কর্পোরেটোক্রেসি, সাম্রাজ্যবাদের নয়া চেহারা ও বাংলাদেশ (শেষ পর্ব)

Posted: অগাষ্ট 18, 2013 in মতাদর্শ
ট্যাগসমূহ:, , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , ,

লিখেছেন: জাহেদ সরওয়ার

প্রথম পর্বের পর

Corporatocracy-2কর্পোরেটোক্রেসির প্রতিটি কাজের পেছনে রয়েছে গোপনীয়তা। তাদের কর্মকাণ্ড সাধারণের আয়ত্তের বাইরে। ভিতরে কি হচ্ছে তা বাইরে থেকে বুঝার কোনো উপায় থাকে না। কারণ দুনিয়ার অধিকাংশ মিডিয়া কর্পোরেটোক্রেসির অংশ। ন্যাশনাল ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশনের (এনবিসি) মালিক হচ্ছে জেনারেল ইলেকট্রিক কোম্পানি। আমেরিকান ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশনের (এবিসি) মালিক হচ্ছে ডিজনি। ভায়াকম হচ্ছে কলম্বিয়া ব্রডকাস্টিং সার্ভিসের (সিবিএস) মালিক। ক্যাবল নিউজ নেটওয়ার্ক (সিএনএন) হচ্ছে আমেরিকা অন লাইন টাইম ওয়ার্নার গ্রপের অংশ।

১৯৮৬ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১৫০০ দৈনিক সংবাদপত্র, ১১০০০ ম্যাগাজিন, ৯০০০ রেডিও, ১৫০০ টেলিভিশন স্টেশন, ২৪০০ বই প্রকাশক, ৭টি চলচ্চিত্র স্টুডিও ছিল। প্রায় ২৫০০০ অধিক মিডিয়া সংস্থা। কিন্তু এসব সংস্থার বেশিরভাগই আকারে ক্ষুদ্র ও স্থানীয়। স্থানীয় সংবাদ ছাড়া সকল রকমের সংবাদের জন্যই তাদেরকে বড় বড় জাতীয় কোম্পানি ও বার্তাসংস্থার ওপর নির্ভর করতে হতো। মিডিয়ার এই বিপুল সংখ্যাধিক্য থাকলেও সংবাদপত্র প্রকাশনার অর্ধেকের বেশি, এবং ম্যাগাজিন, টেলিভিশন, বই, ও চলচ্চিত্রের বেশিরভাগই মাত্র ২৯ টি অতিকায় মিডিয়া সংস্থার হাতে।

নোয়াম চমস্কির হিসাব মতে এটা এখন ২৪ টা মিডিয়া সংস্থায় সীমাবদ্ধ। কারণ অতিকায় কোম্পানিগুলা নিয়মিত অপেক্ষাকৃত ছোট মিডিয়া কোম্পানিকে গিলে ফেলে। যেমন, আরসিএর মালিক জেনারেল ইলেকট্রিক কর্তৃক এনবিসি নেটওয়ার্কের মালিকানা গ্রহণের ঘটনা এবং ওয়েস্টিংহাউসের মালিকানাধীন প্রধান প্রধান টেলিভিশন সম্প্রচার স্টেশন, একটা কেবল নেটওয়ার্ক ও একটা রেডিও স্টেশন নেটওয়ার্ক। জেনারেল ইলেকট্রিক এবং ওয়েস্টিংহাউস উভয়ই অতিকায় বহুজাতিক কোম্পানি, যারা সমরাস্ত্র উৎপাদন ও পরমাণু শক্তির মতো বিতর্কিত ক্ষেত্রেও গভীরভাবে জড়িত। কর্পোরেটোক্রেসির স্বার্থহানিকর বা পথের বাধা কোনো সরকার প্রধানকে হত্যা, ক্যু, অপদস্ত করতে এই মিডিয়াসংস্থাগুলো ব্যাপক ভূমিকা রাখে। এরা মূল সত্য ঘটনাকে খেয়ে ফেলে উগরে দেয় মনগড়া বানানো খবর। যাকে সাম্প্রতিক সাংবাদিকতার জগতে বলা হচ্ছে ক্রিয়েটিভ নিউজ। অর্থাৎ যা নয় তা বানিয়ে তোলা।

বাংলাদেশেও মিডিয়ার নিয়ন্ত্রণ চলে গেছে এখন কয়েকটি পুঁজিবাদি গোষ্ঠীর হাতে। বেশির ভাগ পত্রপত্রিকা ও ভিজুয়াল মিডিয়ার মালিক বসুন্ধরা গ্রুপ, যমুনা গ্রুপ, ব্যাক্সিমকো ইত্যাদি। সাংবাদিকতা এখন পরিণত হয়েছে খেপ মারায়। দেশে সাংবাদিকতা এখন আর কোনো গণচেতনামূলক পেশা নয়। গতর খাটা শ্রমিকদের সাথে সাংবাদিকদের আর তেমন কোনো পার্থক্য নাই। কেবল পার্থক্য হচ্ছে গতর খাটা শ্রমিক কেবল তার দৈহিক শ্রম বিক্রি করে। সাংবাদিককে বিক্রি করতে হয় দৈহিক শ্রম ও আদর্শ। এই জন্য তার শ্রমের মূল্য বেশি। একজন সাংবাদিকের ব্যক্তি আদর্শের কোনো মূল্য নাই মিডিয়ামালিকের কাছে। কোন নিউজ কিভাবে প্রকাশিত বা প্রচারিত হবে তা মিডিয়ামালিকের স্বার্থানুযায়ী তৈরি হবে। সেখানে একজন ব্যক্তি সাংবাদিক নিতান্ত অসহায়।

যাইহোক তৃতীয় বিশ্বের অধিকাংশ দেশের মিডিয়া এইসব মার্কিন মিডিয়াসংস্থার ওপর অনেকাংশেই নির্ভরশীল। বহুজাতিক বাণিজ্যিক সংস্থাগুলোই দুনিয়ার অধিকাংশ খবরের কাগজ, সাময়িকী, প্রকাশনা সংস্থা, চলচ্চিত্র, রেডিও ও টেলিভিশন নেটওয়ার্কের মালিক।

এডওয়ার্ড সাঈদ বলেছিলেন, তৃতীয় বিশ্বের বাসিন্দারা গুটিকয় পশ্চিমী সংবাদসংস্থার ওপর নির্ভরশীল যেমন সিএনএন, বিবিসি, নিউইর্য়ক টাইমস, কমেন্টারি, আটলান্টিক ইত্যাদি। এই সব সংবাদসংস্থার কাজ হলো সংবাদগুলো তৃতীয় বিশ্বে স্থানান্তরিত করা, এমনকি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় সংবাদগুলো তৃতীয় বিশ্বেরই কোনো একটা অঞ্চল সম্পর্কিত। অর্থাৎ তৃতীয় বিশ্ব খবরের উৎস হবার পরিবর্তে পরিণত হয়েছে সংবাদ ভোক্তায়। তৃতীয় বিশ্ব তার নিজের সম্পর্কে জেনে নিচ্ছে পশ্চিমের তৈরি বিভিন্ন ভাবমূর্তি, ইতিহাস ও তথ্যের আলোকে। এমনকি খোদ সাদ্দাম হোসেনও নাকি সংবাদের উৎস হিসাবে সিএনএন এর উপর নির্ভর করতেন।

১৯৭২ সালে বাংলাদেশে পর পর আসেন বিশ্বব্যাংকের তৎকালীন প্রধান রবার্ট মেকনামারা ও কানাডিয় উন্নয়ন সংস্থা সিআইডি এর প্রধান মসিয়ে লাজোয়া। লাজোয়া এক সংবর্ধনাসভায় ঘোষণা দেন, কানাডা বাংলাদেশকে ৪৫ মিলিয়ন ডলারের অনুদান দেবে। আর মেকনামারা তৎকালীন অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদের কাছে জানতে চেয়েছিলেন, বাংলাদেশের কোথায়, কি ধরণের সাহায্য প্রয়োজন হবে? অথচ একাত্তরেই বাংলাদেশের তীব্র বিরোধীতা করেছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের জন্ম চায়নি। তারা চেয়েছিল যে কোনো মূল্যে পাকিস্তান অবিভক্ত থাক। কিন্তু সেটা না পারলেও যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রন নিয়েছে অন্য উপায়ে।

উত্তরে শিল্পমন্ত্রী তাজউদ্দীন বলেছিলেন, আমার সন্দেহ আমাদের যা প্রয়োজন তা আপনারা সত্যিই দিতে পারবেন কিনা। মেকনামারা বলেছিলেন, মিস্টার মিনিস্টার, আমি আপ্রাণ চেষ্টা করবো আপনাদের সাহায্য দিতে।

তাজউদ্দীন প্রায় নির্দি¦ধায় বলেছিনে, মিস্টার মেকনামারা, আমাদের দরকার গরু ও দড়ি।

সত্যিকার অর্থে তাজউদ্দীন আহমেদের এইধরনের উপলব্দির খেসারত বহুভাবে দিতে হয়েছে তার মন্ত্রিত্বের সময়ে। তিনি পরিণত হয়েছিলেন মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের অপছন্দের ব্যক্তিতে।

শুধু একাত্তরে নয় বাংলাদেশের দিকে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের দৃষ্টি আরো অনেক আগে থেকেই নিবদ্ধ ছিল। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর উদ্বিগ্ন ছিল পূর্ব বাংলায় বামপন্থী রাজনীতির প্রভাব নিয়া। ১৯৪৮ সালে কলকাতায় ভারতিয় কমিউনিস্টদের উদ্যোগে যখন পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠা হয়, তখন পূর্ব পাকিস্তানের জন্য পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টির এই নামে একটি প্রাদেশিক দল গঠনেরও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ভারতিয় ও পাকিস্তানি কমিউনিস্টরা সে সময় এ কথা শক্তভাবে বিশ্বাস করতেন, রাজনৈতিকভাবে দুর্বল ও অস্থিতিশীল পাকিস্তানে কমিউনিস্ট বিপ্লব সময়ের ব্যাপার মাত্র। যার জন্য তাঁরা পাকিস্তানের উভয় অংশে সশস্ত্র বিপ্লবের একটি কর্মসূচি গ্রহণ করে। চীনে কমিউনিস্ট পার্টি ক্ষমতায় আসায় তাদের সে বিশ্বাস আরো বদ্ধমূল হয়। কিন্তু কোনো বিপ্লবী গণঅভ্যুত্থানের আগেই পাকিস্তানের কমিউনিস্টদের ওপর নির্যাতন শুরু হয়ে যায়। অভিযোগ ওঠে, সেনাবাহিনীর একাংশের যোগসাজশে কমিউনিস্টরা সামরিক অভ্যুত্থানের চেষ্টায় রয়েছেন। একই অভিযোগে পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্টরাও সরকারি আক্রমণের শিকার হন, ফলে তাঁদের অনেকেই আত্মগোপনে বাধ্য হলেন।

প্রকাশ্য কার্যকলাপ নিষিদ্ধ হলেও এই দলের প্রভাব বিশেষ করে ছাত্রশিক্ষক ও বুদ্ধিজীবী মহলে তাঁদের জনপ্রিয়তা, বেশ লক্ষণীয় ছিল। কমিউনিস্ট বা কমিউনিস্ট ভাবপন্ন বুদ্ধিজীবীদের একটা বড় অংশ হিন্দু হওয়ায় এবং কমিউনিস্ট পার্টি বাংলার উভয় সীমান্তে অভিন্ন কর্মসূচি নিয়ে রাজনৈতিক আন্দোলন পরিচালনা করায় মুসলিম লীগ সরকারের উদ্বেগ আরও বেড়ে যায়।

আমেরিকার সাথে আঁতাত গড়ার ব্যাপারে প্রথম আগ্রহ প্রকাশ করেন মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। ওয়াশিংটনে পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত ইস্পাহানির মাধ্যমে পাঠানো এক অনুরোধে জিন্নাহ এ কথা স্পষ্ট করে দেন যে পাকিস্তান আমেরিকার সঙ্গে সামরিক জোট বাঁধতে আগ্রহী। সামরিক সাহায্যের বদলে আমেরিকা যা চায়, পাকিস্তান তাই দিতে প্রস্তুত। এ সময় জিন্নাহর নির্দেশে তৈরি এক গোপন সামরিক নথিতে সোভিয়েত ইউনিয়নের হাতে পাকিস্তান কীভাবে আক্রান্ত হতে পারে এবং এর ফলে দক্ষিণ এশিয়ায় মার্কিনস্বার্থ কীভাবে বিঘ্নিত হবে, তার এক রূপরেখা ওয়াশিংটনের হাতে তুলে দেয়া হয়। ভিতরে বাইরে কমিউনিজম যদি ঠেকাতে চাও, তাহলে আমাদের সঙ্গে আঁতাত করোএই ছিল সেই নথির মূলকথা।

এরই সূত্র ধরে ১৯৫১ সালে ‘পূর্ব বাংলায় কমিউনিস্ট রুখতে একটি সমন্বিত কর্মসূচি’ নামের এক কর্মসূচি হাতে নেন মার্কিন প্রশাসন। সম্প্রতি আমেরিকার স্টেট ডিপার্টমেন্ট তাদের পুরানা গোপন নথিপত্র, যা এত দিন সিক্রেট বা ক্লাসিফায়েড বলে বাক্সবন্দী হয়ে পড়েছিল, তা খুলে দিয়েছে। এটি সেই গোপন নথিগুলোর একটি। নথিটি অনুবাদ করেছেন মার্কিন প্রবাসী লেখক হাসান ফেরদৌস। নথিটি পড়া যাক।

[*পূর্ব বাংলায় কমিউনিস্ট রুখতে একটি সমন্বিত কর্মসূচি]

সিক্রেট

১৩ আগস্ট ১৯৫০

উদ্দেশ্য: কমিউনিস্ট প্রভাব দূরীভূত করা এবং পাকিস্তানের নতুন ভাবাদর্শের প্রতি সমর্থনসূচক একটি কর্মসূচি তৈরি।

(এই কর্মসূচি পূর্ব বাংলা সরকারের প্রতি আস্থা ও সমর্থন বাড়াবে, বিশেষ করে গণতান্ত্রিক আদর্শ ও ‘মুক্ত পৃথিবী’র আদর্শেও নীতির ভিত্তিতে অগ্রগতি ও নিরাপত্তা অর্জনের যে প্রচেষ্টা তারা চালাচ্ছে তার প্রতি)

যেসব তথ্যমাধ্যম ব্যবহৃত হবে: সংবাদপত্র, রেডিও, চলচ্চিত্র, প্রকাশনা (বই ও পুস্তিকা), গ্রাফিক আর্টস।

যেসব সংস্থা ও ব্যক্তি বিশেষকে ব্যবহার করা হবে: সাংস্কৃতিক সংস্থা (সাহিত্য,সংগীত ইত্যাদি) পাঠাগার (সরকারি ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত), বক্তৃতা কর্মসূচি ( স্থানীয় ও সোভিয়েত আগ্রাসনের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত, এমন বিদেশিদের ব্যবহার করা হবে)

রাজনৈতিক সংস্থা: বর্তমানে কর্মরত ও ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে এমন।

টার্গেট গ্রুপ: শিক্ষা (প্রধানত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং এর অধীনস্থ ৬৭ টি কলেজ), শ্রমিক ( নেতা, উপদল এবং শ্রমিকদের জন্য প্রকাশনা), সেনাবাহিনী, সাধারণ নাগরিক (কৃষিজীবীদের দলসমূহ, মেয়েদের ক্লাব, যুব সংস্থা ইত্যাদি)

পরিচালন নীতি: ইউসিস এবং পূর্ব বাংলা সরকারের মধ্যে সহযোগিতার কথা গোপন রাখা হবে। সব চেষ্টা করা হবে, যাতে এই কর্মসূচি শুধু মার্কিন কনসুলেটের তিনজন কর্মকর্তা এবং বাংলাদেশ সরকারের তিনজন কর্মকর্তা, যারা এই কাজে সরাসরি যুক্ত থাকবেন, তাদের গোচরে থাকবে। ইউসিস যেখানে যখন সম্ভব পূর্ব পাকিস্তান সরকারের প্রচার বিভাগের পরিচালককে সব মালামাল, সহযোগিতা, উপদেশ দিয়ে সাহায্য করবে। এ কার্যক্রম সম্পূর্ণ গোপন রাখা হবে।

ইউসিস পূর্ব পাকিস্তান তার প্রকাশ্য কর্মসূচি যথারীতি চালিয়ে যাবে।

পূর্ব পাকিস্তান সরকার ইউসিস কর্তৃক সরবরাহ করা মালামাল ও সাহায্য প্রচার বিভাগের পরিচালকের মাধ্যমে ব্যবহার করবে এবং বর্তমান চালু আছে, অথচ ভবিষ্যৎ রিক্রুট করা হবেএমন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি মাধ্যমে তার ব্যবহার করবে।

পরিচালন থিম: সব সমস্যা সমাধানে সক্ষম, এমন মতবাদ হিসাবে অথবা গ্রহণযোগ্য আর্থসামাজিক থিওরি হিসাবে কমিউনিজমকে ভুল প্রতিপন্ন করা।

সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে কমিউনিজমের সাযুজ্য এভাবে দেখানো হবে যে এর ফলে এ কথা প্রতিপন্ন করা সম্ভব হবে যে শব্দটি (কমিউনিজম) ব্যবহার করা হচ্ছে পরিকল্পিত আগ্রাসন লুকিয়ে রাখার জন্য।

কমিউনিজম বাস্তবে কত ভয়াবহ, তা সোভিয়েত নিয়ন্ত্রণাধীন অঞ্চলসমূহ, যারা একসময় স্বাধীন ছিল, তাদের উদাহরণে প্রমাণ করা। এ কথা প্রমাণ করা যে কমিউনিস্টরা ঈশ্বরবিরোধী, ফলে এই মতবাদ মুসলিম বিশ্বের স্বাধীন ধর্মীয় ও রাজনৈতিক অস্তিত্বের জন্য মস্ত হুমকি।

বিভিন্ন দেশ ও জাতির মধ্যে শান্তি ও সহমর্মিতা স্থাপনে কমিউনিস্টদের ক্রমাগত বাধা তুলে ধরা। জাতিসংঘে তাদের ভূমিকা তুলে ধরার মাধ্যমে এ কাজ করা হবে। এ কথা প্রমাণ করা যে কমিউনিস্ট নয়, এমন দেশগুলোয় তারা অর্থনৈতিক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিশৃঙ্খলা ও ভাঙন চায়। কমিউনিস্টদের দলীয় মত হলো, সব চলতি ব্যবস্থা ভেঙেই বিপ্লব সম্ভব।

এই কর্মসূচি ইসলামি সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসমতা দূরীকরণে বিশ্বাস করে তা প্রচার করবে।

চলতি সরকারের প্রতি আস্থা বৃদ্ধির চেষ্টা করা হবে। তারা শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি, প্রাকৃতিক সম্পদের উন্নয়ন ও ব্যবহার, কৃষির আধুনিকীকরণে ব্যবস্থা নিয়েছে। তারা জাতীয় নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক শান্তি রক্ষার উদ্দেশে জাতিসংঘে যোগ দিয়েছে। মুক্ত বিশ্বের শক্তিমত্তা বোঝানোর জন্য তাদের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব, বিশাল প্রাকৃতিক সম্পদ ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কথা তুলে ধরা হবে। কোরিয়া, শুলম্যান প্ল্যান ( পশ্চিম ইউরোপের অর্থনৈতিক সমন্বয়সংক্রান্ত ফরাসি প্রস্তাব) ও আসন্ন প্রশান্ত মহাসাগরীয় চুক্তির (অর্থাৎ সিয়াটো ও সেন্টো সামরিক জোট) উদাহরণে এ কথা দেখানো হবে যে ‘মুক্ত বিশ্ব’ যৌথ কর্মসূচিতে বিশ্বাসী।

মুক্ত বিশ্বে’ মানুষ যার যার ধর্ম পালন করতে পারে, নিজের কথা বিনা বাধায় বলতে পারে, সমাবেশে অংশ নিতে পারে, পত্রপত্রিকায় লিখতে পারে, সে কথা জানানো হবে।

পরিচালন থিমভিত্তিক কার্যকলাপের সীমানা: পূর্ব পাকিস্তান সরকার গঠনমূলক বিষয়ের ওপর জোর দেবে, কিন্তু সরাসরি কমিউনিস্টবিরোধী এমন কাজে অংশ নেবে না।

সব কমিউনিস্টবিরোধী দল বা ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ হবে গোপনে এবং তা হবে যতদূর সম্ভব নিয়ন্ত্রিত।

টার্গেট গ্রুপগুলোর কার্যাবলি

শিক্ষাক্ষেত্র: (প্রধানত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও তার নিয়ন্ত্রণাধীন ৬৭ টি কলেজ)

সংবাদপত্রের ভূমিকা এখানে খুবই সীমিত, যদিও পত্রপত্রিকা ও রেডিও পাকিস্তানকে যদি সঠিক কাগজপত্র ও অনুষ্ঠান দেওয়া যায়, তাহলে ফল পাওয়া যাবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য প্রস্তুত প্রচারপত্র, বই ও চলচ্চিত্রে কমিউনিজমকে সরাসরি আক্রমণ না করে অপ্রত্যক্ষভাবে করা হবে। কমিউনিস্টবিরোধী বলে পরিচিত এমন শিক্ষক ও ছাত্রনেতাদের মাধ্যমে ছাত্র সংবাদপত্র, পাঠচক্র, বিতর্ক ক্লাব, থিয়েটার গঠনের চেষ্টা করা হবে। এই চেষ্টা হবে গোপনে।

একটি লেকচার ব্যুরোর মাধ্যমে বিদেশ থেকে লেকচারার আমদানি করা হবে, এ কাজে পূর্ব পাকিস্তান সরকার জড়িত থাকবে না। সোভিয়েত বলয়ের কোনো দেশ থেকে পালিয়ে এসেছে, এমন লোকজন সংগ্রহের চেষ্টা করা হবে। বুলগেরিয়ার কোনো বহিষ্কৃত মুসলমানকে পাওয়া গেলে তার প্রভাব হবে অভাবনীয়। সম্ভব হলে সমাজবিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও অন্যান্য বিষয়ে খ্যাতনামা ব্যক্তিদের সংগ্রহের চেষ্টা করা হবে। দলীয় ক্রীড়া, গোলটেবিল আলোচনা এবং শিক্ষাক্ষেত্রে উন্নতি হয়, এমন কাজে উৎসাহ দেওয়া হবে। ছাত্রদের মধ্যে যারা ধর্মীয় নেতা তাদের মধ্যে ইসলামে গণতন্ত্রের ব্যবহার বিষয়ে কথা বলতে উৎসাহ দেওয়া হবে।

শ্রমিকশ্রেণি: সব মাধ্যমের ব্যবহার হবে, তা ছাড়া বিশেষ প্রকল্পও গ্রহণ করা হবে। প্রধান প্রধান সংবাদপত্র ছাড়াও শ্রমিকদের জন্য সংবাদপত্রে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে এমন সব ট্রেড ইউনিয়ন সংক্রান্ত কাগজপত্র সরবরাহ করা হবে, যাতে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় থাকার কী কী সুবিধা তার ব্যাখা বিবরণ থাকবে। শ্রমিক সংস্থা, শ্রমিক প্রকাশনা এবং কোনো কোনো শ্রমিকনেতাকে উৎসাহিত করা হবে এবং প্রয়োজনমাফিক সহায়তা দেওয়া হবে (যারা বিশ্বস্ত ও কমিউনিস্টবিরোধী চেতনার পক্ষপাতী)

শ্রমিকদের কাছে অর্থবহ এমন অনুষ্ঠান করতে রেডিও পাকিস্তানকে উৎসাহিত করা হবে। এসব অনুষ্ঠানের লক্ষ্য হবে শ্রমিকেরা যে সমাজের অর্ন্তগত অবিভাজ্য অংশ, বাইরের নয়সে কথা বোঝানো। এসব অনুষ্ঠানে শ্রমিকেরাই ‘ভবিষ্যত পাকিস্তানের সৃজনশীল মেধা’ বলে প্রতিষ্ঠিত করা হবে। পূর্ব বাংলার শ্রমিক গ্রুপগুলোর জন্য বিশেষ শিক্ষা সফর ও সমাবেশের আয়োজন করা হবে। একটি বিনিময় কর্মসূচির জন্য আমেরিকার শ্রমিক ফেডারেশনের সহযোগিতা চাওয়া হবে।

মুক্ত বিশ্বে’র সঙ্গে সংযোগ রক্ষার জন্য একটি নতুন সংস্থা গঠন করা হবে। শ্রমিকদের পত্রিকা সংগ্রাম কে সবরকম সাহায্য সমর্থন দেওয়া হবে। এর মাধ্যমে ও অন্যান্য সংগঠনের সাহায্যে পোস্টার প্রদর্শনী ও স্পিকারস প্রোগ্রাম এ এবং দ্য ফিউচার অব পাকিস্তান নামক অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ায় উৎসাহ দেওয়া হবে।

সেনাবাহিনী: পূর্ব বাংলায় সেনাবাহিনীর জন্য সবচেয়ে কার্যকর উপায় হবে তাদের নিয়মিতভাবে চলচ্চিত্র সরবরাহ করা। অধিকাংশ সেনা কার্যালয়েই চলচ্চিত্র প্রদর্শনের ব্যবস্থা রয়েছে, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র প্রদর্শনকারীও রয়েছে। অধিকাংশ সেনা সদস্য উর্দু বোঝেন, ফলে এ ভাষায় চলচ্চিত্র ডাব করার ব্যবস্থা করা হবে। বিভিন্ন বিষয়ে ফিল্ম দেখানো যেতে পারে। আমাদের (মার্কিন) সেনাবাহিনীর জন্য তৈরি অনেক চলচ্চিত্রই এখানে আদৃত হবে। সেনা প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র সংরক্ষণ বিষয়ে ফিল্ম রাখতে হবে। সেনা নেতৃবৃন্দ এসব ফিল্ম পছন্দ করবেন, কারণ এখানে অস্ত্র সংরক্ষণ বিষয়ে তেমন জ্ঞান নেই। ইউসিস নিয়মিতভাবে ফিল্ম সরবরাহ করবে, তবে এ ব্যাপারে তারা সেনা শিক্ষা কর্মকর্তাদের পরামর্শ গ্রহণ করবে। সেনা কর্মমর্তাদের জন্য টাইম, নিউজ উইক ইত্যাদি ম্যাগাজিন ও অন্যান্য যথাযথ পাঠ্যবস্তু সরবরাহ করা হবে। ইউসিস ফিল্ম ও পাঠ্যবস্তু সংগ্রহে (মার্কিন) প্রতিরক্ষা বিভাগের সাহায্য গ্রহণ করবে।

সাধারণ জনগোষ্ঠী: এ দেশের জনগোষ্ঠীর সবচেয়ে বড় অংশ হলো কৃষিজীবী। স্বাক্ষরতার অভাবের কারণে এদের সঙ্গে যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা খুব কঠিন হবে। এদের সঙ্গে যোগাযোগের সবচেয়ে ভালো মাধ্যম হলো রেডিও ও চলচ্চিত্র। বিশেষ প্রকল্পের অধীনে রেডিওর বিষয়টি আলোচিত হবে।

পূর্ব পাকিস্তান সরকারের কাছে যে ১৭ টি মোবাইল ইউনিট রয়েছে, এর সাহায্যে খুবই কার্যকরভাবে চলচ্চিত্র প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। ইউসিস কাজে লাগে এমন ফিল্ম সংগ্রহে সাহায্য করবে এবং ৩৫ এম এম প্রজেকশন যন্ত্রের সম্পূরক হিসাবে ১৬ এমএম প্রজেক্টরের ব্যবস্থা করতে সাহায্য করবে।

বিশেষ বিশেষ গ্রুপ বা দল সংগঠিত করা হবে। এরকম একটি গ্রুপ হলো ‘পাকিস্তান অ্যাসোসিয়েশন ফর দি ইউনাইটেড নেশনস’। পাকিস্তানের পক্ষে ও গণতন্ত্রের সমর্থক, এমন যুব সংস্থা গঠন করা হবে। এ রকম একটি সংগঠন হলো দ্যা অ্যাসোসিয়েশন ফর স্যোশাল অ্যান্ড ইকোনমিক অ্যাডভান্সমেন্ট, যারা আর্থসামাজিক বিষয়গুলো নিয়ে খোলামেলাভাবে আলোচনা করবে, তবে তাদের মোদ্দা কথা হবে সরকার গণতান্ত্রিক উপায়ে অগ্রগতি অর্জন করছে, পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও আশা এই সরকারের ওপরেই বর্তমান। সংকট মুহূর্তগুলোতে এই সংগঠন সরকারের (পাকিস্তান) পেছনে এসে দাঁড়াবে। সব সমমনা দল, যেমনশিক্ষক, শ্রমিক, নারী, রোটারিয়ান ইত্যাদির সমর্থন অর্জন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এসব গ্রুপকে বিভিন্ন পাঠ্যপুস্তক প্রদান করা হবে এবং সেসবের ব্যবহারে উৎসাহিত করা হবে।

বিশেষ প্রকল্প

রেডিও: শ্রোতাদের আগ্রহ বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক বিষয়ে তাদের জ্ঞানবর্ধন ও মুক্ত বিশ্বের মিত্র ভাবাপন্ন দেশগুলোর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার লক্ষ্যে এবং পূর্ব বাংলার আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়নের প্রতি আস্থা বাড়ানোর লক্ষ্যে বর্তমানে চালু রেডিও প্রোগ্রাম ঢেলে সাজাতে হবে। অনুষ্ঠানগুলোর সংস্কার নাট্যায়নের মাধ্যমে অর্জন সম্ভব। এসব অনুষ্ঠানে বিভিন্ন গ্রুপ, যেমন শ্রমিক, কৃষক, ছাত্র ইত্যাদির ভূমিকার প্রতি সাধুবাদ জানানো হবে। এ ছাড়াও পাকিস্তানের বিভিন্ন প্রদেশ ও জেলাসমূহ বিষয়ে অনুষ্ঠান তৈরি হবে। এই শেষোক্ত বিষয়টি ‘পাকিস্তানকে জানুন’ এই শীর্ষক একটি ক্যাম্পেইনের অংশবিশেষ হতে পারে। অন্যান্য দেশের সংগীত ও সাহিত্য নিয়েও অনুষ্ঠান করা হবে। এ অনুষ্ঠানের নাম হতে পারে বিশ্বসংগীত। সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের অগ্রগতি নিয়ে নাট্যায়নের ব্যবস্থাও থাকতে হবে।

বিশেষ প্রযোজনা, যেমন– ‘রাস্তার মানুষ’ এই নামে সাক্ষাৎকার, স্পট নিউজ এবং শহর, নদী ও কলকারখানা ভ্রমণ শীর্ষক অনুষ্ঠান করতে হবে। পাকিস্তানের ইতিহাস এবং মুসলিম সংস্কৃতির উন্নয়ন প্রসঙ্গ সম্ভাব্য সব সময়ে নাটকের মাধ্যমে তুলে ধরা হবে।

সংবাদপত্র: ইউসিস সম্ভাব্য সব পত্রপত্রিকার সঙ্গে ‘বোঝাপড়া’য় পৌঁছানোর চেষ্টা করবে। ‘প্রান্তবর্তী’ ও বন্ধুভাবাপন্ন সংবাদপত্রকে যথাসম্ভব সাহায্যের চেষ্টা করা হবে। গোপন অর্থসাহায্যে একটি পত্রিকা প্রকাশ করা হবে।

পজিটিভ ভাবনা চিন্তা আছে, এমন বইপত্র প্রকাশ ও এর সমন্বিত বিতরণ নিশ্চিত করতে হবে। প্রবলভাবে কমিউনিস্টবিরোধী বই ও পুস্তিকা বিতরণব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

উন্মুক্ত ও গোপন প্রকাশনার মুদ্রণ ও বিতরণের জন্য একটি কর্মসূচি রাখতে হবে। গোপনে বিতরণ করা হবে, এমন সব সংস্থার মাধ্যমে, যারা সমমনা। (প্রয়োজনবোধে) এ ধরনের সমমনা সংস্থা প্রতিষ্ঠা করা হবে।

চলচ্চিত্র: সময়ের যাত্রা (মার্চ অব টাইম) জাতীয় চলচ্চিত্র এবং সব ধরনের তথ্যচিত্র খুব সহজেই সিনেমা হলে প্রদর্শন করা যায়। কৃষি, স্বাস্থ্যবিধান, রোগ প্রতিষেধক ওষুধ, শিক্ষা, বিজ্ঞান, ভ্রমণ এবং অন্যান্য বিষয়, যা দর্শকদের কাছে টানবে সেসব বিষয়ে তথ্যচিত্র নির্মাণ করতে হবে।

স্কুল ও কলেজগুলোর মাধ্যমে এসব চলচ্চিত্রের বিতরণ নিশ্চিত করা হবে। নাগরিক সংস্থা, সেনাবাহিনী ও শ্রমিক গ্রুপগুলোর জন্যও এসব ফিল্ম বিতরণ করা হবে।

এই ক্যাম্পেইনের অংশ হিসেবে একটি ‘পাকিস্তান নিউজরিল কোম্পানি’ গঠন করা হবে। পাকিস্তানের জনগণের মধ্যে সংহতি অর্জনের উদ্দেশ্য এই কোম্পানি কাজ করবে।

ধর্মীয় নেতা ও গ্রুপগুলো: ধর্মীয় মঞ্চ থেকে যাতে কমিউনিস্টবিরোধী প্রচারণা চালানো যায় সে উদ্দেশ্যে ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে একটি ‘সমঝোতায়’ পৌঁছাতে হবে। এ ক্যাম্পেইনের লক্ষ্য হবে এই কথা বোঝানো, যেহেতু কমিউনিজম ধর্মবিরোধী, ফলে সে ইসলামবিরোধী। (কমিউনিজমের অধীনে) ধর্মীয় গ্রুপগুলোর নির্যাতন, বিশেষ করে মুসলমানদের ওপর নির্যাতন তুলে ধরা হবে এই ক্যাম্পেইনের একটি প্রধান লক্ষ্য।]

হাসান ফেরদৌস তার ৭১’বন্ধুর মুখোশ শত্রুর মুখ বইয়ে বলেন,

রাজনৈতিক দলগুলোর বদলে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ভেতর দিয়ে অনুপ্রবেশের চেষ্টাই এই কর্মসূচির প্রধান লক্ষ্য। স্টেট ডিপার্টমেন্টের নিয়ন্ত্রণাধীন ইউনাইটেড স্টেটস ইনফরমেশনস সার্ভিস (ইউসিস) এর সহায়তায় এই কর্মসূচির মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানের সংবাদপত্র, রেডিও, বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থা এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বকে এই নতুন উদ্যোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট করার চেষ্টার কথা তাতে বলা হয়। সামরিক বাহিনীর সদস্যদের এই কর্মসূচির অন্তর্ভূক্ত করা হয়। আরও আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, ১৯৫০৫১ সালেই সিআইএ বাংলাদেশের মৌলবাদী দলগুলোকে তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য পূরণে সহায়ক ভেবে তাদের সঙ্গে মৈত্রচুক্তি করে। কোন রাখঢাক ছাড়াই বলা হয়, কমিউনিস্টদের রুখতে ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে ‘সমঝোতায়’ পৌঁছাতে হবে। কর্মসূচিটি প্রণয়নে পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকার এবং পূর্ব পাকিস্তান সরকার সিআইএ’র সঙ্গে একযোগে কাজ করে। এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য কমিউনিজম কী ভয়াবহ মতবাদ তা প্রমাণে সর্বাত্মক প্রচারকাজ চালানো। অর্ধশতাব্দী আগে লেখা এই কর্মসূচি এখন পড়তে গেলে অবাক লাগে যে, যে ভাষা একসময় কমিউনিজম ঠেকানোর জন্য ব্যবহৃত হতো, এখন ঠিক একই ভাষা ব্যবহৃত হচ্ছে ইসলামি মৌলবাদ প্রসঙ্গে। ইসলাম ঠেকাতে যে নতুন মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের কর্মসূচি মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট বর্তমানে অনুসরণ করছে, এর সঙ্গে ১৯৫১’র কর্মসূচির আশ্চর্য সাদৃশ্য রয়েছে।

উপরের মার্কিন এই কর্মসূচিটা ভাল করে বুঝার চেষ্টা করলে ৪৭ পরবর্তী বাংলাদেশে সাংস্কৃতিক বিকাশকে বুঝা যাবে। এই সফল উদ্যোগের কি কুফল সমাজের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে তার প্রমাণ আজকের বাংলাদেশ। এমনকি একাত্তরে পাকিস্তানের ভাঙন রুখতে না পারলেও মার্কিন স্বাধীন বাংলাদেশের উপরেও তাদের কর্তৃত্ব পুরাপুরি টিকিয়ে রাখে। বাংলাদেশে সংগঠিত প্রত্যেক সামরিক হত্যাকাণ্ড, রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডে তাদের অংশগ্রহণ ছিল। এমনকি যখন পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সেনা আর গোলাবারুদ আনা হচ্ছিল মার্চে এই লক্ষণগুলো বিবেচনা করে তৎকালীণ আওয়ামীলীগের নেতারা তাজউদ্দিনের নেতৃত্বে শেখ মুজিবকে যুদ্ধঘোষণা করতে বললে তিনি একটা ফোন কলের জন্য অপেক্ষা করছেন বলে জানিয়েছিলেন সেই ফোন কলটিও ছিল মার্কিন দূতাবাসের।

একাত্তরেও পশ্চিমবঙ্গের নকশালীদের শসস্ত্র আন্দোলন যাতে পূর্ববঙ্গে ছড়িয়ে পড়তে না পারে। আর ছড়িয়ে পড়লেও যাতে তাদের হত্যার মাধ্যমে তা রোধ করা যায় তার জন্য গ্রুপ তৈরি করেছিলেন মার্কিন মদদে ভারত। শেখ ফজলুল হক মনির নেতৃত্বে সেই গ্রুপকে ট্রেইনাপ করা হচ্ছিল ‘মুজিব বাহিনী’ নামে। যারা পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধের নিয়ন্ত্রণ হাতিয়ে নিতে চেয়েছিল। এবং যাদের হাতে কমিউনিস্ট সন্দেহে প্রচুর দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধ নিহত হয়েছিলেন।

আর মৌলবিদের মধ্যে দেলোয়ার হোসেন সাঈদীদের উত্থানই হয়েছিল মার্কিন মদদে উপরোক্ত প্রকল্পের অংশ হিসাবে। আজ গ্রাম বাংলার মানুষ আর যাই বুঝুক আর না বুঝুক একটা কথা বুঝে। কমিউনিস্ট শব্দের মানে কাফের, নাস্তিক। ইমাম ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে এইসব প্রপাগাণ্ডা চালিয়ে আসছে তারা। আজ তারা এতই সফলতা লাভ করেছে যে সত্যিকারের কমিউনিস্টরা কমিউনিজমের ভাষায় এদেশে মানুষকে তাদের অবস্থানের কথাও বলতে পারবেন না। তাদের আবিষ্কার করতে হবে বিকল্প কোনো ভাষা যা দিয়ে বৈপ্লবিক সম্পর্ক তৈরি করা যায় গণমানুষের সাথে।

আর মেকনামারার এনজিওগুলো কিভাবে ভেতর থেকে অকার্যকর করে রেখেছে এদেশের মানুষের বিকাশ তাতো চোখের সামনেই দেখতে পাচ্ছি।

শেভরন, অক্সিডেন্ডাল, কনাকো ফিলিপসসের মতো বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর সাথে এদেশে বাণিজ্যিক সম্পর্ক অনেকদিনের। এরা গ্যাস তেল উত্তোলনের নামে এদেশের রাজনীতিকে প্রভাবিত করছে দীর্ঘদিন ধরে। ফুলবাড়িসহ বিভিন্ন জায়গায় জনগণ ইতমধ্যে ফুসে উঠেছে তাদের অপকর্মের বিরুদ্ধে। এদেরকেই সহযোগিতা করার জন্য সম্প্রতি মন্ত্রীসভায় পাশ হয়েছে টিকফা চুক্তি। সংসদে পাশ হয়েছে সন্ত্রাসবিরোধী আইন। টিকফা চুক্তি দ্বিপাক্ষিক বললেও মূলত একপাক্ষিক। মনে রাখতে হবে বৃহৎ পুঁজি সবসময় ক্ষুদ্র পুঁজিকে গ্রাস করে। কর্পোরেটোক্রেসির মতো বৈশ্বিক শোষণ ব্যবস্থাকে দূর্বল দ্বিপাক্ষিক চুক্তি দিয়ে মোকাবিলা করা অসম্ভব। আর সন্ত্রাসবিরোধী আইনের সংশোধনীগুলো সুষ্পষ্ট বিদেশি এসব বহুজাতিক কোম্পানিকে সর্বোচ্চ সুবিধা দেয়া এবং এদেশে তেল গ্যাস ইত্যাদি প্রাকৃতিক সম্পদ আহরনের জন্য অবাধ সুযোগ করে দেয়ার পায়তারা ছাড়া আর কিছু নয়। সুতরাং কর্পোরেটোক্রেসির এই নীলনকশা থেকে দেশ ও দেশের মানুষকে বাঁচাতে বা নিজেরা বাঁচতে গেলে এখনি এইসব বিষয়ে সচেতন ও গণচেতনা তৈরি করা না গেলে গোটা দুনিয়াজুড়ে মানুষের বিকাশ আরো বেশি অবরুদ্ধ হয়ে যাবে।

 

দোহাই

কমিউনিস্ট মেনিফেস্টোকার্ল মার্কস/ফ্রেডরিক এঙ্গেলস, এনবিএকলকাতা।

সাম্রাজ্যবাদ পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ পর্যায়ভ্লাদিমির লেলিন, এনবিএকলকাতা।

এক অর্থনৈতিক ঘাতকের স্বীকারোক্তিজন পার্কিন্স, সংঘ প্রকাশন ঢাকা।

বিশ্বায়ন ভাবনা ও দুর্ভাবনা, এনবিএ কলকাতা।

সম্মতি উৎপাদন গণমাধ্যমের রাজনৈতিক অর্থনীতি অ্যাডওয়ার্ড এস হার্মান, নোয়াম চমস্কি, সংহতিঢাকা।

৭১’বন্ধুর মুখ শত্রুর মুখোশহাসান ফেরদৌস, প্রথমা ঢাকা

তাজউদ্দীন নিঃসঙ্গ এক মুক্তিনায়কইমতিয়ার শামীম, বাংলাপ্রকাশঢাকা

(http;//www.icdc.com/paulwolf/Pakistan/pakindiawars.htm#bangladesh)

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s