লিখেছেন: আবিদুল ইসলাম

khaleda-zia-4-বর্তমান আওয়ামী লীগনেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার গণতান্ত্রিকভাবে দেশ চালাচ্ছে একথা বর্তমানে তাদের অন্ধ সমর্থক ছাড়া আর কেউই বলবেন না। বিগত কয়েক বছরের মানবাধিকার পরিস্থিতি, সন্ত্রাসনির্যাতনধর্ষণগুমখুন, জনগণের অর্থ লোপাট, নিরাপত্তাহীনতা, নৈরাজ্য থেকে শুরু করে প্রতিটি ক্ষেত্রেই দুঃশাসন নতুন মাত্রা অর্জন করেছে। এর বিরুদ্ধে খুব কার্যকরভাবে না হলেও জনগণের ক্ষোভ বৃদ্ধি পাচ্ছে। জনসাধারণ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে একত্র হয়ে এসবের প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। এমনকি সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক ব্যানার থেকেও বর্তমানে চলমান যাবতীয় অনাচারঅত্যাচার থেকে রেহাই পাওয়ার দাবি জানিয়ে সমাবেশমিছিলঅনশনমানববন্ধন ইত্যাদি করা হচ্ছে। এসব দাবি ও দাবি প্রকাশের ধরন ইত্যাদির কার্যকারিতা নিয়ে অনেক রকম প্রশ্ন ও বিতর্ক তোলা যেতে পারে। কিন্তু এসব যে হচ্ছে তার মধ্যে দিয়েই আন্দাজ পাওয়া যায় বর্তমান সরকারের অধীনে দেশ কতোটা ‘ভালোভাবে’ চলছে। নিজেদের গণবিরোধী শাসনসৃষ্ট প্রতিক্রিয়ায় সরকার নিজেই এখন দিশেহারা। নিজেদের অপশাসনদুঃশাসন তাদের চারিদিকে যে চোরাবালির বলয় তৈরি করেছে তাতে তাদের স্বখাতসলিলে ডুবে মরার মতো অবস্থা। এজন্য যুদ্ধাপরাধীদের বিচারপ্রক্রিয়া ছাড়া বলতে গেলে তাদের হাতে এই মূহুর্তে আর তেমন কিছুই নেই। এ কারণেই এ ইস্যুটিকে তারা বারবার সামনে আনতে চাইছে, এবং বিরোধী মতের অন্যান্য সংগঠনের যেকোনো সরকারবিরোধী সমালোচনা ও আন্দোলন প্রচেষ্টাকেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারপ্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করার ষড়যন্ত্র হিসেবে আখ্যায়িত করে বিষয়গুলো ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করছে।

যেকোনো দেশে বিদ্যমান সরকারের অপব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে যে আন্দোলনসংগ্রাম সংগঠিত হবে, অনেকরকম দাবিদাওয়া উত্থাপিত হবে এটা অত্যন্ত স্বাভাবিক বিষয়। এই আন্দোলন অথবা দাবিদাওয়া যেমন সরকারে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের সাথে অভিন্ন শ্রেণীচেতনাসম্পন্ন দক্ষিণপন্থী প্রতিক্রিয়াশীল বিরোধী দল থেকে আসতে পারে, তেমনি জনগণের স্বার্থের প্রকৃত প্রতিনিধিত্বকারী অন্যান্য রাজনৈতিক দল, এমনকি অরাজনৈতিক ও পেশাজীবী বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকেও হতে পারে। সংগঠনের চরিত্র অনুযায়ী তাদের দাবিদাওয়া ও আন্দোলনসংগ্রামের চরিত্রও ভিন্ন ভিন্ন হবে। যারা নিজেদের বিপ্লবী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে দাবি করেন, যারা মনে করেন বিদ্যমান ব্যবস্থার মধ্যে কোনোপ্রকার সংস্কার সাধন করে অথবা ছোটখাটো জোড়াতালি মার্কা কাটছাঁট করে অবস্থার কোনো গুণগত পরিবর্তন সম্ভব নয় তারা বর্তমান রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে দাঁড়াবেন এবং বিদ্যমান পরিস্থিতির সমূল উৎখাত সাধনের মাধ্যমে সম্পূর্ণ নতুন ব্যবস্থা প্রবর্তনের মধ্য দিয়েই যে জনজীবনে প্রকৃত পরিবর্তন আনতে হবেএ বক্তব্য উপস্থাপন করবেন, সেই লক্ষ্যে আন্দোলন সংগঠিত করার চেষ্টা করবেন। আবার যাদের প্রকৃত কোনো রাজনৈতিক জ্ঞানই নেই, সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম থেকে বিশেষ কোনো একটা ইস্যুতে কিছুটা প্রতিবাদ করার চেষ্টা করছেন, তারা তাদের সমাবেশ থেকে সরকারের অনেক গুণগান করে বিশেষ ঐ ইস্যুটির প্রতি তার দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করবেন এবং সরকার যাতে সদয় হয়ে এ বিষয়ে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করে সেজন্য সানুনয় আবেদননিবেদন করে বাড়ি ফিরে যাবেন। আবার যেসব রাজনৈতিক সংগঠন বিদ্যমান সরকারি দলের ন্যায় অভিন্ন শ্রেণীচরিত্রসম্পন্ন দক্ষিণপন্থী দল তারাও নিজেদের চিন্তাচেতনার পরিধির মধ্যেই সরকারের সমালোচনা করবেন, সেভাবেই জনগণকে সরকারের বিরুদ্ধে পরিচালিত করার চেষ্টা করবেন।

বাংলাদেশে এখন ক্ষমতাসীন মহাজোটের প্রধানতম সংগঠন আওয়ামী লীগের অবস্থা সবদিক থেকে যতোটা গণবিরোধী হয়েছে, বিপরীত অবস্থানে থাকা প্রধান বিরোধী দল বিএনপির অবস্থা তার চাইতে কোনোদিক থেকেই কম নয় (অন্যান্য ছোটখাটো প্রতিক্রিয়াশীলদের অবস্থাও কমবেশি একই হলেও বর্তমান আলোচনায় আপাতত তাদের বাদ রাখা যেতে পারে।) তাদের বিভিন্ন তৎপরতা, কথাবার্তা, আচারআচরণ, ইস্যুনির্ধারণ, আন্দোলনসংগ্রাম পরিচালনার ধরন ইত্যাদি সমস্ত কিছু থেকেই একথা বিনাদ্বিধায় বলা যায়। তবে সাম্প্রতিক এর নিকৃষ্টতম দৃষ্টান্ত হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক ওয়াশিংটন টাইমস পত্রিকায় প্রধান বিরোধী দলীয় নেত্রী খালেদা জিয়ার নামে প্রকাশিত “‍ZIA: The thankless role in saving democracy in Bangladesh: Corruption and stealing threaten a once-vibrant nation” শীর্ষক নিবন্ধ।

খালেদা জিয়ার শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে অনেকরকম রসাত্মক ও ব্যক্তি আক্রমণমূলক কুরুচিপূর্ণ কথাবার্তা বাজারে প্রচলিত আছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের সমর্থক ও তাদের দ্বারা প্রশ্রয়প্রাপ্ত ব্যক্তিরাই এসব বক্তব্য বিস্তারের প্রধান কারিগর। যেসব কথাবার্তা প্রচারণার সময় বলা হয়ে থাকে তা অত্যন্ত নিম্নরুচির পরিচায়ক হওয়ায় কোনো রুচিসম্পন্ন ব্যক্তিই সেগুলো নিয়ে মাথা ঘামানোর প্রয়োজন বোধ করেন না। কিন্তু সেগুলো যেমনই হোক না কেন, তার মধ্যে সত্যতা কিছু থাকতেই পারে এবং এ বিষয়টি বিবেচনায় নিলে ইংরেজি ভাষায় এভাবে একটি নিবন্ধ লেখার যোগ্যতা যে তার হবে না সেটাও নিঃসংশয়ে বলা যায়। কিন্তু তিনি নিজে এটা না লিখলেও তারই ক্রোড়াশ্রিত কোনো তথাকথিত বুদ্ধিজীবী তা লিখে দিয়েছেন এবং খালেদা জিয়ার অনুমোদন এখানে রয়েছে। শুধু অনুমোদন নয়, তার নির্দেশেই নিবন্ধটি লেখা হয়েছে এটা ধরে নেয়াই অধিক যুক্তিসঙ্গত। সুতরাং নিবন্ধটি খালেদা জিয়ার রচিত মর্মে বিবেচনা করেই আমাদের আলোচনা এগিয়ে নিতে হবে।

ঐ নিবন্ধের মোদ্দা কথা হলো, বর্তমান সরকার অগণতান্ত্রিকভাবে দেশ শাসন করছে, বিরোধী দলের ওপর নির্যাতননিপীড়ন চালাচ্ছে, গরীবের ‘ত্রাতা’ সর্বজনাব ড. মুহাম্মদ ইউনুসকে গ্রামীন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদ থেকে অপসারণ করেছে, যুদ্ধাপরাধী বিচারের নামে বিরোধী দলীয় নেতাদের আটক রেখেছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা উচ্ছেদের মাধ্যমে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন পরিচালনার ব্যবস্থা করে আগামী জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমেও ক্ষমতায় আসার জন্য ষড়যন্ত্র করছে, অতএব বর্তমান ‘গণতান্ত্রিক বিশ্বের নেতৃত্বদানকারী’ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে এসব বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে এবং সরকারকে হুমকি প্রদান করে বাংলাদেশের ‘গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার পথকে পরিষ্কার’ করতে হবে।

পুরো নিবন্ধটিই এতোটাই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের কুৎসিত দালালিতে ভরপুর এবং এর প্রতিক্রিয়াশীল, গণবিরোধী চরিত্র এতোটাই স্পষ্ট যে এ নিয়ে কোনো আলোচনা করতে যাওয়াও খুবই বিড়ম্বনার ব্যাপার। কিন্তু বিড়ম্বনার হলেও সেটা বাধ্য হয়েই করতে হয় কেননা এর মধ্যে দিয়ে শাসক শ্রেণীর অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপির গণবিরোধী ও সাম্রাজ্যবাদের দালালসুলভ চরিত্র অত্যন্ত উৎকটভাবে প্রকাশিত হয়। এর আরেকটি দিক হলো, যেসব অভিযোগের আঙুল তিনি শেখ হাসিনা ও তার সরকারের বিরুদ্ধে উত্তোলন করেছেন তার অধিকাংশই তার নিজের ও তার নেতৃত্বাধীন বিগত সরকারের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

নিবন্ধটির শুরুর দিকেই বলা হয়েছে: “… in the past year, relations have been strained to the point where the United States may be accused of standing idle while democracy in Bangladesh is undermined and its economic allegiance shifts toward other growing world powers.” অর্থাৎ, বিগত বছরে পারস্পরিক সম্পর্ক এমনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যখন কিনা বাংলাদেশের গণতন্ত্র বিনষ্ট হচ্ছে এবং তার অর্থনৈতিক সংলগ্নতা অন্যান্য ক্রমবর্ধমান বিশ্বশক্তির দিকে ধাবিত হচ্ছে এমন অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রকে নিষ্ক্রিয়তার দায়ে দোষী সাব্যস্ত যেতে পারে। এখানে খুব সম্ভবত রাশিয়ার সাথে বর্তমান হাসিনা সরকারের সাম্প্রতিক পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও অস্ত্র ক্রয়সংক্রান্ত বার হাজার কোটি টাকার ঋণচুক্তির প্রতি ইঙ্গিত করে বোঝানো হয়েছে যে বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যিক এবং অর্থনৈতিক সম্পর্কের ভারসাম্য এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরিবর্তে রাশিয়ার ওপর নির্ভরশীল হচ্ছে।

বিগত শতকের নব্বইয়ের দশকেই সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেঙে পড়া এবং শীতল যুদ্ধের কার্যত অবসানের মধ্য দিয়ে দ্বিমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা সম্পূর্ণ অকার্যকর হয়ে এককেন্দ্রিক বিশ্ব প্রতিষ্ঠিত হলেও এখনো অনেকের মধ্যেই রাশিয়াকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিপরীত ব্লকের একটি শক্তি হিসেবে কল্পনা করে নিয়ে বিভিন্ন কথাবার্তা বলার ও প্রচেষ্টা গ্রহণের প্রবণতা লক্ষ করা যায়। সে সময়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে অনেকগুলো ছোট ছোট রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয় এবং প্রধান আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্রটি বর্তমান রাশিয়ার মধ্যে নিজেকে সংহত করে। প্রাক্তন সিআইএ অনুচর মিখাইল গর্বাচেভের পর বরিস ইয়েলেৎসিনের পৌরোহিত্যে মার্কিন আশীর্বাদে রাশিয়া পূর্ণত সাম্রাজ্যবাদের এককেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার মধ্যে বিলীন হয়। বর্তমান রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির পুতিন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতাগ্রহণের পর অবস্থা কিছুটা পরিবর্তনের চেষ্টা করেন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একেবারেই দাসানুদাস হয়ে থাকার পরিবর্তে বর্তমান বিশ্বব্যবস্থাকে স্বীকার করে নিয়েই সেখানে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সামর্থ্য অনুযায়ী নিজস্ব প্রভাববলয় গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। বর্তমানে আন্তর্জাতিক ইস্যুতে অনেক ক্ষেত্রেই এই দুই রাষ্ট্রের মধ্যে দ্বিমত রয়েছে এবং জাতিসংঘ সহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থায় তারা পরস্পরের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। কিন্তু তৎসত্ত্বেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে রাশিয়ার সম্পর্ক আগের মতো শত্রুতামূলক নয়, এবং প্রয়োজনে নিজস্ব অভিন্ন সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থরক্ষার্থে তারা যে পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতেই অগ্রসর হবে সে বিষয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। তাছাড়া বর্তমান আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থা সম্পর্কে যাদের ধারণা আছে তারা সবাই জানেন শীতল যুদ্ধের অবসানের পর আন্তর্জাতিক পুঁজি এখন সাম্রাজ্যবাদী পুঁজি হিসেবে অবাধ হয়েছে এবং এককেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার মধ্যে তার নির্ধারক ভূমিকাকে সংহত করেছে। বর্তমান বিশ্বে পুঁজির গতিবিধি সার্বভৌম এবং সর্বত্র বিস্তৃত। পুঁজির অন্তর্নিহিত চরিত্র অনুযায়ী সে শ্রম শোষণের মাধ্যমে উদ্বৃত্ত সৃষ্টি ও পুনরুৎপাদনের প্রক্রিয়ায় ক্রমাগত নিজেকে সমৃদ্ধ করে চলে। এই সমৃদ্ধিকরণের পথকে অবাধ রাখার জন্যই জাতিসংঘ নামক তথাকথিত বিশ্বজোট, ন্যাটো নামের যুদ্ধজোট, বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল প্রভৃতির মতো সাম্রাজ্যবাদী ঋণ সংস্থা, সিআইএ, এফবিআই, এনএসএ, এমআইসিক্সের মতো বহু গোপন ও প্রকাশ্য গোয়েন্দা সংস্থা এবং বিশ্বব্যাপী সাম্রাজ্যবাদীদের ভাড়াটে গুপ্তঘাতকেরা সক্রিয় রয়েছে। এই বিশ্বব্যবস্থাকে স্বীকার করে নিয়েই রাশিয়া, চীন, ভারতের মতো রাষ্ট্রগুলো নিজস্ব সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থের বিস্তার ঘটাচ্ছে এবং আঞ্চলিক ও নির্দিষ্ট স্বার্থকেন্দ্রিক বলয় সৃষ্টি করছে। এই প্রক্রিয়ায় মার্কিন নেতৃত্বাধীন সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থার সাথে যেমন কিছু ক্ষেত্রে দ্বন্দ্ব পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে তেমনি আবার নিজেদের মধ্যে বিভিন্ন চুক্তি স্বাক্ষর ও মৈত্রী গঠনের মাধ্যমে ভাগবাটোয়ারার ক্ষেত্র প্রতিষ্ঠার কাজও এগিয়ে চলেছে। এই বাস্তবতাকে বুঝলে রাশিয়ার সাথে বর্তমান সরকারের সাম্প্রতিক চুক্তিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আনুগত্য থেকে সরে যাওয়াজাতীয় কিছু মনে করার কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই।

আগেই আলোচ্য নিবন্ধের নিকৃষ্ট চরিত্রের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। যে বাক্যটির দ্বারা এই চরিত্রের সর্বোচ্চ বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে বলে মনে করা যেতে পারে সেটি হলো: “Just ask the families of some 300 people who have been registered as missing since 2009 at the hands of Ms. Hasina’s Rapid Action Battalion- a paramilitary wing of the police.” যে বিষয়ের প্রেক্ষিতে এই বাক্য প্রয়োগ করা হয়েছে সেটা হলো, অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমের শেখ হাসিনার নোবেল পুরস্কার পাওয়ার যোগ্যতাবিষয়ক মন্তব্য এবং দেশের বেশির ভাগ জনগণ যে এই মন্তব্যের সাথে একমত নন সেটা। এই কথা উল্লেখ করে নিবন্ধের উদ্ধৃতাংশে বলা হয়েছে শেখ হাসিনার আধাসামরিক বাহিনী র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটিলিয়ন অর্থাৎ র‍্যাবের হাতে যে তিনশ নাগরিক গুম হয়েছে এ বিষয়ে তাদের পরিবারের সদস্যদের মতামত গ্রহণ করা যেতে পারে। আপাতত দৃষ্টিতে মনে হতে পারে যে এর মধ্যে দোষনীয় কিছু নেই, এবং খালেদা জিয়া বোধহয় উপর্যুক্ত তিনশ নাগরিক ও তাদের পরিবারের সদস্যদের বিশাল দরদী! কিন্তু অন্য সব কিছু বাদ দিয়ে সবার আগে এই প্রশ্ন তাকে সরাসরি করা উচিত যে সরকারের এই চরম প্রতিক্রিয়াশীল ও দক্ষিণপন্থী সশস্ত্র সংস্থা র‍্যাব কাদের আমলে গঠিত হয়েছিল? এবং যাদের কাছে এই সংস্থার বিরুদ্ধে বর্তমানে নালিশ করা হচ্ছে তাদের এই সংস্থা গঠনের পেছনে কী ভূমিকা ছিল? অপারেশন ক্লিনহার্টের নামে সে সময় কতোজন নাগরিককে বিনাবিচারে হত্যা করা হয়েছিল? বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসে র‍্যাবকে গঠিত অবস্থায়ই পেয়েছে। যদিও নির্বাচনের আগে তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ক্ষমতাসীন হয়ে বিনাবিচারে হত্যাকাণ্ড বন্ধ করা হবে কিন্তু সে কথা তারা রাখেনি। উপরন্তু বর্তমান আমলে গুমখুন ও বিনাবিচারে ক্রসফায়ার ও এনকাউন্টারের নামে রাষ্ট্রীয় হত্যাকাণ্ড ইত্যাদি বৃদ্ধি পেয়েছে। সুতরাং যেকোনো সাধারণ সুস্থ জ্ঞানসম্পন্ন মানুষের কাছেই এ বিষয়টি পরিষ্কার যে র‍্যাব দিয়ে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস চালানো এবং নিরীহ মানুষ ও বিরোধী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের হত্যাগুম ইত্যাদি আওয়ামী লীগ অথবা বিএনপির কোনো নিজস্ব দলীয় অপকর্ম নয়। বরং এরা সবাই সম্মিলিতভাবে শাসক শ্রেণীর যে চরিত্র গঠন করেছে এটা হলো তারই অনিবার্য প্রতিক্রিয়া।

এই নিবন্ধে ড. ইউনুসকে নিয়েও নাকি কান্না কাঁদা হয়েছে। গরীবের ‘ত্রাতা’ ইউনুসকে গ্রামীন ব্যাংকের এমডির পদ থেকে সরিয়ে দেয়ার কারণ নাকি তিনি গ্রামের অনেক অসহায় মানুষকে দারিদ্র্যের নিপীড়ন থেকে মুক্ত করেছেন এবং দেশে দারিদ্র্যের হার কমিয়েছেন! একথা ঠিক যে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার ইউনুসের বিরুদ্ধে যেসব ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে সেগুলো কোনোটাই মহৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল না। ব্যক্তিবিদ্বেষ এবং বাংলাদেশের রাজনীতিতে তার প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড়িয়ে যাবার সম্ভাবনার আশঙ্কাতেই প্রধানমন্ত্রীর দ্বারা এ কাজ সংঘটিত হয়েছে। এ বিষয়ে মার্কিন চাপ থাকলেও তিনি সেটা গ্রাহ্য করেন নি। ড. ইউনুস বাংলাদেশে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীদের প্রধানতম ঘুঁটি হলেও শেখ হাসিনার দৃঢ় বিশ্বাস যে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন থেকে তিনি সাম্রাজ্যবাদী শক্তিকে এমন সুযোগসুবিধা পাইয়ে দিতে সক্ষম যেটি ইউনুসের দ্বারা সম্ভব নয় এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অচিরেই ইউনুসসংক্রান্ত বিষয়ে আওয়ামী লীগের সাথে তিক্ততা ভুলে তাদের আবার নিজেদের ক্রোড়ে ঠাঁই দেবে। সুতরাং বর্তমান সরকার ড. ইউনুসের ব্যাপারে যে পদক্ষেপ নিয়েছে তাকে সমর্থন না করলেও বা তার সমালোচনা করলেও এর অর্থ এই নয় যে এর দ্বারা ইউনুসকে মহান চরিত্রের অধিকারী মহৎ ব্যক্তি হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। এই ইউনুস বাংলাদেশে মার্কিনী স্বার্থের প্রধান আস্থাভাজন ব্যক্তি হিসেবে বহু অপকর্মই করেছেন যার আলোচনা করা বর্তমান নিবন্ধের সীমিত পরিসরে সম্ভব নয়। সাধারণত তার দেয়া ক্ষুদ্র ঋণের উচ্চহার এবং এই ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ দরিদ্র মানুষের ওপর তার লোকজনের নির্মম নিপীড়ন ও অত্যাচারনির্যাতনের ঘটনাকে কেন্দ্র করেই অধিকাংশ তর্কবিতর্কের বিষয় আবর্তিত হয়। কিন্তু ক্ষুদ্রঋণ তার অন্যতম প্রকল্প হলেও এটাই একমাত্র নয়। এটার আড়ালে সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থের প্রধান তল্পিবাহক হিসেবে তার আরো অনেক প্রকল্প রয়েছে যেগুলোর গণবিরোধী ও দেশীয় স্বার্থবিরোধী ভূমিকাও কম মারাত্মক নয়।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রসঙ্গে কথিত নিবন্ধটিতে বলা হয়েছে: “Having a caretaker government has been the insurance that elections are free and fair. If the voters decide to vote for a new government, then power must change hands. Despite millions joining in street protests against plans to ditch the caretaker government system before the general election this year, Ms. Hasina seems intent on pushing ahead, believing it will allow her to be re-elected despite popular opposition to her rule.” এর সহজসরল বাংলা অর্থ হলো, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাই দেশে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার প্রধান নিশ্চয়তা প্রদানকারী চাবিকাঠি। এর মাধ্যমেই ভোটারদের ইচ্ছামাফিক সরকার পরিবর্তিত হতে পারে। যদিও দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলোপের বিরোধী কিন্তু বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নিজে আবার নির্বাচিত হওয়ার বাসনায় এই ব্যবস্থাটিকে সংবিধান থেকে উচ্ছেদ করেছেন। সুতরাং যেহেতু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের প্রধান মিত্র বৃটেনের উল্লেখযোগ্য প্রভাব রয়েছে বাংলাদেশের রাজনীতিতে, সেহেতু তারা যাতে এই ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের জন্য সরকারের ওপর পর্যাপ্ত চাপ সৃষ্টি করে এই আহ্বান তিনি জানিয়েছেন।

একথা ঠিক যে বাংলাদেশে বিদ্যমান সংসদীয় রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে কোনো দলীয় সরকারের অধীনে, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনের ব্যবস্থাপনায় সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার মতো পরিবেশ নেই। কেন নেই এই প্রশ্নের উত্তর আওয়ামী লীগবিএনপি সহ প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর শ্রেণীগত চরিত্রের মধ্যেই খুঁজতে হবে। এটা আলাদাভাবে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বৈশিষ্ট্য নয়। ১৯৯৪ সালে বিএনপির অধীনে মাগুরার উপনির্বাচন এর একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত। কেন বর্তমান সরকার এই ব্যবস্থাকে সংবিধান থেকে বিলুপ্ত করল সেটা নিয়ে অনেকেই অনেক কথা বলেছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার কোন অবস্থার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের সংসদীয় ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা ও তাকে কার্যকর রাখার জন্য প্রয়োজন হয়েছিল এই নিয়েও অনেক আলোচনাপর্যালোচনা রয়েছে। আমি ‘বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকারসঙ্কট :: শাসক শ্রেণীর রাজনৈতিক দৈন্যের অনিবার্য প্রতিফলন’ শীর্ষক নিবন্ধে এ বিষয়ে লিখেছিলাম:

জনগণ তাদের অভিজ্ঞতায় দেখেছেন বাংলাদেশে যে দল ক্ষমতায় যায় তারাই সুষ্ঠু ও নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় রাষ্ট্র পরিচালনার পরিবর্তে সব কিছু দখলের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। প্রশাসন, বিচারালয়, সংসদ থেকে শুরু করে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, টেন্ডার প্রক্রিয়া, পেশাজীবী সংস্থা, নদীনালা, খালবিলপুকুর, রাস্তাঘাট, সেতুকোনো কিছুই এই দখলীকরণ তৎপরতার বাইরে থাকে না। সুতরাং নির্বাচনী ব্যবস্থাটিও যে তাদের দখলে যাবে এটা কোনো অস্বাভাবিক বিষয় নয়, বরং এমনটা হওয়াই চরম বাস্তব। কেননা নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর দখল কায়েমই পরবর্তী পাঁচ বছরের জন্য জনসাধারণের ও রাষ্ট্রীয় অন্যান্য সকল সম্পত্তির ওপর দখলীস্বত্ব ও অবাধ ভোগের পরিস্থিতি বজায় রাখার মূল চাবিকাঠি। কিন্তু চাইলেই তো আর সেটা পারা যায় না। ক্ষমতার বাইরে প্রতীক্ষায় রয়েছে শক্তিশালী বিরোধী পক্ষ, যারা পরবর্তীতে নির্বাচনে ক্ষমতায় গিয়ে পূর্ববর্তী সরকারের পদাঙ্ক অনুসরণে সর্বাংশে উন্মুখ। সুতরাং বিরোধী পক্ষ ও জনমতের চাপে, এবং বিদেশি দূতাবাসের ব্যবস্থাপনায় তাকে সম্মতি জ্ঞাপন করতে হয় অনির্বাচিত নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ব্যাপারে।”

এ বিষয়ে নিজের বক্তব্যের অধিক পুনরুক্তি করার কোনো প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। বাংলাদেশে বর্তমানে বিএনপি যে সরকারবিরোধী আন্দোলন পরিচালনা করছে তার প্রধান ইস্যু হলো সংবিধানে তত্ত্বাবধায়কী ব্যবস্থার পুনঃপ্রবর্তন। তাদের সভাসমাবেশ, বক্তৃতা ও বৈঠকী আলোচনা সব জায়গাতে এটাকেই মূল কেন্দ্র করা হয়েছে। অর্থাৎ বর্তমান আওয়ামী লীগনেতৃত্বাধীন জোট সরকারের দুঃশাসনে জর্জরিত নাগরিক যাতে অতীতে বিএনপিজামাতের যাবতীয় কুশাসন ভুলে গিয়ে তাদেরকে আগামী নির্বাচনে আবার ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতায় নিয়ে আসতে পারেন তার পথ খোলা রাখাই বিএনপির প্রধান মাথাব্যথার বিষয়। কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকার থাকানা থাকার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিএনপিআওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে যেসব তর্কবিতর্ক তোলা হচ্ছে সেটা দলগুলোর নীতিগত কোনো অবস্থান থেকে নয়, সরকার অথবা বিরোধী পক্ষে তাদের অবস্থানের কারণেই এটা হচ্ছে। ১৯৯৬ সালে দেখা গিয়েছিল বিএনপি ক্ষমতাসীন থাকা অবস্থায় দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন দিতে তৎপর। আওয়ামী লীগ সে অবস্থায় তাদের নির্বাচিত হওয়ার কোনো সম্ভাবনা না দেখতে পেয়ে নির্দলীয় সরকারের দাবিতে রাজপথ মুখর করে তুলেছিল। বিএনপি সে অবস্থা গ্রাহ্য না করে নিজেদের অধীনে পরিচালিত নির্বাচনের মাধ্যমে (যে নির্বাচন আওয়ামী লীগ, জামাতে ইসলামী প্রমুখ দল বর্জন করে) ক্ষমতায় যায়। কিন্তু এরপর বিরোধী দলের আন্দোলনের তীব্রতা বৃদ্ধি পেলে এবং সাম্রাজ্যবাদী মুরুব্বিরা হস্তক্ষেপ করতে এগিয়ে এলে বিএনপিকে সংসদে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিল পাশ করিয়ে এবং সেভাবে সংবিধান সংশোধন করে তাদের হাতে ক্ষমতা ধরিয়ে দিতে বিদায় নিতে বাধ্য হয়। এরপর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ।

সুতরাং এখান থেকেই স্পষ্ট হয় যে, কোন দলটি নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে যেতে আগ্রহী এবং কোন দলটি তা নয়, সেটা নির্ধারিত হয় শাসন ক্ষমতার দিক থেকে তারা কোন মেরুতে অবস্থান করছে তার ওপর, কোনো নীতি অথবা আদর্শগত দৃষ্টিকোণ থেকে নয়। বর্তমানে ওয়াশিংটন টাইমসে খালেদা জিয়ার তথাকথিত ঐ নিবন্ধটিতে তিনি যে বক্তব্য দিয়েছেন তত্ত্বাবধায়কী ব্যবস্থা নিয়ে, সেটাও তার নিজস্ব অথবা দলীয় আদর্শগত অবস্থান থেকে নয়, বিরোধী দল হিসেবে আগামী নির্বাচনে ক্ষমতায় যাওয়ার অপ্রতিরোধ্য বাসনা থেকেই এর উদ্ভব। তিনি বর্তমান সরকার ও তার প্রধানমন্ত্রী সম্পর্কে যে অভিযোগ এখানে তুলেছেন সেটা এক হিসেবে সত্য হলেও এই একই অভিযোগে খালেদা জিয়া এবং তার দলকেও অভিযুক্ত করা যেতে পারে ১৯৯৬ সালের ঘটনায় তাদের ভূমিকার কারণে, এবং সেটা করাই যুক্তিসঙ্গত।

আলোচ্য নিবন্ধের শেষ পর্যায়ে এসে যা বলা হয়েছে তাহলো: “They also must explain to Ms. Hasina that general preferences for trade will be withdrawn if those who support workers’ rights and have political views opposed to those of the prime minister are not now allowed to express their beliefs. The Western powers should consider targeted travel and other sanctions against those in the regime who undermine democracy, freedom of speech and human rights. They should say and do these things publicly, for all our citizens to see and hear. This is how the United States can ensure that its mission to democratize the world continues.”

সাম্রাজ্যবাদের অধীন ও তাদের ওপর নির্ভরশীল রাষ্ট্রগুলো তাদের জাতীয় অর্থনীতিকে এমনভাবে বিন্যস্ত করে যাতে সাম্রাজ্যবাদের করায়ত্ত থেকে তার বের হয়ে আসার কোনো ইতিবাচক শর্ত সেখানে সৃষ্টি হয় না। এভাবেই তারা তাদের বৈদেশিক নীতি, অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংস্কার, উৎপাদনী খাতসমূহের বিন্যাস, বিভিন্ন নীতি ও কর্মসূচি গ্রহণ, প্রণয়ন ইত্যাদি করে থাকে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই বিষয়গুলো হলো তথাকথিত পোশাক শিল্পখাত নিয়ে দেনদরবার, GSP (Generalized System of Preferences) সুবিধা প্রাপ্তি, MFN (Most Favored Nation) স্ট্যাটাস বজায় রাখা ইত্যাদি। এগুলো সব সরকারের আমলেই হয়ে থাকে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন সহ সাম্রাজ্যবাদী এবং উন্নত পুঁজিবাদী রাষ্ট্র ও তাদের সংঘসমূহ দলনির্বিশেষে তাদের কৃপাপ্রার্থী শাসক শ্রেণীর যেকোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সাথেই নির্ভরশীলতার সূত্রে তাদের অভিন্ন সম্পর্ক বজায় রাখে। এখন খালেদা জিয়া বেপরোয়া হয়ে একথা বলতে চাইছেন যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যেন বর্তমান সরকারের ওপর চাপ দিয়ে বলে, তাদের কথা না শুনলে এবং শ্রমিক অধিকার সংরক্ষণে তৎপর না হলে তারা উপর্যুক্ত ‘সুবিধা’সমূহ প্রত্যাহার করে নেবে।

বর্তমানে গার্মেন্টসকারখানায় শ্রমিক হত্যা, অগ্নিকাণ্ডে অসংখ্য শ্রমিকের মৃত্যু এসবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সহ পাশ্চাত্যের ক্রেতারাও উদ্বিগ্ন। তবে তাদের এই উদ্বেগের সাথে শ্রমিকদরদী হওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই। পোশাক শিল্পের মতো শ্রমঘন শিল্পখাতে তাদের নিজেদের দেশের শ্রমিক নিয়োগে মুনাফার সর্বোচ্চকরণের সম্ভাবনা না দেখে তারা বাংলাদেশের মতো পশ্চাৎপদ ও অধিক জনসংখ্যার দেশ থেকে এ জাতীয় পণ্যসমূহ স্বল্প খরচে অর্ডারের মাধ্যমে ক্রয় করে থাকে। শ্রমিকদেরকে মাথা মুড়িয়ে ঘোল ঢেলে, যতোটা পারা যায় শোষণ করে এবং যথাসম্ভব সর্বনিম্ন মজুরি প্রদানের মাধ্যমে কাজ আদায় করিয়ে নেয়ার বিষয়ে তাদের আগ্রহ অধিক। বাংলাদেশে গার্মেন্টস শিল্পের মালিকবৃন্দও পুঁজিবাদী ব্যবস্থার এই তাগিদ পূরণের সংকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্য নিয়েই তাদের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন। এজন্য বাংলাদেশের পোশাক কারখানাগুলো যথার্থ শিল্পের পরিবর্তে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে দরিদ্র শ্রমজীবী মানুষের জন্য একেকটি কারাগার হিসেবে, যেখানে শ্রম ছাড়া উৎপাদনের প্রয়োজনীয় অন্যান্য প্রায় সব উপাদানই বিদেশ থেকে আমদানি হয়ে আসে। কিন্তু গার্মেন্টস কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে অথবা অন্যভাবে শ্রমিকের মৃত্যু এই বিদেশি ক্রেতাদের পছন্দ নয়। তারা চান সুশৃঙ্খল পরিবেশের মধ্যে শোষণের পরিস্থিতি বজায় রাখতে। এজন্য সীমিত পর্যায়ে ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার প্রদান করা, বিক্ষোভ দেখা দিলে শ্রমিকদের মজুরি নামকাওয়াস্তে বৃদ্ধি করা ছাড়াও অগ্নিকাণ্ডে যেন এমন ব্যাপক হারে শ্রমিকের মৃত্যু না হয় সেটাও তাদের প্রত্যাশা। কেননা সেটি হলে পণ্যের অবাধ যোগান বাধাগ্রস্থ হয়, নিজ নিজ দেশে সময়মতো ভোক্তার চাহিদা পুরণে তাদেরকে সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। এ কারণে বাংলাদেশে গার্মেন্টস শিল্পের বর্তমান পরিস্থিতির কিছু সমালোচনা তারাও করছেন এবং এই পরিস্থিতি পরিবর্তনের জন্য সরকারকে চাপ প্রদান করছেন। খালেদা জিয়ার উপর্যুক্ত নিবন্ধটিতেও এই বিষয়টি মাথায় রাখা হয়েছে। এছাড়া যারা গণতন্ত্র, মানবাধিকার, বাকস্বাধীনতায় বিশ্বাস করে না তাদের বিদেশ ভ্রমণের সুযোগ সীমিত করা (লক্ষণীয় যে এই অংশটির ব্যাপারে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অত্যন্ত ক্ষিপ্ত হয়েছেন। ঘন ঘন বিদেশ ভ্রমণ যে তার অত্যন্ত প্রিয় একটি বিষয়!), বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে খোলাখুলি হস্তক্ষেপ প্রভৃতি প্রস্তাবও রয়েছে। এছাড়া এসব বিষয়ে সাম্রাজ্যবাদীরা যাতে খুব স্পষ্টভাবেই নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করে যাতে আমাদের জনগণ সেটা শুনতে ও বুঝতে পারেন সে বিষয়েও উল্লেখ করা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর বিশ্বের গণতন্ত্র সুরক্ষার ভার এবং তাদের নেতৃত্বে সমগ্র বিশ্বের গণতান্ত্রিকীকরণ প্রক্রিয়া এগিয়ে নেয়ার আশাবাদ রয়েছে নিবন্ধটিতে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি অখ্যাত পত্রিকায় প্রকাশিত খালেদা জিয়ার কথিত নিবন্ধটি তাদের ক্ষমতাসীন মহলের নীতিনির্ধারণে কীভাবে প্রভাব বিস্তার করতে পারে সেটা পরবর্তী আলোচনার বিষয় হতে পারে। সাম্রাজ্যবাদীরা তাদের নিজেদের স্বার্থের হিসাবনিকাশ করেই যেকোনো দেশের বিষয়ে তাদের করণীয় নির্ধারণ করে। বাংলাদেশের মতো একটি সাম্রাজ্যবাদের অধীন রাষ্ট্রে, যেখানে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো খুব স্পষ্টভাবেই তাদের তাবেদার হিসেবে কাজ করেসেখানে কোনো একটি রাজনৈতিক দলকে যে তারা খোলাখুলিভাবে সমর্থন দেবে না এটা বলাই বাহুল্য। এক্ষেত্রে দেশের জনমতের হাওয়া কোনদিকে এ বিষয়টিকে তারা অবশ্যই বিবেচনায় নেবে। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদী হস্তক্ষেপের যে আহ্বান নিবন্ধটিতে জানানো হয়েছে সেটা আরো বহু আগেই বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এদেশের স্বাস্থ্যশিক্ষাশিল্পকৃষিসামরিক থেকে শুরু করে কোনো খাতই সাম্রাজ্যবাদের আওতামুক্ত নয়। এসব ক্ষেত্রে যে ধরনের নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন হয় সেসব থেকেই বিষয়টি স্পষ্ট। এখন যা হতে পারে তাহলো বাংলাদেশে সাম্রাজ্যবাদের প্রভাব ও আধিপত্য গভীরতর হওয়া, জনগণকে তাদের শোষণনির্যাতনের নিগড়ে আরো জোরালোভাবে আবদ্ধ করা।

এদিকে আওয়ামী মহলেও এই নিবন্ধ প্রকাশিত হওয়া নিয়ে তোলপাড় দেখা দিয়েছে। জাতীয় সংসদে খালেদা জিয়ার এই কর্মকাণ্ডকে রাষ্ট্রদ্রোহী আচরণ হিসেবে আখ্যায়িত করে তাকে ক্ষমা চাওয়ার জন্য বলা হয়েছে। বিভিন্ন মন্ত্রী ও সরকার দলীয় সাংসদগণ এর জন্য নিন্দা প্রস্তাব উত্থাপনের কথা বলে খালেদা জিয়ার সমালোচনা করেছেন। কিন্তু তাদের এসব বক্তব্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি কোনো নেতিবাচক উচ্চারণ নেই। বরং যুক্তরাষ্ট্র খালেদার কথা শুনবে না এবং সেটাকে অর্থহীন বিবেচনায় তার প্রতি কোনো ভ্রুক্ষেপ করবে না এমন আশাবাদই তারা ব্যক্ত করেছেন। কিন্তু খোলাখুলিভাবে না বললেও তারাও যে খালেদা জিয়া এবং তার দলের মতোই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৃপাপ্রার্থী এ বিষয়ে তো কোনো সন্দেহ নেই। সুতরাং উক্ত নিবন্ধের বক্তব্য যে সত্য নয় এবং এর ওপর ভিত্তি করে যুক্তরাষ্ট্র যাতে কোনো পদক্ষেপ নিতে অগ্রসর না হয় সে বিষয়টি নিশ্চিতের জন্য অচিরেই সেদেশে নিযুক্ত বাংলাদেশ সরকারের মনোনীত বান্দাগণ যে ক্ষমতাসীন মহলে দৌড়ঝাঁপ ও বিভিন্নমুখী দেনদরবার শুরু করবেন তাতে সন্দেহ নেই।

সাম্রাজ্যবাদ, যার নেতৃত্ব এখন মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাতে, সমগ্র বিশ্বের নিপীড়িত ও শ্রমজীবী মানুষের প্রধানতম ও সাধারণ শত্রু। বর্তমান বিশ্ব যে যুদ্ধ পরিস্থিতি, বৈষম্য, নিপীড়ন, অপুষ্টি, ক্ষুধা, ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদ, পরিবেশ বিপর্যয়, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মহামারী অথবা আরো বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে তার প্রতিটির পেছনে রয়েছে সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থায় পুঁজিবাদের অনিয়ন্ত্রিত ও অপরিসীম চাহিদার পরিপুষ্টি সাধনের তৎপরতা। এই সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থার ও ব্যবস্থাপকদের যারা পদলেহী, অনুগ্রহ প্রত্যাশী এবং তাদের ওপর নির্ভরশীলএরা সবাই শ্রেণীগত দিক থেকে জনগণের প্রকাশ্য দুশমন। ওয়াশিংটন টাইমস নামক প্রচারবিহীন পত্রিকায় নিবন্ধ প্রকাশের মাধ্যমে আর যা কিছুই হোক না কেন, বিএনপি ও তার সভানেত্রীর চরিত্রের এই দিকটি নগ্নভাবেই প্রকাশিত হয়েছে। এবং এর মাধ্যমে দলগতভাবেই কেবল নয়, শ্রেণীগতভাবে তাদের পরিচয় এবং তাদের মতো শাসক শ্রেণীর অন্য যে সমস্ত দল আছে, তাদের সকলের চরিত্রের স্বরূপ এই আদলেই জনগণকে বুঝতে হবে।।

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s