লিখেছেন: শাহ্জাহান সরকার

সর্বহারার প্রতীক...ধর্ম ও রাষ্ট্রের মধ্যেকার সম্পর্ক নিয়ে আজকাল কিছু লেখা মানুষকে বিজ্ঞান মনস্ক ভাবনার দিকে যেমন উদ্বুদ্ধ করেছে। অপরদিকে মানব জাতির ইতিহাসকে ধর্মনিরপেক্ষতার নানা রকম কর্তৃত্ববাদের ফলাফল হিসেবে আলোচনা মধ্যে সীমাবদ্ধ করে নানা তথ্যউপাত্ত দ্বারা ধর্ম ও আধুনিক রাষ্ট্রের মধ্যেকার বিরোধ নিস্পত্তি করার ফরমায়েসি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ধর্ম সংক্রান্ত প্রকৃত বৈজ্ঞানিক ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত না করে এবং বিভিন্ন শ্রেণী রাষ্ট্রের উৎপত্তির সাথে ধর্ম ও সমাজ এবং রাষ্ট্র ও ধর্মের মধ্যেকার বিরোধগুলির ঐতিহাসিক মর্মার্থ ব্যাখ্যা না করে ধর্মনিরপেক্ষতার বাহ্যিক কতগুলি লক্ষণকে এ সংক্রান্ত গবেষণার কেন্দ্রবিন্দু করে ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছার ইচ্ছা যেমন সস্তা তেমনি তা ইউটোপীয় বটে। ফলে ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত কেবল মাত্র একটা মামুলি বিতর্কে পর্যবসিত হয় শুধু তাই নয়, উপরন্তু তা প্রকৃত ধর্মনিরেপেক্ষ রাষ্ট্রের বদলে জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারে তাকে প্রতিহত করার জ্ঞান চর্চাকেই প্রতিষ্ঠিত করার অপপ্রয়াস হয়ে দাঁড়ায়। এরূপ মতবাদের ক্ষেত্রে মানব জাতির সভ্যতার ইতিহাসকে প্রধানত শ্রেণী সংগ্রামের ইতিহাসের বেদিতে গভীর বিশ্লেষণের দ্বারা না দেখার অলসতা থেকে এ সবের উৎপত্তি ঘটছে বলে ধরা যেতে পারে। ইচ্ছাকৃতভাবে ঐতিহাসিক শ্রেণী সংগ্রামকে এড়িয়ে এ কাজে প্রবৃত্ত হওয়ার অর্থ হচ্ছে অবান্তর ও নিষ্ফল উদ্দেশ্য প্রণদীত কাজের অংশ। এবং এর অর্থ হচ্ছে শ্রেণী বিভক্ত সমাজ ও রাষ্ট্রে ধর্মকে শাসক শ্রেণীর শোষণের হাতিয়ার হিসেবে না দেখে ধর্ম ও জাতীয়তার পরম অর্ঘের মধ্যেকার উপরি বিবাদ হিসেবে দেখার একতরফা দৃষ্টিভঙ্গির বিচ্যুতির প্রতিফলনও বটে। ধর্ম ও আধুনিক রাষ্ট্রের মধ্যেকার দ্বন্দ্ব নির্দিষ্ট রাজনৈতিকঅর্থনীতির সস্তা ভাবাদর্শের মধ্যেকার বিরোধ হিসেবে দেখার পদ্ধতি হচ্ছে প্রাথমিক জ্ঞানতত্ত্বের স্তরে পড়ে থাকার ভাববাদী দৃষ্টবাদের সামিল। ধর্মীয় চেতনা যেমন নির্দিষ্ট রাজণীতিঅর্থনীতির ভাবাদর্শগত প্রতিফলন তেননি তা মতাদর্শিকভাবে প্রতিক্রিয়াশীল শাসকগোষ্ঠীর ‘কারিকা’ শক্তিও বটে। ফ্রান্স বিপ্লবের পরে প্রগতিশীল বুর্জোয়া শাসক গোষ্ঠী ধর্মীয় মতাদর্শের ‘কারিকা’ শক্তির সাথে আপোষরফা করে মানব জাতির ইতিহাসকে কলঙ্কিত করেছিল। এভাবেই বুর্জোয়া শাসক শ্রেণী মানবজাতির ইতিহাসে তার গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকাকে শ্রেণী স্বার্থে বিসর্জন দিয়ে এবং শ্রেণী বৈষম্যের বিভিন্ন রূপের উদারনৈতিক ধর্মীয় মতবাদকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দান করে প্রতিক্রিয়াশীল শ্রেণীতে পরিণত হয়েছে। ইংল্যান্ড, আমেরিকা ও ইউরোপের অন্যান্য পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলি ঐ পথেই ধাবিত হয়েছে। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যেতে পারেধর্মীয় আন্দোলন হিসেবে উদারতাবাদ রোমান ক্যাথলিকদের সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়। অপরদিকে ক্যালভিনপন্থীদের ফরাসি হুগুয়েন্টদের এবং প্রটেস্টান্ট সম্প্রদায়ের ধর্মীয় স্বাধীনতার সংগ্রামকে রাজনৈতিকভাবে সমর্থনের নামে প্রটেস্টান্টদের মধ্যেকার মেহনতীদের স্বার্থ বিবেচনা না করে বুর্জোয়া ও ধর্মীয় শাসকশ্রেণীর স্বার্থ রক্ষা করা হয়। এভাবে তথাকথিত নির্দেশকারী ধর্মনিরপেক্ষতাকে (Assertive Secularism) বিসর্জন দেয়া হয়। সপ্তদশ শতাব্দীতে ইংল্যান্ডের গৃহযুদ্ধকালে উদারতাবাদ রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ থেকে স্বাধীন ধর্মাচরণের অধিকারকে রক্ষা করার চেষ্টা করে। গীর্জার প্রভাব থেকে সরকার ও সরকারী প্রতিষ্ঠানসমূহকে মুক্ত রাখার প্রচেষ্ঠা লক্ষনীয়। ইংল্যান্ড ও আমেরিকার বুর্জোয়াদের শ্রেণী শোষণের স্বার্থে এরূপ আপোষকে নমনীয় ধর্মনিরপেক্ষতা (Passive Secularism) বাস্তবে কোন ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের আদর্শ হতে পারেনা।

প্রকৃতি বিজ্ঞানে ও মানবসমাজে ধর্মের সরল উৎপত্তি থেকে ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন মানব জাতির ইতিহাসকে জটিল পঙ্কে নিমজ্জিত করে। ফলে মানব জাতির বিবর্তন ও বিকাশের ধারাকে একটি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক যুগে মানব জাতির ক্রমবিকাশ যে শ্রেণী সংগামের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয় তা স্পর্ষ বা অনুধাবন না করে ধর্মনিরপেক্ষতার নানা দৃষ্টান্তের মধ্যদিয়ে যে সব বুদ্ধিজীবী সেকুলারিজমের ‘ত্রিপর্ব’ রকমফের আবিষ্কারের প্রচেষ্টা দ্বারা যে সেকুলার বা ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের সমাধান দিচ্ছেন তা বস্তুত কেতাবি অধিবিদ্যকতা ছাড়া আর কিছু নয়। এ হচ্ছে শাসক শ্রেণীকে তুষ্ট করার পক্ষে আর এক নতুন জয়গান।

কতিপয় অধ্যাপক ও সমাজ গবেষকেরা তুলে ধরেছেন তাঁদের গবেষণা লব্ধ ত্রিপর্বের ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের সংজ্ঞা। তাঁদের এ পর্যন্তকার আধুনিক বিশ্বরাষ্ট্রের জরিপের ‘বিশ্ববিক্ষা’য় তাঁরা আবিষ্কার করেছেন তিন ধরনের ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে প্রকৃতি। খুব সস্তাবাহ্যিক আর শ্রেণী সম্পর্কহীন রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গির উপর প্রতিষ্ঠিত তাঁদের ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের সরলী সূত্রায়ন।

তাঁদের মতে ধর্মনিরপেক্ষ বিশ্বরাষ্ট্রগুলিতে তিন ধরনের ধর্মনিরপেক্ষতার অনুশীলন দেখা যায়। তাঁদের মতে এগুলি হচ্ছে: ) চরম ধর্মনিরপেক্ষতা (Absolute Secularism), ) নির্দেশকারী ধর্মরিপেক্ষতা (Assertive Secularism), এবং নমনীয়/দুর্বল ধর্মনিরপেক্ষতা (Passive Secularism)(তথ্যসূত্র : খোলা কলাম : বাংলাদেশ প্রতিদিন, ১৩ জুন, ২০১৩)

তাঁদের দু’ধরণের নিস্ফল Secularismসম্পর্কে আমি উপরে উল্লেখ করেছি। চরম ধর্মনিরপেক্ষতার (Absolute Secularism) প্রসঙ্গ তুলে তৎকালিন সমাজতান্ত্রিক রাশিয়া প্রসঙ্গে যা বলা হয়েছে তাতে সমাজতান্ত্রিক রাশিয়া সম্পর্কে সমাজতন্ত্র বিরোধী আন্তর্জাতিক ভাড়াটে বুদ্ধিজীবীদের মতোই একটা সর্বাত্বকবাদী ধারণা ফেরী করা হয়েছে। কিউবা, আলবেনিয়া প্রভৃতি রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে একই কথা বলা হয়েছে। বাস্তবে এ সব ভিন্ন ভিন্ন রাষ্ট্র সম্পর্কে সঠিক রাজনৈতিক ধারণা প্রদর্শণ না করে ধর্মনিরপেক্ষতা সম্পর্কে যা কিছু বলা হয়েছে তাতে করে উক্ত লেখক ত্রয় ধর্মনিরপেক্ষতা সম্পর্কে বিভ্রান্তি বৈ সঠিক কোন দিশা দিতে পারেননি।

উপসংহারে তাঁরা বলেছেন: বাঙালি জাতীয়তাবাদীরা ‘রাষ্ট্রের ধর্মনিরেপেক্ষতা’ নীতির কথা বললেও বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদীরা বিরোধীতার খাতিরে সেটিকে ধর্মহীনতা হিসেবে প্রচার করছেন। (খোলা কলাম : বাংলাদেশ প্রতিদিন, ১৩ জুন, ২০১৩)। অর্থাৎ লেখকগণ আওয়ামী লীগকে ধর্মহীনতার হাত থেকে রক্ষা করার দায়িত্ব তুলে নিয়েছেন। এ থেকে তাঁরা প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে বাঙালি জাতীয়তাবাদী আওয়ামী লীগ ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন করার মতো ‘চরম’ ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষে নন। যে কারণে তাঁরা খুব খোলামেলা তাঁদের নমনীয় ধর্মনিরপেক্ষতার (Passive Secularism) ওকালতি করে বলেছেন: ‘…ইংল্যান্ড, আমেরিকা ও ভারতের মতো নমনীয় ধর্মনিরপেক্ষতা চর্চা করতে হলে আমাদের দেশে তৃণমূলে গণতান্ত্রিক কাঠামো প্রত্যেকের নাগরিক মর্যাদা রক্ষা করা জরুরী।’ অর্থাৎ ধর্ম সমেত গণতান্ত্রিক কাঠামো প্রত্যেকের নাগরিক মর্যাদা রক্ষাই হচ্ছে ধর্মনিরপেক্ষতার রকমফেরের মর্ম কথা বাস্তবে যা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র সৃষ্টি করতে পারেনা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সমাজতান্ত্রিক রাশিয়ার জনগণের উদ্দেশ্যে উগ্র জাতীয়তাবাদী জার্মানের কুখ্যাত এডলফ হিটলার বলেছিল: ‘নাস্তিক বলসেভিকদের হত্যার জন্যে আমি তলোয়ার উঠিয়েছি, তাই আমার যুদ্ধ ধর্মযুদ্ধ। নমনীয় ধর্মনিরেপেক্ষতার আদর্শ বাস্তবে হিটলারের অনুরূপ জাতীয়তাবাদী ধর্মযুদ্ধের নামান্তর। যার অনুশীলনে লিপ্ত বাংলাদেশের প্রতিটি বুর্জোয়া দল। ভণ্ড বামেরাও তারই অনুগামী। কিন্তু ব্যাপক জনগণের আকাঙ্খা হচ্ছে: সত্যিকার ধর্মনিরপেক্ষগণতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র। জনগণের এ আকাঙ্খা পূরণ করতে হলে রাষ্ট্র থেকে ধর্র্মের বিচ্ছেদ জরুরী। এবং এমন কর্তৃত্ববাদের পক্ষে নির্দিধায় ওকালতি করতে অস্বীকার করেনা সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শ।।

 

লেখক : পেরুর আকাশে লাল তারা, মাওবাদ বনাম আধুনিক সংশোধনবাদ গ্রন্থ প্রণেতা

shah_sarker@yahoo.com

১৪.০৬.২০১৩

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s