দুই নেত্রীর সংলাপ থেকে জনগণ কি পাবে?

Posted: এপ্রিল 15, 2013 in দেশ
ট্যাগসমূহ:, , , , ,

লিখেছেন: প্রশান্ত মাহমুদ

pol violenceবাংলাদেশে বর্তমানে সর্বত্র চলছে ভয়াবহ নৈরাজ্য। রাজনীতির মাঠও তার ব্যতিক্রম নয়। এই নৈরাজ্যের সর্বশেষ উদাহরণ বাংলাদেশের জনগণ দেখছেন গত কিছু দিন ধরে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবীতে শাহবাগের তরুণ প্রজন্মের আন্দোলনের পরবর্তী উদ্ভূত পরিস্থিতি থেকে। সারা দেশে একদিকে যেমন চলছে জামায়াত শিবিরের ফ্যাসিস্ট তান্ডব অন্যদিকে চলছে সরকারেরও ফ্যাসিস্ট আচরণ। অন্যদিকে বিএনপিও বসে নেই। শাসকশ্রেণীর এই রাজনৈতিক দলগুলো দেশের জনগণের কথা বিন্দুমাত্র চিন্তা না করে ক্ষমতার মোহে নিজেদের ভেতরে দ্বন্দ্ব সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে এমনভাবে যে তাদের কামড়াকামড়িতে দেশের মানুষ এখন চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন পার করছেন। খেটে খাওয়া শ্রমিক, কৃষক, নিম্নবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত জনগণের জানমালের নিরাপত্তা আজ হুমকির সম্মুখীন। নৈরাজ্যের সব থেকে বড় বলি তারাই হচ্ছেন। বলা বাহুল্য এরকম পরিস্থিতি এবারই প্রথম নয়। একই রকম পরিস্থিতি আমরা ২০০৭ সালের আগেও দেখেছি। স্বাধীনতার ৪২ বছর পার হলেও বাংলাদেশ আজ নানা ধরণের গুরুতর সমস্যার ভারে ভারাক্রান্ত। যার মধ্যে অন্যতম এই সর্বব্যাপী নৈরাজ্য ও সংঘাতময় পরিস্থিতি। এই পরিস্থিতির প্রধান দায় শাসকশ্রেণীর রাজনৈতিক দলগুলোর।

অন্যদিকে, বহুবছর থেকেই বাংলাদেশের জনগণের সামনে এদেশের সুশীল সমাজ নামধারী মহলটি এই নৈরাজ্যিক পরিস্থিতিতে সকল সমস্যার সমাধান হিসেবে একটি প্রেসক্রিপশন দিয়ে আসছেন। তা হল দুই নেত্রী আন্তরিকভাবে সংলাপে বসলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। এ নিয়ে তাদের প্রায়ই বিভিন্ন পত্রিকায় উপসম্পাদকীয়তে, বিভিন্ন চ্যানেলে টকশোতে বিশেষজ্ঞ মতামত দিতে দেখা যায়। মূলধারার মিডিয়াতেও এই সুরের প্রতিধ্বনি খুব ভাল ভাবেই থাকে এবং সংলাপের ব্যাপারে শাসকশ্রেণীর রাজনৈতিক দলগুলোর আন্তরিকতার অভাব নিয়ে হা হুতাশও থাকে। সর্বশেষ হাইকোর্ট থেকে এ বিষয়ে একটি রুল জারি করা হয়েছে। অন্যদিকে বিশ্ববেহায়া খেতাবধারী ব্যক্তিটিও তার নতুন রাজনৈতিক স্টান্টবাজিতে একই রকম কথা বলেছেন। বিভিন্ন মহল থেকে আসছে বিভিন্ন প্রস্তাব, যে কিভাবে সংলাপের মাধ্যমে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন করার ফর্মুলা বের হবে। মিডিয়ার প্রচারণার জোরো সাধারণ মানুষের ব্যাপক অংশও বিশ্বাস করে বসেন যে দুই নেত্রী সংলাপে বসলেই সব মুশকিল আসান হয়ে যাবে। দুই বিরোধী পক্ষের মধ্যে বিরোধ মেটাতে সংলাপ অবশ্যই ভাল জিনিস। কিন্তু যখন এই সংলাপের প্রেসক্রিপশন দিয়ে জনগণের মগজধোলাই করা হতে থাকে তখন “শান্তিপ্রিয়” সুশীলদের সংলাপের প্রেসক্রিপশনটি অবশ্যই আর “সুশীল” থাকে না। সেটি আসল সমাধান থেকে মানুষের দৃষ্টি ফিরিয়ে দেয়ার দুঃশীল কর্মকান্ডে পরিণত হয়।

এমতাবস্থায় যখন আমাদের সামনে সংলাপের প্রেসক্রিপশন পেশ করা হয় তখন করনীয় দুটি কাজ থাকে। এক, প্রেসক্রিপশনটি বিনা বাক্য ব্যয়ে মেনে নেয়া ও বিশ্বাস করা। দুই, প্রেসক্রিপশনটি নিয়ে প্রশ্ন করা। যদি বিনা বাক্য ব্যয়ে মেনে নিতে হয় তাহলে এটা নিয়ে কোন কিছু বলার আর অবকাশ থাকে না। কিন্তু যদি প্রশ্ন করাকে বেছে নেই তাহলে হুড়মুড় করে অনেক প্রশ্ন মনের মধ্যে ভীড় করে। এবারে সেরকম কিছু প্রশ্ন তুলে ধরা যাক। নিচের প্রশ্নগুলো যেকোন প্যারা থেকে পড়া শুরু করা যেতে পারে। কারণ একগাদা প্রশ্ন টানা পড়ে যাওয়াটা সব সময় সুখকর নাও হতে পারে।

আওয়ামী লীগের মহাজোট আর বিএনপির ১৮ দলীয় জোটের মধ্যে বর্তমান বিরোধ সংঘাতটা কি নিয়ে? উত্তর আসে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যু। যদি তাই হয় তাহলে ধরা যাক সুশীল সমাজের প্রেশক্রিপশন মোতাবেক দুই নেত্রী সংলাপে বসলেন এবং তারা দুইজনে বসে নির্বাচন ইস্যুতে একটি ঐক্যমত্যে পৌছালেন। তাতে শাসকশ্রেণীর রাজনৈতিক দলগুলোর লাভ হতে পারে। কিন্তু এই ঐক্যমত্য থেকে খেটে খাওয়া জনগণ কি পাবে? দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে নির্বাচন তো আর কম হলো না। তাহলে স্বাধীনতার চার দশক পার হওয়ার পরও জনগণ তার নূন্যতম আকাক্সিক্ষত জীবন পেল না কেন? নির্বাচন কি তবে কোন সমাধান? যে নির্বাচন নিয়ে তথাকথিত “দুই পক্ষের” কামড়াকামড়ি চলছে জনগণের সমস্যাসঙ্কুল জীবনে আজ সেটাই কি প্রধানতম সমস্যা?

এবারে তবে আরো কিছু প্রশ্ন করা যাক। “সুশীলরা” জবাব দিক যে নির্বাচন নিয়ে দুই নেত্রী সংলাপে বসলে কিংবা সংলাপ সফল হলে কি তাজরীনের শ্রমিক গণহত্যার বিচার হবে? বন্ধ হবে কি শ্রমিকের পুড়ে মরা? শীতে জমে মানুষের মৃত্যু কি বন্ধ হবে? সড়ক দুর্ঘটনায় লঞ্চডুবিতে অবহেলাজনিত হত্যাকান্ড বন্ধ হবে? রাসায়নিকের অবৈধ গুদামে আগুন লেগে আবাসিক এলাকায় মানুষের পুড়ে মরা কি বন্ধ হবে? বন্ধ হবে কি বিষাক্ত লিচু খেয়ে শিশুমৃত্যু? পাহাড় ধ্বসে মৃত্যু বন্ধ হবে? রগ কাটা রাজনীতি বন্ধ হবে? চাপাতির কোপ থেকে কি বিশ্বজিতেরা বাঁচবে? প্রভাবশালীদের হাত থেকে ত্বকীর মতো নিষ্পাপ কিশোরেরা কি বাঁচবে? লিমনরা কি বাঁচবে পঙ্গু হওয়ার হাত থেকে? ফ্লাইওভারের গার্ডার ধ্বসে মানুষ চাপা পড়া বন্ধ হবে? ফেলানীরা কি সীমান্তের কাঁটাতারের উপর আটকে থাকা থেকে রেহাই পাবে? আগুনে পুড়ে বস্তি ছাই হওয়া বন্ধ হবে? বন্ধ হবে কি ক্রসফায়ার? বন্ধ হবে কি বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু? ডাক্তারের অবহেলায় মৃত্যু? ক্ষুদ্রঋণ শোধ করতে না পেরে আত্মহত্যা? বিলবোর্ডের নিচে চাপা পড়ে মৃত্যু কি বন্ধ হবে? উপরোক্ত ঘটনাগুলো নিয়ে শাসকশ্রেণীর রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কি কোন প্রকৃত বিরোধ আছে?

দুই নেত্রীর সংলাপের মাধ্যমে রূপপুরে ভয়ংকর বিপজ্জনক পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র করা কি বন্ধ হবে? সুন্দরবনের কাছে রামপালে সুন্দরবনের জন্য বিপর্যয়কর তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র করা কি বন্ধ হবে? ফুলবাড়িতে এশিয়া এনার্জির তৎপরতা বন্ধে কি উদ্যোগ নেয়া হবে? কনোকো ফিলিপসের হাতে অতি অসম চুক্তিতে দেয়া সমুদ্রব্লক কি কেড়ে নেয়া হবে? বন্ধ হবে কি অতি অসম চুক্তিতে বহুজাতিক কোম্পানীকে সমুদ্রব্লক দেয়া? টেংরাটিলা আর মাগুরছড়ায় আমাদের গ্যাস নষ্ট করার জন্য কি সংশ্লিষ্ট বহুজাতিক কোম্পানীর কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় করা হবে? বন্ধ হবে কি বিদেশী রাষ্ট্রদূতদের মাতব্বরি? দেশময় ইচ্ছেমতো ঘুরে বেড়ানো? বন্ধ হবে কি ভারতকে অতি অসম ভিত্তিতে ট্রানজিট দেয়া? কড়া ও কার্যকর প্রতিবাদ জানানো হবে কি টিপাইমুখ বাঁধের? আমাদের জাতীয় সম্পদের উপর জনগণের নিয়ন্ত্রণ কি নিশ্চিত হবে? সুশীলদের কাছে প্রশ্ন এসব ব্যাপারে কি তবে আগেই “সফল সংলাপ” হয়ে গেছে?

সফল সংলাপের পর থেকে বিশ্ব ব্যাংক আইএমএফের কাছে অপ্রয়োজনে ধরনা দেয়া কি বন্ধ হবে? বন্ধ হবে কি আইএমএফের দেয়া সামান্য ভিক্ষার বিনিময়ে দফায় দফায় বিদ্যুৎ জ্বালানীর দাম বৃদ্ধি? রেলের অস্বাভাবিক বর্ধিত ভাড়া কি কমবে? বাসভাড়ার নৈরাজ্য কি বন্ধ হবে? বন্ধ হবে কি শিক্ষার ব্যয় বাড়ানো? যৎসামান্য যতটুকু সরকারী চিকিৎসাব্যবস্থা এখনো আছে সেটাকে বাজারের হাতে ছেড়ে দেয়ার যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে সেই প্রক্রিয়া কি থেমে যাবে? নাকি আরো জোরদার হবে? জনগুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে ভর্তুকি কমানোর সেই পুরাতন চর্চা কি বন্ধ হবে? রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে কি শক্তিশালী করা হবে? বন্ধ হবে কি জলের দরে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বিক্রির জঘন্য চক্রান্ত? রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে পরিকল্পিতভাবে অলাভজনক বানানো? বন্ধ হবে কি বাণিজ্য উদারীকরণের নামে বিদেশী পণ্যের অবাধ অনায্য প্রবাহ? বাজারের হাতে সব কিছু ছেড়ে ছুড়ে দেয়ার নয়া উদারবাদী লাইন থেকে কি সরে আসা হবে?

সফল সংলাপের পর জামাত শিবিরের রাজনীতি কি নিষিদ্ধ হবে? ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ হবে কি? রাষ্ট্রধর্ম আইন কি বাতিল হবে? গরীবের ছেলেরা কি কওমী মাদ্রাসার কবল থেকে মুক্ত হতে পারবে? ব্লাসফেমী আইন করার সম্ভাবনা কি নাকচ করে দেয়া যাবে? সকল দলের সকল রাজাকারের কি বিচার হবে? ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার কি বন্ধ হবে?

সফল সংলাপের পর বন্ধ হবে কি নদী দখল? ভূমিদস্যুতা? গ্রামাঞ্চলে কি বন্ধ হবে নির্বিচার ইটভাটা স্থাপন? হলমার্ক কেলেঙ্কারীর মতো কেলেঙ্কারী কি বন্ধ হবে? বন্ধ হবে কি শেয়ারবাজারের কেলেঙ্কারী? রাষ্ট্রপতিরা কি খুনের আসামীকে ক্ষমা করার মহানুভবতা দেখানো থেকে বিরত থাকবেন? চিংড়ী ঘেরের নামে কৃষি জমি নষ্ট করে বিপর্যয় সৃষ্টি করা কি বন্ধ হবে? খাবারে ভেজাল দেয়া/ নীরব বিষ মেশানো কি ঠেকানো যাবে?

সংলাপ সফল হলে শিক্ষাঙ্গণে কি সাধারণ ছাত্ররা মাথা উুঁচু করে চলতে পারবে? বন্ধ হবে কি সরকারী ছাত্রসংগঠনের সন্ত্রাসী কার্যকলাপ? সরকারী এমপির উদগ্র ক্ষমতা প্রদর্শন কি বন্ধ হবে? খাবারের দাম কি কমবে? বাড়বে কি শ্রমিকের মজুরী? কোরবানির গরুর থেকে শ্রমিকের জীবনের দাম কি বেশি হবে? কৃষক কি পাবেন তার ফসলের নায্য দাম? গুটিকয় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী যেভাবে দেশকে জিম্মি করে ফেলেছে তার থেকে মুক্তি মিলবে কি?

সর্বোপরি জনগণ কি পাবে তার প্রাপ্য মর্যাদা? পারবে কি সম্মানের সাথে মাথা উুঁচু করে চলতে ? পাবে কি তার আকাঙ্খিত জীবন? যে জীবনের জন্য জনগণ মুক্তিযুদ্ধ করেছিলেন?

এরকম আরো অসংখ্য প্রশ্ন জনগণের মাঝে আছে। কোথাও গোছালোভাবে কোথাও অগোছালো ভাবে। কোথাও সরবে, কোথাও আবার নীরবে। কিন্তু যেভাবেই থাকুক না কেন বাস্তবতা হলো এইধরনের প্রশ্নগুলো আছে। একজন কিশোর বা তরুণ এই প্রশ্নগুলোর ক্ষেত্রেও দুধরণের আচরণ দেখাতে পারে। প্রথমত, প্রশ্নগুলোকে অগ্রাহ্য করা। কিন্তু সেক্ষেত্রে আবার প্রশ্ন তৈরি হয় যে অগ্রাহ্য করলেই কি প্রশ্নগুলো অস্তিত্বহীন হয়ে যাবে? দ্বিতীয়ত, এগুলো নিয়ে ভাবা। এই প্রশ্নগুলোকে সংগঠিতভাবে জনগণের মাঝে ছড়িয়ে দেয়া। সম্ভব হলে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেয়া।

আজ দেশের প্রতিটি বিবেকবান সুস্থ বুদ্ধিসম্পন্ন তরুণদের কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে এই প্রশ্নগুলো নিয়ে ভাবা, এই প্রশ্নগুলো করা। আর এই আর এই সব প্রশ্নের উত্তর যদি হয় কেবল না, না এবং না, তাহলে দুই নেত্রীর সংলাপের প্রেশক্রিপশনের বিষয়ে জনগণ যদি সুশীল সমাজ নামধারীদের পাল্টা প্রশ্ন করে বসে যে “বেল পাকলে কাকের কি?” তাহলে কি তা খুব অন্যায় হবে? যদি উপরোক্ত প্রশ্নগুলোর মতো এমন হাজার হাজার প্রশ্নকে তরুণদের মধ্যে, জনগণের মধ্যে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেয়া যায় তাহলে এ প্রশ্নের উত্তরটা ভবিষ্যতে উপযুক্ত সময়মতো যে জনগণই দিবেন তাতে কোন সন্দেহ নেই।।

৪ এপ্রিল, ২০১৩ ঢাকা।

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s