লিখেছেন: পাইচিংমং মারমা

() সোজা হিসাব

hill killing-1কে কে পাহাড়ের আদিবাসী সংস্কৃতির বিকাশ চান?

নিশ্চয় সবাই চান। এবার বলুন

কে কে পাহাড়ে পর্যটনের প্রসার চান?

অনেকেই চান। কেন চান?

আপনারা বলবেন, কর্মসংস্থানের সুযোগ হবে। মানুষের আয় রোজগার বাড়বে। এলাকার উন্নয়ন হবে। দূর্গম অঞ্চলে রাস্তাঘাট হবে। আমরা আধুনিক দুনিয়ার সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারবো। আমরা নেংটি ছেড়ে জিন্সের প্যান্ট পরবো। আমরা উন্নত হবোইত্যাদি ইত্যাদি।

এবার বলুন,

পাহাড়ের শহরজনপদে মদের জোয়ার কে কে চান? কে কে খাগড়াছড়িবান্দরবান এবং রাঙ্গামাটিতে ব্যাপক হারে মদের প্রচলন চান?

কে কে চান আপনার গ্রামের অভাবী মেয়েটা বেশ্যা হোক?

আদিবাসী সমাজের নৈতিকতাসংস্কৃতি ধ্বংস হোক কে চায়?

আদিবাসীদের লোকজ সংস্কৃতি ধ্বংস হয়ে যাক কে চায়?

আমাদের জীবন, আমাদের সংস্কৃতি সব কিছু শোকেসের সাজানো পণ্যের মতো প্রদর্শনী হবে। তারপর আমরাও পন্য হবো আর আমাদের প্রদর্শনীর টাকা খাবে ব্যাপারিরা – বলুন কে কে চান?

নিশ্চয় কেউ চান না।

আপনি চান বা না চান বাংলাদেশ রাষ্ট্র চায়। খোলাসা করে বললে বাংলাদেশের রাষ্ট্রনীতি এবং অর্থনীতি এটাই চায়। বাংলাদেশের রাজনৈতিকঅর্থনীতির যে কারবার সেই নিয়মে আমাদের পন্য করা হবে। ব্যাপারটা খুলে আলোচনা করা যাক। একটু বোরিং লাগবেআমি আমার উপলদ্ধিটা সহজ করে বলার চেষ্টা করবো।

বান্দরবানে আজকাল প্রচুর পর্যটকের ভিড় হয়। বান্দরবান যদি পর্যটনের স্বর্গ হয় তাহলে কি লাভ ক্ষতি একটু ভাবা যাক।

বান্দরবান পর্যটন স্থান হলে কার কার লাভ হয়

হোটেললজরিসোর্টের মালিক,

হ্যান্ডিক্রাফটস( হস্তশিল্প পন্যকাপড়,আদিবাসীদের তৈজসপত্র ইত্যাদি),

মদের দোকানদার,

বেশ্যা আর বেশ্যার দালাল

পরিবহন কোম্পানি

খাবারের হোটেলের মালিক

শহরের ভিড়ভাট্টা হলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের যোগানদারমার্কেট, বাজারের পাইকারী ও খুচরা দোকানদাররা।

অর্থাৎ এক কথায় পর্যটনের সাথে যুক্ত ব্যবসায়ীরা।

যারা বান্দরবানের সাধারণ মানুষজুম চাষী, মধ্যবিত্ত, বিভিন্ন অফিসের কর্মচারি তাদের কি লাভ?

তাদের কোন লাভ নেই।

এখন বান্দরবানের হোটেলরিসোর্টের মালিক, পরিবহন ব্যবসায়ী, পর্যটন স্থান( নীল গিরি, নীলাচল ইত্যাদি), পাইকারী ব্যবসায়ী কারা?

অবশ্যই আদিবাসীরা নয়। এরা সবাই পাহাড়ের বাইরের মানুষ যারা মূলত ব্যবসায়ী। এরা ব্যবসা করার উদ্দেশ্যেই পার্বত্য চট্টগ্রামে এসেছে।

কিন্তু বেশ্যা এবং বেশ্যার দালাল, মদের দোকানী, কিছু খাবার হোটেলের মালিক কারা?

বান্দরবানের আদিবাসীরা।

তাহলে সোজা হিসাবে আমরা কি পেলাম? পর্যটনের ফলে আমরা পেলাম বেশ্যাবৃত্তি, আদিবাসী জনপদে মদের বন্যা, ফাটকা ব্যবসায়ী যারা আদিবাসী নয়, সমাজে নৈতিকতা ও সংস্কৃতির অবক্ষয়, আদিবাসীদের পন্যায়ন বা আদিবাসীদের পন্যে পরিণত হওয়া।

পর্যটকের আকর্ষনীয় জিনিষগুলো কি কি?

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের স্থান, আদিবাসী সংস্কৃতি যা কৌতূহলী পর্যটকের অচেনা, আদিবাসীদের তৈরি মদ ।

বান্দরবান সহ পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী সমাজে মদ্য পান করাটা অপ্রচলিত নয়। বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে এর প্রচলন আছে। মদ্য পানের জন্য এমনিতেই আমাদের সমাজের ভারসাম্য নষ্ট হয়। যদি এর প্রাতিষ্ঠিনিকিকরন করা হয় অর্থাৎ, মদ পান এবং বেচাকেনা যদি সমাজে বেশি প্রচলিত হয়ে যায় এবং তা যদি প্রশাসনের সম্মতিক্রমে হয় তাহলে?

গোটা সমাজের নৈতিকতা, ভারসাম্য, শৃংখলা ভেঙে পড়বে।

আমার উপরের বক্তব্যের প্রত্যক্ষ প্রমাণ কি?

প্রতি বছর রাজ পুন্যাহের সময় বান্দরবানে কি দেখা যায়?

গলির ভেতরে সারি বাঁধা “ডাব্বা” খেলা বা জুয়ার পসরা।

পর্দার আড়ালে বা বাইরে মদের সহজলভ্য বেচাকেনা। একটু অভাবী সংসারের ঘর হয়ে যায় মদের দোকান।

শহর থেকে পর্যটনে আসা বাবুদের খাঁই মেটাতে অভাবী ঘরের মেয়েটা রাস্তায় নামে শরীর বেচতে। একজন আদিবাসী মারমা মেয়ে বেশ্যা হয়ে যায়।

ধান্দাবাজ যুবক হাওয়া বুঝে মৌসুমি ব্যবসা ধরে। চাঁদা ধরা, ফাটকাবাজি, এটাওটার দোকান দেওয়া ইত্যাদি। তাতে করে তার বেকারত্ব ঘোঁচেনা কিন্তু পরিনতিতে তার ভেতরে দালাল প্রবৃত্তি গড়ে উঠে।

 

() আরেকটু তলিয়ে দেখা যাক

বান্দরবান সহ পার্বত্য চট্টগ্রামে পর্যটন শিল্পের বিকাশ হলে আমারআপনার মতো সাধারণ আদিবাসীর এক পয়সা লাভ নেই । কেননা পর্যটন শিল্পের সাথে আমাদের কোন যোগাযোগ নেই। এখানে আমাদের মাতৃভূমি পাহাড়ের নিসর্গ, আমাদের জীবনধারাসংস্কৃতি দেখিয়ে কিছু মানুষ টাকা কামাচ্ছে আর অন্যদিকে আমাদের সমাজ নষ্ট হচ্ছে। আমাদের সমাজে বেশ্যাবৃত্তি, মদের প্রচলন বাড়ছে। অসাধু উপায়ে টাকা কামানোর দালাল শ্রেনী তৈরি হচ্ছে। আমাদের এবং আমাদের পাহাড়কে দেখিয়ে পর্যটক আকৃষ্ট করে এখানে এনে আমাদের পন্য বানানো হচ্ছে। পর্যটক আকৃষ্ট করতে আমাদের প্রদর্শন করা হচ্ছে, আমাদের সংস্কৃতিকে পন্য বানানো হচ্ছে।

চ্যানেল আই কর্তৃপক্ষ গত কয়েক বছর ধরে পার্বত্য আদিবাসীদের নিয়ে লোকজ মেলা আয়োজন করে আসছে। এ বছর পঞ্চমবারের মতো “পর্যটনের বিকাশে, পার্বত্য অঞ্চলকে বহির্বিশ্বে তুলে ধরার লক্ষ্যে কয়েক হাজার পার্বত্য শিল্পী নিয়ে বিশাল আয়োজন” করেছিলো তারা।

কিন্তু কেন?

আনন্দ কি আনন্দ এসে গেছে কোকাকোলা

গেছে সব দেনার দায়ে

বাকি আছে কাপড় খোলা”

নচিকেতার এই গানটা আমাদের প্রেক্ষাপটে ভাবা যাক। আমরা কেউ ব্যবসায়ী নই। গুটিকয়েক আছেন খুচরা ব্যবসায়ী। বড় কোন বিনিয়োগ যেমন পরিবহন, রিসোর্ট, শিল্প কারখানা আমাদের দিয়ে হবে না। কারন আমরা যুগ যুগ ধরে জুম চাষ করে আসছি। কয়েক দশক হলো আমাদের মধ্যে শিক্ষার প্রসার হয়েছে। যারা শিক্ষিত মধ্যবিত্ত তারাও চাকরিবাকরি করেন, ব্যবসা নয়। রাঙ্গামাটিতে কয়েকজন কুটিরশিল্প আর হস্তশিল্পের মালিক আছেন তাও উল্লেখযোগ্য নয়।

আপনার শহরের সব বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো কারা চালায়? দেশের অর্থনীতির স্থানীয় সঞ্চালক কারা?

আমি, আপনি বা আমাদের মতো আদিবাসীদের কেউ নই। সুতরাং পর্যটন শিল্পের বিকাশ হওয়া বা না হওয়াতে আমাদের কিছু যায় আসে না। সুতরাং এই শিল্পের বিকাশে আদিবাসীদের কোন লাভ নেই।

তাহলে আমাদের পাহাড়ে পর্যটন শিল্পের বিকাশ করতে কিছু মানুষের এত উৎসাহ কেন? এরা কারা?

এরা কেউ আমাদের মতো সাধারণ খেটে খাওয়া, চাকরি করে জীবিকা উপার্জনের কেউ না। যেমন ধরুন চ্যানেল আই। তাদের এত কিসের ঠ্যাকা পড়লো আমাদের সংস্কৃতি উন্নত করতে?

কারন এখানেই তাদের লাভ। ওরা আমাদের দেখিয়ে পয়সা কামায়। ওরা মিডিয়ার লোক। অনুষ্ঠান তৈরি করে ওরা কোটি টাকা কামায়। আমাদের সংস্কৃতি প্রদর্শনের নামে ওরা একেকটা অনুষ্ঠান বানাবে (event creation)। সেই অনুষ্ঠানে বিজ্ঞাপন বাবদ বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে ওরা লাখ লাখ টাকা কামাবে, পার্টনার এজেন্সি এবং প্রোমোটারের কাছ থেকেও পয়সা কামাবে। আর এই লক্ষকোটি টাকার কিছু উচ্ছিষ্ট ভাগ দেবে আমাদের শিল্পীদের পারিশ্রমিক হিসাবে। আমাদের সংস্কৃতি বাঁচলো কি মরলো তাতে তাদের মাথা ব্যথা নেই। মূল ব্যাপারটা হচ্ছে ব্যবসা। ওদের ব্যবসার সাথে আরও অনেকের ব্যবসা জড়িত। তারা চায় এখানে চ্যানেল আইয়ের মতো মিডিয়ার কার্বারিরা ঢুকুক।

খেয়াল করুন, ওরা আমাদের সংস্কৃতির কোন অংশটাকে প্রচার করেমারমাদের সাংগ্রাই, জল উৎসব এবং উৎসব সংস্লিষ্ট অনুষ্ঠানাদি। অর্থাৎ আমাদের সংস্কৃতির উৎসবের দিকটাকে ওরা তুলে ধরে।

এখানে “বিশেষভাবে” উৎসবের বাহ্যিক অংশ যেমন পাখা নৃত্য, কলসি নৃত্য, পানি খেলা ইত্যাদিকে দেখানো হয়। যেকোন সামাজিক উৎসবের অনেক দিক থাকে। সামাজিক উৎসবের ঐতিহ্যগত প্রেক্ষাপট এবং সামাজিক গুরুত্বকে (যা উৎসবের মর্মবস্তু) বাদ দিয়ে শুধু উৎসবের প্রকাশ বা উচ্ছ্বাসের (উৎসবসর্বস্বতা) মানে উচ্ছৃংখলতা। আরো খোলামেলা করে বলা যাক। এর বিশদ ব্যাখ্যা পরের অংশে দেওয়া আছে।

পড়াশোনা এবং চাকুরিসূত্রে আমি পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে দশ বছর ছিলাম। আমাদের অফিসে একমাত্র মারমা ছিলাম আমি। একবার কাজের দরকারে গিয়েছিলাম আরেকটা বিভাগে। সেখানকার কর্মকর্তা আমার সাথে পরিচিত হয়ে বললেন, “আচ্ছা আপনি তো মারমা। আপনাদের প্রধান উৎসব তো সাংগ্রাই তাইনা? ঐ সময় আপনারা পানিখেলা করেন ঠিক না? আমি টি ভি তে দেখেছি।”

সেই কর্মকর্তার সাথে যে অভিজ্ঞতাটা হলো একইরকম অভিজ্ঞতা অসংখ্যবার হয়েছে। সেই কর্মকর্তা একজন উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তি। তাঁর কাছে মারমা আদিবাসী মানে পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠী, অশিক্ষিত উপজাতি যারা উৎসব প্রিয়, যারা সাংগ্রাই করেজলকেলি করে। বাংলাদেশর সংখ্যাগুরু মানুষের মধ্যে আমাদের বিষয়ে এরকমই ধারণা। বাংলাদেশের মিডিয়া এভাবেই আমাদের বাঙালিদের কাছে তুলে ধরে। কিন্তু তারা তুলে ধরে নাঃ

আমাদের দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস। আমাদের প্রাত্যহিক জীবনসংগ্রাম।

আমাদের কৃষ্টিসংস্কৃতি, প্রথা, সামাজিক আচারবিচার, নীতিনৈতিকতামূল্যবোধ। মুসলিম বাঙালি সমাজের তুলনায় আমাদের সমাজে নারীদের অবস্থান উঁচুতে। নারীর প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি মিডিয়াতে দেখানো হয়না।

আমাদের সামাজিক অনুষ্ঠান এবং উৎসবের সামাজিক গুরুত্ব, ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট।

রাষ্ট্র কর্তৃক আমাদের শোষণ বঞ্চনা, গনহত্যার ইতিহাস। মনে করে দেখুন আমাদের পাহাড়ে এত গনহত্যা হলো, আমাদের এত আত্মীয়স্বজন মারা গেলো, আমরা দেশান্তরী হয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলাম। আমাদের জমিপাহাড়আমাদের জন্মভূমি সেটেলারদের আগ্রাসনে বেদখল হয়ে যাচ্ছে। তার এক সেকেন্ড খবর কি কখনো মিডিয়ায় দেখেছেন?

প্রতি বছর পাহাড়ে রাষ্ট্রীয় মদতে সেটেলারদের হাতে আদিবাসীদের ভূমি বেদখল হয়ে যায়। বাংলাদেশের মিডিয়া কি সেই কথা বলে? বছর বছর আমাদের ঘর পুড়ে সেটেলারদের আগুনে। সেই কথা কি মিডিয়া বলে? পাহাড়ের আড়ালে আদিবাসীদের কান্না পাহাড়ের পাথুরে গায়ে প্রতিধ্বনিত হয়। বাংলাদেশের মিডিয়া সেই কথা বলেনা। সেটেলারদের হাতে লাঞ্ছিত হয় আমাদের মাবোনেরা, মিডিয়া কি সেই কথা বলে?

বলেনা।

মিডিয়া এই ক্ষেত্রে টুঁ শব্দটা করেনা। তাহলে আমাদের প্রতিদিনের জীবনের এই নিদারুন সত্যকে আড়ালে রেখে মিডিয়া কেন আমাদের আমোদফুর্তিবাজ হিসাবে দেখাতে চায়? কেন আমাদের জনপদে মদের বন্যা ঘটাতে চায় রাষ্ট্র, প্রশাসন, মিডিয়া?

প্রশ্নগুলো সহজ, উত্তরতো জানা। কারন তারা আমাদের জনপদকে থাইল্যান্ডের অনুকরনে সেক্স ট্যুরিজমের দেশ বানাতে চায়। লাস ভেগাসের মতো জুয়ামদযৌনতার রাজধানী বানাতে চায়। যেখানে দেশ বিদেশের পর্যটকেরা ফুর্তি করতে আসবে। নগরজীবনে ক্লান্ত শহরের বাবু এখানে আসবে ক্লান্তি দূর করতেআদিবাসী মেয়েছেলে আর সুরার সাগরে ভাসতে।

আমাদের উপরে রাষ্ট্রীয় শোষণের খড়গ নেমেছে কয়েক দশক হলো। সেই খড়গে বলি হয়েছে অগণিত আদিবাসী। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর এই স্বাধীন দেশে গনহত্যা হয়েছে। আর সেই গনহত্যায় শত শত আদিবাসীকে হত্যা করা হয়েছে। আদিবাস নিধনের হাত থেকে বাঁচতে যারা শরনার্থী হয়ে ভারতে পালিয়েছিলো তারা ফিরে এসে দেখে তাদের ভিটেমাটিতে এখন সেটেলারদের বাড়বাড়ন্ত বসতি। আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের মাটি, আমাদের লোকালয়, আমাদের নারী, আমাদের অস্তিত্ব কিছুই আর নিরাপদ নয়। আমরা আদৌ নিশ্চিত নই যে আমরা আগামী কুড়ি বছর পর আমাদের ভিটেমাটিতে নিরাপদে থাকতে পারবো কিনা। রাষ্ট্র এভাবেই আমাদের শোষণ করে চলেছে। পাহাড়ে পর্যটন শিল্পের বিকাশ ঘটানো আসলে আমাদের শোষণের নতুন পদক্ষেপ। পাহাড়ে পর্যটন শিল্পের বিকাশের মাধ্যমে আদতে রাষ্ট্র আমাদের প্রান্তিকতার শেষ সীমায় ঠেলে দিতে চায়। পর্যটনের ফলে আমাদের পণ্য বানিয়ে রাষ্ট্র আমাদের বেচতে চায়। আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের নৈতিকতাসামাজিক শৃঙ্খলা, সামাজিক মানুষ হিসাবে ব্যক্তিক আত্মমর্যাদাবোধসব কিছু ধ্বংস করতে চায়। যাতে আমরা হয়ে যাই চিড়িয়াখানার প্রানীর মতো দর্শনীয় উপজাতি, ভোগ করার মতো নারীমাংস, ধ্বংসম্মুখবিলুপ্তপ্রায় উপজাতি।

 

()উচ্চতর শোষণতন্ত্র

সামাজিক উৎসবের ঐতিহ্যগত প্রেক্ষাপট এবং সামাজিক গুরুত্বকে (যা উৎসবের মর্মবস্তু) বাদ দিয়ে শুধু উৎসবের প্রকাশ বা উচ্ছ্বাসের উৎসবসর্বস্বতাকে কেন সামনে নিয়ে আসা হচ্ছে?

কেননা এখানে সামাজিক গুরুত্বের চাইতে অর্থনৈতিক গুরুত্বটা বেশি গুরুত্বপূর্ন।

সাম্প্রতিক সময়ে কর্পোরেট হাউজগুলো বাংলাদেশের অনেক “বাঙালি সংস্কৃতির উৎসবে” পৃষ্ঠপোষকতা করে থাকে। যেমন লালন মেলা, মধু মেলা, নৌকা বাইচ ইত্যাদি। একইভাবে তারা মারমাদের সাংগ্রাই উৎসবে স্পন্সর করে। আর মিডিয়া সাংগ্রায়ের পানিখেলাকে বেশি ফোকাস করে।

বাঙালি সংস্কৃতির অনেক গুরুত্বপূর্ন দিক তারা পৃষ্ঠপোষোকতা করেনা। খেয়াল করলে দেখা যাবে তারা সেই অনুষ্ঠানকেই স্পন্সর করে যেখানে লোকসমাগম বেশি। কেননা, বেশি লোক মানেই বেশি ক্রেতা যাদের কাছে তারা নিজেদের পণ্য ঢোকাতে

পারবে। এখানে তাদের সংস্কৃতিপ্রীতি বা “সি এস আর” (কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপন্সিবিলিটি) একটা গৌণ বিষয়, বড় বিবেচ্য হচ্ছে তাদের বাজার সম্প্রসারন, পণ্যের বাজারজাতকরন এবং প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ভোক্তার কাছে বড় করা।

একই কারণে বাঙালি সংস্কৃতির অনেক গুরুত্বপূর্ন দিন পালন না করে কর্পোরেট মিডিয়া এবং কর্পোরেট হাউজগুলো পয়লা বৈশাখকে সামনে নিয়ে আসে। পুঁজিবাদী কর্পোরেটিজমের যুগে সেই সংস্কৃতিই বিস্তৃতি লাভ করে যার পেছনে কর্পোরেট পুঁজির স্বার্থ জড়িত আছে।

এভাবে বাঙালি সংস্কৃতির পয়লা বৈশাখ হয়ে যায় “ গ্রামীণ ফোন পয়লা বৈশাখ” যার লাইভ টেলিকাস্ট করে টিভি চ্যানেলগুলো।

পুঁজিবাদী দুনিয়ায় কর্পোরেট স্বার্থে সংস্কৃতি পাল্টে গিয়ে কর্পোরেট সংস্কৃতিতে রূপ নেয়। সেই কর্পোরেট সংস্কৃতি ঢুকে যায় মানুষ নামের ভোক্তার ডাইনিং টেবিলে, কিচেনে, বেডরুমে।

একইভাবে আদিবাসী সংস্কৃতি প্রভাবশালী, সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক প্রভাবে যখন বিলুপ্তপ্রায় তখন মিডিয়ার কারণে মানুষের সামনে চলে আসে সাংগ্রাইএর পানিখেলা। কেননা এর একটা appeal আছে। জলসিক্ত মারমা তরুণী মিডিয়ার কল্যানে টিভিতে চলে আসে আর ওদিকে হারিয়ে যায় মারমাদের শতবর্ষের সমৃদ্ধ অনেক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। ট্যুরিজমের সাথে এর সংযোগটা বিবেচনা করতে হলে আমরা ব্রাজিলের কথা ভাবতে পারি। ব্রাজিলের রয়াল কার্নিভাল আর সাম্বা নাচ। ব্রাজিলের কার্নিভাল আর সাম্বা নাচ ব্রাজিলকে ছাপিয়ে গোটা বিশ্বে পরিচিতি পেয়েছে। প্রতিবছর কার্নিভালের সময় পতিতাবৃত্তি বেড়ে যায় স্বাভাবিক সময়ের চাইতে বহুগুণ।

Council on Hemispheric Affairs (COHA) এর গবেষক Melissa Bealeএর মতে

The commercial view of Brazil is that it is a country of samba, football and carnival. Unfortunately, many tourists visit the breathtaking country not for its culture, but for its renowned reputation of exotically striking people and as a center of personal freedoms. This erotic picture of Brazilians has gained negative attention from inappropriate tourists seeking sexual experiences abroad, whether or not it is consensual or legal, – thus, the sex tourism begins.”

একইভাবে রাষ্ট্রের আদিবাসী হিসাবে মারমাদের ঐতিহ্যগত স্বকীয় অস্ত্বিত্ব, সাংস্কৃতিক বৈচিত্রকে স্বীকার না করে তার উৎসবসর্বস্বতাকে প্রচারের মধ্যেও একটা দূরভিসন্ধি আছে। রাষ্ট্র কি তাহলে চায় যেন

পর্যটকেরা পানিখেলা, আদিবাসী নারীর নৃত্য আর উৎসব দেখে পাহাড়ে ছুটে আসুক?

বাজিল কার্নিভাল, সাম্বা নাচ আর পতিতাবৃত্তির ডলারে দেশের “উন্নয়ন” করে। সেভাবে বাংলাদেশর সরকারও কি চায় “উপজাতীয়দের মদ, উপজাতীয় নারীর নাচ, উপজাতীয়দের উৎসব আর পানিখেলায় জলসিক্ত যৌনাবেদনময় নারীর” আকর্ষনে এখানে আরেকটা ব্রাজিলীয় কায়দায় উৎসবমুখর পরিবেশে আদিবাসীদের বিক্রি করা হোক?

 

ANITA PLEUMAROMএকজন ভূতত্ত্ববিদ ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী। তিনি South-East Asia Tourism Monitor”নামক একটি পত্রিকার সম্পাদক এবং ব্যাংকক ভিত্তিক Tourism Investigation & Monitoring Team (tim-team)”সংগঠনের সমন্বয়ক।

তাঁর মতে পর্যটন শিল্প “একধরনের উন্নয়ন আগ্রাসন” (development aggression)

অর্থাৎ উন্নয়নের মোড়কে আগ্রাসন। কেন তিনি পর্যটনকে আগ্রাসনের সাথে তুলনা করেছেন? তিনি বলেন যে,

Women in tourism are found to have the most dehumanising and the worst-paid jobs. Tourism has an infamous reputation of boosting the sex industry wherever it takes root. Efforts to make industry comply with the Code of Ethics promoted by the UNWTO have not helped to curb trafficking in women and girls for sex work in tourist destinations, which in many cases deprives the victims of their fundamental human rights and exposes them to health risks such as HIV/AIDS.

Industry self-regulation has proven an utterly inadequate tool in tourist centres, such as Pattaya in Thailand, Cancun in Mexico or Johannesburg in South Africa, where the sex, drugs and crime, gang violence, mafia-style politics and corruption are out of control.

The erosion of culture and traditional values is visible in all tourist destinations driven by over-commercialisation. Even many of the UN Educational, Scientific and Cultural Organisation (UNESCO)’s World Heritage sites are not properly protected from privatisation and ‘Disneyfication’.

Tourism – including ‘ecotourism’ – also exploits indigenous and local communities and their cultures, turning them into mere exhibits for tourists’ entertainment. ”

………………

 

()পরিশেষ

লেখার শুরুতেই আমি ঠিক করেছিলাম যে এই লেখাটা খুব সহজবোধ্য করে লিখবো। যাতে আমার লেখা আদিবাসী সমাজের সবাই বুঝতে পারেন। সমাজবিজ্ঞান, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও ইতিহাসের আলোকে দেখানো যায় পাহাড়ে পর্যটনের ফলে আদিবাসীদের জীবনে কি বিপর্যয় হতে পারে। সেই বিশ্লেষণী লেখা আমি ভবিষ্যতে উপস্থাপন করবো।

আমার লেখা আরো বিশ্লেষণী এবং ভারী করা যেত। কিন্তু আমি চাইনি আমার লেখা কোন থিসিস পেপার হোক। আমি চাই আমার এই লেখা একটা লিফলেটের মতো হোক, একটা হ্যান্ডবিলের মতো হোক যাতে সবাই এই লেখা পড়ে সচেতন হতে পারে।

এই লেখার প্রাসঙ্গিক বিষয় নিয়ে নীচে দেওয়া ওয়েব লিঙ্কে আরো প্রবন্ধ আছে। আমি আমার লেখায় ঐ সব কথার সারকথা বলতে চেয়েছি।

বাংলাদেশের Economic Trend, Industrial Analysis, Industrial Feasibility and profitability Analysisকরে দেখিয়ে দেওয়া যায় যে পাহাড়ে পর্যটন শিল্পের সম্ভাবনা কত। সব তত্ত্বের বড় কথা হচ্ছে মুনাফা। পাহাড়ে অতিঅবশ্যই পর্যটন একটি লাভজনক খাত। পুঁজিবাদী দুনিয়ায় মুনাফাই শেষ কথা। মুনাফার জন্য আদিবাসীদের উচ্ছেদ, আদিবাসীদের পন্যায়ন হলে আদিবাসীদের সমাজসংস্কৃতি ধ্বংস হয়ে গেলে রাষ্ট্রের কিচ্ছু যাবে আসবে না। তাহলে আমাদের কি করনীয়?

পর্যটনের নামে আমাদের পণ্য করা রুখতে হবে। (To resist commoditization and marketizaton of Indigenous people, culture and place)

চ্যানেল আই সহ মিডিয়ার ব্যাপারী যারা আমাদের সংস্কৃতি বাজারজাত করার হীন চেষ্টা করে তাদের প্রতিহত করতে হবে। প্রত্যেক ব্যক্তি যদি সচেতন হনমানুষকে সচেতন করেন এবং তাদের প্রতিহত করতে রাস্তায় নামেন তাহলে মিডিয়ায় আমাদের পণ্য হিসাবে প্রদর্শনী করা বন্ধ করা যায়।

সব রাজনৈতিকসামাজিকসাংস্কৃতিক সংগঠন মিলে যার যার অবস্থান থেকে ট্যুরিজমের নামে আমাদের পণ্য করা রুখতে হবে।

আমরা যারা রাজনৈতিক দলের সাথে যুক্ত নই আমরাও কিন্তু রাজনীতি করি। শাসকের রাজনীতি বা শাসকের শাসননীতির বিরুদ্ধে রাজনীতি। প্রতিবাদ না করে চুপ করে থাকা মানে শাসকের নীতিকেই মেনে নেওয়া। যদি তার বিরুদ্ধে কেউ মত পোষন করেন, আমি মনে করি তার শাসকের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। আর সোচ্চার হয়ে প্রতিবাদ করা, বিক্ষোভ করার একটা পথ হচ্ছে মানুষকে রাষ্ট্রীয় শাসননীতি ও শোষণনীতির বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলা। আমার এই লেখা কোন প্রেমের উপন্যাস নয়। সুতরাং আমি চাইনা এই লেখা পড়ার পর আপনি আমার লেখার কথা ভুলে যান।

আমি চাই আমার লেখা পড়ে মানুষ ভাববে এবং ভাবাবে। আমার লেখা যদি আপনাকে ভাবাতে পারে এবং মানুষের মধ্যে একটা আলোচনা তুলতে পারে তাহলেই আমার লেখা স্বার্থক। তাই এই লেখাটি পড়ার পর আর সবার মধ্যে ছড়িয়ে দিন।।

 

প্রাসঙ্গিক আরো লেখা

http://www.planeta.com/planeta/99/1199globalizationrt.html

http://www.countercurrents.org/sasi230812.htm

http://www.coha.org/the-infamous-link-between-sex-trafficking-sex-tourism-and-sporting-events-%E2%80%93-what-lies-ahead-for-brazil/

http://www.gale.cengage.com/pdf/samples/sp741209.pdf

http://eprints.lse.ac.uk/15478/1/Cultural_industries_and_cultural_policy_%28LSERO%29.pdf

http://www.prospectmagazine.co.uk/magazine/learningthethaisextrade/

http://www.un.org/esa/socdev/unpfii/documents/BriefingNote1_GREY.pdf

http://www.google.com.bd/url?sa=t&rct=j&q=tourism%2C%20sex%20tourism%20%20threatening%20indigenous%20peoples&source=web&cd=10&cad=rja&ved=0CF0QFjAJ&url=http%3A%2F%2Fwww.twnside.org.sg%2Ftitle2%2Fresurgence%2F207-208%2Fcover1.doc&ei=eqcpUeGDDMXTrQeFq4HIBg&usg=AFQjCNG7w3BrZE2fag5kG28WpDavCh0IEA&bvm=bv.42768644,d.bmk

(এই লেখাটা আমাদের লিটিল ম্যাগাজিন “হুচ” এ প্রকাশিত হয়েছে। লেখাটা তিন ভাগে বিন্যস্ত। সোজা কথায় কি বলতে চেয়েছি তা পাবেন প্রথম অংশে। দ্বিতীয় অংশে একটু তলিয়ে ব্যাখাবিশ্লেষনের চেষ্টা করেছি। এই দুটো অংশ সব ধরনের পাঠকের জন্য। তৃতীয় অংশের শিরোনামঃ “উচ্চতর শোষণতন্ত্র”। এই নোটে তৃতীয় অংশের কিছু কাটছাঁট করেছি। আগ্রহী পাঠকদের আজিজের লোক, লিটিলম্যাগ প্রাঙ্গন, পাঠক সমাবেশের স্টল থেকে সংগ্রহের অনুরোধ করছি। যারা খাগড়াছড়িতে আছেন তারা আমার কাছ থেকেও সংগ্রহ করতে পারেন। লেখক)

Advertisements
মন্তব্য
  1. সাখাওয়াত নাদিম বলেছেন:

    লেখাটা খুব ভাল হয়েছে।

    “আনন্দ কি আনন্দ এসে গেছে কোকাকোলা

    গেছে সব দেনার দায়ে

    বাকি আছে কাপড় খোলা”

  2. Tutul Chakma বলেছেন:

    খুব ভালো হয়েছে ।মনে রাখার মত।
    #বেশ্যা এবং বেশ্যার দালাল, মদের দোকানী, কিছু খাবার হোটেলের মালিক কারা?

    -বান্দরবানের আদিবাসীরা।
    **** ভাবতেই কষ্ট লাগে………………………… 😦

  3. Ziaul Haque Howlader বলেছেন:

    The write up is good one with many good references. My view is – – There are some other ways or alternative forms of tourism development in the world specially at the environmentally or culturally sensitive areas, such as eco-tourism, responsible tourism. This kind of tourism development does not encourage environmental damage, extinct of local community & culture and prostitution. Rather it encourages maintenance of quality culture and environment as well local people participation in the planning and formulation of tourism project for cascading down the benefit to the concerned communities. It does not allow drug abuse, child abuse or prostitution or discotheque. If you do not believe — please visit Iran, Bhutan, Brunei, Cuba, Germany. Some other countries are emerging for this kind of tourism.
    There are some problems in the society which persists since long even if you don’t allow tourism. Prostitution, environmental damage and extinct of local culture are destroyed owing to sky culture and economic aggression, globalization, or for other form of development etc. You have to resist the unbridled free-market economy and aggression of mainstreaming culture to protect own culture.

    What the writer mentions here generally refers to mass tourism and it has already happened in many countries of the world. That mass tourism help benefit leakage from local to other sides (investors from outside) and destroyed the environment and local culture.

    In reference to this article, I would like to ask the author two questions. The first one is – Suppose, we have decided not to develop tourism in the CHT, then what kinds of development can be allowed in this area for employment generation and enhancement of living standard of local people including women? The second one is — If Tourism is not allowed but other development is allowed, can anybody give you any guarantee that local culture won’t be destroyed anyway, community won’t be deprived? Thanks and regards.

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s