লিখেছেন: শাহ্জাহান সরকার

savarসাভারের রানা প্লাজায় গার্মেন্টশিল্পের বিল্ডিং ধ্বসে যে গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে একে ট্র্যাজেডি বলতে মুখে আমার ভীষণ বাধছে। এই মর্মন্তুক শ্রমিককর্মচারী হত্যাকাণ্ড হচ্ছে বিশ্বাসঘাতক বড় মালিক শ্রেণীর রাষ্ট্র ব্যবস্থা ও সরকারের শ্রমিক শ্রেণীর ওপর চাপিয়ে দেয়া অঘোষিত অন্যায় যুদ্ধ। এই অঘোষিত অন্যায় যুদ্ধের শিকার হচ্ছে হাজার হাজার শ্রমিক নরনারী। হত্যাকাণ্ড ঘটে যাবার পর আমরা প্রতিবাদে সরব হই। মাস না পুরোতেই আমরা ভুলে যাই নিরবে শহীদ হয়ে যাওয়া আমাদের শ্রমিক ভাইবোনদের আত্মহুতিকে। আত্মশ্লাঘায় আবার জেগে উঠি যখন আর একটি নিরব গণহত্যা সংঘটিত হয়।

গত ২৪ এপ্রিল, বুধবার এমনি এক আত্মশ্লাঘা বিষাদের কড়া নেড়ে আমাদের জানিয়ে গেল যে, সাভারের গার্মেন্টশিল্পে আর এক গণহত্যা। বহুতল এ বিল্ডিংয়ের ফাটলকে উপেক্ষা করে কাজ করতে শ্রমিকদের বাধ্য করেছিল মালিক পক্ষ। ফলাফল যা ঘটেছে তা বাধহারা কান্না আর আহাজারির ঢেউ ছাড়া অন্য কিছু নয়। সান্তনার এমন কোন বিশ্বশব্দকোষ আমার জানা ছিলনাযার একটি শব্দ বেছে নেয়া আমার জন্য, অপরটি ভবনটিতে আঁটকেপড়া নরনারী ও স্বজন হারানো নিরব শহীদের স্বজনের জন্য। সবাই যেন আতঙ্কিত! নাকি ক্রুদ্ধ? সব মিলে বিস্ফোরণোম্মুখ প্রতিবাদের ভাষা বলছেনা, এঘটনা মেনে নেবার মতো নয়। সবার সাথে আমিও একমত হয়েছিলাম। এবং টিভির পর্দা থেকে চোখ নামিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছিলাম এই কারণে যে, যেন ঐ আহাজারি আমার নিজেরও। যেন এ এক বোবা কান্নার কালোরাত্রি।

সেদিন যে সাংবাদিক বন্ধুরা কলম ধরেছিল, ঘটনার চার পাশে ক্যামেরা ঘুরিয়েছিল, মিডিয়ায় বার্তা পাঠাচ্ছিল এবং বার্তা পড়ছিল বা সম্পাদনা করছিল, পূর্বপরিকল্পনা মাফিক পত্রিকার জন্য নির্ধারিত সম্পাদকীয়, উপসম্পাদকীয়, লিড নিউজ বাতিল করে নতুন আঙ্গিকে পত্রিকার পাতা যারা সাজিয়েছিল শোকে তাদেরও মনমুখায়বে অন্ধকারের ছায়াও নেমে এসেছিল।

পরের দিন বৃহস্পতিবার যথারীতি দৈনিক কাগজগুলো প্রকাশিত হলো নিরব শহীদের বার্তা নিয়ে। নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতির ভাবগম্ভির শপথ অনুষ্ঠান বা প্রধানমন্ত্রীর কমিউটার ট্রেন সার্ভিস উদ্বোধন ও ট্রেন যাত্রার প্রফুল্ল চিত্তের ছবি চলে গেল হয় পেছনের পাতায় নয়তো অন্য কোনখানে।

খবরের কাগজগুলি মানুষের আহাজারী আর আর্তনাদের ছবি নিয়ে হাজির হলো সকাল সকাল। ইলেক্ট্রনিক মিডিয়াতো সার্বক্ষনিক লেগেই আছে। একটু ব্যতিক্রমভাবে একটি জাতীয় দৈনিকের প্রথম পাতায় প্রায় অর্ধডিমাই সাইজ কাগজ জুড়ে এফ ওমরের তোলা নিশ্চল দু’পায়ের ছবি নিয়ে লিড নিউজের শিরোনাম ছাপা হয়েছে মাত্র একটি শব্দে অনুভূতিহীন। কি আশ্চর্য। ছবি ও শিরোনামে যেন আমার নিজেরই বোবা কান্নার ছবি! অদ্ভূত মাইন্ডকোম্বিনেশন! এবং এটাই ছিল সারা দেশের মানুষের অনুভূতির ছবি। পত্রিকাটি অপর সকল মানুষের বাক্যহীন নির্বাধ বেদনার কথা তুলে ধরতে পেরেছে। হ্যাঁ খুব যথার্থভাবে তুলে ধরতে পেরেছে। এর ব্যতিক্রম হলে অন্যায় কিছু হতোনা। কিন্তু মানুষের মনের ভেতরে উড়ানো শোকের কালো পতাকাকে তা ধারণ করতে হয়তো খানিক ব্যর্থ হতো।

এ অনাকাঙ্খিত, অপ্রত্যাশিত ঘটনা দেখে মনে হয়েছে : বাংলাদেশে গার্মেন্টশিল্প মানে লক্ষ লক্ষ শ্রমিকের ভয়ংকর এবং অনিশ্চিত জীবন, ভারি অশ্রুভরা কয়েদখানা, লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবনজীবীকার রক্তপাতময় যুদ্ধ, উত্তাল সমুদ্রে মৃত নাবিকের লাশ। বাংলাদেশে গার্মেন্টশিল্প মানে মাছধরা জেলেদের সাগরে নৌকা বা ট্রলার ডুবি, নিখোঁজের সন্ধানে ডুবুরির তল্লাস। বাংলাদেশে গার্মেন্টশিল্প মানে হস্তীতুল্য হাঙ্গরের গ্রাস। বাংলাদেশে গার্মেন্টশিল্প মানে দ্বীপসদৃশ তিমির এসিডদগ্ধ পেটের ভেতরে মৃত্যুর সাথে বসবাস। বাংলাদেশে গার্মেন্টশিল্প মানে বড় ধনী মালিকদের পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। বাংলাদেশে গার্মেন্টশিল্প মানে কাশিমপুরের সাজাপ্রাপ্ত ফাঁসির আসামীর কনডেমন্ড সেল। বাংলাদেশে গার্মেন্টশিল্প মানে রক্তপেশির গন্ধভরা বাতাসে মুৎসুদ্দি শকুনের উল্লাস; হাড়গিল্লা বায়ারের আকাশে উড্ডয়ন। বাংলাদেশে গার্মেন্টশিল্প মানে গুপ্তহত্যা, এনকাউন্টার আর ক্রসফায়ারের সাজানো প্রেস বিজ্ঞপ্তি। বাংলাদেশে গার্মেন্টশিল্প মানে আকাশে বাতাসে গ্রাম ছাড়া মানুষের ক্রন্দন। বাংলাদেশে গার্মেন্টশিল্প মানে মহান সংসদীয় গণতন্ত্র। বাংলাদেশে গার্মেন্টশিল্প মানে সুন্দরবন থেকে ধরে আনা মিরপুর চিড়িয়াখানার মৃগ হরিণ। বাংলাদেশে গার্মেন্টশিল্প মানে শিকারীর ভয়ে সীমান্ত পেরিয়ে ছুটে আসা স্বচ্ছ জলের আলেয়ায় নীলগাভীর জলডুবি। বাংলাদেশে গার্মেন্টশিল্প মানে আমার ময়না পাখি মেয়েটার অপমৃত্যু। বাংলাদেশে গার্মেন্টশিল্প মানে নিরব শহীদের সারিবদ্ধ লাশ, নবজাতকের অবুঝ কান্না। বাংলাদেশে গার্মেন্টশিল্প মানে মৃত্যুপুরির আর্তনাদ। বাংলাদেশে গার্মেন্টশিল্প মানে সুকান্তের কবিতা শোনরে মালিক শোনরে মজুতদার/ তোদের প্রাসাদে জমা হলো কত মৃত মানুষের হাড়/ হিসাব কি দিবি তার?

আমি স্বজন হারানোর বাধহারা কান্নার রোল কিভাবে সংবরণ করব বলুন। শ্রমিক দরদি আমাদের এক বন্ধু অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ দাবি করেছেন মৃত, পঙ্গু শ্রমিকদের প্রত্যককে ৪৮ লক্ষ টাকা ক্ষতিপুরণ দেয়ার। তাঁর কথার ধার ও যুক্তি দুই আছে। আছে এক প্রকার মানবিক সান্তনা। আমাদের ভালভাবে হেফাজত করার জন্য তিনি মাননীয় সরকার বাহাদুর, কারখানাগুলির মালিক, এমনকি বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স এসোসিয়েশন (বিজিএমইএ) নেতাদের নিকট শ্রমিক ভাইদের হয়ে চার দফা দাবি পেশ করেছেন। অতীতে আমরা এবং আমার শ্রমিক ভাইবোনেরা বারবার বলেছেন, এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি যেন না হয়। কিন্তু ধর্মের কাহিনী ওরা শোনেনা, সাম্রাজ্যবাদের দালাল সরকারগুলিও শোনেনা। কোন অংকের ক্ষতি পুরণের অর্থ শ্রমিকের জীবনের স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি হতে পারেনি, আইন করে অর্থদণ্ড ও কারাবাস কোন অর্থ বয়ে আনেনি। তারপরও আমাদের সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী বন্ধু, অধ্যাপক আনু মুহাম্মদের দাবিকে আমরা ও আমাদের শ্রমিক ভাইবোনদের পক্ষ থেকে স্বাগত জানাই। তা না হলে আমাদের মানুষগুলো কী খেয়ে বাঁচবে; কে তাদের উন্নত চিকিৎসা দেবে। কিন্তু কথা হচ্ছে আমাদের প্রিয় বন্ধুর এ দাবি দেশের বিদ্যমান ট্রেড ইউনিয়নগুলির পুরাতন দাবির নতুন সংস্করণ মাত্র। শ্রমিকদের এ জাতীয় দাবিকে রাষ্ট্র ভ্রুকুটি কেটে ট্রেড ইউনিয়ন করা বন্ধ ঘোষিত হয়েছে। শ্রমিকদের পেছনে শিল্পপুলিশ লাগিয়ে রেখেছে। আন্তর্জাতিক শ্রমিক শ্রেণীর মে দিবসে আমাদের শ্রমিক ভাইবোনদের স্বাধীনভাবে মিটিংমিছিলকথা বলার কতটুকু স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে সকলে তা জানেন। দেশের বুর্জোয়া দলগুলির অধীনে থাকা টেড ইউনিয়ন আন্দোলনের শ্রমিক নেতারা কী রকম কথা বলতে পারেনসেটা বুঝার জন্য পাণ্ডিত্য লাগেনা। গণজাগরণ মঞ্চের নাগরিক সমাবেশে থেকে বিভিন্ন ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠন, সাহিত্যিকবুদ্ধিজীবীরা শ্রমিক শ্রেণীর টেড ইউনিয়ন অধিকারের কথা বলেছেন। শ্রমিকের আন্দোলন আর মৌলবাদ বিরোধী আন্দোলন একাকার হয়েছে বলে শ্রমিক ফ্রন্টের জনৈক নেতা উল্লেখ করেছেন। উক্ত মঞ্চের নেতা ডা. ইমরান এইচ সরকার রক্ত সংগ্রহ কর্মসূচি সহ জণগণের পাশে থাকার কথা বলেন। তিনি আরো বলেন, যেসব শ্রমিক শোষণমুক্ত দেশ গড়তে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল তাদের হাতেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে শোষণমুক্ত সমাজ গঠন হবে। উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সভাপতি কামাল লোহানি সাভারের ঘটনায় রাষ্ট্র, সরকার এবং মালিকপক্ষকে দায়ী করেন।

দুঃখের বিষয় এই যে, শোষণমুক্ত সমাজ গঠনের লক্ষ্যে পুরাতন সমাজ ভাঙ্গার মার্কসীয় মতবাদের পক্ষে উচ্চতর রাজনৈতিক শ্রেণী সংগ্রামের কথা মে দিবসের খোলা মঞ্চগুলি এড়িয়ে চলেছেন। এবং ট্রেড ইউনিয়নের মতো বুর্জোয়া সংগঠনের দাবিদাওয়ার মধ্যে শ্রমিক শ্রেণীর আন্দোলনসংগ্রামকে রাষ্ট্র কতৃক ‘স্বীকৃত’ দাবির আন্দোলনের মধ্যে গণ্ডিবদ্ধ করা বুর্জোয়া সরকারের পলিসিরই অন্তর্গত। অপরদিকে শ্রমিক শ্রেণীর আন্দোলনকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নের নামে আওয়ামী লীগের জাতীয়তাবাদী পতাকার নীচে শ্রমিক শ্রেণীর শোষণহীন সমাজের কাল্পনিক ধারণার প্রকাশকেই তুলে ধরে। শ্রমিকের আন্দোলন আর মৌলবাদ বিরোধী আন্দোলন একাকার হয়েছে বলে যারা দাবি করেন তারা নিজেদের আত্মমুখিন চেতনার উল্লাসে নৃত্য করেন। বাস্তবতার সাথে যার কোন মিল নেই। ধর্মীয় মৌলবাদ বিরোধী আন্দোলন এবং ধর্মনিরপেক্ষতা হচ্ছে পুরাতন বুর্জোয়া বিপ্লবের অংশ। শ্রমিক শ্রেণীর রাজনৈতিক বিপ্লবের সাথে তথাকথিত মৌলবাদ বিরোধী জাতীয়তাবাদী বুর্জোয়া সংস্কার আন্দোলন শাসক শ্রেণীর নিজেদের মধ্যেকার দ্বন্দ্বের বহিপ্রকাশ; শ্রমিক শ্রেণীকে এ জাতীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সাথে গেঁথে ফেলার আকাঙ্খাটা হচ্ছে সমাজগণতন্ত্রীদের আকাঙ্খা।

সাভারে রানা প্লাজায় নিহত ও আহত শ্রমিকশ্রেণীর প্রতি এ হচ্ছে কুমিরের অশ্রুবরণ মাত্র। আজ এসব নিছক আর মামুলি কথার বাচালি শ্রমিক শ্রেণীর ঘৃণাভরে বর্জন করার পালা। শাসক শ্রেণীর অংশের প্রতিনিধি ঐ সব ট্রেড ইউনিয়ন নেতা আর ভাড়াটে বুদ্ধিজীবীদের ছেনালি কথায় শ্রমিক শ্রেণীকে প্রতারিত করা এবং তাঁদের ব্যবহার করার দিন আজ শেষ হোক! সমাজতন্ত্রের লক্ষে, বুর্জোয়া সংসদীয় ব্যবস্থা বর্জন করে সত্যিকার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং চিরস্থায়ী বিপ্লবের জন্য সংগ্রামের নেতৃত্ব শ্রমিকশ্রেণীর হাতে তুলে নেয়ার অধিকার প্রতিষ্ঠা করা হোক! নচেৎ শ্রমিকশ্রেণীর কৃতদাসত্ব মোচন হবার নয়।

১৮৯০ সালে এঙ্গেলসের লিখিত কমিউনিস্ট ইস্তেহারের জার্মান সংস্করণের ভূমিকায় উল্লেখ রয়েছে যেমন আট ঘন্টা শ্রমদিন চালু করার কথা, তেমনি রয়েছে শ্রমিক শ্রেণীর স্বতন্ত্র রাজনৈতিক পার্টি গঠনের বিরুদ্ধে বাকুনিনের অবস্থানের তীব্র সমালোচনা। বাকুনিন যদিও ছিলেন যে কোন ধরনের রাষ্ট্র ব্যবস্থার বিরুদ্ধে নৈরাজ্যবাদী ‘বিপ্লবী’, তা সত্ত্বেও শ্রমিক শ্রেণীর রাজনৈতিক পার্টির প্রশ্নে সমাজগণতন্ত্রীদের সাথে একটা সম্পর্ক রয়েছে। তাছাড়া ১৮৮৯ সালে প্যারিসে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের শ্রমিক কংগ্রেসে ঘোষণা করা হয় আন্তর্জাতিক শ্রমিকশ্রেণীর মে দিবসের প্রতিষ্ঠা, তাৎপর্য ও প্রত্যয়। সে অর্থে শ্রমিক শ্রেণী যা চায় ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার তো বটেই; কিন্তু সর্বাগ্রে যা চায় তা হচ্ছে, পুরাতন নিয়মের এই রাষ্ট্রযন্ত্রটার খোলনলচে পাল্টে ফেলার প্রগতিশীল রাজনীতি চর্চা ও বিপ্লবী আন্দোলনসংগ্রাম করার অধিকার। কারণ প্রগতিশীল রাজনীতি চর্চার অধীনে নেয়া ছাড়া দাবিদাওয়ার ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন যেমন শ্রমিক শ্রেণীর সামনে সঠিক রাজনৈতিক দিশা দিতে পারেনা তেমনি তাঁদের দাবিদাওয়া সাধারণভাবে, মালিক পক্ষ ও রাষ্ট্র সরকার মেনে নিতে চায়না; পরিস্থিতি চরম প্রতিকুলে চলে গেলে আংশিক এবং সাময়িক ‘সমাধান’ হয়ে থাকে মাত্র। ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের সাধারণ চরিত্র এটাই। ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনকে তাই বলা হয় দর কষাকষির সংস্কারমূলক বুর্জোয়া সংগঠন। শ্রমিক শ্রেণীর হাতের এই বুর্জোয়া চরিত্রের সংগঠনটি শ্রমিক শ্রেণীকে তার অভিষ্ট লক্ষে পৌঁছতে দেয়না। আমাদের বুদ্ধিজীবীগণ ও ট্রেড ইউনিয়নবাদী ‘বাম’ নেতারা সেই সাময়িক সমাধানের কথাই বারবার বলছেন। এটা শাসকগোষ্ঠীর পক্ষে ওকালতি করা ছাড়া অন্য কিছু নয়। উচু মাত্রার প্রগতিশীল রাজনৈতিক আন্দোলন ছাড়া শ্রমিক শ্রেণীর মৌলিক বুর্জোয়া অধিকারটুকুও অর্জিত হয়না। তাই প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিক বন্ধুদের প্রতি শ্রমিক শ্রেণীর আহ্বান : শ্রমিক শ্রেণীর প্রকৃত রাজনৈতিক মুক্তির সংগ্রামে ঐক্যবদ্ধ করতে এগিয়ে আসুন এবং তার অধীনে দাবিদাওয়ার সংগ্রামকে তুলে ধরুন। যে কোন মাত্রার প্রগতিশীল রাজনৈতিক আন্দোলনসংগ্রাম শ্রমিক শ্রেণী যেমন নিজের থেকে প্রথমে আয়ত্ত করতে পারেননা, তেমনি তারা নিজেদের থেকে যা গড়তে পারেন তেমন ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের শীর্ষ ব্যারেল থেকেও রাজনৈতিক সংগ্রাম বেরিয়ে আসেনা। এজন্য প্রগতিশীল ও ত্যাগী রাজনৈতিক বিপ্লবী বুদ্ধিজীবীদের শ্রমিক শ্রেণীর সেনাপতিমণ্ডলীর অংশ হিসেবে কাজ করার জন্য শ্রমিক শ্রেণীর রাজনৈতিক আন্দোলন দাবি করে। বিপ্লবী শ্রমিক আন্দোলনসংগ্রামে এই অমোঘ ঐতিহাসিক দাবি পুরণ করা সম্ভব না হলে সত্যিকার বিপ্লবী আন্দোলন অসম্ভব থেকে যায়। আমাদের দেশে প্রগতিশীল শ্রমিক আন্দোলনে এটা একটা অতি মাত্রার দূর্বলতা। অপরদিকে যে সব রেডিক্যাল বুদ্ধিজীবী ও মার্কসবাদে শিক্ষিত বাম ঘরোনার রাজনৈতিক ‘কর্ণধার’ নেতৃত্ব রয়েছেন তাঁরা মনে করেন যে, শ্রমিক শ্রেণীর উত্তাল ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের গর্ভ থেকেই বিপ্লবী রাজনীতির পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে এবং সে স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনের দ্বারা উচু মাত্রায় শক্তি প্রয়োগ করে বিপ্লব সংঘটিত হবে। বাস্তবে এটা হচ্ছে বিপ্লবাকাঙ্খি পেতিবুর্জোয়া বুদ্ধিজীবীগণের অস্থিরচিত্ততা এবং বাম হঠকারিতার প্রকাশ ছাড়া অন্য কিছু নয়। ফলে শ্রমিকশ্রেণীর পাশে দাঁড়ানো বলতে এ সব রেডিক্যাল বুদ্ধিজীবী শ্রমিক শ্রেণীর পক্ষে সংস্কার আন্দোলন ও দাবিদাওয়াকে বুঝে থাকেন। আবার কেতাবি বুদ্ধিজীবী মার্কসবাদীগণ মনে করে থাকেন শ্রমিক শ্রেণী থাকবেন ট্রেড ইউনিয়ন সেক্টরে আর কেতাবিরা থাকবেন পার্টির নেতৃত্বে এবং রাষ্ট্র ক্ষমতার শীর্ষ পদগুলিতে। তাঁদের ধারণা শ্রমিক শ্রেণী রাষ্ট্র পরিচালনায় এবং কার্য নিয়ন্ত্রণের পক্ষে উপযুক্ত নন। বাস্তবে এ জাতীয় ধারণা শ্রমিক শ্রেণীর পার্টিতে বা রাষ্ট্রে আমলাতান্ত্রিকতার জন্ম দেয়। এবং তাঁরা আরো মনে করে থাকেন যে, দাবিদাওয়ার ইস্যু কেন্দ্রিক হট্টগোল বাঁধানোর উপায় হবেন শ্রমিককৃষকমেহনতীরা, আর আমলাতান্ত্রিক বাহিনীর মতো তাঁদের অনুগত হোমড়াচোমড়ারা হবেন শক্তি প্রয়োগের কমান্ডার, কেতাবিরা হবেন শীর্ষস্থানীয় নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক কমিশার। পার্টির সেনাপতিমণ্ডলী ও আন্দোলনকারীর সর্বস্তরে বিপ্লবী রাজনীতির মতাদর্শগত অভিযানকে এরা কম গুরুত্ব দেন; না হয় তা থেকে বিরত থাকেন। কেতারিগণ সর্বদাই শ্রমিক শ্রেণীকে নিুবর্গের মানুষ হিসেবে গণ্য করেন। রাষ্ট্র পরিচালনায় শ্রমিক শ্রেণীকে অকর্মণ্য মনে করে কারখানাশিল্পের ও বাসাবাড়ির চাকরবাকর মনে করেন। তাদের কৃপাই শ্রমিক শ্রেণীর জন্য যথেষ্ট বলে মনে করেন। এই ধ্যানধারণার বৈশিষ্ট্যগুলি হচ্ছে সমাজগণতন্ত্রীদের প্রকৃষ্ট উদাহরণ। মার্কসবাদ যার বিরোধীতা করতে শিক্ষা দেয়। অথচ শ্রমিকশ্রেণী যে পার্টি, রাষ্ট্র ও সর্বস্তরে কার্য পরিচালনা এবং নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন তার নমুনা বুর্জোয়া শিল্পকারখানাগুলিতেই রয়েছে।

আমাদের মতো পশ্চাৎপদ দেশের বুর্জোয়া চটকল কারখানাগুলিতে দেখা যায়, প্রতিটি ডিপার্টমেন্টে একজন সর্দার বা ফোরম্যান থাকেন; উন্নত বিশ্বে যাদের শ্রমিকের সার্জেন্ট বলা হয়। সাধারণত এরা কারখানাশিল্পের প্রাক্তন শ্রমিক। প্রতিটি ডিপার্টমেন্টকে তারা নেতৃত্ব দেন ও কার্য পরিচালনা করে থাকেন; ঠিক যেমন রাশিয়ার সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েতগুলিতে এবং চীনের নয়াগণতান্ত্রিক কমিউনগুলিতে কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে আন্দোলনসংগ্রামে পোড় খাওয়া, রাজনৈতিক দুরদর্শিতাসম্পন্ন দক্ষ শ্রমিকেরা নেতৃত্ব দিতেন এবং কার্য পরিচালনা করতেন। তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, শ্রমিক শ্রেণী পার্টিরাষ্ট্রের নেতৃত্ব ও কার্য পরিচালনা করতে পারেন নাএকথা সত্য নয়। বুর্জোয়া শ্রেণীর লোকেরাই এ মিথ্যা প্রচার করে থাকে।

সাভারের রানা প্লাজায় ২৪ এপ্রিল, ২০১৩ তারিখে বিল্ডিং ধ্বসে গার্মেন্টস শিল্পে যে গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে এবং শিল্পের মালিক বড় ধনীদের সাথে যুক্তভাবে রাষ্ট্র সরকার যে অন্যায় যুদ্ধ শ্রমিকের উপর চাপিয়ে দিয়েছে, এমন অন্যায় যুদ্ধের বিরুদ্ধে শ্রমিকশ্রেণীর প্রতিরোধ সংগ্রামের স্বরূপ ও বর্তমান করণীয় কী হতে পারে সে পথ আলোকিত করে আমাদের শ্রমিক ভাইদের দিশা দিয়ে প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীগণ কাগজের পাতা ভরে লিখুন। দয়া করে বুর্জোয়া পত্রিকার দাবিদাওয়া সম্বলিত সম্পাদকীয় ধাঁচের লেখা লিখবেন না। দাবিদাওয়ার স্মারকলিপি লিখার কায়দা শ্রমিক শ্রেণী বুর্জোয়া নেতাদের থেকে আপনা হতে শিখেছেন। এখন আমাদের শ্রমিক ভাইদের আশু প্রয়োজন প্রগতিশীল রাজনীতির রীতিনীতি শেখা। দেশে বিদ্যমান বুর্জোয়া রাজনীতির শোষণশাসনের অধীনে দাবিদাওয়ার সংগ্রামের দ্বারা শ্রমিক শ্রেণীর স্থায়ী মুক্তি সম্ভব নয়। প্রতিনিয়ত তাঁরা তাঁদের জীবনসংগ্রাম ও মৃত্যুর মধ্য দিয়ে তিলেতিলে সেটাই অনুধাবন করছেন। আমাদের শ্রমিক ভায়েরা তাঁদের স্থায়ী মুক্তি চায়। বিদেশী টাকার দালাল বড় ধনী ও মুৎসুদ্দি বুর্জোয়া রাষ্ট্রের গোলাম হয়ে বাঁচার অর্থ হচ্ছে শ্রমিকশ্রেণীর উপর চাপানো বড় ধনীদের নিরব যুদ্ধে দৃঢ় প্রতিরোধ ছাড়াই করুণার পাত্র হয়ে মৃত্যুকে ভক্তি দেয়ার সামিল। নীরব মৃত্যুকে ‘ভক্তি’ করার দাবিদাওয়ার আন্দোলনের পথ থেকে শ্রমিক ভায়েরা পরিত্রাণ চান। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে বাঙালি জাতীয়তা বা বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের দাবার গুটি হতেও মুক্তি চান। সমাজগণতন্ত্রী বামদের তাঁরা ধিক্কার দেন।

প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী ও বিপ্লবী রাজনৈতিক মহলের ভাইদের প্রতি শ্রমিক শ্রেণীর আহ্বান শ্রমিক শ্রেণীকে বাঁচাতে হলে আপনারা ঐক্যবদ্ধভাবে বিপ্লবী রাজনীতি ও কর্মনীতি হাজির করুন। মতাদর্শের ক্ষেত্রে মার্কসবাদলেনিনবাদমাওবাদের উপর জোর গুরুত্ব দিন। সমালোচনা, আত্মসমালোচনা প্রয়োগকারী বিপ্লবী সংগঠন ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের অধীনে শ্রমিককৃষকের উঁচু মাত্রার মজুদ শক্তিকে এগিয়ে নিন। রাশিয়াচীনভিয়েতনাম ও উত্তর কোরিয়ার শ্রমিককৃষকমেহনতী মানুষ যে পথে তাদের মুক্তির পথ অনুসন্ধান করেছিলেন সেই পথও যদি অবলম্বন করতে হয় তাহলে আমাদের শ্রমিক শ্রেণীর ভাইদের সে পথের কথা জোরেসোরেই বলুন। মরতে যদি হয় সে পথেই মৃত্যু অনেক শ্রেয়; কিন্তু ফিনিক্স, স্পেকট্রাম, তাজরীন ফ্যাশনসের মতো সাভারের নিরব মৃত্যুর গ্লানি শ্রমিক ভায়েরা এড়াতে চান। তাঁদের সাফ কথা নিরব মৃত্যুকে তাঁরা বিদায় জানাতে চান। তাঁরা গর্বের সাথে বলছেন যে তাঁরা শ্রমিক; কারো কেনা গোলাম নন। তাঁরা হাত চালিয়ে দু’মুঠো শুকনো খাবার খায়। শ্রমিকের হাত দিয়ে মালিক তার সম্পদের পাহাড় গড়ে। বায়ারও লাভের অংক কষে। সাম্রাজ্যবাদ লগ্নি পুঁজি খাটায়। শ্রমিকের রক্তমাংস শোষণ করে ওরা নাদুসনুদুস শরীর বানায়। কেউ কেউ সাংসদ হন, আবার কেউ সাংসদের ভাঁড় হন। পুঁজিবাদী শোষণলুণ্ঠনের জন্যই এ সবের আয়োজন। আগেকার যুগের প্রগতিশীল পুঁজিবাদ এ নয়। পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ বিকাশ আধুনিক সাম্রাজ্যবাদে। এখন তার মুমূর্ষু পতনের কাল। পুঁজিবাদের সেই পতনের কালে বাংলাদেশের শ্রমিক শ্রেণীও আন্তর্জাতিক শ্রমিক শ্রেণীর অংশ। বিদেশী লগ্নি পুঁজি ও পণ্য পুঁজির আধিপত্যে আধুনিক সাম্রাজ্যবাদ আমাদের দেশের বড় ধনীদের গার্মেন্টসপুলিশ থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের সমস্ত সৈন্যসামন্ত দিয়ে দেশ ও জনগণের স্বাধীনতা হরণ করেছে। এবং জন্মলগ্ন থেকে নতুন কায়দায় বাংলাদেশকে আধাঔপনিবেশিক রাষ্ট্রে পরিণত করেছে। এ জন্যই দেশের বড় ধনীরা সামরিকবেসামরিক আমলাদের সাথে যোগসাজস করে কখনো সামরিক শাসন, আবার কখনো সংসদীয় ব্যবস্থা কায়েম করে। এ থেকে পরিত্রাণের জন্য বড় ধনীদের সংসদীয় গণতন্ত্রকে এবং সামরিক শাসনের সম্ভাবনাকে বিদায় জানিয়ে সাম্রাজ্যবাদ ও বড় ধনীদের গণতন্ত্রের বিপরীতে শ্রমিক শ্রেণীর নেতৃত্বে সমাজতন্ত্রের লক্ষে নতুন ধরণের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র অর্জনের সকল উচু মাত্রার বিপ্লবী প্রস্তুতিকে স্বাগত জানানো হোক। এছাড়া এই অন্যায় হত্যার প্রতিবাদের ভাষা আমাদের জানা নেই। সাভারের মতো আরো অনেক গণহত্যা হয়তো অপেক্ষা করছে। সময় থাকতে উঁচু মাত্রার প্রতিরোধ যুদ্ধে প্রস্তুত হোন। অযথা শ্রমিকের জন্য বড় ধনী, বুর্জোয়া ও বাম সমাজগণতন্ত্রী নেতা এবং ভাড়াটে বুদ্ধিজীবীদের মায়াকান্না বন্ধ হোক।।

লেখক: পেরুর আকাশে লাল তারা, মাওবাদ বনাম আধুনিক সংশোধনবাদ গ্রন্থ প্রণেতা।

shah_sarker@yahoo.com

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.