লিখেছেন: মনজুরুল হক

পুলিশ হেফাজতে কমরেড চারু মজুমদারের শেষ ছবি

পুলিশ হেফাজতে কমরেড চারু মজুমদারের শেষ ছবি

কমরেড সিএমএর দৃষ্টিভঙ্গীটা গ্রহণ করাই হল আজকের দিনে তাঁর প্রাসঙ্গিকতা। ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনে সিএম ই প্রথম নেতা যিনি দরিদ্র ও ভূমিহীন কৃষককে নেতৃত্বে উন্নীত করার কথা বলেন।

দরিদ্র ও ভূমিহীন কৃষকদের নেতৃত্বে উন্নীত করতে না পারলে যত বড় বিপ্লবী সম্ভাবনাই থাকুক না কেন শ্রেণী সংগ্রাম ব্যর্থ হতে বাধ্য। এই সব কৃষকদের স্কোয়াডকে গণতান্ত্রিক অধিকার দিলেই তাদের বিপ্লবী উদ্যোগ বাড়বে। এই অধিকার দিতে বাধা দেয় আমাদের মধ্যে সংশোধনী চিন্তাধারা। ক্ষমতা দখলের রাজনীতিই পারে তাদের চিন্তাজগতে আলোড়ন আনতে। গ্রামাঞ্চলে দরিদ্র ও ভূমিহীন কৃষকের নেতৃত্ব বিপ্লবী কমিটি প্রতিষ্ঠা করা এবং সেই বিপ্লবী কমিটির নেতৃত্বে ব্যাপক কৃষক জনতাকে সংগ্রামে সামিল করা। এই দুটি কাজ সফলভাবে করতে পারলে ঘাঁটি এলাকা গড়ার সমস্যার সমাধান হবে। মধ্য কৃষককে ধনী কৃষকের প্রভাব থেকে মুক্ত করতে পারে একমাত্র দরিদ্র ও ভূমিহীন কৃষক। এছাড়া আর অন্য কোনো উপায় নেই। গ্রামাঞ্চলে সমস্ত শ্রেনীগুলিকে নির্মূল করার অভিযান পরিচালনা করা যায় একমাত্র গ্রামাঞ্চলে দরিদ্র ভূমিহীন কৃষকদের নেতৃত্ব কৃষক রাজ কায়েম করে। গেরিলাযুদ্ধের বিকাশ ও বিস্তৃতির সংগ্রাম অন্য কোন শ্রেণী পরিচালনা করতে পারে না। কারণ দরিদ্র ও ভূমিহীন কৃষকের মধ্যেই সামন্ত শ্রেণীর বিরুদ্ধে তীব্রতম ঘৃনা সঞ্চিত রয়েছে যুগ যুগ ধরে। এই ঘৃণা সংগ্রামে অবিচলতা আনে। পারে বিপ্লবী জোয়ারকে সৃষ্টি করতে। কারণ, বিপ্লব মূলত তাদের স্বার্থকেই বহন করে। ভারতের বিপ্লবে সিএমএর এই বিশ্লেষণ গোটা গনতান্ত্রিক বিপ্লবের যুগ ধরে প্রাসঙ্গিক থাকবে।

আর একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক হল সিএম তাঁর লেখায় এবং কাজে সব সময় যে দিককে সবচেয়ে বেশী প্রাধান্য দিয়েছেন তা হল এই যে মাও সে তুঙ চিন্তাধারার আলোয় আমাদের দেশে অনুশীলনের এবং প্রয়োগের স্তরকে উন্নত করতে হবে। নকশালবাড়ীতে ভারতে মাও চিন্তাধারার প্রথম প্রয়োগ হল। আর সংশোধবাদীদের সঙ্গে তিনটি প্রশ্নে পার্থক্যের কথা তিনি সুচিহ্নিত করলেন। প্রথমত: গণতান্ত্রিক বিপ্লব একমাত্র সশস্ত্র সংগ্রাম মানে জনযুদ্ধের মারফতই সফল হতে পারে। দ্বিতীয়ত: এই জনযুদ্ধে কেন্দ্র ও প্রধান শক্তি হচ্ছে গ্রাম ও কৃষকশ্রেণী। জনযুদ্ধ হল কৃষকযুদ্ধ। তৃতীয়ত: জনযুদ্ধের বিজয় হতে পারে একমাত্র মাও চিন্তাধারায়। গেরিলাবাহিনী গঠন করে শ্রেণীশত্র“কে ধ্বংস করা পথেই একমাত্র সংগ্রামের জোয়ার দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলতে পারে। সংশোধবাদী চিন্তাধারা শত্র“র শক্তিকে বড় করে দেখায় আর অন্যদিকে জনযুদ্ধ জনগণের শক্তিকে বড় করে দেখাতে উদ্বুদ্ধ করে এবং শত্র“কে ঘৃণা করতে শেখায়। লিন পিয়াও ‘জনযুদ্ধের জয় দীর্ঘজীবি হোক’ বইতে যে পদ্ধতি ও নীতির কথা বলেছেন। তাই হোল মাও সে তুঙ চিন্তাধারার সঠিক প্রয়োগ ও সারা দুনিয়ার বর্তমান যুগের অভিজ্ঞতার সারসঙ্কলন। শ্রেণীবিশ্লেষণ, শ্রেণীসংগ্রাম, অনুসন্ধান ও অনুশীলন এই চারটে হাতিয়ারকে সফল প্রয়োগ করতে পারলে তবেই কৃষকের সশস্ত্র সংগ্রামের এলাকা গড়ে তোলা যাবে।

জাতীয় ঐক্য ও সংহতির প্রশ্নে কমরেড সিএম একটা নতুন দিক নির্দেশ করলেন। আজকের ভারতে রাজীব গান্ধী, বুটা সিং, ভিপি সিং থেকে জ্যোতি বসু সবাই জাতীয় সংহতির ফেরিওয়ালা। সিএম কুড়ি বছর আগেই বলেছিলেন, ‘বর্তমান শাসক শ্রেণীর জাতীয় ঐক্যের আওয়াজের মূল লক্ষ্য একটাই , তা হল একচেটিয়া পুঁজির শোষণের ঐক্য। সুতরাং, ঐ ঐক্যের আওয়াজ প্রতিক্রিয়াশীল। মার্কসবাদীদের এই আওয়াজের বিরোধীতা করতে হবে। প্রতিটি জাতিসত্বার আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে স্বীকার করতে হবে। সামন্ততন্ত্র, সাম্রাজ্যবাদ ও মুৎসুদ্দি বুর্জোয়াদের সরকারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেই ভারতের নতুন ঐক্যের চেতনা আসবে। নাগা, মিজো, কাশ্মীর ইত্যাদি এলাকায় পেটিবুর্জোয়াদের নেতৃত্বে সংগ্রামে যুক্তফ্রন্ট করে শ্রমিকশ্রেণীকে এগোবার কথা তখনই তিনি বলেছিলেন। এই মৈত্রীর পূর্বশর্ত হল সশস্ত্র সংগ্রাম এবং ভিত্তি হল সম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রাম ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার।’ শেষ লেখায় সি এম বললেন, ‘রাজনীতিগতভাবে ঐক্যবদ্ধ পার্টি আমরা যদি গঠন করতে পারি তবেই আমরা পারব ধাক্কা সামলিয়ে উঠতে এবং সংগ্রামকে আরও উন্নত পর্যায়ে তুলতে।’ এবং শহীদ হবার আগের লেখায় এই বিশ্বাস রেখেছিলেন যে সে কাজটা অল্পকালের মধ্যেই তাঁরা করতে পারবেন। পার্টিকে রাজনৈতিকভাবে ঐক্যবদ্ধ করতে পারবেন।”

সিএমকে মোটেই মেডইজি হিসেবে দেখা যাবে না।সিএম এর আউটলুক ও পদ্ধতিই হচ্ছে প্রধান।তা দিয়ে নতুন নতুন সমস্যাকে বিশ্লেষণ করতে হবে। চীনে সংশোধবাদ ক্ষমতা দখল করে নেবার পর যদি সিএমএর রচনাবলীর প্রাসঙ্গিক অংশ পড়া যায় তাহলে দেখা যাবে বিশ্লেষণটাই পাল্টে যাচ্ছে। তাই এক্ষেত্রে যা গুরুত্বপূর্ণ তা হল আন্তর্জাতিকতার মতাদর্শ এবং যা প্রাসঙ্গিক তা’হল তাঁর দুর্দমনীয় স্পিরিট।

প্রায়ই চারু মজুমদার বলতেন,

যে স্বপ্ন দেখেনা এবং অন্যকে স্বপ্ন দেখাতে পারে না সে বিপ্লবী হতে পারে না। সে সমস্যা দেখে অন্যের কাছে ছুটে যায় না। নিজেই সমস্যার সমাধান করে এবং নেতৃত্ব দিতে পারে। তার স্বপ্ন হলো পুরোনো সমাজকে ভেঙ্গে নতুন সমাজ গড়া। এই নতুন সমাজ গড়ার স্বপ্ন সে কৃষককে দেখাবে যদি শ্রদ্ধার চোখ আর শেখার আগ্রহ নিয়ে তার কাছে যায়। এ ক্ষেত্রে বিপ্লবীর কাজটা সেতারির সঙ্গে তুলনা করা যায়। সেতারির আঙ্গুলে সাতটি তার নানা ভাষায় , নানা সুরে কথা বলে, ঠিক তেমনি কৃষক বিপ্লবীর কাছে নতুন সমাজ গড়ার সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বলবে তার জীবনের অনেক গোপন কথা, যার মধ্য দিয়ে আমরা খুঁজে পাবো সমাজের অনেক রূপ,ছন্দ। সেতারি যেমন বারবার তার ছিঁড়িয়ে ছিঁড়তে সৃষ্টি করে অপূর্ব সুর; ঠিক তেমনি গভীর থেকে গভীরতর শেখার প্রচেষ্টা নিয়ে কৃষকের কাছে বারবার গেলেই আমরা খুঁজে পাবো সেই শক্তি যা এই সমাজকে ভেঙ্গে গড়ে তুলতে পারবে নতুন সমাজ। কৃষকদের চুপচাপ দেখে আমরা ভাবছি তারা বোধ হয় জলের মত ঠান্ডা। কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি না যে হাজার বছর ধরে তাদের বুকের মধ্যে দারুণ জ্বালা জমে রয়েছে। ওটা জল নয়, কেরোসিন। তাই একটা দিয়াশলাইয়ের কাঠি জ্বেলে দিলে তা নিভবে না। কারণ কেরোসিন তেলে দেশলাই কাঠি নেভে না, দপ্ করে জ্বলে উঠবে।”

তাঁকে স্মরণের দিনে তাঁকে নিয়ে কী লেখা হল আর কী লেখা হল না সেটা মোটেও গুরুত্বপূর্ণ নয়, গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে তাঁকে ধারণ করা। তাঁকে ধারণের ক্ষেত্রে যে বালখিল্য প্রতিযোগীতা চলছে তাতে করে তাঁর আদর্শ কে কতখানি ধারণ করছে আর কে কতখানি খারিজ করছে সেটাও এতদিনে উন্মোচিত হয়েছে।তার পরও উপমহাদেশের এবং বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের মনে চারু মজুমদার যে আশার স্বপ্ন খোদাই করে দিয়েছিলেন আজও সেই স্বপ্ন বয়ে চলেছে ইতিহাসের উত্তরাধীকার।।

২৮ জুলাই, ২০১৩

[“অসমাপ্ত বিপ্লব অমর বিপ্লবী কমরেড চারু মজুমদার” বই থেকে সংকলিত। লেখক]

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s