লিখেছেন: প্রশান্ত মাহমুদ

savar-disaster-12আবারো লাশের মিছিল। গত ২৪ নভেম্বর তাজরীন গার্মেন্টসে শত শত শ্রমিক পুড়ে অঙ্গার হওয়ার ঠিক ৫ মাসের মাথায় গত ২৪ এপ্রিল বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পের ইতিহাসে ভয়াবহতম ঘটনায় ভবন ধ্বসে পড়ে জীবন্ত কবর হলেন সাভারের রানা প্লাজার পাঁচটি গার্মেন্টেসের হাজারো শ্রমিক। এখন পর্যন্ত উদ্ধার করা লাশের সংখ্যা ৩৯৮। অবিরাম, অবিশ্রান্ত উঠে আসছে লাশ। জানিনা, এই লেখা শেষ করতে করতে এই লাশের সংখ্যা কততে গিয়ে ঠেকবে। ঘটনার দিন সেখানে উপস্থিত প্রত্যক্ষদর্শী, এলাকাবাসী, উদ্ধারকারী ও উদ্ধার হওয়া শ্রমিকদের সাথে কথা বলে এবং মিডিয়ায় আসা তথ্য সব কিছু মিলিয়ে এটা নিশ্চিত হওয়া গেছে যে সেখানে বিভিন্ন তলায় অবস্থিত গার্মেন্ট কারখানাগুলোতে ৫৬ হাজার শ্রমিক কর্মরত ছিলেন। এখন পর্যন্ত আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে ২৪৪৪ জনকে। ২য় পর্যায়ের উদ্ধার কাজ শুরু হয়েছে। হাজারো মানুষ এখনো নিখোঁজ।

বলা বাহুল্য এরকম ঘটনা বাংলাদেশে এবারই প্রথম নয়। বাংলাদেশের প্রতিটি সৎ বিবেকবান মানুষ, প্রতিটি তরুণ, প্রতিটি শ্রমিক, প্রতিটি তাজা প্রাণ এই ঘটনায় বাকরুদ্ধ, মর্মাহত এবং ক্রুদ্ধ। সেই ক্রোধ পাহাড়সম হয়ে পড়ে যখন আমরা বাস্তবে কি কি ঘটেছিল এবং ঘটনা ঘটার পরবর্তী ঘটনা পরম্পরার দিকে চোখ রাখি।

সরকারের বিভিন্ন জন এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন বক্তব্য দিচ্ছেন। বিভিন্ন “বিশেষজ্ঞ” মতামত দিচ্ছেন, মালিকের স্বার্থে প্রপাগান্ডা চালাচ্ছেন। কিন্তু প্রপাগান্ডা আর বাস্তবতা তো এক জিনিস নয়। এবারে এখন পর্যন্ত যত খবর বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রকাশিত ও প্রচারিত হয়েছে তার আলোকে এক্ষেত্রে কি কি বাস্তব ঘটনা (Fact) ঘটেছে সংক্ষেপে সেগুলোর উপর একটু নজর দেয়া যাক

. স্থানীয় যুবলীগ নেতা সোহেল রানার মালিকানাধীন সাভার বাজারের কাছে অবস্থিত রানা প্লাজায় একটি ব্র্যাক ব্যাংকের একটি শাখা সহ মার্কেট এবং বিভিন্ন তলায় ৫টি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরী ছিল। গত মঙ্গলবার ভবনটিতে বিভিন্ন তলায় ফাটল সহ ৭ম তলার একটি পিলারেও ফাটল দেখা দেয়। যার পরিপ্রেক্ষিতে স্থানীয় পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস ভবনটিকে পরিত্যাক্ত ঘোষণা করে। শিল্প পুলিশের পক্ষ থেকেও ফাটলের পরিপ্রেক্ষিতে কারখানা বন্ধ রাখতে বলা হয়। যার খবরও বিভিন্ন সংবাদপত্রে বের হয়।

. এর পরিপ্রেক্ষিতে ব্র্যাক ব্যাংক তাদের উক্ত শাখাটি বন্ধ করে দেয়। কিন্তু নিষেধ অমান্য করে ভবনের মালিক সোহেল রানার রাজনৈতিক ক্ষমতার দাপটে মালিকপক্ষ গার্মেন্টস কারখানাগুলো খোলা রাখে। শ্রমিকেরা ফাটল ধরা ভবনে প্রবেশ করতে না চাইলেও ভবন মালিক থেকে শুরু করে মালিকপক্ষ তাদের ভবনের স্থিতিশীলতা সম্পর্কে মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে, জোর করে, ভয় দেখিয়ে, বেতন কাটার হুমকি দিয়ে কারখানায় প্রবেশ করতে বাধ্য করে। কারখানাগুলোতে শ্রমিকরা প্রবেশের পর কাজ শুরু করার পরপরই পুরো নয় তলা ভবনটি ধ্বসে পড়ে। জীবন্ত কবর দেয়া হয় হাজার হাজার শ্রমিককে।

. মালিক সোহেল রানা ভবন ধ্বসের পর উক্ত ভবনের নিচতলায় ছিলেন। ঐ অংশটি ক্ষতিগ্রস্ত না হলেও জনরোষের ভয়ে তিনি ভবনের বাইরে যাওয়া থেকে বিরত থেকে নিচেই বসে থাকেন। পরে স্থানীয় সরকারদলীয় সংসদ সদস্য মুরাদ জং গিয়ে তাকে উদ্ধার করে নিয়ে যান। এবং এর পর থেকে তিনি নিখোঁজ হয়ে পড়েন। পুলিশের খাতায় “পলাতক” হয়ে যান। যদিও অনেক নাটকের পর গতকাল তাকে বেনাপোল থেকে ধরা হয়েছে।

. রাজউকের আওতাধীন এলাকার মধ্যে থাকা সত্ত্বেও রাজউকের অনুমোদন ছাড়াই হাজা মজা ডোবার উপর নির্মিত রানা প্লাজা ভবনটি সম্পূর্ণ অনুমোদনহীন ছিল। ভবন নির্মানের প্রতিটি ক্ষেত্রে কোন রকম নিয়ম নীতির তোয়াক্কা করা হয় নি। রাজউককের নাকের ডগায় রাজউককে পাশ কাটিয়ে সাভার পৌরসভা থেকে ৫ তলা ভবন করার অনুমতি নিয়ে ৯ তলা ভবন নির্মান করার হয় সেখানকার প্রশাসনের নাকের ডগায়। যদিও এত বড় একটি ভবনের অনুমতি দেয়ার মতো যথেষ্ট কারিগরী জ্ঞানসম্পন্ন লোকবল সাভার পৌরসভার নেই। অন্যদিকে সাভার পৌরসভা নির্মাণ কাজের জন্য যতটুকু মানদণ্ড বেঁধে দিয়েছিল সেটাও রক্ষিত হয়নি। আর এই সকল যথেচ্ছাচার ভবন মালিক করতে পারেন তার রাজনৈতিক ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে।

. বহু আগেই রানা প্লাজার ত্রুটি ধরা পড়ে। পৌরসভার প্রকৌশলীরা বহু আগেই ভবনটিকে গার্মেন্ট কারখানা হওয়ার জন্য অনুপযুক্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ বলে রায় দিলেও গার্মেন্টস মালিকেরা তাতে কর্ণপাত করেননি। ভবন মালিকের রাজনৈতিক ক্ষমতার সাথে গাঁটছড়া বেঁধে গার্মেন্টস চালু রাখেন। অন্যদিকে বিজিএমইএ থেকেও গার্মেন্টসগুলোর অনুমোদন দেয়া হয়ে এবং এসব ব্যাপারে এতদিন কোন আপত্তি তোলা হয়নি।

. ভবন ধ্বসের পর থেকে রাজউক ও সাভার পৌরসভা অনুমোদনহীন ভবন গড়ে উঠতে দেয়ার দায় একে অন্যের উপর চাপাচ্ছে।

সংক্ষেপে এই হচ্ছে ঘটনা। কারা এই হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী সেটা বলে দেয়ার আর কোন দরকার পড়ে না। সেটার জন্য “তদন্ত” করার আর কোন দরকার পড়ে না। উপরোক্ত বাস্তব ঘটনাগুলোই তার জবাব দিচ্ছে। উপরোক্ত বাস্তব ঘটনাগুলোই বলে দেয় এই গণহত্যাকাণ্ডের জন্য সোহেল রানা ও সংশ্লিষ্ট গার্মেন্টস মালিকেরা সরাসরি দায়ী হলেও বিজিএমইএ এই ঘটনার দায় কোনভাবেই এড়াতে পারে না। সেই সাথে রাজউক, সাভার পৌরসভা, শিল্প পুলিশ, প্রশাসন এবং স্থানীয় সংসদ সদস্য মুরাদ জং কেউই এর দায় এড়াতে পারেন না। অন্যদিকে, ঘটনার পরবর্তী ঘটনা পরম্পরায় কিছু বিষয় প্রকটভাবে বেরিয়ে এসেছে। এবারে সেগুলোর দিকে চোখ রাখা যাক।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভূমিকা থেকে যে সকল বিষয় বেরিয়ে আসে:

ঘটনার পর পরই সেখানে উপস্থিত হন অতি অল্প দিনেই কুখ্যাতি পাওয়া আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি সেখানে পৌঁছে সাংবাদিকদের কাছে স্বীকার করেন ভবনটি নির্মাণে ইমারত বিধিমালা অনুসরণ করা হয় নি। তিনি দোষীদের আইনের আওতায় আনার কথা বলেন। ভবন মালিককে গ্রেপ্তারের বিষয়টি তার “মাথায় আছে” বলে জানান এবং বলেন এক্ষেত্রে “তদন্ত করে” ব্যবস্থা নিবেন। তার পেছনেই টিভিতে এই সাক্ষাৎকার দেয়ার সময় মুরাদ জংকে আমরা দেখেছি, যে মুরাদ জং ঘটনার পর পরই ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে খুনি ভবন মালিক সোহেল রানাকে জনরোষ থেকে উদ্ধার করে নিয়ে যান।

প্রশ্ন হচ্ছে যেখানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসে নিজের মুখেই বলেন যে ভবন নির্মাণে নিয়ম মানা হয় নি সেখানে ভবন মালিককে গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে কেন তদন্ত করতে হবে? এই দুমুখো কথা কেন? এর একটাই জবাব। যে মালিক ও খুনিলুটেরা শ্রেণীর তিনি প্রতিনিধিত্ব করেন সেই শ্রেণীগত ঐক্য থেকে তিনি খুনিদের তৎক্ষণাৎ বাঁচাতে চেয়েছিলেন। পরবর্তীতে আমরা দেখলাম তিনি নিজেই প্রকৌশলী সেজে “পিলার নাড়াচাড়া” তত্ত্ব হাজির করলেন। এবং অনেক নাটকের পর অবশেষে সোহেল রানাকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিলেন। কিন্তু ততক্ষণে পুলিশের খাতায় সোহেল রানা “পলাতক” হয়ে গিয়েছিলেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরো বললেন, প্রভাবপ্রতিপত্তির কারণে কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। খুব ভাল কথা। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে জনরোষের ভয়ে ধ্বসে পড়া ভবনের নিচে লুকিয়ে থাকা যুবলীগ নেতা সোহেল রানাকে যে ব্যক্তি উদ্ধার করে “পলাতক” হতে সহায়ত করল, খুনিকে পালিয়ে যেতে সহায়তা করার জন্য সেই সরকার দলীয় সংসদ সদস্য মুরাদ জংকে কেন গ্রেপ্তার করা হবে না?

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে প্রশ্ন, আপনি যেখানে জানতেন যে ভবন নির্মাণে ভবন মালিকের গাফিলতি আছে সেখানে ঘটনার একদিন পরে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিলেন কেন? আপনি যেখানে জানতেন মুরাদ জং ঐ খুনিটিকে উদ্ধার করে পালাতে সহায়তা করেছে তখন তৎক্ষনাৎ মুরাদ জংকেই বা কেন গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিলেন না? তাহলে আপনি নিজেও কি দোষী নন? খুনিদের গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিতে আপনি যে গড়িমসি করলেন সেই অপরাধে আপনাকেও কি গ্রেপ্তার করা উচিত নয়?

অবশেষে জনগণের প্রবল প্রতিরোধের মুখে ২৮ এপ্রিল সোহেল রানাকে গ্রেফতার করা হল। কিন্তু এখনো সকল গার্মেন্টস মালিকদের গ্রেফতার করা হয় নি। প্রবল জনরোষের ভয়ে অবশেষে হয়তো সরকার এদেরকেও গ্রেফতার করবে। কিন্তু তবুও যে মৌলিক প্রশ্নটি থাকে তা হচ্ছে কেন তৎক্ষনাৎ গ্রেফতার করা হল না? আজকে শ্রমিকেরা না হয়ে যদি সেনাবাহিনীর অফিসাররা মারা যেত, যদি বিজিএমইএর মালিকদের এভাবে খুন করা হত, তাহলেও কি এই গড়িমসি হতো?

অন্যদিকে, ঘটনাপরবর্তী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেয়া বক্তব্যের তুমূল সমালোচনা চলছে। বেশির ভাগ আলোচনাতেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে পাগল, ছাগল, অযোগ্য, বুদ্ধি প্রতিবন্ধী, মাতাল, মগা ইত্যাদি বলে অভিহিত করা হচ্ছে। সৎ ও অসৎ দুই উদ্দেশ্যেই এই ধরনের সমালোচনা হচ্ছে। যারা সৎ উদ্দেশ্যে এধরনের সমালোচনা করছেন তাদের মনে রাখা দরকার যে, এহেন সমালোচনা দ্বারা কোন উপকার তো হয়ই না বরং অপকার হয়। কেননা এহেন সমালোচনা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আসল চরিত্রকে লুকিয়ে ফেলে সেটা সমালোচনাকারীদের ইচ্ছাতেই হোক কিংবা অনিচ্ছাতেই হোক। আর সেই আসল চরিত্র হল তার শ্রেণী চরিত্র। খুব সহজ প্রশ্ন রাশি রাশি গোয়েন্দা তথ্যের উপর যিনি বসে থাকেন, তার পক্ষে চাইলেও কি “পাগলছাগল”, “অযোগ্য”, “বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী”, “মাতাল” হওয়া সম্ভব? একটা ছাগলকেও যদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের দায়িত্বে বসিয়ে দেয়া হয়, তাহলে রাশি রাশি তথ্য হজমের পর সেকি আর ছাগল থাকবে? তার নিচের স্তরের লোকেরা কি তাকে ছাগল থাকতে দিবে? তারচেয়েও গুরুতর প্রশ্ন “পাগল”, “ছাগল”, “বুদ্ধি প্রতিবন্ধী”, “মাতাল”, “মগা” কোন ব্যক্তিকে কি কেউ কখনো স্বরাষ্ট্রমন্ত্রনালয়ের দায়িত্বে বসায়? উত্তর হল না না এবং না। সুতরাং এটা পরিস্কার যে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একদম জেনে বুঝে পরিস্কার ঠান্ডা মাথায় উপরোক্ত “পিলার নাড়াচাড়া” তত্ত্ব সহ বাকি বক্তব্যগুলো দিয়েছেন। তিনি যেই মালিক শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষা করেন এবং তিনি যে দুর্বৃত্ত শ্রেণীর প্রতিনিধিত্ব করেন সেই দুর্বৃত্ত শ্রেণীর স্বার্থের দৃষ্টিকো থেকে জনগণকে তোয়াক্কা না করে যা খুশি তাই ধরণের বেপরোয়া ফ্যাসিস্ট বক্তব্য দেওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। দুর্বৃত্ত শ্রেণীর স্বার্থের যারা একনিষ্ঠ সেবক, তাদের পক্ষে এমন বক্তব্য দেয়া ছাড়া অন্য কোন উপায় নেই।

প্রধানমন্ত্রীর প্রতিক্রিয়া থেকে যে সকল বিষয় বেরিয়ে আসে

এবার আসা যাক আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতিক্রিয়ায়। প্রধানমন্ত্রী যথারীতি “গভীর শোক” প্রকাশ করলেন। সরকার থেকে শোক দিবসের ঘোষণা দেয়া হল। কিন্তু সকাল বেলা প্রধানমন্ত্রী যে প্রতিক্রিয়া দিয়েছিলেন সেটা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বলেছিলেন, “আমরা আগে থেকেই সচেতন ছিলাম। আমরা জানতাম বলে সব লোক সরিয়ে ফেলা হয়েছিল। কিন্তু মূল্যবান জিনিস সরিয়ে নিতে লোকজন সকালে সেখানে গিয়েছিল।” এটার চেয়ে বড়, এর চেয়ে নিকৃষ্ট, এর চেয়ে নির্লজ্জ মিথ্যাচারিতা আর কি হতে পারে? মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রশ্ন থাকে, গার্মেন্টেসের শ্রমিকেরা কোন মূল্যবান জিনিস সরাতে সেখানে গিয়েছিল? তারা কি গার্মেন্টেসের যন্ত্রপাতি সরাতে সেখানে গিয়েছিল? পত্রিকার রিপোর্ট কি বলে? সব কটি পত্রিকা কি তাহলে মিথ্যা লিখছে? সব কটি টিভি চ্যানেল কি তাহলে মিথ্যা খবর পরিবেশন করছে? যদি সেটা না হয়ে থাকে তবে কেন এই নির্লজ্জ মিথ্যাচার?

শুধু তাই নয়, তিনি এও দাবী করলেন যে, এই গণহত্যাকারী রানা যুবলীগের কেউ নয়। রানার সাথে তাদের অর্থাৎ, আওয়ামী লীগের কোন সম্পর্ক নেই। তাহলে প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রশ্ন থাকে পুরো সাভার বাজার জুড়ে রানা আর মুরাদ জংয়ের একত্রিত ছবি সম্বলিত পোস্টারগুলো কোথা থেকে এল যেগুলোর নিচে রানার পদবী লেখা সাভার পৌর যুবলীগের “সিনিয়র যুগ্ম আহবায়ক”। যদি রানা অবৈধভাবে এটা করে থাকে তাহলে এতদিন কোথায় ছিল আপনাদের মুরাদজং? কোথায় ছিলেন আপনারা? রানার সাথে আওয়ামীলীগের কোন সম্পর্ক আছে নাকি নাই তার উত্তর অতি সম্প্রতি পত্রিকায় প্রকাশিত রানার কপালে মুরাদ জংয়ের চুমু খাওয়ার ছবিগুলোই দিয়ে দিচ্ছে। সেগুলো বেপরোয়াভাবে আপনার আরেকটি বেপরোয়া মিথ্যাচারকে জনগণের সামনে উন্মোচিত করে দিয়েছে। আশা করি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এখন বলবেন না যে ওগুলো বানানো ছবি।

যাই হোক, ঘটনার পরদিন আমরা প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে আরো কিছু “বচনামৃত” উপহার পেলাম। তিনি ঘটনার দিন জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে কয়েক ফোঁটা চোখের পানি ফেললেও পরদিন সাভারের হত্যাকাণ্ডটিকে সুকৌশলে “অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক” বলে অভিহিত করলেন। তবে কি হত্যাকাণ্ডটি দুর্ভাগ্যের ব্যাপার? তবে কি হত্যাকাণ্ডটির উপর কারো কোন হাত নেই?

এছাড়াও প্রধানমন্ত্রী এই তত্ত্বও দিলেন যে, আগে উদ্ধারকাজ তারপর দোষীদের শাস্তি। এর চাইতে বেপরোয়া, এর চাইতে প্রতারণাপূর্ণ বক্তব্য আর কি হতে পারে? কোথায় কে কবে শুনেছে যে, দোষী কোন হত্যাকাণ্ড করার পর দোষীকে খুঁজে বের করে শাস্তি দেয়াটা দ্বিতীয় পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ কাজ বলে বিবেচিত হয়? প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রশ্ন থাকে যে, উদ্ধার কাজে কি বাংলাদেশের সকল পুলিশ, সকল গোয়েন্দা, সকল র‌্যাব সদস্য, সকল সেনা সদস্য জড়িত? যদি তা না হয়ে থাকে তবে কেন একই সাথে উদ্ধারকাজ আর দোষীকে খুঁজে বের করার কাজ করা হবে না? অন্যদিকে, দোষী কারা সেটা সবাই পত্রিকার মারফত জানে। আপনারাও যে জানতেন সেটাতো স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ঘটনার পরপর তাৎক্ষণিক দেয়া বক্তব্যেই পরিস্কার। তাহলে প্রধান দোষী ঐ ভবন মালিককে তৎক্ষণাৎ গ্রেফতার করলেন না কেন? যখন জানলেন মুরাদ জং ঐ খুনিটাকে উদ্ধার করে পালাতে সাহায্য করেছে তখন মুরাদ জংকে কেন গ্রেফতার করলেন না? সামনে নির্বাচন, পেশীশক্তি মজুদ রাখা দরকার, এইজন্য? অবশেষে জনরোষের ভয়ে রানাকে গ্রেফতার করে হেলিকপ্টারে উড়িয়ে আনা হলেও এই প্রশ্নগুলো কিন্তু রয়ে যায়।

অন্যদিকে, উক্ত গার্মেন্টসগুলোর মালিকদেরকে গ্রেফতারে কোন উদ্যোগও আপনারা ঘটনার তিন দিন পরও নেননি। কেন? তাদের খোঁজ কি আপনাদের জানা ছিল না? তাদের বাড়ির ঠিকানা ব্যাবসা প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক একাউন্টের ঠিকানা কি আপনাদের জানা ছিল না? অবশেষে শ্রমিক ও জনগণের ব্যাপক বিক্ষোভের পর জনরোষের ভয়ে মালিকদের দুই জনকে গ্রেফতার করতে বাধ্য হলেন। এসব ঘটনা কি প্রমাণ করে? আপনারা কাদের স্বার্থের লোক?

উল্লেখ্য ঘটনার দিনও একই ধরনের কথা বলেছেন শ্রম মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মো. ইস্রাফিল আলম। তিনি স্থানীয়দের বিক্ষোভের মুখে বলেছেন, “কারখানা খোলার জন্য কে দায়ী এটা এখনই না দেখে আমাদের সবার উদ্ধার তৎপরতায় মনোযোগ দেয়া উচিত।” পরে এ ঘটনার জন্য দায়ীদের খুঁজে বের করে অবশ্যই বিচারের আওতায় আনা হবে বলে আশ্বাস দেন তিনি। কি চমৎকার নিজ শ্রেণীর সেবার নমুনা! ইস্রাফিল সাহেবকে প্রশ্ন করতে চাই আজকে যদি শ্রমিকেরা না হয়ে বিজিএমইএর নেতাদের ঐ ভবনে ঢুকিয়ে এভাবে জীবন্ত কবর দেয়া হত, তাহলেও আপনার এমন নির্লিপ্ততা থাকতো কি? তখনও কি আপনি হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ীদের পরে খোঁজার কথা বলতে পারতেন? তখন মুখে আনা তো দূরে থাক এ ধরনের কথা চিন্তা করার সাহসও কি আপনার হতো?

শুধু তাই নয় যারা এই ঘটনায় সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে প্রধানমন্ত্রী তাদেরকে নসিহত করলেন তারা যেন টক শোতে সময় নষ্ট না করে ওখানে গিয়ে উদ্ধারকাজে অংশ নেন। খুব ভাল কথা। কিন্তু এত বড় বড় নসিহতকরনেওয়ালা নিজে কি করেছেন? জনগণের এত বড় বিপদের দিনে প্রধানমন্ত্রী ডেমু ট্রেনের উদ্বোধনের মতো অগুরুত্বপূর্ণ কাজে সময় দিতে পারলেন। তার পরদিন টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সাথে মতবিনিময় করতেও তার সময়ের অভাব হল না। অথচ যত সময়ের অভাব হল শ্রমিকদের দেখতে যেতে? প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রশ্ন থাকে আপনি না গেলে কি ডেমু ট্রেন রেললাইন ধরে চলতে পারতো না? টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতাদের সাথে মতবিনিময়টা পিছিয়ে দিলে কি মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যেত? এত কিছুর পরও অন্যদের নিয়ে এই বড় বড় নসিহত করতে কি একটুও লজ্জা লাগলো না আপনার? আওয়ামী লীগের ভাষ্যমতে, আপনি তো জননেত্রী। তা জনগণের যিনি নেত্রী তিনি কেন জনগণের এত বড় বিপদের দিনে এখন পর্যন্ত একটিবারের জন্যও সেখানে যাওয়ার প্রয়োজন বোধ করলেন না? তাহলে আপনি কিসের জননেত্রী? আপনি তাহলে কাদের প্রধানমন্ত্রী? জনগণের নাকি ঐ মালিকদের? জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে যতই অশ্রু বর্ষণ করুন না কেন আপনার কর্মকাণ্ড ও আচরণ দ্বারা কিন্তু আপনি এটাই প্রমাণ করলেন যে, আপনি ঐ মালিকদেরই প্রধানমন্ত্রী। আমাদের নন। আপনি ঐ খুনি, ঐ লুটেরা, ঐ দস্যু, ঐ শোষক মালিকদেরই নেত্রী। জনগণের নন।

বিরোধী দলের প্রতিক্রিয়া থেকে যে সকল বিষয় বেরিয়ে আসে

এবারে দেখা যাক আমাদের বিরোধী দলের প্রতিক্রিয়া কি ছিল। বিরোধীদলও যথারীতি গভীর শোক প্রকাশ করেছে। এবং তারা তাদের হরতালও প্রত্যাহার করেছে। কিন্তু সেটা কখন? দুপুর বেলা ঘটনা ঘটার প্রায় ৬ ঘন্টা পরে। প্রশ্ন আসে যখন সকাল ১০টার মধ্যেই খবর চলে আসে যে সাভারে একটি মহাবিপর্যয় ঘটে গেছে সেখানে জনগণের সেই বিপদে সাড়া দিতে বিরোধী দলের এত দেরী হল কেন? কেন তৎক্ষণাৎ হরতাল প্রত্যাহার করা হল না? আজকে যদি বিজিএমইএ ভবন এভাবে ধ্বসে পড়ত তাহলেও কি বিরোধী দল এত দেরী করে সাড়া দিত? অন্যদিকে, বিরোধী দলের পক্ষ থেকেও প্রথমদিন সকলকে উদ্ধার কাজে এগিয়ে আসার আহ্বান জানানো হল এবং এটাকেই সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ বলে প্রচার করা হল। এদিকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য রানাকে গ্রেফতারের দাবী তুললেও গার্মেন্টস মালিকদের গ্রেফতারের ব্যাপারে তারা নিরব রইলেন। বিজিএমইএএর কাছ থেকে সমস্ত ক্ষতিপূরণ চেয়েও তারা কোন দাবী তুলেনি। বিজিএমইএকে কাঠগড়ায় দাঁড় করায়নি। কিন্তু কেন? গামেন্টস খোলা রেখে মালিকরাও কি সমান অপরাধ করেনি? অনুমোদনহীন ভবনে গার্মেন্টস কারখানা খোলার অনুমতি দিয়ে খোদ বিজিএমইএ কি কোন অপরাধ করেনি? বিরোধী দলের এই নিরবতা থেকেই প্রমাণিত হয় তারা কাদের স্বার্থ দেখেন।

অন্যদিকে, দলীয় লোকদের দ্বারা দেশনেত্রী খেতাবপ্রাপ্ত বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া অকুস্থলে গেলেন ঘটনার একদিন পর। দেশের মানুষের বিপদে তাদের পাশে এসে দাঁড়িয়ে সহানুভুতি জানানোর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করতেই যে দেশনেত্রীর পুরো একদিন সময় লাগে, তিনি কেমন দেশনেত্রী এই প্রশ্ন আজ জনমনে। এর সাথে আমরা যদি স্মরণে রাখি যে, তাজরীন হত্যাকাণ্ডের সময় প্রধানমন্ত্রীর মতো তিনিও সেখানে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেননি, তখন খুব সঙ্গত কারণে এই প্রশ্ন চলে আসে, তবে কি এই ঘটনায় যুবলীগের এক নেতা জড়িত বলেই বিরোধীদলীয় নেত্রী এখানে আসার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলেন? যাতে এটাকে পুঁজি করে নোংরা ভোট রাজনীতিতে ফায়দা লোটা যায়? অন্যদিকে, তারা যতই এখন এই ঘটনায় সরকারকে দোষারোপ করুন না কেন কি করে আমরা ভুলে যাব স্পেকট্রামের ঘটনা? কিংবা বিএনপি আমলের এই রকম অন্যান্য ঘটনাগুলোকে? যেগুলোর একটারও বিচার হয়নি।

লক্ষণীঅন্য অনেক কাল্পনিক সমস্যায়, নির্বাচন ইস্যুতে সরকারের সাথে তাদের সাপে নেউলে সম্পর্ক হলেও শ্রমিকের সমস্যার ক্ষেত্রে, সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের স্বার্থ রক্ষা না করার ক্ষেত্রে সরকারের সাথে তাদের দৃষ্টিভঙ্গির, তাদের কর্মকাণ্ডের কি দারুণ মিল! তাহলে তারা কিসের বিরোধীদল? এসব কর্মকাণ্ড ও আচরণ দিয়ে কি তারা এটাই প্রমাণ করলেন না যে, তারা ঐ খুনিদের, ঐ দস্যুদের, ঐ লুটেরা, ঐ শোষক মালিকদেরই একটি অংশ? তারা কি এটাই প্রমাণ করলেন না যে, সরকারের সাথে তাদের পার্থক্য স্রেফ মসনদের?

শাসকদের পাতি দলগুলোর প্রতিক্রিয়া থেকে যে সকল বিষয় বেরিয়ে আসে

এবারে অন্যান্য কিছু পাতি দলের প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যাক। জাতীয় পার্টি ঘটনার দিন তৎক্ষণাৎ প্রতিক্রিয়ার যথারীতি “গভীর শোক” প্রকাশ করেছে এবং নিহত ও আহতদের ক্ষতিপূরণ দেয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। কি চমৎকার শ্রেণী সেবার নমুনা! খুন করবে মালিকে। অথচ মালিকের শাস্তি দাবীর বিষয়টি প্রতিক্রিয়ায় অনুপস্থিত। আর ক্ষতিপূরণ দিবে সরকার!

জামায়াতে ইসলামীও “গভীর শোক” প্রকাশে কার্পণ্য করেনি। তারা “তদন্ত” করে দোষীদের খুঁজে বের করে শাস্তি দেয়ার আহ্বান জানান। প্রশ্ন থাকে যখন মিডিয়া মারফত দোষী কারা এটা সুষ্পষ্ট, তখন কেন “তদন্ত” করে শাস্তি দেয়ার কথা বলা? সরাসরি মালিকের শাস্তি দাবী কেন নাই? জামায়াতের হয়ে এই প্রশ্নের উত্তরটা সম্ভবত দিয়েছে জামায়াতের পয়দা হেফাজতে ইসলাম। তাদের নেতারা অতি মুনাফাখোর খুনি মালিকদের এই হত্যাকাণ্ডকে খোদার গজব বলে অভিহিত করেছেন! ইসলামের হেফাজতের নামে এরা যে প্রকৃতপক্ষে খুনি, দুর্বৃত্ত, মাফিয়া গডফাদার, মুনাফাখোর মালিকদেরই হেফাজত করছে তাদের এই বক্তব্যের পর এ বিষয়ে আর কোন সন্দেহ থাকে কি?

উদ্ধার তৎপরতা থেকে যে বিষয়গুলো বেরিয়ে আসে

আটকে পড়া শ্রমিকদের উদ্ধারের ক্ষেত্রে আমরা অন্তত শুরুর কয়েকদিন দেখলাম জনগণের তরফ থেকে সেনাবাহিনী ও রাষ্ট্রীয় উদ্ধারকারী বাহিনীর গড়িমসি সম্পর্কে ব্যাপক অভিযোগ। শুধু তাই নয় সাধারণ খেটে খাওয়া জনগণের প্রতি তাদের দরদের ঘাটতির নানা প্রমাণ ও ইঙ্গিত মিডিয়া, ফেসবুক ও ঐখানে যারা গিয়েছিলেন তাদের মারফত আমরা পেলাম। আমরা দেখলাম শুরুর কয়েকদিন পর্যন্ত তরুণ সমাজ, স্থানীয় মানুষ, খেটে খাওয়া মজুর ও শ্রমিকরা কোন রকম প্রশিক্ষণ ছাড়া জীবনের ঝুঁকি নিয়ে উদ্ধারকাজে নেমে গেলেন এবং প্রধান ভূমিকা নিতে বাধ্য হলেন। তারা এই অসাধ্য সাধন করতে পারলেন স্রেফ তাদের মধ্যকার মানবিকতার মহান তাগিদে। অথচ এত এত প্রশিক্ষণ এত এত সুযোগ সুবিধা দিয়ে যাদের জনগণের টাকায় যাদের পোষা হয় বিপদের দিনে কাজে লাগার জন্য, উদ্ধারকাজে তাদের ভূমিকা হয়ে দাঁড়ালো গৌণ!! জনমনে আজ তাই এই বেয়াড়া প্রশ্ন খুব সঙ্গত কারণে এসেছে যে, জনগণের বিপুল টাকা খরচ করে যাদের পোষা হয়, যাদের সারা বছর রাজার হালে রাখা হয়, তারা যদি জনগণের বিপদের এই দিনে উদ্ধারকাজে প্রধান ভূমিকা না নিতে পারে, তাহলে তাদের এত হাজার কোটি টাকা খরচ করে পুষে লাভ কি?

শুধু তাই নয় চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনের মতো সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে শুরুতে বলা হয়েছিল যে ৭২ ঘন্টার পরে এ ধরনের পরিস্থিতিতে আর কারো নাকি বেঁচে থাকার সম্ভাবনা নেই। তাই ৭২ ঘন্টা পর তারা ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে অভিযান শুরু করবে। যে ধরনের অভিযানে আটকে পড়া জীবিত ব্যক্তির প্রাণ সংশয়ের আশংকা থাকে। তা এত বড় গণক ঠাকুরদের কাছে বেয়াড়া সিভিলিয়ানদের তরফ থেকে প্রশ্ন থাকে ঘটনার চার দিন পরও পঞ্চম দিনে তাহলে জীবিত ব্যক্তি উদ্ধার হলো কোথা থেকে। যদিও স্থানীয় উদ্ধারকারীদের কর্মতৎপরতার কারণে সেনাবাহিনী তাদের ৭২ ঘন্টার তত্ত্ব থেকে পরে সরে আসে, তবুও প্রশ্ন থেকে যায় যে আগ বাড়িয়ে জীবিত মানুষদের মৃত্যুর সম্ভাবনা ঘোষণা করার অধিকার সেনাবাহিনীকে কে দিয়েছে?

তারচেয়েও গুরুতর প্রশ্ন আজ উঠেছে উদ্ধার কাজে সরকারের ভূমিকা নিয়ে। আমরা দেখলাম সামান্য হেসকো ব্লেড, টর্চ লাইট, ব্যাটারীর জন্য স্থানীয় উদ্ধারকর্মীদের হাহাকার। অক্সিজেন সিলিন্ডারের সংকট। শুধু তাই নয় রড কাটা, কংক্রীট কাটার জন্য যেসব যন্ত্রপাতি লাগে সেগুলোর জন্য উদ্ধারকারীদের প্রবল আর্তনাদ, আকুতি। হাসপাতালে ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামের সংকট। এই সামান্য কয়েক হাজার হেসকো ব্লেড, টর্চ লাইট, ব্যটারী ওষুধের সম্পূর্ণ সংস্থান কি সরকার করতে পারতো না? সরকারের সামান্য অঙ্গুলি হেলনে কি এই সব কটি জিনিসের সংকট মুহূর্তের মধ্যে কেটে যেত না? তাহলে সেগুলোর সংস্থান করার জন্য সাধারণ মানুষকে কেন এগিয়ে আসতে হল? সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার মন্ত্রণালয় তাহলে কি করে? উল্লেখ্য সরকার এসব ক্ষেত্রে চরম নির্লিপ্ততা, সমন্বয়হীনতা, অদক্ষতা দেখালেও কোন বিবেকবান সাধারণ মানুষ সরকারের গাফিলতিতে বসে থাকতে পারেনি। নিজ উদ্যোগে যে যেভাবে পেরেছে এই বিপদের দিনে শ্রমিকদের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু জনগণের এই কৃতিত্বে সরকারের দোষ কোনভাবেই ঢাকা পড়ে না। বরং তা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় এই সরকার কাদের সরকার। তা প্রশ্ন তোলে এই সেনাবাহিনী তবে কাদের স্বার্থের রক্ষক? এই রাষ্ট্রীয় বাহিনীগুলো তবে কাদের স্বার্থ রক্ষা করে?

ক্ষতিপূরণ ও আহতদের চিকিৎসার খরচের সংস্থানের মধ্য দিয়ে যে সকল বিষয় বেরিয়ে আসে

আমরা দেখলাম এখন পর্যন্ত এই ঘটনায় বিজিএমইএর পক্ষ থেকে কোন ক্ষতিপূরণ দেয়ার ঘোষণা পর্যন্ত আসেনি। এমনকি সরকার থেকেও নয়। দাফনের জন্য মাত্র ২০০০০ টাকা করে প্রতি নিহতের পরিবারকে দেয়া হচ্ছে। আর আহতদের ৫০০০ টাকা! প্রথমত, ২০০০০ টাকায় মৃতব্যক্তির সৎকারের কতটুকু খরচ মেটানো যায়? যাদের হাত পা কেটে উদ্ধার করা হয়েছে ৫০০০ টাকা দিয়ে তারা কি করবে? দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে ৪ কোটি টাকা বরাদ্দের খবর ফলাও করে ছাপানো হয়েছে মিডিয়ায়। কিন্তু ৬০০০ শ্রমিকের মধ্যে ৪ কোটি টাকা বণ্টন করলে জনপ্রতি কত টাকা করে আসে? অবশ্য সরকার থেকে আহতদের সকল চিকিৎসার ব্যয় ভার বহন করার ঘোষণা এসেছে। এটা অবশ্যই দরকারী। হয়তো উদ্ধার কাজ শেষ হলে তাজরীনের মতোই সরকারের তরফ থেকে নিহতের পরিবার প্রতি কয়েক লাখ করে ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে। কেন এই ক্ষতিপূরণ নিহতের পরিবার প্রতি ৪০৫০ লাখ টাকা হবে না? বিডিআর হত্যাকাণ্ডে নিহত আর্মির অফিসারদের যদি যথাযথ ক্ষতিপূরণ দিতে পারেন তবে দেশের অর্থনীতির মূল স্তম্ভ যে খেটে খাওয়া শ্রমিক, তার জীবনের ক্ষতিপূরণ দিতে কেন এই কার্পণ্য? এইসব ঘটনা দিয়ে কি আপনারা আপনাদের শ্রেণী চরিত্রই নগ্নভাবে উন্মোচন করছেন না?

কিন্তু মৌলিক প্রশ্নটি হলো এই যে সরকার যত স্বল্পই হোক ক্ষতিপূরণ দিচ্ছে, চিকিৎসার সকল ব্যয়ভার বহন করছে এগুলো কার টাকায় করছে? সরকারের নিজের তো কোন অর্থ নেই। এই টাকা জনগণের টাকা। আইন অনুযায়ী / নিয়ম অনুযায়ী ক্ষতিপূরণের প্রদানের ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ গ্রহণ করে ক্ষতিগ্রস্তরা। আর ক্ষতিপূরণ দেয় যে ক্ষতি করেছে সে। এক্ষেত্রে শ্রমিকদের জানমালের ক্ষতি করেছে মালিকপক্ষ তথা বিজিএমইএ। তাহলে বিজিএমইএ তথা মালিকপক্ষকে (ভবনের মালিক সহ) কেন সকল নিহত ও আহতদের ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য করা হবে না? কেন মালিকপক্ষকে বাধ্য করা হবে না আহতদের চিকিৎসার সকল ব্যয়ভার বহন করতে? সরকার যতই ক্ষতিপূরণ দিয়ে সাধু সাজার চেষ্টা করুক, যতই চিকিৎসার সকল ব্যয়ভার বহন করার ঘোষণা দিক না কেন (যদিও সেই ক্ষতিপূরণে একজন শ্রমিকের মূল্য কোরবানির গরুর থেকে বেশি হয় না তবুও) এই ক্ষতিপূরণ তো ক্ষতিগ্রস্তদের টাকা দিয়েই ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ করার মতো ব্যাপার। কি চমৎকার শ্রেণী সেবার নমুনা! একদিকে শ্রমিককে শোষণ করতে করতে মুনাফার পাহাড় বানাতে বানাতে খুন করে ফেলবে মালিকপক্ষ। সেই মুনাফা খাবে মালিক একা। অন্যদিকে খুন হওয়ার পর সেই শ্রমিকের ক্ষতিপূরণের বোঝা, তার চিকিৎসার খরচ চাপানো হবে সারা দেশের জনগণ তথা শ্রমিকদের ঘাড়ে। মাঝখান থেকে সাধু সাজবে সরকার! এটার থেকে বড় প্রতারণা, এর থেকে বড় দস্যুতা আর কি হতে পারে?

মিডিয়ার ভূমিকা

যথারীতি মূলধারার মিডিয়া এই ঘটনা মোটের উপর যথাযথভাবেই সরাসরি সম্প্রচার করছে এবং সাংবাদিকেরা যথোপযুক্ত আন্তরিক সহানুভূতি নিয়ে রিপোর্ট করছেন। শ্রমিকের বুকফাটা আর্তনাদ, তার বাবামাভাইবোনের দিশেহারা আহাজারি অত্যন্ত যথাযথভাবেই মূলধারার মিডিয়াকর্মীরা, সংবাদকর্মীরা তুলে আনছেন, যা দেখে কোন সুস্থ ও বিবেকবান মানুষেরই চোখ শুকনো থাকেনি। কিংবা চোখ শুকনো থাকলেও মন শুকনো থাকে নি। সারা দেশের মানুষই এই সব রিপোর্ট দেখে কেঁদেছেন। কিন্তু তবুও মূলধারার মিডিয়ায় এখনো এটাকে দুর্ঘটনা হিসেবে, ট্র্যাজেডী হিসেবে আখ্যায়িত করার ঝোঁক যতটা প্রবল, ঠিক ততটাই নিরুৎসাহ এটাকে হত্যাকাণ্ড বলে অভিহিত করাতে। যদিও এটাকে যে হত্যাকাণ্ড বলে অভিহিত কেউই করছেন না তা ব্যাপারটা তা নয়। তবে মূলধারার বেশিরভাগ মিডিয়ার রিপোর্টে এখনো এটাকে “দুর্ঘটনা”, “ট্র্যাজেডি”, “ভবন ধ্বস”, “প্রাণ ঝরে পড়া”, “ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়” নামেই অভিহিত করা হচ্ছে। কিন্তু জোর গলায় বলা হচ্ছে না এটি একটি হত্যাকাণ্ড। এটি একটি খুনের ঘটনা। এটি একটি গণহত্যা। আর ঠিক এই জায়গাটিতেই ঘটনাপরবর্তী মিডিয়ার শত মানবিক চেহারা সত্ত্বেও তার শ্রেণীচরিত্র উন্মোচিত হয়ে পড়েছে।

তবে টকশো আর উপসম্পাদকীয়তে এই কথাগুলো বলার জন্য অন্যদের সুযোগ করে দিলেও নিজেরা দায়িত্ব নিয়ে এটাকে খুন বা গণহত্যা বলতে মূলধারার মিডিয়া এখনো কোন উদ্যোগ দেখায়নি। একই রকম আচরণ মিডিয়া তাজরীন হত্যাকাণ্ডের সময়ও করেছিল। কিন্তু তারপরও মিডিয়ার তরুণ সংবাদকর্মীদের ধন্যবাদ প্রাপ্য। যারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভবনের ভিতরে গিয়ে রিপোর্ট করছেন এবং সেটা অবশ্যই আন্তরিক সহানুভূতির সাথে। শুধু তাই নয়, তারা তাদের ব্যক্তিগত ব্লগে, ফেসবুকে, নিজেদের সঞ্চালিত অনুষ্ঠানে, উপসম্পাদকীয়তে এই ঘটনাকে হত্যাকাণ্ড অভিহিত করে দোষীদের বিচারও চাইছেন। কিন্তু তরুণ সংবাদকর্মীর মনোভাব আর মিডিয়ার মালিকদের মনোভাব তো এক রকম নয়। আর ঠিক একারণেই মূলধারার মিডিয়া শোক তৈরিতে যতটা না ব্যস্ত, ক্ষোভ তৈরিতে ততটাই নিরুৎসাহী। উদ্ধারকাজ টানা সরাসরি সম্প্রচার করতে যতটা না ব্যস্ত, বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিক বিক্ষোভের সরাসরি সম্প্রচার করতে ততটা ব্যস্ত নয়। অন্যদিকে,সবচেয়ে বেশি প্রচারিত, দিন বদলের দাবীদার বলে একটি পত্রিকা, শ্রমিকের এত বড় বিপদের দিনেও ঝলমলে তারার আসর বসাতে কুণ্ঠিত হয়নি। এসব কিছুই পদে পদে ঘোষণা দিচ্ছে মিডিয়া কোন শ্রেণীর স্বার্থ দেখে। আজকে যদি বিজিএমইএর নেতাদের ডেকে এনে এভাবে স্যান্ডউইচ বানানো হতো, তাহলেও কি মূলধারার মিডিয়ায় এটাকে দুর্ঘটনা বলা হতো? নাকি খুন বলা হতো? মিডিয়া কি পারত এটাকে স্রেফ “ভবন ধ্বস” বলে চালাতে?

 

সময় হয়েছে বদলা নেবার

সাভারের এই রানা প্লাজার হত্যাকাণ্ডটি বাংলাদেশের তথা বিশ্বের ইতিহাসে একটি প্রতীক হয়ে থাকবে যে কি করে একটি লুটেরা, মাফিয়া, দুর্নীতিবাজ, গডফাদার ও দুর্বৃত্ত শাসক শ্রেণী তার অতিমাত্রার লোভের বশবর্তী হয়ে ঠান্ডা মাথায় হাজার হাজার শ্রমিককে খুন করে। এবং খুন করার পরে কতটা বেপরোয়াভাবে তাদের বাঁচাতে মরিয়া হয়ে উঠে। জনগণের মহাবিপদের দিনে কতটা নির্লিপ্ত আচরণ করতে পারে।

সাভারের এই হত্যাকাণ্ডে আজ ক্রোধে ফুঁসছে সারা দেশ। অন্যদিকে, এই ঘটনা আবারো সকলের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিল যে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামাত, জাতীয় পার্টি সহ জোট মহাজোটের রাজনৈতিক দলগুলো যতই নিজেদের মধ্যেকার পার্থক্যকে জনতার সামনে তুলে ধরুক না কেন, ক্ষমতার মসনদ নিয়ে নিজেদের মধ্যে যতই কামড়াকামড়ি করুক না কেন জনগণের স্বার্থ রক্ষা না করার ক্ষেত্রে এদের আচরণে কোন পার্থক্য থাকে না। জনগণের স্বার্থ না রক্ষা করার ক্ষেত্রে এদের মধ্যে ঐক্যের কোন অভাব নেই। এবং যে রাষ্ট্রীয় বাহিনীগুলোকে নিরপেক্ষ বলে প্রচার করা হয় সেগুলো মোটেই নিরপেক্ষ কোন প্রতিষ্ঠান নয়। এগুলো সবই ঐ খুনি, ঐ দুর্বৃত্ত, ঐ শোষক মালিকদের স্বার্থ রক্ষার জন্যই নিবেদিত প্রাণ। জনগণের জন্য যাদের বিন্দুমাত্র দরদ নেই।

আজকে স্বাধীনতার পর গত ৪২ বছর ধরে চলা এই দুর্বৃত্ত লুটেরা শ্রেণীর শাসনে শ্রমিক, কৃষক, মেহনতী, নিম্ন মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত জনগণের জীবনের নিরাপত্তাই আজ হুমকির মুখে। এদের সীমাহীন লোভের কারণে একটার পর একটা সংঘটিত হচ্ছে গণহত্যা। এই খুনিদের সীমাহীন মুনাফালোভের কারণে নিমতলীতে বাসভবনের নিচে রাখা রাসায়নিকের গুদামে আগুন লেগে যেমন গণহত্যা চলে, তেমনি চলে বিষাক্ত রাসায়নিক দেয়া লিচু খাইয়ে শিশু হত্যা। একদিকে, হামীম, তাজরীনের মতো আগুনে পুড়িয়ে অঙ্গার করা হয় শ্রমিকদের; অন্যদিকে, স্পেকট্রাম, সাভারের রানা প্লাজার মতো জীবন্ত গণকবরও রচিত হয় এই নিকৃষ্টতম লুটেরা, দুর্বৃত্ত শোষকদের দ্বারা। অন্যায়ের প্রতিবাদ করায় ত্বকীরা যেমন একদিকে লাশ হচ্ছে; অন্যদিকে, কোন কিছু না করেই পঙ্গু হচ্ছে লিমনেরা। সাভারের রানা প্লাজার হত্যাকাণ্ড আবারো প্রমাণ করলো আওয়ামী লীগের মহাজোট আর বিএনপি জামাতের ৪ দল১৮দলের জোট যারাই ক্ষমতায় থাকুক না কেন এদের দ্বারা কোন কোন গণহত্যারই, কোন হত্যাকাণ্ডেরই, কোন অন্যায়েরই কোন বিচার হচ্ছে না, বিচার হওয়া সম্ভব নয়।

কিন্তু জনগণ তো তাই বলে বসে থাকতে পারে না। রানা প্লাজা হত্যাকাণ্ড শাসকদের শতরকম বেপরোয়া দুর্বৃত্তগিরির উদাহরণ হওয়া সত্ত্বেও তারুণ্যের, মেহনতী মানুষের জয়গানেরও একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। আজ সারা দেশ জুড়ে ক্রোধে ফুঁসছে শ্রমিক, তরুণ সমাজ ও নিপীড়িত জনগণ। তরুণ সমাজের ভেতরে দেখা যাচ্ছে জাগরণের শুরুর ইঙ্গিত। কিন্তু ক্রোধে ফুঁসে ওঠাই যথেষ্ঠ নয়। আমাদের দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাচ্ছে । আজ সময় হয়েছে এই সব হত্যাকাণ্ডের বদলা নেয়ার। সারা দেশ জুড়ে শ্রমিক, কৃষক, মেহনতী, নিম্ন মধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত জনতা ও দেশপ্রেমিক মুক্তিযুদ্ধের সত্যিকারের চেতনায় উদ্বুদ্ধ তরুণদের সংগঠিত প্রতিরোধ গড়ে তোলা ছাড়া এই সব হত্যাকাণ্ডের বদলা নেয়ার, এই সব হত্যাকাণ্ড ঠেকানোর অন্য কোন উপায় আর খোলা নেই।।

২৯ এপ্রিল, ২০১৩

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s