লিখেছেন: দীপন জুবায়ের

art works-18বাড়ির চারপাশ এখন ফাঁকা। কদিন আগেও চারদিকে গাছগাছালিতে ভরা ছিল। রাজ্জাকের চিকিৎসার ব্যায়ভার বহন করতেই গাছগাছালি সব বিক্রি করা হয়েছে। মৃত্যুশয্যায় শুয়েও রাজ্জাক ভীষন প্রতিবাদ করেছিলো, গাছগুলো যেন বিক্রি করা না হয়। কিন্তু তার প্রতিবাদ শোনবার মত অবস্থা ছিল না তখন তার হতদরিদ্র পরিবারের। তার চিকিৎসার টাকা জোগাতে শেষমেশ ওই গাছগুলোই বিক্রি করতে হলো। রাজ্জাকের ছোট টিনশেডের বাড়িটা এখন কেমন যেন শ্বশানের মত লাগছে। গাছ বিক্রির টাকায় ডাক্তারের কথামত তার সিটিস্কান করা হলো। সিটিস্কান করে দেখা গেল মাথার ভেতর বড়সড় এক টিউমার বাসা বেধেছে। ডাক্তার গম্ভীর মুখে বলল, রুগির অবস্থা বেশি ভালো না। কোন আশা দেখছি না। বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে যান। যে কদিন বাঁচে ভালো কিছু খেতে দিন। ওনার মনের ইচ্ছেগুলো পুরোন করবার চেষ্টা করেন, সময় শেষ। অনেক দেরি হয়ে গেছে। এখন আর আমাদেও কিছুই করবার নেই।

ডাক্তারের কথামত রাজ্জাককে বাড়ি ফিরিয়ে আনা হল। লাভের লাভ কিছুই হলো না, মাঝখান দিয়ে এত শখের গাছগুলো গেল। রাজ্জাকের বউ মরা কান্না শুরু করে দিলো, তার সাথে ছেলে মেয়েরাও। যখন সুস্থ ছিলো রাজ্জাক, তখন যে কতকিছু খেতে চাইত মন, কিন্তু যাকে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয়, দিন আনাদিন খাওযা অবস্থা তার শক কি আর পুরোন হবার এই সংসারে? কোনদিন একটা ভালো কিছু খেতে পারেনি সে, কিছু খেতে গেলেই ছেলে মেয়েগুলোর কথা মনে পড়ে যেত। কিন্তু সবার জন্যে ভালো কিছু কেনার সামর্থ তার ছিল না।

নিয়তির কি খেলা ! এখন সে কিছুই খেতে পাওে না অথচ তার চারপাশে কতকত ভালোভালো খাবার পড়ে আছে। কিছুই মুখে দিতে পারে না রাজ্জাক। জোর করে যা কিছু খাওয়ানো হয়, কিছুক্ষণ পর সব উগরে দেয়। দুদিন ধরে কথা বন্ধ হয়ে গেছে তার, কারও সাথে কথা বলতে পারে না। সারাদিনরাত মরার মত পড়ে থাকে তেল চিটচিটে বিছানার উপর। হঠাৎ দেখলে বোঝাই যায় না, মরা না জিবিত। অতি:ক্ষীণ নিশ্বাস নেওয়ার জন্যে বুকের সামান্য ওঠানামার দিকে খেয়াল করলেই শুধু বোঝা যায়, না এখনও মরে নি, বেঁচে আছে। হঠাৎ হঠাৎ উঠে বসে চারদিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকায়। কাউকে সামনে পেলে তার দিকে তাকিয়ে নিজের মাথায় হাত দিয়ে আঘাত কওে আর হু হু করে কাঁদে। মাথায় আঘাত কওে বোঝাতে চায় ভীষণ যন্ত্রনা। কিন্তু কারও সাধ্য নেই তার যন্ত্রনা কমাবার। শুধু তাকিয়ে থেকে চোখের পানি ফেলা ছাড়া কারও যে কিছু করার নেই।

রাজ্জাকের দুই মেয়ে। দুজনেরই বিয়ে হয়েছে। বাবার মাথায় টিউমার ধরা পরবার পর তারা এসে উপস্থিত হয়েছে বাচ্চাকাচ্চা স্বামী সহ। রাজ্জাক যখন একটা প্রায়ান্ধকার ঘরে শুয়ে মৃত্যু যন্ত্রনায় ছটফট করছে ঠিক তখন ঘরের বাইরে দুই মেয়েজামাই আর ছেলের তুমুল গন্ডগোল হচ্ছে সম্পত্তি ভাগাভাগি নিয়ে। কেউ কারও ভাগ ছাড়তে চায় না একফোঁটাও। হতদরিদ্র রাজ্জাকের অল্প কিছু জমিজমা আছে, সারা জীবনের হাড়ভাঙা খাটুনির ফল। ওইগুলো নিয়েই এই গন্ডগোলের সূত্রপাত। উচ্চকন্ঠে গন্ডগোলের শব্দে আশপাশের বাড়ির কিছু মানুষ জমে গেছে। গন্ডগোলের একপর্যায়ে রাজ্জাকের একমাত্র ছেলে হায়দার ভীষণ উত্তেজিত কন্ঠে ঘোষণা করলো, বাবার যেখানে যা আছে সব আমার, এর এককণাও আমি কাওরে দেব না।

হায়দারের বড় বোনও কোন অংশে কম যায় না। সেও গলা ফাটিয়ে চিৎকার কওে বলল, বড্ড লায়েক হয়েছিস তুই না? আমিও দেখে নেব কি কওে জমিজমা াাদায় করতে হয়। তার স্বামী যদিও একটু মিনমিনে স্বভাবের, কিন্তু বউ এর কথা শুনে চট করে অন্যরকম হয়ে গেল। সে তার বউকে লক্ষ্য কওে বলল, তোমার আব্বা ছেলে জন্ম দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু মানুষ করতে পারেনি। বিরাট অমানুষ হইছে।

দুলাভায়ের কথা শুনে হায়দার সত্যিই যেন অমানুষ হয়ে গেল। বয়সসম্পর্কের ভুলে সে আরও উচ্চকন্ঠে গলা ফাটিয়ে বলল, তোরা যা পারিস করিস, আমিও দেখে নেব কার কত ক্ষমতা। আব্বা সব কিছু আমার নামে লিখে দেছে। এর এককণাও আমি কাউরে দেব না।

ধীরে ধীরে আশপাশে লোকজন বাড়তে লাগলো। সবাই নীরব দর্শক। এ ধরনের পারিবারিক গন্ডগোল বাইরের মানুষের কাছে বেশ উপভোগ্য হয়। বেশীরভাগই মহিলা, মুখে কুলুপ এটে দাড়িয়ে আছে। কারও মুখে টু শব্দ নেই। কিছুক্ষণের ভেতর গাঁয়ের দুচারজন বয়ষ্ক লোক এসে গের রাজ্জাকের বাড়ির আঙিনায়। এরা কিন্তু নীরব দর্শক না। এসব ক্ষেত্রে এরা নিজেদেরকে জাহির করবার একটা সুযোগ পায়। সবার থেকে বয়স্ক জব্বার মোল্লা সামনে এগিয়ে এসে বলল, কি শুরু করলে তোমরা? তোমাদেও বাপের কতটুক জমি আছে? এই নিয়ে এত কামড়াকামড়ি ! ছিঃ, ছিঃ, ছিঃ, বাপটা মৃত্যুশয্যায় আর ছেলেমেয়েদেও কান্ড দেখ ! ঘোর কলিকাল।

এতক্ষণ যারা চুপ ছিলো তাদের ভেতর এখন মৃদু গুনগুন শুরু হলো। এতক্ষন সাহস করে কেউ কথা বলতে পারেনি। জব্বার মোল্লার সায় পেয়ে নানা মুখে নানা মন্তব্য শুরু হলো। একজন তার পাশের জনকে লক্ষ্য করে বলল বেশ হতাশ গলায় বলল, সারাজীবন এত কষ্ট কওে এত সব জমিজমাটাকাপয়সা করে লাভ কি বলেন? আপনি চোখ বুজলেই সব শেষ। ছেলেমেয়েদের অবস্থা দেখলেন ভাই? দুনিয়ার হালচাল দিনদিন কি যে হচ্ছে ! আগে তোর বাপের জীবন না জমি ভাগাভাগি? এসব অপগন্ড মানুষ করে লাভ কি?

বাইরের লোকজনের কথাবার্তায় হায়দারদের গন্ডগোল কিছুটা ঝিম ধরে গেল। হাজার হলেও গাঁয়ের মুরুব্বি মানুষ। মাথা যতই গরম হোক, তাদেও মুখের ওপর কথা বলতে গেলে দশবার ভাবতে হয়। হায়দার বারান্দায় উঠে একটা চেয়ার টেনে বসে পড়ল, মুখ থমথমে। মুখ দেখেই বোঝা যায় ভীষণ বিরক্ত।

ওদিকে রাজ্জাকের বউ স্বামীকে কয়েকটা ওষুধ খাওয়াতে ভীষণ চেষ্টা করছে। কিন্তু কোনভাবেই তাকে ওষুধ খাওয়ানো যাচ্ছে না। মৃত মানুষের মত পড়ে আছে রাজ্জাক। উঠে বসবার মত ক্ষমতাটুকুও তার নেই। দেখে মনে হচ্ছে না চেতনা আছে। এত ডাকাডাকিধাক্কাধাক্কির সে পড়ে আছে একটা মৃত লাশের মত। কিনতু এখনও বেঁচে যে আছে সেটা বোঝা যাচ্ছে, বোঝা যাচ্ছে তার বুকের ক্ষীণ ওঠানামা দেখে। মুখে কোন কথা নেই, মাঝেমাঝে যখন একটু চোখ খোলে নিজের হাত দিয়ে মাথায় আঘাত করে। কিছুই খেতে চায় না, মুখের সামনে খাবার ধরলেই হাত দিয়ে সরিয়ে দেয়। বেশী সমস্যা হয়েছে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ায়। সে যে কখন কি বলতে চায়, কিছু দরকার কিনা কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। এক এক করে ঘরে লোক জমতে শুরু করেছে। যারা বাইরে দাড়িয়ে ভাইবোনের ঝগড়া দেখছিল তারাই এখন রাজজাকের ঘরে ভীড় জমাতে শুরু করেছে। সবাই আসছে ঘরে কিন্তু তার নিজের ছেলেমেয়েদের কোন খোজ নেই। তারা বাইরে দাড়িয়ে আছে থমথমে মুখে। তাদের মাথায় এখন বাবার চিন্তা না, জমির চিন্তা। কিভাবে কে কতটা দখল করবে সেই চিন্তায় অস্থির, বাবাকে নিয়ে ভাববার সময় কই? আর তাছাড়া বাবাকে তো তারা খরচের খাতায় তুলে দিয়েছে। এখন শুধু অনর্থক ঘন্টাদিন গোনা, মরার অপেক্ষা। মরলেই হয়, তারপর শুরু হবে আসল খেলা। কার কতটুকু ক্ষমতা দেখা যাবে।

হায়দারের মাথার ভেতর নানান ফন্দি ঘুরপাক খাচ্ছে, সে থম মেরে বারান্দায় বসে ছিল, কিন্তু বাবার ঘরে যতই হৈ চৈ বাড়ছে তার বিরক্তিও বাড়ছে পাল্লা দিয়ে। একসময় প্রচন্ড বিরক্তি নিয়ে হায়দার উঠে দাড়ালো। নাহ্ এখানে আর বসা যাবে না। একলাফে উঠোন পেরিয়ে বাড়ির সিমানা থেকে বেরিয়ে আসল সে। হনহন করে হাটা দিলো রসুলপুর বাজারের দিকে। রাগে সর্বশরীর জ্বলছে। এখন একটা সিগারেট টানার দরকার। পকেটে নেইু এক পয়সা ! আগে যা টুকটাক হাত খরচ মায়ের কাছ থেকে চেয়ে নিত, এখন সে উপায়ও নেই। বাবার পেছনে হাজার হাজার টাকা জলের মত খরচ হয়ে গেল। রাস্তা দিয়ে হাটতে হাটতে হঠাৎ তার সব রাগ বাবার উপর গিয়ে পড়লো। মনে মনে বলে ফেললশালার বুড়া মরেও না। রাগ তো হবেই, মুখে মুখে বোনদের সাথে যতই হম্বিতমিব করুক সে তো জানে বাবা কিছুই তার নামে লিখে দেয়নি। দেবেই বা কি করে? দেবার সময় পেল কই? সুস্থ মানুষ আচমকা বেডে পড়ে গেল। এখন তো কথাও বলতে পারে না। কথা বলতে পারলেও একটা ব্যবস্থা করা যেত, সবার সামনে মুখ দিয়ে বলিয়ে নেওয়া যেত।

হায়দারের ভীষণ অস্থির অস্থির লাগছে। বাবা মরার পর সে পারবে তো বোনদের সাথে টেক্কা দিতে? মাধার ভেতর দুঃশ্চিন্তার ঝড় নিয়ে সে বজলুর চায়ের দোকানে ঢুকল। ঢুকেই বজলুকে বলল, একটা সিগারেট দে।

বজলু বিরক্ত গলায় বলল, আর বাকী দিতে পারব না। তোর আগের টাকা শোধ কর আগে।

হঠাৎ কি যে হলো হায়দারের মাথার ভেতর, সে হিংস্র বাঘের মত একলাফে বজলুর গলা চেপে ধরল। অনর্গল গালিগালাজ করতে করতে বলল, তুই দিবি না মানে? তোর বাপ দেবে।

চায়ের দোকানে সবসময়ই কিছু অলস খরিদ্দার বসে থাকে। তাদের একজন হায়দারকে টানতে টানতে দোকানের বাইরে নিয়ে গেল, কি হইছে তোর? তুই কি পাগল হলি? বাকী টাকা শোধ করতে পারিস না, আবার গায়ে হাত তুলিস?

এবার যেন হায়দার কিছুটা স্বাভাবিক হল। কোন কথা না বলে হনহন করে আবার বড়ির দিকে হাটা দিল। পেছন থেকে বজলুর রাগান্বিত কন্ঠস্বর ভেসে এলো, ফুটানি মারাস না? বাকী টাকা ক্যামনে আদায় করি দেখিস। হায়দার বজলুর কথায় কর্ণপাত করে না। সে বাড়ির দিকে হাটতে থাকে ধীরে ধীরে। এখন আর সেই ভীষন উত্তেজিত ভাবটা নেই তার। এখন তাকে অনেকটা অসহায়, বি:দ্ধস্ত লাগছে। নাহ্, মাথা গরম করে এমন একটা কাজ করা ঠিক হয়নি তার। বজলু তার কতকালের পুরনো বন্ধু। বিপদেআপদে তাকে দেখেছে অনেকবার। বাড়ির আঙিনায় পৌছে সে দেখল, আরো বেশী লোকজন জমে গেছে। আচমকা তার মনের ভেতর একটা ধাক্কার মতো লাগলো। বুড়ার কিছু হয়ে গেল নাকি? হায়দার এক ছুটে তার বাবার অন্ধকারজীর্ণমলিনগুমোট ঘরে ঢুকে গেল। একে তো ছোট ঘর, মহিলাদের ভীড়ে ঘরে ঢোকাই মুশকিল। সে দেখল, বাবাকে দুজন পিঠে হাত দিয়ে বসিয়েছে আর মা বাবাকে খাওয়ানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু সে হাত দিয়ে সরিয়ে দিচ্ছে সবকিছু, মুখ দিয়ে একটা গোঙানোর মত শব্দ হচ্ছে শুধু। কিছুই খেতে চাচ্ছে না, নিজের হাত দিয়ে বারবার মাথায় আঘাত করছে। ঘরের ভেতর ফলমুল আরো কত কি খাবার জমে গেছে।

ঘায়দার বাইরে বেরিয়ে আসল। আচ্ছা তার বুকের ভেতর এমন ধাক্কার মত লাগলো কেন ! সে একটু আগেই বুড়ার মৃত্যু কামনা করছিল। তাহলে বুকের ভেতর এমন করে মোচড় দিয়ে উঠলো কেন? এটাই কি রক্তের টান? হবে হয়ত। তার মনটা ভীষন খারাপ হলো বাবার কথা চিন্তা করে। আহারে, যে মানুষ সুস্থ থাকতে একটা ভালো কিছু কিনে খেতে পারেনি কোনদিন। সংসার চালাতেই সারাজীবন হিমশিম খেয়েছে শুধু। অথচ আজ তার সামনে দেখ সব ভালো ভালো খাবার পড়ে আছে, কিন্তু একবিন্দুও মুখে দিতে পারছে না। নিয়তির কি আজব বিচার !

অভাবের সংসারে হায়দারের লেখাপড়া হয়নি বেশীদুর। কোনরকমে ক্লাস সেভেন উঠতেই বন্ধ হয়ে গেল। তার বাবাও সামান্য লেখাপড়া জানে, এটা তার জানা আছে। বাবার হাতের লেখা ছিল অদ্ভুত সুন্দর, যেটা নিয়ে মানুষের মুখে কত কথা শুনেছে সে, ছোটকাল থেকে। আপদমস্তক খেটেখাওয়া, একজন কৃষকের এমন মুক্তার মত হাতের লেখা দেখে করো বিশ্বাস হয় না প্রথম প্রথম। তারপর একসময় বাবার হাতের লেখার কথা ছড়িয়ে পড়লো জনে জনে। হায়দার ছোটবেলা থেকে দেখছে তার বাবার কাছে কত লোক আসত একটা চিঠি লিখে নেবার জন্যে। বাবা বিরক্ত হতো না। হয়ত মনে মনে একটু গর্বও ছিল তার এজন্যে। একজন হতদরিদ্র মানুষের আর কিই বা থাকে একজীবনে গর্ব করার মত? নুন আনতে পান্তা ফুরোয় যার সংসারে তার গর্ব আসবে কোথা থেকে? ছোটবেলার কথা মনে পড়তেই আরো মন খারাপ হলো হায়দারের। বাবার পিঠে চড়ে সমস্ত এলাকা ঘুওে বেড়াত সে। পুকুরের এমাথা থেকে ওমাথা সাঁতার দিত।

কি মনে করে সে আবার বাবার ঘরে ঢুকল। তাকে এখনও জোর করে খাওয়াবার চেষ্টা চলছে। বাবাকে ওষুধগুলো পর্যন্ত খাওয়ানো যাচ্ছে না। হায়দার একদৃষ্টিতে বাবার দিকে তাকিয়ে দাড়িয়ে রইল। একটু পর সে খেয়াল করলো বাবা হাত নেড়ে তাকে কি যেন বোঝাবার চেষ্টা করছে। কিছুক্ষণ দাড়িয়ে থেকে হায়দারের মনে হলো, হ্যা সে বোধহয় বুঝতে পেরেছে বাবার ইঙ্গিত। বাবা কাগজকলম চাচ্ছে। সে একছুটে তার ঘর থেকে অনেক খুজে কাগজকলম নিয়ে আসল। কলমটা ভালো না, দাগ পড়ে না ভালো। মহিলাদের ভীড় ঠেলে বাবার সামনে যেয়ে কাগজকলম রাখল সে। বাবা তার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকলো, যেন চিনতে পারছে না। তারপর শুকনোচিমসানো মুখে একটুকরা মৃদু হাসি দেখা গেল। হ্যা, তারমানে সে কাগজকলমই চাচ্ছিল। কাঁপাকাঁপা হাতে সে কোনরকমে লিখলো, “বাবা তুই ওদেও বল আমি কিছুই খাব না এখন। আমারে একটু শান্তিতে ঘুমাতে দে তোরা। ঘরের থাইকে সবাইওে চইলে যাতি বল।” অনেক কষ্টে এটুকু লিখেই শুয়ে পড়লো বাবা। হায়দারের হাতে কাগজের লেখা অংশটুকু দিয়ে বাকি কাগজটা ছিড়ে নিজের কাছে রাখলো বাবা। কলমটাও। হায়দার সকলকে ঘর থেকে হটিয়ে দিল। মাকে জোর করে বাইরে নিয়ে গেল। গম্ভীর গলায় বললো, “সে ঘুমাইতে চায়, তোমরা তারে যন্ত্রনা দিয়ো না, কেউ ঘওে ঢুকবা না এখন।” মা কান্নাজড়িত কন্ঠে বললো, “কিন্তুক কাল থেইকে তো কিছুই খাইলো না তোর বাপে, ওষুধও খায় না। হায়দার রাগি গলায় বললো, “এখন তার খাবার ইচ্ছা নেই, যখন ইচ্ছা হবে কাগজে লিখে জানাবে। তোমরা কেই যেন ঘরে ঢুগবানা।” লোকজন এবার যার যার বাড়ির পথ ধরলো, একটু একটু করে ফাঁকা হলো বাড়িটা। তারপর শুনশান নিরাবতা।

হায়দার থমথমে মুখে চেয়ারের উপর বসে পড়লো ঠিক তার বাবার ঘরের সামনে। কিছুক্ষণ আগেও তার মধ্যে যে হিংস্র ভাবটা ছিল এখন তার বিন্দু মাত্র নেই। বলং, একটু ভালো করে লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে তার দুচোখে এখন এক অদ্ভুত শূণ্যতা বিরাজ করছে। সে ফাঁকা দৃষ্টিতে দুরের মাঠের দিকে তাকিয়ে আছে। একসময় তার অজান্তে চোখ দুটো জ্বালা করে উঠলো। সে দ্রুত তার ঘরে ঢুকে দরজা টেনে দিলো। দ্রুত হাত দিয়ে ভেজা দুচোখ মুছে ফেলল। তার এমন হচ্ছে কেন?! বাব যে আর বাঁচবে না এটা তো এখন সবাই জানে। তাহলে এই শেষ সময়ে এসে তার চোখ ভিজে যাচ্ছে কেন? হায়দার তার খাটের ওপর শুয়ে পড়লো। শরীরে কুলানো যাচ্ছে না আর। তবু বুক ফেটে কান্না বেরিয়ে আসতে চাচ্ছে। কিন্তু তাকে তো এখন দুর্বল হলে চলবে না, সংসারের সব দ্বায়িত্ব এখন তার। না আর কাঁদতে না হায়দার। তাকে শক্ত হয়ে দাড়াতে হবে, এছাড়া যে আর উপায় নেই তার। বাবা যতদিন সুস্ত ছিলো ততদিন কাউকে একটুও বুঝতে দেয়নি কিভাবে চলে যাচ্ছে সংসারটা।

দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতে চলেছে। বাড়িতে রান্নাবান্না, খাওয়াদাওয়া একরকম বন্ধ। ক্লান্তিতে শরীর ভেঙে আসছে। উথালপাতাল চিন্তা করতে করতে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল সে।

উচ্চরোলে কান্নার শব্দ আর হৈচৈ না হলে আরো কতক্ষন ঘুমাতো জানে না হায়দার। কান্নার শব্দে ঘুম ভাঙলো তার। গভীর ঘুমের ঘোর কাটতে একটু সময় লাগলো তার। তারপর একলাফে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে আসলো হায়দার। বাড়ি লোকে লোকারন্য। মহিলারা সব মুখে আঁচল চাপা দিয়ে কান্না সামলাচ্ছে যেন। হায়আর বাবার ঘরে ঢুকতে যাবে এমনসময় তার সেই ঝগড়াটে বড়বোন দুহাত দিয়ে জড়িয়ে ধরলো তাকে। “ভাইরে আব্বা আর নাইরে ভাই”। হায়দার ফ্যালফ্যাল করে কয়েক মুহুর্ত তাকিয়ে থাকলো তার বোনের দিকে। তারপর সে যেন সম্বিত ফিরে পেল। ঘুমের রেশ কেটে গেছে পুরোটাই। তার বুকের ভেতর থেকে একটা লম্বা দীর্ঘ:শ্বাস বেরিয়ে আসল। “বাবা নেই?” সে আর বাবার ঘওে ঢুকলো না, আস্তে করে চেয়ারে বসে পড়লো। চারদিকে শুধু কান্না=কাটি আর বিলাপের আওয়াজ, কিন্তু কিছুই যেন তাকে স্পর্শ করছে না। সে আবার সেই শূন্য দৃষ্টিতে বাইরে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে বসে থকলো। সন্ধ্যা নেমেছে আনেক আগেই। তারমানে সে লম্বা সময় ঘুমিয়েছে। ধীরে ধীরে বাড়িতে লোকজনের ভীড় আরও বাড়ছে।

এখন অনেক কাজ। বাবাকে দাফন করতে হবে। কিন্তু পাথরের মত শক্ত হয়ে বসে থাকলো। বাবার মৃত মুখ দেখতে ইচ্ছে করছে না তার। সময়ের হিসাব নাই। এভাবে কতক্ষন বসে থাকলেঅ সে জানে না। একসময় গ্রামের মুরুব্বিরা বাবার লাশ নিয়ে উঠনে বেরিয়ে আসলো। এখানে এখন তার বাবাকে গোসল করানো হবে। শেষবারের মত। মানুষের ভীড় এখন লাশকে ঘিরে। বাবার ঘর মুহুর্তের ভেতর শূন্যফাঁকা হয়ে গেল। শুধু ঘরের এককোনে মা একা বসে আছে মৃতের মত। তার বোধহয় আর কান্নার শক্তিটুকুও নেই।

পায়ে পায়ে সে বাবার বিছানার কাছে যেয়ে দাড়ায়। এখানেই একটু আগে তার জীবিত বাবা শুয়ে ছিল। সেই মানুষ কোথায় চলে গেল। বাবার খাটের ওপর জীর্নমলিন চাঁদর। ঘরে একটা অল্প পাওয়ারের বাল্ব জ্বলছে, যেটা গোটা পরিবেশটাকে আরও করুন করে তুলেছে। মা মরার মত বসে আছে, মাঝে মাঝে শুধু বুক চেরা দীর্ঘ:শ্বাস ফেলছে। এটাসেটা ভাবতে ভাবতে হায়দারের চোখ আটকে গেল একটা লাল কলমের উপর, যেটা আজ সে বাবাকে দিয়েছিল। বাবার বারিশের পাশে পড়ে আছে ওটা। কি মনে করে সে কলমটা হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করতে লাগলো। আর ঠিক তখনই তার মনে পড়ে গেল, বাবা কাগজের একটা ছেড়া অংশ তার কাছে দিয়েছিল। বাকিটুকু নিজের কাছে রেখেছিল। মুহুর্তেই হায়দারের মাথার ভেতর যেন ঝড় বয়ে গেল। সে একলাফে খাটের উপর উঠে কি যেন খুজতে লাগলো। বাবার চিটচিটে বালিশটা তুলে ধরতেই সে জিনিসটা পেয়ে গেল, যেটা সে খুজছিল। একটুকরা ছেড়া কাগজ। কাগজটাতে কাঁপাকাঁপা হাতে কিছু লেখা আছে। কাগজটা চোখের সামনে মেলে ধরে প্রবল উত্তেজনায় সে পড়া শুরু করলো, “বাজানরে, আমি সারাজীবন তোদেরে ভালো কিছু খাওয়াইতে পারি নাই, এখন আমার চারপাশে অনেক অনেক ভালো খাবার। তোদেরে না দিয়ে আমি এইগুলান কেমনে খাই, তুই বল? আমি চইলে যাবার পর তোরা এইগুলান খাস বাপজান। তোর মারে দেখিস।”

হায়দার একবার, দুবার, তিনবার, বারবার লেখাগুলো পড়তে লাগলো। তার দুচোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ে কাগজের টুকরাটা ভিজে ন্যাতান্যাতা হয়ে গেল। একসময় হায়দার গলা ছেড়ে কেঁদে উঠলো “বাজানরে”। সাথে সাথে ঘরের ভেতর ছুটে আসলো অনেক মানুষ, পুরুষমহিলা আর মুরুব্বিরা গ্রায় সবাই, যেন এতক্ষন কারও মনে ছিল না হায়দারের কথা। একজন হায়দারের মাথায় হাত রেথে সান্তনার সুরে বললো, “বাবারে কান্দিস না, কারও বাপমা চিরদিন বাঁচে না। কিন্তু হায়দারের কানে তখন কারও কথাই ঢুকছে না, তার চোখের সামনে ভেসে উঠছে সেই ছোটবেলার একটা দৃশ্য, বাবা কাঠফাটানো রোদে সমস্ত শরীর পুড়িয়ে মাঠ থেকে বাড়ি ফিরেই হাক দিতো, “কই, বাজান তুই কই? আয় গা ধুয়ে আসি”। হায়দারও অপেক্ষায় থকত, কখন বাজান বাড়ি ফিরবে। সে ছুটে এসেএকলাফে বাজানের কাধে উঠে বসতো। তাকে পিঠে নিয়ে পুকুরের এপাশ থেকে ওপাশ যেয়েই বাজান বলতো, “চল বাপ, গরমগরম ভাত খাই।”

হায়দার আরেকবার “বাজান” বলে ফুপিয়ে উঠলো। তার সমস্ত শরীর ঁেকপেকেঁপে উঠতে লাগলো। সে তার হাতের ছেড়া কাগজটা কাউকে দেখতে দিলো না। ঝাপসা চোখে চারদিকে তাকিয়ে দেখল, অনেক অনেক খাবার সেখানে। সত্যিই বাজান কিছুই খায়নি। সব রেখে গেছে তাদের জন্যে। হায়দারের বুকটা যেন ভেঙে যাচ্ছে।

মা উঠে এসে তাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো। হায়দার মাকে জোর করে জড়িয়ে ধরে ডুকরে কাঁদতে কাঁদতে বললো, “বাজানওে আমার কিচ্ছু লাগবে না। শুধু তুমি ফিরে আসো আমার কাছে।”

বাইরে তখন রাজ্জাকের মৃতদেহের গোসল শেষ করে জানাজার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।।

dipanjubaer@yahoo.com

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s