. মানুষ সমব্যথী প্রাণি নয়

art works-5মৃত চড়ুইটার একঝাঁক সমব্যথী চড়ুই আছে

মানুষের নেই

মানুষ কেবলই সমব্যথীর ভণিতা করে।

তাহলে মানুষ এত যে কথা সাজিয়েছে

সে কি তার কষ্ট ঢাকবার কাঁথা সেলাই করা?

 

আমার মা বুড়ি হয়েছেন কাঁথা সেলাই ক’রে

মা তাঁর তন্বীদেহ ভেঙে সন্তান ও স্বামীর জন্যে সকালদুপুররাত

আপ্যায়নের থালা সাজিয়ে বসে থাকেন

আমার পিতাকে তবু সমব্যথী হতে দেখি নি।

 

আমার মা তাঁর চোখের জল লুকিয়ে

বিকেলে পা ছড়িয়ে বোনের মাথার উকুন খুঁটে খুঁটে

বুড়ো আঙুলের নখে পিষতে পিষতে খিলখিল করেন

আমার বোন মায়ের আউলাচুলে বিনুনি বাঁধেন।

আমি তাদের চুলের বিনুনিতে সাপ লুকিয়ে থাকতে দেখেছি

এই যে সাপের অভিশাপ বয়ে বেড়ানো নারীরা

জানি না মানুষের সম্মান পাওয়ার জন্যে কয়শ’ বছরের অঙ্ক সাজাবে?

 

মৃত চড়ুইটার একঝাঁক সমব্যথী চড়ুই আছে

মানুষের নেই

তাহলে মানুষের কীসের এত অহংকার!

প্রকৃতিকে তছনছ ক’রে মানুষ জয়ের ইতিহাস লিখেছে

অথচ বরফ তো জল হয়ে ধেয়ে আসছে সমুদ্রের জলে

বরফ গলার গল্প ছাড়া তো মানুষের আর কোনো গতিই নেই।

———————————————————–

 

১০. পৃথিবীর কাছে

পাতা ঝরার শব্দে এখন হুলুস্থুল উত্তুরে বাতাসের কাঁপন লেগেছে পৃথিবীতে

অগ্নিকোণের আকাশে উড়া দিগভ্রান্ত কাঁকের ডানার ছায়া পড়েছে পৃথিবীতে

নদীর খাড়ির কুয়াশায় খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে বিপন্ন উভচর প্রাণিরা হাঁটছে পৃথিবীতে

আর মানুষেরা বুড়িয়ে যাওয়া পৃথিবীর বয়েসটা গলদ্ঘর্ম গজফিতেয় মেপে দেখছে

আঙুলের কর গুনে গুনে জন্মকালের হিসেব কষতে কষতে অবিরাম নখের ডগা ক্ষয় করছে

পৃথিবীর সকল মানুষের গড়আয়ু বিষয়ে দেশে দেশে দফায় দফায় সংসদ অধিবেশন বসছে।

 

আর আমি কবিতায় খঞ্জনিধ্বনি নাচিয়ে উনুনে শূন্য হাঁড়ি উপুড় ক’রে ভাতের মিনতি করছি

এবং কৃষকের খেতের খনকৃত পঙ্ক্তি আঙুলে তুলে মৌমাছির বিপন্নতা অনুবাদ করছি

আমি জানি না ছন্নমতি কৃষক ও ছত্রিশবর্ণ কবিরা বাতাস বিদীর্ণ ক’রে

কী প্রার্থনা করছে দিনলিপি বদলে যাওয়া পৃথিবীর কাছে?

———————————————————-

 

১১. জন্মদুঃখ

আমার জন্ম বন্য প্রাণিকুলে হলেই ভালো হতো

কারণ মানুষের মতো হিংস্র প্রাণি বন্য প্রাণিকুলে কখনো জন্মে নি।

 

আমার পূর্বমাতাগণ ও পূর্বপিতাগণ বন্যপ্রাণি ছিলেন

সেই বন্যদশায়ও হিংস্র প্রাণি হিসেবে টোটেমের বিরুদ্ধে টোটেম

পাথরের হাতিয়ারে তারা লক্ষ্যভেদ করেছেন

তাদের দর্পিত পদভারে জলস্থল প্রকম্পিত করেছেন

হিংস্র লোভের জিভে সগোত্রের রক্তপান ক’রে নৃত্য করেছেন

ইংরেজ লুণ্ঠকেরা দাসমালিকের চেয়ে কম তো ছিলেন না

তাহলে বিশ্বযুদ্ধে একা হিটলারকেইবা দায়ী করা হবে কেন?!

 

ইরাক আফগান বা লিবিয়া গ্রাসের হিংস্রতায় জাতিসংঘের দূতালি কি চমৎকার

আর আমেরিকার পাতিনেতারা পর্যন্ত দর্পিত উল্লাসে ফতুয়া বিলিয়ে বেড়ান

বিশ্বের প্রভূ হিসেবে সকল হিংস্রতা কী মহান গণতন্ত্রের জন্যেই নিবেদিত নয়?!

 

এবং আমার মানুষ জন্মের জন্যে আমি আদৌ গর্বিত নই

আর তোমরা আমাকে এই অপরাধে বন্যনির্বাসন বা মুখে বাসিথুতু তো দিতেই পারো?

—————————————————–

 

১২. আমি বিনির্মাণ করছি নরক

ঈশ্বর বিশ্বাসীদের মতো আমার জন্যে বরাদ্দকৃত কোনো স্বর্গনরক নেই!

 

আমি মানুষের ভবিষ্যতের সাথে তেলাপোকা ও ইঁদুরের ভবিষ্যৎ বিষয়ে শঙ্কিত

আমি মৎসকুল ও পাখি, বন্যপ্রাণি ও সরীসৃপের ভবিষ্যৎ বিষয়ে শঙ্কিত

আমি প্রজাপতি ও মৌমাছিদের পুষ্প পরাগায়নের ভবিষ্যৎ বিষয়ে শঙ্কিত

আমি বায়ুমল ও পাহাড়, বৃক্ষ ও বনভূমি, নদী ও জলধির ভবিষ্যৎ বিষয়ে শঙ্কিত

 

হে মানুষ আমাকে স্বর্গনরক দেখাতে চেও না

আমি তো ক্রমাগত দ্রুত পায়ে স্বর্গ থেকে নরকের দিকেই ধাবিত!

 

অগ্নি ও লাঙল আবিষ্কার ক’রে প্রাণিবিশ্বে আমি এক গর্বিত মানব প্রজাতি

আমি দর্পিত পায়ে মাড়িয়ে যাচ্ছি প্রকৃতির সকল নির্মাণ কুশলতা

আর নারীকে বিনির্মাণের তামাসায় আচ্ছন্ন করার অহংকারে

পৃথিবীর স্বর্গটাকে তছনছ ক’রে দুহাতের নখরে আমি তো নরকই ধরতে চাইছি।

————————————————

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s