ধর্মকে রাজনীতি থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে ফেলার এখনই শ্রেষ্ঠ সময়

Posted: ফেব্রুয়ারি 17, 2013 in দেশ
ট্যাগসমূহ:, , , , , , , , ,

লিখেছেন: মেহেদী হাসান

war-crime-4কোন দুর্বৃত্ত লোক বা গোষ্ঠি যদি তার হাতে ভয়ানক কোন মানবধ্বংসী অস্ত্র নিয়ে সাধারণ মানুষকে হত্যা ও আরো বিভিন্ন ধরনের অপকর্ম করতে করতে এগিয়ে আসতে শুরু করে তাহলে নিশ্চিতভাবেই আমাদের প্রথম কাজটি হবে ঐ দুর্বৃত্ত লোক বা গোষ্ঠীকে পাকড়াও করে তার হাতের ভয়ানক অস্ত্রটি কেড়ে নেয়া এবং তারপরে তাকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোএবং বিচারের মাধ্যমে তার কৃত অপরাধের জন্য উপযুক্ত শাস্তির ব্যাবস্থা করা। ঐ দুর্বৃত্ত লোক বা গোষ্ঠিটির হাত থেকে মানবধ্বংসী অস্ত্রটি কেড়ে না নিয়ে তাকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো খুব বেশী সুবিধাজনক বলে মনে হয় না। কারণ যখন তার বিচারকার্য শুরু হবে এবং বিচারের রায়ে তার উপযুক্ত শাস্তির ব্যাবস্থা করার চেষ্টা করা হবে তখন সে প্রাণপণে নিজেকে বাঁচাতে ঐ ভয়ানক অস্ত্রটির ব্যাবহার শুরু করবেএটা তার জন্য খুবই স্বাভাবিক বিষয়। সাধারণ অবস্থাতেই সে যখন তার হাতের অস্ত্রটিকে যত্রতত্র ব্যাবহার করে নানা ধরনের ক্ষয়ক্ষতি ঘটিয়ে তোলে সে ক্ষেত্রে তার উপর যখন আক্রমণ আসবে সে তখন অস্ত্র হাতে বসে থাকবেএটা কোন সুস্থ চিন্তার বিষয় হতে পারেনা।

৭১ এ আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় কিছু দুর্বৃত্ত ধর্মভিত্তিক রাজনীতির বৈধতার সুযোগে জামাতশিবির নামক ভয়ানক মানবধ্বংসী অস্ত্রটি হাতে তুলে নিয়ে মানবতা বিরোধী অসংখ্য ধরনের যুদ্ধাপরাধ সংগঠিত করে। ঐ সময় তারা কি কি অপরাধ সংগঠিত করেছে তা নতুন করে বলার কোন প্রয়োজন নেইকারণ আমরা সকলেই তাদের অপরাধ এবং অপরাধের ধরন সমন্ধে কমবেশী অবগত। স্বাধীনতার ৪২ বছর কেটে গেছেতাদের হাত থেকে মানবধ্বংসী ভয়ানক অস্ত্রটি যেমন কেড়ে নেয়া সম্ভব হয় নি ঠিক তেমনিভাবে ইতিপূর্বে তাদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোও অনেকটা সুদূর পরাহত থেকে গেছে। যুদ্ধাপরাধীদেরকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো কেন সম্ভব হয়নি? এর পিছনে অনেকেই অনেক ধরনের যুক্তি উপস্থাপন করবেন। কিন্তু আমার কাছে সুস্পষ্টভাবে মনে হয় যেধর্মভিত্তিক রাজনীতির বৈধতার সুবিধায় তাদের হাতে জামাতশিবির নামক ভয়ানক অস্ত্রটি বহাল তবিয়তে সুরক্ষিত অবস্থায় থাকার কারনেই সেটা সম্ভব হয়ে উঠেনি। এমনকি এই কারনে তারা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক সুযোগ সুবিধাও পেয়ে আসছে। এই অস্ত্রটি তাদের হাতে থাকার কারনে একটি ডানপন্থী দলের সাথে জোটবদ্ধ হয়ে এই বাংলার মাটিতে ক্ষমতার মসনদে পর্যন্ত বসেছে। আমরা শুধু তাকিয়ে তাকিয়ে দেখেছি আর দেয়ালে মাথা ঠুকেছি নিরুপায়তাই ছিল আমাদের একমাত্র আশ্রয় আমাদের করার কিছু ছিল না। তারা আমাদের চোখের সামনে দিয়ে সরকারী গাড়িতে বাংলাদেশের পতাকা লাগিয়ে রাজপথ ধরে বীর দম্ভে এগিয়ে গেছে। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিসৌধে তাদের পা রেখে তাকে কলংকিত করতেও তাদের পিছপা হতে দেখা যায় নি। ধর্মীয় মৌলবাদের উত্থান ঘটিয়ে গ্রেনেড ও বোমা হামলার মাধ্যমে আরো অনেক গণহত্যা চালিয়েছে। সেই রক্তের দাগ এখনও বাংলার মাটিতে অনেকটাই কাঁচা। স্বাধীনতার এই ৪২ বছর ধরে প্রগতিশীল শক্তির যেকোন অগ্রযাত্রায় সবসময় তারা প্রধান বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়ে গেছে এই ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক অপশক্তিগুলো। বর্তমানেও তারা ঐ ডানপন্থি দলটির জোটের শরিক হয়ে প্রধান বিরোধীদলের সুবিধা ভোগ করে আসছে। চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদেরকে বাঁচাতে বিভিন্ন সময়ে হরতাল ডেকে বাসে আগুন দিয়ে সাধারন মানুষকে জীবন্ত অগ্নিদগ্ধ করছে, দোকানপাট পুড়িয়ে দিচ্ছে, দেশের অর্থনীতিতে কোটি কোটি টাকার লোকসান ঘটাচ্ছে, জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলছে।

যুদ্ধাপরাধীদের হাতে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির জামাতশিবির নামক ভয়ানক অস্ত্রটি হাতে থাকার কারনেই বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ডানপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো তাদের সাথে জোটবদ্ধ হয়ে ক্ষমতায় যাওয়ার প্রতিযোগীতায় নিজেদেরকে শক্তিশালী করতে চেয়েছে। এধরনের সুযোগ পেয়ে যুদ্ধাপরাধী নামক দুর্বৃত্তগুলো তলে তলে নিজেদের আঁখের খুব ভালোভাবেই গুছিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছে। বিভিন্ন ধরনের প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে বাংলার মাটিতে নিজেদের ভিত্তি খুব শক্ত ভাবেই দাঁড় করিয়েছে। এখানে একটি আশার কথা হলযুদ্ধাপরাধী নামক এই দুর্বৃত্তরা জনসাধারনের মনে কোন দিন স্থান করে নিতে পারে নি। ধর্মের বিভিন্ন ধরনের ধোঁয়া তুলে কিছু কিছু মানুষের মনে ক্ষণকালীন দ্বিধাদন্দ্ব তৈরী করতে সামান্য কিছুটা মাত্রায় সক্ষম হয়েছে কেবল। শাহবাগের প্রজন্ম চত্বর কেন্দ্রিক গড়ে উঠা সারা দেশব্যাপী গণবিপ্লবে জনগণের সেই দ্বিধা বোটা খসা নষ্ট ফলের মতই ঝরে পড়েছে। জামাতশিবিরের রাজনীতি ও ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করার দাবীতে তারা জোট বেঁধেছে, একাত্ম হয়েছেএমনকি তাদের গতিপ্রক্রিয়া দেখে মনে হচ্ছে তারা এটা প্রতিরোধ করতে মরণপণ সংগ্রামে নামতেও পিছপা হবেনা। কেউ কেউ অবশ্য ক্ষীণ স্বরে বলতে শুরু করেছেন জামাতশিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ করাই যথেষ্টধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করা এই মূহুর্তে দরকার নেইএতে হিতে বিপরীত হওয়ার সম্ভাবনা আছে। আমি তাদের এই বক্তব্যের সাথে কোনমতেই একমত পোষণ করতে পারছিনা। কারণ শুধুমাত্র যদি জামাতশিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয় তাহলে তারা দলের নাম পাল্টে ফেলে আবার রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে উঠে তাদের অপকর্মগুলো করতে শুরু করে দেবেএক্ষেত্রে তাদের ভোল পাল্টানোরও কোন দরকার হবেনা। কারণ তাদের ভোলটি হচ্ছে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি, তার বৈধতাতো শুধুমাত্র জামাতশিবিরের রাজনীতি বন্ধ করার কারনে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে না। যারা এই মুহূর্তে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধের বিরুদ্ধে দাঁড়ায় তাদের যুক্তি গুলো আর ধোপে টেকে না। কারণ তারা বলার চেষ্টা করে বাংলার মানুষ ধর্মপ্রাণ ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করলে ধর্মপ্রাণ মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগতে পারে। এই বিষয়টিকে ইদানিং আমার সত্য বলে মনে হয় নাকারণ শাহবাগের প্রজন্ম চত্বর কেন্দ্রিক শুরু হওয়া সারাদেশব্যাপী গণ বিপ্লবে লাখ লাখ ধর্মপ্রাণ ব্যাক্তি ধর্মভিত্তিক রাজনীতি বন্ধের দাবীতে সোচ্চার হচ্ছে। এই কথায় কারো সন্দেহ থাকলে শাহবাগে গিয়ে আমার কথার সত্যতা জেনে আসতে পারেন।

আরেকটি বিষয় হলধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করলে যদি আসলে কিছু মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানাও হয় তাতে করে তেমন কিছু ক্ষতি বৃদ্ধি হয় না। দেশ থেকে শকুনীদের দূর করতে এবং মানুষকে গণহত্যার হাত থেকে বাঁচাতে প্রয়োজনে সামান্য কিছু মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করা যেতেই পারেধর্মীয় অনুভূতিতে সামান্য আঘাতের কারনে কেউ নিশ্চিত ভাবে মারা যায় না কিন্তু ধর্মভিত্তিক রাজনীতির সুযোগে এই দুর্বৃত্তরা গণহত্যা ঠিকই চালায়তাদের এই গণহত্যার কবল থেকে ধর্মপ্রাণ ব্যাক্তিও রেহাই পায় না। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ও তার পরবর্তীতে অনেক ধর্মপ্রাণ ব্যাক্তিও ধর্মভিত্তিক মৌলবাদী রাজনীতির গণহত্যার শিকার হয়েছেন।

বাংলার জনগণ যখন যুদ্ধাপরাধী, ধর্মীয় মৌলবাদী শক্তির বিরুদ্ধে তার সর্বোচ্চ সচেতনতা ও শক্তি নিয়ে জেগে উঠেছে তখন যুদ্ধাপরাধীদের প্রেতাত্মারা জামাতশিবির নামক ভয়ানক অস্ত্রটি হাতে নিয়ে তাদের প্রতিক্রিয়া দেখানো শুরু করেছে। আক্ষরিক অর্থেই তারা গুলি চালাচ্ছে, গাড়িদোকানপাটে আগুন দিচ্ছে, নানা ধরনের ভাংচুর চালাচ্ছে। জনগণ যত বেশী মাত্রায় জেগে উঠতে শুরু করবেতাদের প্রতিক্রিয়া দেখানোর মাত্রাও সেই পরিমানে বেড়ে উঠবে বলেই আমার ধারনা। অনেক পূর্বেই ধর্মভিত্তিক রাজনীতি বন্ধ ও রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহারের উপর নিষধাজ্ঞার মাধ্যমে যদি তাদের হাতে বেড়ে উঠা জামাতশিবির নামক মানবধ্বংসী অস্ত্রটি যদি কেড়ে নেয়া হত তাহলে তারা আজকে এই সুযোগ পেত না। তাদের জুজুর ভয়ে আমাদের বিচারপতিরাও গণহত্যার মত অপরাধ সংগঠিত করার অপরাধে কাউকে ফাঁসির হুকুম না দিয়ে, ১৪ বছরের কারাদন্ড দিতে পারতেন না। বিচারপতিগণ এতে করে অবশ্য তাদের উপর জনগণের আস্থার উপরে মারাত্বকভাবে অসন্মান দেখিয়েছেন।

শুধুমাত্র ধর্মভিত্তিক রাজনীতি বন্ধ করার মধ্য দিয়েই তাদের প্রতিরোধ করা সম্ভবপর হয়ে উঠবেনা। ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ হওয়ার ফলে হয়তো তাদের সুনির্দিষ্ট দলটি ভেঙ্গে যাবে কিন্তু তাদের অপকর্ম করার সুযোগ খুব বেশী ব্যাহত হবেনা। তারা বিভিন্ন ডানপন্থী রাজনৈতিক দলের মধ্যে ছদ্মবেশে ঢুকে পড়ে সেখানে আরো বেশী মাত্রায় ধর্মের ব্যাবহার শুরু করে দিবে। ঐ নির্দিষ্ট ডানপন্থি দল থেকে তারা কোন ধরনের বাঁধা পাওয়া তো দূরের কথা তাদের অনেক বেশী উৎসাহিত করা হবে কারণ প্রত্যেকটি ডানপন্থী দলই রাজনীতিতে ধর্মের ব্যাবহার করে ক্ষমতায় আসতে খুব বেশী পছন্দ করে। রাজনীতিতে ধর্মের ব্যাবহারে অনেক বেশী পারদর্শিতার ফলে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ছদ্মবেশী জামাতীরা ডানপন্থী দলগুলোর নেতৃত্বের আসনে প্রতিষ্ঠিত হবে। বড় বড় মন্ত্রিত্ব নিয়ে ক্ষমতায় এসে বিষবাষ্প ছড়াতে শুরু করবে। যুদ্ধাপরাধী ও তাদের প্রেতাত্মাদের থেকে দেশ ও দেশের মানুষকে রক্ষাকল্পে ধর্মকে রাজনীতি থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে ফেলা ছাড়া গতন্তর নেই। এই বিষয়ে জনগণকেও আরো বেশী সচেতন করে তুলতে হবে। রাজনৈতিক প্রজ্ঞা সম্পন্ন শিক্ষিত তরুনরা এই বিষয়ে জনগণকে সচেতন করার কাজে এগিয়ে আসবে বলেই আমার ধারনা।

এই দুর্বৃত্তদের বাংলার মাটি থেকে নিশ্চিহ্ন করতে হলে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে হবে তা হলতাদের অর্থনৈতিক, চিকিৎসা সেবা মূলক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো এবং নানা ধরনের কুৎসা ও অপপ্রচার ছড়ানোর কাজে ব্যাবহৃত ইলেকট্রনিক, প্রিন্ট ও ভার্চুয়াল মাধ্যমগুলোকে বাজেয়াপ্ত করা। এগুলোকে পরবর্তীতে জাতীয়করনের মাধ্যমে জনগণের কাজে লাগানোও সম্ভব।

স্বাধীনতার ৪২ বছরের মধ্যে জনগণ যুদ্ধাপরাধীদের প্রতিহত করতে এমনভাবে আর জেগে উঠেনি। জনগণের পিঠ এবার দেয়ালে ঠেকে গেছে এবার তারা সম্মুখ সমরে নামতেও প্রস্তুত। জনগণের মনে যুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছে ভীষণ রবে। এই বারে তাদের শিকড় সহ উপড়ে ফেলতে হবে, অনেক বছর যাবত আমরা এই যুদ্ধ করে এসেছি আর নয় এই বারে তাদের উপর মরণ কামড় হানতে হবে। এই মুহুর্তে ধর্মকে পুরোপুরি রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে না পারলে সামনে আমাদের জন্য ভয়াবহ বিপদ অপেক্ষা করে আছে।।

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s