লিখেছেন: আবিদুল ইসলাম

hasina-manmohanভারতের Indian Express পত্রিকার সম্পাদক শেখর গুপ্ত’র National Interest: Dear Narendrabhai শীর্ষক একটি নিবন্ধ গত ৩১ অগাস্ট পত্রিকাটিতে প্রকাশিত হয়েছে। নরেন্দ্র মোদিকে প্রিয় নরেন্দ্র ভাইহিসেবে সম্বোধন করে তার কাছে খোলা চিঠি আকারে লেখা নিবন্ধটিতে যে কথাগুলো বলা হয়েছে সেটা মোটা দাগে একটি সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের বৃহৎ পুঁজির স্বার্থের প্রতিনিধি সে দেশের শাসক শ্রেণী তার আশপাশের প্রতিবেশী দেশগুলো সম্পর্কে যে দৃষ্টিভঙ্গি ধারণ ও বক্তব্যসমূহ প্রদান করে থাকে তার থেকে ব্যতিক্রম কিছু নয়। বাংলাদেশ সম্পর্কে তাদের প্রধান যে বক্তব্যটি মূল ধারার প্রচার মাধ্যমে সাধারণত দেখা যায় তাহলো: এই দেশটি মৌলবাদীদের আশ্রয়স্থল হয়ে উঠছে এবং ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তে পাকিস্তানের মতোই কার্যক্রম পরিচালনা করে চলেছে। ভারতীয় বৃহৎ পুঁজি যতো অধিক পরিমাণে আন্তর্জাতিক পুঁজিবাদী ব্যবস্থা তথা সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থার সাথে অঙ্গীভূত হচ্ছে ঠিক সেই পরিমাণেই ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদ দমনের নামে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিভিন্ন প্রচারপ্রচারণার সাথে তাদের কথাবার্তা ও বক্তব্য সমান্তরাল ধারায় প্রবাহিত হচ্ছে। একটি রাষ্ট্রের বিদেশনীতি, প্রতিরক্ষানীতি থেকে শুরু করে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সমূহ ও তৎপরতা যে সে রাষ্ট্রের পুঁজির স্বার্থ ও প্রবণতার দিকে লক্ষ্য রেখেই নির্ধারিত এবং কার্যকর হয় এটা হলো তার একটি উল্লেখযোগ্য প্রমাণ।

আলোচ্য নিবন্ধে বাংলাদেশকে মৌলবাদীদের অভয়ারণ্য হিসেবে আখ্যায়িত করার পর আবার এ কথাও বলার চেষ্টা হয়েছে যে, শেখ হাসিনার বর্তমান সরকারের নেতৃত্বে বাংলাদেশ নাকি ‘ঘুরে দাঁড়িয়েছে’। (পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে) সংবিধান তার পূর্বতন ধর্মনিরপেক্ষ অবস্থানে ফেরত গেছে। নিবন্ধটিতে বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণকারী উলফার নেতা অরবিন্দ রাজখোয়াকে ভারতের কাছে হস্তান্তর এবং অনুপ চেটিয়াকে গ্রেপ্তার করে আটকে রাখার বিষয়েও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এই রচনায় বাংলাদেশের সাবেক সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিডিআর সম্পর্কে যে চরম বিষোদ্গারমূলক ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে সেটা বিশেষভাবে লক্ষণীয়। শেখ হাসিনা কর্তৃক বিডিআর বিলুপ্তির প্রশংসা করে বলা হয়েছে এই বাহিনীটি সীমান্তে হিংসাত্মক কার্যকলাপের মাধ্যমে বিএসএফের সদস্যদের হত্যা করেছে, হত্যার পর তাদের মৃতদেহ বাঁশের লাঠির সাথে ঝুলিয়ে রেখেছে (She (Sheikh Hasina) has also disbanded the Bangladesh Rifles, which had become such a malevolent presence on our borders – remember that ghastly visual of the bodies of our BSF patrolmen, killed by the BDR, being carried, hanging by their limbs from bamboo sticks?)

গত এক দশকে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী প্রায় সহস্রাধিক বাংলাদেশীকে বিনাবিচারে গুলি করে হত্যা এবং আরো বহু সংখ্যককে বিভিন্নভাবে নির্যাতন করলেও সে বিষয়ে নিবন্ধে কোনো কিছু উল্লেখ নেই। অতি সম্প্রতি সে দেশে বিএসএফ কর্তৃক তাদের ভূখণ্ডের সীমান্তে গুলি করে বাংলাদেশী কিশোরী ফেলানীকে হত্যার রায় প্রদান করা হয়েছে। এই রায় দিয়েছে বিএসএফেরই লোকজন দ্বারা গঠিত আদালত। সেখানে গুলি চালনাকারী বিএসএফ সদস্য অমিয়কে বেকসুর খালাস দেয়া হয়েছে। ফেলানীর ঘটনাটি দুই দেশে ব্যাপক আলোচিত হলেও এটাই একমাত্র ঘটনা নয়। বিএসএফ কর্তৃক কোনো রকম পূর্ব সতর্কতা ছাড়াই তাদের দেশের সীমান্তে অনুপ্রবেশকারী গরীব বাংলাদেশীদের হত্যার ঘটনা নিয়মিতই ঘটছে। এমনকি তারা অবৈধভাবে বাংলাদেশ সীমান্তে ঢুকে এ দেশের নাগরিকদের ওপর গুলিবর্ষণ পর্যন্ত করে থাকে। এসবের কোনো বিচারই হয় না। বিএসএফবিজিবি কর্তৃক সংঘটিত পতাকা বৈঠকগুলো চলাকালীনও এ সমস্ত গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। এই সীমান্তে হত্যাকাণ্ড বন্ধ করা যে সম্ভব নয় এটা কেবল বিএসএফের কর্মকর্তারাই নন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতানেত্রী ও গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত মন্ত্রীরা পর্যন্ত বলছেন। কী ধরনের নতজানু সরকারের অধীনে বাংলাদেশে শাসনকার্য পরিচালিত হয় এবং ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর এই অপরিসীম ঔদ্ধত্যের রসদের যোগান কোথা থেকে আসে এই ঘটনার মধ্যেই তার স্বাক্ষর পাওয়া যায়।

আলোচ্য নিবন্ধটি শুরু হয়েছে মূলত ভারত ও বাংলাদেশের সীমান্ত চুক্তি এবং ছিটমহল বিনিময়ের ইস্যুকে কেন্দ্র করে। এ বিষয়ে গত ৪ মার্চে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে বক্তা হিসেবে উপস্থিত হয়ে ভারতীয় রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির প্রদত্ত বক্তব্যের উল্লেখ করে এ সংক্রান্ত সুযোগের সদ্ব্যবহার করার জন্য বারবার তাগিদ দেয়া হয়েছে। এরপর নিবন্ধ যতোদূর এগিয়েছে, এর মধ্যে ভারতীয় শাসক গোষ্ঠীর সাম্রাজ্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গিই ক্রমশ উন্মোচিত হয়েছে। ভারতীয় ভূখণ্ডের অভ্যন্তরে অবস্থিত বাংলাদেশী ছিটমহলগুলোকে চোরাকারবারি, মাদক ব্যবসায়ী ও জঙ্গি মৌলবাদের অভয়ারণ্য হিসেবে আখ্যায়িত করে এগুলো যে ভারতের জন্য হুমকি এমন ইঙ্গিতও করা হয়েছে (…these territories have become stateless sovereign republics. These are dens of thugs, smugglers, terrorists, gun-runners and illegal immigration mafias. Even jihadi groups and the ISI have routinely used these as staging posts as these are permanent gaps in our border surveillance)

নিবন্ধে আরো বলা হয়েছে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত আগে বর্তমান হাসিনাসরকারের আমলই হলো এমন এক সুবর্ণ সময় যা একটা ‘জাতি’র (অর্থাৎ, ভারতের) জীবনে বারবার আসে না। সুতরাং যা করার এর মধ্যেই করতে হবে কেননা পরবর্তী নির্বাচনে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপিজামায়াত জোট ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা রয়েছে। তা যদি হয় তাহলে শেখর গুপ্ত’র স্বপ্নসাধ নস্যাৎ হবে এবং বাংলাদে‌শ তার বর্তমান ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ চরিত্র হারিয়ে পরিণত হবে একটি মৌলবাদী দেশে। অথচ বাস্তব সত্য হলো, আওয়ামী লীগ হোক কিংবা বিএনপিশাসক শ্রেণীর এই দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের উভয় সরকারের আমলেই ভারতের সাম্রাজ্যবাদী পুঁজির স্বার্থ বাংলাদেশে অক্ষুণ্ন থেকেছে। ভারতীয় বৃহৎ পুঁজির স্বার্থে বাংলাদেশের দরজা যে সব সময়ই উন্মুক্ত সেটা পূর্ববর্তী বিএনপিজামায়াত জোট সরকারের আমলে রতন টাটার সাথে ইস্পাত ও বিদ্যুৎ বিষয়ক চুক্তির পাঁয়তারার সময়ও দেখা গেছে। এক্ষেত্রে বিএনপি, জামায়াত প্রভৃতি রাজনৈতিক দলের ভারতবিরোধী বক্তব্য ও প্রচারণার চরিত্র যে পুরোপুরিই সাম্প্রদায়িক প্রতিক্রিয়াশীল অথবা স্রেফ বাকোয়াজি এটা অতীতেই ভালোভাবে প্রমাণিত হয়েছে। এ রকম এক বাস্তবতায় বাংলাদেশের আগামী নির্বাচনকে ঘিরে শেখর গুপ্তর প্রকৃত উদ্বেগের কারণ যে অন্য কোথাও নিহিত সে সন্দেহ স্বাভাবিকভাবেই মনের মধ্যে এসে যায়।

আসল ব্যাপার হলো, শেখর গুপ্ত তার খোলা চিঠি আকারে নিবন্ধ লিখে এতো তাগাদা দিচ্ছেন যাকে সেই ব্যক্তিটি কে? কী তার পরিচয়? এই নরেন্দ্র মোদি হলেন উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের রাজনৈতিক শাখা ভারতীয় জনতা পার্টি তথা বিজেপির নেতা, যিনি দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে গুজরাটে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতায় রয়েছেন। এই সেই মোদি, যার পৌরোহিত্যে ২০০২ সালে গুজরাটে সংঘটিত চরম ঘৃণ্য সাম্প্রদায়িক নিধনযজ্ঞে দুই হাজারেরও বেশি মুসলিম নিহত হয়েছিলেন। আহত, পঙ্গু, বাস্তুচ্যুত এবং বিভিন্নভাবে নিরাপত্তাহীন হয়েছিলেন আরো কয়েক হাজার। এই মোদিই গুজরাটে পরপর নির্বাচনে তার দলের জয়ধ্বজা উড্ডীন রেখেছেন। তিনিই গুজরাটের অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রধানতম কাণ্ডারি হিসেবে তার স্বদেশে পরম পূজিত ব্যক্তি! এই মোদিকেই পরবর্তী সম্ভাব্য বিজেপিনেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকারের আমলে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে! নিবন্ধেও সে বিষয়ের ইঙ্গিত রয়েছে। আশা করা যায়, বিজেপি ভবিষ্যত জাতীয় নির্বাচনে জয়ী হয়ে কেন্দ্রে সরকার গঠন করতে সক্ষম হলে নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রীর পদ অলঙ্কৃত করে ভারতমাতার ধর্মনিরপেক্ষ চেতনার বিজয় পতাকাকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরবেন!!! আর এহেন চরিত্রের এক ব্যক্তির সাথেই গত ২৭ জুলাই তারিখে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত তারিক করিম আহমেদাবাদে গিয়ে স্থল সীমান্ত চুক্তির ব্যাপারে দেনদরবার করে এসেছেন মর্মে নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে।

শেখর গুপ্ত’র নিবন্ধের মধ্যে বাংলাদেশের বর্তমান শাসক গোষ্ঠী, বিশেষত আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের উল্লসিত হওয়ার কারণ থাকতে পারে। কিন্তু এতে এ দেশের জনগণের জন্য ইতিবাচক কিছু নেই। উপরন্তু ভারতের শাসক শ্রেণী তার বৃহৎ পুঁজিস্বার্থের প্রতিনিধি হিসেবে আশপাশের ছোটখাটো ও দুর্বল প্রতিবেশী দেশের জনগণের বিরুদ্ধে যে সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্ত করে থাকে তার পরিষ্কার বিপজ্জনক দিকই নিবন্ধটির ছত্রে ছত্রে ফুটে উঠেছে।।

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s