লিখেছেন: আবিদুল ইসলাম

savar-disaster-15গত ২৪ এপ্রিল, বুধবার বাংলাদেশের শ্রমজীবী মানুষ, বিশেষত গার্মেন্টস সেক্টরে কর্মরত শ্রমিকদের জন্য এক ঘোরতর বিপর্যয়ের দিন। সাভারের বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন এলাকায় ‘রানা প্লাজা’ নামে এক বহুতল ভবন দৃশ্যমান কোনো কারণ ছাড়াই হঠাৎ ধসে পড়ে। এই ভবনে থাকা পাঁচটি গার্মেন্টসের কয়েক হাজার শ্রমিক এর ধ্বংসস্তুপের মধ্যে চাপা পড়েন। সেখান থেকে এখন পর্যন্ত আড়াই হাজারের অধিক শ্রমিককে আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে। মৃতের সংখ্যা প্রকাশিত হিসেবে তিন শতাধিক হলেও প্রকৃত সংখ্যা এরচেয়ে অধিক হবে। এখনো ভবনের নিচে বহু মানুষ চাপা পড়ে আছেন। এদের একটা অংশ জীবিত উদ্ধার হলেও অধিকাংশকেই যে বাঁচানো সম্ভব হবেনা এবং আরো বহু সংখ্যক লাশের কোনো খোঁজ পাওয়া যাবে না সেটা সহজেই অনুমান করা যায়। প্রচলিত কোনো নিয়ম না মেনে সস্তা মানের সামগ্রী দিয়ে মাত্র কয়েক বছর আগেই ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছে রবীন্দ্র সাহা নামক এক ব্যক্তির জমি দখল এবং পার্শ্ববর্তী জলাশয় ভরাট করে। মঙ্গলবার ভবনটিতে ফাটল দেখা দিলে স্থানীয় উপজেলা নির্বাহী অফিসার পরীক্ষা করে “ও কিছু নয়” বলে মতপ্রকাশ করার পরেও সম্ভাব্য নিরাপত্তা পরিস্থিতির কথা চিন্তা করে ভবনে অবস্থিত ব্র্যাক ব্যাংক সহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের সেখান থেকে সরিয়ে দেয়া হয়। ফ্যাক্টরিগুলোতেও ছুটি ঘোষণা করা হয়। কিন্তু পরদিনই মালিক পক্ষ কর্তৃক আবার জোর করে এবং চাকরি যাওয়ার ভয় দেখিয়ে ভবনে প্রবেশ করিয়ে তাদের কাজ করতে বাধ্য করা হয়। বর্তমানে যারা নিহত হয়েছেন, আহত অবস্থায় উদ্ধার হয়েছেন, ভবনের স্তুপে লাশ হয়ে এখনো পড়ে আছেন অথবা মৃত্যুর প্রহর গুণছেন তারা হলেন জীবিকার সংস্থান হারানোর ভয়ে কাজ করতে বাধ্য হওয়া এইসব শ্রমিক।

ভবন ধসের পর সাময়িকভাবে সেখানে আটকা পড়লেওভবনের মালিককে তার পৃষ্ঠপোষক স্থানীয় আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য তৌহিদ জং মুরাদ এসে উদ্ধার করে পালিয়ে যেতে সাহায্য করেছেন। এদিকে ভবনটিকে ঘিরে নিহত ও নিখোঁজ শ্রমিকদের আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব ও অন্যান্যদের আহাজারিতে যে হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে সে বিষয়ে অধিক বর্ণনার কোনো প্রয়োজন নেই। উদ্ধার তৎপরতা এখনো চলছে এবং রাষ্ট্রপক্ষের তুলনায় সচেতন এলাকাবাসী ও মানবতার তাগিদে সমবেত হওয়া সাধারণ শ্রমজীবী জনগণই নিজেদের সীমিত সামর্থ্য দিয়ে যথাসম্ভব আন্তরিকতার সাথে অধিক কার্যকরভাবে এই কাজ করে চলেছেন।

এই ঘটনার প্রেক্ষাপটে গত শুক্রবার বিভিন্ন কারখানায় কর্মরত বিক্ষুব্ধ শ্রমিকেরা ঢাকা সহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় রাস্তায় নেমে এসেছিলেন। আশুলিয়া, গাজীপুর, টঙ্গী, মিরপুর সহ বিভিন্ন জায়গায় তারা লাঠিমিছিল করেছেন, গাড়ি, দালানকোঠা, দোকানপাট, গার্মেন্টস ইত্যাদিতে ভাঙচুর চালিয়েছেন, পুলিশের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছেন। তারা কারওয়ান বাজারে লুটেরা গার্মেন্টস মালিকদের প্রতিষ্ঠান বিজিএমইএ ভবন ঘেরাও করতে গিয়েছিলেন। পুলিশী বাধার মুখে সফল হননি। এদিকে রানা প্লাজা ধসের পর গত কয়েকদিনে উচ্চমধ্যবিত্ত শ্রেণীর যেসব “ভদ্রলোক” শ্রমিকদের দুঃখদুর্দশা দেখে আহাউহু করেছিলেন, এই ভাঙচুরসংঘর্ষের খবর পাবার পরই তাদের চিন্তাভাবনার গতিপথ পাল্টে গেছে। এখন তারা মেতেছেন এই শ্রমিকেরা কতোটা খারাপ, সংঘর্ষে অংশ নেয়া লোকজন প্রকৃতই শ্রমিক কিনা, এসবের পেছনে আসলে বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্প ধ্বংসের বিদেশী ষড়যন্ত্র রয়েছে কিনা, এভাবে দেশীয় সম্পদ ধ্বংস করা উচিত কিনা এসব প্রশ্ন নিয়ে।

শ্রেণীচরিত্র আসলেই খুব কঠিন এক জিনিস। এটা এমন এক বস্তু যা হাজার রকমের রঙবেরঙের প্রলেপ মেখে ঢেকে রাখার চেষ্টা করা হলেও নির্দিষ্ট সময়ে ও পরিস্থিতিতে সময় বুঝে তা ঠিকই মুখোশ ছিঁড়ে বেরিয়ে পড়ে। এই ভদ্রলোকদের ক্ষেত্রেও তার কোনো ব্যতিক্রম হয়নি। তারা এখন শত শত শ্রমিক নিহতের বিষয় থেকে মুখ ফিরিয়ে ‘দেশের সম্পদ’ রক্ষার চিন্তায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। এ কারণেই তাদের চিন্তাভাবনার প্রকৃত চরিত্রএবং এর প্রেক্ষাপট কিছুটা বিশ্লেষণ করে দেখা প্রয়োজন।

যেকোনো পরিস্থিতিতে স্থানকালপাত্র ও সামগ্রিক পরিপ্রেক্ষিত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এবং স্বাধীনভাবে চিন্তা করলে ভাঙচুরসংঘর্ষ যেই করুক না কেন এসব কাজ নিন্দনীয় হিসেবে গণ্য হতেই পারে। তাছাড়া শ্রমিকেরা যেভাবে রাস্তায় নেমে এসে ভাঙচুর চালাচ্ছেন, সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছেন তার দ্বারা তাদের পক্ষে ইতিবাচক কোনো কিছু অর্জিত হওয়ার সম্ভাবনা নেই। এসব কোনো কথাই মিথ্যা নয়। সুতরাং তাদের এই কর্মকাণ্ড এমনিতে স্বাভাবিক অবস্থায় সমর্থন করা চলেনা। কিন্তু কী ধরনের অবস্থায় পতিত হয়ে এবং কোন চিন্তার বশবর্তী হয়ে তারা এখন এভাবে নিজেদের ক্ষোভ প্রকাশ করছেন সেটা বুঝে দেখা প্রয়োজন।

বাংলাদেশে গার্মেন্টস নামক যে এক পরগাছাসদৃশ শিল্পখাত আমাদের অর্থনীতির শরীরে গজিয়ে উঠেছে সেখানকার অধিকাংশ কারখানায় স্বাস্থ্যকর পরিবেশে কাজের কোনো বন্দোবস্ত নেই। শ্রমিকদের কাজের সময় নিয়োগপত্র দেয়া হয় না, তাদের চাকরি স্থায়ীকরণের কোনো ব্যবস্থা নেই। এই কারণে তাদের চাকরিরও কোনো নিশ্চয়তা থাকেনা, যেকোনো সময় তাদের যে কাউকে মালিক পক্ষের ইচ্ছে অনুযায়ী বরখাস্ত করতে কোনো অসুবিধা হয় না। চাকরির নিশ্চয়তা না থাকায় শ্রমিকগণ কারখানা মালিকদের কাছে এক প্রকার জিম্মি হয়ে থাকেন। তাদের এ জিম্মি অবস্থার কারণে মালিক শ্রেণী তাদের দিয়ে শুধু যে ইচ্ছেমতো কাজ করিয়ে নেয় তাই নয়, তাদের মজুরি প্রদান করা হয় অস্বাভাবিক রকমের নিম্নহারে। পার্শ্ববর্তী যেকোনো উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় বাংলাদেশে শ্রমিকদের মজুরি যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে বিরাজ করছে এটা এ বিষয়ে প্রকাশিত যেকোনো পরিসংখ্যান থেকেই দেখা যায়।

যে পরিমাণ মজুরি তাদের প্রদান করা হয়, তা দিয়ে মনুষ্যোচিত জীবন যাপন সম্ভব নয়। বিশেষ করে বর্তমানে দ্রব্যমূল্যের সীমাহীন ঊর্ধ্বগতির যুগে মধ্যবিত্ত ভদ্রলোকরাই যেখানে তাদের বেতন দিয়ে জীবনযাত্রার মান বজায় রাখতে হিমশিম খান সেখানে ৩,০০০,০০০ টাকা মজুরি দিয়ে একজন শ্রমিকের পক্ষে কীভাবে পরিবারের ব্যয় নির্বাহ করা সম্ভব সেটা সাধারণ বুদ্ধিতেই বোঝা যায়। এর মধ্যেই তাদের ঘরভাড়া দিতে হয়, নিজের ও পুত্রকন্যাদের আহার্যের সংস্থান, শিক্ষাচিকিৎসার ব্যবস্থা ইত্যাদি করতে হয়। এর সব কিছু করা যে তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না, সেটা বুঝিয়ে বলার প্রয়োজন নেই।

গার্মেন্টস কারখানায় শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়া, মজুরি বৃদ্ধি সহ অপরাপর দাবিদাওয়া আদায়ের জন্য ট্রেড ইউনিয়ন করা ইত্যাদির অধিকার তাদের নেই। কাগজপত্রে আইএলওএর শর্ত সমুহ মেনে নেয়া বাংলাদেশের সরকার গার্মেন্টস মালিকদেরকে এক্ষেত্রে ছাড় দিয়ে রেখেছে। সিবিএ (Collective Bargaining Agency) নামক যেসব দরকষাকষির সংস্থা আছে, তার অধিকাংশের নেতৃত্ব প্রকৃত শ্রমিক নেতার পরিবর্তে মালিক পক্ষের দালাল লোকজনের দখলে। এরা কেউই শ্রমিক শ্রেণীর স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব তো করেই না, উপরন্তু শ্রমিকদের স্বার্থকে বিক্রি করেই ঢাকা শহরে নিজেদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক বিশাল ধনসম্পত্তি তারা গড়ে তুলেছে। এদের অধিকাংশই শ্রমিকদের দাবিদাওয়া নিয়ে আন্দোলন করে নিজেদের পেছনে শ্রমিক সমাবেশ ঘটায়, তারপর শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে মালিক পক্ষের সাথে গোপন আঁতাত, লেনদেন ও সমঝোতার বিনিময়ে আন্দোলনকে হত্যা করে।

কারখানায় কাজের পরিবেশও স্বাস্থ্যকর নয়। যে পরিবেশে শ্রমিকদের কাজ করতে হয় তাতে তাদের বড় অংশই বিভিন্ন অসুখবিসুখে পতিত হন। কারখানা কর্তৃপক্ষ কর্তৃক তাদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত না করায় এবং প্রাপ্ত মজুরির পরিমাণ অত্যন্ত নিম্ন হওয়ায় তারা সব রকমের চিকিৎসা সুবিধা থেকে বঞ্চিত থাকেন। এ অবস্থায় অসুস্থ হওয়ার পর মালিক পক্ষ কর্তৃক ‘আনফিট’ ঘোষিত হলে তাদের চাকরি চলে যাওয়া খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পে বৃহৎ আকারে নারী শ্রমিকের সমাবেশ ঘটলেও, এবং একে কেন্দ্র করে মালিক পক্ষ, সুশীল সমাজ ইত্যাদি নারীর কর্মসংস্থান, ক্ষমতায়ন ইত্যাদি বড় বড় কথা বুক ফুলিয়ে বললেও তাদের মাতৃত্বকালীন ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সুযোগসুবিধার বন্দোবস্ত অধিকাংশ কারখানাতেই নেই। এসব প্রতারণাপূর্ণ কথার আড়ালে নারীদেরকে অধিক সংখ্যায় কাজে নেয়ার প্রকৃত কারণ হলো, পুরুষদের তুলনায় অপেক্ষাকৃত কম মজুরিতে তাদের দিয়ে কাজ করানোর সুবিধা।

ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার, চাকরির নিশ্চয়তা, স্বাস্থ্যসম্মত কাজের পরিবেশ, মনুষ্যোচিত জীবন যাপনের উপযোগী মজুরি ইত্যাদি না থাকার চেয়েও যেটা আমাদের দেশের শ্রমিক শ্রেণীকে সবচেয়ে বড় আকারে আঘাত করছে তাহলো এসব প্রতিষ্ঠানে এদের জীবনের নিরাপত্তারই কোনো নিশ্চয়তা নেই। আগুনে পুড়ে, ভবন ধসে যেভাবে প্রতিবছর শত শত শ্রমিক নিহত হচ্ছেন, একটা বড় অংশের লাশ গুম করা হচ্ছে, আরেকটি অংশ চিরতরে পঙ্গু হয়ে কাজের সক্ষমতা হারাচ্ছেন বাংলাদেশের আর কোনো সেক্টরে এর কাছাকাছি কোনো দৃষ্টান্তও নেই। শুধু তাই নয়, অন্য সব ক্ষেত্রে মানবিক ক্ষয়ক্ষতির সর্বমোট যোগফলও এর সমান হবে না। গত কয়েক বছরে স্পেকট্রাম, হামীম, তাজরিন, স্মার্ট সহ অনেকগুলো কারখানায় ভবন ধসে কিংবা অগ্নিকাণ্ড সংঘটিত হয়ে হাজারে হাজারে শ্রমিক মৃত্যুবরণ করেছেন। কতো লাশ গুম করা হয়েছে তার হিসাব নেই। আর যারা চিরতরে পঙ্গু হয়ে ইতোপূর্বের ভাগ্যাহত জীবনের বোঝা আরো বাড়িয়েছেন, তাদের ক্ষতিরও কোনো হিসাব করা সম্ভব নয়। মালিক পক্ষের অধিকাংশই ক্ষমতাসীন মহল সহ শাসক শ্রেণীর কাছের লোকজন হওয়ায় তাদের কোনো বিচার ও শাস্তির ব্যবস্থা কখনোই হয় না, ফলত এ ধরনের ‘দুর্ঘটনা’র সংখ্যা বাড়তেই থাকে, লাশের মিছিল কখনো শেষ হয় না।

শুধু এক সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার করেও পুরো বিষয়টিকে তাই জনগণের কাছ থেকে আড়াল করা যাবে না। গার্মেন্টস সেক্টরে সোহেল রানা একা নয়, এমন বহু লুটেরা মালিক দেশে ছড়িয়ে আছে, যারা সরকারি কর্তৃপক্ষের ছত্রছায়ায় গার্মেন্টসকারখানা নামে শ্রমিকদের নরককুণ্ড তৈরি করে রেখেছে সমগ্র দেশময়। এভাবে শ্রমিকহত্যার জন্য দায়ী তাজরিন গার্মেন্টসের মালিক দেলোয়ার সহ অন্য কোনো মালিকেরই কোনো প্রকার বিচার এদেশে কখনো হয়নি। ‘রানা প্লাজা’র মতো নিয়মনীতি না মেনে গড়ে তোলা এমন আরো বহু ভবন রয়েছে, যেগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার কোনো ঠিকঠিকানা নেই। তাছাড়া এসব ভবনে জরুরি বহির্গমন পথ তালা দেয়া অবস্থায় থাকে, ফলে আগুন লাগলেও শ্রমিকদের বেরিয়ে যাবার কোনো উপায় থাকে না। আগুনে পুড়ে অথবা ধোঁয়ায় দমবদ্ধ অবস্থায় তাদের মৃত্যুবরণ করতে হয়। তাজরিন গার্মেন্টস সহ আরো অনেক ফ্যাক্টরিতে অগ্নিকাণ্ডের ক্ষেত্রে এমনটাই দেখা গেছে। ওপরে যে বিষয়গুলোর উল্লেখ করলাম বর্তমান পরিস্থিতিতে এ সমস্ত কিছুকেই বিবেচনায় নিয়ে পরবর্তী কর্মসূচি বাস্তবায়নে অগ্রসর হওয়া ছাড়া উপায় নেই।

বাংলাদেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ এবং বিএনপিউভয়েরই শ্রমিক সংগঠন আছে। এই সংগঠনসমূহে দলীয় দালাল ছাড়াও প্রকৃত শ্রমিকের সংখ্যাও যথেষ্ট। নির্বাচনের সময়ও এই দলগুলো শ্রমিকদের কাছ থেকে প্রচুর ভোট পেয়ে থাকে। কিন্তু কারো ভোট পাওয়া আর তার স্বার্থের প্রকৃত প্রতিনিধিত্বকারী শক্তি হওয়া এক কথা নয়। বস্তুত বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো সব সময়েই শ্রমিক শ্রেণীর স্বার্থের প্রতিপক্ষ, ঘোরতর শত্রু হিসেবেই কার্যকর রয়েছে। এর বাইরে যে বাম ও কমিউনিস্ট নামে পরিচিত সংগঠনসমূহ আছে তারা শ্রমিক ইস্যু, তাদের বিভিন্ন স্বার্থ, দাবিদাওয়া ইত্যাদি নিয়ে আন্দোলন করে এলেও এই দলগুলোর অধিকাংশেরই নেতৃত্ব মধ্যবিত্তের হাতে। সুতরাং শ্রমিকদের প্রতি সহানুভূতিশীল হলেও বাংলাদেশে বর্তমানে শ্রমিক শ্রেণীর দুরবস্থা যে পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে তার প্রেক্ষিতে এইব্যবস্থার আমুল ও মৌলিক পরিবর্তনের উপযোগী জঙ্গি কর্মসূচি প্রণয়ন ও তার বাস্তবায়ন তাদের দ্বারা সম্ভব হয় না।

উপর্যুক্ত পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে শ্রমিকরা এখন উপলব্ধি করছেন যে তাদের জন্য তারা নিজেরা ছাড়া আর কেউই নেই। চাকরির নিশ্চয়তা নেই, কাজের পরিবেশ স্বাস্থ্যসম্মত নয়। মুনাফার জন্য মালিক পক্ষের সীমাহীন লোভ ও দুর্নীতির বলি হয়ে অগ্নিকাণ্ডে, ভবন ধসে হাজারে হাজারে শ্রমিক নিহত হওয়ার ঘটনার কোনো শেষ নেই। গার্মেন্টস কারখানায় নিজেদের দাবিদাওয়ার ভিত্তিতে সংগঠিত হওয়া কিংবা ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার নেই, কোনো কোনো ক্ষেত্রে থাকলেও তার নেতৃত্ব দালালদের হাতে। নিজেদের জীবন ও জীবিকার নিরাপত্তার জন্য, মজুরি বৃদ্ধির জন্য মিছিল করে রাস্তায় নামলে তাদের ওপর সরকারের গুণ্ডা বাহিনী ও শিল্প পুলিশ ইউনিট নির্মম দমননিপীড়ন চালায়। তাদের দাবিদাওয়ার ভিত্তিতে সংগঠিত রাজনৈতিক দলগুলোর বিভিন্ন কর্মসূচিও অনেকটাই গাবাঁচানো ও অকার্যকর হিসেবে প্রমাণিত। এমতাবস্থায়, প্রতিরোধের আর কোনো পথ না পেয়ে তাদের পক্ষে রাস্তায় নেমে ভাঙচুর, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি ভিন্ন অন্য কোনো উপায় থাকে না। ক্ষোভ প্রশমন ও দাবি আদায়ের নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতির অনুপস্থিতি এবংসঠিক রাজনৈতিক জ্ঞান ও নেতৃত্বের অভাবে এটাই হয়ে দাঁড়ায় তাদের পুঞ্জিভূত বিক্ষোভ প্রদর্শনের একমাত্র অবলম্বন। কিন্তু শহুরে উচ্চমধ্যবিত্ত ভদ্রলোকদের এই বিষয়গুলো বিবেচনা করার মতো অবস্থা নেই। শ্রমিকদের রাস্তায় নেমে ভাঙচুর ইত্যাদি করতে দেখলেই তাদের ভ্রু কুঞ্চিত হয়ে ওঠে। এর পেছনে তারা গার্মেন্টস শিল্প ধ্বংসের ষড়যন্ত্র আবিষ্কারের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেন। বিক্ষুব্ধ শ্রমিকদের গালাগাল দিতেও তারা পিছপা হননা। এই প্রতিক্রিয়া যে তাদের নিজস্ব শ্রেণী চরিত্রের কারণেই হয় সে কথা বলাইবাহুল্য। বস্তুত গার্মেন্টস সেক্টরে কথিত ‘দুর্ঘটনা’ ঘটলে তারা কিছুটা সমবেদনা জ্ঞাপন করেন, মালিকশ্রমিক ঐক্যের আওয়াজ তোলেন। তারা কামনা করেন এমন পরিস্থিতিতে শ্রমিকরা শুধু চোখের জল ফেলবেন, স্বজন হারানোর বেদনায় হাহাকার করবেন, কিন্তু বিক্ষুব্ধ হয়ে পথে নামবেন না। তারা শ্রমিকদের কাছ থেকে ভদ্র আচরণ প্রত্যাশা করেন এমন এক পরিস্থিতিতে যেখানে তাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে, তাদের অস্তিত্ব ও অধিকার রক্ষার কোনো কার্যকর প্রক্রিয়া দেশে বিদ্যমান নেই; সরকার, ক্ষমতাসীন মহল ও মালিক পক্ষ আবির্ভূত হয়েছে শ্রমিক শ্রেণীর স্বার্থ এমনকি তাদের অস্তিত্বের চরমতম শত্রু হিসেবে।

গত ২৪ এপ্রিল তারিখে সাভারের রানা প্লাজা ধসে পড়ে সেখানে অবস্থিত কয়েকটি গার্মেন্টসের শত শত শ্রমিকের নির্মম মৃত্যু এখানে অনেকগুলো গুরুতর বিষয় সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে আলোচনার ক্ষেত্র হিসেবে আমাদের সামনে উপস্থিত করেছে। তার সবগুলো নিয়ে আলোচনা কিংবা বিশ্লেষণের সুযোগ এই সীমিত পরিসরে নেই। শুধু আরেকটি বিষয়ে এখানে আলোকপাত করার চেষ্টা করব। সেটা হলো বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনীতিতে গার্মেন্টস সেক্টরের অবস্থান।

বাংলাদেশের গার্মেন্টস সেক্টর ধ্বংসের জন্য বিদেশীচক্রান্ত এখানে কার্যকর রয়েছে এবং তাকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষার জন্য সরকারের সম্ভাব্য সব কিছু করা উচিত এ কথা গার্মেন্টস মালিকদের পক্ষ হতে অহরহই শোনা যায়। বস্তুত এ কথা বলে তারা এবং তাদের সংগঠিত দুর্বৃত্ত প্রতিষ্ঠান বিজিএমইএ রাষ্ট্র ও সরকারের কাছ থেকে অনেক সুযোগসুবিধা ইতোমধ্যেই হাতিয়ে নিয়েছে। আরো বিভিন্ন সুযোগসুবিধা আত্মসাতের জন্য তাদের জিহ্বা লালায়িত। এটা ঠিক যে বাংলাদেশের গার্মেন্টস ধ্বংসের জন্য বিদেশী বিভিন্ন মহলের তৎপরতা জারি থাকতে পারে। সেটা তাদের জন্য অসম্ভব কিছু নয়। কিন্তু আমরা যদি পেছনে ফিরে লক্ষ্য করি তাহলে দেখব, বাংলাদেশের পাট, বস্ত্র, কাগজ, ইস্পাত, তাঁত সহ ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বৃহদাকার অসংখ্য শিল্প ইতোমধ্যেই সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্তে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করা হয়েছে। এইসব গুরুত্বপূর্ণ শিল্পের একটা বড় অংশই তাদের কাঁচামাল সংগ্রহ করত এদেশের কৃষিক্ষেত্র থেকে। দেশীয় কাঁচামালনির্ভর এসব শিল্পে মূল্য সংযোজনের পরিমাণ ছিল অনেক বেশি। দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও শিল্পোজাত পণ্য রপ্তানি করা হতো। অন্যদিকে, গার্মেন্টস সেক্টরে রপ্তানি আয় হিসেবে যে পরিসংখ্যান সব সময় বিভিন্ন মাধ্যমে প্রদর্শন করা হয় তার মধ্যে রয়েছে এক বিরাট ফাঁকি, যাকে মিথ্যাচার হিসেবেও অভিহিত করা যায়। এই সেক্টরের কাঁচামাল এবং সুতা ও কাপড় অধিকাংশই বিদেশ থেকে আমদানিকৃত। এই বিপুল আমদানির ব্যয় বাদ দিয়ে যে পরিমাণ মূল্য সংযোজিত হয়ে তা বিদেশে রপ্তানি করা হয় তার মোট অঙ্কপ্রতি বছর রেমিটেন্স খাতে প্রবাসে কর্মরতদের পক্ষ থেকে যে পরিমাণ অর্থ আসে তার চাইতে অনেক কম। কিন্তু গার্মেণ্টস সেক্টরের ‘অবদান’ তুলে ধরার সময় এবিষয়টি ইচ্ছেকৃতভাবে এড়িয়ে যাওয়া হয়।

বিগত বিএনপি সরকারের আমলে বিশ্বব্যাংকের ষড়যন্ত্র ও নির্দেশনায় আদমজী পাটকলের মতো একটি বৃহৎ কারখানা লোকসানের অজুহাতে বন্ধ করে দেয়া হয়। এই কারখানা ঘিরে অসংখ্য শ্রমিকের যে জীবিকার সংস্থান গড়ে উঠেছিল, তাদের সন্তানদের শিক্ষা ব্যবস্থা, চিকিৎসা সহ তাদের জীবন বিকাশের একটি বিশাল ক্ষেত্র হিসেবে তা গড়ে উঠেছিল এর সমস্ত কিছুই এক নিমিষে ধ্বংস করে দেয়া হয়। তখন আমাদের সুশীল সমাজ থেকে পাট শিল্প ধ্বংসের বিরুদ্ধে কোনো আওয়াজ ওঠেনি। শুধু আদমজী নয়, লোকসানের অজুহাতে এভাবে একের পর এক অসংখ্য পাটকল বন্ধ করা হয়েছে, বিজেএমসির দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট সরকারি লোকজনের অবাধ লুটপাটের ফলাফলস্বরূপ ধ্বংস হয়েছে দেশীয় কাঁচামালনির্ভর এই অন্যতম শক্তিশালী ও সম্ভাবনাময় শিল্পখাতটি। এরপরিণামে পাটচাষীদের জীবনেও নেমে এসেছে সীমাহীন দুর্ভোগ; এছাড়া বিপণন, পরিবহন থেকে শুরু করে পাটশিল্পের সাথে অসংখ্য সম্পর্কসূত্রে জড়িত ব্যক্তিবর্গ নিজেদের জীবিকার সংস্থান হারিয়ে পতিত হয়েছেন দুর্বিষহ অবস্থায়। বস্ত্র, কাগজ, চিনি, ইস্পাত প্রভৃতি শিল্পেরও একই অবস্থা। বস্তুত বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর দুর্নীতি, লুটপাট ও সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্তের ফলে এদেশের শিল্পভিত্তি এভাবে ধ্বংস করা হয়েছে। এসব খাতের ধ্বংস নিয়ে প্রভাবশীল মহলে তেমন উল্লেখযোগ্য কথাবার্তা শোনা না গেলেও গার্মেন্টস সেক্টর নিয়ে তাদের মাথাব্যথার অন্ত নেই। এর প্রধান কারণ হলো, গার্মেন্টস সেক্টরকেএদেশে চালু রাখা সাম্রাজ্যবাদীদের বৃহৎ মুনাফা স্বার্থের জন্য অপরিহার্য। এদেশের শ্রমিক,বিশেষত নারী শ্রমিকদের শ্রমশক্তি নিংড়ে, তাদের সাথে সম্ভাব্য সব উপায়ে প্রতারণা করে, মজুরি ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন অর্থ পরিশোধ করে এই সেক্টর ইউরোপ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সহ উন্নত পুঁজিবাদী বিশ্বে কম দামে তৈরি পোশাকের প্রয়োজন মিটিয়ে থাকে। এজন্য এইসব দেশে বাংলাদেশী তৈরি পোশাকের চাহিদা প্রচুর। ক্রেতা সংস্থা, ওয়ালমার্টের মতো বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান সহ মধ্যস্বত্বভোগী একটা বড় অংশ এর মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ আয় করে থাকে। এ কারণে তারাই সম্ভাব্য সব পন্থা অবলম্বন করে যাতে গার্মেন্টস খাত বাংলাদেশে টিকে থাকে, বিকশিত হয়। এর মাধ্যমে গার্মেন্টস মালিক নামক একটি তথাকথিত পুঁজিপতি গোষ্ঠী তারা এদেশে সৃষ্টি করেছে। সাম্রাজ্যবাদীদের এদেশীয় এজেন্ট হিসেবে সক্রিয় বুদ্ধিজীবী, বিশেষজ্ঞ, প্রচার মাধ্যম সবখানেই শোনা যায় গার্মেন্টস সেক্টরের গুণগান, সর্বোচ্চ পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের গালগপ্পো। বাংলাদেশে আর সমস্ত শিল্পখাতের ধ্বংস হওয়ার প্রেক্ষিতে তৈরি পোশাক হয়ে দাঁড়িয়েছে তাই এখানকার একমাত্র শিল্প সেক্টর, তাদের সবেধন নীলমণি। এই সেক্টরকে দেখিয়েই মালিক পক্ষ এদেশকে এমনভাবে জিম্মি করে রেখেছে যার ফলে এখানকার অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ শিল্পখাতের বিকাশ হয়েছে ব্যাহত, অতীতে যা কিছু ছিল তার অধিকাংশই হয়েছে ধ্বংসপ্রাপ্ত। তাই গার্মেন্টস সেক্টরে বহু বছর ধরে চলা তথাকথিত দুর্ঘটনা (চূড়ান্ত বিচারে যাকে শ্রমিকগণহত্যা ছাড়া কিছুই বলা যায় না) দেখে সাম্রাজ্যবাদী মহলও এখন বিচলিত হচ্ছে। এই সকল ‘দুর্ঘটনা’ সহনীয় পর্যায়ে রাখা, শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার প্রদান, গার্মেন্টস সেক্টরে শৃঙ্খলাপূর্ণ শোষণের পরিস্থিতি বজায় রাখার জন্য তারা এখন মালিক পক্ষ ও সরকারের ওপর বিভিন্নভাবে চাপ সৃষ্টি করে চলেছে।

বাংলাদেশের সরকারে অধিষ্ঠিত শাসক শ্রেণীরবিভিন্ন রাজনৈতিক দল এই গার্মেন্টস শিল্প মালিকদের বিভিন্নভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করেএসেছে, তাদের নানা অন্যায়আবদার মেনে নিয়েছে। এর কারণ বোঝাও কঠিন কিছু নয়। বাংলাদেশের পার্লামেন্টারি ব্যবস্থায় যে তিনশ’ ব্যক্তি সংসদের আসনসমূহ অলঙ্কৃত করে রাখেন, তাদের অধিকাংশই হয় নিজেরা গার্মেন্টস মালিক, না হয় অংশিদার। অথবা তাদের আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব কিংবা পরিবারের লোকজন। তাই সরকারে তাদের প্রভাব সব সময়ই বেশি থাকে। স্বাধীনতার চার দশকে বাংলাদেশের পার্লামেন্টারি রাজনীতির যে চেহারা দাঁড়িয়েছে তাতে বিপুল অর্থবিত্তের মালিক না হলে দলীয় মনোনয়নপত্র ক্রয় অথবা নির্বাচনী প্রচারকার্যের ব্যয় নির্বাহ করা সম্ভব নয়। সুতরাং রাজনৈতিক দলগুলোয় এখন ব্যবসায়ী ও তথাকথিত শিল্পপতিদের আধিক্য। জাতীয় নির্বাচনে মনোনয়ন লাভ করে এরাই, এরাই নির্বাচিত হয়ে গঠন করে জাতীয় সংসদ। এ কথা সরকারি ও প্রধান বিরোধী দল উভয়ের ক্ষেত্রেই সমভাবে প্রযোজ্য। এ কারণে জনগণের ভোটে গঠিত হলেও জনস্বার্থের প্রতিনিধিত্বশীল কোনো চরিত্র জাতীয় সংসদে এখন আর নেই। সরকারি অথবা বিরোধী যে অবস্থানেই থাকুন না কেন, তারা সংসদ অধিবেশনেও ঠিকমতো যোগদান করেন না। অন্য আরো অনেক কাজের মধ্যে তাই সরকারের একটা প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে গার্মেন্টস মালিকদের স্বার্থের দেখভাল করা, অগ্নিকাণ্ড কিংবা ভবন ধসে অসংখ্য শ্রমিকের মৃত্যুর পর সম্ভাব্য জনরোষ হতে তাদের রক্ষা করা। এবারও ২৪ এপ্রিলের ঘটনার পর তাই দেখা গেল। রানা প্লাজা ধসে এর মালিক স্থানীয় যুবলীগ নেতা সোহেল রানা ভবনের ভেতর আত্মগোপন করার পর স্থানীয় সংসদ সদস্য নিজে এসে তাকে উদ্ধার করে পালিয়ে যেতে সাহায্য করেছেন। এই সোহেল রানা স্থানীয় সকল সন্ত্রাসী কাজে সংসদ সদস্যের ডান হাত হিসেবে এলাকায় বিশেষ পরিচিত। কাজেই উক্ত সাংসদ বিভিন্ন মাধ্যমে অথবা প্রধানমন্ত্রী সংসদে দাঁড়িয়ে যতোই বলুন রানা যুবলীগের কেউ নয়, দেশের জনগণ তাদের এই মিথ্যাচারের চরিত্র ঠিকই বুঝতে পারেন। এই গার্মেন্টস মালিক পালিয়ে যাওয়ার তিনদিন পর কেন তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হলো এ বিষয়টিও তাদের উপলব্ধির বাইরে নেই। সুতরাং সরকারের মন্ত্রী, এমপি থেকে শুরু করে বিরোধীদলীয় নেতা কিংবা হঠাৎ গজিয়ে ওঠা হেফাজতের নেতারা ‘আল্লার গজব’ নামে যতোই আবোলতাবোল কথাবার্তা বলুক না কেন, তাদের মূল উদ্দেশ্য যে ঘটনায় দোষী ব্যক্তিদেরকে রক্ষা করা এবং গোটা সমস্যার আসল দিক থেকে জনগণের দৃষ্টি সরিয়ে রাখা, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। একারণে তাদের যাবতীয় কথাবার্তাকে পাগলের প্রলাপ বলে উড়িয়ে দিয়ে কিংবা উপহাস করে হালকা করে তুললে মূল সমস্যাটার গভীরতা বোঝা যাবে না।

প্রকৃতপক্ষে তথাকথিত লুটেরা গার্মেন্টস মালিক, তাদেরসংগঠন বিজিএমইএ, সরকারবিরোধী দল সহ সমগ্র শাসক শ্রেণী তাদের উভয়ের পৃষ্ঠপোষক সাম্রাজ্যবাদী মহল, বিভিন্ন ধর্মীয় নেতা থেকে শুরু করে সামরিকবেসামরিক আমলা, সুশীলবক্তা, মূলধারার প্রচার মাধ্যম এরা সবাই আমাদের দেশের দরিদ্র শ্রমজীবী মানুষের শ্রেণীগত শত্রু হিসেবেই গঠিত হয়েছে। এরাই গার্মেন্টস শিল্প রক্ষা ও এর বিকাশেরনামে দেশের অর্থনীতি ও মানুষের জীবনকে নিজেদের স্বার্থের কাছে এক প্রকার জিম্মি করে রেখেছে। এই খাতে কর্মরত শ্রমিক সহ সকল প্রকার শ্রমজীবী মানুষ এবং তাদের স্বার্থের প্রতিনিধিত্বকারী হিসেবে সংগঠিত রাজনৈতিক শক্তিকে আজ এই বিষয়টি ভালোভাবে উপলব্ধি করতে হবে।।

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s