লিখেছেন: আবু তাহের মোল্লা

tea-worker-1-লক্ষ্মী নুনিয়া একজন স্থায়ী চা শ্রমিক। সিলেট টি কোং লিমিটেডের নিয়ন্ত্রণাধীন মৌলভীবাজার জেলার রাজনগর চা বাগানে তিনি কর্মরত ছিলেন। ৭ বছরের শিশু সন্তানের মাতা স্বামী পরিত্যক্তা সহজ সরল যুবতী লক্ষ্মী নুনিয়া বেঁচে থাকার সংগ্রামে বাবার ঘরে আশ্রিত হয়ে শুরু করেন তার কর্মজীবন। প্রায় ৫ বছর পূর্বে তিনি স্থায়ী শ্রমিক হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। তার ভবিষ্যত তহবিল নং ১১৪৮। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী স্থায়ী হওয়ার ১ বছরের মধ্যে তার বাসগৃহ পাওয়ার কথা। কিন্তু একে একে পাঁচটি বছর চলে গেলেও তার কপালে বাসগৃহ জোটেনি। ৭ বছরের শিশু সন্তানকে নিয়ে অনেক লাঞ্ছনা সহ্য করে তাকে পিতৃগৃহে থেকে কাজ চালিয়ে যেতে হয়েছে। কর্তৃপক্ষ বরাবর বাসগৃহ নির্মাণের জন্য লিখিতভাবে ও মৌখিকভাবে বহুবার আবেদন নিবেদন করেছেন কিন্তু কোন ফল পাননি। এ অবস্থায় গত ৩১ আগস্ট ’২০১২ইং তারিখে তিনি শিশু সন্তানকে সাথে নিয়ে বাগানের ম্যানেজারের কার্যালয়ে গিয়ে বাসগৃহ নির্মাণ করে দেবার জন্য অনুরোধ করেন। কিন্তু ম্যানেজার তাতে উত্তেজিত হয়ে বলেন বহুত শিয়ানা মহিলা এর পিছনে অন্য কেউ আছে।’ এরপর তাকে অফিস থেকে বের করে দেয়া হয়। পরদিন বাগান ম্যানেজার স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে তাকে চাকুরীচ্যুতি (Termination)করা হয়েছে মর্মে অবগত করা হয়। চাকুরীচ্যুতির আদেশ হাতে নিয়ে তিনি হতভম্ব হয়ে পড়েন। চাকুরীচ্যুতির আদেশপত্রে ম্যানেজার কোন কারণ উল্লেখ করেননি, শ্রমিক যাতে আইনের আশ্রয় নিতে না পারেন।

চাকুরী ফিরে পাবার জন্য লক্ষ্মী নুনিয়া কর্তৃপক্ষ বরাবর বাংলাদেশ শ্রম আইনের ৩৩() ধারা অনুযায়ী অনুযোগপত্র প্রেরণ করেন। অনুযোগপত্রে তিনি উল্লেখ করেন আমার উপর অর্পিত দায়িত্ব ন্যায়, নিষ্ঠা, সততা, দতা ও বিশ্বস্ততার সঙ্গে পালন করে আসছি। আমার কর্মময় জীবনে কোন ধরণের অভিযোগ আপনার দপ্তরে লিপিবদ্ধ নাই। আমার সার্ভিস রেকর্ড অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন। আমি কখনও কর্তৃপরে অবাধ্য হই নাই। চাকুরী স্থায়ী হওয়ার পর হইতে অদ্যাবধি আমাকে কোন বাসগৃহ দেয়া হয় নাই এজন্য আমি বার বার আপনার শরণাপন্ন হলে আপনি আমাকে ০৩ (তিন) বান্ডিল টিন দেয়া ছাড়া আর কোন পদক্ষেপ নেন নাই। বাসগৃহ নির্মাণের দাবি জানিয়ে আমি গত ৩১ আগষ্ট ’২০১২ইং তারিখে আপনার দপ্তরে গেলে আপনি ক্ষিপ্ত হয়ে আমাকে চাকুরীচ্যুত করেন।” এই অনুযোগপত্র পেয়ে কর্তৃপক্ষ ব্যক্তিগত শুনানীতে হাজির হওয়ার জন্য একটি নোটিশ প্রদান করেন। বিগত ২৬ সেপ্টেম্বর ’২০১২ইং তারিখে ব্যক্তিগত শুনানীতে হাজির হয়ে লক্ষ্মী নুনিয়া তার বক্তব্য প্রদান করেন, কর্তৃপক্ষ তাতে সন্তুষ্ট না হয়ে তার চাকুরীচ্যুতির আদেশ বহাল রেখেছেন মর্মে তাকে পুনরায় অবগত করেন।

১৯৬২ সালে চা বাগান শ্রমিক অধ্যাদেশ জারী করা হয়েছে, বাংলাদেশ সরকার কিছু সংশোধনসহ এই আইন চালু রেখেছে। ১৯৭৭ সালে এই আইনের অধীনে চা বাগান শ্রমিক বিধিমালা জারির ৩৫ বছর হয়ে গেছে। কিন্তু চা শ্রমিকদের বাসগৃহের সমস্যা সমাধান দূরের কথা, তা আরো প্রকট হচ্ছে। মালিকপক্ষ মুনাফার লোভে বহুবিধ ব্যয় বরাদ্দ কমিয়ে দিয়েছে।

১৯৬২ সালের আইনের ১৫ ধারায় বলা হয়েছে প্রত্যেক মালিকের দায়িত্ব হবে চা বাগানে অবস্থানরত প্রতিটি শ্রমিক ও তার পরিবারের বসবাসের জন্য নির্ধারিত পদ্ধতিতে গৃহ নির্মাণের সুযোগসুবিধা প্রদান করা।” এই আইন সংক্রান্ত বিধিমালার ২১ ধারায় শ্রমিকদের আবাসিক ব্যবস্থার বিধান রাখা হয়েছে। বছরে শতকরা ১০ ভাগ হিসাবে গৃহ নির্মাণ করার বিধান রাখা হয়েছে। বিধিমালার বিধানমতে ৩৪০ বর্গফুট পুতার উপর ‘মাটিঙ্গাটাইপ’ ঘর তৈরীর কথা থাকলেও এই বিধান লংঘন করা হয়েছে। এরূপ প্রতিটি বাসগৃহে স্যানিটারী ল্যাট্রিন ও প্রস্রাবখানা তৈরী করে দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। কিন্তু চা বাগানে মালিকরা তো আইন মানেনা। আর শিক্ষার আলো হতে বঞ্চিত চা শ্রমিকরা আইন জানেন না। যারা কিছু কিছু বুঝে তারা মালিকের পকেটে আছে। আর দালাল ইউনিয়ন নেতারা লক্ষ লক্ষ টাকা বখরা হাতিয়ে নেয়।

রাজনগর চা বাগানে স্থায়ী অস্থায়ী শ্রমিক আছে প্রায় দেড় হাজার। এর মধ্যে ৮৬৭ জন স্থায়ী শ্রমিক। প্রতি বছর দশভাগ ঘর নির্মাণ করলে গত ৩৫ বছরে দুই হাজার ঘর নির্মাণ সম্পন্ন হবার কথা। কিন্তু সূত্রমতে শ্রমিকদের চাষ করার জমির বিনিময়ে ঘর দেয়া হয়। অর্থাৎ, চাষের জমি কর্তৃপক্ষ বরাবর ফেরত দিলে তাকে একটি ঘর দেয়া হয়। অথচ একজন স্থায়ী শ্রমিকের এমনিতেই ঘর পাওয়ার কথা আর আইন অনুযায়ী একে একে সবারই ঘর পাওয়ার অধিকার রয়েছে। রাজনগর চা বাগানে এভাবে শ্রমিকদের বঞ্চিত রেখে শোষণের স্টীম রোলার চালানো হচ্ছে। আর ঘর বানিয়ে না দিয়ে কেবল কয়েক বান্ডিল টিন দেয়া হচ্ছে।

শ্রমিক জননেতা মফিজ আলী লিখেছেন – “আইনের বিধানমতে বাসগৃহ তৈরি করে দেওয়ার প্রশ্নটাই বড় প্রশ্ন। আর চালু করা বেআইনী ধরণের বাজে ঘরগুলো মেরামত করার প্রশ্নটা আইনত অচল। মালিকপক্ষ মূল প্রশ্নটাকে আড়াল করে চালু ঘরগুলো মেরামত করার প্রশ্নটাকে সামনে রাখে। অথচ মেরামতের কাজটাও ঠিকমতো করে না। প্রতিবছর শ্রমিকদের বাসগৃহ মেরামতের প্রশ্নে প্রতিটি বাগানে গোলযোগ দেখা দেয়। পৌষ মাস থেকে চৈত্র মাস পর্যন্ত চার মাস শ্রমিকদের ঘর মেরামত করার নির্ধারিত সময়। কিন্তু এই সময়ের মধ্যে মেরামতের কাজ শুরু হয় না। বৃষ্টি নামলেই শ্রমিকদের মধ্যে হাউমাউ শুরু হয়। তখন কিছু ছনের সাথে জাবড়া ও নেপিয়ার ঘাস মিশ্রিত করে শুরু হয় ঘরছানির কাজ।”

আইনের ম্যান্ডেটরী বিধান লংঘনের আরও নজির রয়েছে। আইন প্রণয়নের ৫০ বছরেও শ্রমিকদের আবাসিক ব্যবস্থার সুরাহা হলো না। অথচ বিধিমালার ২১ ধারার () উপধারায় যে বিধান রাখা হয়েছে তাতে বলা হয়েছে, শ্রমিকদের আবাসিক ব্যবস্থার জন্য গৃহ নির্মাণ কার্যের অগ্রগতি সম্বলিত রিটার্ন প্রধান পরিদর্শকের কাছে দাখিল করতে হবে।” ১৯৭৭ সালের বিধিমালা প্রকাশের ৬ মাসের মধ্যে গৃহ সংস্থানের পরিকল্পনা প্রধান পরিদর্শকের কাছে দাখিল করার নির্দেশ দেয়া আছে। এতে কতদিনের মধ্যে গৃহ সংস্থানের ব্যবস্থা করা হবে তার উল্লেখ থাকার কথা। কিন্তু ৩৫ বছরের মধ্যে বিপুল সংখ্যক শ্রমিকের গৃহ সংস্থানের ব্যবস্থা না হওয়ায় সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে চা বাগান মালিকেরা আইন লংঘন করেছে। ১৯৮৩৮৪ সালে ‘ক্যাথলিক কমিশন ফর জাস্টিস এন্ড পিস’ অনুমান করে পাকাঘর রয়েছে যে সকল শ্রমিকের, তাদের হার দশ ভাগেরও নীচে। অথচ ১৯৭৭ সালের আইন বাস্তবায়ন হলে এতদিনে সকল শ্রমিকের বাসগৃহ পাকা হয়ে যেত।

ডান জোন্স নিজের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেছেন, ১৯৮৪ সালে আমি ফিনলে কোম্পানীর বাগানগুলোর কয়েকটি লেবার লাইন পরিদর্শন করি। আমার দেখা পাকা ঘরগুলো ছিল খুব সুন্দর। সেগুলো ছিল বাগানের উর্ধ্বতন ব্যবস্থাপকদের। লাইনে আপনি গরুর ডাক ও শুকরছানার গন্ধ পাবেন। চা সংগ্রাহকেরা আমাকে তাদের ছোট মাটির কুঁড়ে ঘরে আমন্ত্রণ জানাল। সেগুলো বাইরের দিকে পরিচ্ছন্নভাবে চুনকাম করা ছিল এবং ভিতর ছিল নিখুঁতভাবে পরিচ্ছন্ন। কোন কোন শ্রমিক চুনকামের উপর সহজ অলংকরণ করেছিল এবং ফুল, পাখি ও গাছের ছবি মলিন রংয়ে এঁকেছিল অথবা দেওয়ালের কাঁদা দিয়ে গাছ ও জঙ্গলের নমুনা গড়েছিল প্রায় ৮ফুট/৮ফুট আয়তনের ১ কক্ষ বিশিষ্ট ঐ সকল কুঁড়ে ঘরে একের অধিক দরজা ছিল না।”

এ সম্পর্কে রসময় মোহান্ত লিখেছেন, এ সকল ঘরের মেঝে ছিল মাটির, কোন জানালা ছিল না, পৃথক পাকঘরও ছিলনা। পরিবারের সকল সদস্য গাদাগাদি করে বাস করতো, ঘুমাতো, রান্না করতো এবং আহার করতো। মেঝের উপর বস্তা সাজিয়ে তারা বিছানা তৈরী করতো।” এভাবেই মানবেতর জীবন যাপন করে চা শ্রমিকেরা চা শিল্পকে বিকশিত করেছেন।

রাজনগর চা বাগানের মালিক হচ্ছেন কথিত দানবীর রাগীব আলী, সম্প্রতি তিনি সিলেটে মুক্তিযোদ্ধাদের নামে গৃহ নির্মাণ করে দান খয়রাত করেছেন। কিন্তু যারা রক্ত ঘামে তাকে সম্পদের পাহাড় গড়ে দিয়েছেন সেই লক্ষ্মী নুনিয়ারা বাসগৃহের দাবি করায় চাকুরীচ্যুত হয়েছেন। লক্ষ্মী নুনিয়াকে চাকুরীতে পুনর্বহালে চা শ্রমিক ইউনিয়নের নেতারা কোন ভূমিকা রাখেনি। কারণ মালিক শ্রেণীর দালালী করা এদের রাজনৈতিক দর্শন। লক্ষ লক্ষ চা শ্রমিক এই দালালদের খপ্পরে পড়ে ঘুরপাক খাচ্ছেন।

বাংলাদেশে শ্রম ও শিল্প সম্পর্কিত অনেক আইন ও অধ্যাদেশ আছে, কিন্তু শ্রমিকদের বেলায় এর কোন কার্যকারিতা নেই। আইন বাস্তবায়ন হচ্ছে কিনা তা দেখার জন্য কর্মকর্তা আছেন, কিন্তু এরা মালিকদের কাছ থেকে মাসোয়ারা আদায়ে ব্যস্ত। আবার এই আইন প্রয়োগ করে মালিকরা যাতে তাদের মনের খায়েস মেটাতে পারে তারও ব্যবস্থা রয়েছে। এই যেমন লক্ষ্মী নুনিয়াকে টার্মিনেট করে দিতে পারলো কোন অভাব অভিযোগ গ্রাহ্য না করেই। স্বৈরাচারী রাষ্ট্রের স্বেচ্ছাচারী আইন। লক্ষ্মী নুনিয়ার মতো হাজারো চা শ্রমিকের বাসগৃহের সমস্যা রয়েছে, রয়েছে শ্রম আইনের সুযোগ সুবিধা হতে বঞ্চিত থাকার যন্ত্রনা। বাসস্থান ৫টি মৌলিক অধিকারের মধ্যে অন্যতম। এছাড়া অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা ও চিকিৎসা নিশ্চয়তা চা শ্রমিকসহ আপামর শ্রমিক জনগণের পক্ষে প্রচলিত আর্থসামাজিক ব্যবস্থা, তথা আধা সামন্ততান্ত্রিক নয়া উপনিবেশিক ব্যবস্থা বহাল রেখে অর্জন করা কোনদিনই সম্ভব নয়। কাজেই বাড়ি ঘরের নিশ্চয়তা, ভাত কাপড়ের ব্যবস্থা চাইলে, শিক্ষাচিকিৎসা চাইলে, সর্বোপরি স্বাধীন হতে চাইলে একটাই পথ খোলা আছে, আর তা হচ্ছে শ্রমিক কৃষকের মিলিত চেষ্টায় প্রচলিত আর্থসামাজিক ব্যবস্থার উচ্ছেদ সাধন করে শ্রমিক কৃষকের গণতান্ত্রিক একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠা। এই শিক্ষায় লক্ষ্মী নুনিয়াদের শিক্ষিত করতে হবে।।

(সূত্রঃ সাপ্তাহিক সেবা, ২০ জানুয়ারী ২০১৩ রোববার, ৩২ বর্ষ, ০৬ সংখ্যা)

আন্তরিক কৃতজ্ঞতা: এস আর সজীব

weekly-seba-1-

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s