লিখেছেন: শাহেরীন আরাফাত

election-2013গত কয়েকদিন দেশের প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া ছিল বেশ সরগরম, যার মোদ্দা কথা চার সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন। যেহেতু বর্তমান প্রেক্ষাপটে সরকারের তরফে কেবল ঘরোয়া রাজনীতিই বৈধ রাখা হয়েছে, তাই রাজনৈতিক বিশ্লেষণের হিসেব কষা ও প্রচারাভিযানের কাজে শাসক শ্রেণীর সরকারী ও বিরোধী অংশ উভয়েই বেশ ব্যস্ত সময় কাটিয়েছে এখানকার ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া, তথা টক শোগুলোতে।

কেন্দ্রমুখী ব্যবস্থায় সরকার চাইছে না ঢাকায় বিরোধী দলীয়, অথবা সরকারী দলের নিজ বলয়ের বাইরের কেউ ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে জিতুক। আবার বিএনপি, তথা বিএনপি সমর্থিত সাদেক হোসেন খোকা মেয়র থাকাকালীন সময়ে জনগণ সিটি কর্পোরেশনের চরম দুর্নীতি প্রত্যক্ষ করেছে, কিন্তু তা সত্ত্বেও সরকার দলীয়দের দুরাচারে অতীষ্ট জনগণ তাদের প্রতি সমর্থন নাও দিতে পারে! আর যাই হোক না কেন, কোন ক্ষমতাসীন সরকারই চাইবে না ঢাকা হাতছাড়া করতে। তাই সরকার, তথা নির্বাচন কমিশন (ইসি)ঢাকায় নির্বাচন করার কথা বললেও নানা টালবাহানায় তা পিছিয়ে দিয়েছে। তবে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঠিক আগ মূহুর্তে সিলেট, বরিশাল, রাজশাহী ও খুলনা, চার সিটি কর্পোরেশনের এই নির্বাচন, এই নির্বাচনের প্রভাব সরসরি পড়বে সামনের জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও নির্বাচন পূর্ববর্তী রাজনীতিতে। আর মূলত এই বিষয়টাই এ লেখায় তুলে ধরার চেষ্টা করব।

সর্বশেষ প্রাপ্ত নির্বাচনী ফলাফল

সিলেট সিটি করপোরেশন (সিসিক) নির্বাচনে ১৮ দলীয় জোট প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরী (টেলিভিশন প্রতীক) এক লাখ সাত হাজার ৩৩০ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী বদর উদ্দিন আহমদ কামরান পেয়েছেন ৭২ হাজার একশ’ ৭৩ ভোট। বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে ১৮ দলীয় জোট প্রার্থী মো. আহসান হাবিব কামাল (আনারস প্রতীক) ৮৩ হাজার ৭৫১ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ সমর্থিত মো. শওকত হোসেন হিরন (টেলিভিশন প্রতীক) ৬৬ হাজার ৭৪১ ভোট পেয়েছেন। খুলনা সিটি কর্পোরেশন (কেসিসি) নির্বাচনে জয়লাভ করেছেন বিএনপি সমর্থিত মেয়র প্রার্থী মনিরুজ্জামান মনি। চূড়ান্ত বেসরকারি ফলাফল অনুযায়ী মনি (আনারস প্রতীক) পেয়েছেন ১ লাখ ৮১ হাজার ২৬৫ ভোট। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ সমর্থিত মেয়র প্রার্থী তালুকদার আব্দুল খালেক (তালা প্রতীক)পেয়েছেন ১ লাখ ২০ হাজার ৫৮ ভোট। রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন (আরসিসি) নির্বাচনে মেয়র পদে ১৮ দলীয় জোট সমর্থিত প্রার্থী মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল আনারস প্রতীক নিয়ে বেসরকারিভাবে বিজয়ী হয়েছেন। ঘোষিত ফলাফলে জানা যায়, মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল পেয়েছেন এক লাখ ৩১ হাজার ৫৮ ভোট। অন্যদিকে, তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী খায়রুজ্জামান লিটন তালা প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ৮৩ হাজার সাতশ ২৬ ভোট।

ফলাফলের বিশ্লেষণ

ফলাফল বিশ্লেষণ করতে গেলে প্রথমেই যে তথ্য ফুটে উঠে, তা হলো চার সিটি কর্পোরেশনেই আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীর পরাজয়। একে বিএনপি, বা ১৮ দলীয় জোটের জয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকার দলীয়দের স্বৈরশাসনে অতীষ্ট জনগণের কাছে আর কোন অপশন নাই বলেই বারংবার শাসক শ্রেণীর অপর অংশ বিরোধী দল ক্ষমতায় আসে। পরপর দুই টার্ম ক্ষমতায় থাকাটা এখানে প্রায় অসাধ্যের কাছাকাছি। বিশ্লেষকদের মতে, সারা দেশের মতো চার সিটি কর্পোরেশনেও সরকার দলীয়রা গত সাড়ে চার বছরে জনগণকে ন্যূনতম স্বস্তি দিতে পারেনি, তাই জনগণ তাদের প্রত্যাখ্যান করেছে। কিন্তু আমি বিষয়টা এতো সহজভাবে দেখার পক্ষপাতী নই। বিশেষজ্ঞদের এতো বিচার বিশ্লেষণ সত্ত্বেও মনে কিছু প্রশ্ন জাগে আওয়ামী লীগের মতো একটি পরিপক্ক দল, যারা রাষ্ট্র ক্ষমতায়ও আসীন, তারা কি কোন পূর্বানুমান পায়নি যে, এই নির্বাচনে তাদের এমন ভরাডুবি ঘটতে যাচ্ছে, যেখানে তাদের হাতে রয়েছে গোয়েন্দা সংস্থা, প্রশাসনও তাদের হাতের মুঠোয়? আবার ফলাফল ঘোষণার পর তারা কি এতোটাই অহিংস মহানুভব হয়ে গেলেন যে, নিজেদের পরাজয় এতো সহজে মেনে নিলেন? অন্ততঃ সূক্ষ্ম অথবা স্থুল কারচুপির অভিযোগ আশা করেছিলাম তাদের কাছ থেকে, সেটাও তারা করলেন না। এ কি রাতারাতি গজিয়ে উঠা মহানুভবতা, নাকি এর মাঝেও কোন কিন্তুর অবকাশ রয়েছে?

চার সিটি কর্পোরেশনের পরাজিত প্রার্থীরাই ফলাফল মেনে নিয়েছেন। সিলেটের সদ্য সাবেক মেয়র বদর উদ্দিন আহমদ কামরান বলেন, “জনগণ যে রায় দিয়েছে তাতেই আমি সন্তষ্ট। শান্তিপূর্ণভাবে ভোট প্রদান করার জন্য নগরবাসীর কাছে আমার কৃতজ্ঞতা।” অন্যান্য পরাজিত প্রার্থীদের কেউ নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ আনেননি। আর জয়ী প্রার্থীরা নিজেদের জনপ্রতিনিধি প্রমাণের জন্যই বলবেন নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হয়েছে। যদিও নির্বাচন চলাকালীন সময়ে ১৮ দলীয় জোট সমর্থিত প্রার্থীরা এবং বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা চার সিটি কর্পোরেশনেই ব্যাপক ভোট কারচুপি ও অনিয়মের অভিযোগ তোলেন ইসি (নির্বাচন কমিশন) ও ক্ষমতাসীন সরকারের প্রতি। কিন্তু যখনই তারা নিজেদের জয় সুনিশ্চিত দেখেন, তখনই ভোল পাল্টে ইসির প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে ওঠেন। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খান বলেন, “আমরা ইসিতে কয়েক দফা এসেছি শুধু সুষ্ঠু নির্বাচনের আশায়। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে আমাদের জন্য ভাল, সরকারের জন্যও ভাল। নির্বাচন কমিশনের প্রতিও ট্রাস্ট বাড়বে জাতির। ইসির প্রতি আমরা সন্তুষ্ট।” আমানউল্লাহ আমান বলেন, “ইসির ভূমিকার প্রশংসা করি। তাদের ধন্যবাদ জানাই আমরা।” এতে সায় দেন বরকত উল্লাহ বুলু ও শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি। প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ সবাইকে জনরায় মেনে নিতে বলেছেন। সিইসি বলেন, “প্রতিটি নির্বাচনই আমাদের কাছে চ্যালেঞ্জিং। এবারের মতো আগামীতেও ধারাবাহিকতা বজায় রাখব ইনশাহ আল্লাহ। আমরাও সতর্ক ছিলাম। আমাদের সামনে বড় টেস্ট রয়েছে। ওই নির্বাচন করেই সন্তুষ্টি প্রকাশ করব।” আবার বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এক কাঠি সরেশ কথা বলেছেন, তিনি চার সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনকে অভিহিত করেন “নিরব বিপ্লব” হিসেবে! তিনি বলেন, “আংশিক ফলাফলের থেকে এটা পরিষ্কার হয়ে গেছে, শত বাঁধাবিপত্তির পরও চার সিটি কর্পোরেশনে জনগণ ‘নিরব বিপ্লব’ ঘটিয়েছে। এর মাধ্যমে সরকারের অন্যায়অত্যাচার ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনগণের রায় প্রকাশ পেয়েছে।” এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি চার সিটি কর্পোরেশনে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনকেই নির্দেশ করেন, কারণ নির্বাচনে কারচুপি হলে তাকে নিশ্চয় আমরা “অবাধ” বলতে পারি না! প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, “আমরা থাকলে নির্বাচন নিরপেক্ষ হয়।” আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ হানিফ, যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু প্রমুখ বিরোধী দল সমর্থিত মেয়রদের অভিনন্দন জানিয়েছেন। ওবায়দুল কাদের বলেন, “আমেরিকার নির্বাচনের চার মাস আগে ওবামার জনপ্রিয়তা কম ছিলো, আমাদের এখনো পাঁচ মাস সময় রয়েছে।”

উপরোক্ত বক্তব্যসমূহের বিশ্লেষণে আমরা খুব সহজেই বুঝতে পারি যে, বক্তব্যদাতাদের ভাষ্য মতে এই সরকারের আমলেই একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও কারচুপিমুক্ত নির্বাচন আয়োজন করতে সক্ষম বর্তমান নির্বাচন কমিশন। আর তা বিরোধী দলীয় নেতারাও মেনে নিচ্ছেন, অথবা এর বিরুদ্ধে জোরালোবক্তব্য রাখতে তারা ব্যর্থ। খুব স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে একটা নির্বাচিত সরকারের আমলে যখন সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন সম্ভব, তখন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থায় যাওয়ার যৌক্তিকতা কতোটুকু? আর এমতাবস্থায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন করার কী আদৌ কোন প্রয়োজনীয়তা রয়েছে? ক্ষমতাসীন সরকার হয়তো এটাই চাইছে। এই প্রশ্নগুলো ব্যাপকভাবে উঠে আসাটাই তাদের আরেকবার ক্ষমতাসীন হওয়া না হওয়ার ক্ষেত্রে অনেকাংশে কার্যকর। কারণ তত্ত্বাবধায়ক সরকার বর্তমান ক্ষমতাসীনদের কথা মতো কাজ নাও করতে পারে, আর বর্তমান সরকারের ক্রমাগত গণবিরোধী অবস্থানের কারণে অতীষ্ট জনগণের সমর্থনও তারা পাবেন না, সে কথা তাদেরও অজানা নয়, আর সেক্ষেত্রে ক্ষমতায় আবারো টিকে থাকতে হলে আওয়ামী লীগের নিজেদের ক্ষমতায় থাকাবস্থায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত করার কোন বিকল্প নাই। আর সে নির্বাচনে প্রভাব খাটিয়ে সুকৌশলে নির্বাচনকে বৈধ দেখিয়ে তথাকথিক গণতান্ত্রিক প্রত্যাবর্তনের পর প্রথম বারের মতো দ্বিতীয় দফায় তারা ক্ষমতাসীন হতে পারে। অতীতে বিএনপিজামায়াতের আমলে আমরা দেখেছি প্রশাসন বিএনপির মন মতো সাজানো গোছানোর পরেও তাদের শেষ রক্ষা হয়নি। তাই নানান হিসেব নিকেশ কষেই আওয়ামী লীগের মতো একটা দল রাজনৈতিক চাল চালবে, যার মূল লক্ষ্য ক্ষমতার রাজনীতি। অতীতেও আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় যাওয়ার স্বার্থে তাদের রাজনৈতিক নীতিবোধের তোয়াক্কা না করে অনেক কাজই করেছে। অতীতে তারা যেমন চিহ্নিত রাজাকারদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আন্দোলন করেছেন, পরবর্তীতে রাজাকারের বিচারের কথা বলে ক্ষমতাসীনও হয়েছেন, আবার এই বিচার প্রলম্বিত করার পেছনেও জামায়াতের সাথে আওয়ামী লীগের আঁতাতের অভিযোগ উঠেছে! আর বিএনপির প্রতিক্রিয়াশীল অবস্থান সুস্পষ্ট। তাদের সাম্রাজ্যবাদের দালালী বা ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতি নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নাই।

নয়া ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রে স্বৈরতান্ত্রিক গণতন্ত্র

বাংলাদেশের মতো একটা নয়া ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রে শাসক শ্রেণীর অবস্থান সর্বদাই গণবিরোধী, বিদেশী প্রভুদের দালালী আর আনুগত্য প্রদর্শন ছাড়া তাদের পক্ষে ক্ষমতায় টিকে থাকাটাও সম্ভব নয়। (বাংলাদেশের রাষ্ট্র কাঠামো সম্পর্কে পূর্ববর্তী লেখায় – “গণতান্ত্রিক সংবিধান ও নয়াঔপনিবেশিক ব্যবস্থা সম্পর্কে কিছু কথা” কিছু কথা বলা আছে।) আর গত সাড়ে চার বছরে আন্তর্জাতিক প্রচার মাধ্যমে ক্ষমতাসীন সরকারের বাঁধভাঙ্গা দুর্নীতি, দলীয় সন্ত্রাস ও ভিন্নমতের প্রতি অসহিষ্ণু আচরণের যে চিত্র উঠে এসেছে, সর্বোপরি “ইউনুস ইস্যু”তে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সাথে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে ক্ষমতাসীনেরা সাম্রাজ্যবাদের বিরাগভাজন হয়েছেন। আর এ থেকে উত্তরণের জন্য দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলী দিয়ে ক্ষমতাসীন সরকার সাম্রাজ্যবাদসম্প্রসারণবাদের সাথে বিভিন্ন গোপন চুক্তি করেছে, করছে, সম্প্রতি সন্ত্রাস বিরোধী আইন সংশোধন করাটাও সেই বিদেশী প্রভুদের প্রতি আনুগত্যের প্রদর্শন। তবে লোক দেখানো হলেও ক্ষমতায় টিকে থাকতে হলে কিছু না কিছু তো তাদের করে দেখাতে হবেই! আর যদি নিজেদের ক্ষমতায় থাকাবস্থায় একটা অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন তারা করতে পারেন, যা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরাও সার্টিফাই করছে, তাতে তাদের পক্ষে সাফাই গাওয়ার কিছু অন্ততঃ পাওয়া যাবে! আর সাম্রাজ্যবাদীরা ক্ষমতাসীন সরকারের আমলেই সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব, এমন নিশ্চয়তা দিলে শাসক শ্রেণীর বিরোধী দলীয় অংশের সাধ্য নেই নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকার। আর ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং কি জিনিষ, তা নিশ্চয় শাসক শ্রেণীর ক্ষমতাসীন বা বিরোধী, কোন অংশেরই অজানা নয়!

ভোটের রাজনীতিতে ক্ষমতা দখলটাই মূল কথা, এখানে এক একজন মানুষ কেবলই এক একটা ভোট, যে ভোটগুলো মিথ্যা নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে নিজেদের ঘরে তোলাটাই এখানকার গণতন্ত্রের নমুনা। যদিও তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা কোন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে থাকতে পারে না, তথাপি বাংলাদেশ রাষ্ট্রের মতো একটি স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থায়, যেখানে দালাল শাসক শ্রেণীর ক্ষমতার দ্বন্দ্বের বলি হচ্ছে এখানকার ব্যাপক নিপীড়িত জনগণ, সেখানে এমন ব্যবস্থার মাধ্যমেই শাসক শ্রেণীর ক্ষমতাসীনদের মসনদ পরিবর্তন নিশ্চিত করাটা যৌক্তিক। এই ক্ষমতার পালাবদল অনেকটা ক্রিকেটের ১ ইনিংসে এক দল ব্যাটিং করার পর পরবর্তী ইনিংসে সে দলের বোলিং করার মতোই! একটা নয়া ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রে দালাল শাসক শ্রেণীর মধ্যকার আভ্যন্তরীন ক্ষমতার দ্বন্দ্ব যখন বৈরী আকার ধারণ করে, তখনই কেবল তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার মতো একটি সমন্বয়কারী ব্যবস্থা জারি করা হতে পারে। আর বর্তমান অবস্থাকে কোনভাবেই গণতান্ত্রিক বলা যাবে না, বরং ৯০এর দশক থেকেও এখনকার অবস্থায় বিশেষ অবনতি সাধিত হয়েছে। তাই অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা অবশ্যই থাকতে পারে, অন্ততঃ শাসক শ্রেণীর ক্ষমতার পালাবদলে ব্যাপক নিপীড়িত জনগণের জানমালের রক্ষার জন্য এটি কার্যকর থাকা দরকার।

আরো কিছু কথা

যারা বলছেন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সংহত করতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পরিত্যাগ করতে হবে, তারা আপাত গণতন্ত্রের সাফাই গাইলেও মূলত এটি অগোচরে রাখছেন যে, এখানে ন্যূনতম গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাও অবশিষ্ট নাই, আর শাসক শ্রেণীর এই ক্ষমতার বদলকে তারা গণতন্ত্রের নাম দিলেও এই ব্যবস্থা কখনোই গণতান্ত্রিক নয়, কারণ এই ব্যবস্থার সাথে যেমন গণমানুষের সংশ্রব নাই, তেমনি কেবল পাঁচ বছর পর পর নির্বাচন অনুষ্ঠানকে কোন গণতান্ত্রিক চেতনা সম্পন্ন মানুষ গণতন্ত্র বলে আখ্যায়িত করতে পারেন না। আর এই অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থার দায়ভার যতোটুকু ওই দালাল শাসক শ্রেণীর রাজনীতির, ততোটুকুই এখানকার প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক ও মার্কসবাদী বিপ্লবী রাজনীতির ধারকদেরও। প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক ও মার্কসবাদী বিপ্লবী রাজনীতির অনুপস্থিতিতেই দালাল শাসক শ্রেণী জনগণকে আরো ব্যাপকহারে নিপীড়ন করছে, সেই সাথে তাদের দালালীর রাজনীতির প্রসারও ঘটাচ্ছে জনগণকে প্রতিনিয়ত হাজারো মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে। এই সন্ত্রাসী, গণবিরোধী শাসক শ্রেণীকে তখনই উচ্ছেদ করা সম্ভব যখন প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক ও মার্কসবাদী বিপ্লবী রাজনীতির উত্থান সম্ভব হবে, তথা গণতান্ত্রিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ জনগণের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাবে।

এই ভোটের রাজনীতি, তথা নির্বাচনের মাধ্যমে যে প্রহসনের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত করা হয়, তা সর্বোতভাবে গণবিরোধী শক্তির উত্থানকেই নিশ্চিত করে, তবে তা অবশ্যই গণতন্ত্রের লেবাসে। আর এই গণতন্ত্র হলো সাম্রাজ্যবাদের নির্দেশিত নির্বাচন সর্বস্ব গণতন্ত্র, এর সাথে ব্যাপক নিপীড়িত জনগণের ক্ষমতায়নের কোন সম্পর্ক নাই। এই রাষ্ট্রে এক একজন নাগরিক যেন এখানে এক একটা ভোটিং মেশিন! কেবল নির্বাচনের মাধ্যমে কোন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বিনির্মাণ সম্ভব নয়। বরং জনগণের ক্ষমতায়ন, তথা জনগণের শাসনই পারে একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে নিশ্চিত করতে।।

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s