লিখেছেন: জাহেদ সরওয়ার

felani-1ফেলানি হত্যা দুনিয়াজুড়ে সাড়া জাগানো সীমান্ত হত্যাকাণ্ড। তারও কারণ আছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন সীমান্তে আড়ালে আবড়ালে নিয়ত হত্যা, গুম, ধর্ষণ এখন মামুলি বিষয়। বিশেষ করে এর শিকার হচ্ছে বাংলাদেশি গরীব জনগণ। ফেলানির বিষয়টা এতটা চাউর হবার কারণ হচ্ছে সে গুলি খেয়ে বিশ্বমিডিয়ার নজরে পড়ার মতো ভয়াবহভাবে ঝুলে ছিল কাঁটাতারে। এরকম আরেকটা দৃশ্য আমাদের মনে পড়ে যাবে, সার্বিয়রা যখন বসনিয়দের পাইকারিহারে হত্যা ধর্ষণ গুম করছিল। তখন কিছু যুবতীকে তারা ধর্ষণের পর কাটাতারে ঝুলিয়ে প্লেকার্ড লিখে দিয়েছিল জনসাধারণের ব্যবহারের জন্য’। সংবাদপত্রের বরাতে কিছুদিন আগে জানা গিয়েছিল ধর্ষণের আরেকটি খবর। ভারতের মুম্বাই শহরে বাড়িতে বুয়ার কাজ করতো মহিলা। সীমান্ত দিয়ে আসার সময় সন্তানের সামনে তাকে গণধর্ষণ করেছিল বিএসএফ। ধর্ষণ শব্দটি উচ্চারণ করা সহজ হয়তো, কিন্তু সত্যিকার অর্থে এর ভয়াবহতা একমাত্র ধর্ষিতা ছাড়া অন্য কারো বোধগম্য নয়। আর হত্যা তো নিত্য ব্যাপার। তালাশ করতে গেলে এরকম বহুর নজির আমাদের সামনে হাজির হবে।

তো যারা ধর্ষিত হচ্ছে, যারা নিয়ত নিহত হচ্ছে তারা কারা? তাদের শ্রেণী চরিত্রের সামান্য হদিস আমাদের দরকার হবে। এরা প্রায়ই সবাই সমাজের নিম্ন আয়ের লোক, দৈহিক শ্রম ছাড়া যাদের আর কিছু দেবার নাই। সীমান্ত এদের কাছে তেমন প্রশ্ন তৈরি করে না। পাসপোর্ট ভিসা নেয়ার বিলাসিতা করার মতো আর্থিক সামর্থ তাদের নাই। তারাতো যেকোন পারেই দেহশ্রম দিয়ে বেড়াচ্ছে, নিজেদের ভীতিকর চরিত্র সম্পর্কে তারা জ্ঞাত নয়। আর যে কোনো সীমান্তেরই একটা সামাজিক চরিত্র আছে। সীমান্তের উভয়পারে আত্মীয়স্বজন থাকে। যাতায়াত থাকে। তারচাইতেও বড় কথা হচ্ছে। দিনের পর দিন সীমান্ত পার হয়ে কেন এই সাধারণ মানুষ মৃত্যুচিন্তাকে পাশকাটিয়ে কাঁটাতার পার হয়ে অইপারে যাচ্ছে তার খোঁজ রাষ্ট্র বা সমাজ করে নাই। উপকুলে লাখ লাখ মানুষ নদীপথে সামান্য ট্রলারে করে ভীতিকর সমুদ্র উপেক্ষা করে পাড়ি দিচ্ছে মালেশিয়ার দিকে। যতমানুষ মালেশিয়ায় পৌছাচ্ছে তার অধিক হারিয়ে যাচ্ছে সমুদ্রে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে সমুদ্রে তলিয়ে যাবার বিপদ থাকা স্বত্বেও কেন মানুষ এই ঝুকি নিচ্ছে? কার কাছে আছে এর উত্তর? যারা এর উত্তর দিতে পারে বস্তুত তাদের মূল ব্যবসাই দাসপাচার।

বাংলাদেশ সরকারের অন্যতম ব্যবসা হচ্ছে দাসব্যবসায়। যাকে আমরা ভদ্রতার রূপ দিচ্ছি জনশক্তি রপ্তানি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নাকি অন্যতম কাজ হচ্ছে বিদেশে জনশক্তি রপ্তানির বাজার খোঁজে বের করা। এর অর্থ কি? দাসপাচারের বাজার খুঁজছে তারা। কি রকম দুবৃত্ত হলে সরকারের দ্বারা এই কাজ সম্ভব? বাংলাদেশে যেই পরিমাণ সম্পদের উৎস আছে বা যে পরিমাণ বৈদেশিক সহায়তা বা ঋণ নেয়া হয় তাতে ষোলকোটি মানুষের কর্মসংস্থান করা স্রেফ পরিকল্পনা আর নৈতিক দায়িত্ববোধের ব্যাপার। এ দায় কোনোভাবেই রাষ্ট্র বা সরকার এড়াতে পারেনা। সাধারণ মানুষ কি করে তাদের জীবিকা নির্বাহ করবে এই প্রশ্ন বাদ দিলে সেখানে কোনো সরকার বা রাষ্ট্রের উপস্থিতি থাকতে পারে না। থাকলেও সেটা রাষ্ট্র হিসাবে কার্যকর নয়। সেই সমাজকে হয়তো আমরা প্লাতনিয় সক্রাতেসের মতো বলতে পারি ‘কতিপয়তন্ত্র’। আরো কথা আছে সেটা হচ্ছে বাংলাদেশে সরকার যে তার নাগরিকদের শুধু দাস হিসাবে বিদেশে পাঁচার করছে তা নয়, দেশের মেয়েদেরকেও গৃহকর্মী নাম দিয়ে পতিতা হিসাবে পাঁচার করছে মধ্যপ্রাচ্যে।

এইটা আমার মুখস্ত কথা নয়। দশবছর সৌদি আরবে ডাক্তার হিসাবে কাজ করা মার্কিন লেখক জ্যান পি স্যাসনের এরাবিয়ান ডটার্স, ডেজার্ট রয়েল, …, ট্রিলজি পড়লে যে কেউ বিষয়টি অনুধাবন করতে পারবেন। এরাবিয়ান ডটার্স গ্রন্থে ‘আরবে বিদেশি নারী’ শিরোনামে একটা লেখা আছে সেখানে বর্ণিত আছে ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, ভারত, শ্রিলংকা ও বাংলাদেশের মতো তৃতীয়বিশ্বের তরুণী মেয়েদের আসলে কি অবস্থা। গৃহকর্মী নামে তাদের সেখানে নিয়ে গিয়ে আসলে কি করা হয়। এটা জেনেও না জানার ভান করে এসব দেশের সরকারগুলো। কারণ তারা নিজেরাই জানে জনশক্তি রপ্তানির নামে তারা আসলে আদমবেপারি।

তো সম্প্রতি ফেলানির বিচারের নামে প্রহসন করলো ভারত। ভারত এটা করেছে কারণ আন্তর্জাতিক মিডিয়ার কাছে যে দায়স্বীকারের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল তা প্রশমন করতে। হয়তো বিচারটা পুরাটাই সাজানো নাটক ছিল। তারা জানে তাদের প্রতিপক্ষ বাংলাদেশ নামের হযবরল রাষ্ট্র। আর বাংলাদেশ সরকার ফেলানির মত একটা ক্লাসলেস মেয়ের বিচারের কি রায় হল তা নিয়া তার কোনো আগ্রহ আছে কিনা সন্দেহ। ফেলানির প্রসঙ্গ বরিশালের পা কাটা লিমনকেও হাজির করবে জননিরাপত্তার প্রশ্নে। বাংলাদেশ সরকার তার দেশের অভ্যন্তরেই সাধারণ জনগণকে গুলি করে মারছে। ফেলানি যেমন চারঘণ্টা কাটাতারে ঝুলে ভারত সরকারের সমস্যা হয়ে উঠেছিল তেমনি লিমন গুলি খেয়েও না মরে সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছিল বাংলাদেশ সরকারের। যে দেশের সরকারের কাছে তার বাহিনি কর্তৃত নিগৃহীত লিমন বিচার পায় না সেখানে ভারত কর্তৃক নিহত ফেলানির বিচার নিয়া মাথাঘামানো আসলেই অসম্ভব। কারণ ফেলানি আর লিমন দুজনই ক্লাসলেস। সরকার এই শ্রেণীটাকে নিজের দেশের ভেতরের বলে মনে করে কিনা সন্দেহ।

ধরা যাক ফেলানি ভারতের মেয়ে তার নাম অনুরাধা। তাকে হত্যা করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ তাহলে কি অবস্থা হত? যে সব ক্লাসলেস মেয়েদেরকে বিএসএফ গণধর্ষণ করছে এরকম একটা ঘটনা যদি বর্ডার গার্ড করতো তাহলে কি হতো সেই বিচার? আমাদের কল্পনাশক্তি কি এতদূর দেখতে পায়?

প্রতিবেশি রাষ্ট্র হিসাবে ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কটা বরাবরই একতর্ফি। ভারত নিজেদের প্রয়োজনে পাকিস্তানকে ভাঙ্গতে যা যা করা উচিত সবই করেছে। যাকে আমাদের স্বাধীনতা অর্জনে ভারতকে বন্ধু হিসাবে দেখে আসছি আমরা। কিন্তু ভারতের আচরণ থেকে বারংবার প্রমাণিত হয়েছে যে তারা সীমান্তের ওপারের পাকিস্তানকে যেই চোখে দেখে থাকে বাংলাদেশকেও তারা এখনো পাকিস্তানই মনে করে। ভারত যদি বাংলাদেশকে বন্ধু রাষ্ট্র মনে করতো তাহলে দিনের পর দিন ঘটে যাওয়া এই সব একতর্ফি সীমান্ত হত্যাকাণ্ড বন্ধে উদ্যোগ নিত তারা। যতবারই সীমান্তে এইধরণের হত্যাকাণ্ড ঘটেছে উল্টো শিবসেনা প্রভৃতির মুখপাত্ররা বিবৃতি দিয়ে আসছে ভারতের বিভিন্ন শহরে বসবাসকারী বাংলাদেশিরাই নাকি ভারতের সিংহভাগ অপরাধের জন্য দায়ি। অথচ অধিকাংশ বাংলাদেশিরা পারতপক্ষে নিজেদের ভারতিয় বলেই মনে করে ও সেটা মনে করতে পারলে আনন্দিত হয়। বাংলাদেশের বাজারের অধিকাংশ পণ্যই ভারতিয়। ভারতিয় সিনেমা দেখে রাতের পর রাত কাঁদছে বাংলাদেশি দর্শকরা, ভারতের আইটেম সং শুনে বিয়ে জন্মদিন পালন না করলে বাংলাদেশিদের গিজগিজি মরে না। আর একটা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ভারতিয় মামেয়ে প্রজন্ম তৈরি হচ্ছে ভারতিয় সিরিয়ালগুলা দেখে দেখে। বাংলাদেশ ভারতের একটা প্রদেশের মতই ভারতের বাজার।

অন্যদিকে, ভারতের আচরণ সম্পূর্ণ এর উল্টো। সীমান্ত হত্যাকাও তার বিচারপ্রহসনতো আজ প্রকাশিত। তার উপর প্রতি বর্ষায় ভারত তার নদীতে দেয়া সব বাধই প্রায় খুলে দেয়। যাতে ভেসে যায় বাংলাদেশের অনেক গ্রাম। টিপাইমুখ বাধ থেকে শুরু করে অন্যান্য দ্বিপাক্ষিক বিষয়াদিতে ভারতের আচরণ বা পররাষ্ট্রনীতি সম্প্রসারণবাদেরই নামান্তর। তো হিটলার যেমন পূর্বইউরোপের দেশগুলার ভেতর ক্রমে সম্প্রসারণবাদের নানা তরিকার বিকাশ ঘটাচ্ছিল যেন সেই সময়ের ভেতর দিয়েই যাচ্ছে ভারত। ভারতিয় বুর্জোয়ারা কত অমানবিক তাতো ফেলানি হত্যার বিচার প্রহসন দিয়েই পরিমাপ করা যায়। যেই ভারতকে ইতিহাস সাধক বলে বার বার বাহবা দিয়ে আসছিল তার আজ কি চেহারা দাঁড়িয়েছে তার প্রমাণতো ফেলানি হত্যার বিচার প্রহসন। ফেলানিদের তথা বাংলাদেশিদের মানুষ মনে না করার পেছনের ইতিহাস সেই সাতচল্লিশেই প্রোতিত আছে। ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগের পর যেই ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের বিকাশ আর সেই ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের বিকাশের ফলে যে ধর্মীয় ঘৃণাবোধ তা বিভিন্ন ঢালপালায় বিকশিত হয়েছে। সেই বিষবাস্প এখন নানা উসিলায় ছড়িয়ে গেছে। ফেলানি হত্যাকাবা তার বিচার প্রহসনও এর বাইরে নয়।

দিনের পর দিন এইভাবে সীমান্ত জুলুমের জবাবে কি করেছে বাংলাদেশের সরকারগুলা তা আজ অবশ্যই প্রশ্নবিদ্ধ। এর সুলুক সন্ধান করতে গেলে আমাদের খানিক রক্তাক্ত হতে হবে। রাষ্ট্র পরিচালনার খাতিরে আমরা বাঙালি বা বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের জিগির তুললেও মূলত আমাদের রয়েছে নানান আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদ। রবীন্দ্রনাথের বাড়ি ছিল কলকাতার জোড়াসাঁকোতে অথচ জমিদারি ছিল ছড়ানো ছিটানো। আজ ফেলানি যদি প্রধানমন্ত্রীর আত্মীয় হতো নিদেন পক্ষে তার বাড়ি যদি গোপালগঞ্জ হতো তাহলে হয়তো এর কোনো প্রতিকার হবার সম্ভাবনা ছিল। যারা সরকারি চাকরিবাকরি করেন তারা জানেন, তারা প্রতিনিয়তই এই আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদের মুখোমুখি হন। তাহলে সরকারের এই নির্লীপ্ততা নি:সন্দেহে আমরা বলতে পারি সামন্তীয়। অন্য এলাকার মানুষের সাথে সরকার প্রধানের কোনো আন্তরিকতা না থাকা। এবং এই অন্য এলাকার মানুষের এইরকম মৃত্যুর কোনো সুরাহা না হওয়ার কারণেই এইসব প্রশ্ন সামনে চলে আসবেই। একজন ফেলানির জন্য বাংলাদেশ সরকার ভারতের মত বিগব্রাদারের বিরাগভাজন হতে পারে কিনার চাইতে বড় কথা হচ্ছে। রাষ্ট্র হিসাবে তার নাগরিক নিগৃত হলে তার কোনো সুরাহা না চাওয়াটা রাষ্ট্র হিসাবে বাংলাদেশের অস্তিত্ব সম্পর্কে প্রশ্ন তৈরি করে। বাংলাদেশ রাষ্ট্র না হয়ে কারো বাবা বা স্বামীর সম্পত্তি হলে এই সামন্তীয় নির্লীপ্ততা একশ ভাগ সঠিক।

এইক্ষেত্রে দেশের মুবিহীন জনগণ যদি নিজেদের নিরাপত্তার কথা নিজেরাই শুরু করে দেয় তাহলে হয়তো সঠিক কাজই করতো। কিন্তু এদেশের সিংহভাগ জনগণই নিজেদের এখনো স্বাধীন দেশের নাগরিকের চাইতে সামন্তীয় রাষ্ট্রের প্রজাই মনে করে। দেশটার নামইতো এখনো গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ। তো যেই মানুষগুলো মৃত্যুকে উপেক্ষা করে সামান্য কাঠের ট্রলারে করে বঙ্গোপসাগর, ভারত মহাসাগর পাড়ি দিয়ে মালেশিয়া বা অন্যকোথাও পাড়ি দিচ্ছে তারা মূলত যাচ্ছে এই ভয়ংকর সামন্তীয় নির্লীপ্ততার করতল থেকে আরো একটু বেটার জীবনের আশায়। বাপের দেশ আর স্বামীর দেশের রাক্ষসি থাবা থেকে তারা মূলত মুক্ত হয়ে বাঁচার আশায়। তাদের সামনে দুইটা পথ মৃত্যু অথবা অন্যকোনো দেশ। গালভর্তি স্বাধীনতা, চোখভর্তি প্রপাগান্ডা, পিতার স্বপ্ন বা স্বামীর স্বপ্ন ভর্তি ছলচাতুরি’র জাদু গত চল্লিশ বছর ধরে যেই রাষ্ট্রীয় অবদমনের জন্ম দিচ্ছে তাই ফেলানিদের মৃত্যুকে উপেক্ষা করে কাঁটাতার ডিঙোবার প্রেরণা দিচ্ছে মূলত। শত শত নারীপুরুষকে অজানার উদ্দেশে সমুদ্রে তরী ভাসাবার প্রেরণা দিচ্ছে। জনগণ জীবন দিয়ে প্রমাণ করছে বারবার বিদেশের জেলখানা, সীমান্তের কাটাতার এদেশের চাইতে ভালো। বাকী প্রজারা এটা কবে বুঝবে?

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s