manipur-rape-protest-3মনিপুরের শান্তস্নিগ্ধ এক গ্রাম। বাড়ির দরজায় এক নারী বসে আছেন তার চারটি সন্তান আর এক ছোট নাতিকে নিয়ে। তাকে বা তার পেছনের লড়াইয়ের ইতিহাস না বলে দিলে জানা যাবে না যে এই নম্র, সুখী শান্ত মহিলাটিই মনিপুর রাজ্যে সরকারবিরোধী সবথেকে শক্তিশালী এক লড়াইয়ে শামিল হয়েছিলেন।

৬২ বছর বয়সের এই নারীর নাম ইমা নুঙবি বা নাঙঅবা। তিনি মনিপুরের এক সাহসী নারীর প্রতিরূপ। ২০০৪ সালে মনিপুরে আসাম রাইফেলস্ থাঙজাম মনোরমাকে ধর্ষণ ও হত্যা করে। তার বিরুদ্ধে নারীরা বিবস্ত্র হয়ে যে অভিনব প্রতিবাদ করেছিলো তিনি তাতে সম্মুখসারিতে অংশ নিয়েছিলেন।

শুধু এই জন্যই তার ইতিহাস গুরুত্বপূর্ণ নয়। তিনি মাত্র ৪০ টাকা/রূপী আয় করেও তার ৪ সন্তানের ভরনপোষনের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। এবং যা আয় করতেন তার এক অংশ তিনি সংগঠনের কাজে ব্যয় করেছিলেন। তার বান্ধবীরা তাকে মদ বিক্রি করে সংসার চালাতে বললে তিনি বলেছিলেন, তিনি বরং না খেয়ে মরবেন তবু্ও তিনি মদ চোলাই করবেন না।

টেহেলকা ডট কম ওয়েবসাইটের রেবতি রাউল (Revati Laul) তার একটি ইন্টারভিউ নিয়েছিলেন যা ইংরেজী ভাষায় প্রকাশ করা হয়। উক্ত ইন্টারভিউয়ের বাংলা অনুবাদ এখানে তুলে দেয়া হলো।।

অনুবাদ করেছেন: মিঠুন চাকমা

সহযোগিতায়: রীনা দেওয়ান

আমি শিশুকাল কাটিয়েছি নিশ্চিন্তে এবং খুবই সুখে। বেড়ে উঠেছিলাম মনিপুর রাজ্যের বিঞ্চুপুর জেলার ছোট একটি গ্রামে। ৬ ভাইবোনের মধ্যে আমি ছিলাম সবার ছোটো এবং ছিলাম সবার আদরের। শিশুকালে আমি খুবই চঞ্চল এবং দুরন্ত ছিলাম। ছেলেরা কেনোকিছু খেলার সময় আমার দুইভাই আমাকে তাদের সাথে অংশ নিতে দিতো না, বিশেষত তখন যখন তাদের আমি কিল দিতাম যে সময় তারা ভুল করতো বলে আমার মনে হতো।

তবে আমার মা ছিলেন সবসময় আমার পক্ষে। আমার মনেরাখার মতো ছোটোকালের স্মৃতি হচ্ছে, আমার বাবা আমাকে তার পিঠে তুলে নদীর ধারে হাঁটতে নিতেন। আমি তাঁকে খুবই ভালবাসতাম। তাঁর মৃত্যুর পরে অবস্থার পরিবর্তন হলো। আমার পরিবার আমাকে মাত্র দশম শ্রেণী পর্যন্ত স্কুলে পড়াতে পেরেছিলো। তবুও, জীবনের জন্য খুবই শক্ত ভিত গড়তে দেয়ার জন্য আমি পিতামাতাকে ধন্যবাদ দেবো।

আমার মা কোনোদিনই স্কুলে পড়েন নি। তবে তিনি ছিলেন খুবই দূরদৃষ্টিসম্পন্ন। তার মেয়ে সন্তানরা বড় হয়ে কিভাবে জীবন কাটাবে তা নিয়ে তিনি সবসময় চিন্তা করতেন। তাই তিনি আমাদের জন্য কিছু করেছিলেন যা সেই সময়ের জন্য এবং আমাদের সংস্কৃতির প্রেক্ষাপটে অস্বাভাবিক মনে হতো। তিনি আমার জন্য কিছু জমি এবং সেই জমিতে এক রুমের একটি বাড়ি বানিয়ে রেখে গিয়েছিলেন, সেই বাড়িতে আমি আজ বসবাস করছি।

১৯৭৪ সাল। আমি নিজে নিজে বুঝতে পারলাম আমার রাজ্যের নারীরা পুরুষদের চেয়ে কতোটা দুর্বল। এবং এই চিন্তা থেকেই আমি নারী সংগঠনে যোগদান করলাম। সেই সময়ে আমি একজনকে ভালোবাসলাম এবং বিয়ে করলাম। আমার স্বামী ছিলেন সঙ্গী হিসেবে অসাধারণ এবং আমার কাজে (সংগঠনের কাজঅনুবাদক) সহায়তা করতেন। কিন্তু শাশুড়ির তাতে অমত ছিলো। এবং তাই আমাকে কাজ বন্ধ করতে হলো।

যখন আমাদের চতুর্থ সন্তান আসলো, তখন হঠাৎ পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে গেল। আমার স্বামী তার জমানো সব টাকা পেট্রোল পাম্পের ব্যবসায় নিয়োগ করেছিলেন। কিন্তু একদিন আমাদের স্বপ্ন বিরুদ্ধ পক্ষের দ্বারা চুরমার হলো। তারা একদিন এসে আমার স্বামীকে এমন বেদম পেটালো যে সে চলতে ফিরতে অক্ষম হয়ে গেল। যখন সে হাসপাতালে ভর্তি হলো তখন আমার কাছে ছিলো মাত্র ৪০ টাকা (সম্ভবতঃ দৈনিক আয় ছিলো ৪০ টাকা/রূপীঅনুবাদক)। দিনগুলো তখন ছিলো খুবই কষ্টের। আমার স্বামী বাড়িতে অসাড় হয়ে পরে রইল। এবং এক দশক পরে মারা গেল।

আমার সন্তানদের আমি একা ফেলে যেতে না পারায় আমি কাজও করতে পারছিলাম না। তখন আমার বন্ধুরা অনেকেই আমাকে মদ চোলাই করে বিক্রি করতে পরামর্শ দেয়। আমি তাদের বললাম, তার চেয়ে আমার না খেয়ে থাকাই ভালো। এরপর আমি ডেইলী লেবার হিসেবে কাজ করতে শুরু করলাম। কাজটি ছিলো নদীর তীরের (ঘাটের) বালু পরিষ্কার করা। যে নদী দিয়ে শিশুকালে আমাকে আমার বাবা তার পিঠে করে ঘুরতে নিয়ে যেতেন এটিই ছিলো সেই নদীটি। আমি সেই স্মৃতি স্মরণ করতাম এবং তা আমাকে শক্তি এনে দিয়েছিলো।

কিন্তু আমার সংগঠন করার সুপ্ত ইচ্ছাকে আমি আর চাপা রাখতে পারলাম না। সে সময় সারা মনিপুরে মদ বা মাদক সেবন খু্বই ব্যাপক ছিলো। মাদকাসক্তদের সারিয়ে আনতে কয়েকজন মনিপুরী মা একটি সংগঠন করতে চেষ্টা করছিলেন। তারা আমাকে তাদের সংগঠনের সভাপতি করতে চেয়েছিলো। এরপর আমি যা আয় করতাম তা থেকে কিছু রূপী/টাকা বাঁচিয়ে তা আমার সংগঠনের কাজে ব্যয় করতাম। মাদকাসক্তদের সারিয়ে তোলার কাজটি এক পর্যায়ে “মেইরা পাইবী” আন্দোলনে রূপ নেয়। মেইরা পাইবী’র অর্থ হচ্ছে, প্রজ্জ্বলিত মশালবাহী নারী।

আমি সেই সংগঠনের বা আন্দোলনের অন্যতম কর্মী হয়ে উঠলাম। আমি প্রতিদিন ভোর ৪টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত আয়উপার্জনের জন্য শ্রম দিতাম। এরপরে সন্ধ্যা বা রাতে সংগঠনের কাজ করতাম। আমার সন্তানেরা আমার জন্য দরজা খোলা রেখে দিতো, যেন আমি সহজে বাড়িতে ঢুকতে পারি। একদিন যখন আমি সংগঠনের কাজে বাইর ছিলাম, তখন দরজায় কড়া নড়লো, সন্তানেরা আমি এসেছি মনে করে দরজা খুললো, এবং দেখলো আর্মিরা আমাকে খুঁজতে এসেছে।

১৯৯৬ অথবা ৯৭ সালের একটি দিনে আমি ইম্ফলে গেলাম। তখন একটি পাশবিক ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছিলো। এবং এর প্রতিবাদে নারী প্রতিবাদ সমাবেশের ডাক দেয়া হয়েছিলো।

মনিপুরে সংঘাতকালীন সময়ে যখন রহস্যজনকভাবে একের পর এক লোকজন নিখোঁজ হয়ে যাচ্ছিলো তখন আমি তার প্রতিবাদে শুরু হওয়া আন্দোলনে শরীক হলাম।

নিখিল মনিপুরী ছাত্র ইউনিয়ন (অল মনিপুরী স্টুডেন্টস ইউনিয়ন), সংগঠনটিকে তখন মনিপুরী প্রতিরোধকামীদের ফ্রন্ট অর্গানাইজেশন হিসেবে দেখা হতো। সরকার এই সংগঠনকে নিষিদ্ধ করে।সংগঠনের কয়েকজনকে আটক করে জেলে ঢোকানো হয় এবং তাদের অফিস পুড়িয়ে দেয়া হয়। আমি ঘোষনা দিলাম, ছাত্রনেতাদের ছেড়ে না দেয়া বা মুক্তি না দেয়া পর্যন্ত আমি অনশন পালন করবো। আমরা ৩০ জন অনশনে যোগ দিলাম। দুই সপ্তাহ পরে আমাদের গ্রেপ্তার করা হলো। এবং সেই প্রথম আমি জেলে গেলাম। তখন আমার সবচেয়ে ছোট মেয়েটি দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়তো। সে আমাকে দেখতে আসলো, এবং আমার সামনে শুয়ে পড়লো, প্রায় আধঘন্টা সে কাঁদলো এবং পরে ঘরে ফিরে গেল। আমি তাকে বললাম, কেঁদো না। সমাজের জন্য আমি যে কিছু করছি, তার জন্য গর্ববোধ করো। কিন্তু সে এত ছোটো ছিলো যে, তার তখন এসব বোঝারই বয়স হয়নি। সে চলে যাবার পরে আমি মুষড়ে পড়লাম এবং কাঁদতে শুরু করলাম।

আমাদের জানানো হলো, ছাত্রদের মুক্তি দেয়া হয়েছে। অন্যরা তাদের অনশন ও প্রতিবাদ বন্ধ করলো। কিন্তু আমি জেনেছিলাম, এখনো একজন ছাত্র জেলে আছে। এবং আটক ছাত্রটিকে মুক্তি না দেয়া পর্যন্ত আমি জেলে আরো একমাস থাকলাম।

সেই সময়েই আমার সন্তানদের দেখশোনা বা ভরণপোষণের জন্য আমার পরিবার দায়িত্ব নিলো। আমি যখন প্রথম জেলে গেলাম তখন সরকার রাজ্যে আফসপা (AFSPA) বা আর্মড ফোর্সেস স্পেশাল পাওয়ার এক্ট প্রবর্তন করলো। এই আইনের বলে আর্মিরা বা মিলিটারী কোনো অপরাধ করলেও তা থেকে তাদের সুরক্ষা বা প্রতিকারের বিধান ছিলো।

একদিন সরকারের বিরুদ্ধে সোচ্চার কথা বলার কারণে একটি সংবাদপত্রের একজন সম্পাদককে গ্রেপ্তার করা হয়। আমি এবং অন্য মায়েরা (মেইরা পাইবী আন্দোলনের নারীরা অনুবাদক) তার মুক্তির দাবি করলাম। আমাদের প্রতিবাদ সমাবশের উপর ১৪৪ ধারা জারি করা হলো। পুলিশ নির্মমভাবে প্রতিবাদকারীদের উপর হামলে পড়লো। অতিরিক্ত পেটানোর কারণে এক নারীর প্রচুর রক্তক্ষরণ হতে থাকলো। আমি হাতে এক টুকরো সাইকেলের রবার তুলে নিলাম এবং পুলিশকে পাল্টা মারলাম। তারা প্রতিশোধ পরায়ণ হয়ে আমায় তাড়া করলো। এক পুলিশের অফিসার আমাকে তার হাতের লাঠি দিয়ে ভয় দেখালো। সে যখন তা আমার সামনে ঘোরাচ্ছিলো তখন আমি তা ধরে ফেললাম এবং আমরা দুইজনেই মাটিতে পড়ে গেলাম। তিনি আমাকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিলেন। পুলিশ আমায় ধরে ফেললো। আমি আবার জেলে গেলাম।

এই সময়টাতে আমার ভাইয়েরা আমার সন্তানদের দেখভাল করলো। আমার সন্তানেরা আমার পরিবর্তে নদীর তীরের বালু পরিষ্কার করার দায়িত্ব নিলো। তারা সত্যিকারভাবেই আমার সাথে সাথেই লড়তে শুরু করলো।

ঠিক এমনই এক সময়ে ২০০৪ সালের ১১ জুলাইয়ে ৩২ বছর বয়সের এক নারী, নাম থাঙজাম মনোরমা, তাকে গভীর রাতে আসাম রাইফেলস বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গেল। তারা তাকে ধর্ষণ করলো, তার ভগাঙ্কুরে তারা বুলেট চার্জ করলো। আমাদের সহ্যশক্তির সীমার বাইরে ছিলো এটি।ওই সময়ে আমি খুবই কেঁদেছিলাম।

আমি ভাবলাম, মনোরমা না হয়ে আমার মেয়েরও তো এই ঘটনা ঘটতে পারতো। এবং যখন এক নারী সংগঠন প্রতিবাদ করার জন্য আমাকে ইম্ফলে যেতে বললো, আমি তাড়াতাড়ি একটি ট্যাক্সিক্যাব ভাড়া করলাম। কিন্তু ড্রাইভার শহরে প্রবেশ করতে পারলো না। আমি ট্যাক্সিক্যাব থেকে নেমে হাঁটা শুরু করলাম। পুলিশরা আমাকে চিনতো। তারা আমায় যেতে দিলো। যে স্থানে মনোরমা ধর্ষণের প্রতিবাদ হচ্ছিলো আমি সেখানে গেলাম। সেখানে গিয়ে আসাম রাইফেলসের সদর দপ্তরের কাংলা ফোর্টের সামনে আমি অন্য প্রতিবাদকারী নারীদের মতোই বিবস্ত্র হলাম এবং চিৎকার করে উঠলাম – “Indian Army, rape me! We are all Manorama’s mothers.” (ইন্ডিয়ান আর্মি, আমাকে ধর্ষণ কর। আমরা সবাই মনোরমার মা)। আমরা অনুভব করলাম, এটাই হচ্ছে যথার্থ প্রতিবাদের ধরণ।

মনোরমাকে ধর্ষণের যে লজ্জা তা পৌঁছে গেল সারা পৃথিবীতে। এবং এই কারণে পুলিশ আমার উপর নাখোশ হলো। এবং তারা আমাকে খোঁজা শুরু করলো। এনডিটিভি অন্যদের সাথে আমারও ইন্টারভিউ নিতে আসে। আমি ইন্টারভিউ দিতে গেলাম এবং সেই রাতে আমার মেয়েসহ আমাকে গ্রেপ্তার করা হলো। তিনমাস জেলে অন্তরীণ থাকার পরে আমাকে ছেড়ে দেয়া হলো।

চতুর্থ বারের মতো আমাকে আটক হতে হয়। যখন আমি ভূয়া এনকাউন্টারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিলাম তখন তারা আমাকে আটক করেছিলো।

যখন আমি জেলে ছিলাম তখন এক পুলিশ সদস্য আমাকে স্যালুট দিয়ে বললো, “ইমা (মা), ভয় পেয়ো না, আশা ছেড়ে দিও না। আমরা আপনার জন্য সেখানে থাকবো।”। যখন সে এ কথা বললো, তখন আমি কেঁদে উঠেছিলাম।

irom-sharmila-2আজ এখনো আফসপা (AFSPA) বহাল আছে এবং ১২ বছর হলো ইরম শর্মিলা অনশন করে যাচ্ছে। মনিপুরের একজন মা হিসেবে আমি মানবাধিকার রক্ষায় আমার সাধ্যমত চেষ্টা করে যাচ্ছি।

আমি যে সময় সংগ্রামে নেমেছিলাম সে সময় থেকে এখন অনেক বদলেছে। এখনো আমি শক্ত করে আছি আমার কোমড়! এখন যারা সামাজিক কাজ করছে তারা যদি ভাতা না পায়, তবে তারা নড়ে চড়ে না। এখন তাদের রাজনৈতিক কমিটমেন্ট আমাদের সময়কার মতো একই নয়। কিন্তু আমি নারীদের আহ্বান জানাবো, অনুগ্রহ করে আপনারা সংগ্রাম এগিয়ে নিন। এবং কৌশলী হয়ে লড়াই করুন। বেশ কয়েকমাস আমরা অস্থিরতা দেখছি। যেভাবে ঘটার কথা ছিলো সেভাবে ঘটছে না।

এক শুভক্ষণে যখন অনেক নারী জেগে উঠবে তখন অবশ্যই আফসপা (AFSPA)কে পশ্চাদ্ভাবন করতে হবে।।

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s