লিখেছেন: মনজুরুল হক

পুলিশি এ্যাকশনের রিভার্স

attack-on-police-1-বাংলাদেশের পুলিশ সম্পর্কে সবচেয়ে প্রচলিত প্রবাদ ‘বাঘে ছুঁলে এক ঘাপুলিশে ছুঁলে আঠারো ঘা’। প্রবাদটি এমনি এমনি রচিত হয়নি। সেই প্রাচীন কাল থেকেই অর্থাৎ ব্রিটিশ আমলের হাফপ্যান্ট পুলিশ থেকে আজ অবধি সাধারণ মানুষের প্রতি পুলিশের নৃশংস এবং প্রতিহিংসাপরায়ন আচরণের জন্যই এমন প্রবাদ চালু রয়েছে। আঠারো ঘা হবে যে পুলিশ ছুঁলে সেই পুলিশই যখন নিজেদের শরীরে আঠারো দুগুণে ছত্রিশ ঘা নিয়ে হাসপাতালের বেডে শুয়ে কাতরায় তখন সাধারণ মানুষকে একশ আশি ডিগ্রী ঘুরে ভাবতে বসতে হয় কেন এই কন্ট্রাস্ট? কন্ট্রাস্ট বলার কারণ কি? আসুন দেখে নেয়া যাক

এক. শুধু এই সরকার নয়, যে কোনো সরকারের আমলেই বামপন্থীসাধারণ জনগণশিক্ষক শ্রেণীসাধারণ ছাত্রছাত্রীশ্রমিককৃষকবস্তিবাসীএলাকাবাসীমুটে মজুর রিকসাচালকরা মিছিল করলে, ঘেরাও করলে, হরতাল ডাকলে, অবস্থান ধর্মঘট করলে, প্রতিবাদ সমাবেশ করলে, স্মারকলিপি দিতে গেলে, কোনো দুতাবাস অভিমুখে মিছিল নিতে চাইলে, নদী খননের দাবীতে সমাবেশ করলে, বাঁধের বিরুদ্ধে আন্দোলন করলে এমনকি বকেয়া বেতনের দাবীতে কারখানার সামনে দাঁড়ালেই বাংলাদেশের পুলিশ লাঠি চার্জ করে, বেদম প্রহার করে, কাঁদানে গ্যাস চার্জ করে, জলকামান দিয়ে মিছিল ছত্রভঙ্গ করে, রাইফেলের বাঁট দিয়ে হাতপা গুড়ো গুড়ো করে। ৫৪ ধারায় গরুছাগলের মত শত শত সাধারণ মানুষকে গ্রেপ্তার করে। প্রকাশ্য রাজপথে কোমরে দড়ি বেঁধে গুরুছাগলের মত হিড় হিড় করে টেনে নিয়ে হাজতে পোরে। গার্মেন্টের নারী শ্রমিকদের কুৎসিত ভাষায় গালাগাল করে। বিশ্বাবিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ‘ইয়ের’ মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়ার হুমকি দেয়। বস্তিবাসী নারীদের সরাসরি বেশ্যা বলে গালাগাল করে। হাজতে পুরে শ্লীলতাহানী করে। প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষকদের কুৎসিতকদাকার ভাষায় গালাগাল দেয়। তাদের উপর জলকামান নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। কলেজবিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জামাকাপড় ধরে অশ্লীলভাবে টানা হ্যাঁচড়া করে। সর্বশেষ মেথড হিসেবে পিপার স্প্রে করে সাধারণ আন্দোলনকারীদের অন্ধ করে দিচ্ছে! পুলিশের লাঠিবন্দুকের বাঁটের আঘাতে নিহতআহত হওয়ার সংখ্যাটা ভয়াবহরকম! এখনো অনেক রাজনৈতিক কর্মী পুলিশের আঘাতে পঙ্গু জীবনযাপন করছে। সন্ত্রসী সন্দেহে মানুষকে পিটিয়ে মারা, খালে বা নদীতে ঝাঁপ দিয়ে জীবন বাঁচাতে চাওয়া মানুষকে বাঁশ দিয়ে খুচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করার রেকর্ডও আছে পুলিশের। মোদ্দা কথা পুলিশের অপকর্মের রেকর্ড একটা দুটো নয়, অজশ্র।

দুই. সেই পুলিশই যখন রাজপথে জামাতশিবিরের তাণ্ডব হাকরে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে আর মার খায়, এবং মার খাওয়া পুলিশ যখন কর্তাব্যক্তিদের সামনে ভেউ ভেউ করে কাঁদে, বিচার চায় তখন কন্ট্রাস্ট শব্দটাই মানানসই। গত বছরের নভেম্বর মাস থেকে শুরু হয়ে ২৮ জানুয়ারি পর্যন্ত জামাতশিবিরের হাতে যতজন পুলিশ মার খেয়ে আহত হয়েছে গত চল্লিশ বছরে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের হাতেও ততজন পুলিশ আহত হয়নি। এমনকি কোনো কোনো রাজনৈতিক দলের পোষা সন্ত্রাসীরাও পুলিশকে এতটা আক্রমন করে আহত করতে সাহস করেনি। জয়নালদেলওয়ারকে ট্রাকচাপা দিয়ে হত্যাকারী পুলিশও দিব্যি বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ডিউটি করেছে। এর কারণ কী?

পুলিশের দাবী তারা আইন মেনেই রাজপথের আন্দোলনসংগ্রাম মোকাবেলা করছে। তারা আইনের প্রতি ‘শ্রদ্ধাশীল’ থেকেই জ্বালাওপোড়াও প্রতিহত করার চেষ্টা করছে, এবং পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে তারা সফল! সাদা চোখে জামাতশিবিরের পূর্ব পরিকল্পিত আক্রমন বিষয়ে সুশীল সমাজের বুলিবাগীশবাজরা বলছেনজামাতশিবির রাজনৈতিকভাবে সঙ্গবদ্ধ এবং ডেডিকেটেড, তারা ক্যাডারভিত্তিক দল পরিচালনা করে, তাদের শীর্ষ নেতাদের যুদ্ধাপরাধের বিচারের আওতামুক্ত করতে তারা মরিয়া, তারা যে কোনো মূল্যে তাদের নেতাদের বাঁচানোর মিশন নিয়ে নেমেছে, তারা দেশে একটি অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করে দেশকে অকার্যকর করতে চায় যাতে করে দেশে আবার যেন ওয়ান ইলেভেন আসার সুযোগ সৃষ্টি হয়, এমনিতে জামাতশিবির যথেষ্ট শক্তিশালী তার উপর তাদের মাথার উপর বিএনপি’র প্রশ্রয়ের হাত রয়েছে, নিষিদ্ধ ঘোষিত জেএমবি এবং জেজেএমবির কর্মীরা এখন জামাতশিবিরের সাথে যুক্ত হয়েছে ইত্যাদি।

এর বিপরীতে সরকারি দলের ভাষ্য দুরকম। মন্ত্রিদের কেউ কেউ বলছেন (যেমন ২৮ জানুয়ারি) অর্থমন্ত্রী বলেছেনগোয়েন্দা বিভাগের ব্যর্থতার কারণে এমনটি ঘটেছে। আবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তা নাকোচ করে দিয়ে বলেছেনপুলিশ যথাযথ দায়িত্ব পালন করে জামাতশিবিরের অর্ন্তঘাতমূলক কর্মকাণ্ড নস্যাৎ করে দিয়েছে! এই অর্থমন্ত্রী বা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মাত্র ক’দিন আগে প্রাইমারি শিক্ষকদের অবস্থান কর্মসূচী চালাকালিন তাদের উপর পিপারস্প্রে ব্যবহার করে তাদের আহত করা পুলিশদের নিয়ে টু শব্দ করেনিনি। উল্টো মহানগর পুলিশ কমিশনার মিডিয়ায় ব্যাখ্যা তর্জমাসহ বুঝিয়েছেন যে পিপারস্প্রে মানব দেহের জন্য ক্ষতিকর নয়! তাহলে সহজ সোজাসাপ্টা প্রশ্ন আসে জামাতশিবিরের ধ্বংষযজ্ঞ চলার সময়, কোটি কোটি টাকা দামের সরকারি সম্পত্তি জ্বালানোর সময়, হাজার হাজার মানুষকে জ্যামে আটকে দিয়ে, হাসপাতালগুলোকে অচল করে দিয়ে রাজপথের তাণ্ডব চালানোর সময়, পুলিশের ওপর প্রকাশ্যে হামলা করার সময়, পুলিশকে মেরে রক্তাক্ত করে দেয়ার সময় মহামহিম পুলিশের ব্যাটন, কঁদানে গ্যাস, পিপারস্প্রে, জলকামান, রাইফেলে বাঁট, বুটের লাথি নিষ্ক্রিয় কেন? কেন রাজপথে দাঁড়িয়ে থাকা রায়টকার, জলকামান অকেজো হয়ে থাকছে? এই বিশাল ‘কেন’ আরো বিশাল হয়ে সাধারণ মানুষের চিন্তাভাবনাকে নাড়িয়ে দিয়েছে।

এর পেছনের বারণ কী? হালি হালি বা ডজন ডজন কারণ খুঁজতে যাওয়ার দরকার নেই। ছোট্ট একটি কারণ। এবং তা একেবারে দিবালোকের মত পরিষ্কার সবার কাছে। সর্ষের ভেতরেই ভূত। অর্থাৎ পুলিশের নেতৃস্থানীয় পদেই জামাতপছন্দ আদমি বসে বসে ছড়ি ঘোরাচ্ছে! এমনটি ভাবার কোনো কারণ নেই যে জামাতশিবির নাম শুনে তাদেরকে পুলিশ পীর কামেল বা নবীপয়গম্বর ভাবছে।

২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত জামাত বিএনপির সাথে সরকারে ছিল। সে সময় তাদের হাজার হাজার ক্যাডার সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে ঢুকেছে। বিশেষ করে যে সব দপ্তর থেকে দেশের ক্ষমতার কলকাঠি নড়ে। যেমন ক্যাডার সার্ভিস, সেনাবাহিনী, তৎকালিন বিডিআর, আনসার এবং পুলিশে বেনো জলের মত তাদের কর্মী বা ক্যাডার ঢোকানো হয়েছে। তারাই আজ পেশাগত পদে সিনিয়র বা হুকুম দেয়ার ক্ষমতা অর্জন করেছে। এটা প্রায় সর্বজন বিদিত যে জামাতের পরামর্শ এবং উদ্যোগেই এলিট বাহিনী র‌্যাব তৈরি হয়েছে। সে সময় র‌্যাবে অন্তর্ভূক্ত হওয়া সদস্যদের অনেকেই জামাতশিবিরের। এটা যে কেবল সন্দেহ তা নয়। তৎকালিন বিরোধী দল বর্তমান ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মী এটা সেই সময় থেকেই প্রকাশ্যে বলে আসছেন।

বেশ। আওয়ামী লীগও যদি মনে করে এটা ঘটেছে তাহলে তারা তা প্রতিহত করার ব্যবস্থা নিচ্ছে না কেন? কেন তাদেরকে খুঁজে খুঁজে বের করছে না? কেন তাদের শাসনামলের শেষ দিকে এসে এই বিপদকে বিপদ হিসেবে বাড়তে দিচ্ছে? এই প্রশ্নে উত্তর পাওয়া যাবে ছোট্ট একটি উদাহরণে

জোট সরকার আমলে অর্থাৎ, বিএনপিজামাত শাসনামলে মানিলণ্ডারিংয়ের জন্য ইসলামী ব্যাংককে এক লক্ষ টাকা জরিমানা করেছিল সরকার। আর আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট আমলে সেই ইসলামী ব্যাংক ক্রিকেট বিশ্বকাপে দশ কোটি টাকা চাঁদা দিয়ে শেখ হাসিনার ছবি দিয়ে পোস্টার বানিয়েছিল! বিএনপিজামাত জোট আমলের মত এই মহাজোট আমলেও র‌্যাব এর হাতে ক্রস ফায়ারের সংখ্যা অগুনতি। এবং সেই আমলের মত এ আমলেও নিহতদের ভেতর একজনও জামাতশিবিরের নেতাকর্মী নেই!

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠিত হওয়ার পর থেকে বিশেষ করে জামাতের শীর্ষ নেতাদের গ্রেপ্তারের পর থেকে জামাতশিবিরের অর্ন্তঘাতমূলক কর্মকাণ্ড চলছে। সঙ্গবদ্ধ এবং পরিকল্পনামাফিকই চলছে। কোটি কোটি টাকার সরকারি সম্পত্তি ধ্বংস হচ্ছে। একের পর এক পুলিশ সদস্য আহত হচ্ছে। রাস্তাঘাটে সাধারণ মানুষ আতংকে দিশেহারা হচ্ছে। তার পরও কেন মহাজোট সরকার তাদের বিরুদ্ধে সক্রিয় হচ্ছে না? কেন সর্ষের ভেতরকার ভূত খুঁজে বের করে যথাযথ পদক্ষেপ নিচ্ছে না? যে কোনো সরকার তার নিজের লোক নিয়োগ না দিলেও ওই অপবাদ গায়ে লাগে। লাগবেই। এই সরকারও তার ব্যতিক্রম নয়। সরকার কি সর্ষের ভূত বের করলে গায়ে অপবাদ লাগার ভয়ে ভীত? এটাই এখন কোটি ডলারের প্রশ্ন।।

ঢাকা। ২৮ জানুয়ারি, ২০১৩

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s