লিখেছেন: ধ্রূব রহিম

hajaribag-tannery-1প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং পরিবেশ বিপর্যয়ের কবলে ক্ষতিগ্রস্থ আমাদের বাংলাদেশ দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার ভূরাজনৈতিক কৌশলগত অবস্থানে চিহ্নিত হয়ে আছে ষড়ঋতুর দেশ হিসেবে। বাংলাদেশ একদা এই অঞ্চলের দরিদ্র রাষ্ট্রগুলোর একটি যা উন্নয়নশীল দেশের বাজারে একটি মাধ্যম আয়ের রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার স্বপ্ন দেখছে। আর এখনও পর্যন্ত দারিদ্র যতটা না সম্পদে আর চেয়েও বেশী মননে।

এই দেশের অগ্রসরতার জন্য আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব যে ধরণের নীতিমালা তৈরী করেন তা প্রায়শ কাজে তো আসেই না বরং উল্টো বৈষম্য সৃষ্টি করছে পদেপদে। আর বৈষম্য সৃষ্টিতে ব্যাপক অবদান রাখছে মানব সম্পদ উন্নয়ন এবং প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা পদ্বতির অভাব।

বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানব সম্পদ এবং দেশের মোট প্রাকৃতিক সম্পদের সঠিক তত্ত্বাবধান, বিকাশ এবং উন্নয়নএর পুরো প্রক্রিয়াটাই দাবী করে সম্পদের সুষম বন্টন পদ্বতি। যাতে করে উন্নত মানব সম্পদের পাশাপাশি প্রাকৃতিক সম্পদের সঠিক ব্যবহার এবং সাশ্রয়ী উন্নয়ন (sustainable development) ব্যবস্থা সমাজকে এবং পরিবেশকেও রক্ষা করতে পারে।

এখন সারা বিশ্বে সাশ্রয়ী উন্নয়নের আহবান একটি পরিবেশ আন্দোলনের সূত্রপাত করেছে। কারণ বিশ্বে সম্পদ সীমিত। এক সময়ের নির্দয়ভাবে প্রাকৃতিক সম্পদ লুন্ঠন ও নির্বিচারে ধ্বংসের ফলে পৃথিবীর বর্তমান বেহাল অবস্থা, যা আমরা বিভিন্ন সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে অনুস্থিত কনভেনশনের মাধ্যম জানতে পারছি। যেমন মন্ট্রিয়েল প্রটোকল বায়ু মণ্ডলের ওজনস্তরে ক্ষয়, সর্বশেষ কোপেনহেগেন সম্মেলন জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য ছয়টি গ্রিন হাউজ গ্যাসকে (GHG) দায়ী করা হয়েছে যেমন: কার্বন ডাইঅক্সাইড, নাইট্রাস অক্সাইড, সালফার ডাইঅক্সাইড ইত্যাদি এবং বিপর্যয়ের শিকার বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য জলবায়ু তহবিল গঠন।

আমাদের বাংলাদেশ সহ পৃথিবীতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে দুটি বিষয় আমাদের ভাবিয়ে তুলছে তা হলো ওজনস্তরে ক্ষয়রোধ এবং জলবায়ু পরিবর্তন। আর রাষ্ট্রপক্ষের বৈষম্যে পরিপূর্ণ নীতিমালা প্রণয়ন শুধুমাত্র একটি বিশেষ ক্ষমতাবান গোষ্ঠীকে একতরফা সুবিধা দেয়ার জন্য। এই মদদপুষ্ঠ গোষ্ঠীর প্রত্যক্ষ, পরোক্ষ, অবৈধ, অবিবেচিত ও পরিণতিজ্ঞান শূন্য হস্তক্ষেপের ফলে এই দেশের ভৌগলিক সীমানার মাঝেই পরিবেশ বিপর্যয় ঘটতে শুরু করেছে।

বাংলাদেশে পরিবেশগত বিপর্যয় এর দু’একটি নমুনা আপনাদের অবগতির জন্য উল্লেখ করছি। ঢাকা হাজারীবাগের ট্যানারী শিল্পের কলকারখানা থেকে যে পরিবেশ বিপর্যয়, যা খোলাচোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। মাটির দূষণ, পানির দূষণ ছাড়াও বায়ুদূষণ এর কবলে পড়েছে হাজারীবাগ। পরিবেশগত সাধারণ নীতিমালা ও আইনের তোয়াক্কা না করে একশ্রেণীর লোভী, অমানবিক ও অদূরদর্শী বেনিয়ারা শিল্পকারখানা তৈরী করে পরিবেশগত বিপর্যয়কে ত্বরান্বিত করেছে। মুনাফা লোভী একশ্রেণীর টাকার কুমির রাজনীতি ও প্রশাসনিক ক্ষমতাকে পুঁজি করে জণগণের মতামতকে পাশ কাটিয়ে পরিবেশ নীতিমালাকে গুরুত্ব না দিয়ে নিজেদের হীন ব্যবসায়িক ও ব্যক্তিগত স্বার্থকে বড় করে দেখছে। বর্তমান বিশ্বের এদের নতুন নামকরণ হয়েছে ক্লাইমেট মাফিয়া (Climate Mafia) হিসেবে।

খোদ ঢাকা নগরীর একটি আবাসিক এলাকা কি করে চামড়া শিল্পের কলকারখানায় পরিণত হয় এবং পরিবেশগত বিপর্যয়কে নিশ্চিত ও ত্বরান্বিত করে? কারণ খুব সোজা – “দেশের রাজনীতিবিদরা অনেক বিস্তর জ্ঞান অর্জন করেছেন কিভাবে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করে দেশের মানবসম্পদের উন্নয়ন ও বিকাশের জন্য কোন কর্মসূচী না দিয়ে কিভাবে প্রাকৃতিক সম্পদ নির্বিচারে আত্মসাৎ ও ধ্বংস করা যায়, তার উপর।”

খুব স্পষ্টভাবেই বলা যায় প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ ও বিকাশে কোন সুষ্ঠু ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপনা নীতিমালা ছাড়াই পরিবেশগত প্রতিক্রিয়া বিবেচনা না করে অনেকটা গায়ের জোরেই এই ক্লাইমেট মাফিয়ারা (Climate Mafia) বাংলাদেশের বিভিন্নস্থানে একের পর এক পরিবেশ বিপর্যয় ঘটিয়ে চলেছেন উম্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উওোলন, কলকারখানার শিল্পবর্জ্য পরিশোধন না করে সরাসরি উন্মুক্ত জলধার, নদী, খালবিল বা কৃত্রিমকূপ তৈরী করে ভূগর্ভে ক্ষতিকারক তরল শিল্পবর্জ্য নির্বিচারে ফেলা (dumping) হচ্ছে।

প্রাকৃতিক সম্পদ এর সঠিক সংরক্ষণ, পুনঃউৎপাদন, উন্নয়ন ইত্যাদি কার্যক্রম পরিচালনা করার জন্য প্রয়োজন দক্ষ ও প্রশিক্ষিত মানব সম্পদ। কাজেই একটি দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ ও মানব সম্পদের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে প্রয়োজন এ দুয়ের মাঝে সঠিক ও ভারসাম্যপূর্ণ সমন্বিত ব্যবস্থা প্রবর্তন করা, যা সম্পাদন করতে হলে রাষ্ট্রপরিচালনায় সংশ্লিষ্ট পক্ষ ও জনগণের মাঝে এই বিষয়টি নিষ্পন্ন করা দরকার এ কারণে যে, প্রাকৃতিক সম্পদ ও মানব সম্পদ এর অভিভাবক প্রাকৃতিক পরিবেশ, একে রক্ষা করতে দায়বদ্ধ রাষ্ট্রপক্ষ। কাজেই রাষ্ট্রপক্ষের পরিবেশ সচেতনতা আর জণগণের প্রত্যক্ষ উপলদ্ধি ও অংশগ্রহণের মাধ্যমেই একটি দেশের প্রাকৃতিক সম্পদের সঠিক উন্নয়ন, অপরদিকে সম্পদেরও সুষম বন্টন নিশ্চিত হতে পারে। একটি বিশেষ অদূরদর্শী ক্ষমতাবান গোষ্ঠীর প্রত্যক্ষ ও অবিবেচিত হস্তক্ষেপের কারণে একটি রাষ্ট্রের ভৌগলিক সীমান্তের মাঝেই পরিবেশ বিপর্যয় ঘটতে পারে। যেমন একটি দেশের ২৫% এলাকা অবশ্যই সবুজ অরণ্য হতে হবে। আমাদের আছে মাত্র ৯% – যদিও সরকারের খাতায় এ পর্যস্ত ১৪% বলে দাবী করা হচ্ছে। তাহলে ১৬ কোটি জনগণের ১,৪৩,০০০ বর্গ কিলোমিটারের মাঝে অবস্থিত সমুদুয় প্রাকৃতিক সম্পদের উপর এর নেতিবাচক প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া কাজ করতে শুরু করেছে। আমরা জানি, গাছ কার্বন ডাইঅক্সাইড ও আলোর উপস্থিতিতে সালোকসংশ্লেষণ পদ্ধতির মাধ্যমে অক্সিজেন ও খাদ্য উৎপাদন করে। তাহলে ২৫% অরণ্য যে পরিমাণ অক্সিজেন উৎপাদন করতে পারে % বা ১৪% অরণ্য অক্সিজেনের সে ঘাটতি পূরণ করতে পারে না। পরিণতিতে, প্রাণীকূলের পক্ষে জীবিত থাকার সম্ভবনা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসবে আর একই সাথে জীব বৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির সম্মুখীন হয়ে অনেক প্রাণী ও উদ্ভিদ বিলুপ্ত হতে থাকবে।

উদ্ভিদের অস্তিত্ব ক্ষয়িষ্ণু হলে মাটি ক্রমশ সরে যেতে যেতে উদ্ভিদশূণ্য হয়ে পড়ে। মাটি ক্ষয়ের কারণে ভাসমান ধূলিকণা হিসেবে তা বায়ুর সাথে মিশে বাতাসে ভাসতে থাকে।

আর উদ্ভিদ যেভাবে ভূগর্ভস্থ পানি ধরে রাখতে পারে। ভূভাগে এর সংরক্ষণের কোন বিকল্প বলতে নদী নালা খালবিল হাওড় বাওড় ইত্যাদি জলাধারকে বোঝায়। কাজেই উদ্ভিদের অনুপস্থিতিতে ভূগর্ভস্থ পানির পরিমাণ কমে কমে পানির টেবিল নীচে নামবে। আর বৃষ্টিপাত কম হলে নদীনালা, হাওড়বাওড় ইত্যাদি জলধারে পানির পরিমাণ কমে জলশূন্য হয়ে পড়তে পারে।

তাহলে আমরা তো এটা বুঝতে পারছি বায়ুর গুনগত মান কমে যাওয়া, ভূমিক্ষয়, পানি সম্পদ সংরক্ষণ এর অভাব এবং প্রকৃত অর্থে প্রাকৃতিক সম্পদের ক্ষয় প্রতিরোধ করতে হলে প্রয়োজন ব্যাপক গবেষণা, মাঠ পর্যায়ের পর্যবেক্ষণ, উপাত্ত ব্যবস্থাপনা, বিশ্লেষণ ইত্যাদি থেকে সঠিক করণীয় নির্ধারন করা।

আমরা পৃথিবীর মানব জাতি ঠিক বুঝতে পারছি প্রাকৃতিক সম্পদ অফুরন্ত নয়।

তাহলে কোন কোন চিহ্নিত বিষয়গুলো সামগ্রিকভাবে প্রাকৃতিক পরিবেশকে বিপর্যয়ে মুখে ঠেলে দিচ্ছে তার কারণগুলো শুধু জানলেই চলবে না বরং এর থেকে প্রতিকার পেতে হলে আমাদের আরো সচেতন এবং সোচ্চার হওয়া প্রয়োজন।।

(চলবে…)

লেখক: শিল্প ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.