লিখেছেন: অরিন্দম সিরাজী হিজল

art-22শেষ বিকেলের আলো ক্রমশই

মিশে যাচ্ছে

রাখালেরাও ঘরে ফিরছে

চলনবিলের সমস্ত এলাকা তখন

অন্ধকারে নিমজ্জিত।

 

এই সাঁঝ বেলাতেই ঘন

কুটকুটে অন্ধকার

অদূরের লোকালয়ে কুপিগুলো

স্থির দৃষ্টিতে জ্বলছে।

এই রাষ্ট্র চলনবিলের জীর্ণশীর্ণ

বিধ্বস্ত গ্রামগুলোকে আলোকিত

করতে পারেনি।

 

চৌগ্রামে দ্বীপের মতো একটি বাজারে

হোসেনের চায়ের দোকানে বসে

অদূরের ঐ কুপিগুলো দেখতে দেখতে

কথা বলছিলেন ষাটোর্ধ্ব লিকলিকে গড়নের

নবারুণ দা।

 

নবারুণ দা!

যাকে এক নামে চেনে

বিল এলাকার

খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ।

 

এই পা ফাটা মানুষদের সঙ্গে

দাদার সম্পর্ক

প্রায় পাঁচ দশকের।

সুখে দুঃখে সব সময় তাদের পাশে

তাদের মুক্তির জন্য

এক নিবেদিত প্রাণ।

 

রাত তখন প্রায় সাড়ে আটটা

বাজারে একটি মাছের আড়ৎ আছে

যেখানে এখনও মানুষের ভিড়

অনেক রাত পর্যন্ত চলে এই

মাছ আড়তের বেচাকেনা,

সুখলাল, রাম, কুদ্দুস, কাদের সহ অনেকেই

এই আড়তে মাছ

বিক্রি করতে আসে,

কান্তানগর, কাজলহার, বালশা প্রভৃতি গ্রাম থেকে।

 

তিসিখালী মাজার থেকে চাদরমুড়ি দিয়ে

নবারুণ দা’র সাথে দেখা করতে এসেছে

তরুণ বিপ্লবী

কমরেড হাশেম।

 

নবারুণ দা হোসেনের দোকান থেকে

বেরিয়ে হাশেমকে নিয়ে গেলেন

সিংড়া রোডের বিপরীতে লুপ্তপ্রায়

মন্দিরের পাশে

একটি লাটিম গাছের নীচে।

 

বাজার থেকে যে রাস্তাটা সিংড়া

সদর অভিমুখে গিয়েছে

সে পথে একটু পরেই ফিরবে

রজতের বড় দাদা।

রজত তাই এই পথেই দাঁড়িয়ে

দাদার অপেক্ষায়।

ছাতার দীঘি থেকে কেশব রায়

তার বৃদ্ধ অসুস্থ বাবাকে নিয়ে

এসেছে বাজারের ডাক্তারের

কাছে দেখাতে।

 

সিংড়া রোড দিয়ে হঠাৎ একটি

কালো জিপ গাড়ি প্রচন্ড গতিতে

এসে থামলো হোসেনের চায়ের

দোকানের সামনে।

গাড়ির হেডলাইটের আলোর বিচ্ছুরণে

রাতের চৌগ্রাম বাজার তখন প্রচন্ড

আলোকিত।

 

অজপাড়া গাঁয়ে হঠাৎ এই

ঝলসানো আলো দেখে

চমকে উঠলো কুপি দেশের মানুষ।

 

দানবীয় বুটের শব্দ করে

গাড়ি থেকে নেমে আসলো

এক দল কালো পোশাকধারী।

আর তাদের হাতে মারাত্মক সব

আধুনিক অস্ত্র।

 

কালো পোশাকীদের তান্ডবে

গুলির প্রচন্ড শব্দে

বাজারসহ সমস্ত এলাকায়

আর্তনাদ নেমে আসলো।

একে একে বন্ধ হতে থাকলো

সমস্ত দোকানপাট,

হোসেনের চায়ের দোকান

এমনকি ডাক্তারের দোকানটাও।

যে যেদিকে পারছে দিগ্বিদিক ছুটছে

ছড়িয়ে ছিটিয়ে যাচ্ছে,

সে রাতেই মারা যায়

ডাক্তার দেখাতে না পেরে চিকিৎসার

অভাবে কেশব দা’র বৃদ্ধ বাবা।

 

হায়েনা সদৃশ কালো পোশাকীরা

মাছের আড়ৎ থেকে বখরা

আদায় করে,

প্রতিবাদ করায় বুটের পদতলে

পিষ্ট হয়ে রক্তাক্ত হয় সুখলালের দেহ,

আটক হয় দাদা আসার

প্রতীক্ষায় থাকা রজত।

 

হিংস্র কালো পোশাকীদের

নিশানাবিহীন গুলিতে

আহত হয়

কমরেড হাশেম।

বুলেটের আঘাতে বিধ্বস্ত নবারুণ দা’র

নিথর দেহ পড়ে থাকে লাটিম গাছের নীচে।

 

এই

নবারুণ দা

যিনি এই চলনবিল এলাকার

খেটে খাওয়া মেহনতি মানুষের

মুক্তির জন্য ছিলেন

আমৃত্যু নিবেদিত।

স্বপ্ন দেখতেন সশস্ত্র বিপ্লবের,

গ্রাম দিয়ে শহর ঘিরে ফেলার

মাধ্যমে সর্বহারার রাজ কায়েমের,

একটি বৈষম্যহীন শোষণমুক্ত

সমাজের।

 

পরের দিন খবরের কাগজে

জানতে পারি,

তারা নাকি এসেছিলো

আমাদের শান্তি ফিরিয়ে দিতে

আমাদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে,

ডজন হত্যা মামলার আসামী দুর্ধর্ষ চরমপন্থি ক্যাডার

নবারুণ দা নিহত ও হাশেম আহত।

আর তাদের হাতে গ্রেফতার হয়েছে

অস্ত্রসহ ভয়ংকর সন্ত্রাসী রজত।।

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.