লিখেছেন: জাহেদ সরওয়ার

sundarbansবাংলাদেশে সম্প্রতি দুইটা কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প হওয়ার জন্য সরকারি প্রতিষ্ঠান ‘বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড’ ও ভারতীয় প্রতিষ্ঠান ‘ন্যাশনাল থারমাল পাওয়ার করপোরেশন’ (এনটিপিসি), ও জাপানি বহুজাতিক জাইকা যৌথভাবে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। একটা বাঘেরহাট জেলা তথা সুন্দরবনের রামপাল এলাকায়। এটা করছে ভারতের এনটিপিসি কোম্পানি। অন্যটা করা হচ্ছে কক্সবাজার জেলার মহেশখালির মাতারবাড়ি ইউনিয়নে। এটা করছে জাপানি বহুজাতিক কোম্পানি জাইকা। আপাতচোখে দেশে কোনো একটা প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে মনে হয় দেশের উন্নতি হচ্ছে। কিন্তু এই উন্নয়নের পেছনের লাভলোকসানও খতিয়ে দেখা উচিত। বিশেষ করে যেখানে কয়লা বিদ্যুৎ পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর হওয়ায় গত একশ বছর ধরে উন্নত দেশগুলাতে এটা প্রায় বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। রাশিয়াতে লেলিনের শাসনামলেই বন্ধ করে দেয়া হয়েছে এই ক্ষতিকর বিদ্যুৎ প্রকল্প। এই কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প মারাত্মক পরিবেশ দূষন ও নানারকম প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটায় বলে বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশসমূহেও জনবসতি অথবা সংরক্ষিত বনভূমির কমপক্ষে ১৫২০ কিলোমিটারের মধ্যে অনুমোদন করে না। অথচ রামপালে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি জনবসতি থেকে মাত্র ৯ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। আর মহেশখালীরটাতো জনবসতির প্রায় ১কিলোমিটারের মধ্যেই। এমনকি যেই ভারতীয় কোম্পানি রামপালে বিদ্যুৎকেন্দ্র করছে সেই এনটিপিসি ভারতের মধ্যপ্রদেশ ও তামিলনাডুতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের আবেদন করলে ১৯৭২ সালের ভারত বন্যপ্রাণি সংরক্ষণ আইনের দোহাই দিয়ে তা বাতিল করে দেয়। এছাড়াও ২০১০ সালের আগস্টে ভারত সরকারের তৈরি করা ইআইএ (এনভায়রনমেন্ট ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট) গাইডলাইন অনুসারে ২৫ কিলোমিটারের ভেতর কোনো কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা যাবে না। সেখানে ভারতীয় সহ বহুজাতিক কোম্পানিগুলা বাংলাদেশে এই কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প কেন করতে চাচ্ছে আর বাংলাদেশের বুর্জোয়া সরকার তা কেন করতে দিচ্ছে তা ভেবে দেখা জরুরি।

একেকটা কয়লা বিদুৎকেন্দ্র প্রতিদিন যা করা হয় তার হদিস নিলেই মিলে যাবে হিসাব। প্রতিদিন টনটন বিষাক্ত সালফার আর নাইট্রোজেন ডাইঅক্সাইড ফেলা হবে পাশের নদীতে, যে জন্য কয়লা বিদ্যুতের স্থান শনাক্তের সময় নদী থাকাটা জরুরী। টনটন বিষাক্ত সালফারযুক্ত ছাই দূষিত করবে ভূউপরিস্থিত পরিবেশ। বাতাসে এই ছাই মিশে গাছপালা ও প্রাণিদের জীবন যাপনকে করে তুলবে বিপন্ন। বিদ্যুৎকেন্দ্রের চিমনী থেকে ১২৫ ডিগ্রি তাপমাত্রার ধোয়া নির্গমণ হবে। ফলে এলাকার তাপমাত্রা বেড়ে যাবে স্বাভাবিকের তুলনায় বহুগুন। লাখ লাখ টন আমদানিকৃত কয়লা জাহাজে, ট্রলারে বহন করা হবে নদী বা স্থলপথে। কয়লার ভাঙ্গা টুকরো, জাহাজের তেল এইসব এলাকার প্রাকৃতিক পরিবেশকে বিনষ্ট করবে। প্রতিদিন শত শত গভীর নলকূপের মাধ্যমে শত শত কিউসেক ভূগর্ভস্থ মিঠাপানি উত্তোলন করা হবে। এতে অত্র এলাকার ভূগর্ভস্থ মিঠাপানির আধার নিশ্বেষ হয়ে যাবে। সুন্দরবনের কাছে যেমন রয়েছে পশুর নদী তেমনি মাতারবাড়ির পাশের খাল যুক্ত হয়েছে বঙ্গোপসাগরে। অতিমাত্রায় সালফারের কারণে এসব নদীতে নিশ্বেস হবে মৎস্যসম্পদ। বিদ্যুৎকেন্দ্রের আশেপাশের জমিতে উৎপাদিত ফসল, শাকসবজি খেলে মানবদেহে ছড়িয়ে পড়বে অ্যাজমা, ফুসফুসবাহিত নানা রোগ এমনকি মহামারি আকারে দেখা দিতে পারে ক্যান্সার।

রামপালে ১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে গেলে প্রতিদিন প্রায় ১৪২ টন বিষাক্ত সালফার ও ৮৫ টন নাইট্রোজেন ডাই অক্সাইড ফেলা হবে পশুর নদীতে। এই নদীটি সুন্দরবনের মধ্যদিয়ে প্রবাহিত হয়ছে। ফলশ্রুতিতে নদীটি ধ্বংশ হয়ে যাবে। হাজার হাজার টন ভস্মিভূত কয়লার ছাই মিশে গাছপালা এবং প্রাণিদের জীবন যাপনকে বিপর্যস্ত করে তুলবে। বিদ্যুৎ কেন্দ্রের চিমনি থেকে ১২৫ ডিগ্রি তাপমাত্রার ধোয়া নির্গমন হবে। ফলে ঐ এলাকার তাপমাত্রা বেড়ে যাবে স্বাভাবিকের তুলনায় বহুগুন। বছরে ৫০ লাখ টন আমদানিকৃত কয়লা জাহাজে বহন হবে সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত নদী পথে। কয়লার ভাঙা টুকরা, জাহাজের তেল সুন্দরবনের ইকো সিস্টেম সম্পূর্ণ ভেঙ্গে ফেলবে। পরিবেশ অধিদপ্তরের ভয়ভীতি দেখিয়ে প্রয়োজনের দ্বিগুণের চেয়ে বেশী অর্থাৎ ১৮৪৭ একর জমির অধিগ্রহণ করা হয়েছে। প্রতিদিন ৭২টি গভীর নলকূপের মাধ্যমে ১৪৪ কিউসেক ভূগর্ভস্থ মিঠাপানি উত্তোলন করা হবে তাপবিদ্যুতের জন্য। ভূগর্ভস্থ মিঠাপানির আধার নিশ্বেষ হবে অদিদ্রুত। দেবে যাবে ঘরবাড়িসহ আশপাশের স্থাপনা। ৮ হাজার পরিবার তার জমি থেকে উচ্ছেদ হবে এই প্রকল্প বাস্তাবায়ন হলে। করমুক্ত সুবিধাসহ ভারত মাত্র ১৫% বিনিয়োগ করে বিদ্যুতের মালিকানা পাবে ৫০%। বিদেশী ৭০ ভাগ ঋণের সুদসহ ঋণ পরিশোধের দায় থাকবে বাংলাদেশের। দেশীয় কোম্পানির চেয়ে এই প্রকল্পের বিদ্যুতের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে দ্বিগুন অর্থাৎ ৮ টাকা ৮০ পয়সা। রামপাল প্রকল্পে লাভ হবে ভারতীয় পক্ষের আর তার সাথে দেশি দখলদার ও কমিশনভোগীদের। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষতি সর্বব্যাপী। সুন্দরবন ধ্বংশ হওয়া ছাড়াও প্রত্যক্ষ আর্থিক ক্ষতি হবে বাংলাদেশের। তুলনামূলকভাবে বিদ্যুতের অতিরিক্ত দামের জন্য আর্থিক ক্ষতি হবে ১লক্ষ ৪০ হাজার কোটি টাকা। এর সাথে প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত সম্ভাব্য ক্ষতি যোগ করলে মোট ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াবে ৫ লক্ষ ৪০ হাজার কোটি টাকা।

এছাড়া সুন্দরবন ধ্বংস, ভয়াবহ পরিবেশ দূষণের মাধ্যমে খুলনা শহরসহ এই বিভাগের মানুষ ও বন্য প্রাণির জীবন জীবিকা খাদ্য ইত্যাদিও ভয়াবহ ক্ষতি টাকার অংকে নিরুপণ করা অসম্ভব। সুন্দরবনের কারণে রামপালের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র মিডিয়ায় প্রচার পেলেও মহেশখালী বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়ে তেমন কোন কথাবার্তা শোনা যাচ্ছে না। মিডিয়ার নজরেও পড়ে নাই আবার যারা এটা নিয়ে আন্দোলন সংগ্রাম করছেন তারাও জানেন বলে মনে হয় না। মহেশখালীর কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতকেন্দ্রে ১২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে স্থাপিত হবে। যে স্থানে এই কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপিত হবার কথা তাতে লবন ও চিংড়ী চাষ করে স্থানীয় দুই ইউনিয়নের দেড়লাখ মানুষ জীবন নির্বাহ করে। শুধু যে তারা জীবিকাহীন হবে তাই না কয়লা বিদ্যুতের প্রভাবে এই দেড়লাখ মানুষ উদ্বাস্তু হবে। শুধুকি এরাই ধীরে ধীরে পুরা মহেশখালীটাই মরুভূমি হবার আশংকা দেখা দেবে।

বাংলাদেশের একমাত্র কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র বড়পুকুরিয়ার মাত্র ২৫০ মেগাওয়াট পাওয়ার প্ল্যান্ট। বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু হওয়ার পর থেকেই নানান ধরনের সমস্যা দেখা দিয়েছে সেখানে। স্থানীয়দের অভিযোগের শেষ নাই। তারা বারবার এসব সমস্যার সমাধানে কেন্দ্রটি ঘেরাও করছে। প্রধানতম সমস্যা হচ্ছে পানি সমস্যা। বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রয়োজনে ভূগর্ভস্থ পানি টেনে নেবার কারণে এলাকাবাসী চাষাবাদ ও দৈনন্দিন কাজে ব্যবহারের পানি পাচ্ছেন না। গ্রামবাসীর অভিযোগ বিদ্যুৎ কেন্দ্র সংলগ্ন ১৪ টি পাম্পের কারণে দুধিপুর, তেলিপাড়া, ইছবপুরসহ আশপাশের গ্রামে পানির তীব্র অভাব দেখা দিয়েছে। দ্বিতীয় সমস্যা হচ্ছে ছাই। মাত্র ২৫০ মেগাওয়াটের এই কেন্দ্রটি চালু রাখতে প্রতিদিন কয়লা জ্বালাতে হয় ২হাজার ৪০০টন। এতে ছাই হয় প্রতিদিন ৩০০ মেট্রিকটন। পুরা এলাকা ছেয়ে যাচ্ছে। একাধিক পুকুরে প্রতিদিন এই ছাই জমা হচ্ছে। ইতমধ্যে এই পুকুরগুলার চারভাগের তিনভাগের বেশি ছাইয়ে ভরাট হয়ে গেছে। ফলে পুকুরের পানিও শুকিয়ে গেছে। শুধু তাই না এই ছাইমিশ্রিত পানি ছুইয়ে মাটির নীচে ও আশপাশের জলাভূমিতে গড়িয়ে যাচ্ছে। বড় পুকুরিয়া কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের আশেপাশে গেলেই দেখা যায় কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের নালা বেয়ে কয়লা ধোয়া কালো পানির স্রোতে মিশে যাচ্ছে আশপাশের কৃষিজমিতে। ফলে আশপাশের কৃষিজমিগুলোর রঙ এখন নিকষকালো। এই যদি বড়পুকুরিয়ার মাত্র ২৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিবেশ দূষণের আংশিক চিত্র হয় তাহলে ১৩২০ মেগাওয়াটের রামপাল ও ১২০০ মেগাওয়াটের মহেশখালী কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিবেশের, জনবসতি ও কৃষিজমির কি হাল হবে তা অনুমান করা খুব কঠিন নয়।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট নিরসনের নামে দেশী বিদেশী লুটেরা গোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষা করতে গিয়ে সরকার বারবার দেশের জন্য সর্বনাশা পথ গ্রহণ করছে। সুন্দরবনকৃষিজমি শহর ধ্বংসকারী রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের সিদ্ধান্ত, মহেশখালীর মত দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ ধ্বংশ করার সিদ্ধান্ত, ফুলবাড়িবড়পুকুরিয়ার উন্মুক্ত খনির চক্রান্ত অব্যাহত রাখা, বঙ্গোপসাগরের গ্যাস ব্লক একতরফা সুবিধা দিয়ে বিদেশি কোম্পানির কাছে ইজারা দেয়া, কুইক রেন্টালের নামে ১৪ থেকে ১৭ টাকা কিংবা তারও বেশি দরে বিদ্যুৎ ক্রয়, কোন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি না করে, প্রয়োজনীয় সমীক্ষা না করে বিদেশি কোম্পানি নির্ভর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের উদ্যোগ ইত্যাদি সবকিছুর জনস্বার্থকে উপেক্ষা করে মুনাফা ও লুটপাটের আয়োজনের অংশমাত্র।।

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s