লিখেছেন: আবিদুল ইসলাম

democracy-1-আমাদের দেশে ইতিহাস পাঠ এবং ইতিহাসবিষয়ক জ্ঞানের অবস্থা বড়ই করুণ। তরুণ সমাজের অধিকাংশ সদস্যের ইতিহাসের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার বিষয়ে পর্যাপ্ত তো দূরের কথা সামান্যতম ধারণাও নেই। বাংলাদেশের একের পর এক ক্ষমতায় আসা সরকারগুলোও জনগণের মধ্যে ইতিহাসবিষয়ক সচেতনতা সৃষ্টির কোনো চেষ্টা চালায় না। উপরন্তু সে চেতনা যাতে কোনোভাবেই না আসে সে প্রচেষ্টাই তাদের অব্যাহত থাকে। সত্যিকার ইতিহাসবিষয়ক জ্ঞানের অভাবে এখানে একটা বিষয় খুব হাস্যকর এবং একই সাথে করুণভাবে বর্তমানে দেখা যাচ্ছে। সেটা হলো নিজেদের যথেষ্ট ইতিহাস জ্ঞান আছে এরকম একটা প্রচ্ছন্ন দাবি তুলে অপরাপর যাদের একেবারেই সে জ্ঞান নেই তাদের প্রতি বিভিন্নভাবে কটাক্ষইঙ্গিত করা, তাদের দেশপ্রেম নিয়ে হাহুতাশ করা। এই দাবিওয়ালাদের ইতিহাসজ্ঞানও কিন্তু স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস, মাতৃভাষা দিবস প্রভৃতির তারিখ, মুক্তিযুদ্ধে সাত বীরশ্রেষ্ঠ এবং ভাষা আন্দোলনের শহীদদের নামএ জাতীয় সামান্য কয়েকটি মুখস্থ তথ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ। ইতিহাসের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, তার প্রকৃত তাৎপর্য এবং এর গতিপ্রকৃতির বিশ্লেষণ এগুলোর ধারকাছ দিয়েও তারা নেই। এটা ঠিক উপর্যুক্ত তথ্যগুলোও যাদের সঠিকভাবে জানা নেই, তাদের নিষ্করুণ অবস্থা নিয়ে কোনো প্রকার তর্ক করা চলে না। কিন্তু তরুণ সমাজের যে অংশ এরকম সামান্য কয়েকটি তথ্য মুখস্থ করেই নিজেদেরকে ইতিহাসবিষয়ক বিদ্যার জাহাজ মনে করে বসে আছে তাদের অবস্থাও মনস্তাত্ত্বিক কাঠামোর দিক থেকে খুবই করুণ। কিন্তু মুস্কিল হলো এদের সাথে কোনো তর্কবিতর্কেও যাওয়া যায় না। ইতিহাসের নামে তারা এতোদিন যা শিখে এসেছে তার বিপরীত অথবা অন্যথা কোনো কিছু শুনলেই তাদের মাথা বিগড়ে যায়, যারা তাদের সাথে এসব নিয়ে আলোচনা করতে যায় তাদের দিকে এমন দৃষ্টিনিক্ষেপ করে যে মনে হয় তারা যেন ভিন্ন গ্রহ হতে আগত কোনো অদ্ভুত প্রাণী! সুতরাং বিগত চার দশক ধরে শাসক গোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠিত ইতিহাসকাঠামোর পরিধির বাইরে তারা কিছু চিন্তা করতে অক্ষম এবং শুধু তাই নয়, এর বাইরে কেউ ভিন্ন কিছু চিন্তা করবে এবং সে বিষয়ে কথা বলবে এটা বরদাস্ত করতেও তারা প্রস্তুত নয়।

ইতিহাসবিষয়ে নিজেকে সমৃদ্ধ করার জন্য অনেকে আবার আশ্রয় গ্রহণ করে ইতিহাসনির্ভর গল্পউপন্যাসের। একথা ঠিক যে ঐতিহাসিক গল্পউপন্যাসে ইতিহাসের কিছু উপাদান ব্যবহৃত হয়। একজন সৎ ও দক্ষ সাহিত্যিক সে ব্যবহার যথার্থভাবে করে থাকেন। এতে যেমন ইতিহাসের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কিছুটা জানা যায়, তেমনি সাহিত্যপাঠের আনন্দও লাভ করা যায়। কিন্তু সেটা ইতিহাসের উপাদাননির্ভর হলেও চূড়ান্ত বিচারে সেটা কল্পসাহিত্যই (fiction), ইতিহাস নয়। ঠিক যেমনি বিজ্ঞান কল্পকাহিনী গোগ্রাসে গিললেই একজন পাঠকের বিজ্ঞানবিষয়ক প্রকৃত জ্ঞান অর্জন হয়েছে একথা বলা যায় না, তেমনি ইতিহাসনির্ভর গদ্যসাহিত্যের ক্ষেত্রেও সেটা সত্য। তাছাড়া, সাহিত্য রচনার সময় এর স্রষ্টার স্বাধীনতা রয়েছে তার মধ্যে নিজস্ব বক্তব্য প্রকাশের সহায়ক কিছু আখ্যান, ঘটনা ও চরিত্র ঢুকিয়ে দেয়াএবং গল্পকারঔপন্যাসিকদের এই স্বাধীনতা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিষয়। ইতিহাস বিকৃত হয়েছে এই অজুহাতে গল্পকবিতার লেখকদের ওপর খড়গহস্ত হওয়া নিম্নস্তরের ফ্যাসিবাদেরই পরিচায়ক। লেখকগণ তাদের দায়িত্ববোধ অনুযায়ী সেখানে কতোটা নিজস্ব সৃষ্টিশীলতা, কল্পনা ইত্যাদি ব্যবহার করবেন এবং আখ্যানের মোচড় (twist) কীভাবে নির্মাণ করবেন সেটা তার ব্যক্তিগত বিষয়। পাঠকের দায়িত্ব ইতিহাসকে উপজীব্য করে লিখিত এই সকল আখ্যানকে নিখাদ ইতিহাস হিসেবে ধরে না নিয়ে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে রচিত কল্পকাহিনীমূলক সাহিত্য হিসেবেই তাকে গ্রহণ করা এবং সেখানে উল্লিখিত কোনো ঘটনা অথবা বক্তব্যকে ঐতিহাসিক তথ্যসূত্র হিসেবে ব্যবহারের কথা চিন্তা না করা।

সুতরাং ইতিহাসবিষয়ক জ্ঞানচর্চার জন্য একমাত্র যে পথ রয়েছে সেটা হলো ইতিহাসের বইপত্র পাঠ। এখানেও আরেক বিড়ম্বনা। কোন বইয়ে সঠিক তথ্যবিশ্লেষণ রয়েছে সেটা সাধারণ পাঠকের পক্ষে বোঝা খুব কষ্টকর। বাজারে ইতিহাসের যে বইপত্র পাওয়া যায় তার বড় অংশই বাংলাদেশের রাজনৈতিক দল ও তাদের নেতানেত্রীদের মহিমাময় গৌরবগাঁথার বাইরে কিছু নয়। শুধু তাই নয়, এর অনেকগুলোই মিথ্যে ও ভ্রান্ত তথ্যে পরিপূর্ণ। এই বইগুলো পাঠ করে যারা ইতিহাসের জ্ঞান নামক কোনো কিছু অর্জন করবে তাদের সম্মুখে এর বিপরীত কিছু বলতে এলে তারা যে খড়গহস্ত হবে এটাই স্বাভাবিক। এর কারণ হলো পাঠ্যবইয়ে উপস্থাপিত ইতিহাস যে পাঠ্যবইয়ের প্রণয়নকারী হলো বাংলাদেশের সরকার কখনোই বস্তুনিষ্ঠ হতে পারে না। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে একথা আরো দৃঢ়ভাবে প্রযোজ্য। আমরা দেখতে পাই, বাংলাদেশে কোনো সরকার ক্ষমতাসীন হলেই তারা সব কিছু নিজস্ব সম্পত্তি বিবেচনায় দলীয়করণ শুরু করে, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নামকরণ হয় তাদের নেতানেত্রীদের নামে। সরকারি মহল থেকে সব জায়গায় চলতে থাকে তাদেরই একঘেয়ে গুণকীর্তন। একই কথা প্রযোজ্য সরকারি প্রচার মাধ্যমগুলোর ক্ষেত্রেও। কিন্তু সরকারি প্রচার মাধ্যমের কীর্তিকলাপের ওপর বীতশ্রদ্ধ হয়ে যে বেসরকারি প্রচার মাধ্যমে ভদ্র নাগরিকগণ কর্তৃক সঠিক তথ্যের দিশা খোঁজা হয়, সেগুলোর অবস্থা কী? বাংলাদেশের সামগ্রিক ক্ষমতাকাঠামোর স্বার্থবলয়ের বাইরে কি তাদের অবস্থান? মোটেও তা নয়। বরং গণমাধ্যম নামে পরিচিত এই মনস্তত্ত্ব নিয়ন্ত্রণ ও নির্মাণের হাতিয়ারসমূহের মালিকগণও এই প্রতিক্রিয়াশীল এস্টাবলিশমেন্টের অনিবার্য অংশ। সুতরাং ইতিহাসবিষয়ক জ্ঞান বিতরণের নামে তারা যেসব তথ্য “পয়দা” করেন তাতে ভাষার ক্ষেত্রে কিছু হেরফের থাকলেও চূড়ান্ত বিচারে সেগুলো সরকারি এবং প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর ঐতিহাসিক ভাষ্যেরই প্রতিরূপ।

এরকম অবস্থায় ইতিহাসনির্ভর গল্পউপন্যাস থেকে যা কিছু জানা বা শেখা যায় তাকে ইতিহাসের প্রকৃত জ্ঞান হিসেবে ধরে নিয়ে আত্মপ্রসাদ লাভের সুযোগ কতোটুকু? আমার ব্যক্তিগত বিচারে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এ ভূখণ্ডে রচিত ইতিহাসনির্ভর উপন্যাসের শ্রেষ্ঠতম উদাহরণ হলো আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের খোয়াবনামা। আরেকবার বলে বিষয়টি পরিষ্কার করি, এটা আমার নিজস্ব অভিমত। যে কেউ এর সাথে দ্বিমত পোষণ করতেই পারেন। “খোয়াবনামা” ১৯৪৭ সালের দেশভাগের অব্যবহিত পূর্ব হতে এর ঠিক পরবর্তী কিছু সময়ের পরিধিতে আবদ্ধ পটভূমিতে রচিত। এই কয়েক বছরের গুরুত্বপূর্ণ এবং ক্রান্তিকালীন সময়কে ধারণ করতে ইলিয়াস সেখানে হাজির করেছেন উত্তর বাংলার তেভাগা আন্দোলন, আঞ্চলিক পরিসরে স্থাপন করেছেন তৎকালীন বড় দুই রাজনৈতিক দল কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের পাল্টাপাল্টি সাম্প্রদায়িক রাজনীতির রূপ, গ্রামবাংলার তৎকালীন সামাজিক চেহারা, লর্ড কর্নওয়ালিশকৃত চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে সৃষ্ট নতুন ভূমিসম্পর্ক ব্যবস্থা, দখলীস্বত্বের নতুন কাঠামো এবং ক্ষমতার বিন্যাস, বর্গাচাষীদের ওপর জোতদারজমিদারমহাজনদের ত্রয়ী শোষণনিপীড়নঠকবাজি, দেশভাগ ও দেশত্যাগের রাজনৈতিক চিত্র। এসব কিছুর নিখুঁত ও বহুমাত্রিক বর্ণনা এ উপন্যাসে যেভাবে উঠে এসেছে, তা শুধু এর স্রষ্টার গভীর ইতিহাসচেতনার সাক্ষ্যই বহন করে না, বরং তার অনন্যসাধারণ সাহিত্যপ্রতিভার স্মারক এই গ্রন্থ। যে কেউ যদি গ্রহণে প্রস্তুত থাকেন, তাহলে এই পাঠে নির্মল আনন্দ তিনি লাভ করতে পারেন কিন্তু এর মধ্যে বর্ণিত ছোট ছোট ঘটনা ও চরিত্র, উদ্ধৃত সংলাপ প্রভৃতির রস প্রকৃত তাৎপর্য সহকারে আস্বাদন করতে হলে পটভূমিতে চিত্রায়িত ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কে পূর্ব ধারণা থাকা আবশ্যক। উত্তর বাংলার তেভাগা আন্দোলন, চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত, গ্রামবাংলার তৎকালীন সমাজকাঠামো, কংগ্রেসমুসলিম লীগের রাজনীতির স্বরূপ বিষয়ে পূর্ব জ্ঞান থাকার কারণে এর সামগ্রিক রস ও নির্মল আনন্দ উভয়ই একযোগে গ্রহণ করা আমার পক্ষে সম্ভব হয়েছে। একই কথা প্রযোজ্য সংশপ্তকউপন্যাসের ক্ষেত্রেও, যদিও সেটা বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগে রচিত। এ কারণে এর পরিপ্রেক্ষিত অথবা উপজীব্য নিয়ে কোনো বিস্তারিত আলোচনায় গেলাম না।

democracy-3-স্বাধীন বাংলাদেশে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে রচিত আরেকটি উপন্যাস আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়, সেটি হলো হুমায়ূন আহমেদের “জোছনা ও জননীর গল্প”। হুমায়ূন আহমেদ কোন ধারার গল্পকথক এটা আমরা সবাই কমবেশি জানি। তিনি মূলত একজন বিনোদনধর্মী লেখক। বর্তমানে বিভিন্ন চ্যানেলে প্রচারিত অধিকাংশ টেলিভিশন নাটক দেখলে যে ধরনের “মজা” বেশির ভাগ দর্শক পেয়ে থাকেন, তার উপন্যাস নামধারী অধিকাংশ সৃষ্টিকর্মই সে পর্যায়ের। একজন পেশাদার ও বাজারের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখা লেখক হিসেবে তার সৃজনশীলতাসংক্রান্ত সীমাবদ্ধতার বিষয়টি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু তিনি শক্তিমান ও গুণী লেখক ছিলেন, যদিও সে শক্তিমত্তা ও গুণ তিনি কোন খাতে ব্যয় করেছেন সেটা পৃথক বিতর্কের বিষয়। কিন্তু লেখক হিসেবে তার দৃষ্টিভঙ্গি, চরিত্র ও সীমাবদ্ধতার বিষয়টি মাথায় রেখে জোছনা ও জননীর গল্পমূল্যায়ন করতে গেলে দেখা যায় যে প্রচলিত এবং সমাজের ওপরতলা থেকে আরোপিত মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের ভাষ্য মোটা দাগে মেনে নিয়েও তিনি যা রচনা করেছেন তার মধ্যে তাৎপর্যময় কিছু উপাদান রয়েছে। আমাদের শাসক শ্রেণী কথিত মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস তাদের নেতানেত্রী থেকে শুরু করে নিজস্ব ঘরানার লোকজনের বীরত্বগাঁথায় পরিপূর্ণ। এগুলো পড়লে মনে হয় কোনো এক নেতা বিদেশের জেলখানায় থেকেই সামগ্রিক মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেছিলেন, আর কিছু নেতা অন্য একটি দেশে বসে সেদেশের পৃষ্ঠপোষকতায় যুদ্ধের যাবতীয় গতিপ্রকৃতি নিয়ন্ত্রণ করেছিলেন, আরেকজন নেতা বেতার ঘোষণার মাধ্যমে এমন অমোঘ বাণী জনতার ওপর বর্ষণ করেছিলেন যার অলৌকিক মাহাত্ম্যেই বায়বীয় প্রক্রিয়ায় এদেশে প্রতিরোধ যুদ্ধের সূচনা হয়েছিল। কিন্তু এর বাইরে কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র এবং মধ্যবিত্তের যে সন্তানেরা দেশের মাটিতে বসে সামান্য অস্ত্র হাতে বুকে দেশপ্রেম নিয়ে অসম সাহসিকতার সাথে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়েছিলেন তার আখ্যান এই অধিপতি ইতিহাসকাঠামোয় স্থান সঙ্কুলানের অভাবে ধুঁকে মরে। হুমায়ূন আহমেদ তার এই উপন্যাসে নিজস্ব বর্ণনাভঙ্গিতে তুলে এনেছেন বেশ কিছু সেইসব নামনাজানা সাধারণ মানুষের প্রতিরোধসংগ্রামের কথা, যারা কোনো ভবিষ্যত লাভের সম্ভাবনা মাথায় না রেখেই স্বদেশের মুক্তির জন্য লড়াই করতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করেছিলেন। এই উপন্যাস তাই সমাপ্ত হয়েছে অনন্যসাধারণ এক অনুচ্ছেদের মাধ্যমে

নাইমুল কথা রাখেনি। সে ফিরে আসতে পারেনি তার স্ত্রীর কাছে। বাংলার বিশাল প্রান্তরে তার কবর হয়েছে। কেউ জানে না কোথায়। এই দেশের ঠিকানাবিহীন অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধার কবরের মধ্যে তারটাও আছে। তাতে কিছু যায় আসে না। বাংলার মাটি পরম আদরে তার বীর সন্তানকে ধারণ করেছে। জোছনার রাতে সে তার বীর সন্তানদের কবরে অপূর্ব নকশা তৈরী করে। গভীর বেদনায় বলে, “আহারে! আহারে!”

কিন্তু যতোই অসাধারণ হোক এসব উপন্যাস, যতোই সত্য হোক তাদের প্রেক্ষাপট কিংবা ঘটনার বর্ণনা, “খোয়াবনামা”, “সংশপ্তক”, “জোছনা ও জননীর গল্প” কিংবা এ জাতীয় অন্য কোনো ইতিহাসনির্ভর উপন্যাস চূড়ান্ত বিচারে কিন্তু গল্পকাহিনীই। তা ইতিহাসবিষয়ক বস্তুনিষ্ঠ পাঠের কোনো বিকল্প হতে পারে না। ইতিহাস রচনার জন্য প্রয়োজন প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ, এ বিষয়ে বিভিন্ন রেফারেন্স বইয়ের সাহায্য গ্রহণ করা, প্রাপ্ত তথ্য সম্ভাব্য সব উপায়ে ক্রসচেক করে তার যথার্থতা নিশ্চিত করা, ইতিহাসবিষয়ক অর্জিত জ্ঞান কাজে লাগানো, যৌক্তিক বিশ্লেষণপদ্ধতি প্রয়োগ, পরিস্থিতিগত সাক্ষ্যের ব্যবহার, ইতিহাসের পারস্পরিক দ্বন্দ্বমূলক উপাদানগুলো বিবেচনায় নিয়ে তার বহুমাত্রিকতাকে তুলে ধরা ইত্যাদি। এসবের অভাবে ইতিহাসবিষয়ক অধিকাংশ বইপত্র সঙ্কীর্ণ দলীয় প্রচারণার হাতিয়ারে পরিণত হতে বাধ্য। বাংলাদেশে হয়েছেও তাই। ইতিহাস নামক যেসব ভাষ্য সরকারগুলো বর্তমানে পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করছে, যেসব বটিকা গেলানোয় জনগণকে ব্যতিব্যস্ত করে তুলছে, সরকারিবেসরকারি প্রচার মাধ্যমগুলো তারস্বরে যেসব ভাষ্যের বিপণন অব্যাহত রাখছে তার মধ্যে ইতিহাসের উপর্যুক্ত বৈশিষ্ট্যসমূহের পরিবর্তে স্থান পাচ্ছে জীবিত ও মৃত নিজ দলীয় নেতানেত্রীর ব্যক্তিগত বন্দনা, নির্দিষ্ট প্রতিপক্ষ দাঁড় করিয়ে তার প্রতি একদেশদর্শী দোষারোপ, সব কিছুকে সাদাকালোয় মোটা দাগে চিহ্নিত করে এর বহুমাত্রিকতাকে অস্বীকার করার প্রবণতা ইত্যাদি। সৎ ও বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস চর্চার কোনো স্থান এর মধ্যে নেই। এক্ষেত্রে সঠিক ইতিহাস কোনটা, আর কোনটাই বা সঙ্কীর্ণ দলীয় স্বার্থে রচিত ইতিহাস নামধারী আবর্জনা সেটা নিরূপণ করা যাবে কীভাবে?

এর জন্য যৌক্তিক চিন্তাকাঠামো গঠন, দ্বান্দ্বিক বিশ্লেষণী দৃষ্টিভঙ্গি অর্জন, কার্যকারণ সম্পর্কের যথার্থ সূত্রায়ন, পরিপ্রেক্ষিত বিশ্লেষণের সক্ষমতা সৃষ্টিএসবের কোনো বিকল্প নেই। ইতিহাস সাধারণত অতীতের ঘটনাবলীকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। এই অতীত কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। বিদ্যমান বর্তমান এই অতীতেরই ধারাবাহিক প্রবহমানতা মাত্র। সুতরাং আমাদের চারিদিকে প্রতিনিয়ত ঘটে যাওয়া ঘটনাবলীর দিকে যদি তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখি এবং তাদের তাৎপর্য গভীরভাবে অনুধাবন ও বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করি তাহলে এদের পরস্পরের মধ্যে গভীর সম্বন্ধসূত্র আবিষ্কার করা সম্ভব। এই সূত্রের হাত ধরে ক্রমান্বয়ে অতীতের কাছে ফিরে গেলে আমরা বর্তমানে সংঘটিত যাবতীয় ঘটনার কার্যকারণ নির্ণয় করতে সক্ষম হবো। তখনই সহজ বোধে আসবে ইতিহাসের কোন ভাষ্যটি সঠিক ও সত্য, এবং কোনটি মিথ্যা। এবং এই সত্যমিথ্যার স্বরূপ উন্মোচনের মাধ্যমে শত্রুমিত্র নির্ধারণ করার পথও সহজতর হবে।

যেকথা বলতে বসেছিলাম তাতেই ফিরে যাই। ঐতিহাসিক উপন্যাস ইতিহাসের বিকল্প হতে পারে না। ইতিহাসের বিকল্প সে নিজেই। সুতরাং তার নিজস্ব অমোঘ নিয়মেই সে স্বমহিমায় নিজের হৃত স্থানে প্রতিস্থাপিত হবে। ইতিহাসের নামে যে মিথ, গুজব, ব্যক্তিকীর্তন, দলীয় কীর্তনের আখ্যান বিগত চার দশক ধরে বহুবর্ণিল মোড়কে ও খোলসে জনগণের সামনে উপস্থাপিত হয়েছে সে রঙের মোড়ক অচিরেই খসে পড়ে তার স্বরূপ উন্মোচিত হবে এবং সঠিক ইতিহাসজ্ঞানের বলে বলীয়ান হয়ে জনগণও শোষণমুক্তির সংগ্রামকে এগিয়ে নিতে সক্ষম হবে।।

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s