স্বাধীনতা নেই, গণতন্ত্র নেই”(রাষ্ট্র ও বিপ্লব)

ফলে কোন অবস্থাতেই সর্বহারাশ্রেণী ঐক্যের খাতিরে সর্বহারার নেতৃত্ব বা সর্বহারার বিজয় ঘোষণা করার কাজটি স্থগিত করতে পারেনা। অন্য কোন শ্রেণীর জন্য ততদিন পর্যন্ত স্বাধীনতা, গণতন্ত্র অথবা মুক্তি এই শব্দগুলোর কোন অস্তিত্ব থাকতে পারেনা। বেবেলের কাছে লেখা চিঠিতে এঙ্গেলস বলছেন, সর্বহারা শ্রেণীর কাছে যতদিন রাষ্ট্রের প্রয়োজন থাকছে ততদিন সেই প্রয়োজনীয়তাটা স্বাধীনতার স্বার্থে নয়, বরং নিজ প্রতিপক্ষকে দাবিয়ে রাখার স্বার্থেই আর যে মূহুর্তে স্বাধীনতার কথাটা বলা সম্ভব হবে, সে মূহূর্তে রাষ্ট্র হিসেবে রাষ্ট্রের অস্তিত্বও আর থাকছেনা”

সমাজ বিকাশের পর্যায়গুলোর প্রশ্নে মার্ক্সএঙ্গেলসলেনিনমাও আমাদের এই শিক্ষাই দিয়ে গেছেন। শান্তনু সুমন আরো একবার তার বক্তব্য নিয়ে ভাবনাচিন্তা করবেন এই আশা করছি। সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী ছাত্র ঐক্যের সহযোদ্ধা হিসেবে এই বক্তব্য আমার জন্যও অস্বস্তিকর। আমি আহ্বান করছি, অবিলম্বে তিনি এই বক্তব্য সমর্থন করার জন্য সবাইকে আহ্বান করা বন্ধ করবেন এবং তার প্রতিক্রিয়াশীল বক্তব্য তুলে নেবেন।।

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s