peppar-sprayমারাত্মক রাসায়নিক দ্রব্যাদি মিশ্রিত পেপার স্প্রে (যাতে মরিচের গুড়া রয়েছে বলে বলা হয়) বিপজ্জনক কুকুরকে ঘায়েল করার বড় অস্ত্র। http://www.liquidfence.com-এ বলা হয়েছে, কুকুরের ক্ষেত্রে এটা একশত ভাগ কার্যকরি। শুধু কুকুর বা এ জাতীয় হিংস্র জন্তু জানোয়ার ঘায়েল করার জন্যই যে শুধু পেপার স্প্রে ব্যবহৃত হয় তাই নয়, প্রতিবাদী জনগণের প্রতিরোধ সংগ্রাম প্রতিহত করতে এই বিপজ্জনক দ্রব্যটি স্বৈরতান্ত্রিক শাসন রয়েছে এমন কোনো কোনো দেশে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। পেপার স্প্রের মতো ভয়ানক ক্ষতিকর দ্রব্যটি ব্যবহৃত হচ্ছে ১৯৭৩ সাল থেকে খোদ মার্কিন মুলুকে। এফবিআই এবং মার্কিন ডাক বিভাগ প্রথম দিকে ভয়ঙ্কর ব্যক্তি এবং জন্তু জানোয়ার ঘায়েল করতে এটি ব্যবহার করে। আর তখন থেকে কমবেশি অনেক দিন পর্যন্তই তারা এটি ব্যবহার করছে। মার্কিন বিচার বিভাগের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব জাস্টিসএর ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, পেপার স্প্রে সহিংস ও বিপজ্জনক জনগোষ্ঠীর প্রতিবাদ দমনে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। আর স্প্রে আক্রান্ত এবং ক্ষতিগ্রস্তদের আইনি হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে বলে মার্কিন সংবাদ মাধ্যমগুলোর বিভিন্ন সময় খবর দিয়েছে।

পেপার স্প্রে তীব্র শ্বাসকষ্ট, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধকতা, ক্যান্সার, চর্মরোগসহ নানা দূরারোগ্য ব্যধির কারণ হতে পারে। তাছাড়া বিশ্লেষজ্ঞদের মতে, পেপার স্প্রের কারণে মানব দেহে নানা ক্ষতিকর প্রভাব দেখা দেয়। হৃদযন্ত্রের রোগ, উচ্চ রক্তচাপ থাকলেও বিপদের মাত্রাটা অনেক বেশি। তবে শ্বাসকষ্টের তীব্রতাই এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে বেশি থাকে। বিভিন্ন সময় পেপার স্পের উপরে যে গবেষণা হয়েছে তাতে মানব শরীরে এর বিরূপ প্রভাবের ভয়ঙ্কর সব প্রতিক্রিয়ার কথা, এমনকি মৃত্যুর ঘটনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। আটলান্টাওয়্যার সংবাদ মাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, পুলিশ হেফাজতে এই পেপার স্প্রের কারণে বেশ কয়েকজনের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। মার্কিন বিচার বিভাগের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব জাস্টিসের ১৯৯৫ সালের তথ্য মতে, পেপার স্প্রের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় মধ্য ৯০এ ৭০ জনের মতো নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। নর্থ ক্যারোলাইনা মেডিকেল জার্নালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ওসি স্প্রে বা পেপার স্প্রেতে পানি, অ্যালকোহল, কার্বনডাইঅক্সাইড, হ্যালোজেনেটেড হাইড্রোকার্বন (ফ্লেয়ন, টেট্রাক্লোরোথাইলিন, মিথাইলিন, ক্লোরাইড) রাসায়নিকও ব্যবহার করা হয় যার প্রভাবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে শ্বাসপ্রশ্বাসের ব্যাঘাত ঘটিয়ে আকস্মিক মৃত্যুও ঘটতে পারে।

সাম্প্রতিক কালেও যুক্তরাষ্ট্রে পেপার স্প্রে ব্যবহার করা হয়েছে অকুপাই ওয়ালস্ট্রিট আন্দোলনের সময়। আর মানবাধিকার সংগঠনগুলো তখন এর তীব্র প্রতিবাদ জানায়। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী সে সময়, তথ্য প্রমাণ প্রমাণিত হওয়ায় পুলিশের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নেয়া হয়।

খোদ মার্কিন মুলুকে যে মানের পেপার স্প্রে ব্যবহৃত হয়, তার চেয়েও অতি নিম্নমানের স্প্রে ব্যবহার হয় দরিদ্র দেশগুলোতে, অগণতান্ত্রিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ বিক্ষোভ ঠেকাতে।

ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই নির্যাতন, নিপীড়ন, ক্রসফায়ার, গুম খুনের পরে, বর্তমান সরকারের শেষ সময়ে এসে এখন নতুন যে অস্ত্রটি ব্যবহৃত হচ্ছে তার নাম পেপার স্প্রে। দেশের মানুষ এ নতুন ‘ভয়াবহ, মারাত্মক নিপীড়ন ও হত্যা কৌশল’ সবে প্রত্যক্ষ করেছে। আর এই কৌশলের স্প্রের প্রথম শিকার প্রতিবাদী দরিদ্র স্কুল শিক্ষকরা। পেপার স্প্রের প্রতিক্রিয়া সইতে না পেরে একজন স্কুল শিক্ষক নিহত হয়েছেন। এই স্প্রে দুটি বাম দলের হরতালের সময়ও ব্যবহৃত হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, পেপার স্প্রের বিরূপ প্রতিক্রিয়া বর্তমান তো অবশ্যই বাকি জীবনেও নানা শারীরিক জটিলতার সৃষ্টি করতে পারে। বহুক্ষেত্রে এটি হতে পারে জীবনী শক্তিনাশক, ধীরে ধীরে প্রাণহরণকারী একটি উপাদানে।

অথচ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহিউদ্দিন খান আলমগীর এই পেপার স্প্রের পক্ষে সাফাই গাইতে গিয়ে বলেছেন, ‘এই স্প্রেতে মানুষ মরে না।’ তিনি ১৮ জানুয়ারি বলেছেন, ‘নিরাপত্তা কর্মীরা অবৈধ সমাবেশ দমন করতে নিশ্চয় ফুলের মালা নিয়ে যাবে না। বরং দমনের উপকরণ নিয়েই যাবে।’ ক্ষমতাসীনদের দিক থেকে এ জাতীয় বক্তব্য নতুন কিছূই নয়। এর আগেও তারা এই ধরনের বক্তব্য অসংখ্যবার দিয়েছেন। এই ধরনের বক্তব্য তারা দিয়েছেন, তথাকথিত ক্রসফায়ার, খুন, গুমসহ নির্যাতননিপীড়ন এবং জনগণের ন্যায্য দাবিদাওয়া জানানোর প্রতিবাদ সমাবেশ ভেঙে দেয়ার ক্ষেত্রে।

ইতোমধ্যেই মানবাধিকার সংগঠনগুলো পেপার স্প্রের মতো মারাত্মক উপাদান ব্যবহার করায় সরকারের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তারা বলেছেন, এটি কোনো ক্রমেই আইনসম্মত নয়, রীতিমতো মানবাধিকার লঙ্ঘন।

আইন শালিস কেন্দ্রের প্রধান অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল তার প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, ‘কোনো আইনেই পেপার স্প্রে ব্যবহার গ্রহণযোগ্য নয়। সংবিধানে যেখানে জনগণের অধিকারকে বৈধতা দেয়া আছে, তাতে এটি ব্যবহারে সংবিধান অনুমোদন দেয় না।’ তিনি আরো বলেন, ‘কোনো কোনো রাষ্ট্র হয়তো এটা ব্যবহার করতে পারে, কিন্তু তাতে এর বৈধতা পাওয়া যায় না। পেপার স্প্রে সম্পর্কে যে খবরাখবর ও তথ্যাদি পাচ্ছি, তাতে এর ফলে ক্যান্সার, দৃষ্টিহীনতা, শ্বাসকষ্টজনিত রোগ হতে পারে। এমনকি আক্রান্ত মানুষদের নানা দুরারোগ্য ব্যধি হতে পারে। একটি যে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে, অনেকেরই ধারণা, তা পেপার স্প্রের কারণেই হয়েছে। আইন কিংবা মানবাধিকার যে দৃষ্টিতেই দেখা হোক আমরা স্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই, পেপার স্প্রে ব্যবহার কোনো ক্রমেই গ্রহণযোগ্য নয়।’ সুলতানা কামাল বলেন, ‘আরেকটি বিষয় এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য, ডাম্পিং বা নিজ দেশে ব্যবহার অনুপযোগী বা ব্যবহারে বাধা থাকলে তা অন্য কোন দেশকে দিয়ে দেয়া হয়। কাজেই ওই সব দেশ তা ব্যবহার করতে পারছে না। আর পারছে না বলেই আমাদের মতো দেশগুলোতে সানন্দে তারা পাঠিয়ে দিচ্ছে এবং আমরা তা গ্রহণ করছি। হয়তো তারা এটাও বলবে যে, এটা খুবই কার্যকরি একটা উপায়।’ তিনি বলেন, ‘যেহেতু পেপার স্প্রে মানুষের শারীরিক, দৈহিক ক্ষতি করতে পারে, এতে দুরারোগ্য ব্যধি হতে পারে কাজেই আমরা মানবাধিকার কর্মীরা এ ব্যাপারে একমত যে, পেপার স্প্রে ব্যবহার অন্যায় এবং এটা অবিলম্বে বন্ধ করা উচিত।’

মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের মহাসচিব আদিলুর রহমান খান বলেন, এটা একটা নিবর্তনমূলক পদ্ধতি। গণরোষ, গণপ্রতিরোধ এবং জনগণের প্রতিবাদ সংগ্রাম দমনের হাতিয়ার হিসেবেই এটা অগণতান্ত্রিক শাসকরা ব্যবহার করে থাকে। তিনি বলেন, ইসরাইলিরা ন্যায্য দাবিতে বিক্ষোভকারী ফিলিস্তিনিদের উপরে এই পেপার স্প্রে ব্যবহার করে। আর পাগলা কুকুরকে দমনের জন্য এটি একটি বড় অস্ত্র বলেই আমি জানি। তিনি বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অকুপাই ওয়ালস্ট্রিটের সময় পুলিশ পেপার স্প্রে ব্যবহার করেছিল এবং পরিণতিতে ওই পুলিশদের চাকরি হারাতে হয় এবং ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দিতে হয়েছে।

পুলিশের সাবেক আইজি নূরুল হুদা বলেন, মারাত্মক অস্ত্র, তা যেকোনো সময়ই হোক, ব্যবহার না করাটাই উত্তম।।

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

(আন্তরিক ধন্যবাদ “আমাদের বুধবার”কে)

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s