লিখেছেন: শাহেরীন আরাফাত

জনগণএকটি রাষ্ট্রের গঠন প্রক্রিয়ায় তার সকল শ্রেণী পেশার মানুষের অংশগ্রহণ ও ব্যাপক জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার সংরক্ষণ করতে পারলেই কেবল সেটি একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। কোন রাষ্ট্রের সংবিধান পাঠের দ্বারা সেই রাষ্ট্রের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের অনেকটাই উন্মোচিত হয়। বাংলাদেশ রাষ্ট্র যে গণতান্ত্রিক চেতনায় গঠিত হওয়ার কথা ছিল, অথবা এখানকার জনগণ যে গণতান্ত্রিক চেতনায় লড়াইসংগ্রাম করেছে, রাষ্ট্র গঠন প্রক্রিয়ায় তার কোন প্রতিফলন আমরা প্রত্যক্ষ করিনি।

লাখো মুক্তিকামীদের আত্মবলিদানে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত হয়, যাতে এখানকার জনগণ পরোক্ষ অথবা প্রত্যক্ষভাবে আত্মনিয়োগ করেন, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল মাতৃভূমিকে হানাদার মুক্ত করে জনগণের আইন, জনগণের শাসন প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধকে অসমাপ্ত রেখে ঘোষণা করা হয়, মুক্তিযুদ্ধ শেষ, আমরা স্বাধীন, জন্ম নেয় বাংলাদেশ রাষ্ট্র। কিন্তু জনগণের মুক্তি আজো অধরা।

যে উঠতি বুর্জোয়া শ্রেণীর হাতে তৎকালীন মুক্তিকামীদের বৃহৎ অংশের নেতৃত্ব ছিল, তারা কোনভাবেই জাতীয় চেতনার অধিকারী ছিলেন না, তারা ছিলেন সাম্রাজ্যবাদীসম্প্রসারণবাদী শক্তির সাথে সরাসরি সম্পর্কিত। যার ফলে পরবর্তীতে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের রাষ্ট্র ক্ষমতা, তথা রাষ্ট্র গঠন প্রক্রিয়াটিও যখন এদের হাতে উঠে আসে, তখন তারা আত্মনির্ভরশীল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের দিকে না গিয়ে পাকিস্তানী কাঠামোয় একটি নয়া ঔপনিবেশিক ধাঁচের রাষ্ট্র কাঠামোই বিনির্মাণ করেন। রাষ্ট্রের সংবিধান গঠনে রাষ্ট্রের জনগণের সকল অংশের মত ও প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ নিশ্চিত না করে, জনগণের তথা মুক্তিযুদ্ধের গণতান্ত্রিক চেতনাকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে সাম্রাজ্যবাদের পছন্দানুযায়ী একটা কমিটি গঠন করে সংবিধান রচনা করা হয়। আর সেই সংবিধান ইংল্যান্ড ও ভারতের সম্মতি পাওয়ার পরেই কেবল গৃহীত হয়। সংবিধানের সর্বত্র ঔপনিবেশিক আইন বলবৎ রেখে এবং গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের মূলা ঝুলিয়ে সেখানে একব্যক্তি কেন্দ্রিক শাসন ব্যবস্থা কায়েম করা হয়। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সরকা প্রধানের ক্ষমতা যেকোন রাষ্ট্রের সরকার প্রধান থেকেই কেবল বেশি নয়, এর তুলনা হতে পারে কেবল রাজতান্ত্রিকসামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থার সঙ্গে।

যে সংবিধানে মৌলিক অধিকারের কথা বলছে, সেই সংবিধানই বলছে রাষ্ট্র তার জনগণকে মৌলিক অধিকার নিশ্চিত না করলে জনগণের এ নিয়ে মামলা করারও অধিকার নাই, সেখানে ব্যক্তি স্বাধীনতার কথা বলা হয়েছে, আবার সংবিধানেরই অপর বক্তব্যে তা রহিত করা হয়। একই রূপ স্ববিরোধী অবস্থান রয়েছে ধর্মনিরপেক্ষতা ও মানবাধিকারের ক্ষেত্রেও। অথচ রাষ্ট্র কর্তৃক গোপন চুক্তি, তথা সাম্রাজ্যবাদের পদলেহনের বৈধতা স্বয়ং এই সংবিধান প্রদান করছে! ঠিক তেমনি ক্রসফায়ারের বৈধতাও দিচ্ছে এই সংবিধান। বৈধতা দিচ্ছে সংসদ কর্তৃক যে কোন গণবিরোধী আইন পাসের, আর তাতে জনগণ কোন হস্তক্ষেপও করতে পারবে না!

শাসক শ্রেণীর বর্তমান ক্ষমতাসীন অংশ চাইছে যে কোন প্রকারে হোক আরো এক টার্ম ক্ষমতায় টিকে থাকতে। আর এতে তাদের মূলত সাম্রাজ্যবাদী মার্কিন ও সম্প্রসারণবাদী ভারতের সমর্থন অন্যন্ত জরুরী। ভারতকে খুশী করতে করিডোরটেলিকরিডোর দেওয়া হয়েছে, সুন্দরবনের জীববৈচিত্র ধ্বংস করে হলেও তারা নিজেদের আনুগত্য প্রদর্শনে অঙ্গিকারাবদ্ধ! অপরদিকে, মার্কিন প্রশাসনকে খুশী করতে ক্ষমতাসীনেরা শাহরিয়ার কবিরদের মতো দালালদের ব্যবহার করছে, যারা সন্ত্রাস বিরোধী যুদ্ধে মেরিন সেনাদের এখানে আহবান জানায়। আবার সরকার এখানে এফবিআইএর স্থায়ী এজেন্ট নিয়োগ দেয়। সম্প্রতি সরকারী দল সাম্রাজ্যবাদের প্রতি নিজেদের আনুগত্যের নিদর্শন স্বরূপ সন্ত্রাস বিরোধী (সংশোধিত) বিল ২০১৩ জাতীয় সংসদে পাস করেছে। যে আইনের সার কথা হলো অন্য রাষ্ট্রের সম্পত্তির ক্ষতি করলে যাবজ্জীবন, এমনকি তাতে ‘প্ররোচিত’ করলেও ১৪ বছরের কারাদণ্ড। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে বলা কথার কারণেও এই আইনে বিচার করা যাবে। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের তথাকথিত বন্ধু রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে মুখ খুললেই টুটি চেপে ধরা হবে! তার মানে এখানে সাম্রাজ্যবাদসম্প্রসারণবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া থেকে জনগণকে বিরত থাকতে বাধ্য করা হবে। সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী অবস্থানকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বলেও অভিহিত করার সুযোগ রয়েছে।

বিরোধী দল এই আইন পাসের কারণে ওয়াকআউট করলেও তাদের অবস্থানও সরকারী দল থেকে ভিন্ন কিছু নয়। সাম্রাজ্যবাদসম্প্রসারণবাদ কর্তৃক সহযোগিতাপুষ্ট গণবিরোধী র‍্যাব তারাই গঠন করেছেন। ক্রসফায়ারগুমকে তারাই জনস্বার্থের দোহায় দিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন। প্রধান বিরোধী দলীয় নেতা সাম্রাজ্যবাদী মার্কিনীদের বাংলাদেশে আক্রমণের আমন্ত্রণ জানিয়ে পত্র লিখে তা মার্কিন পত্রিকাতে ছাপিয়েছেন। তারা হয়তো এ কারণে ওয়াকআউট করেছেন যে, তারা কেন আগে এমন আইন পাস করে নিজেদের আনুগত্য প্রকাশ করেননি! আগামীতে হয়ত বিরোধী দলীয়রা ক্ষমতায় গেলে সাম্রাজ্যবাদী চিন্তা করলে গুম করা হবে মর্মে আইন জারী করতে পারেন!

মূলতঃ একটি নয়া ঔপনিবেশিক ব্যবস্থায় যে দালাল শাসক শ্রেণী ক্ষমতাসীন থাকে, বাংলাদেশেও আমরা সেটাই লক্ষ্য করছি। এখানে জনগণের গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে চক্রান্ত আখ্যা দেওয়া হয়, এখন নতুন আইন করে জনগণের এই গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী চক্রের অন্তর্গতও প্রমাণ করা হতে পারে!

কিন্তু তার মানে কি জনগণের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা দমে যাবে? কখনোই না। নিপীড়ন অব্যাহত থাকলে ব্যাপক নিপীড়িত জনগণ সময়ে সময়ে তাদের স্বতস্ফুর্ত বিদ্রোহও জারী রাখবেন। দরকার কেবল জনগণের বিপ্লবী চেতনাকে ধারণ করতে পারে এমন একটি মার্কসবাদী বিপ্লবী রাজনৈতিক সংগঠন। যে সংগঠন জনগণের সকল অংশে কাজের মাধ্যমে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারবে, পারবে সাম্রাজ্যবাদ ও এর দেশীয় দালাল শাসক শ্রেণীর বিরুদ্ধে একটা জোরদার আন্দোলন গড়ে তোলে দালালদের সমূলে উচ্ছেদ করে জনগণের আইন, জনগণের শাসন কায়েম করতে। ব্যাপক নিপীড়িত জনগণের এটাই মুক্তির সোপান

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s