সামরিক আগ্রাসন – সাম্রাজ্যবাদের অভ্যন্তরীণ সঙ্কটের প্রতিফলন

Posted: অগাষ্ট 25, 2013 in আন্তর্জাতিক
ট্যাগসমূহ:, , , , , ,

লিখেছেন: আবিদুল ইসলাম

গোটা পৃথিবী মার্কিন আগ্রাসনের শিকার...পুঁজিবাদ তার বিকাশের সর্বোচ্চ পর্যায়ে সাম্রাজ্যবাদের রূপ পরিগ্রহ করে। আন্তর্জাতিক পুঁজিবাদ সাম্রাজ্যবাদী স্তরে পৌঁছেছে তার বয়স এক শতাব্দকাল পেরিয়ে গেছে। একই সাথে সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থার যুগে পুঁজিবাদের সকল প্রগতিশীল ভূমিকাও তিরোহিত হয়েছে। সামন্তবাদ উচ্ছেদের পর্বে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিকতার ধারণা এনে পুঁজিবাদ অগ্রগতির যে পথ দেখিয়েছিল মানব সমাজকে বলাই বাহুল্য পুঁজিবাদের সেই ভূমিকা আর নেই। তা শুধু যে ভূমিদাসত্ব থেকে মানুষকে মুক্ত করে শ্রমদাসত্বের শৃঙ্খলে বেঁধেছে তাই নয়; এখন গোটা মানব সমাজ, বিশ্বপ্রকৃতিজলবায়ু সহ প্রাণের অস্তিত্বের প্রতিই তা ভয়াবহ হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে।

আন্তর্জাতিক পুঁজিবাদ, তথা সাম্রাজ্যবাদের প্রধান লক্ষ্য হলো পুঁজির বিকাশের অপ্রতিহত চাহিদাকে পরিপুষ্ট রাখা এক কথায় পুঁজির স্বার্থের দেখভাল করা। একই সাথে গোয়েন্দা সংস্থা, আন্তর্জাতিক অর্থলগ্নিকারী প্রতিষ্ঠান, সামরিক বাহিনী, এনজিও, সুশীল সমাজ এ সমস্ত কিছুই সৃষ্টি করা হয়েছে পুঁজিবাদের এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে। পুঁজির প্রবাহ যতোক্ষণ অবাধ থাকে, তার বিকাশের পথে কোনো প্রতিবন্ধক এসে দাঁড়ায় না, ততোক্ষণ সাম্রাজ্যবাদ ভদ্রতার মুখোশ পরিধান করে থাকে। কিন্তু যখনই তার গতিপ্রবাহ বাধাগ্রস্থ হয় কোনো কারণে তখনই সে তার প্রকৃত চেহারা নিয়ে আবির্ভূত হয়। আর এই আবির্ভাবের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা দেয় দেশে দেশে যুদ্ধ, সামরিক আগ্রাসন, হত্যা, নিপীড়ন সহ আরো বহু কদর্য বিষয়।

সাম্রাজ্যবাদ তার উদ্দেশ্যকে সফল রাখার জন্য কাজ করে কয়েকটা স্তরে। প্রথম পর্যায়ে তারা তাদের আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহ তথা বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ প্রভৃতি সংস্থা, তাদের বশংবদ এনজিও, সুশীল সমাজ, মিডিয়া প্রভৃতির দ্বারা অনুন্নত দেশসমূহের দালাল শাসক গোষ্ঠীকে নিজেদের শৃঙ্খলে বেঁধে রেখে স্বার্থ হাসিল করে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অস্ত্র চুক্তি, ঋণ চুক্তি, পারস্পরিক সহযোগিতামূলক কিংবা অবকাঠামো উন্নয়ন চুক্তি, যৌথ সামরিক মহড়া প্রভৃতি এই স্তরে সাম্রাজ্যবাদী তৎপরতার উল্লেখযোগ্য স্মারক। এ পর্যায়ে ব্যর্থ হলে প্ল্যানবি বাস্তবায়নে বিশ্বের দেশে দেশে ছড়িয়ে আছে তাদের গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন, যারা স্থানীয় রাজাকারদের সহায়তায় চালায় বিভিন্ন ধরনের অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতা। এই তৎপরতার বহিঃপ্রকাশ রাষ্ট্রপ্রধান কিংবা প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গকে হত্যা, গুম এমনকি অপহরণের পর্যায়ে পর্যন্ত পৌঁছায়। বিশ্বে এর উদাহরণ বিরল নয়, বিশেষত গত শতকের দক্ষিণ আমেরিকায়।

তৃতীয়, অর্থাৎ সর্বশেষ পর্যায়ে তারা আশ্রয় নেয় দেশে দেশে সামরিক আগ্রাসনের। এসবই তারা করে গণতন্ত্র, ব্যক্তিস্বাধীনতা, মানবাধিকার ইত্যাদির নামে। এ কাজে বর্তমানে সাম্রাজ্যবাদের কেন্দ্রীয় রাষ্ট্র হিসেবে নেতৃত্বে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। বিগত শতাব্দে এ ধরনের কার্যকলাপ আমরা দেখেছি ইন্দোচীন অঞ্চলের দেশগুলোতে, বর্তমান জমানায় যা সম্প্রসারিত হয়েছে দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে; আফগানিস্তানকে দিয়ে যার সূচনা। এরপর একে একে এসেছে ইরাক, লিবিয়া, পাকিস্তান এই রাষ্ট্রগুলো। আর অনির্দিষ্টকালীন যুদ্ধ পরিস্থিতির দেশ হিসেবে ফিলিস্তিন ও লেবানন তো রয়েছেই। (ওহ! ভুলে গিয়েছিলাম, ফিলিস্তিন তো এখন পর্যন্ত কোনো রাষ্ট্রই নয়।) এছাড়া ইরান বহুদিন ধরেই সাম্রাজ্যবাদীদের টার্গেটের মধ্যে রয়েছে। এবার তাদের আগ্রাসী পরিকল্পনার তালিকায় এসেছে সিরিয়া।

ইরান কিংবা লিবিয়া অথবা সিরিয়ায় অর্থ, অস্ত্র, প্রশিক্ষণ ইত্যাদি সাহায্য দিয়ে মার্কিনীরা তাদের পক্ষে কিছু সরকারবিরোধী গ্রুপ খাড়া করেছে। সিরিয়ায় তারা এখন এমন তৎপরতা চালাচ্ছে যা দেশটিকে দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে। সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাসার আল আসাদ কোনো পূজ্য ব্যক্তি নন। বিরোধীদের দমন করতে গিয়ে তার সরকারও সহিংসতা প্রদর্শন করছে। কিন্তু তাকে গণহত্যাকারী হিসেবে চিহ্নিত করে যেভাবে সাম্রাজ্যবাদের বশংবদ মিডিয়াগুলো প্রচারণা চালাচ্ছে তার উদ্দেশ্য যে আরেকটি সামরিক আগ্রাসনের ক্ষেত্র প্রস্তুত করা তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তারা এখন অভিযোগ করছে যে সেখানকার সরকার নাকি বিরোধীদের ওপর রাসায়নিক অস্ত্র প্রয়োগ করছে। ইরাকে তারা গণবিধ্বংসী অস্ত্রের কথা বলে দেশটির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। তাদের সেই প্রচারণা যে মিথ্যে ছিল সেটা বহু আগেই প্রমাণিত হলেও বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় সাম্রাজ্যবাদীদের জবাবদিহিতা কিংবা শাস্তি বিধানের কোনো সুযোগ নেই। এই কারণে তাদের মিথ্যাচারেরও বিরাম নেই। জাতিসংঘ নামের এক শিখণ্ডিকে সামনে রেখে এবং প্রয়োজনমতো তার সকল রীতিনীতিকে পায়ে দলে সাম্রাজ্যবাদীরা নিজেদের স্বার্থে যেকোনো কিছুই করতে পারে।

পারমাণবিক, গণবিধ্বংসী কিংবা রাসায়নিক যে ধরনের অস্ত্রই হোক না কেন, সেটা আছে মূলত সাম্রাজ্যবাদীদের হাতেই। সিরিয়ায় যদি সে ধরনের কোনো অস্ত্র ব্যবহৃত হয়ে থাকে সেটা সরকারবিরোধী গ্রুপের দ্বারাই হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। কেননা এই গ্রুপগুলো সাম্রাজ্যবাদীদের সকল প্রকার সহায়তার দ্বারা পরিপুষ্ট। মধ্যপ্রাচ্যে সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থের সবচেয়ে বড় পাহারাদার হিসেবে রয়েছে যে রাষ্ট্রটি তাহলো ইসরাইল। তাদের রয়েছে পারমাণবিক অস্ত্রের বিশাল এক ভাণ্ডার। সে বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের খেলার পুতুল জাতিসংঘের আণবিক শক্তি সংস্থা নিশ্চুপ রয়েছে। (সংস্থার প্রাক্তন মহাপরিচালক মিশরীয় বংশোদ্ভূত মোহাম্মদ এল বারাদি ইরাক আগ্রাসনকালীন ভূমিকার জন্য পরবর্তীতে পুরস্কৃত হয়েছেন।) অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে তাদের দ্বিতীয় প্রধান দোসর সৌদি আরবের হাতে রয়েছে মার্কিনী অস্ত্র দ্বারা সজ্জিত এক বিশাল সেনাবাহিনী। এই বাহিনীকে রাখা হয়েছে আরব দেশগুলোতে গণতন্ত্রের যেকোনো সম্ভাবনাকে প্রতিহত করার জন্য। মাত্রই দুই বছর আগে তারা বাহরাইনে বিদ্রোহের সময় সে দেশের শাসক গোষ্ঠীর সাহায্যে এগিয়ে এসে সেই বিদ্রোহ দমন করেছিল। এই দেশগুলো (এবং একই সাথে উপসাগরীয় অন্যান্য দেশ) নিকৃষ্ট শাসক গোষ্ঠীর দ্বারা পরিচালিত হলেও যতোক্ষণ তারা সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থের রক্ষক হিসেবে নিজেদের ভূমিকা বজায় রাখছে ততোক্ষণ পর্যন্ত তাদের আশ্রয়প্রশ্রয় দেয়াই মার্কিনীদের কর্তব্য। এই দেশগুলো তেল বাণিজ্য সহ অন্যান্য ক্ষেত্রে এখানে মার্কিনী স্বার্থের দেখভাল করছে। এরা নিজেদের প্রতিরক্ষার নামে তেলের বিনিময়ে প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র ক্রয় করে থাকে। এর মাধ্যমে একদিকে সাম্রাজ্যবাদীদের জ্বালানি চাহিদা যেমন পূরণ হয় অন্যদিকে অস্ত্র বিক্রয়ের মাধ্যমে তারা প্রভূত মুনাফাও অর্জন করে।

তবে এই অবস্থা যে চিরকাল একভাবে চলবে এমন নয়। অনেকেরই মধ্যে ধারণা আছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এতোটাই শক্তিশালী যে ভবিষ্যতে তাদের পতন কিংবা পরাজয়ের কোনো সম্ভাবনা নেই। বিশ্ব অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির ঐতিহাসিক বিশ্লেষণে সামর্থ্যের অভাব এই ধরনের চিন্তাভাবনার জন্য অনেকাংশে দায়ী। আগেই বলেছি সাম্রাজ্যবাদের যুগে পুঁজিবাদের প্রগতিশীল ভূমিকা বলে কিছু নেই। বর্তমানে বিজ্ঞানের কল্যাণে তা প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের নিত্যনতুন চমক প্রতিনিয়ত আমাদের সামনে হাজির করলেও সে সকল তৎপরতা মূলত নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি ও মুনাফার তাগিদে পরিচালিত হয়ে থাকে। কিন্তু অন্যদিক থেকে দেখলে পুঁজিবাদের বিকাশের বর্তমান পর্যায় তার অর্থনীতির ভিতকে ভেতর থেকে ধসিয়ে দিচ্ছে। বিনিয়োগ উৎপাদনশীল খাত থেকে স্থানান্তরিত হচ্ছে বাণিজ্যিক খাতে। খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এসব কারখানা আবার অনুন্নত, তথা তৃতীয় বিশ্ব হিসেবে পরিচিত দেশগুলোতে স্থাপন করা হচ্ছে। এটাও পুঁজিবাদের বৈশিষ্ট্যের কারণেই ঘটছে। মুনাফা সর্বোচ্চকরণের তাগিদে বিনিয়োগ অর্থাৎ পুঁজির প্রবাহ এখন জনবহুল সস্তা শ্রমের দেশগুলোর দিকে ধাবিত হচ্ছে। এর ফলে একদিকে যা হচ্ছে তাহলো উন্নত বিশ্ব, বিশেষত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদনশীল খাতগুলোর বিকাশ রুদ্ধ হয়ে সেখানে ব্যাংকবীমা সহ অর্থকরী খাতের জয়জয়কার দেখা যাচ্ছে। অতএব সেখানকার শ্রমিকরা ব্যাপক হারে বেকার হচ্ছেন। অন্যদিকে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা কিংবা মুনাফা পরিস্থিতি বজায় রাখার জন্য একটি প্রতিষ্ঠান যে আরেকটির সাথে একীভূত হচ্ছে তার ফলেও জনশক্তির বড় অংশ চাকরি হারাচ্ছেন। তাদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। তারা রাস্তায় নেমে আসছেন। বেকার সমস্যা প্রতিটি প্রেসিডেন্সিয়াল নির্বাচনেই তাদের প্রার্থীদের একটি প্রধান ইস্যু হিসেবে দেখা দেয়। এটা হলো সঙ্কটের একটি দিক। এর আরেকটি দিক হলো এই যে, ব্যাপক হারে শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর বিকাশ রুদ্ধ হওয়ায় ব্যাংকবীমার মতো সুদী কারবারগুলোও তাদের ফুলেফাঁপা অবস্থার মধ্যে থেকে হঠাৎ করে সঙ্কটের আবর্তে নিক্ষিপ্ত হচ্ছে। নিউ ইয়র্কের ওয়ালস্ট্রিট কেন্দ্রিক এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যাপক রাষ্ট্রীয় ভর্তুকির মাধ্যমে টিকিয়ে রাখতে হচ্ছে। এর ফলে জনসেবা এবং সামাজিক নিরাপত্তামূলক খাতগুলোর ব্যয় বরাদ্দ কমিয়ে দিতে হচ্ছে। এদিক থেকেও জনগণের মধ্যে ক্ষোভ ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

অর্থাৎ আন্তর্জাতিক পুঁজিবাদের প্রধান ব্যবস্থাপক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন উভয় সঙ্কটে। এই সঙ্কট বিশ্ব পুঁজিবাদের অভ্যন্তরে বিদ্যমান যাবতীয় অসঙ্গতি, স্ববিরোধিতা এবং বৈপরীত্য থেকে উদ্ভূত। পুঁজিবাদের কল্যাণে বৃহৎ কলকারখানা প্রতিষ্ঠার যুগে শিল্প এলাকায় যে বিশাল সব শ্রমিক সমাবেশ ঘটেছে তার ফলে উৎপাদিকা শক্তি অর্থাৎ উৎপাদনকে কেন্দ্র করে মানুষের যাবতীয় তৎপরতার সামাজিকীকরণ হয়েছে। এর সাথে উৎপাদন যন্ত্রের ব্যক্তিমালিকানা চরিত্রের দ্বন্দ্ব এর একটি বিশেষ দিক। এটা সাম্রাজ্যবাদের যুগে পুঁজিবাদের বিকাশের দ্বন্দ্বের অনিবার্য ও ঐতিহাসিক গতিপথ। এই সকল সঙ্কটের পাশাপাশি জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ, ব্র্যাডলি ম্যানিং, এডওয়ার্ড স্নোডেন, জন পারকিন্স প্রভৃতি তাদের নিজেদের লোকজনই এখন অভ্যন্তরীণ যে সকল তথ্য ফাঁস করে মার্কিন প্রশাসন, পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা দপ্তর তথা তাদের হর্তাকর্তাদের বিভিন্ন কুকীর্তি জনসমক্ষে নিয়ে আসছেন সেটিও মার্কিন সহ বিশ্বের নাগরিকদের চোখ খুলে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। এদিক থেকেও সাম্রাজ্যবাদী শাসকরা এখন পর্যুদস্ত অবস্থায়।

সবদিক থেকে পরিস্থিতি সামাল দেয়া তাদের জন্য যথেষ্ট কঠিন হওয়ায় এর থেকে উদ্ধার লাভের জন্য তারা যুদ্ধ ও সামরিক হস্তক্ষেপের রাজনীতির ওপর অধিকতর হারে নির্ভরশীল হচ্ছে। এই দিক দিয়ে ডেমোক্র্যাট এবং রিপাবলিকানদের মধ্যে অতীতে যে কাজের পদ্ধতিগত কিছুটা ব্যবধান লক্ষ করা যেতো সেটাও এখন লোপ পাচ্ছে। পূর্বেই বলা হয়েছে সাম্রাজ্যবাদ তার মুনাফা এবং পুঁজির স্বার্থরক্ষার শেষ পর্যায়ে গিয়ে সামরিক আগ্রাসনের পথ নেয়। এর সাথে আরো একটা কারণ যুক্ত হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার নিজের অভ্যন্তরের অর্থনৈতিক সঙ্কট, বেকারত্ব, দেউলিয়াপনা, মূল্যস্ফীতি, সামাজিক অস্থিরতা প্রভৃতি থেকে দেশের নাগরিকদের দৃষ্টি সরানোর জন্য সন্ত্রাসবাদ, মুসলিম জঙ্গিবাদ প্রভৃতি ইস্যু সামনে নিয়ে আসা সহ বিশ্বের ‘অবাধ্য’ রাষ্ট্রগুলোয় গণতন্ত্র, মানবাধিকার, বাকস্বাধীনতার অনুপস্থিতিতে অশ্রুপাত করছে। এই দেশগুলোয় গণতন্ত্রের ধ্বজা উত্তোলনের লক্ষ্যে তারা সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের সপক্ষে জনমত নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালাচ্ছে। তাদের দেশের প্রধান মিডিয়াগুলো এই উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য সম্ভাব্য সকল প্রচারকার্য চালাচ্ছে।

কিন্তু এই যুদ্ধনির্ভরশীলতাও তাদের দূর ভবিষ্যতে রক্ষা করতে পারবে সে সম্ভাবনা কম। কেননা মাত্র বিগত এক যুগেই গণতন্ত্র, মানবাধিকার প্রভৃতির নামে দেশে দেশে তাদের যাবতীয় কুকীর্তির স্বরূপ জনগণের চোখে এখন অনেকটা স্পষ্ট। নিজেদের পুঁজিপ্রবাহকে অবাধ ও দ্রুততর করার স্বার্থে তারা বিশ্ব যোগাযোগ ব্যবস্থার যে অভূতপূর্ব উন্নয়ন ও বিকাশ সাধন করেছে এক্ষেত্রে সেটা বিপরীতমুখী পথে তাদেরকে লক্ষ্যবস্তু করেই তাদের দিকে তীর হয়ে ফিরে আসছে। ইরান কিংবা সিরিয়ায় আরেকটি যুদ্ধ তাদের গণবিরোধী চরিত্রকে বিশ্ববাসীর সামনে আরেক দফা স্পষ্টই করবে কেবল। একই সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সঙ্কটও ক্রমাগত ঘনীভূত হবে। জনগণ যখন দেখতে পাবেন যে তাদের বেকার সমস্যার সমাধান হচ্ছে না; স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা সহ কল্যাণমূলক খাত থেকে অর্থ সরিয়ে নেয়া হচ্ছে এবং সেগুলো আর্থিক খাতের কিছু কালপ্রিটের ব্যবসায়বাণিজ্যকে রক্ষা ও স্ফীত করার জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে আবার অন্যদিকে সরকার কেবল মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের ধুয়া তুলে দেশে দেশে যুদ্ধ বাধিয়ে বসছে, তখন নিশ্চিতই সেখানে সামাজিক অস্থিরতা বৃদ্ধি পাবে। এর প্রতিফল হিসেবে বিভিন্ন রকম অপরাধমূলক তৎপরতা, আইন অমান্যের প্রবণতা, বিক্ষোভ প্রদর্শন, নৈরাজ্য ইত্যাদিও বৃদ্ধি পাবে।

তবে মানুষের মন এক বিস্ময়কর বস্তু। মানবেতিহাসের প্রতিটি বাঁকে তা যুগান্তকারী সমস্ত কাণ্ডকীর্তির স্বাক্ষর বহন করছে। সুতরাং মানুষ কোনো দীর্ঘস্থায়ী নৈরাজ্যিক পরিস্থিতিতে বসবাস করতে পারে না। সে তখন নিজের অস্তিত্বের স্বার্থেই তাকে প্রতিস্থাপন করে উন্নততর কোনো জীবনদর্শনের দ্বারা। আলোচ্য ক্ষেত্রেও পুঁজিবাদ ও তার সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক রূপ বৈশ্বিক সাম্রাজ্যবাদের শেষ মুখোশটাও যখন খসে পড়বে এবং এই ব্যাধির দ্বারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনুগামী অপরাপর সাম্রাজ্যবাদী দেশও কমবেশি আক্রান্ত হবে তখন মানুষ নিজের বাঁচার প্রয়োজনেই বর্তমান ব্যবস্থাকে ছুঁড়ে ফেলে ভিন্ন মতাদর্শের কোনো ব্যবস্থার দ্বারা সে শূন্যতা পূরণ করবে। তবে সেটা যে রাতারাতি ঘটবে এমন নয়। এর জন্য সচেতন প্রয়াসের প্রয়োজন রয়েছে। রয়েছে বিশ্বব্যাপী মানবতার সপক্ষে প্রগতিশীল রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের জোরালো তাগিদ। উদ্ভূত হয়েছে দেশে দেশে ধর্মবর্ণলিঙ্গ নির্বিশেষে মানুষের সাথে মানুষের ঐক্য গঠনের ঐতিহাসিক প্রয়োজনীয়তা। মানব সমাজ এখন তার মুক্তির জীবনদর্শনের আগমনধ্বনির জন্য কান পেতে আছে।।

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s