লিখেছেন: এস আর সজীব

savar-disaster-12সাভার আজ এক অভিশপ্ত নরককুন্ড। বেড়েই চলেছে লাশের মিছিল। কেউ জানে না এর শেষ কোথায়। আহতদের আর্ত চিৎকার, স্বজন হারানোদের বিলাপ, লাশের উৎকট গন্ধ, প্রিয়জনের খোঁজে উৎকণ্ঠার দীর্ঘ অপেক্ষা। অভিশাপের যন্ত্রনার চাপে বিপর্যস্ত মানবতা। এটাকে দুর্ঘটনা বা ট্রাজেডি বলে চালানোর অপচেষ্টা থেকে বিরত থাকুন। মুক্ত থাকুক মনুষত্ব নিয়ে প্রহসন করা থেকে। এটা হত্যাকান্ড। এটা নিছক খুন আর খুন ঠান্ডা মাথায় স্মরণকালের ভয়াবহ বিভৎস গণহত্যা।

অভিশপ্ত রানা প্লাজা! ভবনে দেখা দিয়েছে ফাটল। ২৩ ডিসেম্বর বিশেষজ্ঞরা ভবনকে পরিত্যাক্ত করার ঘোষণা দেন। এটাকে আমলে নিয়েছিলেন ভবনের দোকানপাট এবং ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। তারা মালামলের গুরুত্ব দেননি। গুরুত্ব দিয়েছেন কর্মচারীদের জীবনের নিরাপত্তার প্রতি। ২৩ তারিখেই তারা ভবন থেকে নিজেদের গুটিয়ে নেন। কিন্তু গুটিয়ে নেয়নি ভবনের মালিক দুর্বৃত্ত সোহেল রানা ও তার সহোদর গার্মেন্টস মালিকরা। তাদের নগ্ন লালসার কাছে পদদলিত করা হলো হাজার হাজার শ্রমিকের জীবিত থাকার অধিকার থেকে। কারখানা খেলা রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়। শ্রমিকরা আপত্তি জানায়। কর্ণপাত করেনি দুর্বৃত্তরা। চাকরির হুমকি, বেতন কর্তনের হুমকি দেওয়া হলোশ্রমিকদের মধ্যে আশঙ্কার গুঞ্জন। এটাকে প্রশমিত করতে দোসর করা হলো প্রশাসনিক সরকারি কর্মকর্তা ইউএনও এবং পৌর প্রকৌশলীদ্বয়কে। লোভ আর প্রতাপের কাছে মনুষত্ববোধ, দায়িত্বকর্তব্যবোধ এবং মূল্যবোধকে বিসর্জন দিয়ে শ্রমিকদের আশ্বস্ত করার কলঙ্কের অধ্যায় রচনা করলো তারা। যা ঘটার তাই ঘটে গেল। ২৪ ডিসেম্বর ঘটে গেল মহাপ্রলয়।

এই প্রলয়তো নতুন নয়। এটা পূর্বাপর ঘটনার সর্বোচ্চ স্ফীতির পুনরাবৃত্তি মাত্র। বাংলাদেশের গার্মেন্টস সহ অধিকাংশ শিল্প ক্ষেত্রের সাধারণ চিত্র। শিল্প আইনের থোড়াই কেয়ার করেন এদেশের শিল্প মালিকরা। শ্রমিকের জীবনের নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য সম্মত পরিবেশে নিরাপদে কাজ করার নিশ্চয়তা, ন্যায্য বেতন, স্বীকৃত সুযোগ সুবিধা প্রদান, ট্রেড ইউনিয়ন করা সহ শ্রমিকের মৌলিক অধিকার প্রদানে কখনওই তারা তোয়াক্কা করে না। বেকারত্ব আর অভাবের সুযোগ নিয়ে এরা নামমাত্র শ্রমের মূল্য ও শ্রমিকের জীবনকে জিম্মি করে সর্বোচ্চ মুনাফা লুণ্ঠনের শিকারে পরিণত করেছে। এদের এই বর্বর জীঘাংসার কাছে বলী হয়েছে স্প্রেকট্রাম, ফিনিক্স, হামিম গ্রুপ, তাজরীনসহ অসংখ্য গার্মেন্টস ও শিল্প কারখানার শ্রমিকেরা। আরও যে কত হবে তার পুনরাবৃত্তি দেখতে সময়ের জন্য অপেক্ষা করতে হবে মাত্র।

এই বর্বর হত্যাকান্ড, নির্মম পাশবিকতা ও লোমহর্ষক ঘটনার আজও পর্যন্ত কোনো প্রতিকার হয়নি, বিচার হয়নি। ঘটনা যখন সংঘটিত হয়গরম গরম নানা লোক দেখানো পদক্ষেপের ঘোষণা দেয়া হয়। নানা নামে তদন্ত কমিটি গঠিত হয়ব্যাস এই পর্যন্তই। ঘটনার প্রতিক্রিয়া থিতিয়ে আসলে সময়ের অতলান্তে তা চাপা পড়ে যায়। অপরাধীরা বুক চিতিয়ে দাপিয়ে বেড়ায় সমাজের সর্বস্তরে। ঘটনার শিকার হয়ে যে শ্রমিকের জীবন যায়যারা পঙ্গুত্ব মাথায় বরণ করেন তাদের পরিবার ও তারা বয়ে চলেন দুর্ভাগ্যের অভিশাপ মাথায় নিয়ে।

প্রচলিত রাষ্ট্র ব্যবস্থায় এটাই স্বাভাবিক পরিণতি। নয়া উপনিবেশিক আধা সামন্তবাদী এই রাষ্ট্রব্যবস্থা তিন শোষণ শাসনের পাহারাদার। লগ্নি পুঁজির ধারক বাহক সাম্রাজ্যবাদ ও তাদের দেশিয় দালাল সামন্তআমলা মুৎসুদ্দি পুঁজির স্বার্থ রক্ষাকারী ব্যবস্থা। লগ্নি পুঁজির স্বার্থ হলো আমাদের মত দেশগুলো থেকে কত সস্তায় শ্রমশক্তি, প্রাকৃতিক সম্পদ ও কাঁচামাল লুণ্ঠন করা যায়। দেশিয় দালাল শ্রেণী হলো তাদের এই লুণ্ঠনের মাধ্যম মাত্র। এরা প্রভুর উচ্ছিষ্ট ভোগ করে সমাজে নিজেদেরকে অর্থবিত্ত, প্রভাব প্রতিপত্তিতে প্রতিষ্ঠিত করে। ভূলুণ্ঠিত হয় জাতীয় স্বার্থ, নিষ্পেষিত হয় শ্রমিক, কৃষকসহ সাধারণ জনগণের জীবন জীবিকা। প্রতিনিয়তই তাদের জীবন হয়ে ওঠে দূবিষহ। পদদলিত হয় সামাজিক মূল্যবোধ, মানবিকতা, আইনশৃঙ্খলা ও ন্যায় বিচার। সুতরাং প্রচলিত রাষ্ট্র ব্যবস্থায় যারাই ক্ষমতায় আসুক জাতি ও জনগণের ভাগ্যে নেমে আসে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি মাত্র।

কিন্তু অনন্য দেশের জনগণএত নিষ্ঠুরতা, বর্বরতা, নির্মম বঞ্ছনা, নির্যাতন এত কিছুর পরও তাদের জীবনী শক্তিকে দুর্বল করতে পারে না। প্রতিক্রিয়ার সকল প্রতিবন্ধকতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ দুপায়ে দলে আবার ঘুরে দাঁড়ায়। কলেলাঙ্গলে বাধার পাহাড় গলে তারা জীবনের খেলায় মেতে উঠে। পরাভব মানে না তারা। নিজেরা নিজেদের সকল দুর্ভোগ কাটিয়ে এগিয়ে চলে সামনের দিক, কারো তোয়াক্কা করে না। ঐক্য, ভ্রাতৃত্ববোধ, মানবিক মূল্যবোধের ইতিহাস রচনা করে। সাভারের এই মহাপ্রলয় মোকাবেলায় আবারও রচিত হলো ইতিহাসের এক মহাকাব্য। স্বার্থান্বেষীদের নাকি কান্না, লোক দেখানো তৎপরতা মানুষের মৃত্যু নিয়ে সংসদে রাজনীতি করণের বাণী বর্ষণ, রেলগাড়ী উদ্বোধনের সুললিত দৃশ্য প্রদর্শনকে চাপা দিতে দুরন্ত সাহস, আত্মত্যাগ, অমিত ধৈর্য্য সৃজনশীলতা ও মমত্ববোধের অমর কাব্য করে সাভারের মহাপ্রলয় মোকাবেলায় উদ্ভাসিত করছে জনগণ আরও এক অনন্য ইতিহাস।

এই মহান অদম্য শক্তির অধিকারী জনগণকে ভাগ্য নিয়ন্ত্রণের রাষ্ট্রযন্ত্রটার দায়িত্বে উপনিত করতে পারলে প্রচলিত রাষ্ট্রের সকল আবর্জনা ও ব্যর্থতা দূর করে জাতিকে সৌভাগ্যের শিখরে উপনীত করা মাত্র সময়ের ব্যাপার। সাভারের ঘটনায় সেটাই প্রমাণিত করে। কিন্তু কারা সেই দায়িত্ব পালন করবেজনগণকে রাষ্ট্র ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত করার অগ্রণী দায়িত্ব হলো দেশপ্রেমিক বিপ্লবী রাজনৈতিক শক্তির। তাদের আজ বলার সময় এসেছে, আর নয়রক্তাক্ত আজ গোটা দেশ। ফুঁসে ওঠো, ক্রোধ আর ঘৃণায়। ছিন্ন করো পিছুটান। গোলামীর ফটকগুলো বন্ধ কর, আর যেন খুলো না।

(সূত্র: সাপ্তাহিক সেবা ‘মে দিবস সংখ্যা’ ৩৩ বর্ষ, ০২ সংখ্যা, বুধবার, ১ মে ২০১৩)

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s