কর্পোরেটোক্রেসি, সাম্রাজ্যবাদের নয়া চেহারা ও বাংলাদেশ (পর্ব – ১)

Posted: অগাষ্ট 14, 2013 in মতাদর্শ
ট্যাগসমূহ:, , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , ,

লিখেছেন: জাহেদ সরওয়ার

Corporatocracy-2গোটা দুনিয়াকে নিয়ন্ত্রণ ও শোষণের আওতাভুক্ত করতে উন্নত দেশসমূহের বহুজাতিক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, বিশ্বব্যাংক, বহুজাতিক দাতাসংস্থা, আইএমএফ ও উন্নত দেশগুলির সরকারসমূহ অলিখিতভাবে যে লুটেরা বাণিজ্যিক সংস্কৃতির চর্চ্চা করে থাকেন তাকে বলা হয় কর্পোরেটোক্রেসি। নিজেরা বুঝার জন্য আমরা যার অর্থ করতে পারি ‘সম্মিলিত শোষণাগার’। যা সাম্রাজ্যবাদেরই আরেকটি ধাপ, নয়া চেহারা।

কর্পোরেটোক্রেসিও পুঁজির স্বাভাবিক বিকাশের অংশ। কার্ল মার্কস বলেছিলেন, ‘নিজের প্রস্তুত মালের জন্য অবিরত বর্ধমান এক বাজারের প্রয়োজন বুর্জোয়াশ্রেণিকে সারা দুনিয়াময় দৌড় করিয়ে বেড়ায়। সর্বত্র একে বসতি নির্মাণ করতে হয়, সর্বত্র একে উপনিবেশ স্থাপন করতে হয়, যোগসূত্র স্থাপন করতে হয়।’

ঠিক এই একই জিনিস দেখতে পাই প্রায় আড়াইশ’ বছর পর। জন পার্কিন্স তার বিশ্ববিবেকে সাড়া জাগানো বই ‘এক অর্থনৈতিক ঘাতকের স্বীকারোক্তি’ বইয়ে লেখেন, কর্পোরেটোক্রেসির সদস্যগণ কতগুলো অলিখিত মূল্যবোধ ও লক্ষ্যকে অনুসরণ করেন। এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ক্রমাগতভাবে একে সংরক্ষণ, বিস্তৃত ও শক্তিশালী করা।’

কর্পোরেটোক্রেসি শোষণের বৈশ্বিক সমিতি। রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও রাজনৈতিক ক্ষমতার ছত্রছায়ায় সে কাজ করে। সে বহুরূপী, বিভিন্নরকম মুখোশে সে একেক রাষ্ট্রের কাছে উপস্থিত হয়। বেশিরভাগ সহমর্মী, সহানুভূতিপ্রবণ, উন্নয়নকামী, দরিদ্রের অবতার রূপে সে হাজির হয়। হঠাৎ উন্নয়নের ভুয়া পরিসংখ্যান ও ব্যক্তিগত ব্যাংকবেলান্স ভরিয়ে তোলে, ক্ষমতার চিরস্থায়িত্বের স্বপ্ন দেখিয়ে হাত করে একেকটা দেশের আমলা, বুদ্ধিজীবী, অর্থমন্ত্রীসহ সরকার পক্ষকে।

খানিকটা এনজিওর মতো। প্রথমে একটি পরিবারকে ঋণ নেয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করে, পরে সুদে আসলে সেই ঋণের জন্য ভিটে বিক্রি, ভিটেছাড়া হতে হয় ঋণখেলাপিকে। যদিও এই এনজিও কর্পোরেটোক্রেসিরই অংশ। চীন বিপ্লব ও ভিয়েতনামে মার্কিনিদের পরাজয় সাম্রাজ্যবাদকে যে সমস্যায় ফেলে তা থেকেই এনজিওর জন্ম। ভিয়েতনামের যুদ্ধের সময় মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ছিলেন রবার্ট মেকনামারা। পরবর্তীকালে বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্টের দায়িত্বও পালন করেন তিনি। ভিয়েতনাম যুদ্ধের পরে মার্কিন প্রশাসন মেকনামারাকে যুদ্ধ পরাজয়ের কারণসহ একটা মূল্যায়ন রিপোর্ট তৈরি করতে বলে। সেই রিপোর্টে ভবিষ্যতের জন্য দিকনির্দেশনা হিসাবে ঔপনিবেশিক ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে যুদ্ধের পূর্বে ও যুদ্ধের সঙ্গে সমন্বিত করে সেবাখাতে কল্যাণমূলক সাহায্য সহযোগিতা দেয়ার ধারণা তুলে ধরেন। পরে ১৯৭৩ সালে বিশ্বব্যাংকের পরিচালকমণ্ডলীর সভায় নাইরোবিতে তার ভাষণে এই অবকাঠামোর রূপরেখা ঘোষণা করেন। মেকনামারার সাথে সেদিন বিশ্বব্যাংক ও এশিয়ান উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) এই প্রস্তাব সমর্থন ও এর সাথে একাত্মতা ঘোষণা করেন। সৃষ্টি হয় কর্পোরেটোক্রেসির নয়া অধ্যায় এনজিও। বলা যায় রবার্ট মেকনামারাই এনজিও ধারার মূল আবিষ্কারক। গণমানুষের বিপ্লবী চেতনাকে নস্যাৎ করা, শ্রমজীবীদের একই কাতারভুক্ত হওয়াতে বাধা প্রদান, আজেবাজে বইপুস্তক পড়িয়ে মানুষের চেতনাকে বিভ্রান্ত করে রাখা, ক্ষুদ্রঋণের আবর্তে মানুষকে আটকে ফেলে এমন অবস্থা করা যেন এই জাল কেটে সে আর বেরিয়ে আসতে না পারে। এই এনজিও’র সমন্বয়কারী অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ঘাতক সফল শোষকদের জন্য রয়েছে নোবেল পুরষ্কার, নাইট উপাধি, মেগসেসাইসহ অন্যান্য অর্থকরী পুরষ্কার।

কর্পোরেটোক্রেসি শুধু ঋণ দিয়েই ক্ষান্ত হয় না। জন পার্কিন্স বলেন, মাফিয়াদের মতই কর্পোরেটোক্রেসি সুযোগ সুবিধা বিলায়। এগুলো মূলত ভৌত অবকাঠামো, যেমন বিদ্যুৎকেন্দ্র, হাইওয়ে, সমুদ্রবন্দর, সেতু, রেললাইন, বিমানবন্দর, ও শিল্প স্থাপনা নির্মাণের জন্য ঋণ প্রদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। এসব ঋণের মূল শর্ত হচ্ছে, এসব ভৌত অবকাঠামো নির্মাণের কাজ যে কোনো আমেরিকান কোম্পানিকেই দিতে হবে, এবং সবধরনের যন্ত্রপাতি আমেরিকান কোম্পানি থেকেই ক্রয় করতে হবে। এই ঋণ ওয়াশিংটনের ব্যাংকিং হাউজ থেকে নিউইয়র্ক, হাউস্টন বা সানফ্রান্সিকোর ইঞ্জিনিয়ারিং হাউজে স্থানান্তরিত হয় মাত্র। ঋণের অর্থ হাতে না পেলেও ঋণগ্রহীতা দেশকে এই ঋণ সুদেআসলে পরিশোধ করতে হয়। যখন একজন অর্থনৈতিক ঘাতক পুরাপুরি সফল হয় তখন ঋণের অংক বিশাল আকার ধারণ করে। কয়েক বছরের মধ্যেই ঋনগ্রহীতা দেশটি পরিণত হয় ঋণখেলাপি দেশে। তখনই কর্পোরেটোক্রেসি টুঁটি টিপে ধরে ঋণখেলাপি দেশটির। এরপর শুরু হয় কর্পোরেটোক্রেসির প্রস্তাবের পক্ষে জাতিসংঘে ভোট প্রদান, ঋণখেলাপী দেশে কর্পোরেটোক্রেসির সামরিক ঘাঁটি স্থাপন, বাণিজ্যিক সংস্থাগুলোর কাছে দেশটির প্রাকৃতিক সম্পদ তুলে দেওয়াসহ পরিণত হয় কর্পোরেটোক্রেসির একটা অনিবার্য দাসরাষ্ট্রে।’

কর্পোরেটোক্রেসি ঋণের বিনিময়ে একেকটা দেশকেই গিলে ফেলে। হত্যা করে সে দেশের জনগণ, লুঠ করে দেশটির খনিজসহ সবধরনের সম্পদ। চরম রাজনৈতিক অরাজকতার ভেতর ঠেলে দেয় একেকটা জাতিকে। যার প্রমাণ ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে গোটা দুনিয়াজুড়ে। ইকুয়েডর, ইন্দোনেশিয়া, গুয়েতামালা, ভিয়েতনাম, পানামা,এল সালভাদর, নিকারাগুয়া, কলম্বিয়া, ইরান, ইরাক, ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তানসহ আরো অনেক দেশে। এর বিনিময়ে ভরে উঠতে থাকে বিশ্বকর্তাদের ব্যাংকবেলান্স, সচল থাকে তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতা ও বিলাসবহুল জীবন। সাথে লাভবান হয় আক্রান্ত দেশের বুর্জোয়া বা ক্ষমতাবানরা যারা নিজের দেশটাকে তুলে দিয়ে নিজেদেও বিদেশি ব্যাংক অ্যাকাউন্টগুলো ভরে তুলে। সারা দুনিয়াটাই হয়ে উঠেছে তাদের অবাধ বাজার। বিক্রয় ও ক্রয়ের। বিক্রয় ও ক্রয় উভয়েই তাদের মুনাফা অবধারিত। আর কর্পোরেটোক্রেসির এই ভাল থাকার বিনিময়ে দুনিয়ার কোটি কোটি মানুষ খাদ্য পায় না, চিকিৎসা পায় না, বাসস্থান হারা, বিদ্যুৎ পায় না, শিক্ষা পায় না। যেন বিশ্বের দেশে দেশে তারা টিকে থাকে নতুন ক্রীতদাস হিসাবে। আধপেট খেয়ে বা না খেয়ে খুব সংখ্যালঘু কিছু মানুষের বিলাসীদ্রব্য উৎপন্ন করাই যেন তাদের নিয়তি। এই কর্পোরেটোক্রেসির অংশীদার শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা উন্নত দেশসমূহ নয়। বরং উন্নয়নশীল ও দরিদ্র দেশের ধনীরাও এর শরিক। শ্রেণিগতভাবে একই শ্রেণিভুক্ত হওয়ার কারণে যে কোনো দেশের ধনীরা খুব দ্রুতই কপোরেটোক্রেসির সদস্য হয়ে পড়ে।

আবার মার্কসের কাছে ফিরে যেতে হয়। তিনি বলেছিলেন, গোটা সমাজ ক্রমেই দু’টি বিশাল বিরোধী শিবিরে ভাগ হয়ে পড়ছে, ভাগ হচ্ছে পরস্পরের সম্মুখীন দুই বিরাট শ্রেণিতেশোষক ও দাস।’

জন পার্কিন্সের জবান থেকে জানা যায় কর্পোরেটোক্রেসি তিনভাবে কাজ করে। প্রথম কাজ হচ্ছে অর্থনৈতিক ঘাতদের। পার্কিন্স নিজেও একজন অর্থনৈতিক ঘাতক ছিলেন। এদের মূলত অর্থনীতিবিদ বলা হয়। এদের চাকরী দেয় বহুজাতিক বাণিজ্য সংস্থাগুলো। এদের খুঁজে বের করে সিআইএ। এদের কাজ হচ্ছে টার্গেট দেশটিতে গিয়ে সে দেশের উন্নয়নের পূর্বাভাস তৈরি করা। যে পূর্বাভাসের সিংহভাগই মিথ্যা আশ্বাস ছলছাতুরী।

অর্থনৈতিক ঘাতকরা কোনো দেশের প্রেসিডেন্ট বা প্রধানকে সহজ অর্থনীতির ভাষায় লোভ দেখিয়ে বাগে আনতে ব্যর্থ হলে মাঠে নামে কুখ্যাত শৃগাল বাহিনী। এরা মূলত সিআইএ’র প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত খুনীর দল। এরা সেই রাষ্ট্র প্রধানকে এমনভাবে সরিয়ে দেয় যাতে আতংক ছড়িয়ে পড়ে এবং কোনো প্রমাণ না থাকে।

এই শৃগাল বাহিনী মাত্র দু’মাসের ব্যবধানে হত্যা করে ইকুয়েডরের প্রেসিডেন্ট হাইমে রোলদো ও পানামার প্রেসিডেন্ট ওমর তোরিজাকে। দু’জনই ছিলেন স্ব স্ব দেশের আপোসহীন বিপ্লবী ও জাতীয়তাবাদী নেতা। দু’জনকেই হত্যা করা হয় উড়ন্ত বিমানে বিস্ফোরক ফাটিয়ে। খুব সহজেই যাকে বলা যায় বিমান দুর্ঘটনা। অর্থনৈতিক ঘাতক ও শৃগাল বাহিনী উভয়েই ব্যর্থ হলে যুদ্ধ অনিবার্য। যেমন ইরাকে দুই বাহিনীই ব্যর্থ হওয়ায় যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে পড়ে। যাকে কর্পোরেটোক্রেসির অন্যতম অংশীদার বুশ বলেছিলেন পবিত্র যুদ্ধ বা ক্রুসেড, আসলে যা ছিল হলি ওয়ার ইন কর্পোরেট। এই ‘পবিত্র’ যুদ্ধও কর্পোরেটোক্রেসির আরেক বাণিজ্য। কর্পোরেটোক্রেসি জানে যুদ্ধে তার জয় অবধারিত। তাই সে যুদ্ধাক্রান্ত দেশের ভৌত অবকাঠামো ও বৃহৎ ঐতিহ্যিক স্থাপনাগুলা উড়িয়ে দেয়। দেশটাকে পরিণত করে রক্তাক্ত অন্ধকার দান্তের নরকে। সেই দেশের প্রাকৃতিক সম্পদের বিনিময়ে দেশটার অবকাঠামো পুননির্মানের দায়িত্ব দেয় কর্পোরেটোক্রেসিরই খুটি বিশ্ববাণিজ্য সংস্থাগুলার নির্মাণশাখাকে। বিশাল বিশাল ইমারতের আড়ালে তারা লুঠে নেয় দেশটার প্রাণটুকু। যাতে দেশটা পুরাপুরি আটকে পড়ে কর্পোরেটোক্রেসির জালে। আর বলাই বাহুল্য এই কর্পোরেটোক্রেসির অন্যতম চালিকা শক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

অর্থনৈতিক ঘাতকদের উৎপত্তির খানিকটা ইতিহাস আছে। ১৯৫১ সালে ইরান একটি বৃটিশ পেট্রোলিয়াম কোম্পানির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। প্রতিষ্ঠানটি ইরানের পেট্রোলিয়াম সম্পদ ইচ্ছামতো লুটপাট করছিল। এর জবাবে তৎকালীন জনপ্রিয়, গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মোসাদ্দেক ইরানের পেট্রোলিয়াম সম্পদকে জাতীয়করণ করলেন। ক্রুদ্ধ বৃটেন এই সংকট থেকে পরিত্রাণ পাবার জন্য দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা চাইল। সরাসরি আক্রমণ চালালো না সোভিয়েত ইউনিয়নের ভয়ে। তাই পরিকল্পিতভাবে ইরানে পাঠানো হয় আমেরিকার ২৬তম প্রেসিডেন্ট থিওডোর রুজভেল্টের নাতি কারমিট রুজভেল্টকে। কারমিট ছিলেন সিআইএ’র এজেন্ট। তিনি ঘুষ দিয়ে, ভয় দেখিয়ে ইরানের শাসক শ্রেণির একাংশকে কব্জা করলেন। দুর্নীতি পরায়ণ আমলাদের কাজে লাগিয়ে গোটা ইরান জুড়ে সহিংস বিক্ষোভ ও দাঙ্গা ছড়িয়ে দেয়া হলো। অবশেষে ইরানের সেনাবাহিনী মোসাদ্দেক সরকারকে উৎখাত করে আমেরিকাপন্থী মোহাম্মদ রেজা শাহকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনলো। এরপর দীর্ঘদিন রেজা শাহ অপ্রতিহত স্বৈরতান্ত্রিকভাবে শাসন করেছে ইরান। আর মোসাদ্দেকের বাকি জীবন কেটেছে গৃহবন্দী হিসাবে। কারমিট রুজভেল্ট এক নতুন পেশার সূচনা করলেন অর্থনৈতিক ঘাতক হিসাবে।

পার্কিন্স বলেন, রুজভেল্টের নাতিকে পাইকারিভাবে কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে একটি বড় ঝুঁকি ছিল। তিনি ছিলেন সিআইএ’র এজেন্ট। অপারেশন ইরানের সময় যদি তিনি ধরা পড়তেন তাহলে তা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এক ভয়াবহ আন্তর্জাতিক কেলেংকারী বয়ে আনত। তা না ঘটায় তিনি এক বিদেশী সরকারকে উৎখাতের প্রথম মার্কিন প্রচেষ্টাকে সফল করতে পেরেছিলেন। স্নায়ুযুদ্ধের যুগে এ ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করার প্রয়োজনীয়তা যে বহুবার দেখা দেবে এমন একটি পদ্ধতি উদ্ভাবনের আবশ্যকতা দেখা দিয়েছিল যা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থকে অক্ষুণ্ন রাখবে, কিন্তু সরকারকে কোনো মতেই বেকায়দায় ফেলবে না।

নীতিনির্ধারক মহলের জন্য স্বস্তির উদ্ভব ঘটল গত শতাব্দীর ষাটের দশকে। এটি ঘটল একটি আর্থবাণিজ্যিক বিপ্লবের মাধ্যমে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকাণ্ডের পরিধি গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ল। অন্যদিকে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ এর মত বহুজাতিক দাতা সংস্থাগুলোর গ্রহণযোগ্যতা গোটা বিশ্ব জুড়ে বিস্তৃত হলো। আইএমএফ মূলত যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত হলেও এর নীতিনির্ধারকদের মধ্যে ইউরোপীয়দের প্রাধান্য বেশী। সবচেয়ে জরুরি ব্যাপার এই যে, বিশ্বসাম্রাজ্য গঠনের লক্ষ্যে মার্কিন সরকার, বহুজাতিক দাতা সংস্থা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে পারস্পরিক লাভজনক সহযোগিতার ধারা গড়ে উঠল। এই ধারা বর্তমান বিশ্বে এক অচ্ছেদ্য চক্রে পরিণত হয়েছে।’

তবে রবার্ট মেকনামারাকে কর্পোরেটোক্রেসির মূল উদ্ভাবক বলা যায়। ১৯৬০ সালে মেকনামারা কেনেডি সরকারের প্রতিরক্ষামন্ত্রী হন। রবার্ট মেকনামারার ‘অ্যাগ্রেসিভ লিডারশিপ’ তত্ত্ব এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ও বেসরকারি আমলাতন্ত্রের কর্মকাণ্ডকে নিয়ন্ত্রণ করছে। ১৯৬৯ সালে পদ থেকে বিদায় নেয়ার আগে প্রেসিডেন্ট জনসন তার প্রতিরক্ষামন্ত্রী রবার্ট মেকনামারাকে বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট পদে নিযুক্ত করলেন। মেকনামারা ছিলেন কেনেডিজনসন প্রশাসনে সামরিক বাহিনী ও বাণিজ্যিক শিল্পখাতের যোগসূত্রের মূল অনুঘটক। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় মোটর কোম্পানির প্রেসিডেন্ট ছিলেন। এরপর টানা আটবছর দু’টি কেন্দ্রিয় সরকারের অন্যতম প্রভাবশালী মন্ত্রী ছিলেন। তারপর বৃহত্তম আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী সংস্থার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করেছেন। তার এই উত্থান বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, কেন্দ্রিয় সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থার মাঝে বিদ্যমান সীমারেখাগুলো মুছে ফেলেছে। বিশ্ব অর্থনীতিতে রবার্ট মেকনামারার সবচেয়ে বড় অবদান হচ্ছে বিশ্বসাম্রাজ্য বিস্তারের ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংককে গোটা বিশ্ব জুড়ে ব্যবহার করা।

মেকনামারার এই ধারা পরে আরো প্রবাহিত হয়। তার উত্তরসূরীদের ভেতর দিয়ে এক শক্তিশালী কর্পোরেটোক্রেসি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে। নিক্সনের মন্ত্রিসভায় জর্জ শুলজ ছিলেন অর্থমন্ত্রী ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনা পরিষদের চেয়ারম্যান। এরপর জর্জ শুলজ আমেরিকার অন্যতম বিশ্ববাণিজ্যসংস্থা বেখটেলের প্রেসিডেন্ট পদ লাভ করেন। রিগান সরকারের আমলে তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

কেসপার ওয়েনবার্গার ছিলেন বেখটেলের ভাইস প্রেসিডেন্ট। রিগানের আমলে তিনি প্রতিরক্ষামন্ত্রী হন। রিচার্ড হেমস ছিলেন জনসনের আমলের সিআইএ’র পরিচালক। নিক্সনের আমলে হেমস ছিলেন ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত। রিচার্ড চেনি ছিলেন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের (সিনিয়র) প্রতিরক্ষামন্ত্রী। এরপর তিনি হেলিবার্টন কোম্পানির প্রেসিডেন্ট হন। বুশ (জুনিয়র) আমলে তিনি ভাইস প্রেসিডেন্ট হন। সিনিয়র বুশ ছিলেন জাপাটা পেট্রোলিয়ামের প্রতিষ্ঠাতা। এরপর তিনি নিক্সনের আমলে জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী প্রতিনিধির দায়িত্ব পান। প্রেসিডেন্ট জেরাল্ট ফোর্ডের আমলে তিনি সিআইএ’র পরিচালক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। রিগানের আমলে তিনি ভাইস প্রেসিডেন্ট হন। এরপর প্রেসিডেন্ট।

রাষ্ট্র যে পুঁজির স্বার্থ রক্ষার যন্ত্র বিশেষ এতে তাই প্রমাণিত হয়। এভাবে দাতা প্রতিষ্ঠান, মার্কিন সরকার, বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ সহ সবার অভিন্ন স্বার্থ অভিন্ন লক্ষ্যে কর্পোরেটোক্রেসির বিকাশ।

যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো, যাদের মধ্যে এনএসএ বৃহত্তম, সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক ঘাতকদের খুঁজে বার করে। এরপর আর্ন্তজাতিক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো এসব ঘাতকদের চাকরি দেয়। অর্থাৎ অর্থনৈতিক ঘাতকদের সাথে মার্কিন সরকারের কোনো সম্পর্ক থাকবে না। তাই তাদের কাজের প্রকৃত স্বরূপ যদি কখনো উন্মোচিত হয় তখন তা বাণিজ্যিক লোভ হিসাবেই চিহিৃত হবে। কিন্তু তা কখনও আমেরিকান সরকারকে বিপদে ফেলবে না। অথচ যে সব বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান অর্থনৈতিক ঘাতকদের চাকরি দেবে সেসব প্রতিষ্ঠান বহুজাতিক ব্যংকগুলোর মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় অর্থ পেয়ে থাকে। এই অর্থ মূলত আমেরিকান নাগরিকদের কাছ থেকে সংগৃহীত বার্ষিক কর ও শুল্ক। এভাবেই প্রায় নিজেদের অজান্তে মার্কিন সাধারণ নাগরিকরাও অংশগ্রহণ করছে কর্পোরেটোক্রেসির এই আগ্রাসনে। শুধু মার্কিনইবা বলি কেন তৃতীয় বিশ্বের দেশসমূহের দূর্নীতি পরায়ণ শাসকেরা মানিলন্ডারিংয়ের মাধ্যমে যে সব অর্থ প্রথম বিশ্বে পাচার করে সে সবও ব্যবহৃত হয় এই টাকা বানানোর নৃশংস খেলায়।।

(চলবে…)

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s