স্মারক বক্তৃতা – লাল পতাকার নিচে সাংস্কৃতিক আন্দোলন

Posted: জুন 18, 2013 in মতাদর্শ, সাহিত্য-সংস্কৃতি
ট্যাগসমূহ:, , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , ,

world-to-win[নিম্নোক্ত বক্তৃতাটি বিশিষ্ট লেখক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন সংগঠক মহসিন শস্ত্রপাণি কর্তৃক প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী, আজীবন প্রতিবাদী ড. আহমদ শরীফএর চতুর্দশ মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে ‘স্বদেশ চিন্তা সংঘ’ আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রদত্ত ‘ড. আহমদ শরীফ স্মারক বক্তৃতা, ২০১৩’। সম্পাদনা পর্ষদ, মঙ্গলধ্বনি]

 

মাননীয় সভাপতি, স্বদেশ চিন্তা সংঘ’র সদস্যবৃন্দ ও সমাগত সুধীমণ্ডলীআপনাদের আন্তরিক শ্রদ্ধা ও শভেচ্ছা জানাই।

দেশের একজন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও চিন্তাবিদ, প্রথাবিরোধী, প্রতিবাদী ও দ্রোহী মানবপ্রেমী ড. আহমদ শরীফএর জীবনাবসানের আজ চতুর্দশ বার্ষিকী। তাঁর জীবন ও কীর্তি সম্পর্কে দুচার কথায় কিছুই বলা সম্ভব নয়, সে চেষ্টাও আমি করবো না। স্বদেশ চিন্তা সংঘ’র সদস্যবৃন্দ ‘ড. আহমদ শরীফ স্মারক বক্তৃতা’ দেবার আমন্ত্রণ জানিয়ে আমাকে কৃতার্থ করেছেন। এর পূর্বে ১২ জন খ্যাতিমান শিক্ষক, লেখক, চিন্তাবিদ ও রাজনৈতিক নেতা এই বক্তৃতা দিয়েছেন। তাঁদের কাতারে দাঁড়াবার কথা ভাবা আমার মতো একজন কর্মীর পক্ষে ধৃষ্টতা। কেবল আরেকবার আনুষ্ঠানিকভাবে ড. আহমদ শরীফএর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে আজ আপনাদের সামনে হাজির হতে সম্মত হয়েছি। তাঁর সান্নিধ্য, সাহচর্য ও প্রশ্রয় যেটুকু পেয়েছি তা আমার জীবনের এক অতি মূল্যবান স্মৃতিসঞ্চয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আমি তাঁর ছাত্র ছিলাম না। তবে তাঁর কাছ থেকে আমি যে শিক্ষা পেয়েছি সেজন্যে তাঁকে আমার একজন শিক্ষক হিসেবেই শ্রদ্ধা করি। সেই মনীষী দ্রোহী মানবপ্রেমীর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আমার আলোচনার বিষয়– ‘লাল পতাকার নিচে সাংস্কৃতিক আন্দোলন’ আপনাদের সামনে পেশ করছি।

 

লাল পতাকার নিচে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সূচনা হয় আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ১৬৪ বছর পূর্বে আর উপমহাদেশে ৯১ বছর পূর্বে।

লাল পতাকার নিচে সর্বহারা শ্রেণীর অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের যাত্রা শুরু ১৮৪৮ সালে কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার প্রকাশের পর। আমাদের আলোচনার প্রধান দিক অবশ্য সাংস্কৃতিক আন্দোলন। তবে একথা তো মানতেই হবে যে, সংস্কৃতি সমাজের অর্থনীতি ও রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো বিষয় নয়। বরং এর বিপরীতঅর্থাৎ নির্দিষ্ট সমাজের অর্থনীতির ওপর তার সাংস্কৃতিক রূপ ও চারিত্রবৈশিষ্ট্য সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। অর্থনীতি হচ্ছে সমাজের ভিত্তিভূমি। তার ওপরই গড়ে ওঠে রাজনীতিদর্শনসংস্কৃতি আর সব রকম বুদ্ধিবৃত্তিক ও সৃজনশীল বিষয়সমূহ। সে কারণেই আমরা বার বার বলি এবং পুনরায় বলছিসাংস্কৃতিক আন্দোলন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনের অধীন ও অনুগামী। এর ব্যতিক্রম যা ঘটে থাকে তা ব্যতিক্রমইসাধারণ ও নির্ধারক ঘটনা নয়।

কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার রচনা ও প্রকাশ এবং তার অবধারিত ফল হিসেবে লাল পতাকার নিচে সংস্কৃতিক আন্দোলনের যাত্রা শুরুটা মোটেও আকস্মিক ঘটনা ছিলো না। এর পটভূমিতে ছিলো ইউরোপের কয়েকটি দেশেবিশেষ করে ফ্রান্স, ইতালি, জার্মানী, স্পেন, ইংল্যান্ড প্রভৃতি দেশে শ্রমজীবী জনগণের দীর্ঘদিন ধরে চলা শ্রেণীসংগ্রাম। এসব সংগ্রামের আবশ্যিকতা থেকেই ওইসব দেশে গড়ে ওঠে বেশ কিছু সংগঠন। সংগঠিত হবার ক্ষেত্রে প্যারিসে ও লন্ডনে শরণার্থী জার্মান শ্রমিকদের ভূমিকা ছিলো অগ্রগামী। আর বাস্তব পরিস্থিতির কারণেই অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় বৈরিতা মোকাবিলা করার কৌশল হিসেবেই ওইসব সংগঠন ছিলো গোপন ও চক্রান্তমূলক।

ইশতেহার রচনা ও প্রকাশ যেমন আকস্মিক ঘটনা ছিলো নাতেমনি তা ছিলো না গবেষকবুদ্ধিজীবীদের সাহিত্যিক কৌতূহলের ফল। যাঁরা ইশতেহার রচনা করেছিলেনকার্ল মার্কস ও ফ্রেডারিক এঙ্গেলসতাঁরা শ্রমজীবী জনগণের সংগ্রাম ও তাদের সংগঠনের সাথে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন। তাঁরা উভয়েই ছোট ছোট গোপন সংগঠনগুলো একটি সংগঠনে ঐক্যবদ্ধ করা ও আন্তর্জাতিক রূপ দেবার প্রক্রিয়ার সাথেও সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন। অবশ্য তখনো পর্যন্ত আন্তর্জাতিকের ধারণা ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার ভৌগোলিক সীমার মধ্যেই আবদ্ধ ছিলো। এশিয়া,আফ্রিকা ও দক্ষিণআমেরিকা তখনো আন্তর্জাতিকের ধারণার মধ্যে বিবেচিত হতো না।

ওইসব ছোট ছোট গুপ্ত সংগঠনগুলোর গোপন কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয় ১৮৪৭ সালের নভেম্বর মাসেলন্ডনে। দশদিনব্যাপী দীর্ঘ তর্কবিতর্কসমালোচনার মধ্যদিয়ে গঠিত হয়ইউরোপআমেরিকার শ্রমজীবী জনগণের প্রথম আন্তর্জাতিক সংগঠন ‘কমিউনিস্ট লীগ’। এই কংগ্রেস কার্ল মার্কস ও ফ্রেডারিক এঙ্গলসকে একটি বিশদ তাত্ত্বিক ও বাস্তব পার্টি কর্মসূচী প্রণয়নের দায়িত্ব দেয়। এভাবেই রচিত হয় কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহারজার্মান ভাষায় এবং লন্ডনে পুস্তিকাকারে প্রকাশিত হয় ১৮৪৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। কিছুদিনের মধ্যেই জার্মানী, ইংল্যান্ড ও আমেরিকায় অন্তত বারোটি সংস্করণ এবং পরে ইউরোপের প্রায় সকল ভাষায় অনূদিত ও প্রকাশিত হয়। স্মরণ করা যেতে পারে, মার্কস ইশতেহার রচনার সময় ব্রাসেলসএ নির্বাসিত ছিলেন। ইশতেহার প্রথম ইংরেজি ভাষায় অনুবাদ করেন মিস হেলেন ম্যাকফারলেন। প্রকাশিত হয় ১৮৫০ সালে লন্ডনে জর্জ জুলিয়ান হার্নি কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত রেড রিপাবলিকান পত্রিকায় ধারাবাহিক কয়েক সংখ্যায়। বর্তমানে যে ইংরেজি সংস্করণটি বিশ্বব্যাপী প্রচলিত সেটি অনুবাদ করেছিলেন স্যামুয়েল মুর মূল জার্মান সংস্করণ অনুসরণে এবং সম্পাদনা করেছিলেন ও ভূমিকা লিখেছিলেন ফ্রেডারিক এঙ্গেলস। লন্ডন থেকে সেটি প্রকাশিত হয়েছিলো ১৮৮৮ সালে। এটিই নির্ভরযোগ্য ইংরেজি অনুবাদ হিসেবে সারা দুনিয়ার কমিউনিস্টদের কাছে বিবেচিত হয়।

কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার মার্কস ও এঙ্গেলসএর যৌথ রচনা। তবে এর মূল চিন্তাধারার একক ও পূর্ণাঙ্গ কৃতিত্ব মার্কসএর। এ কথা অকপটে জানিয়েছেন এঙ্গেলস। ইশতেহারএর, ১৮৮৩ সালে প্রকাশিত, জার্মান সংস্করণের ভূমিকায় প্রবহমান ওই ‘মূল চিন্তাধারা’ এঙ্গেলস বর্ণনা করেছেন এভাবে:

প্রতিটি ঐতিহাসিক যুগের অর্থনৈতিক উৎপাদন ও তা থেকে আবশ্যিকভাবে সমাজের যে কাঠামো উদ্ভূত হয় সেটাই গঠন করে সেই যুগের রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসের ভিত; ফলস্বরূপ [জমির উপর আদিম গোষ্ঠিগত মালিকানার অবলুপ্তির পর থেকে] সমগ্র ইতিহাসই হচ্ছে শ্রেণী সংগ্রামের ইতিহাস, সমাজ বিকাশের বিভিন্ন পর্যায়ে শোষিত ও শোষকদের মধ্যেকার, আধিপত্যহীন ও অধিপতি শ্রেণীসমূহের মধ্যেকার সংগ্রামের ইতিহাস; এই সংগ্রাম বর্তমানে এমন এক পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে যেখানে শোষণ, পীড়ন ও শ্রেণী সংগ্রাম থেকে একইসাথে ও চিরকালের কতো সমগ্র সমাজকে মুক্ত না করে, শোষিত ও নিপীড়িত শ্রেণীটি (সর্বহারা শ্রেণী) তাকে শোষণ ও পীড়ন করছে যে শ্রেণীটি (বুর্জোয়া শ্রেণী) তার কবল থেকে নিজেকে আর মুক্ত করতে পারে না।’

তিনি আরো বলেছেনজীববিজ্ঞানের ক্ষেত্রে ডারউইনের তত্ত্ব যা করেছে, আমার মতে, ইতিহাসের ক্ষেত্রে মার্কসএর সিদ্ধান্ত অবধারিতভাবে তাই করবে।’…. ‘তাঁর এই তত্ত্ব ইতিহাস বিজ্ঞানের রূপান্তর ঘটিয়েছিলো।’

প্যারিতে ‘জুন অভ্যুত্থান’ ঘটার কয়েকদিন পূর্বে ইশতেহারএর ফরাসী অনুবাদ প্রকাশিত হয়। ইশতেহার তাঁদের হাতে পৌঁছার পূর্বেই প্যারির শ্রমজীবী জনগণ অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছিলেন। বুর্জোয়ারা নিষ্ঠুরভাবে দমন করলেও ১৮৪৮ সালের ২৩ থেকে ২৬ জুন সংঘটিত প্যারির অভ্যুত্থান ইতিহাসে সর্বহারা শ্রেণী ও বুর্জোয়া শ্রেণীর মধ্যে প্রথম বৃহৎ গৃহযুদ্ধ হিসেবে চিহ্নিত।

ইশতেহার স্পষ্ট ঘোষণা করেছিলো:

শৃঙ্খল ছাড়া সর্বহারাশ্রণীর হারাবার কিছু নেই। জয় করবার আছে সারাবিশ্বটাই।”

আর আহ্বান জানিয়েছিলো: দুনিয়ার মজদুর এক হও।’

এই আহ্বান সারা দুনিয়ার শ্রমজীবী জনগণের প্রধান রণধ্বনিতে পরিণত হয়েছে।

প্রকাশের পর থেকে ইউরোপ ও আমেরিকায় শ্রমজীবী জনগণের শ্রেণীসংগ্রামের দিশা হিসেবে গৃহীত হয় কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার। জন্ম নেয় নতুন চেতনা, নতুন সাংস্কৃতিক বোধযাত্রা শুরু হয় লাল পতাকার নিচে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের। ইশতেহার যে নতুন চেতনা ও সংগঠিত হবার প্রেরণা যোগান দিয়েছিলো তা ইউরোপ ও আমেরিকার সীমায় আবদ্ধ থাকেনিসারা দুনিয়ার সর্বহারা শ্রেণী ও সমাজের অগ্রসর অংশের চেতনায় বিপুল আলোড়ন জাগিয়েছিলো।

 

সংস্কৃতি ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন সম্পর্কে আমাদের ধারণা এখানে বলে নিতে চাইসংক্ষেপে। আমাদের সমাজে সংস্কৃতি সম্পর্কে খন্ডিত ও বিভ্রান্ত ধারণা চালু আেেছ। গানবাজনানাচের অনুষ্ঠানকেই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বলা রাজনৈতিক মহলে এবং গোটা সমাজেই রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। এমন বলাটা যে বিকৃত সংস্কৃতি তা কারো খেয়ালে আসে না।

সমাজবদ্ধ মানুষের জীবনসংগ্রাম থেকে জন্ম নেয় সংস্কৃতি। প্রকৃতি ও জীবজগতের সংস্কৃতি যদি আমরা স্বীকার করি তবে বলতে হয়প্রাকৃতিক সংস্কৃতি, আরণ্যক সংস্কৃতি। কিন্তু তা মেনে নয়া হয় না। কেননা, তা চলমান ও বিকাশমান নয়। অন্যদিকে মানুষের সমাজে সংস্কৃতি চলমান, চিরপরিবর্তনশীল ও বিকাশমান। মানুষ প্রকৃতির বৈরিতার বিরুদ্ধে বেঁচে থাকা ও টিকে থাকার তাগিদে লড়াই করে। সেই লড়াইয়ে তার বেদনা, ক্ষোভ, ক্রোধ, বীরত্ব, জীবনতৃষ্ণা, আনন্দ ও সৃষ্টিশীলতার যেসব বোধ তার চেতনায় জন্ম নেয় তারই নানামুখী, নানারূপে প্রকাশই তার সংস্কৃতি। অরণ্যে সংস্কৃতি নেইসংস্কৃতি আছে মানুষের তৈরি উদ্যানে। জীবনের তাগিদে হাতিয়ার নির্মাণে, আশ্রয়ের প্রয়োজনে গৃহনির্মাণে, শীত ও তাপ থেকে দেহ রক্ষার জন্যে বস্ত্র ও পোশাক তৈরিতে, খাদ্য উৎপাদন ও প্রস্তুত প্রণালিতে সংস্কৃতি প্রকাশমান। এভাবে আমরা খাদ্যসংস্কৃতি, বাস্তুসংস্কৃতি, পোশাকসংস্কৃতি, ক্রিড়াসংস্কৃতি, দৈহিক কসরত ও কৌশল প্রদর্শনের সংস্কৃতি, আচারআচরণের সংস্কৃতি প্রভৃতি পরিচয় দিয়ে থাকি।

মানুষের সমাজ বদ্ধ জলাশয়ের মতো স্থির নয়নদীর মতো বহমান। তার সংস্কৃতিও স্থাণু নয়সমাজের অনুসরণে নিত্যই পরিবর্তনশীল। বিরামহীনভাবে চলছে পরিবর্তন ও পরিমার্জন। সংস্কৃতি বায়বীয়ও নয়তার রূপ ও বৈশিষ্ট্য আছে, আছে ইতিহাসআছে দেশের ও কালের সীমানা। সংক্ষেপে বলা যায়, উৎপাদন, বিতরণ, বিনিময় ও ভোগের ব্যবস্থা এবং আনন্দ ও বেদনা প্রকাশের তাগিদ থেকেই সংস্কৃতির উন্মেষ ও বিকাশ। সাহিত্যে শিল্পকলার সকল শাখা, সকল রকম প্রচারমাধ্যমসহ বুদ্ধিবৃত্তিক ও সৃজনশীলতার সকল প্রয়াসই সংস্কৃতির প্রকাশক ও বাহক। মোটকথা, সংক্ষেপে বলা যায়, সংস্কৃতির প্রধানত দুই রূপমানসসংস্কৃতি ও বস্তুসংস্কৃতি। আবার বস্তুসংস্কৃতিতে মানসসংস্কৃতি মূর্তরূপে প্রকাশিত। আর মানস গঠন বা মতাদর্শ সমাজব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। তাই আমারা দেখি, মানবজাতি যতো ধরনের সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে, তার সংস্কৃতিও ততো ধরনের রূপ ও বৈশিষ্ট্য লাভ করেছে। মানবজাতির যতো অংশ পৃথিবীর যতোগুলো ভৌগোলিক সীমায় সমাজ ও সভ্যতা গড়ে তুলেছে ততোগুলো খন্ডাংশে সংস্কৃতির স্বাতন্ত্র্য স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে। আবার যুদ্ধাভিযান, বাণিজ্য, ধর্ম ও মতবাদ প্রচার এবং ভ্রমণ অভিযান ও অভিবাসনের মধ্যদিয়ে সংস্কৃতির কোনো কোনো বৈশিষ্ট্য দেশের সীমা অতিক্রম করে বিশ্বরূপ লাভ করেছে। আদানপ্রদান, মিশ্রণ ও সংশ্লেষনের মধ্যদিয়ে বিভিন্ন রূপের সংস্কৃতি নতুন রূপলাভ করে থাকে। তাও অবশ্য নির্দিষ্ট সমাজের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও জীবনযাপন প্রণালীর ওপর নির্ভরশীল।

মানবসভ্যতার প্রারম্ভকালে ভূমিতে সাধারণ বা সামাজিক মালিকানার অবসান ও ব্যক্তিমালিকানা প্রতিষ্ঠার মধ্যদিয়ে সমাজ শ্রেণীতে শ্রেণীতে বিভক্ত হয়েছে। ঠিক তেমনি তার অনুসরণে সংস্কৃতিও ভিন্ন ভিন্ন রূপলাভ করেছে। কোনো সমাজে যে শ্রেণী বা শ্রেণীসমূহের নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয় সে সমাজের সংস্কৃতিও সেই শ্রেণী বা শ্রেণীসমূহের মতাদর্শ ও মানসবৈশিষ্ট্যর প্রতিবিম্ব হয়ে ওঠে। সেটাই সে সমাজের সংস্কৃতির পরিচায়ক রূপভাল করে। প্রকৃতপক্ষে সেটি সমাজের নিয়ন্ত্রক বা অধিপতি শ্রেণীর সংস্কৃতিনিয়ন্ত্রক বা অধিপতি সংস্কৃতি। শ্রেণীতে শ্রেণীতে বিভক্ত সমাজে শ্রেণী নির্বিশেষ জাতীয় সংস্কৃতি হতে পারে না। তবে বিশেষ কোনো সংকটাবস্থা থেকে উত্তরণের চেষ্টায় অথবা বিদেশী দখল থেকে স্বাধীনতা ও মুক্তি অর্জন বা আগ্রাসনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার সংগামকালে, মুষ্টিমেয় দালাল বা বিশা¦সঘাতক ও অর্বাচীন বাদে, সকল শ্রেণী সাধারণ স্বার্থে ও স্বদেশপ্রেমের চেতনায় উত্থিত ও ঐক্যবদ্ধ হলে ওই নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক পর্বকালে যেহেতু শ্রেণীস্বার্থ জাতীয় স্বার্থের অধীন হয়ে যায়, সেকারণে সংস্কৃতিও ওই নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক পর্বকালের জন্য একটা সাধারণ জাতীয় রূপলাভ করে থাকে। তবে তা অবশ্যই ওই নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক পর্বকালের জন্যেই। অর্থাৎ ওই নির্দিষ্ট পর্বকালের অবসান হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সংস্কৃতির সে অখন্ড রূপ আর টিকে থাকে না। আর্ন্তজাতিক ক্ষেত্রেও বর্তমান বিশ্বে, একচেটিয়া ও বহুজাতিক ধনিক শ্রেণী এবং সাম্রাজ্যবাদ ও আধিপত্যবাদের সংস্কৃতি আর তার বিপরীতে রয়েছে সর্বহারা শ্রেণী এবং নিপীড়িত শ্রেণী ও জাতিসমূহের আন্তর্জাতিক সংস্কৃতি ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী দেশপ্রেমের সংস্কৃতি।

সমাজে সংস্কৃতির মূলে রয়েছে মতাদর্শ। আর সে মতাদর্শ হচ্ছে শ্রেণী ও শ্রেণীসমূহের। কোনো সমাজ ব্যবস্থা সংকটের আবর্তে পড়লে তার থেকে উদ্ধারের চেতনা তার অভ্যন্তরে জাগ্রত হয়। শুরু হয় নতুন পথের ও উপায়ের অন্বেষণ। এ অন্বেষণা ব্যক্তি থেকে ছোট ছোট গোষ্ঠিতে এবং ক্রমান্বয়ে গোটা সমাজে নতুন চেতনার জন্ম দেয়। পুরাতন অচল ব্যবস্থা পরিবর্তনের লক্ষে সৃষ্টি হয় দ্বন্দ্ব ও সংঘাত। এই নতুন চেতনা, নতুন দ্বন্দ্ব ও সংঘাত সৃষ্টি করে নতুন সংস্কৃতির উপাদান।

কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার প্রকাশের পর পুঁজিবাদী সমাজের নিষ্ঠুর শোষণ ও নির্যাতনের ব্যবস্থা পরিবর্তনের যে চেতনা জাগিয়ে তুলেছিলো প্রথমে ইউরোপআমেরিকার এবং পরে সারা দুনিয়ার সর্বহারা শ্রেণী ও নির্যাতিত অন্যান্য শ্রেণীসমূহ এবং উপনিবেশগুলোতে নিপীড়িত জাতিসমূহের মধ্যে সেই চেতনাই জন্ম দিয়েছে লাল পতাকার নিচে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের।

 

ইউরোপে শ্রমজীবী জনগণের সংগ্রামে প্যারির শ্রমিক শ্রেণী ছিলো সবচেয়ে এগিয়ে। তারাই শ্রেণী চেতনায় সংগঠতি হয়ে সর্বপ্রথম বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধে অভুত্থ্যান সংগঠিত করে ১৮৪৮ সালের জুন মাসে। আর কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহারএর আলোয় বিজ্ঞানভিত্তিক বিশ্বদৃষ্টি লাভ করে সর্বহারা শ্রেণীর প্রথম রাষ্ট্র তারাই প্রতিষ্ঠা করে প্যারিতে– ‘প্যারি কমিউন’।

ইশতেহার প্রকাশের ২৩ বছরের মাথায় ‘প্যারি কমিউন’ প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৮৭১ সালের ১৮ মার্চ প্যারির শ্রমিকরা শহর থেকে বুর্জোয়া শাসকদের হঠিয়ে দিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা নিয়ে নেয় নিজেদের হাতে। এ ছিলো এক অবিস্মরণীয় বীরত্বের গৌরবদীপ্ত কীর্তি। দশদিন পর ২৮ মার্চ গঠিত হয় ‘প্যারি কমিউন’পৃথিবীর প্রথম সর্বহারা শ্রেণীর রাষ্ট্র। তা ছিলো সম্পূর্ণ নতুন ধরনের রাষ্ট্রশ্রমিকজনগণের দ্বারা ও শ্রমিকজনগণের জন্যশ্রমিকশ্রেণীর স্বার্থের রাষ্ট্র। তা কোনোমতেই আমেরিকার তথাকথিত জনগণের জন্য, জনগণের দ্বারা, জনগণের রাষ্ট্রের মতো নয়। আমেরিকার রাষ্ট্রনেতা মুখে যাই বলে থাকুন, প্রকৃতপক্ষে ওদেশের রাষ্ট্র ছিলো এবং আছে শোষকউৎপীড়ক জনশত্রু বুর্জোয়াদের, যা সাম্রাজ্যবাদে পরিণত হয়েছে বহু পূর্বেই। বর্তমানে সে রাষ্ট্র আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রসহ সারা বিশ্বের জনগণের এক নম্বর শত্রুরাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত ও বিবেচিত।

প্যারি কমিউন’ টিকে ছিলো ৭২ দিন। বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধ সংগ্রাম চালিয়ে স্বদেশের ও বাইরের প্রতিক্রিয়শীল রাজশক্তির আক্রমণে পতন হলেও তার অভিজ্ঞতা ও শিক্ষা বিপুল প্রভাব সৃষ্টি করেছিলো বিশ্বব্যাপী সর্বহারা শ্রেণীর সংগ্রামে। লেনিন বলেছেন:

ইউরোপীয় সর্বহারা শ্রেণীকে শিখিয়েছে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের কর্তব্যকর্মগুলো সঠিকভাবে উপস্থাপিত করতে।”

তিনি আরো বলেছেন: প্যারিতে কামানের বজ্রনির্ঘোষ সর্বহারা শ্রেণীর সবচেয়ে পশ্চাদপদ অংশগুলোকে গভীর সুপ্তি থেকে জাগিয়ে তুলেছিলো, এবং সর্বত্র বিপ্লবী সমাজতান্ত্রিক প্রচারকার্যের প্রসারে উদ্দীপনা যুগিয়েছিলো।’

প্যারি কমিউন’ সৃষ্টি করেছিলো আন্তর্জাতিক সংহতির এক বলিষ্ঠ আন্দোলন। কমিউনের সমর্থনে, কমিউন দমনকারী প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিগুলোর বর্বতার বিরুদ্ধে এবং শরণার্থী কমিউনের যোদ্ধাদের সমর্থনে শ্রমিকরা জনসভা ও মিছিল করেছিলো ব্রিটেন, জার্মানী, বেলজিয়াম, আমেরিকা প্রভৃতি দেশে। এ সব সংহতি আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলো বিশ্বের সর্বহারা শ্রেণীর প্রথম সংগঠন ‘শ্রমজীবী জনগণের আন্তর্জাতিক সমিতি’ [ওয়ার্কিং মেনস ইন্টারন্যাশনাল এ্যাসোসিয়েশন] এবং সমিতির নেতৃমন্ডলীর দুই গুরুত্বপূর্ণ সদস্যকার্ল মার্কস ও ফ্রেডারিক এঙ্গেলস। কমিউন ব্যর্থ হলেও আরেক ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ সত্য প্রতিষ্ঠা করেছিলো। মার্কসএর ভাষায় তা হলো

তৈরি রাষ্ট্রযন্ত্রকে স্রেফ দখল করেই নিজের কাজে তা লাগাতে পারে না শ্রমিকশ্রেণী।”

তাকে চূর্ণ করে সে ধ্বংসস্তূপের ওপর তাকে গড়ে তুলতে হবে নতুন রাষ্ট্রযন্ত্র।

পূর্বতন রাষ্ট্রশক্তি চূর্ণবিচূর্ণ করে তার স্থলে যে নতুন সত্যিকার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রক্ষমতার প্রতিষ্ঠা করে ‘কমিউন’, তার বিশদ বর্ণনা মার্কস দিয়েছেন তার ‘ফ্রান্সে গৃহযুদ্ধ’ গ্রন্থের তৃতীয় অংশে। সে প্রসঙ্গে তার ভূমিকায় এঙ্গেলস মন্তব্য করেছেন:

রাষ্ট্র এক শ্রেণী কর্তৃক অন্য শ্রেণীকে দমন করার যন্ত্র ছাড়া আর কিছুই নয়। আর সেটা রাজতন্ত্রের বেলায় যতোটা, গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের ক্ষেত্রে তার চাইতে কিছু কম নয়। শ্রেণী প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে জয়লাভের পর সে রাষ্ট্র সর্বোত্তম ক্ষেত্রে সর্বহারা শ্রেণীর কাছে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া একটা অভিশাপ। বিজয়ী সর্বহারা শ্রেণী, ঠিক কমিউনের মতোই, সঙ্গে সঙ্গে তার নিকৃষ্টতম দিকগুলো যথাসম্ভব কেটেছেঁটে বাদ দিতে বাধ্য হবে। যতোদিন না নতুন, মুক্ত সামাজিক অবস্থায় মানুষ হয়ে ওঠা নতুন যুগের নরনারী এসে এই রাষ্ট্রপাটের গোটা আবর্জনাটা ছুঁড়ে ফেলে দিতে পারছে।”

প্যারি কমিউন’এ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো সঠিক অর্থেই ‘সর্বহারা শ্রেণীর একাধিপত্য’।

প্যারি কমিউন’ বিশ্ব সর্বহারা শ্রেণীর প্রথম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মধ্যদিয়ে মানবজাতির নতুন সভ্যতা ও সংস্কৃতির দ্বারোদ্ঘাটন করেছিলো। সভ্যতার ইতিহাসে তাই তার ভূমিকা ও গুরুত্ব অপরিসীম। সর্বহারা শ্রেণী ও নিপীড়িত জনগণ শান্তিপ্রিয়। রক্তপাত ও হিংসা তারা ঘৃণা করে। কিন্তু তাদের বাধ্য করা হয় রক্তপাতের মধ্যদিয়ে যেতে, সে সত্যও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ‘প্যারি কমিউন’এ।

বিশ্ব সর্বহারা শ্রেণীর জন্যে ‘প্যারি কমিউন’এর সর্বোত্তম উপহার হচ্ছে ‘আন্তর্জাতিক’ সংগীত। এই সংগীতের রচনাকারী কবি অগ্যঁ পতিএ ছিলেন ‘প্যারি কমিউন’ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে একজন কমিউন সদস্য ও সাহসী যোদ্ধা। ১৮৪৮ সালে বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধে শ্রমিকশ্রেণীর মহাসমরেও তিনি ছিলেন প্রতিরোধের কাতারে, একজন প্রত্যক্ষ যোদ্ধা। কমিউনের পতনের পর যেসব আহত ও শ্রান্ত কমিউনার্ড বাধ্য হয়ে কোনোমতে লন্ডনে পৌঁছেছিলেন তাদের একজন এই কবি অগ্যঁ পতিএ। ‘১৮৭১ সালের জুন মাসে, মে মাসের রক্তাক্ত পরাজয়ের পর, রচিত হয়েছিলো তাঁর বিখ্যাত সংগীতমহান আন্তর্জাতিক।’ পতিএএর ২৫তম মৃত্যুবার্ষিকীতে, তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে, লেনিন তাঁর ছোট্ট রচনায় বলেছেন:

কমিউন ধ্বংস হয়েছেকিন্তু পতিএএর ‘আন্তর্জাতিক’ কমিউনের আদর্শ ছড়িয়ে দিয়েছে বিশ্বব্যাপী।”… “সকল দেশের শ্রমিকশ্রেণী তাঁদের সর্বাগ্রগামী যোদ্ধা, সর্বহারা শ্রেণীর কবির এই সংগীত নিজেদের কন্ঠে তুলে নিয়েছেন এবং বিশ্বব্যাপী সর্বহারা শ্রেণীর সংগীতে পরিণত করেছেন।”

প্যারির এক গরীব পরিবারে কবি পতিএএর জন্ম। সারা জীবন তিনি গরীবই ছিলেন, ধনী হবার দুঃস্বপ্ন তাড়িত হয়ে উচ্ছিষ্টভোজীদের পঙ্ক্তিতে গিয়ে দাঁড়াননি। প্যাকিং শ্রমিক হিসেবে এবং পরবর্তীকালে কাপড়ে নকশা এঁকে তিনি রুটি যোগাড় করতেন। ১৮৪০ সাল থেকে ফরাসীদের জীবনে যতো বড়ো বড়ো ঘটনা ঘটেছে সে সবের প্রতিধ্বনি উঠেছে তাঁর তেজোদ্দীপ্ত সংগীতে। যারা পশ্চাদপদ ছিলো তাদের চেতনা জাগিয়ে তুলেছিলেন তিনি। আহ্বান জানিয়েছিলেন শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধ ও সংগঠিত হবার। তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেছিলেন বুর্জোয়াদের ও ফরাসী সরকারকে। কমিউনে তিনি নির্বাচিত হয়েছিলেন ৩৬০০ ভোটের মধ্যে ৩৩৬২ ভোট পেয়ে। কমিউনের সকল কাজকর্মে তিনি অংশ নিয়েছিলেন। প্রায় ৯ বছর ইংল্যান্ডে ও আমেরিকায় প্রবাসজীবন কাটিয়ে তিনি স্বদেশে ফিরে আসেন ও ‘ওয়ার্কার্স পার্টি’তে যোগ দেন। তাঁর কাব্যের প্রথম খন্ড প্রকাশিত হয় ১৮৮৪ সালে ও দ্বিতীয় খন্ড ১৮৮৭ সালে ‘বিপ্লবী সংগীত’ নামে।

অগ্যঁ পতিএ প্যারিতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ১৮৮৭ সালের ৮ নভেম্বর। তাঁকে সমাহিত করা হয় শহীদ কমিউন যোদ্ধাদের সমাধিস্থলে। সমাধিস্থলের পথে তাঁর শবযাত্রায় এক বিরাট জনতা লাল পতাকা হাতে অংশ নিয়েছিলো। জনতার হাত থেকে লাল পতাকা ছিনিয়ে নিতে পুলিশ বর্বর হামলা করেছিলো। সে বর্বরতার বিরুদ্ধে সবদিক থেকেই গর্জনধ্বনি উঠেছিলো– ‘পতিএ দীর্ঘজীবী হোক!’

লেনিন বলেছেন:

দারিদ্রের মাঝে পতিএএর মৃত্যু হয়। কিন্তু তিনি এমন স্মৃতি রেখে গেছেন যা সত্য সত্যই মানুষের তৈরি যেকোনো কিছুর চেয়ে অনেক বেশি স্থায়ী। তিনি ছিলেন অন্যতম শ্রেষ্ঠতম সংগীতের মাধ্যমে প্রচারকঐতিহাসিক সংগীত আজ কোটি কোটি সর্বহারার কাছে পরিচিত।”

তিনি আরো বলেছেন: একজন শ্রেণী সচেতন শ্রমিক, তিনি যে দেশেই থাকুন না কেন, দুর্ভাগ্য তাঁকে স্বদেশ ও বন্ধুদের মধ্য থেকে তুলে যেখানেই নিক্ষেপ করুক না কেন, এবং ভিন্ন পরিবেশে, ভিন্ন ভাষাভাষীদের মাঝে নিজেকে তিনি যতোই অচেনা ভাবুন না কেনআন্তর্জাতিকের সুপরিচিত সুর শুনে কমরেড ও বন্ধু খুঁজে পাবেন।”

আন্তর্জাতিক’ ছিলো এক দীর্ঘ কবিতা। তার অংশবিশেষ নিয়ে তৈরি করা হয় সংগীত। সুর দিয়েছিলেন পি. ডেগিটার (P. Degeyter)। সারা দুনিয়ায় প্রায় সকল ভাষায় এই সংগীত অনূদিত হয়েছে এবং গাওয়া হয় একই সুরে। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি কবি কাজী নজরুল ইসলামকে এটি অনুবাদ করার দায়িত্ব দিয়েছিলো। তিনি যে অনুবাদ করেন– [‘জাগো অনশন বন্দী ক্রীতদাস / জগতের ভাগ্যহত…’] তা পার্টির অনুমোদন পায়নি। পরে পার্টির একজন সদস্য, মোহিত ব্যানার্জী, বাংলা রূপান্তর করেন [‘জাগো জাগো জাগো সর্বহারা / অনশন বন্দী ক্রীতদাস / শ্রমিক দিয়াছে আজি সাড়া / উঠিয়াছে মুক্তির আশ্বাস…’]। এ অনুবাদ প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৪২ সালের ৪ নভেম্বর জনযুদ্ধ পত্রিকায়। সেখানে ক্রীতদাস বানান ‘কৃতদাস’ ছাপা হয়েছিলো]। এই রূপান্তর অনুমোদিত ও প্রচলিত হয় পার্টির সিদ্ধান্তে। [ অর্বাচীন ও সুবিধাবাদী সংগীত শিল্পীরা এর যথেচ্ছ ব্যবহার করে থাকে। আমাদের দেশে সর্বহারা শ্রেণী এই যথেচ্ছাচারিতা বন্ধ করে দেবার মতো শক্তি ও সামর্থ্য অর্জন করতে না পারায় এমনটা হচ্ছেতা বলার অপেক্ষা রাখে না।]

 

কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহারএর আলোয় মুক্তির পথ খুঁজে পেয়ে রুশদেশের সর্বহারা শ্রেণী শক্ত হাতে আঁকড়ে ধরেছিলো ‘প্যারি কমিউন’এর পতাকা আর কন্ঠে তুলে নিয়েছিলো ‘আন্তর্জাতিক’ সংগীত। এরপর তারা পরিচালনা করেছিলো এক দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের সঙ্গে সঙ্গে এক দীর্ঘ সাংস্কৃতিক সংগ্রাম। আর নিষ্ঠুর ও গৌরবময় রক্তপাতের ঘটনার মধ্যদিয়ে ‘প্যারি কমিউন’এর পতনের ৪৬ বছর পর রুশদেশে তারা উড়িয়েছিলো সর্বহারা শ্রেণীর সার্থক বিপ্লবের বিজয় পতাকা১৯১৭ সালের অক্টোবর [ নতুন পঞ্জিকা মোতাবেক নভেম্বর ] মাসে।

রুশদেশের সর্বহারা শ্রেণী অক্টোবর বিপ্লবের বিজয়ের মধ্যদিয়ে কেবল স্বদেশে বুর্জোয়া ও সামন্তপ্রতিক্রিয়াশীলদের পরাভূত করে এক নতুন রাষ্ট্রসোভিয়েত ইউনিয়নপ্রতিষ্ঠা করেছিলো। সেই বিপ্লবের তোপধ্বনি সারা বিশ্বের প্রায় সকল দেশের সর্বহারা শ্রেণী, নানা পেশায় মেহনতকারি সকল জনগণ ও নিপীড়িত জাতিসমূহের নিকট পৌঁছে দিয়েছিলো মার্কসবাদী মতাদর্শ ও লাল পতাকার নিচে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের বার্তা।

রুশদেশে লাল পতাকার নিচে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সূচনা পর্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন দার্শনিক প্লেখানভ। নবচেতনায় জেগে ওঠা রুশী মার্কসবাদীদের তিনি ছিলেন একজন বিশিষ্ট শিক্ষক। রুশ বিপ্লবের নেতৃমন্ডলীর প্রধান লেনিন কেবল রাজনৈতিক নেতা ও শিক্ষকই ছিলেন নাতিনি সর্বহারাশ্রণীর সাংস্কৃতিক আন্দোলনেরও একজন প্রধান শিক্ষক ও দিশা নির্মাতা ছিলেন। বিপ্লবের পূর্বে যেসব কীর্তিমান ব্যক্তি সমাজ বাস্তবতার ওপর তাঁদের চিন্তার আলো ফেলেছিলেন সেসব লেখকশিল্পী ও চিন্তকদের কীর্তি ও কৃতি সঠিকভাবে মূল্যায়নের এবং সে মূল্যায়ন থেকে সত্য উদ্ধার করে নবচেতনাকে সমৃদ্ধ করার সঠিক দিশাও তিনি দিয়েছিলেন। পুরাতন সবকিছুর গ্রহণ ও বর্জনের, সমালোচনার ও প্রশংসার সঠিক পথ তাঁর কাছ থেকেই জানা গেছে। তাঁর শিক্ষা থেকেই ধ্রুপদ সাহিত্য ও শিল্পকলার যথার্থ মূল্যায়ন ও সঠিক গ্রহণবর্জনের দৃষ্টিভঙ্গী অর্জন সম্ভব হয়েছে।

রুশদেশে বিপ্লব সর্বহারা শ্রেণীকে বুর্জোয়া শ্রমদাসত্ব থেকে মুক্তি দিয়েছিলোফলে বিপুল গতিতে স্ফূরণ ঘটেছিলো নির্মাণে ও সৃজনে। লেখক ও শিল্পীরাযারা পূর্বে ছিলো সামন্ত ও ধনিক শ্রেণীর রাষ্ট্র ব্যবস্থায় মানসিক দাস, তারা নতুন সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থায় নব চেতনার স্রোতে অবগাহন করে যেমন মুক্তির স্বাদ পেয়েছিলো, তেমনি মেতে উঠেছিলো নতুন সৃষ্টিকর্মযজ্ঞে। লাল পতাকার নিচে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের এক অতি উজ্জ্বল নামম্যক্সিম গোর্কি। তিনি নবচেতনায় উদ্দীপিত তাঁর সৃষ্টিকর্মের জন্যে বিপ্লবের পূর্বেই বিশ্বখ্যাত হয়েছিলেন। তাঁর সৃষ্টিকর্ম সর্বহারা শ্রেণীর অগ্রগামী অংশকে বিপুলভাবে উদ্দীপিত করেছিলো। তাঁর ‘মা’ উপন্যাসএর পাঠক পৃথিবীর প্রায় সকল দেশে খঁজে পাওয়া যাবে। সে সব পাঠকের অনেকেই এ উপন্যাস পাঠ করে প্রেরণা পেয়েছে, বিপ্লবী সংগ্রামে যোগদিতে উদ্বুদ্ধ হয়েছে। এটি কেবল একটি সাহিত্যকৃতিই নয়সাহিত্য বিচারে এর চেয়ে উৎকৃষ্ট, সার্থক ও মহত্তম উপন্যাস রুশ ভাষায় আছে অবশ্যইএ উপন্যাস একইসাথে যেমন শ্রেণী সংগ্রামের কাহিনী, তেমনি ওই সমাজের সর্বহারা শ্রেণীর সাংস্কৃতিক সংগ্রামের, তার জীবনরুচিমূল্যবোধ বদলাবার সংগ্রামেরও দলিল। তাই ‘মা’ উপন্যাস মর্যাদা পেয়েছে রুশদেশের শ্রমিকশ্রেণীর মহান সংগ্রামের এক উজ্জ্বল স্মারক হিসেবে। সে জন্যেই এর এতো কদর এবং সকল প্রধান ভাষায় অনুবাদের তাগিদ অনুভূত হয়েছে। বিপ্লবের পর সর্বহারা শ্রেণীর সাংস্কৃতিক আন্দোলনেজীবনরুচিমূল্যবোধ পরিবর্তন ও নবনির্মাণে এবং লেখকশিল্পীসংস্কৃতিকর্মীদের দিশাগত পরিচালনায় বিশেষ ভূমিকা পালন করেছেন যাঁরা তাদের মধ্যে স্মরণীয় নামলুনাচারস্কি।

সবকিছু সহজে, তরতর করে বয়ে চলা জলপ্রবাহর মতো ঘটেছিলো তা আমরা কখনোই বলবো না। তা বললে সত্যকে কেবল অস্বীকারই করা হয় না, তা হবে সম্পূর্ণ অবৈজ্ঞানিক কথা। বিপ্লবের শত্রু কেবল বাইরে থেকে সরাসরি আঘাত করে না, ভেতর থেকে চোরাগোপ্তা আঘাতও সমানে চালায়। বিপ্লবের শক্তি ও নেতৃত্বকে তাই লড়তে হয় যেমন সামনের প্রত্যক্ষ শত্রুর বিরুদ্ধে, তেমনি সজাগ থাকতে হয় ও নির্মূল করার ব্যবস্থা নিতে হয় অভ্যন্তরে লুকিয়ে থাকা শত্রুকেও। এমন প্রক্রিয়া কখনোই সঠিক ও নির্ভুলভাবে চলতে পারে না। সেটা লক্ষ্য করেই মাও সেতুঙ বলেছেন-‘বিপ্লব ভোজসভা অথবা প্রবন্ধ রচনা করা কিংবা ছবি আঁকা বা সূচিকর্মের মতো নয়’বিপ্লব হচ্ছে বিদ্রোহ, সশস্ত্র শক্তি দিয়ে প্রতিপক্ষ সশস্ত্র শক্তিকে উৎখাত করা। শুনতে নির্মম মনে হলেও একথা সত্য যে, বিপ্লব তো শেষ পর্যন্ত প্রাণ দেয়ানেয়ার এক নিষ্ঠুর কর্মযজ্ঞ। এই কর্মযজ্ঞে ভুলত্রুটি শুধরে নেয়া সহজ নয়, সম্ভবও নয়।

মানবজাতি আজো পর্যন্ত এমন কোনো ব্যবস্থা উদ্ভাবন করতে পারেনিযা সম্পূর্ণ ত্রুটিমুক্ত। মার্কসবাদ সম্পর্কেও তা সত্য। আজো পর্যন্ত কেউ দাবি করেনি যে, মার্কসবাদের সবকিছু সম্পূর্ণ অভ্রান্ত ও ত্রুটিমুক্ত। তবে একথা জোর দিয়ে বলা হয় যে, মার্কসবাদের মৌলিক সত্য অভ্রান্ত। যতোদিন সমাজ শ্রেণীতে শ্রেণীতে বিভক্ত থাকবে ততোদিন মার্কসবাদের এই মৌলিক সত্যঅর্থাৎ শ্রেণী সংগ্রাম এবং এক শ্রেণী কর্তৃক অন্য শ্রেণীকে দমন ও পরাভূত করাঅভ্রান্ত সত্য হিসেবেই টিকে থাকবে।

রুশদেশের সর্বহারা শ্রেণীর বিপ্লবে ও বিপ্লবোত্তর সমাজ পুনর্গঠনকালে ত্রুটিবিচ্যুতি হওয়াটা ছিলো স্বাভাবিক। তবে ত্রুটির চাইতে সাফল্য ও সার্থকতা যে ছিলো অনেক অনেক বেশি তা ওই বিপ্লবের ও সোভিয়েত রাষ্ট্রের শত্রুরাও স্বীকার না করে পারেনি। অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সাফল্য আমাদের আলোচনার বিষয় নয়যদিও সংস্কৃতির আন্দোলন রাজনৈতিক আন্দোলনেরই ভিন্ন রূপ এবং অর্থনীতি ও রাজনীতির ওপর নির্ভরশীল ও অনুগামী। বিপ্লবের পর যে বিস্ময়কর শিল্পায়ন ঘটেছিলো এবং তা ঘটেছিলো এমন দ্রুত গতিতে যার কোনো পূর্ব নজির নেই। সামন্ততন্ত্রকে সম্পূর্ণ উচ্ছেদ করার ফলে বহু শতাব্দী প্রাচীন নির্মম ভূমিদাস প্রথা থেকে মুক্তি পেয়েছিলো জনসংখ্যার অধিক অংশ, কৃষক জনগণ। তাদের একটা অংশ নতুন ও বিপ্লবী জীবন খুঁজে পেয়েছিলো শিল্পকারখানায়। ভূমিদাসত্ব থেকে মুক্ত কৃষক জনগণ আধুনিক কৃষি সরঞ্জামের সহায়তা পেয়ে খাদ্য উৎপাদনে বিস্ময়কর রেকর্ড সৃষ্টি করেছিলো। তার সঙ্গে সঙ্গে অবসান হয়েছিলো বেকারত্বের।

আর সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে পরিচালিত সার্থক বিপ্লবের ফলে বিপুল সংখ্যক মানুষ কেবল শিক্ষিতই হয়নিসোভিয়েত ইউনিয়নের শিক্ষা ব্যবস্থা বিশ্বের সর্বোত্তম হিসেবে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতও হয়েছিলো। বিজ্ঞান চর্চা, সাহিত্যশিল্পকলা, সংগীতনৃত্যনাটকচলচ্চিত্রচিত্রকলা সর্বক্ষেত্রে বিশ্বমানই কেবল অর্জিত হয়নিঅনেক ক্ষেত্রে নতুন বিশ্বমান সৃষ্টিও হয়েছিলো।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানীর ফ্যাসিস্ট আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়াইতে সোভিয়েত জনগণ যে সাহস ও বীরত্ব, স্বদেশপ্রেম ও ত্যাগের মহিমা দেখিয়েছে তা মানবজাতির ইতিহাসে বিস্ময়কর গৌরবগাথা হিসেবে স্থানলাভ করেছে। রবীন্দ্রনাথের ‘রাশিয়ার চিঠি’ স্মরণ করা যেতে পারে। তিনি অবশ্য বাইরের পরিবর্তন ও উন্নয়ন দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন আর অন্তরের পরিবর্তন ও উন্নয়ন না দেখে আফসোস করেছেন। তার মতো ভাববাদী কবির পক্ষে কি নবজাগ্রত বস্তুবাদী মানুষের অন্তরজগতে সন্ধান চালানো সম্ভব ছিলো? উপলব্ধির জন্যও তো মানসগঠন জরুরি।

লেনিন দীর্ঘদিন সোভিয়েত রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পাননিঅকাল মৃত্যু সর্বহারা শ্রেণীর এই মহান শিক্ষক ও নেতার কর্মজীবনের চিরবিরতি ঘটিয়েছিলো। তারপর নেতৃমন্ডলীর প্রধানের দায়িত্ব পেয়েছিলেন জোসেফ স্তালিন।

নতুন সোভিয়েত রাষ্ট্রে সংস্কৃতি ক্ষেত্রের কালোদিক হচ্ছেলেখকশিল্পী ও বুদ্ধিজীবীদের নিবর্তন। এ বিষয়ে পশ্চিমের পুঁজিবাদীসাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রসমূহের অনুগত লেখকশিল্পী ও বুদ্ধিজীবীরা এতো ফেনিয়েছে যে তার মধ্য থেকে সত্য উদ্ধার করা প্রায় অসম্ভব। সোভিয়েত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সূচনাকাল থেকেই এই নিবর্তনের শুরু। তবে তুঙ্গ অবস্থা সৃষ্টি হয়েছিলো তথাকথিত ‘স্তালিন যুুগ’, বিশেষকরে, তিরিশের দশকে।

রুশদেশে সর্বহারা শ্রেণীর বিপ্লব ও তার রাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠার ইতিহাস সৃষ্টিকারী ঘটনা দেশের অভ্যন্তরের বুর্জোয়া শ্রেণী ও প্রতিক্রিয়াশীল সামন্ত শ্রেণীর পক্ষে মেনে নেয়া যেমন সম্ভব হয়নি, তেমনি একইভাবে মেনে নিতে পারেনি ইউরোপ ও আমেরিকার বুর্জোয়া ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তিসমূহ এবং তাদের অনুগত ও উচ্ছিষ্টভোজী বুদ্ধিজীবীরা। ফলে সার্থক বিপ্লবকে ব্যর্থ বিপ্লবের পথে ঠেলে দেবার ও সোভিয়েত রাষ্ট্রকে ধ্বংস করার লক্ষে দেশের অভ্যন্তরে ও বাইরে থেকে চক্রান্তষড়যন্ত্রের মোকাবিলা করতে হয়েছিলো সর্বহারা শ্রেণীর রাজনৈতিক অগ্রবাহিনী অর্থাৎ পার্টিকে ও তার রাষ্ট্রশক্তিকে। এই চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্র যেমন ছিলো নিষ্ঠুর ও বিধ্বংসী তার মোকাবিলাও ভিন্ন রকম হওয়া সম্ভব ছিলো না। শত্রু যখন আঘাত করার জন্যে মাথার ওপর তালোয়ার তোলে তখন করজোড়ে বিনয়ের সঙ্গে মাথা নিচু করে শান্তি রক্ষার আবেদন জানাতে গেলে ওই উদ্যত তালোয়ার ঘাড় থেকে মাথাটাই নামিয়ে দেবে। সর্বহারা শ্রেণী হানাহানি ও রক্তপাত ঘৃণা করে এবং সমাজে শান্তি, সম্প্রীতি ও স্থিতি প্রতিষ্ঠা তার এক প্রধান লক্ষ্য ও প্রতিশ্রুতি। এই শ্রেণী ও তার সহযাত্রী সমগ্র মেহনতকারী ও দেশপ্রেমিক জনগণ শত্রুশ্রেণীগুলোর উদ্যত তালোয়ার প্রতিহত করতেই তালোয়ার ওঠাতে ও প্রত্যাঘাত করতে বাধ্য হয়। ইতিহাসের এই নির্মম সত্য তাদের পক্ষে মেনে নেয়া কঠিন যেসব লেখকশিল্পীবুদ্ধিজীবী নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে এমন ঘটনা দেখে কিংবা তার বর্ণনা শোনে বা পাঠ করে।

সোভিয়েত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সূচনা থেকেই লেখকশিল্পীবুদ্ধিজীবীদের নিবর্তনের ঘটনা ঘটেছে এবং তা দীর্ঘদিন ধরে চলেছে। সর্বহারা শ্রেণীর বিরোধিতাকারীরাই মূলত এই নিবর্তনের শিকার হয়েছিলেন। পুরনো সমাজের পশ্চাদপদ সংস্কৃতির সেবক লেখকশিল্পীবুদ্ধিজীবীরা নতুন সমাজকে মেনে নিতে পারেনিই কেবল নয়, সক্রিয় বিরোধিতা করেছে, নানারকম অন্তরঘাতে সহায়তা করেছে। সর্বহারা শ্রেণীর নতুন রাষ্ট্র ও সমাজ তাদের ছেড়ে দেবে কেন? তারপরও একথা বলা যায়সর্বহারা শ্রেণীর সোভিয়েত রাষ্ট্র বুদ্ধিজীবীদের সাথে যে আচরণ করেছে সে সম্পর্কে ওই রাষ্ট্রের শত্রুদের ফেনায়িত প্রচারণা সত্যকে কুয়াশাবৃত করে রেখেছে। তার প্রভাবে দুনিয়াব্যাপী সোভিয়েত রাষ্ট্র সম্পর্কে নৈরাজ্যকর বিভ্রান্তি বিরাজ করছে। আর সোভিয়েত রাষ্ট্র ভেঙে যাবার পর সেই শত্রুরা নব উদ্যমে অতি উৎসাহে বিরামহীন বিষোদ্গার করে চলেছে। তবে তাই বলে সোভিয়েত রাষ্ট্রে বুদ্ধিজীবীদের নিবর্তনের বিষয়ে যে বাড়াবাড়ি হয়েছে তা আমরা অস্বীকার করি না।

লেনিন ও ম্যাক্সিম গোর্কির সম্পর্ক এবং তাঁদের মধ্যে অসংখ্য পত্রবিনিময় থেকেও তার প্রমাণ পাওয়া যায়। সর্বহারা শ্রেণীর লেখক গোর্কি এবং সেই শ্রেণীর শিক্ষক ও নেতা লেনিনের মধ্যেকার সম্পর্ক কোনো বিশেষণ দিয়েই বিবৃত করা যাবে না। নিবর্তনের শিকার লেখকশিল্পীবিজ্ঞানীবুদ্ধিজীবীদের পক্ষ নিয়ে গোর্কি যেভাবে আবেগতাড়িত হয়ে লেনিনকে উত্যক্ত করেছেন আর লেনিন ধৈর্য ও সহমর্মিতার সঙ্গে সেসব সহ্য করেছেন এবং প্রয়োজনীয় যুক্তিসঙ্গত ব্যবস্থা নিয়েছেন তার নজির ইতিহাসে বিরল বললে খুব কমই বলা হবে। লেনিন এক চিঠিতে গোর্কিকে বলেছিলেন (১৫ সেপ্টেম্বর ১৯১৯): “কিছু ‘প্রতিভাবান’কে কয়েক সপ্তাহ বা তার চেয়ে বেশিদিন জেলে রাখা তেমন ক্ষতিকর নয়, যদি তা চক্রান্ত ও হাজার হাজার মৃত্যু ঠেকানোর জন্য হয়।” কথাটা শুনতে নির্মম মনে হলেও এমন ঘটনা এড়াবার কোনো উপায় তখন ছিলো না। লেনিন যেমন গোর্কির কথা মতো ভুলত্রুটি শুধরে নেবার ব্যবস্থা নিয়েছেন তেমনি গোর্কির অন্যায্য ও অযৌক্তিক আবদার ও অভিযোগের তীব্র ও তীক্ষ্ণ হুলফোটানো সমালোচনাও করেছেন। লেনিন সর্বহারা শ্রেণীর তেমনই একজন মহান শিক্ষক ও নেতা, যিনি লেখকশিল্পীবিজ্ঞানীবুদ্ধিজীবীদের ভালোমতো জানতেন ও বুঝতেন। বিশেষকরে গোর্কিকে তিনি জানতেন ও বুঝতেন সবচেয়ে বেশি। দীর্ঘকাল ধরে তাঁদের দুজনের সম্পর্ক ইতিহাসে এক অনন্যসাধারণ দৃষ্টান্ত। তাঁদের উভয়ের মধ্যে বিনিময়কৃত পত্রাবলী তার সর্বোৎকৃষ্ট প্রমাণ।

গোর্কি সম্পর্কে লেনিনের ছোট্ট একটা মন্তব্য:

গোর্কি তাঁর মহৎ সৃষ্টিকর্মের মধ্যদিয়ে রুশদেশের ও সারাবিশ্বের শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে নিজেকে নিবিড় বন্ধনে আবদ্ধ করেছেন।”

আর গোর্কির মন্তব্য: এমন মহান ব্যক্তিবর্গ আছেন যাদের গুরুত্ব বর্ণনায় মানুষের ভাষা যথেষ্ট নয়তেমন একজন ব্যক্তি কেবল রুশদেশে নয়, সমগ্র পৃথিবীতে, আমাদের এই সমগ্র গ্রহে, হচ্ছেন ভ্লাদিমির ইলিচ (লেনিন)। আমার মতে, যতো ললিত শব্দাবলীই উচ্চারণ করি না কেন, আমরা কখনোই তাঁর কীর্তি ও কৃতির, তার প্রাণপ্রাচুর্যতার, তার অন্তর্ভেদী দৃষ্টির মননশীলতা কেবল আমাদের জন্য নয়সমগ্র মানবজাতির জন্য, তার গুরুত্ব ও তাৎপর্য যথার্থভাবে কখনোই বর্ণনা করা যাবে না।”

তথাকথিত স্তালিন যুগে, বিশেষকরে তিরিশের দশকে, নিবর্তন তুঙ্গ অবস্থায় পৌঁছেছিলো। সোভিয়েত ইউনিয়নে এই কালপর্ব বিশেষভাবে চিহ্নিত। এ সময়ে চক্রান্তষড়যন্ত্র যেমন গভীর ও জটিল রূপ নিয়েছে তেমনি নির্বতনের মাত্রাও অনেক বেড়েছে ও নির্মম হয়েছে। বাইরের পুঁজিবাদীসাম্রাজ্যবাদী শক্তিসমূহের সাথে সাথে দেশের অভ্যন্তরে লুকিয়ে থাকা সমাজতন্ত্রবিরোধী শক্তির ষড়যন্ত্রের জাল নিপুণ ও নিষ্ঠুর রূপ নিয়েছিলো। সর্বহারা শ্রেণীর রাজনৈতিক সংগঠনের অর্থাৎ পার্টির অভ্যন্তরে পেটিবুর্জোয়া শ্রেণীর ব্যাপক অনুপ্রেবেশ পরিস্থিতিকে ঘোলাটে ও জটিল করে তিুলেছিলো। লেনিনের যোগ্য ছাত্র স্তালিন যোগ্যতা ও দক্ষতার সঙ্গে বাইরের ও অভ্যন্তরের ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করেছিলেন। তবে এই মোকাবিলা তো কেবল ব্যক্তিবিশেষের বিরুদ্ধে ব্যক্তিবিশেষের নয়। সংগঠিত শক্তির সর্বাত্মকতার বিরুদ্ধে সংগঠিত শক্তির সর্বাত্মকতার। সেটা লেনিনের সময় যেমন স্তালিনের সময়ও তেমনি। ব্যক্তি পরিচালক ও প্রতীক মাত্র। সংগঠিত শক্তির পূর্ণমাত্রায় সক্রিয়তা ও সহযোগিতা ছাড়া ব্যক্তির পক্ষে কোনো ঘটনাই পরিণতির দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। আমরা তো জানি, ইতিহাস ব্যক্তিকে নির্মাণ করে আর ঘটনাধারা পরিচালনার দায়িত্ব পালন করে ব্যক্তি। ইতিহাসের পরিহাস হচ্ছে সব কৃতিত্বের সকল প্রশংসা ও ব্যর্থতার সব দায়ভার ব্যক্তির ওপরই অর্পিত হয়। সেটা অবশ্যই ভুল।

স্তালিন ছিলেন একজন বিরাহমীন জ্ঞান ও সত্য অনুসন্ধানী বিচক্ষণ মার্কসবাদী। একজন কর্তব্যনিষ্ঠ ও দক্ষ সংগঠকের শ্রেষ্ঠ গুণাবলী তাঁর মধ্যে বিকশিত হয়েছিলো। রাষ্ট্র পরিচালনায় অসাধারণ দক্ষতার স্বাক্ষর যেমন রেখেছেন, সঙ্গে সঙ্গে ইতিহাস, ভাষাবিজ্ঞান ও জাতিসমস্যা চর্চায় অসাধারণ অবদানও রয়েছে তাঁর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে ‘মিত্রশক্তির’ অন্য নেতারা তাঁকে যেমন ভয় পেতেন তেমনি তাঁর জ্ঞান ও মেধাকে সমীহ না করে পারেননি। বাইরে তাঁর কঠোর ও কঠিন গাম্ভীর্যের আবরণ ছিলো ঠিকই কিন্তু অন্তরে তিনি ছিলেন যেমন দরদি ও স্নেহশীল, তেমনি ছিলেন সুবিবেচক। রাষ্ট্রের ও জনগণের শত্রুর মোকাবিলায় তিনি যেমন ছিলেন কঠোর ও নির্মম, দেশের জনগণের ও সারা দুনিয়ার সর্বহারা শ্রেণীর পক্ষে তিনি ছিলেন দরদি ও সুবিবেচক অভিভাবকতুল্য। স্তালিনের বিশেষ আগ্রহে ‘ডক্টর জিভাগো’র লেখক বরিস পাস্তারনাক আরেকজন লেখক বেবেলকে সঙ্গে নিয়ে প্যারির বিশ্ব লেখক সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন ১৯৩৬ সালে। সর্বহারা শ্রেণীর নেতা হিসেবেই নতুন সংস্কৃতি নির্মাণের সংগ্রামে তাঁর ভূমিকা পালন করেছিলেন স্তালিন।

পশ্চিমের বুদ্ধিজীবীরা, যারা প্রকৃতপক্ষে পুঁজিবাদীসাম্রাজ্যবাদী শক্তির সেবক ছাড়া আর কিছুই নয়স্তালিনকে ‘দানব’ আখ্যা দিয়ে প্রথম পিটার, দ্বিতীয় ক্যাথরিন ও হিটলারের সমতুল্য বলে চিত্রিত করে কেবল অন্যায়ই করেনিঅপরাধও করেছে। তাদের এ অপরাধের শাস্তি তারা একদিন অবশ্যই পাবে। সর্বহারা শ্রেণীর সাংস্কৃতিক আন্দোলন বিশ্বব্যাপী বিজয় পতাকা ওড়ালে ওইসব বুদ্ধিজীবীর টন টন কুকীর্তি ও কৃতি ইতিহাসের আবর্জনাস্তূপে নিক্ষেপের মধ্যদিয়েই হবে তাদের অপরাধের যথার্থ শাস্তি।

সোভিয়েত ইউনিয়নে লাল পতাকার নিচে বস্তুসংস্কৃতি ও মানসসংস্কৃতির নির্মাণযজ্ঞে বিস্ময়কর সাফল্য যে ইতিহাস সৃষ্টি করেছে পূর্বে মানবজাতি আর কখনো তেমনটা দেখেনি। সমাজে মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অবদমিত ও নির্যাতিত সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ সাহসের সাথে মাথা উঁচু করে উঠে দাঁড়িয়েছে, শ্রমের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং ধর্মীয় ও সামন্ততান্ত্রিক প্রতিক্রিয়াশীল মানসিক দাসত্ব থেকে মুক্তির বিজ্ঞানসম্মত পথ খুঁজে পেয়েছে। আর সে সাথে শ্রেণী বিভক্ত সমাজের এক গুরুতর অভিশাপ নারীপুরুষের বৈষম্যের সামাজিক অবসান ঘোষিত হয়েছেগৃহেপরিবারেসমাজে বন্দী ও নির্যাতিত নারী পুরুষের সমান অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। পুঁজিবাদী সমাজে আজো নারী তেমনটা কল্পনাও করতে পারে না।

তবু এই রাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত সর্বহারা শ্রেণীর হাতছাড়া হয়ে গেছে। শ্রেণী সংগ্রামে সর্বহারা শ্রেণীর সাময়িক হলেও পরাজয় হয়েছে। সর্বহারা শ্রেণীর ভেতরে ঢুকে পড়া ও লুকিয়ে থাকা বুর্জোয়া মতাদর্শের পতাকাবাহীরা বিজয়ী হয়েছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন অভ্যন্তর থেকেই পরিবর্তিত হওয়া ও শেষ পর্যন্ত তার রাষ্ট্রব্যবস্থা ভেঙে পড়ার ঘটনা বিশ্ব সর্বহারা শ্রেণীর জন্যে এক বড়ো শিক্ষা। এই শিক্ষা ভবিষ্যতে বিশ্ব সর্বহারা শ্রেণী আরো যোগ্যতার সাথে কাজে লাগাবে তাতে আমাদের কোনো সন্দেহ নেই। সাময়িক পরাজয় ও পিছুহটা কোনোমতেই চিরদিনের মতো শেষ হয়ে যাওয়া নয়, পুঁজিবাদীসাম্রাজ্যাদী রাষ্ট্রসমূহ ও তাদের ভাড়াখাটা বুদ্ধিজীবীরা যতোই উদ্বাহু হয়ে নৃত্য করুক, তারাও জানে, এ নৃত্যানন্দ তাদের সাময়িক। বিশ্বব্যাপী সর্বহারা শ্রেণী নতুন জ্ঞানে, নতুন অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ হয়ে প্রস্তুত হচ্ছেইতিহাসের শেষ হাসি অবশ্যই তারাই হাসবে।

একই রকম ঘটনা ঘটেছে চীনে, উত্তর কোরিয়ায়, ইন্দোচীনে ও কিউবায়। তবে এসব দেশে পুঁজিবাদ ও প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির পতাকাবাহীরা প্রকাশ্য ও প্রত্যক্ষ বিজয় অর্জন আজো করতে পারেনি। ওইসব দেশে সবকিছু লাল পতাকা উড়িয়েই হচ্ছে। ফলে দৃশ্যত লাল পতাকার নিচে সাংস্কৃতিক আন্দোলন সম্পূর্ণ পরাভূত হয়নি। বিপ্লবের বিজয়ের মধ্যদিয়ে লাল পাতাকার নিচে নতুন সংস্কৃতি নির্মাণের যে প্রক্রিয়া চালু হয়েছিলো ও দীর্ঘদিন ধরে চলছে সে প্রক্রিয়া অনেকটা বিভ্রান্ত ও কলুষিত হলেও সম্পূর্ণ থেমে যায়নি। বিপরীত যাত্রার চাপ প্রবল এবং কখনো কখনো মনে হতে পারে সেটাই প্রধান ধারা, তবু মনোযোগ দিয়ে অনুসন্ধান করলে অনুধাবন করা যায়লাল পতাকার নিচের শক্তিই এখনো প্রবল। সেটা কতোদিন থাকবে তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করা যেতে পারে। আমরা কিন্তু ইতিবাচক দিকটাই ভাবতে চাই। অপেক্ষা করা যাক, ইতিহাস আমাদের কি শিক্ষা দেয়।

তবে একথা তো জোর দিয়েই বলতে হবে যে, ওইসব দেশে সফল বিপ্লবের পর লাল পতাকার নিচে নতুন অর্থনীতি, রাজনীতি, দর্শন ও সংস্কৃতির নির্মাণযজ্ঞে যে সব অভিজ্ঞতা অর্জিত ও সঞ্চিত হয়েছে তা সবই বিশ্ব সর্বহারা শ্রেণীর ও একইসাথে গোটা মানবজাতির অমূল্য সম্পদ। আর সেসব সম্পদ ইতিহাসের ভাঁড়ারে জমা করার কৃতিত্ব ওইসব দেশের সর্বহারা শ্রেণীর ও সকল মেহনতকারী জনগণের এবং তাদের বিচক্ষণ নেতৃমন্ডলীর। সেসব কৃতিত্বের জন্যে প্রশংসা করতে ও শিক্ষা নিতে আমাদের কোনোরকম দ্বিধা বা সংকোচবোধ থাকা অন্যায়।

 

চীনদেশে অক্টোবর রুশ বিপ্লবের তোপধ্বনি লাল পতাকার মতাদর্শ পৌঁছে দিয়েছিলো। একই সময়ে একইভাবে ভারতেও তা পৌছেছিলো। তবে চীন দেশে লাল পাতার বিজয় হয়েছে, ভারত উপমহাদেশে তা হয়নি। চীনে প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছরের সামন্ততান্ত্রিক শোষণ ও নিষ্পেষণ থেকে সমগ্র দেশবাসীকে মুক্ত করতে পেরেছে লাল পাতাকার শক্তি, ভারতে তা পারেনি। লাল পতাকা হাতে চীনদেশের সর্বহারা শ্রেণী, কৃষক জনগণ ও অন্য সকল মেহনতকারী জনগণের সম্মিলিত শক্তির বলে ঔপনিবেশিক দখল থেকে দেশের প্রতি ইঞ্চি ভূমি উদ্ধার ও মুক্ত করেছে। ভারত উপমহাদেশে তেমনটা হয়নি। চীনদেশে লাল পতাকার বিজয়ের ফলে নারীপুরুষের সম্পর্কের অবমাননাকর বৈষম্য সম্পূর্ণ না হলেও অনেকটাই অবসান হয়েছেনারীর ব্যক্তিমর্যাদা সামাজিক স্বীকৃতি ও কর্মক্ষেত্রে পুরুষের সমান অধিকার পেয়েছে। পুরাতন অর্থনীতি, পুরাতন রাজনীতি উচ্ছেদের সাথে সাথে পুরাতন পশ্চাদপদ সংস্কৃতিও উচ্ছেদের সংগ্রাম সাফল্য অর্জন করেছেনতুন অর্থনীতি, নতুন রাজনীতির অনুসরণে নতুন সংস্কৃতি বিনির্মিত হয়েছে।

বিপ্লবের পূর্বে লাল পতাকার নিচে সাংস্কৃতিক আন্দোলনে সবার আগে ছিলেন লেখক ও চিন্তাবিদ লু সুন। মাও সেতুঙ বলেছেনতিনি ছিলেন চীনের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের পতাকা বাহক।” এছাড়া মাও তুন ও কুও মোরোর অবদান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তবে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের বিজ্ঞানভিত্তিক দিশা নির্মাণ করেছিলেন সর্বহারা শ্রেণীর নেতা ও শিক্ষক মাও সেতুঙ।

চীনদেশে অর্থনীতি ও রাজনীতির বহু জটিল পথপরিক্রমা আমরা লক্ষ্য করেছিসংস্কৃতি বিনির্মাণের ক্ষেত্রেও কোনো ব্যতিক্রম ঘটেনি। ‘সর্বহারার সাংস্কৃতিক মহাবিপ্লব’ বলে যে ঘটনাধারা দশ বছরব্যাপী ওইদেশে চালু ছিলো তা কেবল সেদেশের জনগণের জীবন ও সমাজ ওলোটপালট করে দেয়নিপ্রায় সারা দুনিয়ার তরুণ শক্তি ও প্রগতিশীল লেখকশিল্পীসংস্কৃতিকর্মীর চিন্তা জগতেও বিপুল আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলো। ওই ঘটনা লাল পতাকার নিচে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ইতিহাসে যে অভিজ্ঞতা ও শিক্ষা জমা করেছে তাসব উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই। অস্বাভাবিক ও অভাবিতপূর্ব বাড়াবাড়ি যেমন হয়েছে তেমনি জনগণের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক চেতনার মান উন্নয়নে অচিন্তিতপূর্ব অবদানও রেখেছে।

কথাসাহিত্যকার মো ইয়ানএর নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তি (২০১২) চীনা সাহিত্যের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু তাতে আমাদের উৎফুল্ল হবার কোনো কারণ নেই। নোবেল কমিটি লু সুন, কুও মোরো, মাও তুনএর মতো মহান সাহিত্যকারদের উপেক্ষা করে যে অন্যায় করেছিলো সে বিবেচনায় মো ইয়ানকে পুরস্কৃত করা প্রহসন ছাড়া আর কিছুই নয়। বর্তমান চীনে মো ইয়ানের চেয়েও শক্তিমান ও প্রতিভাবান সাহিত্যকার আছেন। তাছাড়া এই পুরস্কার প্রদানের পেছনে ধনী ও শক্তিশালী চীনকে তোয়াজ করার রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিলো সেকথা ভাবা অন্যায় হবে বলে আমাদের মনে হয় না।

লাল পতাকার নিচে সাংস্কৃতিক আন্দোলনে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীনে এক গুরুতর অভিজ্ঞতা সর্বহারা শ্রেণীর হয়েছে। তা হচ্ছে, বিশেষকরে, স্তালিন ও মাও সেতুঙএর ক্ষেত্রে ‘ব্যক্তিপূজা’র ঘটনা। উত্তর কোরিয়ায় কিম ইল সুঙএর ক্ষেত্রেও আমরা তা লক্ষ্য করেছি। এ ঘটনা যে সামন্ততান্ত্রিক সংস্কৃতির কুপ্রভাব তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সর্বহারা শ্রেণী শ্রেষ্ঠ গণতন্ত্র চর্চা করবে সেটাই প্রতিশ্রুত ও প্রত্যাশিত। সর্বহারা শ্রেণীর নেতৃমন্ডলীর শীর্ষে যাঁর অবস্থান নিশ্চয় তিনি নেতৃমন্ডলীর মধ্যে সবচেয়ে জ্ঞানী ও বিচক্ষণ, সবার চেয়ে যোগ্য ও দক্ষ। তবু তিনি সমগ্রেরই অংশ। সমগ্রের জ্ঞানচর্চা ও বাস্তব অভিজ্ঞতা স্ফটিকিকৃত হয়ে ব্যক্তির চিন্তাধারার মধ্যদিয়ে প্রকাশিত হয়। সমগ্রের চর্চার মধ্যদিয়েই সঠিক চিন্তা ও কর্মপন্থা বেরিয়ে আসে। ফলে সকল কৃতিত্ব ব্যক্তিবিশেষের একার নয়গোটা নেতৃমন্ডলীর। তাই সকল প্রশংসা সমগ্র নেতৃমন্ডলীরই হওয়া উচিৎ। ব্যক্তি প্রশস্তি এই সত্যকে আড়াল করে এবং সর্বহারা শ্রেণীর বিজ্ঞানভিত্তিক সংস্কৃতির বিপরীতে সামন্ততান্ত্রিক ‘ব্যক্তিপূজা’র ভাববাদী সংস্কৃতি স্থান করে নেয়। এ বিষয়ে স্বয়ং স্তালিন ও মাও সেতুঙ সচেতন ছিলেন। বিশেষকরে, মাও সেতুঙ স্তালিনের বিজ্ঞানভিত্তিক দ্বান্দ্বিক ও ঐতিহাসিক বস্তবাদী সমালোচনা করে তার প্রমাণ রেখেছেন।

তারপরও আমরা দেখি বিশ্ব সর্বহারা শ্রেণীর এই দুইজন নেতা ও শিক্ষকের পক্ষে এমন ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়নি। আর এজন্যে ব্যক্তিগতভাবে তাঁরা যতোটা দায়ী তার চেয়ে অনেক বেশি দায়ী তাদের সময়ের নেতৃমন্ডলী। একথা আমরা যতো সহজে বলছি, বাস্তব ঘটনা ততো সহজ ছিলো না। আমাদের ধারণা এমন ঘটনা এড়ানো বোধহয় সম্ভবই ছিলো না। এর একটা ব্যাখ্যা দিয়েছেন মাও সেতুঙ। রেড স্টার ওভার চায়না’র লেখক হিসেবে বিশ্বখ্যাত আমেরিকান সাংবাদিক ও চীনসুহৃৎ এডগার স্নো’র সঙ্গে আলাপ প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন প্রতিক্রিয়াশীল মূর্তি সরিয়ে সেখানে বিপ্লবী মূর্তি স্থাপন করে যদি জনগণ উৎসাহ পায় তাতে ক্ষতি কী? এক সময় দেখা যাবে এসবের অবসান হয়েছে। অর্থাৎ তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন, জনগণের চৈতন্যলোক বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষায় সমৃদ্ধ হলে ব্যক্তিপূজার উৎসাহ আর থাকবে না। ইতিহাসের বিশেষ বিশেষ মুহূর্তে ব্যক্তি প্রশস্তি সামনে চলার গতি বেগবান করে তা আমরা অস্বীকার করতে পারি না, তা এড়ানোও যায় না।

চীন পৃথিবীর অন্যতম প্রচীন সভ্যতার দেশ। মানবজাতির উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে এদেশের মানুষের অবদান বিপুল। মানব সভ্যতা থেকে তারা নিয়েছে যতো দিয়েছে তার চেয়ে বেশি। সেই দেশে লাল পতাকার নিচে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগ্রামে, বিশেষকরে, বিপ্লবের বিজয়ের পর নতুন সমাজ ও সংস্কৃতি নির্মাণে, যতো গুরুতর ভুলত্রুটিবিচ্যুতিই ঘটুক না কেন, সর্বহারা শ্রেণীর নেতৃত্বে চীনা জনগণের অবদান মানবজাতির ইতিহাসে অমূল্য সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করতেই হবে।

এ প্রসঙ্গে একথা আমরা বলতে চাইবিপ্লবউত্তর বিনির্মাণের সংগ্রামের চাইতে বিপ্লব চলাকালীন ঘটনাধারা এবং সেই ঘটনাধারা থেকে প্রাপ্ত অভিজ্ঞতা ও শিক্ষা সম্পর্কে আমাদের আগ্রহ ও ঔৎসুক্য অনেক বেশি। কেননা আমরা ও আমাদের মতো যারা পুরনো সমাজের অন্ধকারে মুক্তি লাভের আকাক্সক্ষায় কাতরাচ্ছি তাদের জন্যেরুশদেশের, চীনের, ভিয়েতনাম বা ইন্দোচীনের কিংবা কোরিয়া বা কিউবার বিপ্লব চলাকালীন অভিজ্ঞতা ও শিক্ষা জানা অধিক প্রয়োজন, নিজেদের চলার পথ অপেক্ষাকৃত ত্রুটিমুক্ত রাখতে।

 

লাল পতাকার নিচে সর্বহারা শ্রেণীর সাংস্কৃতিক আন্দোলন বড়ো তিনটি ধাক্কায় পিছু হঠেছে, বিভ্রান্তি ও হতাশার শিকার হয়েছে এবং উদ্যমহীনতা ও শেষ পর্যন্ত সুবিধাবাদের কবলে পড়ে ঘুরপাক খাচ্ছে। প্রথম ঘটনা সোভিয়েত ইউনিয়নে, স্তালিনের মৃত্যুর পর, সংশোধনবাদের বিজয় অর্জন ও শেষ পর্যন্ত সর্বহারা শ্রেণীর আন্তর্জাতিকতাবাদের স্থান দখল করেছে সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্যবাদ। তার পরিণতিতে সোভিয়েত ইউনিয়ন টুকরো টুকরো হয়ে গেছে আর বুর্জোয়াশ্রেণী সাময়িককালের জন্যে হলেও লাল পতাকা সরিয়ে তাদের নিজস্ব পতাকা উড়িয়েছে। ফলে বিশ্বব্যাপী লাল পতাকার সংগ্রাম বিভ্রান্তি ও হতাশার শিকার হয়েছে।

দ্বিতীয় ঘটনা, সোভিয়েত ইউনিয়নে সংশোধনবাদের বিজয়রে পর অর্থাৎ লাল পতাকা হাতে লাল পতাকার সংগ্রাম পরাভূত করার পর প্রথমে আলবেনিয়ার সর্বহারা শ্রেণীর উদ্যোগে ও পরে চীনের নেতৃত্বে যে সমালোচনা ও বিরোধিতা জেগে ওঠে তারই পরিণতিতে সৃষ্টি হয় বিশ্ব সর্বহারা শ্রেণীর সংগ্রামে ‘আন্তর্জাতিক মহাবিতর্ক’। এই ‘মহাবিতর্ক’ পরিণতি লাভ করে ‘মস্কো’ ও ‘পিকিং’এই দুই কেন্দ্র অনুসরণে বিশ্বব্যাপী সর্বহারা শ্রেণীর সংগ্রাম ও সংগঠন বিভক্তিতে। এর ফলে সর্বহারা শ্রেণীর সংগঠন ও শক্তি দুর্বল হয়ে যায়। তবে সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে ‘পিকিং’কেন্দ্রের অনুসরণে এক নতুন জোয়ারও সৃষ্টি হয় বিশ্বব্যাপী। এই জোয়ারের ফলে বিশ্বব্যাপী সর্বহারা শ্রেণীর সংগ্রাম ও সংগঠনশক্তি একধাপ এগিয়েছিলো ঠিকই কিন্তু বামবিচ্যুতি ও স্বদেশের বাস্তব পরিস্থিতি সঠিকভাবে অনুধাবন করতে না পারায় ও সমাজের গভীরে প্রবেশ করতে অক্ষমতার কারণে দেশে দেশে সে জোয়ার শেষ পর্যন্ত বিভ্রান্তি ও সুবিধাবাদের শিকারে পরিণত হয়েছে।

এরপরও যেটুকু প্রাণশক্তি অবশিষ্ট ছিলো তা প্রায় নিঃশেষ হয়ে গেছে চীনে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও আধুনিকতার নামে যেসব ঘটনাধারা শুরু হয়েছে, মাও সেতুঙএর মৃত্যুর পর থেকে, তার প্রতিক্রিয়ায়। এককালে যে শক্তি বিশ্বব্যাপী সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রামে প্রেরণা ও সাহস যুগিয়েছে সে আজ সাম্রাজ্যবাদের নির্ভরযোগ্য মিত্রে পরিণত হয়েছে। তার কণ্ঠ থেকে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী একটি শব্দও শুনতে পাওয়া যায় না। আমেরিকার নেতৃত্বে সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রসমূহ যখন বিভিন্ন দেশে আগ্রাসন দখল লুন্ঠন হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞে মত্ত তখন সেই শক্তি আইনি ভাষায় আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানিয়ে অপেক্ষায় থাকে তার জাতীয় স্বার্থ যেন কোনোমতেই ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। তার নেতাদের মুখে সর্বহারা শ্রেণীর আন্তর্জাতিকতাবাদের কথাও আর শোনা যায় না। সর্বহারা শ্রেণীর রাজনৈতিক শক্তির নেতৃত্বে সেখানে ধনতন্ত্র চর্চা চলছে, সম্পদ বৃদ্ধি হচ্ছে বিস্ময়কর গতিতে। তার সঙ্গে সঙ্গে সমাজে ধনবৈষম্যও অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। এর ফলে সে সমাজের সংস্কৃতিও কলুষিত হয়েছে ব্যাপকভাবে। তার প্রমাণ আমরা পাচ্ছি সাহিত্যে, সংগীতে, চলচ্চিত্রে, চিত্রকলায় ও নানারকম সামাজিক ঘটনার সংবাদে। যে সমাজে সকল উদ্যমউদ্যোগে প্রাণসূত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিলো– ‘সেবা,’ আজ তার স্থান দখল করেছে ‘মুনাফা’। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ‘বন্ধুত্ব আগে, পরে প্রতিযোগিতা’র স্থান দখল করেছে কেবল ‘প্রতিযোগিতা’। সেখানে আজো লাল পতাকা উড্ডীন আছে ঠিকই আর সবকিছু হচ্ছেও লাল পতাকার নিচেই; তবে, আমরা জানি না, লাল পতাকা উড্ডীন থাকবে নাকি অদূর ভবিষ্যতে ধনতন্ত্রের পতাকা তাকে হঠিয়ে সগর্বে বিজয় ঘোষণা করবে। আমাদের প্রত্যাশা লাল পতাকা উড্ডীন থাকবে, তবু মনে আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।

এই অবস্থা বিশ্বব্যাপী লাল পতাকার সংগ্রাম বিষয়ে বিভ্রান্তি ও হতাশার জন্ম দিয়েছে। তার ফলে সুবিধাবাদ সমস্ত উদ্যম কব্জা করে নিতে পেরেছে। সেবা সততা ও কর্তব্যনিষ্ঠা এখন কেবল ফাঁপা ও ফাঁকা বুলিতে পরিণত হয়েছে তাই নয়, এসব কেউ এখন উচ্চারণ করলে তা প্রহসন ও বিদ্রƒপ ছাড়া আর কিছুই মনে হয় না।

বিশ্বব্যাপী লাল পতাকার নিচে সাংস্কৃতিক আন্দোলন এমন করুণ অবস্থায় এসে পৌঁছেছে। তবে এটাই ইতিহাসের শেষ নয়। সাম্রাজ্যবাদের উচ্ছিষ্টভোজী বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবীরা যতোই উদ্বাহু নৃত্যৃ করুক আর ফাঁপা বুলির তুবড়ি ছোটাক, বর্তমান অবস্থা হয়তো কিছুটা দীর্ঘস্থায়ী হবে কিন্তু কোনোমতেই চিরস্থায়ী হবে না। শক্তিশালি সামন্তরাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে কিন্তু চিরস্থায়ী হয়নি। জ্বরাগ্রস্ত ধনতন্ত্রসাম্রাজ্যবাদে পৌঁছানোর পর থেকে যে ব্যবস্থা ধুঁকছেতার পক্ষে চিরস্থায়ী হওয়া কি করে সম্ভব? ইতিহাস আমাদের সে শিক্ষা দেয় না। সমগ্র মানবজাতিকে শেষ পর্যন্ত সমাজতন্ত্রের পথে যেতেই হবে। সেটাই মানবজাতির ইতিহাস নির্ধারিত নিয়তি। সে নিয়তি যেমন জবরদস্তি কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারবে নাতেমনি জবরদস্তি ঠেলে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াও যাবে না। প্রত্যেক সমাজের অভ্যন্তরের তাগিদ থেকেই তা গতিময় হবে এবং সর্বহারা শ্রেণীর বিচক্ষণ নেতৃত্বের পরিচালনায় সামনের দিকে এগুবে। এটাই ইতিহাসের শিক্ষা। আর এটাও সত্য যে, সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থাও চিরস্থায়ী ও মানবজাতির জন্যে চূড়ান্ত ব্যবস্থাএমন দাবি কেউ করেনি। করলে তা হবে ইতিহাসবিরোধিতা। সাম্যবাদী সমাজযে সমাজে শ্রেণী ও শ্রেণীশোষণ থাকবে না, নিয়ন্ত্রণ ও নির্বতনের যন্ত্র রাষ্ট্র থাকবে না, সমস্ত সম্পদের মালিক হবে সমাজ; সে সমাজে প্রত্যেকে সমাজকে দেবে তার সাধ্য মতো আর নেবে তার প্রয়োজন মতো। সেই সাম্যবাদী সমাজের পথে মানবজাতিকে যেতে হচ্ছে সমাজতান্ত্রিক সমজের মধ্যদিয়ে। তাই সমাজতন্ত্রকে চিরস্থায়ী ব্যবস্থা হিসেবে দাবি করা বা ভাবার কোনো অবকাশ নেই।

 

রুশদেশের সর্বহারা শ্রেণীর অক্টোবর বিপ্লবের তোপধ্বনি চীনের সঙ্গে সঙ্গে ভারতে ও পৃথিবীর প্রায় সকল দেশে লাল পতাকার মতাদর্শ পৌঁছে দিয়েছিলোসে কথা আগে একবার আমরা বলেছি। চীন, কোরিয়া, ভিয়েতনাম এবং পরে কিউবা ছাড়া ভারত ও অন্য কোনো দেশে লাল পতাকার সংগ্রাম বিজয় অর্জন করেনি, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আমরা জানি, লাল পতাকার মতাদর্শ ভারতে যখন পৌঁছায় তখন ভারত ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অধীন এক অখন্ড রাষ্ট্র ও দেশ। সে ভারত ভেঙে তিনটি দেশ ও রাষ্ট্র হয়েছে। তবে লাল পতাকার নিচে সংগ্রামে একটা ঐক্যসূত্র বজায় আছে। বিশেষ করে বাংলাদেশে লাল পতাকার সংগ্রাম ও শক্তি অখন্ড ভারতের সংগ্রাম ও শক্তিরই উত্তরাধিকারী এবং এখনো ভারতের ঘটনাধারার প্রভাব থেকে মুক্ত নয়।

ভারতপাকিস্তানবাংলাদেশে লাল পতাকার সংগ্রাম যদি একটি বাক্যে বর্ণনা করতে হয় তবে বলতে হবে ৯২ বছরের ইতিহাসের প্রধান দিকযোগ্য হয়ে উঠতে না পারার ফলে বিভ্রান্তি, সুবিধাবাদিতা ও ব্যর্থতার গ্লানিতে পূর্ণ হলেও আমাদের মানতেই হবে সর্বহারা শ্রেণী, কৃষক জনগণ ও অন্যসব মেহনতকারী জনগণ এবং ইতিহাস ও সমাজ সচেতন লেখকশিল্পীবুদ্ধিজীবীদের বিরাট বিরাট সংগ্রাম ও সংগঠিত হবার ঘটনাধারা লাল পতাকার বিজয় অভিমুখী সোপাণশ্রেণী নির্মাণ করেছে। এই সত্যের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখা কেবল মূর্খতাই নয়ইতিহাসের ও সত্যের বিরোধিতা করাও। আর ওই সত্যকে কেবল মুখে স্বীকার করলেই চলবে না, তাকে গভীরভাবে জানতে ও বুঝতে হবে, তার থেকে প্রয়োজনীয় শিক্ষা নিতেই হবেযদি ভবিষ্যৎ অভিমুখী যাত্রায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হয়।

ভারত উপমহাদেশে ৯২ বছরে লাল পতাকার নিচে সংগ্রামের রাজনৈতিক বিশ্লেষণের দায়িত্ব রাজনৈতিক তাত্ত্বিকদের। আমরা মনে করি, তারা যাগ্যতার সাথে সেটি সম্পন্ন করবেন ও নতুন দিশা নির্মাণ করবেন। সেটা যতোদিন তারা না পারছেন ততোদিন লাল পতাকার সংগ্রাম ব্যর্থতার ঘূর্ণিচক্রে ঘুরপাক খেতেই থাকবে এবং জনগণের দুর্ভোগ চলতেই থাকবে। আমরা এই সময়কালের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের উজ্জ্বল দিকগুলো স্মরণ করতে চাই।

লাল পতাকার নিচে সংগঠিত হবার প্রথম উদ্যোগ আমরা দেখতে পাই ভারতের বাইরে। তাসখন্দে ১৯২০ সালের ১৭ অক্টোবর গঠিত হয়েছিলো ‘ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি’। ঔপনিবেশিক শাসনশোষণ ও নিষ্পেষণনির্যাতন থেকে মুক্তির পথ সন্ধানে জলস্থলমরুপর্বত ডিঙিয়ে কয়েকজন বাঙালি তরুণ পৌঁছেছিলেন সোভিয়েত ইউনিয়নে। তদের মধ্যে ছিলেন এম এন রায়, ধীরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়, ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত, নলিনী গুপ্ত, প্রমুখ। এরাই ছিলেন পুরোগামী। ‘কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক’এর পক্ষ থেকে নবগঠিত ‘ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি’র নামে ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের কাছে প্রথম ইশতেহার পাঠানো হয়েছিলো ১৯২১ সালে। সে ইশতেহার রচনা করেছিলেন এম এন রায়। তবে এ উদ্যোগ ভারতের মাটিতে কোনো স্থান করে নিতে পারেনি।

লাল পতাকার মতাদর্শে আকৃষ্ট হয়ে কলকাতায় মুজফ্ফর আহমদ ও,বোম্বাইত (মুম্বাই) শ্রীপাদ অমৃত ডাঙ্গে (এস এ ডাঙ্গে) সংগঠন তৎপরতা শুরু করেন ১৯২০ সালে। সূচনাপর্বে এরা দুজন পার্টি গড়ে তোলার সাথে সাথে সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তোলার লক্ষে লেখালেখি, প্রচার ও প্রকাশনা ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ব্রিটিশ কমিউনিস্ট পার্টি’র আগ্রহে ও এম এন রায়, এস এ ডাঙ্গে, মুজফ্ফর আহমদ প্রমুখের চেষ্টায় ভারতের তরুণদের মধ্যে সাম্যবাদী চেতনা ছড়িয়ে পড়ে। সংগঠন গড়ে তোলার কাজে বাংলায় অন্যতম প্রধান ভূমিকা পালন করেন মুজফ্ফর আহমদ। তাঁরই সাহচর্যে কবি কাজী নজরুল ইসলাম সাম্যবাদী চেতনায় কিছুটা হলেও উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন এবং একথা স্পষ্ট করেই বলা উচিৎ যে, কাজী নজরুল ইসলামই প্রথম বাঙালি কবি যাঁর রচনায় সাম্যবাদের কথা খোলাখুলি বলা হয়েছে।

বিদ্রোহী হিসেবে খ্যাত এই কবি যদিও সাম্যবাদী চেতনায় স্থির থাকেননি কিংবা সাম্যবাদী মতাদর্শ গ্রহণ ও চর্চা করেননি তবুও সূনাপর্বে এমন একজন কবির পক্ষে ওই মতাদর্শে উদ্বুুদ্ধ ও অনুপ্রাণিত হবার ঘটনা মোটেও উপেক্ষা করা যায় না। তিনি নিপীড়িত মানুষের বেদনা ও বিক্ষোভবোধ নতুন ভাষায় প্রকাশ করেছিলেন। ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তির সংগ্রামের কথা সে সময় তাঁর মতো আর কোনো কবির কন্ঠ হতে উচ্চারিত হয়নি। বাংলা ভাষায় তিনিই সর্বহারা শ্রেণী ও নিপীড়িত জনগণের প্রথম কবি। তাঁর সকল সীমাবদ্ধতা তাঁর কালের পরিপ্রেক্ষিতে বিচার করতে হবে। সে সময় শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়, মনীন্দ্রলাল বসু, নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়, নারায়ণ ভট্টাচার্য, জগদীশ গুপ্ত, শিবরাম চক্রবর্তী, হেমন্তকুমার সরকার, প্রেমেন্দ্র মিত্র প্রমুখ নতুন যুগের আলোয় আলোকিত নবীন কবি ও লেখক ‘সংহতি’, ‘আত্মশক্তি’, ‘বিজলী’, ‘কল্লোল’, ‘কালিকলম’, ‘লাঙ্গল’, ‘গণবাণী’, ‘নবশক্তি’, ‘বঙ্গবাণী’ প্রভৃতি পত্রপত্রিকায় তাদের সৃজনশীল রচনায় সমাজের নিচুতলার মানুষের জীবন ও জীবনযন্ত্রণা এবং সে সঙ্গে রুশদেশের বিপ্লবের কথা তুলে ধরেছিলেন। একই সময়ে ‘বলশেভিকবাদ’ বিরোধীরাও এই নতুন মতাদর্শকে হেয় করার চেষ্টাও সমানে করেছিলেন। বিশের দশকে খুবই অল্প সংখ্যক কবিলেখকবুদ্ধিজীবী মার্ককবাদ চর্চা করেছেন। আর তাদের দৃষ্টিভঙ্গীও তেমন স্বচ্ছ ছিলো না। তাঁরা প্রায় সকলেই কংগ্রেসী রাজনীতি ও সমাজতন্ত্রের পাঁচমিশালী আবর্জনার মধ্যে নিমজ্জিত ছিলেন। সূচনাকালে তা মোটেও অস্বাভাবিক ছিলো না। ১৯২৯ সালের মিরাট ষড়যন্ত্র মামলার পূর্বে মোটামুটি এই ছিলো অবস্থা।

১৯৩০ সালের পর থেকে মার্কসবাদী দৃষ্টিভঙ্গীতে সাহিত্য ও শিল্পকলা বিচার শুরু হয়। ড. ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত ছিলেন একজন অগ্রগণ্য চিন্তাশীল লেখক। সে সময়ের ‘দেশ’ ও ‘আনন্দবাজর’ পত্রিকায় তিনি বেশকিছু রচনা প্রকাশ করেন। তবে চিন্তাজগতে ‘লালের আভা’ ফোটানোর ক্ষেত্রে ‘পরিচয়’ পত্রিকার ভূমিকা ছিলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সম্পাদক সুধীন্দ্রনাথ দত্ত মার্কসবাদে বিশ্বাসী ছিলেন নাকিন্তু তাঁর পত্রিকাকে কেন্দ্র করেই সর্বপ্রথম মার্কসীয় যুক্তিবিজ্ঞানে বিশ্বাসী কয়েকজন বুদ্ধিজীবী একত্রিত হয়েছিলেন এবং এই পত্রিকায় তাদের নতুন চিন্তা প্রকাশ করেছিলেন। এঁদের প্রায় সকলেই পরবর্তীকালে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য অথবা অনুরাগী সমর্থক হিসেবে সাংস্কৃতিক আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। এঁদের মধ্যে ছিলেন সুশোভন সরকার, ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, শাহেদ সোহরাওয়ার্দি, বিষ্ণু দে প্রমুখ কবি ও সাহিত্যসমালোচক। প্রকৃতপক্ষে, বাংলা ভাষায় ‘পরিচয়’এই প্রথম মার্কসীয় যুক্তি বিজ্ঞানের আলোকে সাহিত্য ও শিল্পকলা বিচারের সূচনা হয়। ‘পরিচয়’ পত্রিকার লেখকরা সকলেই মার্কসবাদী ছিলেন নাতবে এই পত্রিকায় সে সময় জ্ঞানচর্চা ও অনুশীলনের যে দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে তেমন নজির আর পাওয়া যায় না।

ভারতে সাংস্কৃতিক আন্দালনের সংগঠিত উদ্যোগ শুরু হয়েছিলো কমিউনিস্ট পার্টি গঠনের প্রথম উদ্যোগের মতোই ভারতের বাইরে। তিরিশির দশকের প্রথম দিকে ১৯৩২৩৪ সালে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের কয়েকজন লন্ডনপ্রবাসী তরুণছাত্র মার্কসবাদী মতাদর্শের সাথে পিরিচিত হন। তারা যাদের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যম্যাক্সিম গোর্কি, রোঁমা রোঁল্যা, আঁরি বারবুস, ই এম ফস্টার, র‌্যালফ ফক্স, জন স্ট্র্যাচি প্রমুখ মনস্বী লেখক ও চিন্তাবিদ। ওই তরুণরা প্রগতিশীল সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেই থেমে থাকেন নি, নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে সক্রিয় উদ্যোগও নিয়েছিলেন। এদের মধ্যে ছিলেন মুলকরাজ আনন্দ, সাজ্জাদ জহির, হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, ভবানী ভট্টাচার্য, ইকবাল সিং, রাজা রাও, মুহম্মদ আশরাফ প্রমুখ প্রতিভাবান তরুণ। এদের সঙ্গে ছিলেন প্রমোদরঞ্জন সেনগুপ্ত, তিনি থাকতেন প্যারিতে আর ছিলেন ভারতীয় ছাত্রদের ‘ফ্রেন্ড, ফিলোসোফার এ্যান্ড গাইড’ ড. জ্যোতিশচন্দ্র ঘোষ।

তবে এ উদ্যোগে যার একক ভুমিকা ছিলো সবচেয়ে বেশি তিনি হলেন সাজ্জাদ জহির। তিনি ১৯৩০ কিংবা ১৯৩১ সালে লন্ডনের হাইড পার্কে মে দিবসের মিছিলে যোগ দিয়ে যে প্রাণোন্মাদনার স্বাদ পেয়েছিলেন তা থেকেই সঙ্গে সঙ্গে লিখেছিলেন তার প্রথম কবিতামজ্‌লমোঁনে মুলকো মুলকো / ঝান্ডা লাল উঠায়া হৈ / জো ভুখা থা জো নাঙ্গা থা / ব গুস্সা উস্কো আয়া হৈ / রোকে তো কোই অব্ হামকো জরা / সারা সংসার হামারা হ্যায়/ সারা সংসার হামারা হ্যায়।” এ কবিতা পরে সুর দিয়ে বহুবার বহু সমাবেশে গাওয়া হয়েছে।

এই তরুণরা লন্ডনের এক চীনা রেস্তোরাঁর পিছন অংশে নিয়মিত মিলিত হতেন ও দীর্ঘ সময় ধরে মার্কসবাদী মতাদর্শের আলোকে সাহিত্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ব পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা ও তর্ক বিতর্ক চালাতেন। তাদের আলোচনার একটা বড়ো লক্ষ্য ছিলো ভারতে লেখকদের একটি সংগঠনের পতাকাতলে সমবেত করা। প্রায় তিন বছর ধরে আলোচনা চালিয়ে তারা একটি ছোট সংগঠনিক কমিটি গঠন করেন ও ইশতেহার প্রণয়ন করেন ইংরেজি ভাষায়। ইশতেহারএর প্রথম খসড়া রচনা করেছিলেন মুলকরাজ আনন্দ। তবে দীর্ঘ হওয়ায় তা গৃহীত হয়নি। এরপর দায়িত্ব দেয়া হয় ড. জোতিশচন্দ্র ঘোষকে। এই দুটি খসড়া মিলিয়ে ইশতেহারএর চূড়ান্ত খসড়া প্রণয়নের দায়িত্ব দেয়া হয় সাজ্জাদ জহিরকে। তার খসড়াটিই কিছু শব্দ ও বাক্য পরিবর্তন সংশোধন ও সংযোজনের মধ্যদিয়ে চূড়ান্ত করা হয় ও ভারতের বিভিন্ন স্থানে তার কপি পাঠানো হয়। এই প্রক্রিয়ার সফল পরিণতি ১৯৩৬ সালে ‘প্রগতি লেখক সংঘ’ গঠন। [বাংলায় ‘প্রগতি লেখক সংঘ’ প্রচলিত হলেও সংগঠনের নামকরণ হয়েছিলো ইংরেজিতে সম্ভবত সর্বভারর্তীয় সংগঠন বিবেচনা করে-‘প্রগ্রেসিভ রাইটার্স এ্যাসোসিয়েশন’সংক্ষেপে পিডব্লিইএ]

প্রগতি লেখক সংঘ’ গঠনে পেছনের ঘটনাবলী একবার স্মরণ করে নেয়া যেতে পারে। তিরিশের দশকের শুরুতে জার্মানীতে হিটলারের ও ইতালিতে মুসোলিনির নেতৃত্বে ফ্যাসিবাদের উত্থানের ফলে এবং তাদের সাম্রাজ্যলালসা ও যুদ্ধপ্রস্তুতিতে সমগ্র ইউরোপ ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলা করার উদ্দেশ্যে ১৯৩৫ সালে মস্কোতে অনুষ্ঠিত ‘কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল’এর ৭ম অধিবেশনে, দিমিত্রফ উত্থাপিত ‘যুক্তফ্রন্ট তত্ত্ব’, গৃহীত হয়। এই তত্ত্বের মূল কথা ছিলো ফ্যাসিবাদবিরোধী সকল শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করা। বলার অপেক্ষা রাখে না, উদ্যোগ ছিলো কমিউনিস্টদের আর সর্বত্র তারাই ছিলো পরিচালক শক্তি। কেননা, যে উদ্যম ও সাহস, সততা ও নিষ্ঠা এবং অবিচল দৃঢ়চিত্ত হয়ে কমিউনিস্টরা কর্তব্য সম্পাদন করেছেন ও করে থাকেন অন্য শ্রেণীগুলোর কর্মীরা তা পারে না। তাদের শ্রেণীসংস্কৃতি তাদেরকে সর্বপ্রথমে আত্মস্বার্থ নিয়ে ভাবতে শেখায়। স্বার্থপরতা, দোদুল্যচিত্ততা ও সংকটমুহূর্তে আপসের পথ বেছে নেয়া, সুবিধা অন্বেষণ করা তাদের চরিত্রের বৈশিষ্ট্য।

ওই ‘যুক্তফ্রন্ট’ তত্ত্বের আলোয় ফ্যাসিবাদের দানবীয় ঔদ্ধত্য ও যুদ্ধপ্রস্তুতির বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানান রোঁমা রোঁল্যা, আঁরি বারবুস ও ম্যাক্সিম গোর্কি সারাদুনিয়ার প্রগতিশীল ও বিবেকবান লেখকশিল্পীবুদ্ধিজীবীদের কাছে এই আহ্বানে সাড়া দিয়ে বিভিন্ন দেশের লেখকশিল্পীবুদ্ধিজীবীরা প্যারিতে মিলিত হলেন ফ্যাসিবাদবিরোধী প্রথম আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ১৯৩৫ সালের ২১ জুন। এই সম্মেলন থেকে ফ্যাসিস্ত বর্বরতার বিরুদ্ধে সকল মানবপ্রেমী লেখকশিল্পীবুদ্ধিজীবীর প্রতি আহ্বান জানানো হলো ঐক্যদ্ধ সংগ্রামে এগিয়ে আসতে। যেসব বিশ্ববিখ্যাত লেখকশিল্পীবুদ্ধিজীবী সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য আঁদ্রে জিদ, ইএম ফস্টার, আঁদ্রে মারলো, অলডাস হাক্সলি, জুলিয়া বাদা, ওয়াল্ডো ফ্রাঙ্ক, মাইকেল গোল্ড, জন স্ট্র্যাচি প্রমুখ। ইউরোপ প্রবাসী ভারতীয় লেখকদের পক্ষ থেকে সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন মুলকরাজ আনন্দ।

এর পরপরই ভারতে ‘সাম্রাজ্যবাদবিরোধী গণফ্রন্ট’ গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ শুরু হয়।

ফ্যাসিস্ত মুসোলিনি আবিসিনিয়া আক্রমণ করলে কলকাতায় কমিউনিস্ট ও কংগ্রেস সোস্যালিস্ট পরিচালিত ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠনগুলোর নেতৃত্বে শ্রমিক শ্রেণীর সমবেত তীব্র ঘৃণা ও প্রতিবাদ সংগঠিত হয়। এরপরই ট্রেড ইউনিয়ন নেতারা ও বুদ্ধিজীবীরা ১৯৩৫ সালের ২৭ অক্টোবর কলকাতায় এক ঘরোয়া বৈঠকে মিলিত হয়ে গঠন করেন ‘যুদ্ধ ও ফ্যাসিবিরোধী সংঘ’এর সাংগঠনিক কমিটি।

এই পটভূমিতেই ভারতের প্রায় সকল অঞ্চলের লেখকগণ এক সম্মেলনে মিলিত হন লক্ষ্ণৌতে ১৯৩৬ সালের ১০ এপ্রিল। এটাই ছিলো ভারতে জনগণের সংস্কৃতির পক্ষে লেখকশিল্পীবুদ্ধিজীবীদের প্রথম সংগঠিত সমাবেশ। ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনের মন্ডপের এক অংশে এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনের সকল সাংগঠনিক তৎপরতা যদিও পরিচালনা করেছিলেন মার্কবাদী মতাদর্শের অনুসারীরা, অংশ্রহণকারী সবাই কিন্তু তা ছিলেন না। তারা ছিলেন সাধারণভাবে প্রগতি মনস্ক, ফ্যাসিবাদের যুদ্ধোন্মাদনাবিরোধী ও কংগ্রেসের রাজনীতির অনুসারী জাতীয়তাবাদী দেশপ্রেমিক। শ্রমিককৃষকসাধারণ মানুষের প্রতি তাদের ছিলো সাধারণ দরদ ও মমতা।

সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেছিলেন খ্যাতিমান লেখক মুন্সী প্রেমচাঁদ। অভ্যর্থনা কমিটির প্রধান ছিলেন ‘যসশ্বী কবি ও সংগ্রামী দেশনেতা’ মওলানা হসরত সোহানী। আর উদ্বোধনী ভাষণ দিয়েছিলেন কংগ্রেসের বিশ্বখ্যাত নেত্রী শ্রীমতী সরেজিনী নাইডু। জওহারলাল নেহরু আনুষ্ঠানিকভাবে না হলেও আড়াল থেকে উৎসাহ দিয়েছিলেন। স্মরণ করা যেতে পারে, সে সময় নেহরু সোভিয়েত সুহৃৎ (এমন কি ‘স্তালিনের ইয়ার’) ও সমাজতন্ত্রঅনুরাগী বলে পরিচিত ছিলেন। কমিউনিস্ট পার্টি সে সময় বেআইনী ঘোষণার ফলে গোপন ছিলো এবং পার্টির নেতৃস্থানীয় অনেকে কংগ্রেসে সক্রিয় ছিলেন। বিশেষকরে, গান্ধীর বিরোধিতা সত্ত্বেও সুভাষ বসু কংগ্রেসএর সভাপতি নির্বাচিত হলে বাংলার কংগ্রেসী মহলে কমিউনিস্টরা অধিক তৎপর হয়ে ওঠে। কমিউনিস্ট নেতা বঙ্কিম মুখার্জী, পাঁচুগোপাল ভাদুড়ী, সোমনাথ লাহিড়ী, প্রমুখ সুভাষ বসুর ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে কংগ্রেসকে ‘বামমুখী’ করার প্রবল প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন।

সুতরাং একথা বলা যায় যে, কংগ্রেসের ছায়াতলেই অনুষ্ঠিত লেখকশিল্পীবুদ্ধিজীবীদের সম্মেলনে গঠিত হয় মার্কসবাদীদের পরিচালনায় ‘প্রগতি লেখক সংঘ’। ১৯৩৫ সালে যে ইশতেহার বা ঘোষণা প্রচার করা হয়েছিলো এবং ১৯৩৬ সালের ১০ এপ্রিল অনুষ্ঠিত সম্মেলনে গৃহীত হয়েছিলো তাতে বলা হয়েছে:

সনাতনী সংস্কৃতিতে ভাঙন ধরার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের সাহিত্যে আটপৌরে জীবনের বাস্তবতাকে এড়িয়ে যাওয়ার আত্মঘাতী প্রবণতা দেখা দিয়েছে। আমাদের নতুন সাহিত্য প্রত্যক্ষ ও প্রাকৃতিককে ছেড়ে অপ্রত্যক্ষ ও আধাত্মিকের দিকে ধাবিত হয়েছে। পৃথিবীর মাটি পরিত্যাগ করে কল্পলোকের আশ্রয় গ্রহণ করেছে। ফলে তার রচনাভঙ্গী অন্ধ নিয়মানুগত্যের বিষম জালে জড়িয়ে পড়েছে। তার ভাবসম্পদ হয়েছে রিক্ত ও বিকারগস্ত…”

আমাদের সমাজ যে নবরূপ ধারণ করছে তাকে সাহিত্যে প্রতিফলিত করা এবং বৈজ্ঞানিক যুক্তিবাদকে সাহিত্যে প্রতিষ্ঠিত করে প্রগতিকামী মননধারাকে বেগবান করাএই আমাদের কর্তব্য।…”

আমরা চাই জনসাধারণের জীবনের সঙ্গে সর্বাধিক কলার নিবিড় সংযোগ; আমরা চাই যে, সাহিত্য প্রাত্যহিক জীবনের চিত্র ফুটিয়ে তুলুক আর যে ভবিষ্যতের পরিকল্পনা আমরা করছি তাকে এগিয়ে আনুক।…”

ভারতীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতির যা কিছু শ্রেষ্ঠ আমরা তার উত্তরাধিকারের দাবি করি। আমাদের দেশে নানা মূর্তিতে যে প্রগতিদ্রোহ আজ মাথা তুলেছে তাকে আমরা সহ্য করবো না।যা কিছু আমাদের নিশ্চেষ্টতা, অকর্মণ্যতা, যুক্তিহীনতার দিকে টানে, তাকে আমরা প্রগতিবিরোধী বলে প্রত্যাখ্যান করি। যা কিছু আমাদের বিচারবুদ্ধিকে উদ্বুদ্ধ করে, সমাজব্যবস্থাকে যুক্তিসঙ্গতভাবে পরীক্ষা করে, আমাদের কর্মিষ্ঠ, শৃঙ্খলাপটু, সমাজের রূপান্তরক্ষম করে, তাকে আমরা প্রগতিশীল বলে গ্রহণ করবো।”[বাংলা ভাষান্তর হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়]

প্রগতি লেখক সংঘএর বাংলা প্রকাশনা ‘প্রগতি’র (১৯৩৭) ভূমিকায় নরেশচন্দ্র সেনগুপ্ত [তিনি কমিউনিস্ট বা মার্কসবাদী মতাদর্শের অনুসারী ছিলেন নাছিলেন স্বাধীনচেতা চিন্তকলেখক] লিখেছেন:

মানবের মানবত্বকে আশঙ্কিত ধ্বংসের মুখ হইতে রক্ষা করিতে হইলে সব মানুষের সংহত চেষ্টা প্রয়োজন। যাহার বাহুতে বল আছে, চিত্তে আছে যার ধীশক্তি ও ভাবুকতা, কণ্ঠে আছে যার বাগ্মিতা,… লেখনি যার শক্তিমানসকলের সমবেত চেষ্টা আজ প্রয়োজনমানবের সভ্যতা, সংস্কৃতি ও প্রগতিকে দৃপ্ত শক্তির মূর্ত অকল্যাণের হস্তে আসন্ন ধ্বংস হইতে রক্ষা করিবার।”

সম্মেলনে যে সর্বভারতীয় কমিটি গঠিত হয় তার সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন মুন্সী প্রেমচাঁদ এবং সঙ্গতকারণেই সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন সাজ্জাদ জহির। মুলকরাজ আনন্দ সম্মেলনে যোগ দিতে পারেননি। তিনি যোগ দিয়েছিলেন সর্বভারতীয় দ্বিতীয় সম্মেলনে কলকাতয় ১৯৩৮ সালের ডিসেম্বর মাসে।

প্রসঙ্গত বলা যায়প্রগতি লেখক সংঘএর ইশতেহার ও প্রগতি সংকলনের ভূমিকা থেকে যে দুটো উদ্ধৃতি উল্লেখ করা হয়েছে তা রচিত হয়েছিলো সেই তিরিশের দশকের মধ্যবর্তীকালে। পৌণে এক শতাবাদীকাল পরেও, এই আমাদের বর্তমান সময়ে, লেখকশিল্পীসংস্কৃতিকর্মীদের কোনো সংগঠনের ঘোষণাপত্রে বা কোনো সংকলনের ভূমিকায় হুবহু গ্রহণ করলে কি বেমানান হবে? তার অর্থ এই দাঁড়াচ্ছে যে, সেই ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের কাল থেকে এতো ঘটনার মধ্যেদিয়ে আসার পরও উপমহাদেশের সমাজ ও সভ্যতার মৌলিক কোনো পরিবর্তন এই ৭৫ বা ৮০ কিংবা ১০০ বছরে হয়নি।

লক্ষ্ণৌ সম্মেলনে গৃহীত ঘোষণাপত্রএর ভিত্তিতে বাংলার প্রগতিশীল লেখকবুদ্ধিজীবীরা একই সময়ে সংগঠিত হবার উদ্যোগ নেন ও একটি সাংগঠনিক কমিটি গঠন করেন। ১৯৩৬ সালের ১৮ জুন ম্যাক্সিম গোর্কির মৃত্যু সংবাদ ঘোষিত হলে সর্বভারতীয় লেখক সংঘএর সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ জহির ‘গোর্কি দিবস’ পালনের আহ্বান জনান। তার পূর্বেই বাংলার প্রগতি লেখক সংঘএর সাংগঠনিক কমিটি গোর্কির মৃত্যু সংবাদ পেয়ে ১১ জুলাই (১৯৩৬) এলবার্ট হলের [বর্তমানে ‘কফি হাউস’] কমিটি রুমে এক শোকসভার আয়োজন করে। এই শোকসভা আহ্বান করেছিলেনআনন্দবাজার পত্রিকা’র সে সময়ের সম্পাদকসত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার, কবি কাজী নজরুল ইসলাম, হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, সুরেন্দ্রনাথ গোস্বামী, বিবেকানন্দ মুখোপাধ্যায়, . ধীরেন্দ্রনাথ সেন (এ্যাডভান্স পত্রিকার সম্পাদক) ও খগেন্দ্রনাথ সেন। শোকসভায় সভাপতিত্ব করেন সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার। এই সভায় আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বঙ্গীয় প্রগতি লেখক সংঘ’ গঠনের কথা ঘোষণা করা হয়। ড. নরেশচন্দ্র সেনগুপ্ত সভাপতি এবং সুরেন্দ্রনাথ গোস্বামী সম্পাদক নির্বাচিত হন।

সর্বভারতীয় প্রগতি লেখক সংঘএর ডাকে কলকাতয় গোর্কির স্মৃতি সভা অনুষ্ঠিত হয় ১৬ আগস্ট (১৯৩৬)। রবীন্দ্রনাথ অপ্রসন্ন বিরূপতার সঙ্গে গোর্কির নাম উচ্চারণ করেছিলেন ‘তলস্তয়ের স্মৃতি’ পাঠ করে। তিনিই গোর্কি স্মৃতিসভায় এক বাণী পাঠিয়ে গোর্কি সম্পর্কে তাঁর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে বলেন:

ম্যাক্সিম গোর্কি স্বীয় মানবপ্রেম ও সাহিত্য সৃষ্টি দ্বারা বিশ্বসাহিত্য ক্ষেত্রে অমর কীর্তি রাখিয়া গিয়াছেন। তাহার স্মৃতির প্রতি আমি শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করিতেছি।”

কেন ও কি করণে গোর্কি সম্পর্কে রবীন্দ্রাথের অপ্রসন্ন বিরূপ মনোভাব শ্রদ্ধায় পরিবর্তিত হয়েছিলো তা সে সময়ের ঘটনাধারার আলোকেই বিচার করতে হবে।

এই সময়ে স্পেনের নির্বাচিত বৈধ রিপাবলিকান সরকার উৎখাতের উদ্দেশ্যে ফ্যাসিস্ত ফ্রাঙ্কো সশস্ত্র আক্রমণ শুরু করলে ১৯৩৬ সালের ২০ নভেম্বর এই ফ্যাসিস্ত বর্বতা প্রতিহত করার জন্য বিশ্ববাসীর কাছে আকুল আবেদন পেশ করেন ফরাসী মনীষী বোঁমা রোঁলা। সে আবেদনে বিপুল সাড়া জাগে ভারতের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মহলে। তার ফলে ওই বছর মার্চ মাসে গঠিত হয় ‘ফ্যাসিবাদ ও যুদ্ধবিরোধী লীগ’ [লীগ এগেইনস্ট ফ্যাসিজম এ্যান্ড ওয়ার]-এর সর্বভারতীয় কমিটি। সে সময় রবীন্দ্রনাথ কলকাতায় ছিলেন। বাংলার প্রগতি লেখক সংঘএর সম্পাদক সুরেন্দ্রনাথ গোস্বামী, সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও আরো কয়েকজন কবির সঙ্গে দেখা করে ওই কমিটির সভাপতির দায়িত্ব নেয়ার অনুরোধ জানালে তিনি ‘সানন্দে সম্মতি প্রদান’ করেন। [জীবনের শেষ দিকে অসুস্থ অবস্থায় ১৯৪১ সালে গঠিত ‘সোভিয়েত সুহৃৎ সমিতি’র পৃষ্ঠপোষক হতেও তিনি সম্মত হয়েছিলেন।] স্পেনে ফ্যাসিস্ত বর্বতায় তাঁর ‘মন তখন ক্ষুব্ধ ও বিচলিত’। তিনি এইসময় এই ফ্যাসিস্ত বর্বরতার তীব্র নিন্দা ও ভর্ৎসনা করে তাঁর স্বদেশবাসীর উদ্দেশ্যে স্পেনের গণতান্ত্রিক সরকারকে সাহায্য করার আহ্বান জানান। রবীন্দ্রনাথ হলেন ফ্যাসিবাদ ও যুদ্ধবিরোধী সর্বভারতীয় কমিটির সভাপতি আর কার্যকরী সভাপতি (চেয়ারম্যান) হলেন কে টি শাহ্। সাধারণ সম্পাদক সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর। কমিটির সদস্যদের মধ্যে ছিলেন আচার্য্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, সরোজিনী নাইডু, এস ব্রেলভি (‘বম্বে ক্রনিকল’ সম্পাদক), কে শান্তনম (মাদ্রাজের ‘ডেইলি এক্সপ্রেস’ সম্পাদক), আর এস রুইকর, তুষারকান্তি ঘোষ, . ধীরেন সেন, অধ্যাপক সুরেন্দ্রনাথ গোস্বামী, সাজ্জাদ জহীর, ইন্দুলাল যাজ্ঞিক, স্বামী সহজানন্দ, এস জি রঙ্গ, এস এ ডাঙ্গে, পি ওয়াই দেশপান্ডে, ডা. সুমন্ত মেটা, মিঞা ইফতেখারউদ্দিন [ ইনি পরবর্তীকালে পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন এবং মওলানা ভাসানীর একজন পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। ], কমলা দেবী, জয়প্রকাশ নারায়ণ, দেবেন সেন, নবকৃষ্ণ চৌধুরী, ডা. সুরেশ বন্দ্যোপাধ্যায়, শিবনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রমুখ সারা ভারতের রাজনৈতিক ও সংস্কৃতিক আন্দালনের নেতৃবৃন্দ। এ সময় কমিউনিস্ট পার্টির সাংস্কৃতিক ফ্রন্টের অন্যতম সংগঠক চিন্মোহন সেহানবীশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

প্রগতি লেখক সংঘ’ গঠনের সূচনাপর্বেই তার শত্রু পক্ষের আক্রমণের মোকাবিলা করতে হয়েছে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের স্বার্থের সেবক ‘স্টেটসম্যান’ ‘সংঘ’র ইশতেহার প্রকাশের পরপরই ‘সংঘ’র বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করে এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে ১৯৩৬ সালের ৭ জুলাই। তার জবাব দেন বিচক্ষণ ও সাহসী সম্পাদক সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’র ৮ জুলাই সংখ্যার সম্পাদকীয়তে। [পরবর্তীকালে আনন্দবাজার পত্রিকা’র মালিকরা পত্রিকার নীতি পরিবর্তন করলে এই বিচক্ষণ ও সাহসী সম্পাদক ইস্তফা দেন এবং তাঁর সম্পাদনায় আত্মপ্রকাশ করে সাপ্তাহিক অরণি। ১৯৪১ সালের আগস্ট থেকে ১৯৪৮ পর্যন্ত এই পত্রিকা বাংলার প্রগতি সংস্কৃতির আন্দোলনে অমূল্য অবদান রেখে বিলুপ্ত হয়।]

মাসিক পত্রিকা অগ্রণী ছিলো কমিউনিস্ট পার্টির নির্দেশে পরিচালিত বাংলা ভাষায় ‘প্রথম বামপন্থী মাসিক পত্রিকা’। সর্বভারতীয় প্রগতি লেখক সংঘ’র দ্বিতীয় সম্মেলনে সভাপতি মন্ডলীর সদস্য বুদ্ধদেব বসু’র লিখিত ভাষণের আক্রমণ দিয়েই শুরু হয় সাহিত্য ও শিল্পকলার ক্ষেত্রে মার্কসবাসীদের বাংলা ভাষায় ‘সম্ভবত’ প্রথম মতাদর্শগত সংগ্রাম [ অগ্রণী, প্রথম বর্ষ, দ্বিতীয় সংখ্যা, ফেব্রুয়ারি ১৯৩৯]। বুদ্ধদেব বসু তাঁর রচনায় মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবী সম্পর্কে চরম হতাশা প্রকাশ করেও শেষ পর্যন্ত সেই মধ্যবিত্তের ওপর আস্থা স্থাপন করে যে বক্তব্য উপস্থিত করেন, সরোজকুমার দত্ত ‘ছিন্ন কর ছদ্মবেশ’ শিরোনামে নিবন্ধে সেই বক্তব্যের অসঙ্গতিকে ব্যঙ্গবিদ্রƒপে বিদ্ধ করেন। [বুদ্ধদেব বসু ওই একই নিবন্ধে আভাসে ইঙ্গিতে রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে যে কটাক্ষ করেছিলেন তাতে তিনিও খুবই ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। সে ক্ষোভ রবীন্দ্রনাথ অমিয় চক্রবর্তীকে লেখা এক চিঠিতে প্রকাশও করেছিলেন। সে চিঠি প্রবাসী’তে (বৈশাখ, ১৩৪৬) প্রকাশিত হয়েছিলো। শনিবারের চিঠি ও পূর্বাশা পত্রিকায়ও বুদ্ধদেব বসুর মতের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা প্রকাশিত হয়েছিলো।]

বুদ্ধদেব বসু একটা দৃষ্টান্ত মাত্র। আমরা আগেই বলেছি, প্রগতি লেখক সংঘ’র সকলেই এমনকি অধিকাংশই কমিউনিস্ট মতাদর্শের অনুসারী বা সমর্থক ছিলেন না। মার্কসবাদী ভাবাদর্শে যারা অনুপ্রাণিত, যাদের কেউ কেউ গোপন কমিউনিস্ট শক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন, তারাই বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থের প্রশ্ন সামনে রেখে দেশের খ্যাতিমান ও তরুণ লেখকবুদ্ধিজীবীদের একটি সংগঠনের পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তারা মতাদর্শগত সংগ্রাম ভুলে যাননি। তাদের বিবেচনায় ভুল চিন্তার বিরুদ্ধে সমালোচনা করতে তারা মোটেও পিছপা হননি।

বাংলায় ‘প্রগতি লেখক সংঘ’র সকল তৎপরতার কেন্দ্র ছিলো কলকাতা। অনেকগুলো জেলায় নামে কমিটি হয়েছে তবে কাজে তেমন কিছুই হয়নি। ব্যতিক্রম ছিলো ঢাকা। ঢাকায় ‘সংঘ’র শাখা বেশ সক্রিয় ছিলে। ঢাকায় ‘সংঘে’ যাঁরা একত্রিত হয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে জ্যেষ্ঠ ছিলেনসতীশ পাকড়াশী আর সর্বকনিষ্ঠ ছিলেন তরুণ লেখক ও শ্রমিক আন্দোলনের অগ্রগামী সংগঠক সোমনে চন্দ। আর ছিলেন রণেশ দাশগুপ্ত, জ্যোতির্ময় সেনগুপ্ত, অচ্যুত গোস্বামী, কিরণশংকর সেনগুপ্ত, প্রমুখ। এদের মধ্যে তরুণ সোমেন চন্দ ছিলেন সাংগঠনিক কাজে সবচেয়ে অগ্রগামী। এই তরুণ মার্কসবাদী লেখকবুদ্ধিজীবীদের উদ্যোগে নতুন সাহিত্য ভবন থেকে ১৯৪০ সালে প্রকাশিত হয়েছিলো প্রগতিশীল সংকলন ক্রান্তি। সংঘের অন্যতম নেতা রণেশ দাশগুপ্ত ‘নতুন দৃষ্টিতে উপন্যাস’এর পর্যালোচনা করেছিলেন আর নৃপেন্দ্রচন্দ্র গোস্বামী তাঁর ‘সাহিত্যে সৌন্দর্যবাদ’ রচনায় অসংকোচে বলেছেন-“আমরা এমন সাহিত্য চাই যা আমাদের হাতুড়ি পিটিয়ে মানুষ করতে পারে। আমরা বাংলা সাহিত্যে একজন গোর্কির অভ্যুদয় দেখতে চাই।”

সর্বভারতীয় প্রগতি লেখক সংঘ’র দ্বিতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় কলকাতায় ১৯৩৮ সালের ডিসেম্বর মাসে, আশুতোষ কলেজ হলএ। সম্মেলনের উদ্যোক্তারা সহযোগিতা পেয়েছিলোরাজশেখর বসু (পরশুরাম) ও অতুলচন্দ্র গুপ্ত’র মতো বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গের। উদ্বোধনী বাণী দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। সেটা সম্মেলনে পাঠ করেছিলেন হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়। কবির নির্দেশে সেটি ইংরেজিতে ভাষান্তর করেছিলেন তিনি। সভাপতি মন্ডলীতে ছিলেনমুলকরাজ আনন্দ, বুদ্ধদেব বসু, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় ও হিন্দি কবি সুদর্শন। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ছিলেন, প্রেমেন্দ্র মিত্র, প্রমথ চৌধুরী, শাহেদ সোহরাওয়ার্দি, সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার, প্রবোধকুমার সান্যাল, নির্মলকুমার সিদ্ধান্ত প্রমুখ খ্যাতিমান লেখকবুদ্ধিজীবী। পরিচয়সম্পাদক সুধীন্দ্রনাথ দত্ত সভাপতি মন্ডলীর সদস্য হিসেবে দীর্ঘ লিখিত ভাষণ দেন। সেটি পরে ‘সংঘ’র স্বল্পস্থায়ী পত্রিকা নিউ ইন্ডিয়ান লিটারেচারএ প্রকাশিত হয়। বুদ্ধদেব বসুর ভাষণের কথা ইতিপূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে।

Writer should not be a recluseশিরোনামে রবীন্দ্রনাথের উদ্বোধনী বাণী থেকে কয়েকটি বাক্য উদ্ধৃত করা খুবই প্রাসঙ্গিক মনে করি:

….a writer isolated from the society can never become familiar with humanity… It is obvious that cut off from the masses we will be totally alienated. Writers have to mix with the people and to know them. I have committed a grave mistake in my endeavour by keeping away from the society for a long time. I have realised it now and that is why I am giving this counsel to them…

Today our country is like a vast desert which dose not have a trace of greenery and life. Every inch of our land is a picture of sorrow. We have to banish this suffering and sorrow and have to cultivate the garden of life afresh. It must be writers’ duty to instil life into the country, sing the songs of awakening and valour, to carry the message of hope and happiness to every human being and not to let anybody dispair…

…shed off the slough of `ego’ if you want to search for truth and beauty…

প্রগতি লেখক সংঘ’ পরিচালনা যারা করতেন তাদের প্রধান অংশই ছিলেন মার্কসবাদী লেখকবুদ্ধিজীবী এবং তাদের কেউ কেউ কমিউনিস্ট শক্তির অভ্যন্তরের অংশ ছিলেন সে কথা আমরা পূর্বেও বলেছি। এ সত্য খ্যাতিমান লেখকপন্ডিতবুদ্ধিজীবীদের অজানা ছিলো না। মার্কসবাদী দর্শনের অনুসারী বা সমর্থক না হয়েও এবং মার্কসবাদীদের দ্বারা পরিচালিত জেনেও ‘প্রগতি লেখক সংঘ’র কার্যক্রমের সাথে তারা কেন যুক্ত হয়েছিলেন, সমর্থনসহযোগিতাপৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছিলেন সে এক বড়ো প্রশ্ন্।

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ‘দল বেঁধে সাহিত্য করা যায় না’ কথাটা জোর দিয়ে বলেও প্রথম সম্মেলনে শুভেচ্ছা পাঠিয়েছিলেন। এমনটা সম্ভব হয়েছিলো অগ্রগামী সংগঠকরা ছিলেন ক্লান্তিহীন তৎপরতায় লিপ্ত ও অসাধারণ কর্তব্যনিষ্ঠ। পরবর্তীকালে যাই হোক সে সময় ভাগ্য বা সুবিধেসন্ধানী বলে তাদের কোনো দুর্নাম ছিলো না। নিজেদের যোগ্যতা ও নিষ্ঠা দিয়ে তারা অন্যদের আস্থা অর্জন করেছিলেন। আর দেশের ও বিশ্বব্যাপী পরিস্থিতির আনুকূল্য তো ছিলোই। তারপরও সংগঠন তেমন জোরদার অবশ্য হয়নি। তবে লেখকবুদ্ধিজীবীদের চিন্তায় এক নতুন হাওয়া যে দোলা দিয়েছেলো তা অস্বীকার করা যাবে না।

শরৎচন্দ্র যে বলেছিলেন ‘দল বেঁধে সাহিত্য করা যায় না’কথাটা আংশিক সত্য, সম্পূর্ণ নয়। সাহিত্যসৃষ্টির জন্য নিভৃতে নিমগ্নতার কথা কেউ অস্বীকার করে না। কিন্তু প্রকৃত জীবন ও জীবনসত্য সম্পর্কে সঠিক দৃষ্টিভঙ্গী ও জানাবোঝা এবং তাকে সাহিত্যে রূপ দিতে দল বেঁধে অনুসন্ধানঅধ্যয়নবিতর্কে সাহিত্যসৃষ্টি অনেক বেশি সমৃদ্ধ ও পরিশুদ্ধ হয় তার প্রমাণ তো কম নেই। তাছাড়া, কেবলমাত্র সাহিত্য করার জন্যে তো দল বাঁধার উদ্যোগ নেয়া হয়নি, তা হয়েছিলো জনগণের মুক্তির সংগ্রামে লেখকশিল্পীবুদ্ধিজীবীদের সঙ্ঘবদ্ধ অংশগ্রহণের এবং সাহিত্য ও শিল্পকৃতি জনগণের জীবন ও সংগ্রামের সঙ্গী করে তোলার উদ্দেশ্যে। ‘প্রগতি লেখক সংঘ’ ও পরবর্তীকালে ‘গণনাট্য সংঘ’র পতাকা তলে সে আন্দোলন কতোটা ফল দিয়েছিলো তার প্রমাণ তো ইতিহাসে আছে।

তিরিশের দশককে বলা যায় সর্বহারা শ্রেণীর লাল পতাকার নিচে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের প্রস্তুতিকাল। লেখকবুদ্ধিজীবীদের চিন্তার জগতে কিছুটা আলোড়ন সৃষ্টি হলেও বাস্তবে তেমন কোনো আন্দোলন গড়ে ওঠেনি। তবু এটা মানতেই হবেচিন্তার জগতে যে আলোড়নটুকু সৃষ্টি হয়েছিলো তারই ধারাবাহিকতায় চল্লিশের দশকে সৃষ্টি হয়েছিলো আন্দোলনের কল্লোল। তাই তিরিশের দশকের ঘটনাধারা আমাদের গুরুত্ব দিয়েই বিবেচনা করতে হয়।

চল্লিশের দশকের সূচনায় জাতীয় সংস্কৃতির অতীত ও বর্তমান নিয়ে যখন প্রগতি শিবিরের অভ্যন্তরে কিছুটা বিতর্ক শুরু হচ্ছে সে সময়ই শুরু হয়ে যায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের তান্ডব। কমিউনিস্ট পার্টি এই যুদ্ধকে সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ বলে ঘোষণা দিলো আর তার বিরুদ্ধে প্রচার অভিযান শুরু করলো ‘না এক পাই, না এক ভাই’ ধ্বনি দিয়ে। অর্থাৎ ভারতবাসীর কাছে আহ্বান জানালোঅর্থ দিয়ে অথবা সৈন্য দিয়ে কোনোভাবেই এই যুদ্ধে সহায়তা নয়। তার স্বাভাবিক ফল হিসেবেই আতঙ্কিত ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সরকারের দমনপীড়ন নেমে এলো কমিউনিস্ট শক্তির ওপর। অসংখ্য নেতা কর্মী আটক, অন্তরীণ ও কলকাতা থেকে বহিষ্কৃত হলো। অন্যদিকে দমনপীড়ন এড়াতে অনেকে আত্মগোপন করতে বাধ্য হয়। এতে করে পার্টির নির্দেশে পরিচালিত অগ্রণী পত্রিকা বন্ধ হয়ে যায়। আর সেসঙ্গে ‘প্রগতি লেখক সংঘ’র তৎপরতাও কার্যত থেমে গেলো।

সাংস্কৃতিক আন্দোলনের এই আপাত শূন্যতা পূরণ করতে এগিয়ে এসেছিলো ছাত্র ফেডারেশনের একদল সংস্কৃতি মনস্ক কর্মী। তারা ছাত্রছাত্রীদের সক্রিয় সহযোগিতায় গড়ে তোলে ‘ইয়োথ কালচারাল ইনস্টিটিউট’ নামে একটি সংগঠন। এরা নিয়মিত সংস্কৃতি বিষয়ে আলোচনা ও বিতর্কসভার আয়োজন করতো; অভিনয়, পোস্টার প্রদর্শনী ও গানের অনুষ্ঠান করতো। পরবর্তীকালে সংগঠিত ‘গণনাট্য সংঘ’র অগ্রবর্তী হিসেবেই এই সংগঠনের গুরুত্ব বিবেচিত হয়।

এদিকে বিশ্বযুদ্ধে নতুন পরিস্থিতির উদ্ভব হলো। জার্মানীর ক্যাসিস্ত হিটলারের নাৎসি বাহিনী ১৯৪১ সালে ২২ জুন বিশ্বের প্রথম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়নে আগ্রাসন অভিযান শুরু করে। ফলে যুদ্ধের চরিত্র বদলে গেলো। সোভিয়েত ইউনিয়ন রক্ষার আন্তর্জাতিক কর্তব্য উপস্থিত হলো বিশ্বের কমিউনিস্ট শক্তিগুলোর সামনে। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি সে কর্তব্য অতি দ্রুত অনুভব করে এবং বিশ্বযুদ্ধ সম্পর্কে পূর্বের অবস্থান থেকে সরে আসে। কমিউনিস্ট কর্মীদের উদ্যোগে ও প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠে ‘সোভিয়েত সুহৃৎ সমিতি।’ এই সমিতি গড়ে তোলার সক্রিয় উদ্যোক্তাদের মধ্যে ছিলেন কমিউনিস্ট বুদ্ধিজীবী বলে পরিচিতহীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, স্নেহাংশুকান্ত আচার্য, জ্যোতি বসু, রাধারমণ মিত্র, প্রমুখ। সমিতির সভাপতি নির্বাচিত হন ড. ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত আর সম্পাদকের দায়িত্ব নিয়েছিলেন স্নেহাংশুকান্ত আচার্য ও হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়। আগে উল্লেখ করেছিরবীন্দ্রনাথ অসুস্থ থাকা সত্ত্বেও সমিতির পৃষ্ঠপোষক হতে সম্মত হয়েছিলেন।

সাংস্কৃতিক আন্দোলনে যে গতিহীনতা সৃষ্টি হয়েছিলো, ‘সোভিয়েত সুহৃৎ সমিতি’ গঠনের মধ্যদিয়ে তাতে পুনরায় প্রাণাবেগ ও গতিবেগ সৃষ্টি হয়। সোভিয়েত ইউনিয়নের পক্ষে জনমত গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে একের পর কে জনসভা, পোস্টার প্রদর্শনী, সংগীতানুষ্ঠান, চলচ্চিত্র প্রদর্শনী প্রভৃতি হতে থাকে কর্মীদের উদ্যোগে। এভাবে সেসময় সোভিয়েত সংস্কৃতির সাথে বাংলার জনসাধারণ ও বুদ্ধিজীবীদের ব্যাপক পরিচয় ঘটা সম্ভব হয়।

সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রান্ত হবার পর ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি রণনীতি বদলানোর ফলে ঔপনিবেশিক শাসন কর্তৃপক্ষ তার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেয়। এ সময় বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির সম্পাদকের দায়িত্ব পান ভবানী সেন। তার নেতৃত্বে শ্রমিককৃষকমধ্যবিত্তের বিভিন্ন ফ্রন্টে নতুন প্রাণের সাড়া জাগে। ইতিহাসের এই তাৎপর্যময় মুহূর্তে ঢাকার তরুণ কমিউনিস্ট লেখক সোমেন চন্দ ফ্যাসিবাদী গুন্ডাদের হামলায় নিহত হন ১৯৪২ সালের ৮ মার্চ। তিনিই ছিলেন ঢাকায় প্রথম লেখক শহীদ। তাঁর এই হত্যাকান্ডের বেদনাময় ঘটনায় বিচলিত হয় বাংলার সকল দল ও মতের লেখকশিল্পীবুদ্ধিজীবীরা। এই পটভূমিতে অনুষ্ঠিত হয় ফ্যাসিবাদ বিরোধী লেখক শিল্পী সম্মেলন কলকাতায় রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের সভাপতিত্বে। ১৯৪২ সালের ২৮ মার্চ অনুষ্ঠিত সেই সম্মেলনে গঠিত হয় ‘ফ্যাসিবিরোধী লেখক ও শিল্পী সংঘ’। সভাপতি নির্বাচিত হন অতুলচন্দ্র গুপ্ত এবং সম্পাদকের দায়িত্ব পান কবি বিষ্ণু দে ও সুভাষ মুখোপাধ্যায়। স্থির হয় এরপর থেকে ‘ফ্যাসিবিরোধী লেখক ও শিল্পী সংঘ’ বাংলায় সর্বভারতীয় ‘প্রগতি লেখক সংঘ’র শাখা হিসেবে কাজ করবে।

লাল পতাকার নিচে সাংস্কৃতিক আন্দোলনে এর পরের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ‘গণনাট্য সংঘ’ গঠন। ১৯৪৩ সালের ২৫ মে বোম্বাইতে ‘ইন্ডিয়ান পিপলস থিয়েটার এ্যাসোসিয়েশন’ (সংক্ষেপে আইপিটিএ) [ বাংলায় ‘ভারতীয় গণনাট্য সংঘ’ (সংক্ষেপে-‘গণনাট্য’)] সংগঠিত হয়। ‘গণনাট্য সংঘ’ গঠনে অংশগ্রণকারী ও পরিচালক মন্ডলী গঠনের বিবরণে যাবার পূর্বে ওই ১৯৪৩ সালেরই একটি ঘটনা বলে নিতে চাই। সেটি হচ্ছে বোমাবাইতে ‘ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি’র প্রথম কংগ্রেস অনুষ্ঠানের পূর্বে প্রায় সারা ভারতের প্রতিনিধিদের নিয়ে প্রগতি লেখক সম্মেলন অনুষ্ঠত হয়। সম্মেলনে প্রধান বক্তা ছিলেন টেড্র ইউনিয়ন আন্দোলনের নেতা ও কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃমন্ডলীর অন্যতম সদস্য শ্রীপাদ অমৃত ডাঙ্গে (এস এ ডাঙ্গে)। পার্টির সম্পাদক পূরণচাঁদ জোশী সাংস্কৃতিক আন্দালনে ঝাঁপিয়ে পড়ার আগ্রহ সঞ্চারী ডাক দিয়েছিলেন। সম্মেলনে যারা অংশ নিযেছিলেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যসত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার, বিষ্ণু দে, মখদুম মহীউদ্দিন, খাজা আহমদ আব্বাস, মারাঠি নাট্যকার মামা ওয়ারেরকার। আরো ছিলেন দেবব্রত (জর্জ) বিশ্বাস, জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র, বিজন ভট্টাচার্য, শম্ভু মিত্র, বিনয় রায় প্রমুখ।

এ ঘটনা উল্লেখ করার কারণ এই প্রথম কমিউনিস্ট নেতাদের সাংস্কৃতিক আন্দোলনে প্রত্যক্ষ অংশ নিতে দেখা গোলো। অর্থাৎ পার্টি আর আড়ালে নয়, সরাসরি প্রকাশ্যে নেতৃত্বের ভূমিকা পালন শুরু করে। সে সময় শ্রমিক আন্দোলন ও কৃষক আন্দোলনে তেমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিলো।

গণনাট্য সংঘ’ গঠন প্রক্রিয়ায় সেটা আরো স্পষ্ট ও প্রত্যক্ষ রূপ নিলো। সভাপতি নির্বাচিত হন সর্বভারতীয় ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক এন এম জোশী। সাধারণ সম্পাদক অনিল ডি সিলভা, যুগ্মসম্পাদক বিনয় রায় (বাংলা) ও কে টি চন্ডী (বোম্বাই)। কোষাধ্যক্ষ খাজা আহমদ আব্বাস। কমিটির সদস্যদের মধ্যে ছিলেন নিখিল ভারত কিষাণ সভার সভাপতি বঙ্কিম মুখার্জী, ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেসের সভাপতি এস ও ডাঙ্গে, ‘প্রগতি লেখক সংঘ’র সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ জহীর এবং ছাত্র ফেডারেশনের অরুণ বসু।

গণনাট্য সংঘ’র সর্বভারতীয় কমিটির গঠনরূপ থেকে এটা পরিষ্কার যে, সাংস্কৃতিক আন্দোলন পরিচালনায় লেখকশিল্পীবুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে সরাসরি যোগ দিলেন শমিককৃষক ও ছাত্রতরুণদের প্রতিনিধিরা। তার ফলে এ আন্দোলন শহরকেন্দ্রিক মধ্যবিত্তের গন্ডি পেরিয়ে কারখানার শ্রমিক, গ্রামাঞ্চলের কৃষক ও অন্যসকল মেহনতকারী জনগণের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা চালায়। তবে এ সত্য উপেক্ষা করা যাবে না যে, শহরকেন্দ্রিক মধ্যবিত্ত গন্ডি অতিক্রমের চেষ্টায় সংগীত মাধ্যম যতোটা সাফল্য পেয়েছিলো অন্য কোনো মাধ্যম তা পায়নি। গণসংগীত এ আন্দোলনের এক অতি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। বাংলায় গণসংগীতের পুরোগামীরা হলেন জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র, বিনয় রায়, হেমাঙ্গ বিশ্বাস, সলিল চৌধুরী, প্রমুখ। তবে এঁদের মধ্যে নিষ্ঠাবান ও আপসহীন শ্রেণীসচেতন সাংস্কৃতিক সংগ্রামী হিসেবে বেকলমাত্র হেমাঙ্গ বিশ্বাসকেই চিহ্নিত করা যায়। তার মাধ্যমে লোকসংগীতের সুর গণসংগীতে নবজীবন লাভ করেছিলো। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তিনি অবিচল ছিলেন। অন্যরা কমবেশি সময়ের স্রোতে ভেসে গেছেন। নাটকের ক্ষেত্রেও কিছু সাফল্য এসেছিলো (‘নবান্ন’, ‘ছেঁড়া তার’ প্রভৃতি) তবে সে সাফল্য ধরে রাখা ও এগিয়ে নেয়া যায়নি। কবিতা এবং সৃজনশীল ও মননশীল সাহিত্য ক্ষেত্রেও নবজাগরণ এসেছিলো এবং গণ্ডি ভাঙার চেষ্টাও লক্ষ্য করা যায়, তবে সে চেষ্টা বিকাশের পথে এগুতে পারেনি। তবু, যতো সীমবদ্ধতাই থাকুক, বিষ্ণু দে, সমর সেন, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, সুকান্ত ভট্টাচার্য, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রমুখ পুরোগামী কবি ও লেখকদের সে সময়ের সাধনা ও সংগ্রামকে খাটো করে দেখা হবে মারাত্মক ভুল।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় জীবনের প্রকৃত রূপ অন্বেষণে ব্রতী হলে প্রবীণ প্রথিতযশা কবি মোহিতলাল মজুমদার তাঁকে গালাগালি দিয়ে লিখলেন : “চিন্ময় বাস্তবের পরিবর্তে জড়বাস্তবের উপাসনা তাঁহাকে পাইয়া বসিয়াছে…. রূপকার কবির আসন হইতে রূপবিদ্রোহী কর্মকারের পদবীতে নামিয়াছেন।” আর সামগ্রিকভাবে প্রগতিসাহিত্য সম্পর্কে তাঁর মত ছিলো আরো তীক্ষ্ণ : “ সকলকে বাতিল করিয়া দিয়া ‘প্রগতি’ নামে একটি অনার্য শব্দকে বিশাল বংশদণ্ডে বাঁধিয়া, ভদ্রবেশী বর্বরগণের অগ্রণী হইয়া আজ যুগধর্মের সুযোগেমানবসভ্যতার এই অতিশয় সংকটময় দুর্দিনেইহারা, এই রসঅধিকারবঞ্চিত হরিজনেরা, জাতে উঠিবার জন্য বিষম কোলাহল শুরু করিয়াছে।” প্রচলিত সমাজব্যবস্থার সেবকদের পক্ষ থেকে এমন সমালোচনা প্রশংসা হিসেবেই বিবেচিত হওয়া উচিৎ। কেননা যাদের তিনি ‘বর্বর’ ও ‘হরিজন’ বলে গাল দিয়েছেন তাঁরাই যে নতুন যুগের অগ্রগামী প্রতিনিধি সে সত্য তিনি ভালোমতো বুঝতে পেরেছেন। আরো বুঝতে পেরেছেন, তাঁর মতো মহাজনদের ‘চিন্ময় বাস্তব’এর আকাশে ঝড় এরাই তুলেছেন এবং তাদের স্মর্ণআসন একদিন ধূলায় গড়াগড়ি যাবার যে আশঙ্কা তরা করেছেন তা ভবিষ্যতে এরাই কিংবা এদের উত্তরসুরীরা সত্য করে তুলবে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেমে যাবার পর ‘ফ্যাসিবিরোধী লেখক ও শিল্পী সংঘ’র সক্রিয়তা থেমে গিয়েছিলো। সাংস্কৃতিক আন্দোলন পরিচালনায় ‘গণনাট্য সংঘ’ই হয়ে দাঁড়িয়েছিলো প্রধান সংগঠন।

চল্লিশের দশকে বাংলায়, বিশেষকরে, কলকাতাকেন্দ্রিক রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক নবজাগরণ সৃষ্টি হয়েছিলো। সে জাগরণের উত্তাল তরঙ্গাঘাত শহরকেন্দ্রিক মধ্যবিত্ত গন্ডি পেরিয়ে শ্রমিক, কৃষক ও সকল মেহনতকারী জনগণের মাঝে পৌছেছিলো ঠিকই কিন্তু তা প্রধান ও নিয়ন্ত্রণকারী ঘটনাস্রোতের রূপ নিতে পারেনি। লাল পতাকার নিচে সমস্ত উদ্যোগ ও আয়োজন চলে গিয়েছিলো মুৎসুদ্দি শ্রেণীর জাতীয় আন্দালনের অধীনে। মুৎসুদ্দি শ্রেণীর আপসের রাজনীতির বিরুদ্ধে যেশক্তির ইতিহাসনির্দেশিত দায়িত্ব ও কর্তব্য ছিলো স্বাধীনতা ও জাতীয় মুক্তির সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়ে বিজয়ের পথে নিয়ে যাওয়ার, তা পারেনি সেই লাল পতাকার রজনৈতিক শক্তি। তেমন যোগ্যতা ও বিচক্ষণতা অর্জন করতে পারেনি সে শক্তি। চীন ও ইন্দোচীনের সংগ্রাম থেকে কোনো শিক্ষাই নেইনি। ফলে সার্থকতার কিছু কিছু চিহ্ন সৃষ্টি করা ছাড়া রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সর্বক্ষেত্রে ব্যর্থতার ধারাই প্রধান ধারা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে ইতিহাসে। ঔপনিবেশিক ভারতের মুক্তির সংগ্রামের সঠিক দিশা নির্মাণ করতে না পারার কারণেই এমনটা ঘটেছে তা বলাই বাহুল্য। সেই না পারার ইতিহাসের ধারানুক্রম আমাদের কাল পর্যন্ত চালু রয়েছে।

তার ফলস্বরূপ ভারতের সামন্ত ও মুৎসুদ্দি ধনিক শ্রেণীর দুই রাজনৈতিক দল ‘কংগ্রেস’ ও ‘মুসলিম লীগ’এর সহযোগিতায় ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকশক্তির ‘ভাগ করে শাসন করা’র নীতি কার্যকর এবং সাম্প্রদায়িক বিবেচনায় ভারত ভাগ করে ভারত ও পাকিস্তান দুটি রাষ্ট্র সৃষ্টি সম্ভব হয়। ভারত বিভাজনে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, লিয়াকত আলী ও তাদের সঙ্গীসাথীরা যতোটা দায়ীমোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী, জওহারলাল নেহরু, সরদার প্যাটেল ও তাদের সঙ্গীসাথীরা তার চেয়ে মোটেও কম দায়ী নয়। সে সাথে ভারতের সর্বহারা শ্রেণীর রাজনৈতিক শক্তির দায়ও অস্বীকার করা যাবে না। ঔপনিবেশিক শাসকশক্তির সাথে ভারতের সামন্ত ও মুৎসুদ্দি ধনিকশ্রেণীর আপস রফার ফলে ভারতে উপনিবেশের স্থলে নয়াঔপনিবেশিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা পায়। অর্থাৎ কাগুজে স্বাধীনতা। প্রকৃতপক্ষে বাস্তব পরিস্থিতির কারণে সাম্রাজ্যবাদ প্রত্যক্ষ শাসনের পরিবর্তে পরোক্ষ শাসনের অর্থাৎ পর্দার আড়াল থেকে সবকিছু নিয়ন্ত্রণের কৌশল নেয়। আর গণতন্ত্রের নামে প্রতিষ্ঠিত হয় সামন্তমুৎসুদ্দি ধনিকশ্রেণীর একাধিপত্য। যে নেহরু এক সময় সমাজতন্ত্রের অনুসারী, সোভিয়েত ইউনিয়নের সুহৃৎ এবং এমন কি ‘স্তালিনের ইয়ার’ বলে পরিচিত ছিলেন তিনি ক্ষমতা লাভের পর দর্পের সঙ্গেই বললেন-“ ‘কমিউনিজম’ আর ‘কমিউনালিজম’ এ তফাৎ কোথায়, কারণ জলে ডুবে মরা আর পাহাড় থেকে পড়ে মরার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।” তাই তিনি তাঁর ‘স্বাধীন ভারতে’ লাল পতাকার শক্তি দমনে নিষ্ঠুর হতে দ্বিধা করেন নি। তিনি ভুলে গেছেন ঔপনিবেশিক শাসনবিরোধী সংগ্রামে ওই লাল পতাকার শক্তির অবদান মোটেও কম নয়।

চল্লিশের দশকে সাংস্কৃতিক আন্দোলনে যে জোয়ার সৃষ্টি হয়েছিলোসামন্তমুৎসুদ্দিশ্রেণীর স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র তাকে পুরোপুরি গ্রাস করে। অধিকাংশ লেখকশিল্পীবুদ্ধিজীবী নয়াউপনিবেশিক রাষ্ট্র ও সমাজের সেবায় কোমর বেঁধে নেমে পড়ে। যারা স্রোতের বিরুদ্ধে সাহস করে দাঁড়াবার চষ্টা করেছিলেন ‘ইয়ে আজাদী ঝুটা হ্যায়, লাখ ইনসান ভুখা হ্যায়’এমন বাম হঠকারী ধ্বনিতে তারাও বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে এবং রাষ্ট্রীয় নিষ্ঠুর নিবর্তনের মুখে হতাশা ও উদ্যমহীনতার শিকার হয়। তারপরও যে দুজারচন লেখকশিল্পীবিুদ্ধিজীবী অবিচলিত থাকার চেষ্টা করেছেন তাদের ভূমিকা উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে আমাদের সামনে আছে। তারই ধারাবাহিকতায় আজো ভারতে লাল পতাকার নিচে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের প্রচেষ্টা জারি আছে সে কথা আমাদের ভুলে যাওয়া অন্যায় হবে। ষাটের দশকের শেষের দিকে ও সত্তর দশকে বিশেষকরে ‘নকশালবড়ী’ আন্দোলনের অভিঘাতে সাংস্কৃতিক আন্দোলনে যে জাগরণ সৃষ্টি হয়েছিলোরাজনৈতিক শক্তির বহু কেন্দ্রে বিভক্তি ও বিভ্রান্তির শিকার হবার ফলে সে জাগরণ প্রত্যাশিত বিকাশের পথে এগুতে পারেনি।

 

ভারতবিভক্তির পর পাকিস্তানে, বিশেষকরে তার পুর্বাঞ্চলে, পূর্ব বাংলায়, লাল পতাকার সংগ্রাম অত্যন্ত কঠিন অবস্থায় পড়ে। সাম্প্রদায়িক রাজনীতি ও সংস্কৃতির প্রবল জোয়ারে দিশেহারা সর্বহারা শ্রেণীর রাজনৈতিক শক্তির পক্ষে টিকে থাকা প্রায় অবম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় হিন্দুবিদ্বেষ সাধারণ মানুষের চেতনাকেও বিষাক্ত করে তোলে। রাষ্ট্রীয় প্রচারণা কমিউনিস্টদের ‘হিন্দু’ ও ‘ভারতের চর’ আখ্যা দিয়ে দমন ও পীড়ন চালাবার ফলে হিন্দু সম্প্রদায় থেকে আশা ব্যাপক সংখ্যক কমিউনিস্ট কর্মী, লেখকশিল্পীবুদ্ধিজীবী দেশত্যাগ করে ভারতে চলে যেতে বাধ্য হয়। ফলে প্রায় দুদশক ধরে লাল পতাকার সংগ্রাম এ অঞ্চলে যতোটুকু বিকাশলাভ করেছিলো তা প্রায় নিঃশেষ হয়ে যায়। যারা মাটি কামড়ে পড়ে ছিলেন তাদের অবস্থা দাঁড়ায় স্বদেশে পরবাসীর মতো এবং স্বাভাবিকভাবেই আত্মরক্ষা হয়ে দাঁড়ায় তাদের প্রধান কর্তব্য।

বাংলা ভাষার রাট্ট্রীয় মর্যাদা ও অধিকারের দাবিতে সংঘটিত আন্দোলন কিছুটা দম নেবার সুযোগ সৃষ্টি করলেও রাষ্ট্রীয় নিবর্তন মোবিলা করা ও এই আন্দোলনকে পেটিবুর্জোয়া বা মধ্যবিত্ত গন্ডি থেকে বের করে জনগণের বৃহত্তর সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত করার যোগ্যতা এবং শক্তি ও সামর্থ্য তেমন কিছুই ছিলো না লাল পতাকার রাজনৈতিক শক্তির। ফলে ওই আন্দোলন সীমিত গন্ডিতে আবদ্ধ হয়ে যায় এবং সে গন্ডি কখনোই অতিক্রম করতে পারেনি। তবে এ আন্দোলনের অভিঘাতে যে জাগরণ সৃষ্টি হয়েছিলো তার ফসল হিসেবে আমরা পেয়েছি কিছু কবিতা, গান ও গল্প। সে সাথে অসাম্প্রদায়িক চেতনার কিছুটা শক্ত জমিন। সে সময়ের বিচারে এটা একেবারে কম নয়। যদিও পরে এ আন্দোলন ও এমন অন্য আন্দোলনগুলোর সুফল চলে গেছে জনগণের শত্রুদের হাতেই।

ঢাকার সংস্কৃতি ও সংস্কৃতিচর্চা ছিলো খুবই পশ্চাদপদসামন্ততান্ত্রিক। আমাদের স্মরণ রাখতে হবে, বিশের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক ‘বুদ্ধির মুক্তি’ আন্দোলন শেষ পর্যন্ত সহ্য করেনি ঢাকার নবাবদের কর্তৃত্বাধীন প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি। ওই আন্দোলনের অন্যতম নেতা ও প্রধান সংগঠক আবুল হুসেনকে তাঁর রচনার জন্যে নবাব বাড়িতে ডেকে নিয়ে বিচারের সম্মুখীন করা হয় এবং অপমান করা হয়। অথচ ওই আন্দোলনের লক্ষ্য ছিলো ধর্মের বিরোধিতা নয়, মুসলমান সমাজকে আলোকিত করা, অনাচারজর্জর পশ্চাদপদ অবস্থা থেকে যুক্তিপূর্ণ অগ্রগতির পথে চলতে সহায়তা দেয়া। অন্ধ প্রতিক্রিয়াশীলতা সমাজকে পেছনে অন্ধকারে আটকে রাখতে চেয়েছিলো, তাই তারা সমাজের পক্ষে যক্তিপূর্ণ কোনো শুভাকাক্সক্ষা সহ্য করতে চায়নি। অন্যদিকে, সাম্প্রদায়িক বিভক্তির ফলে যে পরিস্থিতির উদ্ভব হয় তা আমরা আগেই উল্লেখ করেছি। সে কারণে গণ্ডিবদ্ধ ও গোষ্ঠিগত তৎপরতাও তখন ছিলো অনেক গুরুত্বপূর্ণ ও সাহসের পরিচায়ক। সে জন্যে সেসময়ের পরিপ্রেক্ষিতে তাঁদের কীর্তি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা উচিত।

এমনই একটা ছোট গোষ্ঠি– ‘অগ্রণী শিল্পী সংঘ’সংগঠিত হয়েছিলো ১৯৫১ সালে। এর সংগঠককর্মী ছিলেনআবদুল্লাহ আল মুতি শরফুদ্দিন, অজয় বর্মণ, আবদুল করিম, মন্টু খান, নাসীম আলী, ফওজুল করিম, সালেহ আহমেদ, মাসুদ আলী খান, আবদার রশীদ, আবদুর রাজ্জাগ, প্রমুখ। এই কর্মীদের অনেকেই গোপন পার্টির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এসংগঠন বেশিদিন সক্রিয় ছিলো না। এঁদের দুএকজন বাদে প্রায় সকলেই নানা পেশায় যোগ দেন এবং কেউ কেউ পেশাজীবনে সাফল্য ও খ্যাতিও অর্জন করেন।

এই সময়ের বহুল আলোচিত নাটক ‘কবর’। জেলখানায় এ নাটক রচনায় মুনীর চৌধুরীকে প্রণোদনা দিয়েছিলেন কমিউনিস্ট কর্মী ও বুদ্ধিজীবী রণেশ দাশগুপ্ত। ‘কবর’ নাটক নিয়ে আলোচনার সময় এ সত্যটি প্রায় সকলেই উপেক্ষা করেন। প্রত্যেক ঘটনার পেছনে একটা ইতিহাস থাকে। তাকে উপেক্ষা করা বা বিস্মৃত হওয়া অন্যায়। ‘কবর’ নাটক মৌলিক রচনা নয় বলে সমালোচনা আছে। আরউইন শ’র বেরি দ্য ডেডএর রূপান্তর বা ছায়া অবলম্বনে রচিত বলে কেউ কেউ মন্তব্য করেছেন। বেরি দ্য ডেড অনুবাদ করেছেন কলকাতায় উৎপল দত্ত আমরা কবরে যাব না নামে। ঢাকায় জামালউদ্দিন হোসেন অনুবাদ করেছেন কবর দিয়ে দাও নামে। সেটি মঞ্চায়িত হয়েছে আতাউর রহমানের পরিচালনায়।

কবর’ সম্পর্কে সমালোচনা যাই থাকুকসে সময় কারাগারে ওই নাটক রচনা করা ও সেখানেই বন্দীরা মিলে অভিনয় করার ঘটনা যে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ইতিহাসে অচিন্তিতপূর্ব এক ঘটনা তাতে সন্দেহ প্রকাশের কোনো অবকাশ নেই্। এমনটা পরে আর হয়েছে বলে আমাদের জানা নেই। তবে সে সঙ্গে এটাও আমাদের স্মরণ রাখতে হবে যে, ‘কবর’রচয়িতা মুনীর চৌধুরী পরে সামরিক স্বৈরাচারী রাষ্ট্রশক্তির সেবা দিয়েছিলেন। স্বৈরাচরী শাসক আইয়ুব খানের ভাষণ পর্যন্ত তিনি অনুবাদ ও সম্পাদনা করেছিলেনে। সেটি প্রকাশ করেছিলো ‘বিএনআর’।

পাকিস্তান সাহিত্য সংসদ’ গঠিত হয়েছিলো ১৯৫২ সালে। সে সময় ঢাকায় কমিউনিস্ট পার্টির সাথে যুক্ত ছিলেন এবং সাধারণভাবে প্রগতিশীলএমন উভয় ধরনের লেখক শিল্পীরা যোগ দিয়েছিলেন এই সংগঠনে। এঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সৈয়দ নূরুদ্দীন, সরদার জয়েনউদ্দীন, মনজুর মোর্শেদ, কামরুল হাসান, আব্দুল গনি হাজারী, শামসুর রাহমান, মুস্তাফা নূরউল ইসলাম, অজিত গুহ, হাসান হাফিজুর রহমান, প্রমুখ। ‘সংসদ’এর সভাপতি ছিলেন ড. কাজী মোতাহার হোসেন। সাধারণ সম্পাদক ফয়েজ আহমদ। ‘সংসদ’এর নিয়মিত সাহিত্য সভা হতো পাটুয়াটুলীর সওগাত কার্যালয়ে। সওগাতসম্পাদক ‘মোহাম্মদ নাসিরুদ্দীন সভায় যোগদানকারীদের নাস্তা ও চা খাওয়াতেন’। ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারি হলে অসংখ্য রাজনৈতিক নেতা ও কর্মীর সাথে সাথে ‘সংসদ’এর সাধারণ সম্পাদক ফয়েজ আহমদও কারারুদ্ধ হন। ফলে সংসদ সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। স্বৈরাচারী শাসকদের কাছ থেকে উচ্ছিষ্ট পাবার লোভে সুবিধাবাদের জোয়ারে অধিকাংশ লেখকশিল্পীবুদ্ধিজীবী ভেসে যাবার ফলে ১৯৬৩ সালে ‘সংসদ’ পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ আর সফল হয়নি।

পঞ্চাশের দশকে পুর্ব বাংলায় সাংস্কৃতিক আন্দোলনে উল্লেখযোগ্য তেমন সংগঠিত উদ্যোগ আর লক্ষ্য করা যায় না। শাসক দল মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক দলগুলোর ‘যুক্তফ্রন্ট’ গঠন ও ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে ‘যুক্তফ্রন্ট’এর অভাবিতপুর্ব বিজয় একটা অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করেছিলো ঠিকই কিন্তু অর্থনৈতিক শক্তিতে দুর্বল বাঙালি মুৎসদ্দিশ্রেণীর অপরিপক্ক রাজনৈতিক শক্তি নিজেদের মধ্যে ক্ষমতা ও লুটপাট নিয়ে খেয়োখেয়িতে এমন মত্ত হয়েছিলো যে, জনগণের প্রত্যাশা ও ভরসা নৈরাজ্যের অন্ধকারে তলিয়ে যায়। তারই সুযোগ নেয় পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী। কায়েম করে স্বৈরাচারী শাসন ১৯৫৮ সালে।

ষাটের দশকের শুরুতে ছাত্রতরুণদের, বিশেষকরে শিক্ষাঙ্গনে, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন নতুন করে জাগরণের সূচনা করে। গোটা ষাটের দশক আমাদের ইতিহাসে চিহ্নিত হয়ে আছে ‘গণজাগরণের দশক’ হিসেবে। কেবল আমাদের দেশে নয়, এই দশক সারা দুনিয়াব্যাপী তরুণশক্তির উত্থান ও আলোড়নের দশক ছিলো। এই দশকের প্রথম দিকে সর্বহারা শ্রেণীর মতাদর্শগত আন্তর্জাতিক বিতর্ক শুরু হয়ে মধ্যবর্তী সময়ে ‘আন্তর্জাতিক মহাবিতর্ক’এর রূপ নেয় এবং তার ফল হিসেবে বিশ্বব্যাপী সর্বহারা শ্রেণীর রাজনৈতিক শক্তি ‘মস্কো’ ও ‘পিকিং’ এই দুই কেন্দ্র অনুসরণে বিভক্ত হয়ে যায়। পূর্ব বাংলার দুর্বল ও অপরিপক্ক শক্তিও সে বিভক্তির শিকার হয়।

বিভক্তির অভ্যন্তরীণ কারণগুলো বিবেচনা করা খুবই জরুরি তবে সে দায়িত্ব রাজনৈতিক তাত্ত্বিকদের। তারাই সঠিক মূল্যায়ণ করতে পারবেন এবং তাদের তা করতে হবে। আমাদের অর্থাৎ বুদ্ধিজীবী বা সংস্কৃতিআন্দোলনের কর্মীদের পক্ষে সেটা সম্ভব নয়। আমরা শুধু এ পর্যবেক্ষণটুকু উল্লেখ করতে চাই যে, সে সময় সর্বহারা শ্রেণীর রাজনৈতিক শক্তি বিভ্রান্তি ও সুবিধাবাদে নিমজ্জিত হয়েছিলো। আন্তর্জাতিক মহাবিতর্কের অভিঘাতে যে নতুন প্রাণশক্তির অভ্যুদয় ঘটে তাকে ধারণ করার পরিপক্কতা, যোগ্যতা ও সামর্থ্যসে শক্তির ছিলো না। ফলে ওই বিভক্তি ছিলো অনিবার্য। মস্কোপন্থী ভাগ শ্রেণী সহযোগিতার নীতির অনুসরণে উদীয়মান বাঙালি মুৎসুদ্দি বুর্জোয়া ও পেটিবুর্জোয়াদের রাজনৈতিক শক্তি আওয়ামী লীগের ছায়াতালে থাকা তাদের ইতিহাস নির্ধারিত কর্তব্য বলে বিবেচনা করে। [তেমন কর্তব্যচেতনার ধারাবাহিকতা আজো মূলতই বজায় আছে।] ‘পিকিংপন্থী’ ভাগ বিপ্লবের ঝান্ডা উড়িয়েছিলো ঠিকই এবং নবজাগ্রত বিপুল তরুণশক্তিকে দুবাহু বাড়িয়ে সংবর্ধিতও করেছিলো। কিন্তু এই শক্তিকে ধারণ করা ও তাকে দুনিয়া বদলাবার অমিত শক্তিতে বিকশিত করার যোগ্যতার ও সামর্থের প্রমাণ তারা দিতে পারেনি। তার ফলে কলকারখানা, জল ও স্থলের পরিবহণ এবং অন্যান্য ক্ষেত্রের শ্রমজীবী ও মেহনতকারী, আখ ও পাটচাষীসহ সমগ্র কৃষক জনগণের সঙ্গে শহরবাসী মধ্যবিত্তদের যে বিশাল সংগ্রামী উত্থান ও ঐক্য ঘটেছিলো তা উঠতি বাঙালি মুৎসুদ্দিশ্রেণীর উগ্রজাতীয়তাবাদের খপ্পরে চলে যায়। আর অন্যদিকে যোগ্য হয়ে উঠতে না পারার ফলে, বিশেষকরে তরুণদের মধ্যে, অসহিষ্ণুতা ও অস্থিরতা, অবিশ্বাস ও অনাস্থা, বিভিক্তি ও পুনরবিভক্তির বিরামহীন ধারার জন্ম দেয়। সে ধারা আজো বহমান।

লাল পতাকার রাজনৈতিক শক্তির এমন অবস্থার ফলে সাংস্কৃতিক আন্দোলনে বড়ো কোনো সংগঠিত উদ্যোগ কি করে সম্ভব হতে পারে? হয়ওনি। ঢাকায় এবং বিভিন্ন জেলা শহরে কেবল ছোট ছোট গোষ্ঠিউদ্যোগ আমরা লক্ষ্য করি।

ষাট দশকের মাঝামাঝি লাল পতাকার রাজনৈতিক শক্তির বিভক্তির পূর্বে ‘রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষ’ উদযাপন উপলক্ষে লেখকশিল্পীবুদ্ধিজীবীদের একটা বড়ো ধরনের সমাবেশ ঘটেছিলো ১৯৬১ সালে। এতে কমিউনিস্ট পার্টির সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত কর্মীদের ভূমিকা ছিলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই সমাবেশ অসাম্প্রদায়িক চেতনা সৃষ্টি ও বিকাশে প্রেরণাদানকারী ঘটনা হিসেবে ইতিহাসে চিহ্নিত। এর পরপরই সংগঠঠিত হয় ‘ছায়ানট’মূলত কমিউনিস্ট কর্মীদের উদ্যোগে। তবে ‘ছায়ানট’ আন্দোলনের সংগঠনের পরিবর্তে প্রধানত রবীন্দ্রচর্চার প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায় এবং মধ্যবিত্তের উদারনৈতিক চেতনার সেবা দিয়েছে। বর্তমানে সাম্রাজ্যবাদের দালাল ধনিক শ্রেণী নিয়ন্ত্রিত সংস্কৃতির সেবক প্রতিষ্ঠান হিসেবে তার ভূমিকা পালন করছে।

লেখক ও শিল্পীদের গোষ্ঠি ‘সৃজনী’ ১৯৬০ সালে সংগঠিত হয় ‘সৃজনী সাহিত্যিক গোষ্ঠী’ নামে। ১৯৬৩ সালে নাম বদলে হয় ‘সৃজনী লেখক ও শিল্পী গোষ্ঠী’। এবছর গৃহীত তার ‘ঘোষণা’য় বলা হয়েছিলো:

সৃজনীর লেখক ও শিল্পীরা সবসময় মনে রাখে যে তাদের প্রত্যেকের যেমন স্বতন্ত্র ও চিহ্নিত ব্যক্তি সত্তা বা ভূমিকা ও প্রতিভা রয়েছে, তেমনি তারা প্রত্যেকেই সর্বসাধারণের অবিভাজ্য অংশ।

সৃজনী জীবনের জয়গান করে। অপরাজেয় আশাবাদীধ্বংস ও মৃত্যুর কুৎসিৎ ভ্রূকুটি তাকে স্তব্ধ করে দিতে পারে না।

অতি জাতীয়তাবাদ কিংবা তথাকথিত বিশ্বপ্রেমিকতাকে সে কাছে ঘেঁষতে দেয় না। প্রতিক্রিয়ার সাথে সংঘাতকে অবশ্য এড়িয়ে চলবে না সৃজনী।

প্রতিভার ছলে কখনও আত্মপ্রবঞ্চনা করবেনাসে জানেবিকৃতিতে ঘটবে তার বিচ্যুতি।

সৃজনী’ প্রতিষ্ঠায় ছিলেন অজয় গুপ্ত, ইমরুল চৌধুরী, নিয়ামত হোসেন, আবু নাহিদ, মাসুদ আহমেদ, কবি ইউসুফ পাশা, হেদায়েত হোসাইন মোর্শেদ, প্রমুখ। কিছু পরে যোগ দেনশুভ রহমান, মাহবুব তালুকদার, জিয়া আনসারী, ওয়াজেদ মাহমুদ, সোলায়মান এবং আরো পরে মোজাম্মেল হোসেন মন্টু, প্রমুখ।

সৃজনী’ একুশে ফেব্রুয়ারি ও মে দিবস উপলক্ষে বেশ কয়েকটি সংকলন প্রকাশ করে। ১৯৬৭ সালে সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পঞ্চশ বছর পূর্তি স্মরণে প্রকাশিত ‘জয়ধ্বনি’ সংকলন সংগঠনের ‘লেখকদের ইতিহাসচর্চা ও সমাজবিকাশের গতিধারা সম্পর্কে গভীর অনুশীলনের ফসল’ হিসেবে বিবেচিত। তেমনি তাদের নাট্যচর্চায় ১৯৬৮ সালে ম্যক্সিম গোর্কির জন্মশতবর্ষ উদযাপন উপলক্ষে ‘মা’ মঞ্চায়ন, সে সময় পত্রপত্রিকায় ‘এক যুগান্তকরী ঘটনা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিলো। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের সমন্বয়ে ‘গোর্কি জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন কমিটি’র মঞ্চে অভিনিত গোর্কির জগৎবিখ্যাত ‘মা’ উপন্যাসের নাট্যরূপ দিয়েছিলেন মোজাম্মেল হোসেন মন্টু ও সোলায়মান। আরো কয়েকটি নাটক তারা মঞ্চায়ন করেছে। এছাড়া বিস্মৃতির অন্ধকার থকে সোমেন চন্দকে আলোয় তুলে আনার প্রথম কৃতিত্ব ‘সৃজনী’র। ষাটের দশকে ঢাকার লেখকশিল্পীদের মধ্যে বিশেষ অবস্থান তৈরি হয়েছিলো এ সংগঠনের।

সৃজনী’র সকল কার্যক্রম ঢাকা শহরকেন্দ্রিক মধ্যবিত্ত গন্ডিতে আবদ্ধ ছিলোসে গন্ডি ভাঙার অঙ্গিকার থাকলেও বাস্তবে সম্ভব হয়নি। রাজনৈতিক বিভক্তির পর ‘সৃজনী’ ‘মস্কোপন্থী’ ধারার সঙ্গে যুক্ত ছিলো। অবশ্য গোপন পার্টির সাংস্কৃতিক ফ্রন্ট হিসেবে সংগঠিত ও পরিচালিত হতো কিনা তা আমাদের পক্ষে জানা সম্ভব হয়নি। তবে উদ্যোক্তাদের ও অগ্রগামী কর্মীদের অনেকেই পার্টিকর্মী ছিলেন। প্রফেসার আনিসুজ্জামান, রণেশ দাশগুপ্ত, সন্তোষ গুপ্ত, বদরুদ্দীন উমর প্রমুখ ‘সৃজনী’র তৎপরতার সঙ্গে কোনো না কোনো পর্যায়ে, কোনো না কোনোভাবে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। এই সংগঠনের সাথে এমন অনেকেই যুক্ত হয়েছিলেন যারা পরে ভাগ্য ও সুবিধে অন্বেষণে নিজেদেরকে করুণার পাত্রে পরিণত করেছেন। এখনো ‘সৃজনী’র নামে সাহিত্যসভা হয়ে থাকেতবে তার চরিত্র সম্পূর্ণ বদলে গেছে এবং অন্যকেনো তৎপরতাও নেই।

এরপরের উল্লেখযোগ্য সংগঠন ‘ক্রান্তি শিল্পী গোষ্ঠী’, নবগঠিত ‘পিকিংপন্থী’ ধারার রাজনৈতিক কেন্দ্রের অনুমোদনেই এটি সংগঠিত হয়। প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন ডাকা শহরের পার্টি সংগঠক আবদুস সামাদ খান মুকুল। তাঁরই প্রস্তাবে প্রথমে সাতজনকে নিয়ে এর সাংগঠনিক তৎপরতা শুরু হয় ১৯৬৬ সালের মধ্যবর্তী সময়ে। আবদুস সামাদ খান মুকুল ছাড়া বাকী ছয়জন হলেনঅধ্যাপক রফিকুল ইসলাম, কামাল লোহানী, কামাল আমেদ, জহিরুল ইসলাম, শেখ আবদুল জব্বার ও মহসিন শস্ত্রপাণি। প্রায় ছমাস ধরে অনেকটা গোপনে নারিন্দায় জহিরুল ইসলামের মেসে আলাপ আলোনা চালাবার পর বেশ আড়ম্বরের সাথেই ‘ক্রান্তি’র প্রতিষ্ঠা হয় ১৯৬৭ সালের জানুয়ারি মাসে, সেগুনবাগিচার এক বাড়িতে। সভাপতি ব্যারিস্টার পারভেজ। প্রথম সহসভাপতি অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম। অন্য সহসভাপতিরা হলেনখান আতাউর রহমান (সংগীত ও চলচ্চিত্র পরিচালক, অভিনেতা), আলতাফ মাহমুদ (সংগীত পরিচালক, প্রচলিত একুশে ফেব্রুয়ারি সংগীতের সুরকার), গায়ক ও সুরকার আবদুল লফিত, শেখ লুৎফর রহমান, প্রমুখ। সাধারণ সম্পাদক কামাল লোহানী। যুগ্মসম্পাদক আতাউর রহমান (অভিনেতা ও নাট্য পরিচালক হিসেবে খ্যাত)। ১৯ বা ২১ সদস্যের কার্যকরী কমিটির সদস্যদের মধ্যে ছিলেন আবদুস সামাদ খান মুকুল, কামাল আমেদ, আবদুল মতিন (সাংবাদিক), অজিত রায়, জহিরুল ইসলাম, ইন্দু সাহা, এডভোকেট লুৎফে আলম, মহসিন শস্ত্রপাণি, প্রমুখ। প্রতিষ্ঠার দিনের পরে সভাপতিকে আর পাওয়া যায়নি। পার্টি কেন্দ্রের পক্ষ থেকে গোপনে ‘ক্রান্তি’ পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছিলেন আবদুল হক। প্রকাশ্য দায়িত্ব ছিলো নূরুল হুদা মির্জার ওপর। তবে আবদুল হক বা নূরুল হুদা মির্জা কেউই প্রকৃতপক্ষে কোনো দায়িত্ব পালন করেননি। এজন্যে ব্যক্তিগতভাবে তাঁরা দায়ী নন, দায়ী পার্টি কেন্দ্র।

আড়ম্বরের সাথে প্রতিষ্ঠা হলো। দুএকটা গানের, নৃত্যনাট্যের ও নাটকের অনুষ্ঠানও হয়েছে বেশ জমকালোভাবে। তবে লাল পতাকার নিচে সাংস্কৃতিক আন্দোলন পরিচালনার মতো যোগ্য হয়ে গড়ে উঠতে পারেনি। ‘ক্রান্তি শিল্পী গোষ্ঠী’ ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন গ্রুপ) ও শ্রমিক আন্দোলনের কয়েকজন নেতার তরফ থেকে যথেষ্ট সহযোগিতা পেয়েছিলো। যা পায়নি তাহলো মতাদর্শগত দিশা ও সংগঠন পরিচালনার যোগ্য কর্মী। তাই কেবলমাত্র একটা গানের টিমের ওপর নির্ভর করে কয়েক বছর টিকেছিলো ‘ক্রান্তি’। পরবর্তীকালে সুবিধাবাদী ও সুযোগ সন্ধানীদের খপ্পরে পড়ে যায় এবং তাদের খপ্পরেই আছে আজো।

প্রতিষ্ঠার বছরে ১৯৬৭ সালে বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে ‘ক্রান্তিবর্ষবরণ ১৩৭৪’ নামে একটা ছোট সংকলন প্রকাশ করেছিলো। আর কোনো প্রকশনার খবর আমাদের জানা নেই। সংকলনের সম্পাদক ছিলেন অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম। প্রকাশক ‘ক্রান্তি শিল্পী গোষ্ঠী’র পক্ষে কামাল লোহানী।

ক্রান্তি’র আদর্শ উদ্দেশ্য বিষয়ে ‘আমাদের কথা’ শিরোনামে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে বলা হয়েছে:

দেশ বলতে বোঝায় মানুষ। সংগ্রামী মানুষ। ওরাই সভ্যতার নিয়ন্তা, ইতিহাসের স্রষ্টা। এদের সংগ্রামী জীবনের অভিব্যক্তির রূপায়ন বিধৃত হয় শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতিতে। তাই সংস্কৃতি জনজীবনের দর্পণ।

প্রয়োজন মানুষের দৈনন্দিন জীবন প্রবাহের নতুন ও উন্নত রূপ সাধন। ভিয়েতনামে চলছে মৃত্যুঞ্জয় জনতার বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধ সংগ্রাম। পৃথিবীর তিন মহাদেশ জুড়ে আজ শোনা যাচ্ছে শোষিত জনতার অগ্রাভিযানের তুর্যনাদআমাদের দেশের শিল্পে সংগীতে কবিতায় নাটকে আমরা রূপায়িত করার প্রয়াস পাব এই জনমানস বিশ্ববিক্ষণকে।’

এছাড়া গণসাংস্কৃতিক আন্দোলনের কর্মী সৃষ্টি করা; জনজীবনে সংগ্রামী দেশাত্মবোধ জাগ্রত করা; লোক সংস্কৃতিকে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে পুনরুজ্জীবিত করা ও তাকে বর্তমানের আলোকে সুপ্রতিষ্ঠিত করা এবং সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রাম চালানোপ্রভৃতি লক্ষ্য উল্লেখ করা হয়।

সংকলনে প্রকাশিত হয়েছিলো– ‘চীনের আধুনিক সংস্কৃতি’আহমেদ হুমায়ুন, কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের রচনা– ‘চট্টগ্রামের কবিয়াল’ (সংকলিত); ‘আর্থিক দৃষ্টিতে নববর্ষ’বিনোদ দাশগুপ্ত এবং কবিতাসন্তোষ গুপ্ত, বুলবুল খান মাহবুব, এম মহিউদ্দিন এবং বারবারা বিডলার [হাইফংএর অরণ্যে নামাপ বোমা’ শিরোনামে ১২ বছর বয়সী আমেরিকান মেয়ের এই কবিতাটি আমেরিকায় স্কুল ছাত্রছাত্রীদের জন্যে প্রকাশিত পত্রিকা ‘ভেনচার’এ প্রকাশিত হয়। ভিয়েতনামে আমেরিকার বর্বরতা স্বচক্ষে দেখে ঘৃণাজর্জরিত হৃদয়ে কবিতাটি রচনা করে বারবারা।] আর সংকলনের শুরুতে ছিলো রমেশ শীলের একটি গীতিকবিতা।

ক্রান্তি’তে তাদের কিছু করার সুযোগ নেই ভেবে কবি ইন্দু সাহা ও কথাসাহিত্যিকার জহিরুল ইসলাম অসন্তুষ্ট হয়ে সংগঠন ত্যাগ করেন। এছাড়া লাল পতাকার গোপন রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে উপদলীয় তৎপরতার ছায়াপাতও ঘটে ‘ক্রান্তি’র উদ্যমী ও সক্রিয় কর্মীদের ওপর।

এ অবস্থায় কেবল কবি, লেখক ও কর্মীদের নিয়ে একটি আলাদা সংগঠন করার চিন্তা করেন আবদুস সামাদ খান মুকুল। জহিরুল ইসলাম ও আরো দুএকজন একই রকম চিন্তা করছিলেন। তারই ফল হিসেবে সংগঠিত হয় ‘উন্মেষ সাহিত্য সংসদ’। মূল উদ্যোক্তা ও সংগঠক আবদুস সামাদ খান মুকুল। প্রতিষ্ঠার দুবছর পর সংগঠনের নামের সাথে ‘সংস্কৃতি’ শব্দটি যোগ করে নামকরণ করা হয় ‘উন্মেষ সাহিত্যসংস্কৃতি সংসদ’। বাংলা বাজার এলাকায় কবি ইন্দু সাহার বাসায় ১৯৬৮ সালের মার্চ মাসের প্রথম দিকে অনুষ্ঠিত এক কর্মীসভায় ‘উন্মেষ’ গঠিত হয়। প্রথম সভাপতি জহিরুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক কবি ইন্দু সাহা। সংগঠনের প্রায় সকল কর্মীই বয়েসে তরুণ এবং কোনো না কোনোভাবে প্রকাশ্য বা গোপন কেন্দ্র পরিচালিত রাজনৈতিক আন্দোলনের সাথে জড়িত ছিলো। জহিরুল ইসলাম ও ইন্দু সাহা ছাড়া আর কারো কোনো প্রকাশনা তখনো পর্যন্ত ছিলো না। পত্রপত্রিকাসংকলনে কারো কারো কবিতা ছড়া গল্প কিছু কিছু প্রকাশিত হয়েছে।

প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই ‘উন্মেষ’ তরুণ কবিলেখকদের অনুশীলনের কেন্দ্র হিসেবে ভূমিকা পালন করেছে। তবে আন্দোলনমুখিতা ছিলো এই সংগঠনের সবচেয়ে বড়ো বৈশিষ্ট্য। সমমনা বা কাছকাছি চিন্তার সংগঠন বা গেষ্ঠির সাথে মিলিতভাবে আন্দোলনে বেশি জোর দিয়ে এসেছে সব সময়। ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ ও ‘মে দিবস’ উপলক্ষ করে অনেকগুলো সংকলন প্রকাশ করেছে ‘উন্মেষ’। সে সব সংকলন সবগুলো যে মানসম্মত ছিলো তা বলা যাবে না। ১৯৭০৭১ এই দুবছর কয়েকটি নাকটনাটিকা তারা মঞ্চায়ন করেছে। আটষট্টিউনসত্তরের গণআন্দোলনের একদিনের হরতালের ঘটনা নিয়ে এই সংগঠন প্রথম নাটিকা– ‘মহাবিপ্লবের পদধ্বনি’মঞ্চায়ন করে পল্টন ময়দানের খোলা মঞ্চে ১৯৭০ সালের ৩০ জানুয়ারি। আটষট্টিউনসত্তরের গণআন্দোলনের পটভূমিতে প্রথম উপন্যাস ‘উন্মেষ’এর সভাপতি জহিরুল ইসলামের ‘অগ্নিসাক্ষী’।

পল্টন ময়দানের খোলা মঞ্চে অভিনীত নাটিকা সম্পর্কে প্রশংসা করে দৈনিক পাকিস্তান পত্রিকায় লিখেছিলেন তরুণ সাংবাদিক [বর্তমানে খ্যাতিমান ‘মিডিয়া ব্যক্তিত্ব’] মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর। এই সংগঠন ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের পর থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় ছিলো। চুয়াত্তর সালে পুনর্গঠনের পর থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময় ধরে খুবই সক্রিয় ছিলো এবং এই সময়কালে প্রায় সকল সম্মিলিত আন্দোলনে অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। বর্তমানে এর সক্রিয়তা প্রায় নেই বললেই চলে।

উন্মেষ’এর অনুশীলনে ও আন্দোলনে জড়িত ছিলেন এমন যারা কমবেশি পরিচিতি ও খ্যাতি পেয়েছেন তাদের মধ্যে কবি সমুদ্র গুপ্ত, মুনীর সিরাজ, মতিন বৈরাগী, কাজী মনজুর, ছড়াকার আবু সালেহ, রেজউদ্দীন স্টালিন ও দারা মাহমুদ এবং আবৃত্তিশিল্পী কামরুল হাসান মঞ্জু। দীর্ঘ সময় ধরে প্রধান সংগঠকের দায়িত্ব পালন করেছেন মহসিন শস্ত্রপাণি। এক সময় যশোর, খুলনা, ময়মনসিংহ, কিশোরগঞ্জ, গৌরিপুর, চট্টগ্রাম প্রভৃতি স্থানে শাখা সক্রিয় ছিলো। শহরের শ্রমিক এলাকায় ও গ্রামাঞ্চলেও অনেক আলোচনা সভা, কবিতা ও ছড়া পাঠ, সংগীত ও নাট্যানুষ্ঠান করেছে এ সংগঠন রাজনৈতিক কর্মীদের সহযোগিতায়। মোটকথা, সংগ্রামী জনগণের জীবনের সাথে ঘনিষ্ঠ হওয়ার ও তাদের জীবন থেকে শিক্ষা নেবার চেষ্টা এ সংগঠন খুবই করেছে। আটষট্টিউনসত্তরের গণআন্দোলনে সংগঠনের কর্মীরা সংগ্রামী জনগণের মধ্যেই ছিলো সব সময়। সংগঠনের প্রথম সভাপতি জহিরুল ইসলাম ১৯৭১ সালের ২ এপ্রিল বুড়ীগঙ্গার দক্ষিণপারে পাকিস্তান সেনাবাহিনী হামলা চালালে চুনকুটিয়া গ্রাম থেকে নিখোঁজ হন।

লাল পতাকার রাজনৈতিক শক্তির কোনো অংশের সিদ্ধান্তক্রমে বা নির্দেশে ‘উন্মেষ’ সংগঠিত হয়নি। তবে এ সংগঠনের অনেকেই ওই শক্তির একটি কেন্দ্রর সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন বলে তাদের নেতা ও কর্মীদের পৃষ্ঠপোষকতা ও সহযোগিতা পেয়েছে সব সময়। সে বিচারে এ সংগঠন লাল পতাকার নিচে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ হিসেবেই বিবেচিত। এর দুএকজন অগ্রণী কর্মীর পরিচালনায় উন্মেষ নামে একটা মাসিক পত্রিকা ১৯৭৯ সাল থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত প্রায় দশ বছর চালু ছিলো।

উন্মেষ’এর কয়েক মাস পরে ১৯৬৮ সালে সংগঠিত হয় ‘উদীচী’ কমিউনিস্ট কথাসাহিত্যকার সত্যেন সেনএর নেতৃত্বে। তিনিই ছিলেন এর প্রধান উদ্যোক্তা। সে সময় সত্যেন সেন ও সংগঠনের সকল কর্মীই ‘মস্কোপন্থী’ ধারার সাথে যুক্ত ছিলেন। ফলে ওই ধারার রজনৈতিক মতাদর্শের অর্থাৎ বাঙালি মুৎসুদ্দি বুর্জোয়াশ্রেণীর সাথে সহযোগিতার রাজনীতির অধীনেই থেকেছে সব সময়। এর ফলে লাল পতাকার মতাদর্শের কথা মুখে বললেও বাস্তবে বুর্জোয়া উদারনৈতিক মতাদর্শের গণ্ডিতেই আটকে আছে। সে গণ্ডি ভাঙার কোনো চেষ্টা কখনোই দেখা যায়নি। বর্তমানে দেশে ও বিদেশে মিলিয়ে তিনশোর অধিক শাখা সক্রিয় আছে এবং বুর্জোয়া উদারনৈতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্থিত হয়েছে আর আওয়ামী লীগের রাজনীতির সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক সুযোগসুবিধে ও সহযোগিতাপৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে থাকে।

ষাট দশকের, ঢাকার বাইরের, একটা উল্লেখযোগ্য সংগঠন খুলনার ‘সন্দীপন’। সংগঠিত হয়েছিলো ১৯৬৩ সালে। প্রথম সভাপতি ছিলেন প্রাক্তন স্পীকার আবদুল হাকিম। এর সাথে জড়িত ছিলেন সুরকার ও গায়ক সাধন সরকার, নাজিম মাহমুদ, কথাসাহিত্যকার হাসান আজিজুল হক, কবি ও কথাসাহিত্যকার আবুবকর সিদ্দিক, প্রমুখ। প্রধান উদ্যোক্তা ও প্রধান সংগঠক ছিলেন খালেদ রশীদ গুরু। এই সংগঠনে যুক্ত হয়ে কবি আবুবকর সিদ্দিক রচনা করেছিলেন তাঁর বিখ্যাত সব গণসংগীত আর সুর দিয়েছিলেন সাধন সরকার। সেসব গান কেবল খুলনায় নয়, ঢাকায় এবং অন্য অনেক জায়গায় গণসংগীত শিল্পীরা তাদের কন্ঠে তুলে নিয়েছিলেন।

সন্দীপন’এর খালেদ রশীদ গুরু ছিলেন সাক্রিয় কমিউনিস্ট কর্মী এবং ‘পিকিংপন্থী’ ধারার একটি অংশের জেলা পর্যায়ের অন্যতম নেতা। তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রথম দিকে [ ১৯৭১ সালের এপ্রিলমে (?) ] খুলনার ডুমুরিয়া এলাকায় পাক বাহিনীর সাথে যুদ্ধের ময়দানে শহীদ হন। এরপর ‘সন্দীপন’এর তেমন কোনো তৎপরতা আর বজায় থাকেনি। এছাড়া পূর্ব বাংলার প্রায় সর্বত্র শহরগুলোতে ছোট ছোট গোষ্ঠি জনগণের সংগ্রামের সহযোগী শক্তি হিসেবে তৎপরতা ষাট দশকে যেমন চালিয়েছে আজো তেমন তৎপরতা জারি রেখেছে, ভবিষ্যতেও থাকবে তাতে আমাদের কোনো সন্দেহ নেই।

ষাট দশকে প্রগতিশীল লেখালেখির দিকটা একটু স্মরণ করা যেতে পারে। বিশেষকরে, যেসব রচনা তরুণ শক্তিকে উৎসাহ ও প্রেরণা দিয়েছে। কথা সাহিত্যে সত্যেন সেন ও শহীদুল্লাহ কায়সারএর উপন্যাস; রণেশ দাশগুপ্তর মননশীল রচনাবলী; বদরুদ্দীন উমরএর বিশেষকরে তাঁর সাম্প্রদায়িকতার চরিত্রবৈশিষ্ট্য উন্মোচনকারী রচনাবলী; আবুল কাসেম ফজলুল হকএর রচনা, বিশেষকরে তাঁর কালের যাত্রার ধ্বনি’র কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এর সাথে উল্লেখ করতে হয় বদরুদ্দীন উমরএর গবেষণাগ্রন্থ পুর্ববাংলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি। এমন সব কথাসাহিত্য ও মননশীল রচনাবলী ষাটের দশকে সমাজের সচেতন অগ্রগামী তরুণশক্তির নিত্য পাঠ ও আলোচনার বিষয় হিসেবে আদৃত হয়। কবি ইন্দু সাহা, বুলবুল খান মাহবুব ও গগন তানু, প্রমুখএর কবিতাও খুবই আদৃত হয়েছিলো।

ষাট দশকের প্রথম দিকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক জনতা ও শেষের দিকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক গণশক্তি লাল পতাকার চেতনা বিকাশে ও জনগণের মুখপত্র হিসেবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

 

আমরা আগেই বলেছি, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে ভারতের বিভিন্ন জাতিসত্তার জনগণের স্বাধীনতা ও জাতীয় মুক্তির আকাক্সক্ষা সে সময়ের লাল পতাকার রাজনৈতিক শক্তি অনুধাবন করতে ব্যর্থ হওয়ায় স্বাধীনতার পতাকা চলে যায় সামন্ত মুৎসুদ্দিশ্রেণীর রাজনৈতিক শক্তির হাতে। সে শক্তি তার শ্রেণীচরিত্র অনুযায়ী ঔপনিবেশিক শাসকশক্তির সাথে আপস করার ফলে দেশ বিভক্ত এবং জনগণ স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের নামে প্রতারণার শিকার হয়। তেমনি প্রায় একই রকম ঘটনা ঘটে পূর্ব বাংলায়। পূর্ব বাংলার জনগণের স্বাধীনতা ও জাতীয় মুক্তির আকাক্সক্ষা লাল পতাকার রজনৈতিক শক্তি অনুধাবন করতে পারেনি। তার ফলে স্বাধীনতা ও জাতীয় মুক্তির পতাকা চলে যায় সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থের সাথে গাঁটছড়া বাঁধা বাঙালি মুৎসদ্দিশ্রেণীর রাজনৈতিক শক্তির হাতে। অথচ শোষণমুক্তির দাবির সাথে স্বাধিকারের দাবিতে এবং সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লাল পতাকার রাজনৈতিক শক্তির আন্দোলন পঞ্চাশের দশক থেকে শুরু করে ষাটের দশকে এসে জনগণকে বিপুলভাবে জাগিয়ে তুলেছিলো। কিন্তু অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, বিভাজন ও বিভ্রান্তির কারণে উগ্রজাতীয়তাবাদী শক্তির উত্থান মোকাবিলা করতে পারেনি। ‘পিকিংপন্থী’ বলে চিহ্নিত ও পরিচিত যে অংশগুলো আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে, ভারতের কর্তৃত্বে ও সোভিয়েত ইউনিয়নের সমর্থনৈ স্বাধীনতা সংগ্রামে যোগ দেয়নি তারা স্বাধীনতাবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত ও চিত্রিত হয়। বিশেষকরে, পূর্ব বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রাম চীন সমর্থন না করায় ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের পক্ষে থাকায় এই অংশগুলোর দেশপ্রেম পর্যন্ত প্রশ্নের সম্মুখীন হয়। অথচ তারা দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর বর্বর আক্রমণ প্রতিরোধে সাধ্যমতো সশস্ত্র যুদ্ধ করেছিলো, বাইরের কোনো রকম সাহায্য ছাড়াই। তারাই ছিলো শ্রেষ্ঠ দেশপ্রেমিক, তাদের সকল ভুলত্রুটি ও সীমাবব্ধতা সত্ত্বেও। আর যাদের হাতে দেশপ্রেম ও স্বাধীনতার পতাকা চলে যায় তাদের দেশপ্রেম যে সাম্রাজ্যবাদের ও দেশের শোষকশ্রেণীসমূহের মুনাফাশোষণলুণ্ঠন ও নির্যাতনপ্রেম, সে সত্য আড়ালে চলে যায়।

তার ফল হিসেবে বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর প্রথম দফা আওয়ামী লীগের শাসন বলবৎ থাকা পর্যন্ত লাল পতাকার সংগ্রাম অত্যন্ত দুঃসময়ের মধ্যে পড়ে। রাষ্ট্র পরিচালনকারীদের ও তাদের দলীয় লোকজনের আচরণ ছিলো ফ্যাসিস্তসুলভ। লাল পতাকার গোপন বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে সে সময়ে বিলিকরা প্রচারপত্র ও নানা রকম ছোট ছোট প্রকাশনায় সে সময়ের শাসকশক্তিকে ‘জাতীয় বেইমান’, ‘ফ্যাসিস্ত’ ইত্যাদি বলে আখ্যা দেয়া হতো। রাষ্ট্র নেতা ‘নকশাল দেখলেই গুলি’ করার নির্দেশ জারি করেন এবং প্রকাশ্য জনসভায় ‘লাল ঘোড়া দাবড়ানো’র হুমকি দেন। এছাড়া ‘রক্ষী বাহিনী’ গঠন করে সারা দেশে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা হয়। ‘লাল বাহিনী’ শিল্পকলকারখানায় ও শ্রমিক অঞ্চলে ফ্যাসিস্ত তৎপরতা চালায় ও নৈরাজ্য সৃষ্টি করে এবং লুটপাটের মচ্ছব চলে। তাতে করে শ্রমিকশ্রেণীর মধ্যে কলুষতার ব্যাপক বিস্তার ঘটে। সচেতন শ্রমিকদের পক্ষে কোনো রকম প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। মোটকথা, দেশে এক রুদ্ধশ্বাস পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। লেখকশিল্পীবুদ্ধিজীবীদের মত প্রকাশের সামান্য অধিকারটুকুও অবশিষ্ট ছিলো না। সংবাপত্রগুলোর ওপর কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছিলো। শেষপর্যন্ত ‘বাকশাল’ গঠন করে একদলীয় শাসন কায়েম করা হয়, সরকারের নিয়ন্ত্রণে চারটি রেখে সব পত্রপতিকা বন্ধ করে দেয়া হয় এবং শাসকদল ও তাদের সহযোগীদের প্রধান ধ্বনি হয় ‘এক নেতা এক দেশ, বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ’। এই সময়ে রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র শক্তি ও শাসকদলের নানা রকম সশস্ত্র শক্তির আক্রমণে পঁচিশ হাজারের অধিক বামপন্থী নেতা ও কর্মী প্রাণ হারায় বলে দাবি করা হয়ে থাকে।

এমন শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতেও খণ্ডে খন্ডে বিভক্ত লাল পতাকার শক্তিগুলো জনগণের স্বার্থের পক্ষে তৎপরতা জারি রাখে। লেখকশিল্পীবুদ্ধিজীবীরা সীমিত পরিসরে হলেও নানা রকম অধিকার আন্দোলন সংগঠিত করেছিলো।

জনগণের মধ্যে সাহস ও চেতনা সৃষ্টির লক্ষে ১৯৭৪ সালে পুনর্গঠিত হয় ‘উন্মেষ’। সে সময় এ সংগঠন গোপন একটা কেন্দ্রের সাথে যুক্ত ছিলো। তখন সংগঠনের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন মহসিন শস্ত্রপাণি ও সাধারণ সম্পাদক কবি সমুদ্র গুপ্ত। ১৯৭৪ সালের আগস্টে অনুষ্ঠিত ওই পুনর্গঠন সভায় গৃহীত ঘোষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়

আমাদের লক্ষ্য জনগণের গণতান্ত্রিক জাতীয় সংস্কৃতি গড়ে তোলা। জনগণের গণতান্ত্রিক নতুন সমাজ গড়ে তোলার সংগ্রামের মধ্যদিয়েই কেবল এই নতুন সংস্কৃতি গড়ে উঠতে পারে। লেখক, শিল্পী ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের অবশ্যই জনগণের সাথে একাত্ম হতে হবে; জীবন ও সমাজ বদলের প্রক্রিয়ার অভ্যন্তরে থেকে অর্জিত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই কেবল নতুন সংস্কৃতি গড়ে তোলার লক্ষ্যকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যেতে পারে।”

এ সংগঠন পরবর্তীতে এককভাবে ও সম্মিলিত বিভিন্ন আন্দোলনে সামনের কাতারে সক্রিয় থেকেছে।

একই সময়ে অর্থাৎ ১৯৭৪ সালে আরেকটি গোষ্ঠি সংগঠিত হয় ‘গণসংস্কৃতি পরিষদ’ নামে। এর প্রথম সভাপতি অধ্যাপক ম. নূরুন্নবী ও সাধারণ সম্পাদক স্বপন বড়ুয়া। এই সংগঠন সরাসরি কোনো কেন্দ্রের সাথে যুক্ত না থাকলেও এর মূল সংগঠকরা একটি গোপন কেন্দ্রের কর্মী ছিলেন।

বাংলাদেশ লেখক শিবির’ পুনর্গতি হয় ১৯৭৬ সালে। এই সংগঠন আহমদ ছফা’র উদ্যোগে প্রথম সংগঠিত হয়েছিলো ১৯৭১ সালের প্রথম দিকে (?) ‘লেখক সংগ্রাম শিবির’ নামে। সে সময় এটি লাল পতাকার কোনো অংশের সাথে কোনো রকম সম্পর্কিত ছিলো না। তবে ১৯৭৬ সালে পুনর্গঠন যারা করেন তাদের অনেকেই একটি গোপন খন্ডাংশের সাথে যুক্ত ছিলেন। পুনর্গঠন পর্বে এর ব্যাপক ভিত্তিক গণচরিত্র ছিলো। [পরে সংগঠনের নামে ‘বাংলাদেশ’ বানান ‘বাঙলাদেশ’ চালু হয়েছে।] সে সময় লেখক শিবিরের সভাপতি ছিলেন ড. আহমদ শরীফ ও সাধারণ সম্পাদক শাহরিয়ার কবির। অনেক খ্যাতিমান লেখকবুদ্ধিজীবী এই সংগঠনে সমবেত হয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায় যাদের নাম তারা হলেনবদরুদ্দীন উমর, শওকত আলী, অখতারুজ্জামান ইলিয়াস, আনু মুহাম্মদ, শান্তনু কায়সার, প্রমুখ। পরবর্তী সময়ে লেখক শিবির একটি গোপন রাজনৈতিক কেন্দ্রের প্রকাশ্য তৎপরতার সংগঠনে পরিণত হয়। এর ফলে অনেক লেখকবুদ্ধিজীবী এ সংগঠন থেকে ক্রমে ক্রমে সরে গেছেন।

ঢাকায় ও দেশের প্রায় সকল শহরে লেখকশিল্পীসংস্কৃতিকর্মীদের ছোট ছোট অনেক গোষ্ঠি সমাজ বদলের আকাক্সক্ষায় জনগণের সংগ্রামের সহায়ক তৎপরতায় লিপ্ত ছিলো ও আছে। তাদের সম্পর্কে বলার মতো তথ্য আমাদের জানা নেই। এর দায় স্বীকার করেই বলতে চাই, ওইসব গোষ্ঠি ও তাদের কাজকর্ম সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ ও বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশ করা খুবই প্রয়োজন লাল পতাকার নিচে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের স্বার্থেই। একাজ যারা যোগ্যতা ও নিষ্ঠার সাথে করতে পারবেন, ভবিষ্যতের কর্মীরা শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার সাথেই তাদের স্মরণ করবে।

 

১০

আর তিনটি উদ্যোগের কথা বলে আমি এ আলোচনা শেষ করতে চাই।

এক: ‘গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ফ্রন্ট’

২৩টি সংগঠনের সমন্বয়ে এই ফ্রন্ট গঠিত হয়েছিলো ১৬ জানুয়ারি ১৯৭৮ সালে, ওই সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিদের এক সাধারণ সভায়। এতে সরাসরি কোনো সংগঠন বা গোষ্ঠিতে যুক্ত নন এমন বিশিষ্ট প্রগতিশীল লেখকশিল্পীবুদ্ধিজীবীও ছিলেন। বাংলাদেশ লেখক শিবির ১৯৭৭ সালের ডিসেম্বর মাসে ঐক্যবব্ধ সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছিলো। এটাই ছিলো বাংলদেশে এমন প্রথম উদ্যোগ। [স্মরণ করা যেতে পারে, ১৯৭৬ সালের সম্মিলিত একুশে ফেব্রুয়ারি উদযাপনের ঘটনা। সেটাও ছিলো বাংলাদেশে সম্মিলিতভাবে একুশে ফেব্রুয়ারি উদযাপনের প্রথম সার্থক উদ্যোগ। সে উদ্যোগে ‘পিকিংপন্থী’ বলে পরিচিত ঢাকার প্রায় সকল সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা ও লেখকশিল্পীসাংবাদিকবুদ্ধিজীবী, এমনকি রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গও সামিল হয়েছিলেন। নানা অনুষ্ঠানের মধ্যদিয়ে একুশে ফেব্রুয়ারি উদযাপন ছাড়া বরুদ্দীন উমরএর সম্পাদনায় প্রতিরোধের একুশ নামে একটা সংকলনও প্রকাশিত হয়েছিলো। বলা বাহুল্যই হবে যে, এ উদ্যোগে ‘মস্কোপন্থী’ ধারার কোনো লেখকশিল্পীবুদ্ধিজীবী অংশ নেয়নি।

লেখক শিবিরএর সভাপতি ড.আহমদ শরীফ ও সাধারণ সম্পাদক শাহরিয়ার কবির স্বাক্ষরিত এক আহ্বানে (১৭ ডিসেম্বর ১৯৭৭) সাড়া দিয়ে ঢাকার ১৩টি সংগঠনের প্রতিনিধিরা ২ জানুয়ারি ১৯৭৮ এক বৈঠকে মিলিত হয়। ওই বৈঠকে ঐক্যবদ্ধ সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তোলার লক্ষে ‘ঘোষণাপত্র ও কর্মসূচী’ প্রণয়নের জন্য ১৩ সদস্যের একটি সাবকমিটি গঠিত হয়। ১৫ জানুয়ারি সাবকমিটির সভায় মহসিন শস্ত্রপাণি উত্থাপিত ঘোষণাপত্র ও কর্মসূচীর খসড়া সাধারণ সভায় উপস্থাপনের জন্য অনুমোদিত এবং এর পরের দিন ১৬ জানুয়ারির সাধারণ সভায় গৃহীত হয়। ওইদিন ‘গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ফ্রন্ট’ আনুষ্ঠানিকভাবে গঠিত হয় ২৩ সংগঠনের সমন্বয়ে। এই সংগঠনগুলো হচ্ছেবাংলাদেশ লেখক শিবির, উন্মেষ সাহিত্যসংস্কৃতি সংসদ, দুর্জয় সংস্কৃতি সংসদ, সমষ্টি, নাট্যফৌজ, সাংস্কৃতিক আন্দোলন, ছড়া সংসদ, উচ্চারণ সাহিত্য চক্র, সুকান্ত একাডেমী, গণসংস্কৃতি পরিষদ, দেশকাল, ভাষা সমিতি, ঢাকা শিশু নাট্যম, অস্বীকার, বহুবচন নাট্যগোষ্ঠী, শিরোনাম গোষ্ঠী, উদয়ন সংঘ, চলচ্চিত্র কর্মী শিবির, আরণ্যক, ঋষিজ শিল্পী গোষ্ঠী, সাহিত্য ক্লাব, চলচ্চিত্রকার সংসদ এবং কিংশুক সাহিত্য গোষ্ঠী। পরে ধ্রুবতারা সংস্কৃতি সংসদ, পল্বব সাহিত্য চক্র, নয়া সমাজ ও অগ্নিবীণা সাহিত্য সংস্কৃতি সংসদ যোগ দিলে ফ্রন্টভুক্ত সংগঠনের সংখ্যা দাঁড়ায় ২৭টি।

ওই সাধারণ সভায় ২০১ সদস্যের সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটি গঠিত হয়। কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন ড. আহমদ শরীফ। কোষাধ্যক্ষ ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। আর পাঁচ সদস্যের সম্পাদকমন্ডলীতে ছিলেনআবুল কাসেম ফজলুল হক, নরেন বিশ্বাস, মহসিন শস্ত্রপাণি, নাজমুল হক নান্নু ও শাহরিয়ার কবির।

. আহমদ শরীফ চেয়েছিলেন একটা সম্মেলনের মধ্যেই এই ঐক্যবদ্ধ উদ্যোগ সীমিত রাখতে। কিন্তু কয়েকজন তরুণ অনেকটা জেদ ধরে একটা সংস্কৃতিক ফ্রন্ট গঠন করার পক্ষে মত দেয়। শেষ পর্যন্ত ওই তরুণদের একগুঁয়েমী তিনি মেনে নিয়েছিলেন ঠিকই, তবে মনে মনে নিশ্চয় হেসেছিলেন এই ভেবে যে, না ঠেকলে এদের শিক্ষা হবে না। সত্যিই আমরা ঠেকে শিখেছি।

. আহমদ শরীফ প্রধানত ছিলেন উদারনীতিক মানবপ্রেমী। প্রতিবাদ ও দ্রোহ ছিলো তাঁর চরিত্রের বৈশিষ্ট্য। তিনি লাল পতাকার রাজনৈতিক মতাদর্শের সমর্থক ও অনুরাগী ছিলেন ঠিকই কিন্তু তিনি বিশেষ কোনো রজনৈতিক কেন্দ্রের সদস্য বা সমর্থক ছিলেন না। তিনি সাধারণভাবে লাল পতাকার সংগ্রাম সমর্থন করতেন আবার তার বিবেচনামতো অকপটে যে কোনো ভুলত্রুটির সমালোচনাও করতেন। শোষক শ্রেণীর কোনো অংশের প্রতিই তাঁর কোনো রকম আস্থা বা সমর্থন ছিলো না। অথচ তিনি ফ্রন্টএর ঘোষণাপত্রে ‘সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ’, ‘সম্প্রসারণবাদ’, ‘আগ্রাসী শক্তি’, ‘মুৎসুদ্দি শ্রেণী’, ‘সামন্তবাদ’ ইত্যাদি রাজনৈতিক দলিল ও প্রচারপত্রের শব্দাবলী ব্যবহারে আপত্তি করেননি। এতে ব্যক্তিগতভাবে আমি একইসাথে বিস্মিত ও আনন্দিত হয়েছিলাম।

যাহোক, ‘গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিক ফ্রন্ট’, ১৯৭৮ সালের ৭৯ এপ্রিল, যে সম্মেলন অনুষ্ঠানের উদ্যোগ নিয়েছিলো ও সার্থক করে তুলেছিলো তেমনটা বাংলাদেশে পূর্বে বা পরে আর দেখা যায়নি। তিনদিনের এ সম্মেলনের প্রথম দিন, উদ্বোধনী অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেছিলেন ড. আহমদ শরীফ। ঢাকার ও দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সম্মেলনে যোগদানকারী লেখকশিল্পীসংস্কৃতিকর্মীদের কমিটির পক্ষ থেকে স্বাগত জানিয়ে ভাষণ দিয়েছিলেন সাংবাদিক মাশির হোসেন। ঘোষণাপত্র পাঠ করেছিলেনশাহরিয়ার কবির এবং আলোচনা করেনআবুল কাসেম ফজলুল হক, নরেন বিশ্বাস ও মহসিন শস্ত্রপাণি।

এরপর দ্বিতীয় অধিবেশনে ৪টি ও দ্বিতীয় দিনের প্রথম অধিবেশনে ৫টিএই দুই অধিবেশনে মোট ৯টি প্রবন্ধ পঠিত হয়প্রবন্ধ সাহিত্য, গল্পউপন্যাস, কবিতা ও ছড়া, সংবাদপত্র ও প্রকাশনা, নাটক ও যাত্রা, সংগীত, চিত্রকলা, চলচ্চিত্র এবং শিল্পীসাহিত্যকদের সাংগঠনিক ভূমিকা বিষয়ে। প্রবন্ধ পাঠের এই দুই অধিবেশনের প্রথম দিনের দ্বিতীয় অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন নূরুল হুদা মির্জা, দ্বিতীয় দিনের প্রথম অধিবেশনের সভাপতি ছিলেন ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। দ্বিতীয় দিনের দ্বিতীয় অধিবেশন ও তৃতীয় দিনের প্রথম অধিবেশনে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা প্রতিনিধিরা [ বিশেষকরে লেখক শিবির, উন্মেষ ও গণসংস্কৃতি পরিষদএর ] তাদের এলাকার সাংস্কৃতিক তৎপরতার রিপোর্ট পাঠ করেন। তিনদিন ধরে প্রতিদিন সন্ধ্যায় কবিতা পাঠ, আবৃত্তি, সংগীত ও নাটক অভিনীত হতো। এক সন্ধ্যায় ‘মাও সেতুং যেখানে ছিলেন’ নামে একটি প্রামাণ্য চলচ্চিত্রও প্রদর্শিত হয়।

সম্মেলনের শেষ দিনের শেষ অধিবেশনে সামগ্রিক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। সভাপতিত্ব করেন ড. আহমদ শরীফ এবং আলোচনায় অংশ নেননূরুল হুদা মির্জা, . সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ও নরেন বিশ্বাস। আলোচনা শেষে খসড়া ঘোষণাপত্র, নীতিমালা, কর্মসূচী ও গঠনতন্ত্র অনুমোদিত হয় এবং ১১ সদস্যের সম্পাদকমন্ডলী নির্বাচিত হয় এক বছরের জন্য। সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি ড. আহমদ শরীফ। সহসভাপতি ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, . নূরুন্নবী ও মহসিন শস্ত্রপাণি। কোষাধ্যক্ষ আমানুল্লাহ কবির। সদস্যগণশাহরিয়ার কবির, ইন্দু সাহা, শরীফ হারুণ, নওশের ইসলাম ও জ্যোতি চট্টোপাধ্যায়।

সম্মেলনে গৃহীত প্রস্তাবসমূহের শেষে “বাংলাদেশকে সাম্রাজ্যবাদ, সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ, সম্প্রসারণবাদ ও আধিপত্যবাদী প্রভাব থেকে মুক্ত করে একটি নতুন সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষে দেশের প্রগতিশীল বামপন্থী রাজনৈতিক দলসমূহের প্রতি ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহবান” জানানো হয়।

সম্মেলন উপলক্ষে ‘সাংস্কৃতিক ঐক্য’ নামে একটি স্মরণিকা প্রকাশিত হয়েছিলো। ‘ফ্রন্ট’এর সম্পাদকমন্ডলীর সম্পাদনায় স্মরণিকা প্রকাশনার দায়িত্ব পালন করেছিলেন প্রকাশনা উপকমিটির আহ্বায়ক মুনতাসীর মামুন। প্রচ্ছদ এঁকেছিলেন রফিকুননবী। লিখেছিলেন ড. আহমদ শরীফ– ‘আর্ত মানবতার প্রতি মানবদরদীর দায়িত্ব’; . সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী– ‘সংস্কৃতিতে প্রতিক্রিয়াশীলততা’; বদরুদ্দীন উমর– ‘জনগণের সাংস্কৃতিক বিকাশে প্রতিবন্ধকতা’; নূরুল হুদা মির্জা– ‘প্রতিক্রিয়াশীল সংস্কৃতির বিরুদ্ধে নয়া সংস্কৃতির সংগ্রাম’; মহসিন শস্ত্রপাণি– ‘নব শক্তির বিজয়যাত্রা অপ্রতিরোধ্য’; আবুল কাসেম ফজলুল হক– ‘সাংস্কৃতিক আন্দোলনের দুই ধারা’; নরেন বিশ্বাস– ‘লোকনাট্য ও সঙ্গীত প্রসঙ্গ’ এবং শাহরিয়ার কবির– ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতিপ্রসঙ্গ: নাটক ও চলচ্চিত্র’।

স্মরণিকার সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছিলো:

সাংস্কৃতিক আন্দোলন কেবলমাত্র শহরাঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকলে জনগণের জীবন সংগ্রাম সংস্কৃতিতে যথার্থভাবে প্রতিফলিত হতে পারে না। কেননা, জনসংখ্যার বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ বসবাস করেন গ্রামাঞ্চালে। তাই সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে আমাদের অবশ্যই টেনে নিয়ে যেতে হবে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত। শহর ও গ্রামাঞ্চলে ঐক্যবদ্ধ সংস্কৃতিক আন্দোলন পরিচালনার সমস্যা মীমাংসা করা এই সম্মেলনের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য। [ বলার অপেক্ষা রাখে না, এই চেতনা ও ঘোষিত উদ্দেশ্য স্মরণিকার সম্পাদকীয়তেই আটকে থেকে গিয়েছে, বাস্তব করে তোলার কোনো পদক্ষেপই আমরা নিতে পারিনি।]

স্মরণিকায় অন্তর্ভুক্ত রচনাগুলোর মধ্যে নূরুল হুদা মির্জা ও শাহরিয়ার কবিরের রচনায় সোভিয়েত ইউনিয়নকে ‘সামাজিক সাম্রাজ্যবাদী’ এবং ভারত রাষ্ট্রকে ‘সম্প্রসারণবাদী’ বলা হয়েছিলো। আবুল কাসেম ফজলুলক হক বলেছিলেন ‘বিভিন্ন সাম্রাজ্যবাদ’ ও ‘সম্প্রসারণবাদ’। [স্মরণ করা যেতে পারে, ওই সময় শাহরিয়ার কবির ও ড. মুনতাসীর মামুন তাদের প্রাসঙ্গিক রচনায় সোভিয়েত ইউনিয়নকে ‘সামাজিক সাম্রাজ্যবাদী’ ও ভারতকে ‘সম্প্রসারণবাদী, বলে উল্লেখ করতেন। পরে অবশ্য তারা মত ও পথ পরিবর্তন করে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সেবক ও প্রচারক হিসেবে কোথায় গিয়ে পৌঁছেছেন তা কারো অজানা নয় আর তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনাও প্রাসঙ্গিক নয়।]

গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ফ্রন্ট ওই সম্মেলনের পর উল্লেখ করার মতো তেমন কোনো তৎপরতা চালাতে পারেনি। তার পেছনে অনেকগুলো কারণ ছিলো। তবে প্রধান কারণ রাজনৈতিক। ফ্রন্টভুক্ত সংগঠনগুলোর অধিকাংশই ছিলো ছোট ছোট গোষ্ঠি। যে কটা সংগঠন ফ্রন্টের তৎপরতা সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারতো সেগুলো কোনো না কোনো গোপন কেন্দ্রের সাথে যুক্ত ছিলো। আর ওইসব গোপন কেন্দ্র সম্মিলিত সাংস্কৃতিক আন্দোলন পরিচালনার ব্যাপারে যেমন সঠিক দৃষ্টিভঙ্গীর পরিচয় দিতে পারেনি, তেমনি বাস্তব কর্মপদ্ধতিও নেয়নি। বলা যায় তা নেবার মতো সাংগঠনিক যোগ্যতা ও বিচক্ষণতা তাদের ছিলো না, আজো নেই। ফলে ‘গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ফ্রন্ট’ কেন, তেমন আর কোনো উদ্যোগে তারা পৃষ্ঠপোষকতা ও সহযোগিতা দিতে পারেনি। এ থেকে এ সত্য আরেকবার প্রমাণিত হয় যে, সঠিক রাজনৈতিক দিশা ও নেতৃত্ব ছাড়া বুদ্ধিজীবী এবং কবি, লেখক, শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীদের নিজেদের উদ্যোগে কোনো আন্দোলন যেমন প্রত্যাশিত মাত্রায় বিকাশলাভ করতে পারে না, তেমনি ওইসব আন্দোলনে যেটুকু সাফল্য বা সুনাম অর্জিত হয় তা তাদের কাছ থেকে ছিনতাই করে ব্যক্তিস্বার্থে কাজে লাগায় সুবিধাবাদীরা। তরপরও ‘গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ফ্রন্ট’ সম্মিলিত উদ্যোগের যে দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেছে তা কোনোমতেই উপেক্ষা করার নয়।

ফ্রন্টের দুটো ঘটনা স্মরণ করা যেতে পারে। তার একটা হলো১৯৭৮ সালের নভেম্বর মাসে সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে ‘শান্তি ও সহযোগিতা’ চুক্তি স্বাক্ষর করার পর সোভিয়েত ইউনিয়নের মদদ পেয়ে ভিয়েতনাম কম্বোডিয়ায় আগ্রাসন চালায় এবং এক পুতুল সরকার ক্ষমতায় বসিয়ে ওই দেশটিতে কার্যত তার দখলদারি কায়েম করে। তার বিরুদ্ধে সারা দুনিয়াব্যাপী প্রতিবাদ ও নিন্দা প্রকাশিত হয়। আমাদের দেশেও বিভিন্ন মহল থেকে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানানো হয়েছিলো আর সমর্থন জানানো হয়েছিলো কম্বোডিয়ার জনগণের ন্যায় সংগ্রামের পক্ষে। ফ্রন্টের পক্ষ থেকেও পত্রিকায় প্রকাশের জন্য একটা বিবৃতি দেয়া হয়েছিলো। বিবৃতির ভাষাকে ড. আহমদ শরীফ ‘একটু কড়া হয়েছে। আমি অবশ্য একটু নরম ভাষায় লিখেছিলাম’ মন্তব্য করেও ওই বিবৃতিতে ফ্রন্টএর সভাপতি হিসেবে স্বাক্ষর দেবার সময় তাঁর মুখে স্নিগ্ধ হাসি ফুটেছিলো। তাঁর এই ধরনের ভূমিকার কারণেই তিনি অধিকাংশ কমিউনিস্ট ও প্রগতিশীল সংগঠনের নেতা ও কর্মীদের শ্রদ্ধা ও গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেছিলেন।

অন্য ঘটনাটি হলো, ফ্রন্টএর পক্ষ থেকে হেমাঙ্গ বিশ্বাসকে সংবর্ধনা প্রদান। উপমহাদেশের খ্যাতিমান সাংস্কৃতিক শ্রেণীসংগ্রামী, সংগীতশিল্পী ও সংগীতজ্ঞ হেমাঙ্গ বিশ্বাস তাঁর ‘মাস সিঙ্গার্স’এর কয়েকজন সাথীশিল্পী সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশ সফরে আসেন ১৯৮১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। মার্চ মাসের ২ তারিখে ফ্রন্টএর পক্ষ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রশিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) মিলনায়তনে তাঁকে সংবর্ধনা দেয়া হয়। ড. আহমদ শরীফের সভাপতিত্বে ও্ই অনুষ্ঠানে প্রায় দুহাজার শ্রোতাদর্শক সমবেত হয়েছিলো। আমাদের ধারণা এমন আন্তরিক ও শ্রদ্ধাপূর্ণ সংবর্ধনা হেমাঙ্গ বিশ্বাস তাঁর পূর্বে বা পরে আর পাননি। তিনি ও তাঁর সাথীশিল্পীরা সত্যিসত্যিই অভিভূত হয়েছিলেন। আমরাও এমন একজন শিল্পীসংগ্রামীকে সংবর্ধনা দিতে পেরে আনন্দিত ও গর্বিত হয়েছি।

দুই: . আহমদ শরীফের নেতৃত্বে বাম প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী ও সংস্কৃতিকর্মীদের শেষ সাংগঠনিক উদ্যোগ– ‘সমাজতান্ত্রিক বুদ্ধিজীবী সংঘ’।

দেশের কমিউনিস্ট ও বাম প্রগতিশীল শক্তির বহু কেন্দ্রে বিভিক্তি প্রত্যক্ষ করে ড. আহমদ শরীফ অত্যন্ত বেদনাহত, আশাহত ও ক্ষুব্ধ ছিলেন। আলোচনা সভায় বক্তৃতায় কিংবা ঘরোয়া বৈঠকে সব সময় তিনি তা প্রকাশও করতেন ও ওই শক্তির ঐক্যের পক্ষে কথা বলতেন। এ প্রসঙ্গে তাঁর একটা প্রিয় ইংরেজি বাক্য ছিলো United we stand, divided we fall.কমিউনিস্ট ও বাম শক্তির ঐক্য বিষয়ে কার্যকর ভূমিকা পালনের ইচ্ছায় তিনি একসময় একটা রাজনৈতিক দল গঠনের কথাও ভেবেছিলেন এবং তাঁর ঘনিষ্ঠজনদের সাথে কিছুদিন ধরে আলাপআলোচনাও করেছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন তাঁর একার কথা গুরুত্ব পাচ্ছে না, একটা দল গঠন করে চেষ্টা চালালে বামপন্থীদের ঐক্যের ব্যাপারে ইতিবাচক সুফল পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু তাতে তেমন কোনো সাড়া পাননি।

সে রকম আরেকটি ও তাঁর জীবনের শেষ উদ্যোগ ছিলো তাঁর মৃত্যুর মাত্র ৪৮ দিন পূর্বে, ১৯৯৯ সালের ৭ জানুয়ারি। ওইদিন তাঁর বাড়িতে ১২১৪ জন বুদ্ধিজীবী ও সংস্কৃতিকর্মীর এক বৈঠকে সমাজতন্ত্রের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণকারী সাম্রাজ্যবাদবিরোধী বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে একটি সংগঠন গড়ে তোলার প্রাথমিক আলোচনা হয়। এটাই ছিলো ‘সমাজতান্ত্রিক বুদ্ধিজীবী সংঘ’ গঠনের প্রথম উদ্যোগ [তার কয়েকদিন পূর্বে অবশ্য খুবই ঘনিষ্ঠ কয়েকজনকে ডেকে তাঁর ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন]। একটা ঘোষণাপত্রও প্রাথমিকভাবে অনুমোদিত হয়। সেই ঘোষণাপত্রের একটা ভূমিকা রচনা করেন ড. আহমদ শরীফ। সেটাই তাঁর জীবনের সম্ভবত শেষ রচনা। তাতে তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন:

আমরা যারা বামপন্থীদের নেতা কর্মী নই, অথচ মনে প্রাণে তাদের সমর্থকআমরা পরিণামে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে মানব মুক্তিকামী প্রগতিশীল মার্কসবাদসম্মত চিন্তাশীল যুক্তিবাদী ব্যক্তিদের একটা স্বেচ্ছাপ্রণোদিত সংঘ গঠন করতে চাই।”

এই ‘সংঘ’ গঠন বিষয়ে মতবিনিময় ও পরামর্শের জন্য তিনি বাম নেতৃবৃন্দকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন তাঁর বাড়িতে ১৬ ফেব্রুয়ারি। তাঁর আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে সেদিন ওই বেঠকে উপস্থিত ছিলেনবদরুদ্দীন উমর, রাশেদ খান মেনন, হায়দার আকবর খান রনো, নির্মল সেন, খালেকুজ্জামান, দিলীপ বড়ুয়া, প্রমুখ। ডা. এম এ করিম ও টিপু বিশ্বাসের উপস্থিত থাকার কথা ছিলো, তবে থাকতে পারেননি। সেদিন ড. আহমদ শরীফ সূচনা বক্তব্য হিসেবে প্রায় এক ঘন্টা ধরে ভাষণ দেন। সম্ভবত, এটাও ছিলো তার জীবনের শেষ ভাষণ।

উপস্থিত নেতারা ‘সমাজতান্ত্রিক বুদ্ধিজীবী সংঘ’ গঠনের উদ্যোগকে সমর্থন জানান ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেবার আশ্বাস দেন। [পরে তারা সে সমর্থন ও আশ্বাসের কথা স্মরণ রাখতেন কিনা সে প্রশ্নটা উড়িয়ে দেয়া যায় না। পরে আমরা দেখেছি, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী একটা ফ্রন্ট গঠনের উদ্যোগ তাদের অসহযোগিতার ফলে সফল হতে পারেনি।।]

. আহমদ শরীফ ২৪ ফেব্রুয়ারি ( ১৯৯৯ ) আকস্মিক শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলে ‘সমাজতান্ত্রিক বুদ্ধিজীবী সংঘ’ গঠনের উদ্যোগ ব্যর্থতার চোরা বালিতে তলিয়ে যায়।

এই ‘সংঘ’ গঠনের স্বল্পকালীন প্রক্রিয়ার সাথে যারা জড়িত ছিলেন তারা একটা বিষয় লক্ষ্য করে একইসাথে বিস্মিত ও আনন্দিত হয়েছেন। তা হলো, তিনি উদারনৈতিক মানবতাবাদী থেকে ক্রমে মার্কসবাদী হয়ে উঠেছিলেন এবং নির্ভরযোগ্য কর্মী বাছাইয়ের প্রশ্নে যে ধরনের সতর্কতা তিনি অবলম্বন করেছিলেন তা ছিলো অনেকটা কমিউনিস্ট পার্টির কর্মী বাছাইয়ের মতো।

তিন: লাল পতাকার নিচে ঢাকাকেন্দ্রিক সম্মিলিত সাংস্কৃতিক আন্দোলনে সর্বশেষ অভিজ্ঞতা ‘গণসংস্কৃতি ফ্রন্ট’।

মে দিবস উদযাপন সামনে রেখে ‘জনগণের সমাজ বদলের সংগ্রামে কার্যকর ও তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালনের উদ্দেশ্যে কয়েকটি প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক সংগঠন ১৯৯৮ সালের মার্চ মাসে ঐক্য প্রক্রিয়া শুরু করে। তারা এপ্রিল মাসে গঠন করে মে দিবস উদযাপন সাংস্কৃতিক কমিটি’। যে ১৫টি সংগঠনের প্রতিনিধিরা এই কমিটি গঠন করে সে সংগঠনগুলো হচ্ছেসৃজন, গণশিল্পী সংস্থা, ধ্রবতারা, কবি সুকান্ত স্মৃতি সংসদ, সমাজ চেতনা, বিবর্তন সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, আপেক্ষিক, শহীদ বিপ্লবী ও দেশপ্রেমিক স্মৃতি সংসদ, গণসংস্কৃতি পরিষদ (হাসান ফকরী), সূচনা অধ্যয়ন চক্র, প্রত্যয় সাংস্কৃতিক আন্দোলন, প্রগতি সংস্কৃতি সংসদ, শহীদ আসাদ পরিষদ, গণসংস্কৃতি পরিষদ (. নূরুন্নবী) ও উন্মেষ সাহিত্যসংস্কৃতি সংসদ। কমিটির আহ্বায়ক নির্বাচিত হন গণসংগীত শিল্পী কামরুদ্দীন আবসার।

যে সংগঠনগুলো এই ঐক্য প্রক্রিয়া শুরু করে তাদের মধ্যে কয়েকটি ‘সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট’এর সঙ্গে যুক্ত ছিলো। ‘জোট’এর তৎপরতা বিষয়ে তারা অসন্তুষ্ট ও ক্ষুব্ধ হয়ে বিকল্প পথ সন্ধানে উদ্যোগী হয়। আশির দশকে সামরিক স্বৈরাচারী শাসক এরশাদ বিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলনের সহযোগী হিসেবে গড়ে ওঠে ‘সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট’। উদ্যোগ পর্বে প্রগতিশীল বলে পরিচিত কিছু সংগঠন ও ব্যক্তি এ প্রক্রিয়ার সামনের কাতারে থাকলেও ক্রমে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সহযোগী সংগঠন ও ব্যক্তিবর্গ জোটের নেতৃত্ব ও পরিচালনায় দখল কায়েম করে। আর আওয়ামী লীগ ক্ষমতা লাভ করার পর সাম্রাজ্যবাদের ও দেশের শোষকশ্রেণীসমূহের স্বার্থের সেবক রাষ্ট্রের সহযোগিতা করে ও পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে ধন্য হয় এই ‘জোট’। ‘জোট’এর মঞ্চে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন আহমেদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদার্পণ করায় জোট নেতারা তাদের জীবন সার্থক হয়েছে বলে তুষ্ট ও আনন্দিত হয়। ‘জোট’এর পরিণতি এমনটা যে হবে এর সূচনা পর্বে প্রক্রিয়ার প্রকৃতি লক্ষ্য করে দুএকটা সংগঠন ও দুএকজন ব্যক্তি সে কথা পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়ে ওই প্রক্রিয়ায় যুক্ত থাকতে অস্বীকার করেছিলেন। ঢাকার ও দেশের বিভিন্ন স্থানের এমন কিছু সংগঠন ‘জোট’এর সাথে শিথিল বন্ধনে যুক্ত আছে, যারা নিজেদের ‘প্রগতিশীল’ বলে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করে। বুঝেশুনেই তারা ‘জোট’এ আছে। নানা উপলক্ষে অনুষ্ঠানে অংশ নেয় এবং রাষ্ট্রীয় অনুদানের ভাগও হাত পেতে নিতে আপত্তি করে না। আবার এমন সংগঠনও দুএকটা আছে, বিশেষকরে নাট্যচর্চায়, বিপ্লবী বুলি আওড়ে থাকে আর ‘জোট’এ অন্যদের সঙ্গে মিলে সাম্রাজ্যবাদনিয়ন্ত্রিত দেশের শোষক শ্রেণীসমূহের সংস্কৃতির সেবা দেয়। ‘নাটক শ্রেণী সংগ্রামের সুতীক্ষ্ণ হাতিয়ার’ ধ্বনি দিয়েছে আর নিয়মিত মনোরঞ্জন করে চলেছে সমাজের সুবিধেভোগী মধ্রবিত্তের। রাজনৈতিক ক্ষেত্রের কিছু বামপ্রগতিশীল দলের মতোই বুলি ও বাস্তব কাজের এমন অসঙ্গতিযা নির্ভেজাল সুবিধাবাদকেবল বিভ্রান্তি ছড়ায় না, নিষ্ঠাবান কর্মীদের হতোদ্যমও করে।

যাহোক, ‘জোট’ সম্পর্কে অসন্তুষ্ট ও ক্ষুব্ধ দুএকটি সংগঠন এবং জোটভুক্ত হয়নি এমন সংগঠনগুলো মিলে এই নতুন ঐক্য প্রক্রিয়া শুরু করে। কিছুদিনের মধ্যেই ‘বাঙলাদেশ লেখক শিবির’ ও আরো কয়েকটি সংগঠন এ প্রক্রিয়ায় যোগ দিলে সংগঠনের সংখ্যা দাঁড়ায় ২১। পরে আরো ৩টি সংগঠন যোগ দেয়ায় ২৪টি সংগঠন নিয়ে গঠিত হয় ‘গণসংস্কৃতি ফ্রন্ট’ ১৯৯৯ সালের ১৪ মার্চ। কনভেনশন করে ‘ফ্রন্ট’এর পূর্ণাঙ্গ সাংগঠনিক রূপ দেবার লক্ষে ওইদিন সংগঠনসমূহের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি আহ্বায়ক কমিটি গঠিত হয়। তার সভাপতি নির্বাচিত হন মহসিন শস্ত্রপাণি ও সাধারণ সম্পাদক কামরুদ্দীন আবসার। সদস্যরা হলেনহায়দার আনোয়ার খান জুনো, . নূরুন্নবী, মুঈনুদ্দিন আহমদ, মফিজুর রহমান লালটু ও সামীম আরা।

ফ্রন্ট’ গঠনের পূর্বে ঐক্য প্রক্রিয়া চলে এক বছর ধরে। এর মধ্যে ‘নজরুল জন্মশতবর্ষ উদযাপন সাংস্কৃতিক কমিটি’ ও ‘কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার প্রকশের ১৫০ বছর উদযাপন সাংস্কৃতিক কমিটি’র নামে অনেকগুলো অনুষ্ঠান হয় এবং প্রতিবাদ, বিক্ষোভ সমাবেশ ও বিবৃতি প্রদান চলে। এরপর ২০০০ সালের আগস্ট মাসে কনভেনশন করে পূর্ণাঙ্গ সাংগঠনিক কমিটি গঠিত হয়। সে কমিটির সভাপতি মহসিন শস্ত্রপাণি ও সাধারণ সম্পাদক কামরুদ্দীন আবসার নির্বাচিত হন। বর্তমানে ফ্রন্টের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন হায়দার আনোয়ার খান জুনো ও মজিফুর রহমান লালটু।

গণসংস্কৃতি ফ্রন্ট’এর ঘোষণাপত্রের ভাষা ও অভিব্যক্তি পূর্বে এ ধরনের যে কোনো উদ্যোগের ঘোষণাপত্রের মতোই। কেবল অতি সাম্প্রতিক বিষয়গুলো জোর দিয়ে উল্লেখ করা হয়। ঘোষণাপত্রের শেষে প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয় এভাবে:

পুরোগামী সাংস্কৃতিক সংগ্রামীদের সংগ্রামের “ঐতিহ্যের পতাকা হাতে আমরাসাংস্কৃতিক আন্দোলনের কর্মীরা, বর্তমানের অসহনীয় অবস্থা পরিবর্তনের উদ্দেশ্যে জনগণের সাথে প্রত্যক্ষ সংগ্রামে অংশগ্রহণ এবং জনগণের চেতনা ক্রমাগত বিকাশের অবিরাম ধারায় নিজেদের মেধা ও যোগ্যতা নিয়োজিত করার লক্ষে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রত্যয় ঘোষণা করছি।”

গণসংস্কৃতি ফ্রন্ট’ সংগঠিত হবার সময় বাম রাজনৈতিক শক্তি বা কেন্দ্রগুলোর কাছ থেকে যে সহযোগিতা ও পৃষ্ঠপোষকতা প্রত্যাশা করা হয়েছিলো তা পাওয়া যায়নি। তবু জনগণের সকল আন্দোলনের সাথে থাকার যে অঙ্গীকার ‘ফ্রন্ট’ করেছিলো তা বাস্তবে রূপ দেবার চেষ্টা সাধ্যমতো করেছে। দীর্ঘ ১৫ বছর টিকে থাকার ঘটনা গুরুত্ব দিয়ে স্মরণ করতে হবে অবশ্যই। কেবল টিকেই থাকেনি, এ সময়ে বিভিন্ন আন্দোলনে, বিশেষকরে ‘তেলগ্যাসখনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎবন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি’র প্রায় সকল আন্দোলনে ও লং মার্চে, অংশ নিয়েছে। দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে কয়লা খনি নিয়ে সাম্রাজ্যবাদী কোম্পানি এশিয়া এনার্জি সরকারের সহযোগিতায় যে চক্রান্ত চালায় তার বিরুদ্ধে ফুলবাড়ী ও সংলগ্ন এলাকাগুলোর জনগণের সংগ্রামে ‘ফ্রন্ট’এর কর্মীরা সাধ্যমতো যুক্ত ছিলো। এ সব ঘটনায় ‘ফ্রন্ট’এর কর্মীরা যেমন অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ হয়েছে ও নতুন নতুন সৃষ্টিতে অনুপ্রাণিত হয়েছে, তেমনি ভবিষ্যতে সংস্কৃতি কর্মীদের জন্যে স্মরণ ও অনুসরণের মতো দৃষ্টান্তও স্থাপন করেছে। এছাড়া প্রতিবছর নিয়মিত ‘আসাদ দিবস’ উপলক্ষে সমকালীন বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা সভা, কবিতা পাঠ ও আবৃত্তি এবং সংগীত ও নাটক অনুষ্ঠান এবং সেইসাথে বইমেলার আয়োজন করে থাকে।

রাজনৈতিক শক্তির তরফ থেকে প্রত্যাশিত সহযোগিতা ও পৃষ্ঠপোষকতা না পাওয়ার ফলে মাত্র কয়েকটি সংগঠনের প্রতিনিধিরা ‘ফ্রন্ট’এর তৎপরতা চালু রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে এ চেষ্টা তারা আর বেশিদূর এগিয়ে নিতে পারবেতেমনটা আশা করা যায় না।

 

১১

সুধীবৃন্দ, লাল পতাকার নিচে সংস্কৃতিক আন্দোলনের যে রেখাচিত্র আপনাদের সামনে উপস্থিত করলাম তাতে অসার্থকতার দিকটাই প্রধান হয়ে দেখা দিয়েছে। এটাই আমাদের কালের বাস্তবতা। দুনিয়া জুড়ে লাল পতাকার সংগ্রাম সামায়িককালের জন্যে হলেও, পরাজিত হয়েছে তা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু শেষ হয়ে যায়নি। সেই সত্য যারা অনুধাবন করতে পারে তারা ভবিষ্যতে বিজয়যাত্রার আশা ছাড়তে পারে না। আমরাও বারবার অসার্থকতার গ্লানি ঝেড়ে ভবিষ্যৎমুখী যাত্রাকে সচল রাখার চেষ্টা কখনোই ছাড়িনি। আমাদের পূর্বে যারা পথ হেঁটেছেন তারা আমাদের প্রেরণা। আমাদের কালে যারা আশার প্রদীপ জ্বেলে রাখার চেষ্টা করেছেন তারা আমাদের শক্তি। তারাই এই যাত্রা যন্ত্রণাবিদ্ধ বর্তমানকে উজ্জ্বল ও আনন্দময় ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবেনএই প্রত্যয় আমাদের এতোটুকু দুর্বল হয়নি। আমাদের দেশে ও বিশ্বব্যাপী স্বদেশের শোষক ও শাসকশ্রেণীসমুহের ও সাম্রাজ্যবাদের শোষণ লুণ্ঠন ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে জনগণ যে সংগ্রাম চালাচ্ছেন তার মধ্যদিয়েই লাল পতাকার রাজনৈতিক শক্তি সংঘবদ্ধ হবে এবং বিচক্ষণ ও যোগ্য নেতৃত্ব বিকাশ লাভ করবে অবশ্যই। আর সেই রাজনৈতিক শক্তির অধীনে ও পরিচালনায় সাংস্কৃতিক আন্দোলনও পূর্ণ মাত্রায় প্রস্ফুটিত হবেএ বিশ্বাস আমাদের এতোটুকু টলেনি। ইতিহাস এখানেই শেষ নয়, তা হতেও পারে না। যতোদিন সমাজ শ্রেণীতে শ্রেণীতে বিভক্ত থাকবে, শোষণনির্যাতন ও অবদমন থাকবে ততোদিন সংগ্রাম চলবে শোষণনির্যাতন ও অবদমনের ব্যবস্থার অবসান না হওয়া পর্যন্ত। জনগণের শক্তি ও সামর্থ্যরে ওপর যাদের আস্থা আছে তাদের অগ্রযাত্রা কোনো শক্তিই স্তব্ধ করতে পারে না। এটাই ইতিহাসের শিক্ষা।

 

লাল পতাকার নিচে সংস্কৃতিক আন্দোলনের এই রেখাচিত্র যদি ভবিষ্যতে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের কর্মীদের আরো অনুসন্ধানে ও শিক্ষা অর্জনে উদ্বুদ্ধ করতে পারে তাহলেই এই এটি আঁকার চেষ্টা সার্থক হয়েছে বলে জানবো। আপনাদের সকলের মঙ্গল কামনা করি ও ধন্যবাদ জানাই।।

———————————————————-

 

মহসিন শস্ত্রপাণি

সকল রকম শোষণবৈষম্য ও নির্যাতন, অসম্মান ও অবমাননা মুক্ত নতুন সমাজ প্রতিষ্ঠায় রাজনৈতিক সংগ্রামের অধীন ও অনুগামী সাংস্কৃতিক আন্দোলনের একজন অগ্রগামী সংগঠক মহসিন শস্ত্রপাণি। কিশোর বয়স থেকে প্রায় অর্ধ শতাব্দীকাল ধরে ঢাকায় রাজনৈতিকসাংস্কৃতিক আন্দোলনে তিনি যুক্ত আছেন। লেখালেখি করেন মূলত সাংস্কৃতিক আন্দোলনের তাগিদ থেকেই। ‘ক্রান্তি’র অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং প্রায় চল্লিশ বছর ধরে ‘উন্মেষ সাহিত্যসংস্কৃতি সংসদ’এর প্রধান সংগঠকের দায়িত্ব পালন করেছেন। ড. আহমদ শরীফএর নেতৃত্বে ‘গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ফ্রন্ট’ ও ‘গণসংস্কৃতিক ফ্রন্ট’এর সামনের কাতারের অন্যতম প্রধান সংগঠক। সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলনের একজন সক্রিয় কর্মী। দুদফা কারাবাসের বেদনা ও আনন্দময় অভিজ্ঞতা আছে তাঁর।

তাঁর জন্ম ১৯ ডিসেম্বর ১৯৪৫ সালে। মাতা জাহানারা খাতুন। পিতা হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক সৈয়দ আবদুল মুত্তালিব। মাতাপিতার পাঁচ সন্তানের মধ্যে প্রথম। জন্ম গ্রাম: কাজীরবেড়, উপজেলামহেশপুর, জেলাঝিনাইদহ (যশোর)। ঢাকায় বসবাস ১৯৬৩ সাল থেকে। দৈনিক আজাদ, দৈনিক জনপদ, সাপ্তাহিক গণবাংলা প্রভৃতি পত্রিকায় ৬৭ বছর সাংবাদিকতা পেশায় যুক্ত ছিলেন। ১৯৭৯ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত মাসিক উন্মেষ পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন এবং স্বল্পকাল স্থায়ী নয়া দুনিয়া সাপ্তাহিক’এর সম্পাদকপ্রকাশক ছিলেন। সত্তর দশকের মাঝামাঝি থেকে তিরিশ বছরের অধিককাল সম্পাদনাপ্রকাশনা ও মুদ্রণ পেশায় যুক্ত ছিলেন।

ভ্রমণ করেছেন ভারত, নেপাল, ভুটান, ব্যাংকক, হংকং, চীন; ইউরোপের ব্রিটেন, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস, জার্মানী, অস্ট্রিয়া, হাঙ্গেরি, যুগস্লাভিয়া, ইতালি, সুইজারল্যান্ড, ফ্রান্স এবং আমেরিকা ও কানাডা।

 

প্রকাশনা: উপন্যাসকারাজীবনের পটভূমিতে রচিতঅন্তরিত লোকালয় (১৯৭১): জোছনায় কালো মেঘ (১৯৯৭)। গল্পগ্রন্থজনশ্রুতি (১৯৮০, ১৯৮৬)। রম্যচরনাআজগুবি শিশু (১৯৯০)। নাটকআজালিয়া পর্বত (চীনা অপেরার নাট্যরূপ১৯৭৮); লাল তারার কাহিনী (চীনা কাহিনীর নাট্যরূপ১৯৮২); [বহুবার মঞ্চস্থ হয়েছে, প্রকাশিত হয়নি, নাটিকাউনসত্তরের গণআন্দোলনের পটভূমিতে]; মহাবিপ্লবের পদধ্বনি (প্রথম মঞ্চায়ন৩০ জানুয়ারি ১৯৭০) ; ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর উপকূলে ঘূর্ণিঝড় গর্কির ধ্বংসযজ্ঞের পটভূমিতে, শবের মিছিলে জীবনের জয়গান (প্রথম মঞ্চায়ন৩১ জানুয়ারি ১৯৭১)। ভ্রমণ কাহিনীদেশের নাম চীন (১৯৮৫)। জীবনীবিপ্লবী হো চি মিন (১৯৭২,পঞ্চম সংস্করণ২০০৮); এডগার স্নো (সংক্ষিপ্ত জীবনচিত্রের অনুবাদ১৯৮৬)। রচনা সংকলনশেষ যুদ্ধের ডাক (১৯৯৬): সংস্কৃতি আন্দোলন: পক্ষ ও বিপক্ষ (২০০০)। সম্পাদনানজরুল পরিষদ পত্রিকা (সংকলন১৯৮৩): সুরমা উপত্যকার শঙ্খচিল (হেমাঙ্গ বিশ্বাস স্মরণে ১৯৮৮, দ্বিতীয় সংস্করণ ‘হেমাঙ্গ বিশ্বাস জন্মশতবর্ষ স্মরণে’ ২০১২); শতকোটির দেশ (বাংলাদেশচীন ইনস্টিটিউটএর ১৯৮৫ থেকে ১৯৯১ পর্যন্ত ৫টি সংকলন); মজলুম জননেতা (মওলানা ভাসানী স্মারকসংকলন২০০২); কাগমারী সম্মেলন স্মারকগ্রন্থ (২০১১)। এছাড়া অনেক সংকলনস্মরণিকা ও গ্রন্থ সম্পাদনা করেছেন।।

—————————————————————–

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s