লিখেছেন: মতিন বৈরগী

art works-14-সময়ের গতির মুখে মানুষের পরিবর্তন ঘটে শারীরিক না হলেও চিন্তায়, অভ্যাসে, ব্যবহারিক রীতিতে। গতকালের মানুষটি তাই হুবহু আজকের মানুষ আর নয়। তাঁর পরিবর্তন ঘটেছে, ভাঙচূর হয়েছে, হয়ে চলেছে। এই পরিবর্তন সামাজিক তথা রাজনৈতিক, দৈশিক এবং আন্তর্দেশীয়। দর্শনের নতুন ভাবনা, বিজ্ঞানের নতুন আবিষ্কার, পুঁজির নানা স্তরিক বিকাশবিস্তৃতি মনুষ্য জীবনে যে পরিবর্তন এনেছে তা প্রতিদিনই বদলে দিচ্ছে সমাজের অবস্থা ও অবস্থান। তবে তার অর্থ এই নয় যে এই বদলানোর মধ্য দিয়ে মানুষ প্রকৃত স্বাধীনতা করায়ত্ব করতে পেরেছে বা শোষণমুক্ত সমাজে প্রবেশ করে মূক্ত চিন্তায় নিজেকে বদলে নিতে পারছে। সত্য এই যে শোষণকৌশল বদল হচ্ছে, নতুন কৌশল আরোপিত হচ্ছে। স্বাভাবিক কারণেই আমরা লক্ষ্য করতে পারি অতীতের সৃজনশীলতা আর আজকের সৃজনকাজে প্রকাশের প্রিয়তাঅপ্রিয়তা সামনে এসে পড়ছে। আজকের কাব্য আর চর্যা যুগের নয়, শুধু মাত্র আবেগও নয় কিংবা দয়িতার কাছে দয়িতের রতি নিবেদনের বিষয়ও নয়। আজকের কাব্যে প্রকাশ, রীতি, কৌশল, বুদ্ধিদীপ্ততা আলাদা হয়ে গেছে। এর তীক্ষ্ণতা, তীব্রতা, রসবোধ, শিল্পনির্মাণ, মনস্তত্ত্ব ভিন্ন রকম। তাই কবিতার শরীরে মিশেছে মানুষ, জাতি, দেশ, মহাদেশ, স্বাধীনতা কতো কী? নিজস্ব গণ্ডি ছিঁড়ে কবিতা হয়ে উঠছে বহুত্ত্বের মনোভূমি। অতীতের ধারা, আবেগ, বিষয়, বিস্ময়. আশা, উদ্দীপনা, হতাশা, ক্লান্তি হয়ে উঠছে তার উপজাত। ঐতিহ্যকে শক্তিমান করে কবিরা ব্যবহার করছেন নতুন ঐতিহ্য তৈরির কাজে। যুক্ত করছেন বুদ্ধিদীপ্ত কল্পনা আর নির্মাণে নতুন কৃতকৌশল। ফলে জাতীয় সংস্কৃতির রূপটি কেবল মাত্র দৈশিক নয় আন্তর্জাতিকও। বাংলা কাব্যের স্বার্থক কবিরা বর্তমানকে বের করে আনছেন তার অতীত থেকে বিশ্ব কবিতার সম্ভাবনায়।

মৌলিক শিল্প সব সময়ই তার সমকালীন মতাদর্শের সীমাকে ছাড়িয়ে যায় এবং মতাদর্শ যে বাস্তবকে আমাদের দৃষ্টি থেকে আঁড়াল করে রাখে, সেই বাস্তবকে দেখার অন্তরদৃষ্টি আমাদের দান করে” কথা ক’টি ‘আর্নস্ট ফিশারের’। একটি ভালো কবিতা তা যে ভাষাতেই লেখা হোক না কেন সময়ান্তরে তা দেশকালের গণ্ডিকে অতিক্রম করে মানবিক হয়ে ওঠে এবং কোনো বিশেষ মতবাদেরযা সরাসরি রাজনীতিকে প্রাসঙ্গিক করে রচিত, শিল্পগুণ আরো বেশী রূপঘন হয়ে উঠতে পারে যদি কবিতাটির রচনা শৈলী মানবতার পক্ষে থাকে এবং শেষতক মানুষের জাগরণ ক্রিয়ায় উপাত্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। আমাদের আলোচ্য কবি নয়ন তালুকদার মানবতার পক্ষে দাঁড়িয়ে মানুষের পক্ষে তার দুঃখ, বেদনা, দাহকে উপজীব্য করে বুনন করে চলেছেন কাব্যের শরীর। তাঁর কাব্যের মূল সুরটি মানব জাগরণের, মানব শক্তি বিজয়ের। মানুষ, মানুষ আর মানুষই হয়েছে তাঁর কবিতার অনুষঙ্গ। পরিপার্শ্ব, প্রকৃতি, পাখি, মৌমাছি, প্রজাপতি, নদী, সমুদ্র, মাঝি, নাও, মাছ, ব্যাঙ, সাপ, কুকুর, সজারু, ইঁদুর, নক্ষত্র, আকাশ এসেছে যথারীতি মানুষ অনুষঙ্গের সঙ্গ হয়ে।

পতাকা বহন করি

অথচ পতাকা কখনো আমার হয় না

এ কেমন জমিনে জন্ম

তবু এ কেমন পতাকাপ্রেম রক্তাক্ত বাঁচার বাসনা . . .

হায়, পতাকা বহন করি

অথচ এই পতাকা কখনোই আমার হয় না!’

[‘অথচ পতাকা’ ‘কালের ত্রয়ী পদাবলি’]

খুব সাদামাটা শব্দ বুননে রচিত পঙ্ক্তি। কিন্তু সত্যকে কিরকম উদোম করে দেয়, চিনে নিতে দেয় মানুষকে তার নিজত্বকে, তার বৃত্তবদ্ধতাকে। যে পতাকা মানুষের স্বাধীনতার প্রতীক, যা শুধুমাত্র ভৌগলিক স্বাধীনতা নয়, যা তারা লড়াই করে অর্জন করেছেআজ আর তাতে কোনো গৌরব নেই। কাব্য নির্মাণে শিথিলতার পরেও এর দাবী অনেক দূর বিস্তৃত হয়ে পাঠকের চিন্তাভাবনার দিগন্ত প্রসারিত করে নির্মাণ করে দেয় নতুন পঙ্ক্তিমালা। কল্পনাকে দূরতম করে এবং উপলব্ধিকে শাণিত করে দেখিয়ে দেয় নিজের আইডেন্টিটি।

আমি মুঠোকে শক্ত করতে পারছি না

আমি কনুইয়ের ভাঁজগুলোকে সংঘবদ্ধ করতে পারছি না

আমি লক্ষ্যভেদী চোখে মহাকালকে ধরবার জন্যে লক্ষ্য স্থির করতে পারছি না

আমি জানি না সমকালকে মুঠোয় না ধরে আমি মহাকালকে কীভাবে ছোঁব?!’

[‘আহাম্মক’ ‘কালের ত্রয়ী পদাবলি’]

মানুষের জগৎ পরিবর্তনের মূল হলো হাত, হাতকে মুক্ত করে মানুষ ঊষ হয়েছে সমাজে। হাত হচ্ছে পরিবর্তনের শ্রমের হাতিয়ার। ‘মুঠো শক্ত’ দ্বারা হাতকে সিগনিফাই করা যায়যার শক্তি বিশ্বাসকে দৃঢ় করে এবং পরিবর্তনের ধারার উপাত্ত। মুঠো শক্ত না হলে দৃঢ়তার ভিত্তি নড়বড়ে হয় এবং কনুইয়ের ভাঁজ সংবদ্ধ হওয়া মানে একত্রিত শক্তির প্রকাশ এবং চোখের সামনে দৃশ্যমান করে বাস্তবযাকে পরিবর্তন করতে হবে, দূর ইতিহাসের ধারা থেকে আগামীর সকল আগামী অব্দি। দূর আগামীতে পৌঁছাতে হলে সমকালকে বুঝতে হয় ইতিহাসের ধারায়। যা মানুষের অভিজ্ঞতার দিকে ইঙ্গিত করে, যা সঠিক হতে পারে বর্তমানের অবস্থাঅবস্থানকে জেনেবুঝে পরিবেশপরিস্থিতিসামাজরাজনীতিবিশ্বব্যবস্থা ইত্যাদিকে শক্ত হতে শক্ত মুঠোয় বিচার বিশ্লেষণ করে। হাতের মুঠো শক্ত না হলে অর্থাৎ চিন্তার জগৎ যদি পুরাণোই থেকে যায় কেবল মাত্র মৌলিক বলে সীমানাকে সীমিত রেখে স্পার্টাকাস যুগের অবস্থানকে চূড়ান্ত ভেবে নিয়ে মুঠিকে শক্ত ভাবা হয় তাহলে মুঠি শক্ত হবে কিভাবে।

অতীত শিল্পকে বুঝতে হলে বুঝবার বিষয় প্রসঙ্গে মার্ক্সএর বক্তব্য এরকম ‘ভিত্তি ও উপরিসৌধ’এর মধ্যকার সম্পর্ক আর আমাদের সঙ্গে অতীত শিল্পের সম্পর্ক। মার্ক্স বলেছেন, ‘অতীত শিল্প থেকে আমরা আধুনিক যুগেও নান্দনিক আনন্দ পাই, কারণ ঐসব প্রাচীন সমাজের ধারাবাহিকতার সঙ্গে ইতিহাস আমাদেরকে যুক্ত করে’ [টেরী ঈগলটন, মার্কসবাদ ও সাহিত্য সমালোচনা]। কোনো মানুষই তার অনুভূতিকে প্রকাশের ক্ষেত্রে কখনো ব্যক্তিমানুষসমাজরাজনীতিকে পরিহার করে তার চিন্তাকে প্রকাশ করতে পারে না। কবি তো নয়ই। ‘মানব মনের প্রাচীনতম নান্দনিক কার্যকলাপের মধ্যে কাব্যই অন্যতম’ কবির প্রকাশ যেহেতু শিল্পের মাত্রায় ঘটে সে কারণে এর সাথে যুক্ত হয় কাব্য প্রকরণ, অলঙ্কার, অনুষঙ্গ ও অন্যান্য বিষয়াবলী। কবি এই প্রকাশকে কাব্যের নানা জটিল কৃতকৌশলের মধ্য দিয়েও প্রকাশ করতে পারেন, আবার সহজসরলভাবেও প্রকাশ করতে পারেনশিল্পের প্রকরণ মেনে। কবিতা সহজবোধ্য হোক এমন প্রত্যাশা প্রায় সকল পাঠকের।

কবি নয়ন তালুকদার সমাজ সচেতন কবি, তাঁর প্রকাশিত কাব্যের সংখ্যাও নিছক কম নয়। তাঁর আলোচ্য ‘কালের ত্রয়ী পদাবলি’তে মন্ত্রগ্রস্তের পুনর্জন্ম, সংঘাত প্রকৃতি মানুষে ও কণ্ঠস্বরের ভাঙাগড়া এ তিনটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করা হয়েছে। এ ছাড়া সত্তর ও আশির দশকে রচিত এবং শূন্যদশকে প্রকাশিত তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থআনুগত্যে বিখ্যাত আমরা ও রক্তগঙ্গায় নিশিদিন। আনুগত্যে বিখ্যাত আমরা কাব্যগ্রন্থেআশ্চর্য পিতা রহমালী, মরদ, অন্ধের আর্তি, পেত্তম পুরুষ, লিখেছিলি মা স্বাধীনতা এবং রক্তগঙ্গায় নিশিদিন কাব্যগ্রন্থেশীত যায় শীত আসে, কুত্তোটা, লাঠি, বউটা, উদগত অঙ্কুর, কতদিন বাকি, তোফা প্রভৃতি কবিতাবলীতে তিনি নিরীক্ষা করেছেন গ্রাম ও নগর বিভক্ত বাকপ্রতিমার সমন্বিত নান্দনিক কাব্যশৈলী ও গল্পকবিতা রূপায়নেযা কাব্যভাষ্যে নতুন এক সংযোজন।

যেমন

তোরে খুব ভালোবাসিওে ফুলি

কালার কথাখান মানি পচা ইল্শের আঁশটে

বটিতে ঘসরঘসর খসে খসে পড়ে

শুকনো গালে চুমুটুমু ছাই ভাল্লাগে না

প্যাট তাঁতলি ছাতা কিছুতিই কিছু না . . .।’

[‘মরদ’ ‘আনুগত্যে বিখ্যাত আমরা’]

কিংবা

রস জ্বালিয়ে গুড়

গুড় বেচতে গান্নার হাট

চালডালতেলনুন কেনাঘরে ফেরা;

আর চুলোর পাশে আগুনের ওমে হাত রেখে

জীবনের রঙচটা গল্পের পিঠে গল্প ফেদে সন্ধ্যে কাটে

একই ছেঁড়ামাদুরে শুয়ে শীত যায় শীত আসে . . .

গাছি বাহার আলী তার বিয়ের বছরের বউটাকে হাতড়ায়

গমের মতো পুরুষ্টু গতর

পাকা ধানের মতো চকচকে চোয়াল,

গাছির বউ রমলা স্বপ্নের ঘোরে পাশ ফিরে শোয়

এবং আলতো হাতে স্বামীর মুখটায়

সন্তানের মুখটা খুঁজতে খুঁজতে ঘুমিয়ে পড়ে।’

[‘শীত যায় শীত আসে’ ‘রক্তগঙ্গায় নিশিদিন’]

সত্তর ও আশির দশকে রচিত উক্ত কবিতাসমূহ যেমন গ্রামীণ প্রান্তজনেরা উপভোগ করতে পেরেছেন, তেমনি বহুলভাবে পঠিত ও আলোচিত হয়েছে নগরের সচেতন পাঠক মহলেও। উল্লেখ্য যে, আশির দশকে কবি নয়ন তালুকদার কথিত স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে আকণ্ঠ সক্রিয়তা এবং জীবনযাপনে নিরাপত্তাহীনতায় তাঁর এই নিরীক্ষাপঙ্ক্তিমালা রচনায় ছেদ পড়ে। নব্বই’র দশকে কবি সমকালের জাতীয় ও বিশ্বরাজনীতি, প্রথাবিরোধী এশীয় ও বিশ্বসাহিত্যসহ প্রান্তমানুষের বিকাশ ধারার ইতিহাস পঠনপাঠনে মগ্ন থেকেছেন এবং গ্রামীণ প্রান্তমানুষের কাছে থেকে তাদের জীবন ধারা নিষ্ঠার সাথে পর্যবেক্ষণ করেছেন। কোনো মতাদর্শের বা শিল্পের ঈশ্বরগণকে তিনি যেন তোয়াক্কাই করতে চান নিআবার সেই তিনিই এম এন রায়, পল সুইজি, নোয়াম চমস্কি, টেরী ঈগলটন, ম্যাক্সিম গোর্কি, গুন্টার গ্রাস প্রভৃতিজনসহ এশিয়া, আফ্রিকার সমকালীন কবিসাহিত্যিকদেরকে গ্রহণ করেছেন অকৃপণ উদারতায় এবং হকিন্সসহ প্রকৃতিপরিবেশবাদী বিজ্ঞানীদেরকে তিনি ধারণ করেছেন সচেতন প্রজ্ঞায়। এই পঠনপাঠন, পর্যবেক্ষণ ও ধারণ অভিজ্ঞানেরই প্রকাশ ঘটেছে তাঁর ‘কালের ত্রয়ী পদাবলি’তে। মানুষকৃত প্রকৃতিবিশ্বের বিপর্যয় গাঁথা ও প্রান্তমানুষের দ্রোহভালোবাসা, দুঃখবেদনার নান্দনিক শিল্পস্বর আমাদের মননকে সচকিত ও আন্দোলিত করে। আমরা দেখতে পাই বিষয় বৈচিত্রপূর্ণ কাব্যভাষ্য রচনায় যেমন সিদ্ধহস্ত তেমনি প্রান্তসমাজ ও প্রকৃতিপরিবেশ সচেতনতার শিল্পশৈলী নির্মাণে নিরন্তর ভাঙাগড়ায় এক সাহসী ও কুশলী কবি নয়ন তালুকদারকে। তাঁর সৃজনে সেই প্রাণের টানটিই ধ্বনিত হয়ে ওঠে

আমি তো জন্মকাল অতিক্রমের কালে কখনো সুনামীকালের স্বপ্ন দেখি নি

আমি তো পৃথিবীতে কখনো সুনামী কালের তাব দেখবো বলে আসি নি

অথচ এই সুনামীই আমাকে শিখিয়েছেপড়িয়েছে

মানুষ কী কী তাবের বিনিময়ে এই সুনামী কালকেই সে অর্জন করেছে . . .।’

[‘সুনামী কাল’ কালের ত্রয়ী পদাবলি]

অথবা

আমাদের ক্ষুধার যুদ্ধে শস্যহীন মিত্রতার মাঠ পেরিয়ে

পায়ে পায়ে বন্ধুর মুখোশে আসে এই দেশে বহুজাতিক বেনিয়ারা

আহা, কী বিপন্নবোধে ককিয়ে ওঠে কৃষকের মেয়েবউমা . . .!’

[‘বৃষ্টির গল্প’ ‘কালের ত্রয়ী পদাবলি’]

কবিতায় প্রকাশিত হন কবি, তাঁর চিন্তাচেতনারাগদ্রোহ এমনকি সামাজিক অবস্থান ইত্যাদিও অনুধাবন করা যায় তার প্রকাশ থেকে। তিনি লিখছেন তাঁর কাব্যের পঙ্ক্তিমালা একটি পরিচ্ছন্ন মুক্ত সমাজের প্রত্যাশায়। তাই তাঁর কবিতায় বক্তব্যের তীব্রতা একটু বেশী। সে হোক, তারপরও আমরা লক্ষ্য করতে পারবো যে তাঁর বাকবিন্যাস সমকালের, আধুনিক এবং রূপময়।

যেমন

কে আছো হে এই দেশে সাহসী সে মানুষ

ঠিকঠাক সিঁড়িটা তো জানিয়ে দাও

জীবনটাকে অতিক্রম করবে মানুষ-’

[‘বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাও’ ‘কালের ত্রয়ী পদাবলি’]

অথবা

আমি ধানের নাড়ার বিছানায় শুয়ে

পাহারা দি ধানের খেত

রাতের অন্ধকার ও কুয়াশা দুহাতে সরিয়ে সরিয়ে . . .

­­ক্রেতা চোরের দল

আমার সব ধান চুরি ক’রে নেয় দিবালোকে . . .

আমি ক্রেতা চোরের ল্যাজটিও ছুঁতে পারি না।’

[‘ধানচোর’ ‘কালের ত্রয়ী পদাবলি’]

আবার

মহিষের খুরের তলায় ককিয়ে ওঠা ঘাসের মতো

মানুষের স্বপ্নেরা ককিয়ে ওঠে লুন্ঠনমতি রাষ্ট্রের কল্যাণে. . .।’

[‘মহিষ ও মানুষ’ ‘কালের ত্রয়ী পদাবলি’]

এরকম অসংখ্য পঙ্ক্তির উদাহরণ টেনে বলা যায় যে কবি নয়ন তালুকদার প্রান্তিক নন। বরঞ্চ জনগণ’র কাছাকাছি থেকে তাদের ভালোবাসাদ্রোহদুঃখসুখ ও অনুভুতি নিজের করে উপলব্ধি করতে চেয়েছেন এবং বিস্তৃতি দিয়েছেন তাঁর কাব্যে। কবি নয়ন তালুকদারের পরিচয় আমরা সহজেই জেনে নিতে পারি তাঁর কবিতা থেকে। ঠিক যেভাবে আমরা আমাদের অপরিচিত অন্য দেশের কবিকেও চিনতে পারি তাঁর কবিতা থেকেইকি তিনি ভেবেছেন ও ভাবছেন।

 

এভাবে

দুঃখ? সাহসী এমন কে বলে

আমি দুঃখেরই দাস?

বজ্র আগুন যতদিন জ্বলে

যতদিন সন্ত্রাস

ততদিন নেই দুঃখর দলে

দুঃখশুধু বিলাস’।

[‘হোসে মারতি’র ‘শাদাসিদের গান’]

কিংবা

ক্লাউদিয় লারস’র ‘গুঁড়ো’ কবিতার ক’টি পঙ্ক্তি এ রকম

আমি দেখেছি মুখোশপরা মুনুষ

একটা কুয়োর মধ্যে ছুঁড়ে ফেলছে সত্য

যখন তার জন্যে আমি কাঁদতে শুরু করে দিই

আমি তাকে পেয়ে যাই সকলখানে।’

মানবেন্দ্র বন্দোপাধ্যায়’র লাতিন আমেরিকার বিদ্রোহী কবিতা অনুবাদ’র পাশাপাশি আমরা কবি নয়ন তালুকদারের পঙ্ক্তিগুলো মিলিয়ে নিতে পারি

লুন্ঠকের জন্ম আছে কিন্তু মৃত্যু নেই

লুন্ঠকের বিনাশ চেয়ে লুন্ঠিত নারী কাঁদে জীবনজীবন

দ্রোহের রক্তে ভাসে প্রত্নমানুষ লাশ হয়ে জীবনজীবন

অগ্নির বিস্তার উপেক্ষা ক’রে বাড়ে তবু লুন্ঠকের দেহের পরিধি. . .।’

[‘লুন্ঠকের মৃত্যু নেই’ ‘কালের ত্রয়ী পদাবলি’]

লুকাচের মতে, একজন লেখকের ভালো লেখার বিষয়টি তাঁর নিজের ব্যক্তিগত ক্ষমতার উপর নির্ভরশীল নয়, বরং অনেকটাই নির্ভর করে ইতিহাসে তাঁর কি অবস্থান তার উপরে’ [টেরী ঈগলটনের প্রবন্ধ ‘আঙ্গিক ও অন্তর্বস্তু’]। কবি নয়ন তালুকদার যা কিছু লিখেছেন তার মূলসুরটি মানবিক এবং প্রকৃতিবিশ্ব ও প্রান্তমানুষের জন্যেই নির্মিত তাঁর সকল পঙ্ক্তিমালা। চর্চার মধ্য দিয়ে কবি আরো বেশী আঙ্গিক ও রূপ নির্মাণে যত্নবান হবেন তা প্রত্যাশা করা যায়। কারণ কবিতাকে সর্বশেষ সময় পর্যন্ত কবিতা হয়ে উঠতে হবে ভাবনায় ও নির্মাণেহতে হবে নান্দনিক। কবি নয়ন তালুকদারের কবিতায় সমপুষ্টি আছে। কাব্যভাষ্যে সংবেদনশীলতা ও নান্দনিকতা সৃজনে যে সচেতন অভিজ্ঞান তাঁর নাড়িছেঁড়া উচ্চারনে তা আমরা দেখতে পাই

আমি বিশ্বসংসার তন্নতন্ন ক’রে আমার জন্মের ঠিকুজি খুঁজেছি আমার ঘুম নেই

আমি ক্ষুধার অন্ন ও ছতর ঢাকবার বস্ত্র জোটাতে দ্বিচারিতা করেছি আমার ঘুম নেই

আমি জন্মসূত্র মতবাদ পিছনে ফেলে অর্জিত মতবাদের জোছনায় ভুত দেখেছি আমার ঘুম নেই

আমি বিজ্ঞানের ঘাড় থেকে সমরাস্ত্রের ভুত নামাতে অপারগ হয়েছি আমার ঘুম নেই

হায়, আমার কাল আমাকে ত্রৈলোক্য দ্বন্দ্বের ত্রিশূলে চড়িয়ে রেখেছে আমার ঘুম নেই!’

[‘আমার ক্ষুদ্রত্ত্ব’ ‘কালের ত্রয়ী পদাবলি’]

এবং আঙ্গিক ও চিত্রকল্প নির্মাণ কৌশলের ব্যঞ্জনাময়তায় যে নৈপুণ্য তাঁর পঙ্ক্তিমালায় তা রূপায়িত হয়েছে এভাবে

জল জল করে কৃষক মরাগাঙে জাগান দিয়ে স্বপ্নের পাট

জল জল করে কৃষকবধু মরাগাঙের জলে ফেলে শাড়ির আঁচল

জল জল করে মাঝি মরাগাঙের জলে হাকিয়ে নৌকর গোলুই

জল জল করে শালিক মরাগাঙের জলের স্নানে মেলে দুইপাখা

উত্তরের জলের ঢেউ পশ্চিমে যায়

দক্ষিণের জলের ভাটা যায় পূবের টানে

এই জলের মতিভ্রমে তোর ছত্রিশবর্ষী গতরখানিরে ডুবিয়ে ডুবিয়ে

নমিতা তুই কী গল্প করিস কোন উপকূলের ঢেইভাঙা লবন জলের ভাসানের সাথে?!’

[‘জলের পিপাশা’ ‘কালের ত্রয়ী পদাবলি’]

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s