লিখেছেন: আঞ্জুমান রোজী

কবি, প্রাবন্ধিক ভজন সরকারের “বিভক্তির সাতকাহন” গ্রন্থ এবং তার মুক্তচিন্তার আলোকে আমার এই আলোকপাত।

কালের স্রোতে ভেসে গেছে অনেক কিছু, আবার মহাকালের পাটাতনে রয়েও গেছে অনেক সত্য সুন্দরের প্রতিধ্বনি; তা স্বত্বেও বদলেছে অনেক কিছু। বদলেছে পৃথিবীর বিবর্তনের ইতিহাস। শুধু বদলায়নি ধর্মীয় অনুশাসনের অনুভূতি। বর্বর যুগে ধর্ম এসেছিল মানুষকে শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবনযাপনে অভ্যস্ত করে অসভ্য মানুষকে সভ্য করার তাগিদে। মানুষের মনে ধর্মীয় বিশ্বাস আর ধর্মের নামে অলৌকিক ভয় ঢুকিয়ে দিয়ে বুঝানোর চেষ্টা করা হয়েছিল জীবনের পরিমিতি বোধ, যা থেকে মানুষ পেতে পারে নিরবচ্ছিন্ন সুখ আর অসীম আত্মার পরিতৃপ্তি। বর্তমান যুগে শিক্ষা মানুষকে সভ্যতার চরম শিখরে পৌঁছে দিয়েছে, যেখানে শুধু মানবতারই ঝাণ্ডা উড়ে। কিন্তু শিক্ষা দীক্ষা জ্ঞান গরিমায় মানুষের মন ও মগজে সুস্থধারার মুক্তচিন্তা চেতনার বিকাশ যতটা না ঘটছে তারচেয়ে বেশী মনকে ধর্মের নামে কালো অন্ধকার থাবা আচ্ছন্ন করে রাখছে। যদিও সব ধর্মেই বলে, এমন কি বড় বড় ঋষি মনিষী্রাও বলেছেন, সব কিছুর উর্ধে হলো মানব ধর্ম। তাহলে এ কেমন ধর্ম যেখানে মানুষে মানুষে হানাহানি, কাটাকাটি, অপবাদ অপমান অপব্যবহারের ডংকা বাজে? এমনই সামাজিক রাষ্ট্রীয় এবং প্রাত্যহিক জীবন যাপনের অনুষঙ্গে ধর্মান্ধের দামামার এক কঠিন বাস্তবতা দেখতে পাই ভজন সরকারের “বিভক্তির সাতকাহন” গ্রন্থে, যেখানে প্রতিটি মূহুর্তে মানবতা লঙ্ঘনের চিত্র ফুটে উঠেছে নির্মমভাবে।

দেশকালপাত্রভেদে ধর্মান্ধতা নির্মম এবং নৃশংসভাবে পদদলিত করছে মানবতাকে। বিশেষত যা শুরু হয়েছিল বিশ শতকে ধর্মের নামে দেশ বিভাগের প্রাক্কাল থেকে। দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে দেশ ছাড়া মানুষগুলো হৃদয়ে রক্তপাতের ফল্গুধারা নিয়ে অন্ধকার চোরাবালিতে আশ্রয় খুঁজে বেড়াচ্ছে আজো। এই বিভাজনের নৃশংসতা বংশ পরম্পরায় প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে আজ অবধি বিদ্যমান। বিভক্তির নামে দেশ এবং ধর্মের এই বিভাজনে প্রগতিশীল চিন্তা চেতনার যেমন হচ্ছে অবলুপ্তি তেমনই মানবতাকে করছে লাঞ্চিত। ভজন সরকার এই ধর্মান্ধতার নির্মমতা অবলোকন করেছেন তার গভীর অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে। যা তার গ্রন্থের প্রতিটি রচনায় পরিলক্ষিত। এই দৃষ্টিভঙ্গীর আলোকে ধর্মীয় সংকীর্ণতা এবং গোঁড়ামির উর্ধে থেকে প্রগতির ঝাণ্ডা তুলে ধরেছেন ভজন সরকার তার “বিভক্তির সাতকাহন” গ্রন্থে।

বৈষম্যমূলক ধর্মচর্চা নাকি অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে তৈরী শ্রেণী বৈষম্য মানুষে মানুষে বিভেদ তৈরী করেছে তার বিশ্লিষ্ট আলোকপাত রয়েছে এই গ্রন্থে। সেটা আজকের আর্থসামাজিকরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ভাবিয়ে তোলে চরমভাবে। যদিও একই ভাষাভাষী, কৃষ্টিসংস্কৃতির বাংলার ইতিহাস এবং ঐতিহ্য বলে, ধর্ম কখনই বাঙালি মিলন ও সামাজিকতায় বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়নি। জাতিধর্মবর্ণ নির্বিশেষে বাঙালি একটি জাতিস্বত্বা। সেই বিশ্বাসে মানবতার পতাকা নিয়ে প্রগতিবাদীরা আজো পথে পা বাড়ায় এগিয়ে যাওয়ার আশ্বাসে। কিন্তু রাজনৈতিক বাতাবরণে চলছে ধর্মের গুণকীর্তন,করছে কলুষিত পরিবেশ, এগিয়ে যাওয়ার পথকে করছে অবরোধ। কারণ ধর্ম কখনো প্রগতির কথা বলে না। তাহলে মানুষের মুক্তি কোথায়? ধর্মে নাকি অর্থনৈতিক মুক্তিতে, নাকি মুক্ত চিন্তা চেতনার জ্ঞানগরিমায় উদ্বুদ্ধ প্রগতির ধারাবাহিকতায়! এমনই অনেক হাজারো প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয় এই গ্রন্থ পাঠকালে। কৌতুহলী মন মানুষের মনষ্কামনাকে জয় করার অভিপ্রায়ে জানার আগ্রহ বেড়ে যায় দ্বিগুন; যার কারণে বিভক্তির সাতকাহনগ্রন্থটি পাঠে মনোনিবেশ করি শুধুমাত্র লেখকের বাস্তব এবং চাক্ষুষ অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হওয়ার জন্যে। এই গ্রন্থটিতে আর্থসামাজিকরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে মানুষে মানুষে বিভেদের বিভিন্নদিক তুলে ধরা হয়েছে। যার কারণে “বিভক্তির সাতকাহন” গ্রন্থটির নামকরণের যথার্থতা খুজে পাওয়া যায়। তৎকালীন বাঙালি সমাজ আর আজকের বাঙালি সমাজের মধ্যে মৌলিক পার্থক্যের রূপরেখাও এঁকে দিয়েছেন লেখক তার দৃঢ় লেখনীর মাধ্যেমে। যেমন দ্বন্দের ত্রিসীমায় অবস্থান করছে বাঙালির অস্তিত্ব, বাঙালিত্বে নাকি মনুষত্বে নাকি ধর্মের বাতাবরণে হবে বাঙালির অস্তিত্ব ! ‘বিভক্তির সাতকাহন’ গ্রন্থটি এমনই তীক্ষ্ণ প্রশ্নের সম্মুখীন করে।

প্রগতিবাদী অসম্প্রদায়িক চিন্তাচেতনার মানুষ কখনই মন্দির মসজিদের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করবে না যতক্ষন না সেখানে মানবতার কোন চিহ্ন পাওয়া যায়। অথচ ভারতের বাবরি মসজিদ আর ঢাকার ঢাকেশ্বরী মন্দির ভাঙ্গনে মানুষের উগ্রতায় দেখা যায় ধর্মের নামে বিভক্তির প্রমাদ! যা দেখে লেখকের মন বিষণ্ণতায় ভরে উঠে। আর তখনই লেখক হারিয়ে যান বটগাছের শীতল ছায়ায় শৈশব জড়ানো স্মৃতির রাজ্যে ; যা আজো লেখককে তাড়িয়ে বেড়ায়,যখন জাতিধর্মবর্ণ নির্বিশেষে সকলের মধ্যে সৌহার্দ সম্প্রীতির এক সুন্দর সেতুবন্ধন ছিল;কি পূজাপার্বনে, কি তা তাজিয়া মিছিলে। গত দু’দশকে কোথায় যে এসব উধাও হয়ে গেলো! স্মৃতির পাতায় আরো একটি নাম নীলিমাদি, পিতা কর্তৃক যাকে বলী দিতে হয়েছিল স্বধর্মের উচুনীচু্র ভেদাভেদে।ধর্মচর্চা বা ধর্ম পালনে অন্যের সমস্যা না থাকলেও, কিছু ধর্মান্ধ মানুষ অন্যের উপর জোরপূর্বক ধর্মের নামে বাইপাস সার্জারী চালাতে সচেষ্ট হয়। ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোন কাজই সমাজ সংসারের জন্যে সুস্থ ফলদায়ক হতে পারে না।

 bivoktir-satkahon-1

সাত সমুদ্র তের নদী পার হয়ে আসা এই পশ্চিমা দেশে, যেখানে রয়েছে সম অধিকারের উদারনীতি, রয়েছে শক্ত মানবতার ঝাণ্ডা; এখানেও লেখক অবলোকন করেছেন বাঙ্গালি মানসিকতার মানুষে মানুষে বিভেদের নানা রঙ। কট্টর প্রগতিবাদীরা কিভাবে এখানে এসে হয়ে গেছে একজন ধর্মান্ধ প্রতিক্রিয়াশীল হিন্দু অথবা মুসলমান। বিভিন্ন ঘরোয়া পূজাপার্বন নিয়ে প্রতিযীগিতামূলক অনুষ্ঠান হচ্ছে এই বিদেশ বিঁভুয়ে, যা হওয়া উচিৎ ঘরের চৌহদ্দিতে,নিজস্ব ধ্যানে নিবিষ্ট চিত্তে পালন; তা না করে, আমন্ত্রিত হিন্দুমুসলমান অতিথীদের মধ্যে হচ্ছে বিভাজন। তেমনটি চলছে তাবলীগ জামাতের ক্ষেত্রেও।তাই ধর্মের প্রতি নমনীয় থেকে পক্ষপাতদুষ্ট সাপম্রদায়িক চিন্তাভাবনার প্রকাশ যতই ঘটুক না কেন, প্রগতিশীল মক্তচিন্তাচেতনার মানুষকে খুঁজে পাওয়া ভার হয়ে দাঁড়ায়। বিদেশে বিভাজনের আরো একটি নির্মম চিত্র তুলে ধরেছেন লেখক, যেমন, “গরুশুয়োর; ইমিগ্র্যান্টরিফিউজি; বিশ্ববিদ্যালয়কলেজ; বুয়েটবিআইটি; হলহোস্টেল; ডিপার্টমেন্টফ্যাকালটি; জেলাউপজেলা ইত্যাদি”। এই বিভাজনের সাতরঙে আমার প্রাণের বাংলাদেশ শতভাগে বিভক্ত। বংশ পরম্পরায় সংস্কৃতি, কৃষ্টির চর্চা পারিবারিক ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা এবং রুচিভেদের কারনেই মূলত গড়ে উঠে এই ব্যবধান।এই বিভাজনের মধ্যে পড়েছে কট্টর সম্প্রদায়িক, কট্টর অসম্প্রদায়িক চিন্তাচেতনার ডামাডোল, আরো পড়েছে কবিতামোদি, কবিতাপ্রেমী, কবিতা ভাবীদের আচরন। দিনে দিনে বাঙ্গালি স্বাতন্ত্রবোধ ঢাকা পড়ে যাচ্ছে ধর্মচর্চার লেবাসে, যারফলে চলনে বলনে নামকরণে পোষাকে আষাকে বাঙ্গালি স্বাতন্ত্রিকতায় এনে দিচ্ছে চরম বিভাজন। যা ভজন সরকারের লেখনীতে ফুটে উঠেছে তীব্রভাবে। সত্যিকারের দেশ প্রেমিক অসম্প্রদায়িক,প্রগতিশীল চিন্তা চেতনার মানুষগুলো বলিষ্ঠ আদর্শ নীতির কারণে ধুঁকে ধুঁকে মার খাচ্ছে আজকের এই ক্ষয়ে যাওয়া সমাজে অর্থপ্রভাবপ্রতিপত্তির কাছে। পেশাদারিত্বের জৌলসেও হচ্ছে বিভাজন, বৃত্তিধর্ম মানুষকে কৃত্রিম করে তোলে যেখানে স্বাধীন চিন্তাচেতনাকে করে ফেলে বৃত্তাবদ্ধ। পেশার প্রতি আনুগত্যে যে কোন বন্ধনকে একপেশে করে তোলে। তাই তো আজ মানুষ একত্রিত হচ্ছে, পেশায়পেশায়; ধর্মেধর্মে; সম্প্রদায়েসম্প্রদায়ে; জাতিতেজাতিতে; জাতীয়তায়জাতীয়তায়, এই গুচ্ছে গুচ্ছে একত্রিত হওয়াও আজ সভ্য সমাজের বিভক্তির আসল বাতাবরণও বটে।

বিভক্তির সাতকাহন” গ্রন্থটি তিন পর্বে বিভক্ত; প্রথম পর্বে লেখক তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা যা তাঁর চাক্ষুষ, এমন সব কাহিনী নিয়ে সমাজের বিভক্তির কাহিনীচিত্র তুলে ধরেছেন; দ্বিতীয় পর্বে পারিপার্শ্বিক অবস্থা থেকে লেখক তাঁর নিজস্ব ভাবনার প্রতিফলন ঘটিয়েছেন, যে ভাবনার উপর প্রভাব ফেলেছেন দেশের প্রথিতযষা অনেক গুরুজন, বিশেষ করে আহমেদ শরীফ, হুমায়ূন আজাদ, শহীদ কাদরি, ডঃ ওয়াহিদুল হক প্রমুখ; তৃতীয় পর্বে সমাজের বৈষম্যমূলক আচরণের ঘটনার উপর বর্ণিত লেখকের স্মৃতিকথা।ধর্মের রং যত গাঢ় হবে, সম্প্রীতির রং তত ফিকে হতে বাধ্যলেখকের এই বক্তব্যের আলোকেই মূলতঃ তার প্রতিটি নিবন্ধ রচিত।

সর্বোপরি চমৎকার শব্দ শৈলীর প্রেক্ষাপনে ভজন সরকার সাবলীল ভাষায় কঠিন বাস্তবতার নিরীখে তুলে আনেন বাঙালি সমাজ রাষ্ট্রের নির্মম চিত্র। যদিও ভজন সরকার একাধারে কবি এবং প্রাবন্ধিকও বটে, তদুপরি মানবিক চিন্তাচেতনায় উদবুদ্ধ হয়ে প্রগতির ঐশী তুলে ধরেছেন ‘বিভক্তির সাতকাহন’ গ্রন্থে তার প্রতিটি নিবন্ধে। যেখানে লেখক হিন্দুর সাথে মুসলমানের, মুসলমানের সাথে ইহুদির বা খ্রীষ্টানের, ধর্মের সাথে বিজ্ঞানের, সংস্কারের সাথে অপসংস্কৃতির, সুরের সাথে অসুরের দ্বন্দে সৃষ্ট সামাজিক বিভেদের ধারা প্রতিহত করার জন্যে বিজ্ঞানের সাথে সাহিত্য দর্শন, ইতিহাসসংস্কৃতি ও সমাজকলার সমসত্ব মিশ্রণ ঘটিয়ে পারিবারিক শিক্ষা এবং মনুষ্যত্বের বুনিয়াদের উপর জোর দিয়েছেন। সেই সাথে মানবতা ও প্রগতির পক্ষে উচ্চকিত করেছেন তাঁর কন্ঠ। এমন নিরীক্ষামূলক সংবেদনশীল আরো লেখা লেখনীর ক্ষুরধারায় মানবতা আর প্রগিতর ঝাণ্ডা নিয়ে উঠে আসুক, লেখকের কাছে সেই কামনা সর্বত। “বিভক্তির সাতকাহন” গ্রন্থটি মুক্তচিন্তা প্রকাশনা থেকে একুশের বই মেলায় প্রকাশিত হয়ে ইতিমধ্যে পাঠক সমাজে বেশ সমাদৃত হয়েছে।।

লেখকঃ কবি ও গল্পকার।

anjumanrosy@ymail.com

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s