লিখেছেন: মতিন বৈরাগী

art-1-তখন দিনের সূর্য যুদ্ধক্লান্ত সৈনিকের মতো উঠছিলো আকাশে

উত্তর থেকে বইছিলো শীতের বাতাস

দিনের উত্তাপ হিম হয়ে ঝরছিলো

গাছগুলোর পাতাগুলোয় পথের পাশের তৃণগুলোয় কুয়াশারা হিম হয়ে ঝরছিলো

ঝাপটা হাওয়ায় পাখিগুলো জবুথবু চুপচাপ শাখার আড়ালে

রুখছিলো শীতের চাবুক

দু’একটি কাক সকালের আকাশে উড়ছিলো

আকাশটা ছিলো ধোয়ার আকাশ..

 

একজন মানুষ বিরামহীন পথ হাঁটছিলো

গন্তব্য অনেক দূরের অথবা দূর রয়েছে গন্তব্যে

সারি সারি বাড়িঘর পিছনে পড়ছিলো আবার

সামনে থেকে সরে যাচ্ছিল পিছনে।

 

যখন সেই মানুষের শরীরের উত্তাপ হিম হয়ে আসছিলো

সারাদিনের পথ চলায় এবং নদীতীরে পারাপারে থেমেছিলো

তখন দিনের সূর্য ছূঁইছিলো পশ্চিমের দিগন্ত রেখা

সবুজের বুকে ঘন হয়ে বসছিলো সান্ধ্যআঁধার

তখন জনমানবহীন এক নদীতীর বরফের মতো ছিলো স্থির

জলরাশির ওপারটা জমে আছে ঘন শাদা কুয়াশায়

তখন ডানে ও বামে দূর আর দূরে বাড়িগুলো দাঁড়িয়ে নিশ্চল

উঁচু উঁচু আঁধারের টিলা

রাত্রির কালো ঘন করে তুলছিলো,বৃক্ষগুলো তন্দ্রায় যেনো দুলছিলো

 

তখন সেই মানুষ ক্লান্তির কফিনে আঁটা পেরেকনিথর শরীর অনুভবহীন

খঁজছিলো পারাপার, সে হাঁটছিলো পানির দিকে সোজা

মাথা তার নড়ছিলো সীমিত দৃষ্টিতে দেখলোছিলো

সামনের কাদাহীন নদীটির তীরে শিকার ধরার কৌশলে মাথা তুলে থাকা

কুমির যেনো ’ভাসমান নৌকা-’

যেনো কতোকাল থেকে এই ভাবে ভেসে আছে

তখন সে দিশাহীন ছিলো!

 

নৌকা! গন্তব্যে পৌঁছানোর ইশারা! সময়ের এই প্রান্তে আনন্দআশা!

সে ছুটলো উঠলো বসে পড়লো নৌকায় পারাপারে ভয় আর শঙ্কায়

যে ভাবে মানুষ ঘটমান ঘটনাকে ভাবে সম্ভবনা

সেই ভাবনায় আশা বড় হলো স্বপ্ন হলো এগুলো সে মাঝির দিকে

অস্পষ্ট মাঝির মুখ মাঝদরিয়ায় কেমন যেনো ছায়ার মতো

জলের ঢেউগুলো ফনা তুলে দোলাচ্ছে নৌকা

দুলছে মাঝির মুখ হাওয়ায় উড়ানো কাগজের মতো

 

মানুষ! মানুষের মুখ এমনও কি হয় কখনো!

কুয়াশায় শীতে প্রচন্ড খরায় কিংবা অকালের অঝোরে ঝরার বৃষ্টিপাতে!

নিজের মুখে হাত বুলিয়ে টের পেতে চাইলো, ঠিক তখন

মানুষের কন্ঠ উঠে এলো তার কানেহাওয়ারা কেঁপে গেলো

দেখলো, দু’খানি পা’ শিয়ালের পা’য়ের মতো ছড়িয়ে আছে

অবিকল শিয়ালের পা’ নিশ্চিত করলো তার চোখ

সে এক নিরস হাসির শব্দ শুনলোকেমন যেনো

ভেসে আসা দূরের শব্দের মতো নানা শব্দে জড়িয়ে

যেনো গর্গনরা হাসছে কিন্তু মুখ তার দেখতে পেলো না আর

তবু মনে হলো ছায়ার মতো এক মুখ শতমুখে হাসছে ধারালো দাঁত

উচ্চরব নেই আবার নীরবও না

তাতেই ভাঙছে বাতাস জমে যাওয়া শরীর তাহার।

 

সেই এক চিৎকার মানুষের ভয়ের, শঙ্কার, আতঙ্কের রব

ঝাঁপিয়ে পড়লো সে নদীতে সাঁতরে উঠলো তীরে

তখনো সেই হাসিটা মেডুসার মস্তকের শত নাগের মতো

দীর্ঘ হয়ে ছুটলো তার দিকে বাঁকা বাঁকা দাঁতগুলো উঁচিয়ে

দৌড়ের এই প্রান্তে মনে হলো তার গন্তব্য এখন অনেক দূর হয়ে গেছে

অনন্ত এক সময়ের দিকে।

 

এখন বিশ্রামের প্রয়োজন, খাদ্যেরএকটু উত্তাপ শরীরে আবার

অনুভবের এই মাত্রায় মনে হলো তার সমুখে আলোর রেখা

কুয়াশা মিশ্রিত আঁধারের শরীর চুইয়ে এলায়িত ধানক্ষেতের উপর

মাথা তুলে ডাকছে তাকে আর নুয়ে পড়া ধানশীষ স্পষ্ট হলো তার চোখে

ধানগুচ্ছের ফাঁকে জমে আছে অন্ধকার আর তার মাঝে এক কুঁড়ে

ছড়িয়ে পড়ছে মরা আলো যা সে দেখেছিলো অসহায়ত্বের রাতে

জ্বলছে কেরোসিন বাতি বিভ্রমের মতো আঁধারের কাছাকাছি,আর

ওপাশে বসে আছে একজন চাঁদরে ঢাকা তার দুই পা’ সামনে ছড়িয়ে

মুখখানি অন্ধকার। মনে হলো মানুষহীন এই প্রান্তর জেগে আছে মানুষের কাছে

 

সরব হলো সে প্রর্ব্থানায়

আমার একটু আশ্রয় চাই শুধু রাতটুকু, শুকনো কাপড় বিশ্রাম

ভেতর থেকে ইশারার শব্দ বসলো সে অবগুন্ঠিত মানুষটির পাশে

বললো: আমি খুব ভীতক্লান্তক্ষুধার্ত এবং ঠান্ডায় জর্জরিত

ভয় আমাকে তাড়িয়ে এনেছে এতোদূর আমি পথ হারিয়েছি

সে বলতে যাচ্ছিলো আচ্ছা মানুষের পা’ কখনো শিয়ালে

তাকালো অবগুন্ঠিত মানুষটির দিকে একজোড়া পা

অবিকল সেই পায়ের মতো লোমশ সাজানো তীক্ষ্ণ নখর..

 

দৌঁড়ের ভিতর সে একই রকম হাসির শব্দ শুনতে পেলো

একই ভাবে ছুটে আসছে তার দিকে তার তার তার পিছু

 

দিশাহীন সেই মানুষ যেনো বহুমানুষ এবং একক দৌঁড়াচ্ছে খুঁজছে আশ্রয়

বিভ্রান্তি এই প্রান্তে সে দেখলো নিজেকে এক প্রার্থনালয়ে

ভিতরে মোমের স্নিগ্ধালোক ভাবলো স্রষ্টার নামের এই ঘর দৈত্যদানো

ভূতপ্রেতহীন, আসবে না আর। দেখলো দেবদূতের মতো শুভ্র পোশাকে

বসে আছে মানুষ মানুষের মতো জ্বলছে আলোর স্নিগ্ধ শিখা

ডাকছে তাকে প্রার্থনায়

 

হায়, ক্ষুধাক্লান্তির মানুষ আশ্রয় আর খাদ্য পাবার আশায় বিভোর হবার আগে

দাঁড়িয়ে পড়লো শান্তি আর কল্যাণ কামনায় এবং

নত হবার কালে দেখলো সেই পা’ অবিকল শৃগালের মতো সমান ভরে রুকুতে নুয়ে আছে

তখন সে সেই হাসিটি আবারো শুনতে পেলো এবং অষ্ফুট চিৎকারে চেতনা হারালো

 

আর চেতনা হারানো মানে তো নতুন করে জেগে উঠবার অপেক্ষা

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s