. মন্ত্রগ্রস্তের পুনর্জন্ম

art-42আমি মন্ত্রগ্রস্ত সাঁইত্রিশ অব্দি হেঁটেছি আর আমার সাথে নমিতার ছায়া হেঁটেছে।

 

মন্ত্র আমাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলতো মিছিলে নিয়ে যেতো দামোদর দেখাতো

মন্ত্র আমাকে নিয়ে খেলতে খেলতে রক্তনৃত্য খেলাতো

এবং তেত্রিশ ঘুরানি খাইয়ে ছেড়ে দিতো প্রত্যক্ষ নমিতার সামনে!

আমি নমিতাকে চিনতে পারতাম না

তার কোলের অকালজন্মাটাকে চিনতে পারতাম না

মনে হতো অযাচিত কে এক শশ্রুমণ্ডিত বৃদ্ধ অসম্ভব খেলাচ্ছে নমিতাকে

নমিতার মাইদুটো দুইহাতে দুইঠোঁটে ইচ্ছে মতন ঘাঁটাঘাঁটি ক’রে

বেশতো খিলখিল আনন্দেই আছো হে বাছাধন

কচুকাটা কেটে ছুড়ে দেবো দামোদরের জলেবুঝেছো!

 

আমি মন্ত্রগ্রস্ত সাঁইত্রিশ অব্দি হেঁটেছি আর আমার সাথে নমিতার ছায়া হেঁটেছে।

 

মন্ত্র আমাকে গান গাইয়েছে স্বৈরাচার নিপাত যাক মিছিলে মিছিলে

মন্ত্র আমাকে ধান বুনিয়েছে চাঁচড়ার মাঠে

আর আদুরে হাতে শূকরের মাংসভুনা তুলে দিয়ে গালে

শূদ্রপাড়ার একজন বানিয়ে সে কী গর্ব তার

ভাবখানা যেন বদলে দিয়েছে আমার পৈত্রিক খোলনলচে!

হাঁটুগেড়ে খরাজাল পাতার ভঙ্গিতে বসে বগলের রোম দেখার সমান

দুহাত ঊর্ধ্বে তুলে ধুম করতালি বাজাতে বাজাতে

ঠোঁট মুচড়ে মুচড়ে চোখের তারা নাচিয়ে নাচিয়ে

একটুও শব্দ না ক’রে মন্ত্র সেদিন হেসেছিলো অচেনা কোনো নমিতার ঢঙে

কিন্তু আমি তো দিব্যি তার যুগলস্তন নৃত্যের ঠ্যামক দেখতে পেয়েছিলাম

যুগলনিতম্ব নৃত্যের বাতাস কাঁপানো কাড়ানাকাড়া শুনতে পেয়েছিলাম

আমার বুকের দামামার ভেতর আমি জেগে উঠে দেখি নমিতা নাই

তার অকালজন্মাটা নাইতুমি কোথায় নমিতা? তোমার অকালজন্মাটা . . .?!

 

আমি মন্ত্রগ্রস্ত সাঁইত্রিশ অব্দি হেঁটেছি আর আমার সাথে নমিতার ছায়া হেঁটেছে।

 

মন্ত্র আমাকে নমিতাশূন্য ক’রে শূদ্রপাড়ার পথ ছাড়িয়ে

কপোতাক্ষ সুন্দরবন ঢাকেশ্বরীর বস্তির গলি ছাড়িয়ে

কানামাছি ভোঁভোঁ খেলাতে খেলাতে হাঁটিয়েছে যোজন যোজন।

কিন্তু একজন কবিকে কতোকাল আর দখল রাখা যাবে

মাঠের জোছনায় এখন কৃষকের আবাদি মাটির বুকে দাঁড়িয়ে

আমি হতচকিত একঝাঁক সাদাহাঁস উড়ে যাওয়া দেখতে পাচ্ছি

রোদেজলেঘামে কৃষক কি বীজে কি ফসল আবাদ করেছে

বহুজাতিক বা দিশি প্রতারক কৃষকের মাঠে কি কি প্রতারণা বিস্তার করেছে

আমি মেঠো ইঁদুরের গর্তাবধি স্পষ্ট তা দেখতে পাচ্ছি।

আমি বাউলের জরায়ুকোষ থেকে রবীন্দ্রনাথের জন্মজড় আবিষ্কার করতে করতে

আবৃত্তি করছি ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে’

মহাকালের মাঙ্গলিক বাতাস বিদীর্ণ করতে করতে উড়িধানের নিবিষ্টতায়

আমি সুভাষ মুখোপাধ্যায় রপ্ত করছি ‘ফুল ফুটুক না ফুটুক আজ বসন্ত’।

 

জুলফিতে ‘হুলিয়া’ লুকিয়ে আমাকে এই বুঝি দাবড়ে ধরলো

শহীদ মিনারের বেদিমূলে খরগোশের চোখ নির্মলেন্দু গুণ

তাঁর আলম্ব গোফ ভিজে যাচ্ছে দাড়ি ভিজে যাচ্ছে আমার অনার্য চোয়ালের ঘামে

আর আমার নাভিমূল ছেঁড়া শূন্যতা ছাড়িয়ে

আমার রক্তাক্ত বুকের মধ্যে আমি নমিতাকে স্পর্শ করতে পারছি

আমি কালঅতিক্রান্ত নমিতার অবিরাম হাঁটাচলার শব্দ শুনতে পাচ্ছি

আর বাতাস পেরিয়ে যাওয়া বাতাসে আমি নমিতার ভিজে চুলের ঘ্রাণ পাচ্ছি।

 

আমি মন্ত্রগ্রস্ত সাঁইত্রিশ অব্দি হেঁটেছি আর আমার সাথে নমিতার ছায়া হেঁটেছে।

—————————————————

 

. একাত্তরের ধর্ষক

মেঘে মেঘে ধাক্কায় আগুন জ্বলে

পৃথিবী চমকে ওঠে মেঘের আগুনে।

বৃষ্টি নদী ও সমুদ্রের জন্ম হতে হতে

বৃক্ষরাজি ফুল ও ফসলের জন্ম হতে হতে

সূর্য এবং চাঁদ দিবস ও রাত্রি

জন্মের বিলয় ও বিন্যাসে নাচতে নাচতে

সময় হেঁটে যায় সময়ের পথ

এবং সময় মহাকাল হয়ে যায়

কিন্তু প্রত্যুষ, জোৎস্না ও জন্মকাল

মানুষ হতে মানুষকে কিছুই শেখায় না।

 

একাত্তরের ধর্ষক আজও তেমনি ধর্ষকামী

নারীর প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ছুঁয়ে ছুঁয়ে

নাভিমূলের প্রতিটি রোমকূপ গুনে গুনে

কোথায় কতোকতোবার কী কী

এবং কীভাবে কীভাবে লুন্ঠনযোগ্য হবে

তা তারিয়ে তারিয়ে মুখস্থ করে!

 

সেজদার চাদর বিছিয়ে

নারীর হাত, পা, চোখ ও মুখের বন্ধন

এবং আদিঅন্ত মুখস্থ করতলে নাচাতে নাচাতে

বাতাস টুকরো টুকরো ক’রে

আবৃত্তি করে ওষ্ঠস্তনযোনি ও জরায়ু বিষয়ক পদাবলি

আর নিঃশঙ্ক কণ্ঠ দাপিয়ে বয়ান করে

নারীর নিতম্বনাভিমূলজন্ম ও জন্মদানের উত্তরাধিকার।

 

কিন্তু গোরের মাটি উপাসনালয় ও মহাকাল

একাত্তরের ধর্ষককে ধর্ষক বৈ নতুন কিছুই বানায় না।

————————————————

 

. আমি অসংবিধানিক একজন লোক

সংবিধান সম্মত আমার কোনো ঘরবাড়ি নেই

সংসদ ভবনের যতো কর্মদিবস ও তর্কাতর্কির শব্দভাণ্ডার

এসবে আমার কোনো প্রবেশাধিকার নেই।

 

আমার তন্বীকালের স্ত্রীর ওষ্ঠ ও স্তন ঠুকরে খেয়েছে কাঁকবংশী বুদ্ধিজীবীগণ।

তবু আমি নির্বিরোধ আকাশের শূন্যতায় ফানুস উড়িয়ে দিয়ে

ফুটো বেলুনের রঙের ভেতর নক্ষত্র চাঁদ ও উল্কাপতন দেখছি

আর কী অবলীলায় দেখো এই আমি জীবনটাকে কণ্ঠে তুলে

আবৃত্তি করছি ক্লিষ্টক্লিন্ন জীবনের পঙ্ক্তিমালা

বাবরিচুলো মাথা ও ভাঙাপাঁজর দুলিয়ে দুলিয়ে

খরাপোড়া ফসলের মাঠে ইঁদুরের সংসদে বসে

আমি জীবনের স্বপ্ন দেখার বেদনা ও বুকের ক্রন্দন বিষয়ে

অলিখিত এক সংবিধান পাঠ করছি

জানি না তবুও আমি সে সুযোগ পাবো কী না

রাষ্ট্রীয় সংবিধানের যেসব অংশের পুনর্লেখন খুবই প্রয়োজন ছিলো?!

 

হায়! সংবিধান সম্মত আমার কোনো অন্তর্বাস নেই

তাই বাতাসে দাপিয়ে আসা মেঘের ছায়ার অন্তর্বাসে

আমি শিশ্নটাকে শাসনে রাখি

ফুটপাথের ওতে দাঁড়িয়ে বেহুদার মতন হাসতে হাসতেই হিসি করি

গোরস্তানের ভাঙা পাঁচিলের ওতে বসে নির্দ্বিধায় পাছা খুলে দাস্ত করি

সত্যি বলতে, আমি কথিত সভ্যদের নাগালের বাইরের অসংবিধানিক একজন লোক

আমাকে সভ্যতার বুনো বাতাস তাড়িয়ে তাড়িয়ে ফেরে

রঙিন স্বপ্নে ও ভগ্নদুঃস্বপ্নেনিয়তই।

———————————————–

 

. সুবিধেবাদী মন

আমার সুবিধেবাদী মন চেষ্টা ও তদবির পছন্দ করে

অথচ আমার কিছুতেই কিছু হলো না।

নমিতা তোমার চুমুটাও বস্তুর মূল্যেই কিনতে হয়

কড়ি না খসিয়ে এখন যে কোনোখানেই কানাকড়িও মেলে নাতোমাকেও না।

 

নমিতা তুমি বিক্রয়যোগ্য খোলা হাটের ভোগ্যপণ্য আদিমে ছিলে এখনো আছো

আমি সর্বার্থেই তা মান্য করি না বটে কিন্তু ঘরের অন্ধকাওে বা জোৎস্নায় তা মিথ্যেও তো নয়

আর এই অবিশ্বাসীর শাস্তি কী হতে পারে একবার তবু ভেবে দেখো তো নমিতা?!

 

আর আমি এতকিছু না ভেবেই ঝাঁপ দি তোমার ঢেউভাঙা দেহের অথৈ জলে

ডুবুরির সত্যে একদিন কুড়িয়ে তোমার স্বাধীন হওয়ার সূত্রটাকে যদি খুঁজে পাই

তোমার জন্ম ও জলধির তলে কুড়িয়ে তোমার মানুষ হওয়াটাকে যদি খুঁজে পাই

দ্বিকালের পথ হেঁটে নক্ষত্রসমান দূরত্ব ঘুচোবার যন্ত্র তৈরির বিজ্ঞানটাকে যদি খুঁজে পাই

আর আমি তো জন্ম থেকে সেই আশায় মহাকালের পথ হাঁটছি তোমারই জলধির জলে।

——————————————–

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s