সাবেরের ছোটগল্প – মধ্যবিত্ত মনস্তত্ত্বের পোস্টমোর্টেম রিপোর্ট

Posted: অক্টোবর 6, 2013 in সাহিত্য-সংস্কৃতি
ট্যাগসমূহ:, , ,

লিখেছেন: আহমদ জসিম

moinul-ahsan-saber-1নির্বাচিত গল্প,

লেখক: মঈনুল আহসান সাবের,

প্রকাশক: অনন্যা,

প্রকাশ কাল: ডিসেম্বর ২০১১,

প্রচ্ছদ: ধ্রুব এষ।

মধ্যসত্তর থেকে যিনি গল্প সৃজনের কাজটা সুনিপূণ হাতে করে যাচ্ছেন সেই মঈনুল আহসান সাবেরের নির্বাচিত গল্পগ্রন্থ পাঠ করতে গিয়ে আমাদের কিছু বিচার ও বিবেচনা বোধ সামনে এসে দাঁড়ায়। প্রথমেই স্মর্তব্য বাংলা ভাষায় ছোটগল্পের বুনন সূচিত হয়েছে রবীন্দ্রনাথের মতো বিশ্ববরেণ্য শিল্পীর হাত দিয়ে। রবীন্দ্রনাথ যখন বাংলা ভাষায় ছোটগল্প লিখছেন তখন তার সমকালের বিশ্বের অন্যান্য গল্পকারদের মধ্যে আছেনএলেন পো, ও হেনরি মোপাসার মতো গল্পকাররা। এই সব গল্পকারদের গল্পের প্রধান বৈশিষ্ট্য সারপ্রাইজ, অপরদিকে তার বিপরীতে দাঁড়িয়ে রবীন্দ্রনাথ লিখে গেছেন ইমেজনির্ভর গল্প। রবীন্দ্রউত্তর ছোটগল্পে ভাষা বুনন ও বিষয়বৈচিত্র্যে বেশ পরিবর্তন এসেছে, কিন্তু আমরা বোধ করি রবীন্দ্রনাথের সেই ইমেজ থেকে খুব বেশি বেরিয়ে আসতে পারিনি। এই বিবেচনায় মঈনুল আহসান সাবেরকে আলাদা করে বিবেচনার দাবি রাখে। বলে রাখা ভাল, এই পৃথকীকরণের ব্যাপারটা যত না ভাষা কিংবা বিষয়কেন্দ্রিক তার চেয়ে ঢের বেশি বুনন ক্রিয়ায়। সেই বিবেচনায় তিনি আলাদা করে ইমেজ কিংবা সারপ্রাইজিং গল্পের প্রতিনিধিত্বকারী নন। তিনি যা করেছেন তা হলো ইমেজ এবং সারপ্রাইজিং দুইটা বিষয়কে তাঁর গল্পে সমন্বয় সাধন করেছেন অত্যন্ত দক্ষতার সাথে। নিদেনপক্ষে তাঁর নির্বাচিত গল্পগ্রন্থটা পাঠ করে আমরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারি। সাবের নানাবিধ বিষয় নিযে গল্প লেখলেও তার গল্পের প্রধান উপজীব্য বিষয় মধ্যবিত্তের যাপিত জীবন। মানিকউত্তর বাংলা ছোটগল্পে আমরা ইলিয়াসকে দেখেছি মধ্যবিত্তের মনস্তত্ত্বকে গল্পের বিষয় করতে। সাবেরের গল্পে মধ্যবিত্ত এসেছে নানা আঙ্গিকে। তবে সব আঙ্গিকেই এই শ্রেণীর অন্তঃসারশূন্য জীবনটাই যেন উন্মোচন হয়ে উঠে। আবার গল্পের সরলরৈখিক বর্ণনার ভিতর দিয়ে যেতে যেতে পাঠক এক প্রচণ্ড ধাক্কা খায়, যেটা পাঠকের চেতনাজগৎকে পাঠের সাথে সাথে নতুন এক দ্যোতনা ক্রিয়ার সাথে যুক্ত করে। যেমন আমরা তার হন্তারক গল্পে দেখছি পাঠক প্রস্তুত হচ্ছে একটা খুনের বিভৎস দৃশ্য দেখার জন্য কিন্তু শেষ পর্যন্ত পাঠক দেখলো ভালবাসার একটা বিকশিত রূপ, যেখানে হিংস্রতার বদলে চূড়ান্তভাবে জয় হচ্ছে মানবতার। তাহলে এবার আমরা গল্পটার বুননের দিকে একবার নজর দিতে পারি, গল্পের বিষয় বিন্যস্ত হয়েছে সাহেলী নামের এক নারী আর ত্রিভুজ প্রেমের কাহিনি নিয়ে। সাহেলীর সাথে প্রথম সম্পর্ক ছিল সেকান্দারের, এখন সেই সাহেলী নতুন করে সম্পর্কে জড়ালো তারেক নামক এক যুবকের সাথে সেকান্দারকে সাহেলীর ক্রমশ উপেক্ষা, ফলে সেকান্দারের পৌরুষত্বে আঘাত ও প্রতিহিংসাপরায়ন হয়ে উঠার এক রমরমা বর্ণনা। এই প্রতিহিংসা তারেককে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য সেকান্দার কৌশলে তাকে নিয়ে গেল এক নির্জন স্থানে, তারপর খুনের জন্য এটেম নেওয়ার এক মর্মস্পর্শী বর্ণনা। যেন এখনই সেকান্দর কোমর থেকে পিস্তলটা বের করে তারেককে খুন করল বুঝি! প্রতিবার কোন না কোন বাঁধা এসে হাজির, প্রকৃত সুযোগটা এলো এখন আর হত্যা নয়, পাঠককে হতবাক করে সেকান্দার তারেককে বোগলদাবা করে ফিরে এল। আমরা তার গ্রাস গল্পটা পড়েও একই বিষয় লক্ষ করি, সেই সাথে এক ভয়ানক ভাবনায় নিমজ্জিত হই। এখানে দেখছি, রাহিপুর নামক এক গ্রামে একটা রোবট কারখানা গড়ে উঠেছে, যেখানে তৈরি হচ্ছে অত্যন্ত উন্নত মানের রোবট, সেই কারখানা নিয়ে প্রতিবেদন লিখতে এসেছেন এক সংবাদিক। সংবাদিক রাহিপুরে এসেই স্মৃতিময়তার নষ্টাজিয়াতে নিমজ্জিত হয়ে পড়েন: একের এক বর্ণনায় উঠে আসে একদা প্রেমিকাকে নিয়ে ঘুরতে আসা সুজলা সুফলা সেই গ্রামির দৃশ্যপট, সেই সাথে বর্তমান সময়ে বদলে যাওয়া জনপদের বর্ণনা, কিন্তু আমাদের গল্পের জন্য অপেক্ষা করতে হয় সাংবাদিকের কারখানা অবদি পৌঁছানো পর্যন্ত। কারখানার তত্ত্বাবধায়ক আহমেদ তরাফদার, তরাফদার পুত্র বলে যাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন, সেই জিয়া পুরো কারখানাটা সাংবাদিককে ঘুরে ফিরে দেখালো। দেখানোটা বড় কথা নয়, সাংবাদিকের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছেন, তরাফদার সাহেব যাকে পুত্র বলে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন সে কী আসলে মানুষ না রোবট। তরাফদার সাহেবের মুখে রোবটের বর্ণনা শুনে সাংবাদিক নিশ্চিত ভেবে নিলেন জিয়া নামে পুত্র বলে যাকে পরিচয় করিযে দিয়েছেন সে আসলে রোবটই, তাই তরাফদারকে সংবাদিক বললেন, ‘আমি আপনার চালাকি ধরে ফেলেছি, আপনার ছেলে বলে পরিচয় দিয়ে যাকে আমার সঙ্গে পাঠালেন সেযে একটা রোবট তা জানতে আমার বাকী নেই।’ তরাফদার সাহেব টেবিলের উপর প্রবল হাতের আঘাতে চারদিক কাঁপিয়ে বললেন, ‘স্টপ ইট, হি ইজ মাই স্যন, মাই ওন স্যন।’ তারপর শুরু হলো রোবটের সাথে থাকতে থাকতে একজন মানুষ মানবিক বোধ হারিয়ে রোবট হয়ে উঠার গল্প, মর্মস্পর্শী শরীর হিম হয়ে আসা আহমেদ তরাফদারের সেই বর্ণনার শেষ সংলাপটি এই রকম: ‘আমরা কোটি কোটি টাকা ঢালছি, হাজার হাজার বিজ্ঞানী জড়ো করছি, দিনরাত কাজ করে চলছি কারণ আমরা ঠিক মানুষের মতো রোবট বানাতে চাই। কিন্তু সাংবাদিক সাহেব, মানুষ যে ক্রমশ…..।’ গ্রাস গল্পটা লেখা হয়েছে প্রায় চার দশক আগে, অথচ সময় অতিক্রমের সাথে সাথে গল্পটা যেন আরো প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে, লেখকের চৈতন্য বোধের প্রখরতা কিংবা সমকালের নিরিখে সমাজ বিশ্লে­ষণের ক্ষমতা ছাড়া এমন কালোত্তীর্ণ গল্প লেখা সহজ কর্ম নয়। আমরা গ্রাস গল্পের ঠিক বিপরীত গল্প হিসেবে বলতে পারি খননকারী গল্পটার কথা, গ্রাস গল্পে আমরা দেখেছি একজন রক্তমাংসের মানুষের যান্ত্রিক মানুষ হয়ে উঠা আর খননকারী গল্পে দেখছি একজন যান্ত্রিক মনোবৃত্তির মানুষের ভিতর লুকায়িত মানবিক বোধের প্রকাশ। রহমত শেখের মতো একজন গোরখোদক যে টাকার বিনিময় কবর খোঁড়ে, নিরাসক্ত অনুভূতিহীন এই লোক নিজেই যেন এক জীবন্ত লাশ। কবরখোঁড়ার কাজ না থাকলে নিজে নিজে ঘুরে বেড়ানো ছাড়া জাগতিক কোন বিষয় নিয়েই রহমত শেখের কোন আগ্রহ নেই। তার একমাত্র ছেলের অসুখ করেছে, ছেলের জন্য ঔষধ আনতে সে শহরে যেতে চায় না। অবশেষে স্ত্রীর পিড়াপিড়িতে যেতে হয়। শহরে গিয়ে এক ভয়ানক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়। এক দুর্ঘটনায় একজন মানুষ পতিত হলো, রহমত শেখ তার লাশ ছোয়ার অভ্যস্ত হাতে বুঝতে পারে লোকটা এখনো বেঁচে আছে, রহমত শেখ চেঁচিয়ে উঠে, ‘মরে নাই, এই লোক মরে নাই।’ চারপাশ থেকে কেউ আর এগিয়ে আসে না। তারা দূর থেকে এক পলক দেখে নিজের মতো হেঁটে যায়। আমরা দেখলাম, মৃত মানুষের জন্য কেঁদে যে লোকগুলো বুক ভাসায় তাদের জীবিত মানুষের জন্য কোন অনুভূতি নাই। অন্যদিকে একজন মৃত্যুপথযাত্রিকে বাঁচানোর কী এক অনুভূতি রহমত শেখের। আমরা সাবেরের উচ্চতর সমাজনিরীক্ষা, মনোবিশ্লেষণের ক্ষমতার প্রমাণ পাই মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে নিয়ে লেখা গল্পগুলোতে। তার মুখোশ, বৃত্ত কিংবা জীবনযাপনের মতো গল্পগুলোতে যেভাবে মধ্যবিত্তশ্রেণীর অন্তঃসারশূন্য জীবন, জীবনের নিরর্থকতা আর গতানুগতিকতার বিষয়গুলো ফুটে উঠেছে এতে আমরা স্পষ্টভাবে বলতে পারি মানিকউত্তর ছোটগল্পে মধ্যবিত্তের জীবনবোধকে তার মতো করে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছে খুব কম গল্পকারই। একত্রে তিনি একাধারে নিরাসক্ত নির্দয় নির্মোহ। কখনো কখনো রীতিমতো জীবনবোধের এই অন্তঃসারশূন্যতাকে চ্যাঙদোলা করে ছেড়েছেন, আমরা গল্পগুলোর দিকে দৃষ্টি দিলেই সেটা বুঝতে পারবো। ধরা যাক মুখোশ গল্পটার কথা, সাংবাদিকঅধ্যপকের মতো মধ্যবিত্তের প্রতিনিধিত্বকারী কিছু বন্ধু যারা একসঙ্গে মেলায় গেছে, তাদের মধ্যে মাহাবুব নামের একজন মেলা থেকে কিছু মুখোশ কিনে সেই মুখোশ পরে ক্রমশ নিজেকে নানা ব্যক্তিত্বে উপস্থাপন করছে, মুখোশের ভিতর দিয়ে যেন মধ্যবিত্তের প্রতিমুহূর্তের রংবদলের খেলাটাই ফুটে উঠছে। বৃত্ত গল্পে আমরা দেখছি ফিরোজা, আলম আর তাদের দুই সন্তান নোটন টোটন নিয়ে ছাপোষা একটা মধ্যবিত্তের সাংসারিক জীবন, খুব গতানুগতিক জীবনের একটা চিত্র হলেও একটা শাড়িকে কেন্দ্র করে গতানুগতিকতার মোড় পাল্টে যাচ্ছে। ফিরোজার শাড়ি কেনাকে কেন্দ্র করে ঝগড়া। সেই ঝগড়ার কারণে ফিরোজার প্রতি মনোযোগ এবং দীর্ঘদিন পর তাকে নিয়ে ঘুরতে রের হওয়া। স্ত্রী ফিরোজাকে মোটরসাইকেলে বসিয়ে আলম যত দূরেই পাড়ি দেয় কিন্তু শেষ পর্যন্ত এসে হাজির হয় সেই প্রতিদিনের পরিচিত স্থানে। তারা যেন সেই পরিচিত বৃত্ত থেকে বেরুতে পারছে না। ফিরোজা আলমের এই পরিচিত বৃত্তের মধ্যে আটকে থাকা যেন সমস্ত মধ্যবিত্তের জীবনের বৃত্তায়নকেই চিহ্নিত করছে। জীবনযাপন গল্পটা আরেকধাপ এগিয়ে মধ্যবিত্তের আত্মমৈথুনকে রীতিমতো চ্যাঙদোলা করে ছেড়ে দিলেন, ইসমাইলের অবেলা অফিস ফেরত, তার অফিসের সামনে ধ্বসে পড়া বিল্ডিংএ মৃত্য’র সংখ্যা নিয়ে স্বামী স্ত্রীর কৌতূহলের মধ্যদিয়ে মধ্যবিত্তের আত্মমৈথুনের পাশাপাশি এই শ্রেণীর সমাজ বিচ্ছিন্নতাবোধও প্রবলভাবে ধরা পড়ে। মধ্যবিত্তের জীবনকে কত আঙ্গিক থেকে দেখা যায় এবং কত রকমভাবে বিশ্লেষণ করা যায় তার এক অনন্য উদাহরণ হতে পারে সাবেরের ছোট গল্প। শুধুমাত্র আত্মমৈথুন নয় পলায়নপ্রবনতা অর্থনৈতিক টানাপোড়ন হীনমন্যতাসহ নানা আঙ্গিকে উঠে এসেছে তাঁর গল্পে। আমরা তার আশ্চর্য প্রীদপ গল্পে দেখছি একটি প্রদীপকে কেন্দ্র করে স্বামীস্ত্রীর উচ্চবিলাসি আকাক্সক্ষা আর নিমিষে তা ছুঁড়ে ফেলার দৃশ্য। গল্পটা শুরু হয়েছে এই ভাবে: মলি ফেরিঅলার কাছ থেকে পাঁচ টাকা দিয়ে একটা প্রদীপ কিনেছে, আশ্চর্য প্রদীপ। সেই প্রদীপকে স্বামী জামাল আর স্ত্রী মিলি আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ বানিয়ে একের পর এক অবদমিত আকাক্সক্ষার প্রকাশ। চাহিদার ফর্দ করতে করতে স্বামীস্ত্রী দু’জনই ক্লান্ত হয়ে পড়ে। ক্লান্ত শরীর নিয়ে দু’জনই শুতে যায়। বাকী ফর্দ সকালে করবে বলে। ক্ষাণিক পর স্বামী জামাল প্রদীপটা ছুঁড়ে ফেলে দেয় ঘরের বাইরে। এ তো আদপে প্রদীপ ছুঁড়ে ফেলা নয় মধ্যবিত্তের জীবনে প্রতিমুহূর্তে জন্মনেয়া আকাক্সক্ষা এবং বাস্তবতার নিরিখে তা বর্জন করার চিত্রটাই যে উঠে এসেছে এই গল্পে। তার স্বপ্ন গল্পেটা একই বিষয় নিয়ে ভিন্নভাবে বিন্যস্ত, এই গল্পে আমরা দেখছি এক মধ্যবিত্ত তরুণ আফিস থেকে বেরিয়ে মেসে ফেরার পথে রাস্তা থেকে পাওয়া বিদেশি কাপড়ের লালছে রঙের ব্লাউজ নিয়ে কেমন স্বপ্নবিভোর হয়ে উঠলো। তরুণ যে মেসে থাকে তার পাশে থাকে কোন বিত্তশালী পরিবারের তিন তরুণী। তরুণের কল্পনায় এই ব্লাউজ তাদের কারো এক জনের। এই ব্লাউজ নিয়ে তরুণের মেসে ফিরে আসা, রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে একেরপর এক কল্পনার জাল বিস্তার অতপর ব্লাউজটা ছুড়ে ফেলা। আশ্চর্য প্রদীপ এবং তার স্বপ্ন দুইটা গল্পই মূলটা একটা গল্পের বিষয়কে দুই ভাবে বিন্যাস করা। দুইটা গল্প পাশাপাশি রেখে পাঠ করলে পাঠক হিসেবে আমাদের মনে হতে পারে গল্পকার বোধ করি রিপিটিসন থেকে বেরুতে পারছেন না। তাই একই বিষয়কে ভিন্ন আঙ্গিক থেকে বারবার ঘুরেফিরে দেখাচ্ছেন। এই অভিযোগ শুধু এই দুই গল্পের ব্যাপারে নয়, আমরা জীবনযাপন এবং পুলিশ আসবে গল্পের ব্যাপারেও আনতে পারি। জীবনযাপন গল্পের মতই পুলিশ আসবে গল্পেও একই রকম অফিস ফেরত, একইরকমভাবে মৃত্যু নিয়ে স্বামী স্ত্রীর আলাপ চারিতা; যে আলোচনাগুলোতে মৃত্যু নিয়ে মানবিক বোধের বদলে মৃত্যুর সংখ্যা অথবা ধরণটাই মূখ্য হয়ে উঠে। মধ্যবিত্তের জীবন কী এমনই মানবিক বোধ বির্বজিত, শুধুই আত্মমৈথুন? সাবের যদি তাই ভাবেন, তবে তিনি একপেশে দৃষ্টির দায়ে দুষ্ট হয়ে পড়বেন। কিন্তু সামগ্রিক সাবেররের ছোট গল্প পাঠ করে তাঁর বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ করার কোন সুযোগ আমাদের নেই। আমরা ভিড়ের মানুষ গল্পে দেখছি, মধ্যবিত্তের জেগে উঠার সম্ভবনা। রাস্তায় দুইদলের মরামারি; কৌতূহলি মানুষের ভিড়, সেই ভিড়ে মধ্যবিত্ত তার স্বভাবসুলভ আলাপচারিতায় বেরিয়ে আসা আক্ষেপগুলো এবং শেষপর্যন্ত লড়াইয়ের অপরিহার্যতা সংলাপে আমাদের জানান দেয় লেখব কত আঙ্গিক থেকে মধ্যবিত্তশ্রেণীকে দেখতে পারেন। তদুপি যে কথাটা না বললেই নয়, তা হলো সাহিত্য আদপে কোন শ্রেণীকে বিষয় নির্ধারণ করে রচিত হয়েছে তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সেই শ্রেণীর সংকট কিংবা সম্ভবনাগুলোকে কতটা প্রকাশ করতে পেরেছে, সাবের তার ছোট গল্পের মধ্যদিয়ে এই কাজটা বেশ দক্ষতার সাথেই করতে পেরেছে। মধ্যবিত্তের এই গল্পসমুহে গল্পকারকে আমরা কখনো মনঃসমীক্ষক কখনো বা সমাজবিশ্লেষক হিসেবে খুঁজে পাই, এই ক্ষেত্রে আমরা যে দুইটা গল্পকে উদাহরণ হিসেবে আনতে পারি, স্থির চিত্র ও একটি হাউই ‘অপেক্ষা’, স্থির চিত্র ও একটি হাউই মধ্যবিত্তের হীনমন্যতার অসাধারণ প্রকাশ। রঞ্জু গ্রামের স্কুলে মাস্টারি করেন, ছাপোষা মধ্যবিত্ত বলতে যা বুঝায় আমরা রঞ্জকে ঠিক সেভাবেই দেখছি। টুকটাক কবিতা লেখেন, এক সময় বামরাজনীতি সাথে যুক্ত ছিলেন। তার স্কুল জীবনের বন্ধু বাবু বুর্জোয়া পরিবারের সন্তান। দীর্ঘদিন ধরে দুই বন্ধু বিচ্ছিন্ন, কিন্তু পত্রযোগাযোগ আছে। পত্র মারফতে রঞ্জু জানতে পারলো বাবু বিদেশ যাচ্ছে, বিদেশ যাত্রা উপলক্ষ্যে বাবুর আয়োজিত পার্টির আমন্ত্রিত অতিথি রঞ্জু। এখানে দেখলাম, কোটিপতি বন্ধুর পার্টিতে যোগ দেওয়া এক মধ্যবিত্ত তরুণের নিজের অস্তিত্ব নিয়ে অস্থিরতা প্রকাশ। এই গল্পে তার চেয়েও একটা বড় দিক হলো, রমিজ চরিত্রটা। যে চরিত্রের ভিতর দিয়ে আমরা দেখছি একটা গল্পের মধ্যদিয়ে দুইটা গল্পের সমান্তরাল বিকাশ। রমিজ বাবুদের কেরানি। ছোটবেলায় রঞ্জু যখন বাবুদের বাড়িতে নিয়মিত যাতায়াত করতো তখন এই রমিজ কাকুকে নিয়ে তার অনেক স্মৃতি। সেই স্মৃতিকাতরতাই বাবুদের বাড়িতে এসে কেরানি রমিজ কাকুর সাথে রঞ্জুর দেখা করতে যাওয়া। কিন্তু রমিজ কাকু নিশ্চিত হয়ে যার সাথে দেখা করতে গেল, সে আসলে রমিজ কাকুর ছেলে, রমিজ কাকুর ছয় মাস আগে মৃত্যু হয়েছে। গল্পের একেবারে শেষ স্তবকে এসে আমরা দেখছি, অস্থির রঞ্জু অস্বস্তি থেকে বাঁচার জন্য নিচে নেমে যায় রমিজ কাকুর ছেলের সাথে কথা বলার মনস্তাপে, কিন্তু কথা বলতে গিয়ে দেখে, তো রমিজ কাকুর ছেলে নয়, অল্প বয়সি একটা ছেলে। কথা বলে জানতে পারে এই রমিজ কাকুর ছেলের ছেলে, রমিজ কাকুর নাতি। রমিজ কাকুর ছেলের ডানদিকটা অবশ হয়ে গেছে তাই চাকরিটা কলেজ পড়–য়া ছেলেটার ভাগ্যে জুটলো। গল্পের শুরুতে আমরা দেখলাম রঞ্জু এসে দেখছে বাবুদের দোতলা বাড়ি তিনতলা হয়েছে আর গল্পের শেষে দেখছি, রমিজ কাকুর তৃতীয় প্রজন্ম এসে বাবুদের কেরানি গিরিতে যুক্ত হয়েছে। সমাজবাস্তবতাকে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া বলতে যা বুঝায়, মধ্যবিত্তের অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের আরেকটা মহাকাব্যিক গল্প অপেক্ষা, হাসান নামক এক স্বল্পবেতনভোগী অফিস কর্মচারির গল্প, যে তার বসের কাছে আকুতিমিনতি করছে একটা এড্যবাস নেওয়ার জন্য। কারণ গেল মাসের বেতনের ছয়শ টাকা বাড়ি ফেরার সময় পকেট মারে নিয়ে গেছে। এই ছয়শ টাকা ছাড়া চলার আর কোন সঙ্গতি নেই। আ্যডভান্স হলো না কারণ, হাসান অফিস থেকে আগে যে আ্যডভান্স নিয়ে রেখেছে তার পুরো টাকা এখনো শোধ হয়নি। বন্ধুদের কাছে ধার চাইলো কিন্তু সেখানেও ব্যর্থ, হাসান উদ্ভ্রান্তের মতো রাস্তায় হাঁটে, ঠিক বুঝতে পারে না টাকা ছাড়া মাসটা কী ভাবে পার করবে। সিদ্ধান্ত নিতে পারে না ঘরে যাবে কীনা। কিংবা একটু দেরি করে ঘরে ফেরার জন্য লম্বা পথটাই বেছে নেয় হাসান। হাসান রাস্তায় হাঁটে আর ভাবে যদি রাস্তায় কুড়িয়ে কিছু পায়। না ভাগ্যবিধাতা তার প্রতি সুপ্রসন্ন হয় না। কিন্তু মুখোমুখি হয় অন্য এক অভিজ্ঞতার। …‘হাত দশেক দূরেই একটা রিকশার পথ রোধ করে দাঁড়িয়েছে একটা গাড়ি……। স নিচু হয়ে আস্ত একটা ইট তুলে নেয়। লক্ষ্য স্থির করে, তারপর অন্ধকারে দাঁড়িয়ে সেটা ছুঁড়ে মারে। ইটটা গিয়ে পড়ে কাঁচের উপর।’ এইভাবে এক দম্পতিকে ছিনতাইকারির হাত থেকে উদ্ধার করার শিহরিত বর্ণনা। ছিনতাইকারির হাত থেকে অনেকগুলো স্বর্ণালঙ্কার, নগদ টাকা আর স্ত্রীকে রক্ষা করতে পেরে, পাঁচশ টাকা দিয়েছে হাসানের হাতে। হাসান সেই টাকা নেয়নি। এতক্ষণ এই পরিমাণ টাকার জন্যই উদ্ভ্রান্তের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছে হাসান। কিন্তু টাকাটা হাতের কাছে পেয়েও নিল না। এটাই হচ্ছে মধ্যবিত্তের আত্মমর্যাদা বোধ। ভাঙবে কিন্তু মচকাবে না। সেই হাসান বাড়ি ফিরে গিয়ে দেখে তার মেয়ে শয্যাশায়ী, এবং স্ত্রীর আকুতিকিছু একটা কর।….হাসান কয়েক মিনিট নিশ্চল দাঁড়িয়ে থেকে দ্রুত বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে গেল। তারপর উদ্ভ্রান্তের মতো দ্রুত পায়ে হেঁটে সেই স্থানে এসে পৌঁছালো যেখান থেকে সেই এক দম্পতিকে ছিনতাইকারির কবল থেকে উদ্ধার করেছিল। তারপর অপেক্ষা। পায়ের কাছে ইট জড়ো করে গাছে হেলান দিয়ে নিশ্চল দাঁড়িয়ে থাকে। গল্পটাতে সাবের মধ্যবৃত্তের টানাপোড়েন আর আত্মমর্যাদা বোধের এক দারুণ সমন্বয় সাধন করেছেন। এই অপেক্ষা গল্পটা বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গল্প হয়ে উঠার দাবি রাখে। তবে গল্পের শেষ লেজটুকু নিয়ে একটু কথা থাকতে পারে। মেয়ের অসুস্থতা দেখে পিতা হিসেবে হাসানের উদ্ভ্রান্ত হয়ে এইভাবে রাস্তায় বেরিয়ে আসাটা আমাদের কাছে স্বাভাবিক বলে মনে হয়, কিন্তু উন্মাদের মতো আবার রাস্তা থেকে ইট জড়ো করা! এখানে হাসানকে লেখকের ভাড়াখাটা চরিত্র বলে মনে হচ্ছে। আমরা এবার লেখকের মুক্তিযুদ্ধকে উপজীব্য করে লেখা দুইটি গল্প নিয়ে কথা বলতে পারি, একটা কবেজ লেঠেল, এক ভাড়াখাটা খুনি লেঠেলের মুক্তিযোদ্ধা হয়ে ওঠার গল্প, আরেকটা ভুল বিকাশ, যেখানে আমরা দেখছি স্বাধীনতাউত্তর বাংলাদেশের সমাজচিত্র কিংবা এক মুক্তিযোদ্ধা তরুণের স্বপ্নভঙ্গের বেদনা। কবেজ লেঠেল গল্পটাতে আমরা দেখছি, আকমল প্রধান আর রমজান শেখ বলে দুই গ্রামীণ জোতদারের দ্বন্দ্ব মুক্তিযুদ্ধে দুইজনই পাকিস্তানি আর্মির সহযোগী। আকমল প্রধানকে পেছনে ফেলে পাকিস্তানিদের সহযোগিতায় রমজান শেখ এগিয়ে যাচ্ছে দেখে আকমল প্রধান পরশ্রীকাতরতা ভুগছে। যে কোন মূল্যে রমজান শেখকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিতে চায়। এই যুদ্ধের ডামাঢোলে হত্যা করা হলে, দায়টা মুক্তিবাহিনির উপরেই বর্তাবে। প্রস্তাবটা দিয়ে রেখেছে কবেজ লেঠেলের কাছে। জমি আর নগদ টাকার বিনিময়ে রমজান শেখকে হত্যা করার জন্য। কবেজ লেঠেলের জবাব, ভেবে দেখি, এদিকে অস্থির রমজান শেখ। হ্যাঁ, ঠিকই একদিন রমজান শেখকে খুন করে কবেজ লেঠেল আসে আকমল প্রধানের কাছে, ‘প্রধান আনন্দে লাফায় প্রায়, – কী নিবি তুই কবেজ, ট্যাকা এহনই দেই, জমি লেখ্যা দেই?’

হাঁটু ভেঙ্গে মাটিতে বসে কবেজ। একটা বিড়ি বের করে ধরায়। আকমল প্রধানের দিকে ঘোরলাগা চোখে তাকায়। তারপর নির্লিপ্ত এবং শীতল গলায় বলে কী দিবা তুমি? আমি তো হেরে টাকা বা জমির লাইগ্যা খুন করি নাই।’ কবেজ লেঠেলের ছোট্ট একটা বাক্য পাঠককে প্রচণ্ড ধাক্কা দেয়। আমরা দেখি কবেজ লেঠেলের মতো অশিক্ষিত বাড়াখাটা খুনির চেতনাতেও কী সুক্ষভাবে মুক্তির চেতনা বিকশিত হয়। ঠিক এই গল্পের বিপরীত গল্পটা হচ্ছে ভুল বিকাশ মুক্তিযুদ্ধের বিকাশ কবেজ লেঠেলদের মতো খুনিদের যেমন বিপ্লবী হয়ে উঠতে দেখছি ঠিক তেমনে দেখছি যুদ্ধ শেষ হতে না হতেই সমাজবাস্তবতা গ্রামের সহজ সরল সাধারণ মানুষকে কেমন হিংস্র বানিয়েছে। একজন পাঠক হিসেবে কিংবা একজন আলোচক হিসেবে আমি দাবি করতে পারি আমাদের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কিংবা যুদ্ধপরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে লেখা এই দুইটা গল্প বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ গল্পের দাবিদার। সময়কে শিল্পের ফ্রেমে বন্দি করা কিংবা মধ্যবিত্তের মনোচৈতন্যের বিশ্লেষণের ক্ষমতাই মঈনুল আহসান সাবেরকে বাংলা গল্প সাহিত্যে অমরত্ব দান করবে।।

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s