শাসকশ্রেণীর ফ্যাসিবাদী প্রবণতা প্রতিহত করতে বামপন্থীদের নেতৃত্বে গণআন্দোলন গড়ে তুলুন – বাসদ

Posted: জুলাই 4, 2013 in দেশ
ট্যাগসমূহ:, , , , ,

SPB_logo-3দেশের প্রধান চারটি সিটি কর্পোরেশন ও নবগঠিত কালীগঞ্জ পৌরসভার নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট সমর্থিত প্রার্থীদের বিপুল বিজয়ের ঘটনাকে দেশের চলমান রাজনীতিতে নতুন মোড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত বলে অনেকে মনে করছেন। তাই, দেশের রাজনীতি নিয়ে হিসাবনিকাশও নতুন করে শুরু হয়েছে। এ পরিস্থিতির পটভূমি সম্পর্কে কিছু কথা বলা দরকার।

প্রধান দুই বুর্জোয়া দলের ক্ষমতাকেন্দ্রীক সংঘাতে দেশের রাজনীতিতে একটা অস্থিরতা বিরাজ করছিল। এর সাথে যুক্ত হয়েছিল যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রশ্নে জামাতের সহিংস তা, এবং তারই ধারাবাহিকতায় হেফাজতের উত্থান। এমনই একটি সময়ে অনুষ্ঠিত হল সিলেট, রাজশাহী, বরিশাল এবং খুলনা সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন। খুব স্বাভাবিক কারণেই এ নির্বাচনকে ঘিরে সকলের মনযোগ নিবদ্ধ হয়েছিল। নির্বাচনের ফলাফল পুরোপুরি আওয়ামী নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের বিরুদ্ধে গিয়েছে। বিএনপিপন্থীরা বলতে চাইছেন, এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে মানুষ গত সাড়ে চার বছরের দুর্নীতিদুঃশাসনকে প্রত্যাখ্যান করেছে। আর আওয়ামী লীগ দেখাতে চাইছে, তাদের অধীনেও সুষ্ঠু অবাধ নির্বাচন সম্ভব। ফলে তত্ত্বাবাধায়ক সরকারের কোনও দরকার নেই। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী এবং সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর পুরনো একটি কথা নতুন করে বলতে শুরু করেছেন; সেটি হল তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় এলে তারা আর ক্ষমতা ছাড়তে চাইবে না, এমনকি কেয়ামত পর্যন্ত তারা ক্ষমতায় থাকবে। নির্বাচনের পর রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ভাষ্যে আরো একটি বিষয় উঠে এসেছে। সেটি হল, এ নির্বাচনে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি একটি বড় ফ্যাক্টর বা উপাদান হিসাবে কাজ করেছে। ইসলামী ধর্মভিত্তিক রাজনীতির এই প্রভাব, এদেশের গণতান্ত্রিক চেতনাসম্পন্ন মানুষ এবং অন্যান্য ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষের মনে খানিটকা ভীতির সঞ্চারও করেছে।

এটা সকলেরই জানা যে, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের কথা জোরেশোরে বলা শুরু করে। সরকারের এ মনোভাব বিএনপি ও তার সহযোগিদের মনঃপূত হয়নি, হওয়ার কথাও নয়। তারা এর বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। প্রথম দিকে যা ছিল কথার পাল্টাপাল্টি সেটাই ক্রমে সংঘাতসহিংসতায় রূপ নেয়। আওয়ামী লীগ চেয়েছে আদালতের রায়কে কাজে লাগিয়ে সংবিধানে প্রয়োজনীয় সংশোধনী এনে নিজেদের অবস্থানকে দৃঢ় করতে। বিপরীতক্রমে বিএনপি ও ১৮ দল হরতালঅবরোধ দিয়ে সরকারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধাচরণ করে এসেছে।

বিএনপি ও তার সহযোগিরা শুরু থেকেই এ কথা বলে আসছিল যে দলীয় সরকারের অধীনে তারা কোনো নির্বাচনে যাবে না। কারণ, এ সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হতে পারে না। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ বলতে চেয়েছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা যেহেতু অনির্বাচিত ব্যবস্থা, তাই এটি সংবিধানসম্মত নয়। আর তাছাড়া তত্ত্বাবাধয়ক সরকারের নামে যারা ক্ষমতায় আসবে তারা ‘মাইনাসটু’ ফর্মুলা বাস্তবায়ন করবে, তারা আর ক্ষমতা ছাড়বে না। ফলে আওয়ামী লীগ কিছুতেই তত্ত্বাবাধয়ক সরকার ব্যবস্থা মেনে নেবে না। পরিবর্তে অন্য কোনো পদ্ধতি হতে পারে। এই নিয়েই চলছিল রাজনীতির টাগঅফওয়ার। এর সাথে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, খালেদাতারেককোকোর মামলা ইত্যাদি ছিল সম্পূরক ইস্যু। এ অবস্থা চলতে চলতেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ইস্যুটি একসময় প্রধান বিষয় হিসাবে সামনে চলে আসে। তখন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন এবং এর বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে জামাত সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং জামাতের তাব দেশবাসীকে শঙ্কিত করে তোলে।

জামাতের সশস্ত্র তাবের পাশাপাশি, জামাতের সাথে সরকারের নানামুখী আঁতাতআপসের লক্ষণ যা প্রকাশিত হচ্ছিল তাতে দেশের গণতন্ত্রকামী মানুষ বিচলিত এবং বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল। তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল শাহবাগের গণজাগরণ আন্দোলনে। তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বে সংঘটিত এ আন্দোলন নানা দিক থেকেই ছিল অভূতপূর্ব। কিন্তু তরুণ প্রজন্মের বন্ধুদের রাজনৈতিক অনভিজ্ঞতার কারণে এবং বামগণতান্ত্রিক শক্তিগুলোর সুস্পষ্ট অবস্থান নিতে না পারায় গণজাগরণের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত সরকারবিরোধী মনোভাব এক পর্যায়ে সম্পূর্ণ চাপা পড়ে যায়। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনকে সরকার তার হারিয়ে যাওয়া ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের কাজে লাগাতে চাইছে, এটাই দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। গণজাগরণ মঞ্চ একটা বিরাট সম্ভাবনা তৈরি করতে পেরেছিল। কিন্তু রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা এবং গণআন্দোলন সম্পর্কিত দৃষ্টিভঙ্গির বিভ্রান্তির কারণে কত সহজেই তা স্তিমিত হয়ে গেল।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ইস্যুকে হাতিয়ার করে সরকার নিজেদের সকল অপকর্ম, দুর্নীতিদুঃশাসনদুষ্কৃতি আড়াল করে হারানো জনপ্রিয়তা পুনরুদ্ধার করে ফেলছে, এ চিন্তা বিএনপিকে অস্বস্তিতে ফেলে দেয়। অন্যদিকে জামাতসহ স্বাধীনতাবিরোধী বিভিন্ন শক্তি তো নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার স্বার্থেই এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল। এর সাথে যুক্ত হয় সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলির পরিকল্পনা। এসব কিছুর সম্মিলনের মধ্য দিয়ে উত্থান ঘটে হেফাজতে ইসলামের। বিএনপির সমর্থন ও পৃষ্ঠপোষকতা এতে শক্তি যোগায়। আমরা দেখেছি, গণজাগরণের আন্দোলনকে ইসলামবিরোধী আখ্যা দিয়ে সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষকে বিভ্রান্ত করে দেশের মধ্যে সহিংস পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছিল। হেফাজতের উত্থানের ক্ষেত্রে, শুরুর দিকে, সরকারও পরোক্ষে মদদ দিয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করার মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের মানুষদের ভোট টানা আর হেফাজমের মাধ্যমে ধর্মভিত্তিক ভোট কব্জা করা এই উভয়মুখী নীতি আওয়ামী লীগ অনুসরণ করেছে। হেফাজতের দাবি মেনে ব্লগারদের গ্রেফতার করা, গণজাগরণমঞ্চ বন্ধ করে দেয়া ইত্যাদি ঘটনা সবাই জানেন। এমনকি এক পর্যায়ে সারাদেশে ১ মাস মিছিলসমাবেশ নিষিদ্ধ করার কথাও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে। কিন্তু যাই হোক, গাছেরটাও খাওয়া আর তলারটাও কুড়ানো শেষ পর্যন্ত হয়ে উঠেনি। সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের ফলাফল, সেই ইঙ্গিতই রেখে গেছে।

কারো কারো মনে হতে পারে, তত্ত্বাবধায়ক বা নির্দলীয় সরকার ব্যবস্থা না হলে জনগণের আপেক্ষিক স্বাধীনভাবে ভোট প্রদানের অধিকার চর্চার পরিবেশ বজায় থাকবে না। এ আশঙ্ক্ষার বাস্তব ভিত্তি অবশ্যই আছে। কিন্তু আপেক্ষিক স্বাধীনভাবে ও নিরাপদে ভোট প্রদানকেই (যদিও অর্থপেশী শক্তি ও প্রচার মাধ্যম জনমতকে প্রবলভাবে প্রভাবিত করে) যখন সমস্ত কিছুর ঊর্ধ্বে তুলে ধরে জনগণের অপরাপর সকল গণতান্ত্রিক অধিকারকে চাপা দেয়ার আয়োজন করা হয় তখন পরোক্ষে গণতন্ত্রের কবর দিয়ে ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা কায়েমের পথ সুগম করা হয় মাত্র। বিএনপি ও ১৮ দলীয় জোট সে কাজটিই করছে। আওয়ামী লীগ চাইছে আগামী নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে আরেকদফা ক্ষমতায় থাকতে, আর বিএনপি চাইছে বর্তমান সরকারের অপকীর্তিকে দেখিয়ে নিজেদের বাক্সে ভোট টানতে। তত্ত্বাবধায়ক কিংবা নির্দলীয় সরকারের বিতর্কের ভরকেন্দ্র এখানেই।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার কিংবা নিজেদের নেতানেত্রীদের নামে মামলা নিয়ে বিএনপি গত ৪ বছরে যত কথা বলেছে, যত হরতাল দিয়েছে তার প্রায় সিকিভাগ শক্তিও সে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষায় ব্যয় করেনি। এ চার বছরে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, জ্বালানি তেলবিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি, সন্ত্রাস, নারী নির্যাতন, কৃষকের ফসলের ন্যায্য দাম, শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি, সাধারণ মানুষের শিক্ষাচিকিৎসার অধিকারহীনতা ইত্যাদি বহুবিধ যে সংকটে দেশের মানুষ জর্জরিত, এর কোনোটি নিয়েই বিএনপি ও তার জোট গণআন্দোলন গড়ে তোলার পথে যায় নি। তাজরিন গার্মেন্টসে অগ্নিকাণ্ডে শ্রমিক হত্যা, রানা প্লাজা ধসে ১২শত শ্রমিক গণহত্যার ঘটনাসহ গার্মেন্ট শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ও নিরাপদ কর্মপরিবেশের দাবি নিয়েও তারা সরকারকে দোষারোপ করার বাইরে কোনো আন্দোলন গড়ে তোলার পথে যায় নি। আমাদের জাতীয় সম্পদ গ্যাসকয়লা রক্ষার আন্দোলনেও ১৮ দলীয় জোটের অংশগ্রহণ নেই। একইভাবে মার্কিন স্বার্থে টিকফা এবং ভারতের স্বার্থে রামপাল কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়েও বিএনপি নিরবতাই পালন করছে। র‌্যাব এবং ক্রসফায়ার নিয়ে এ দল দুটি ক্ষমতায় থেকে এক ধরনের বক্তব্য এবং ক্ষমতার বাইরে থেকে বিপরীত বক্তব্য প্রদানের বিষয়টিও নিশ্চয়ই আমাদের মনে আছে।

জনগণের সমর্থন নিয়ে বিএনপি ক্ষমতায় যেতে চায়, কিন্তু জনগণের অধিকারের দাবি নিয়ে সে লড়ছে না কেন? কারণ, বুর্জোয়ারা এটা খুব ভালো করেই জানে যে আজকের দিনে জনগণের যে কোনো গণতান্ত্রিক আন্দোলন শেষপর্যন্ত বুর্জোয়া ব্যবস্থার বিরুদ্ধেই পরিচালিত হবে। ফলে গণআন্দোলনকে দমন করতে, বিপথে পরিচালিত করতে, পেছন থেকে ছুরি মারতে তারা সব সময়ই সচেষ্ট থাকে। বিষয়টি আমাদের গভীরভাবে ভেবে দেখা দরকার।

জঙ্গীগোষ্ঠীর সহিংসতা রোধে দেশে সভাসমাবেশ নিষিদ্ধ করার একটা কথা শোনা গিয়েছিল। এ ঘোষণাকে অবলম্বন করেই সরকার ঢাকায় বাসদ, গণতান্ত্রিক বাম মোর্চাসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সভাসমাবেশে বাধা দিয়েছে, কোথাও কোথাও গ্রেফতার পর্যন্ত করেছে। বাধা দেয়া হয়েছে গার্মেন্ট শ্রমিকদের বিভিন্ন প্রতিবাদ বিক্ষোভে। এর পাশাপাশি সম্প্রতি সন্ত্রাস দমন আইনে এমন কিছু সংশোধনী আনা হয়েছে যা স্বাধীন মতপ্রকাশের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত বাধা হিসাবে কাজ করবে। একই কথা প্রযোজ্য শ্রম আইনের সংশোধনীর ক্ষেত্রেও। শ্রমিকদের যেঅধিকারগুলো এতদিন কাগজেকলমে স্বীকৃত ছিল এসংশোধনীর মাধ্যমে তাও কেড়ে নেয়ার আয়োজন করা হচ্ছে। জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকারের দিক থেকে দেখলে, এটা অত্যন্ত বিপজ্জনক প্রবণতা। এগুলো সরকারের ফ্যাসিস্ট মনোভাবেরই বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু এ শুধু আওয়ামী নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারেরই নয়, এটা আমাদের দেশের শাসকদের সাধারণ প্রবণতা, এবং দিন দিন এ প্রবণতা বাড়ছে। বিএনপি নিজেদের উপর সরকারের আক্রমণের প্রতিবাদ যতটা করছে, সে অনুযায়ী জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার, মত প্রকাশের অধিকার, প্রতিবাদ করার অধিকার রক্ষার জন্য কোনো আন্দোলনে এগিয়ে আসেনি। কারণ, ভবিষ্যতে ক্ষমতায় গিয়ে জনগণকে দমন করার জন্য এ সমস্ত হাতিয়ার তারাও ব্যবহার করবে।

ক্ষমতার পালাবদল কেমন করে হবে, এ বিতর্কের নিশ্চয়ই ফয়সালা হবে। কিন্তু জনগণের সামনে আরও বড় প্রশ্ন অপেক্ষা করছে। অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, ক্ষমতার পালাবদল যে প্রক্রিয়াতেই হোক না কেন, তাতে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার এবং আশাআকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়নের কোনো সম্ভবনা নেই। মানুষ আক্ষেপ করে বলে, যায় দিন ভালো, আসে দিন খারাপ। মানুষ আরো খারাপ দিনের জন্য অপেক্ষা করছে। ফলে নির্বাচন যেভাবেই হোক, তাতে পরিণতি পাল্টাচ্ছে না।

বাংলাদেশে বুর্জোয়াশ্রেণী কি ভয়াবহ দুঃশাসন চালাচ্ছে, রানা প্লাজা ধসে ১২শত শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা তারই নজির। বুর্জোয়াদের এই দুর্নীতিদুঃশাসন থেকে মানুষ রেহাই চায়। সে কারণেই দ্বিদলীয় দুঃশাসনের চক্র থেকে বেরিয়ে আসার একটা আকাঙ্ক্ষা দেশের রাজনীতিতে, প্রধানত শিক্ষিক মধ্যবিত্ত মহলে শুনতে পাওয়া যায়। অনেক সময় সাধারণ মানুষও এ আকাঙ্ক্ষার প্রতিধ্বনি করেন। সেখান থেকেই বিকল্প শক্তির কথাটা শোনা যায়। একটা সংগঠিত বুর্জোয়া ব্যবস্থা, যার পেছনে বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলির প্রত্যক্ষপরোক্ষ সহযোগিতা আছে, তাকে নিছক আকাঙ্ক্ষার জোরে পরিবর্তন করা যায় না। মনে রাখতে হবে, পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা বা বিকল্পের আকাঙ্ক্ষা শ্রেণীগতভাবে বুর্জোয়া পরিধির মধ্যেই জন্মেছে। বুর্জোয়ারা মিডিয়া এবং অন্যান্য শক্তির মাধ্যমে বিকল্পে এ আকাঙ্ক্ষাকে বুর্জোয়া রাজনীতির গণ্ডিতে, নির্বাচনী রাজনীতির গণ্ডিতে আটকে রাখতে চায়। বিকল্প শক্তি বলতে সাধারণ মানুষ, এমনকি অনেক শিক্ষিত মানুষও বুর্জোয়া পার্লামেন্টারি রাজনীতির বিকল্প, নির্বাচনী বিকল্পের কথা ভাবছে এবং বলছে।

বিকল্প শক্তি গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষা বামপন্থীরাও বলছেন। কিন্তু তার সাথে বুর্জোয়া পার্লামেন্টারি রাজনীতির বিকল্পের ধারণার সুস্পষ্ট পার্থক্য আছে। এই পার্থক্য স্পষ্ট করে তোলাও বামপন্থীদের দায়িত্ব। দুটো শর্ত মেনেই আমাদের সে পার্থক্য সুস্পষ্ট করতে হবে। প্রথমত, জনজীবনের জ্বলন্ত সমস্যাগুলি নিয়ে ধারাবাহিক, দীর্ঘমেয়াদী, কষ্টকর গণআন্দোলন গড়ে তোলা, আন্দোলনকারী জনগণের শক্তি গড়ে তোলা এবং দ্বিতীয়ত, এই গণআন্দোলনের সামনে যথার্থ বিপ্লবী নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা। এ প্রক্রিয়া অনুসরণ করার মাধ্যমেই আমরা মানুষের মনে এ বুর্জোয়া ব্যবস্থার অসারতা এবং সমাজতন্ত্রের যথার্থতা তুলে ধরতে সক্ষম হবো, বুর্জোয়া পার্লামেন্টারি রাজনীতির বিকল্প হিসাবে জনগণের আন্দোলনকারী বিকল্প শক্তি গড়ে তুলতে পারব।

আমাদের দল এককভাবে, এমনকী বামপন্থীরা সম্মিলিতভাবেও এ মূহুর্তে বিরাটব্যাপক গণআন্দোলন গড়ে তোলার মতো শক্তি রাখে না। এটি সত্য। সে কারণেই আমরা সকল বামপন্থী শক্তির প্রতি আহ্বান জানাই, প্রত্যেকেই স্ব স্ব অবস্থান থেকে জনজীবনের সমস্যাগুলি নিয়ে আন্দোলন গড়ে তোলার কাজে এগিয়ে আসুন। এ আন্দোলন গড়ে তোলার পথেই একটা যথার্থ কার্যকরী বাম ঐক্য গড়ে তোলা সম্ভব হবে। আন্দোলনের প্রক্রিয়ায় বামপন্থীদের যে ঐক্য গড়ে উঠবে, সেটাই আবার ভবিষ্যতে আরো বৃহত্তর আন্দোলনের ভিত্তি রচনা করবে। আমরা আন্তরিকভাবেই এ আহ্বান দেশের বাম শক্তিগুলির সামনে রাখছি। বামপন্থীদের নেতৃত্বে দেশের গণতন্ত্রকামী দেশপ্রেমিক জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করে গণআন্দোলন গড়ে তোলার পথেই শাসকশ্রেণীর ফ্যাসিবাদী প্রবণতাকে প্রতিরোধ করে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকারের সুরক্ষা গড়ে তোলা সম্ভব হবে।।

 

বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলবাসদ

কনভেনশন প্রস্তুতি কমিটি

২২/১ তোপখানা রোড (৬ষ্ঠ তলা) ঢাকা১০০০।

ফোন ও ফ্যাক্স : ৯৫৭৬৩৭৩

মেইল: spb.convention2014@gmail.com

 

(লেখাটি বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল বাসদ’এর মুখপত্র ‘সাম্যবাদ’ জুলাই ২০১৩ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়।)

 

[বি.দ্র. লেখাটি বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল বাসদ’এর ডক্যুমেন্ট বা দলিল; মঙ্গলধ্বনির মৌলিক লেখা নয়। এই ডক্যুমেন্টের জন্য মঙ্গলধ্বনি দায়বদ্ধ নয়।]

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s