রাজনীতি, সংস্কৃতি ও মতাদর্শ

Posted: জানুয়ারি 17, 2013 in অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক, দেশ, প্রকৃতি-পরিবেশ, মতাদর্শ, সাহিত্য-সংস্কৃতি
ট্যাগসমূহ:, , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , ,

লিখেছেন: বন্ধু বাংলা

প্রথম ভাগ ভূমিকা:

আজকাল নতুন প্রজন্মের কাউকে রাজনৈতিক আদর্শের বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হলে; প্রচলিত অন্তঃসারশূন্য রাজনৈতিক অবস্থার উদহারণ টেনে গর্বের সঙ্গে বলে, ‘আমি কোন দল করি না। আমার কোন মতাদর্শ নাই’। ইন্টারনেটে সামাজিক যোগাযোগের সাইট, ফুসবুকে অনেকের প্রোফাইল স্ট্যাটাসে দেখা যায়; দেয়া থাকে No political view”। অনেকে আবার এ জাতীয় উত্তরকে আরও বেশি উচ্চ ডিগ্রীতে নিয়ে বলে, I hate politics। অনেকে উদাররূপে নিজেকে উদারনৈতিক জাহির করে, যা বস্তুত মতাদর্শহীন দেউলিয়াত্ব। এরূপ মতাদর্শহীন রাজনৈতিক অবস্থানের পক্ষে তারা যে সব ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ প্রদান করেন, সেটা অন্তঃসারশূন্য স্থূল চিন্তার পরিচায়ক। ব্যক্তির মতাদর্শহীন রাজনৈতিক অবস্থানকে রাজনৈতিক সচেতনতার অংশ ভাবা যায় না, অচেতন চিন্তাই তাকে মতাদর্শহীন বা রাজনৈতিকভাবে অসচেতনতার দিকে ধাবিত করে। এটা কোন রূপেই রাজনৈতিক সচেতনতার অংশ নয় বরং চূড়ান্ত বিচারে রাজনৈতিকভাবে অসচেতনতারই অংশ।

এটা ঠিক যে একটা সময়ে বাঙালিরা রাজনীতি সচেতন হয়ে উঠেছিল। ব্রিটিশ উপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে যে লড়াই সংগ্রাম; বিশেষ করে উনিশ শতকের শুরুতে বঙ্গ ভঙ্গ নিয়ে যে আন্দোলন বা দেশ বিভাগের পর পাকিস্তানি শোষনের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন সংগ্রাম, ‘৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ’ এসবই বাঙালির রাজনৈতিক সচেতনতার প্রমাণ বহন করে। কিন্তু আজকে যারা রাজনৈতিকভাবে মতাদর্শহীন, তাঁরা কেন এমনটি ভাবে? এর ছোট একটি উত্তর হলো, পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক সমাজ ব্যবস্থা ও আমাদের পরিবর্তিত সংস্কৃতি। মানুষ সামাজিক জীব হওয়া সত্ত্বেও পুঁজিবাদ কর্তৃক সৃষ্ট আজকের ব্যক্তিকেন্দ্রিক জীবনযাপন ব্যবস্থা এর জন্য দায়ী মূলত। অর্থাৎ, ভোক্তা বা ক্রেতা সৃষ্টিকারী পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা আমাদের সমাজ ও অন্যান্য সামাজিক ও পারিবারিক কাঠামো দুর্বল করে দিয়ে সংস্কৃতির ভিতর থেকে যে আমূল পরিবর্তন ঘটাচ্ছে; এর প্রভাব পড়েছে আমাদের রাজনীতিতে, সংস্কৃতিতে, চিন্তাচেতনায়, সামগ্রিক জীবন বোধে। সংস্কৃতির পরিবর্তনের প্রভাব রাজনীতির উপরে পড়ে। রাজনীতি নিজেই সংস্কৃতির একটি অংশ। আজকের সমাজ বাস্তবতায় সামাজিকভাবে সমষ্টিকের নয়, একক ক্রেতা রূপে ব্যক্তির জয় জয়কার। জয় জয়কার সে শ্রেণী ব্যক্তির, যার ক্রয় করার ক্ষমতা আছে। পরস্পর সামাজিক সম্পর্কের সম্বন্ধযুক্ত উপাদান যেমন সংঘবদ্ধ মানুষ, পারস্পরিক ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া ও সচেতনতা, সহযোগিতা, পরস্পর নির্ভরশীলতা ইত্যাদি সামাজিক সম্পর্কের স্থলে ঠাই করে নিয়েছে ব্যক্তিকে অপর ব্যক্তি থেকে বিচ্ছিন্নকরণের প্রক্রিয়া। ব্যক্তিকে ক্রেতায় রূপান্তর ও মুনাফার সম্পর্ক, ভোগবাদী স্বার্থবাদী সম্পর্কের ফলে সর্বত্র হিসাব একটাই – ‘আমার লাভ কিসে, আমার ক্ষতি কিসে?’ লাভ আর ক্ষতির এই স্থূল হিসাব নিকাশ মতাদর্শহীনতাকে উস্কে দিচ্ছে! সেইসাথে কর্পোরেট পুঁজি, কর্পোরেট মিডিয়া, কর্পোরেট সংস্কৃতি খুব সূক্ষ্মভাবে মানুষকে মতাদর্শহীন একটি দু’পায়া প্রাণীতে রূপান্তরিত করে যাচ্ছে।

একটা সময় ছিল যখন বাংলাদেশে একান্নবর্তী পারিবারিক কাঠামো ছিল। যৌথ শ্রম ব্যবস্থা ছিল। একটা উদহারণ দেয়া যেতে পারে যেমন যৌথ শ্রম, যৌথ আহারের মত যৌথ বিনোদনরূপে গ্রামবাংলায় এক সময়ে হুঁক্কার প্রচলন ছিল। ৫৬ জন ধূমপায়ী মানুষ বৃত্তাকারে এক সাথে বসে হুঁক্কার ঘড়ঘড় আওয়াজের সাথে সাথে ভাগ বসাত পরস্পরের গালগল্পে, ব্যক্তিকপারিবারিক ও সামাজিক সমস্যায়। সচেতনতা ও সমাধান উঠে আসত এসব পারস্পরিক আলোচনায়। গ্রামীণ সংস্কৃতির অংশরূপে এর ইতিবাচক সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব ছিল। কিন্তু পুঁজির একটি পণ্য সিগারেটকে যদি এই হুক্কার বিপরীতে দেখি, তবে দেখতে পাব, এই সংস্কৃতি আমূল পরিবর্তিত হয়ে একান্ত ব্যক্তিকেন্দ্রিক পুঁজিবাদী সংস্কৃতিতে রূপ নিয়েছে। একাই টানছি, একাই ভাবছি। এই পুঁজিবাদী সংস্কৃতি শেখাচ্ছে নিজে বাঁচো অর্থাৎ “চাচা, আপন প্রাণ বাঁচা” বা “নিজে বাঁচলে বাপের নাম” এই জাতীয় স্বার্থবাদী চিন্তা চেতনা!

দ্বিতীয় ভাগসংস্কৃতি, সভ্যতা ও মানুষের রাজনীতি:

মানুষ রাজনৈতিক জীব। প্লেটো তার Philebus গ্রন্থে তিন ধরণের জীবন নিয়ে কথা বলেছেন। অ্যারিস্টটল এ প্রসঙ্গে তিন ধরণের জীবন নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তাদের পার্থক্য করেছেন ঠিক এভাবেই; এক ধরণের জীবন হলো দার্শনিকের জীবন (bios theo retikos), ভোগ বা বিনোদনের জীবন (bios apolaustikos), ও রাজনৈতিক জীবন (bios politokos)। মানুষের রাজনৈতিক জীবন (bios politokos) অন্য দুই জীবন থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। অ্যারিস্টটলের ‘পলিটিক্স’ গ্রন্থের একটি বিখ্যাত উক্তি হলো, ‘মানুষ রাজনৈতিক জীব (politokon zoon)। মানুষ প্রাণধারী কোন ইতর শ্রেণীর প্রাণীবিশেষ বা জীব নয়। অন্যান্য প্রাণীর সঙ্গে মানুষের পার্থক্য হচ্ছে জীবের জীবন আছে কিন্তু তাতে কোন রাজনীতি নেই, অন্য কোন জীবের মুখের ভাষা নেই। কিন্তু মানুষের একটি জীবন আছে যা রাজনৈতিক। মানুষের মুখে একটি ভাষা আছে, যে ভাষা রাজনৈতিক।

রাজনীতি মানেই মানুষের সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ও অর্থনৈতিক ‘মুক্তির সংস্কৃতি’। ‘মুক্তি’ নামক শব্দটির সর্বোচ্চ অভিব্যক্তি বা রূপ হলো সুন্দর জীবন। সুন্দর জীবনের চেয়ে সুন্দর আর কিছু নেই। সুন্দর জীবন সৃষ্টিই সংস্কৃতির লক্ষ্য, তেমনি অনুঘটক রূপে রাজনীতিরও সর্বোচ্চ লক্ষ্য ঐ সুন্দর জীবন সৃষ্টি। রাজনীতি সংস্কৃতির অংশ, আবার আমাদের সমাজ নানা শ্রেণীতে বিভক্ত, সেইসাথে রাষ্ট্রের অধীন। তাই রাজনীতি নিয়ে আলোচনায় অবধারিত রূপে চলে আসে সংস্কৃতি, সভ্যতা ও শ্রেণীর ইতিহাস; রাষ্ট্রের ও শ্রেণীর সংস্কৃতি কি এবং কেন?

রাজনীতি যেহেতু সংস্কৃতির অংশ, তাই সভ্যতা ও শ্রেণী ইতিহাসের আগে আমরা সংস্কৃতির বিষয়ে একটু ধারণা নিই। সংস্কৃতি শব্দটি বাংলা ভাষায় ১৯২২ সালে বাংলায় প্রথম ব্যবহার করার পর থেকেই এর সঠিক প্রতিশব্দ গঠন নিয়ে শুরু হয়েছে জটিলতা বা মারামারি! ‘কালচার’ শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ রূপে সংস্কৃতি শব্দটি চালু করার জন্য রবীন্দ্রনাথ রীতিমত কুস্তী লড়েছিলেন। ‘কালচার’ শব্দের প্রতিশব্দ রূপে ‘কৃষ্টি’কে তিনি বর্জন করেছেন। কারণ ‘কৃষ্টি’ মানে কর্ষণ যা কৃষিকাজের সঙ্গে সম্পর্কিত, জমিদার নন্দন সাহিত্যিক রবি বাবুর এটা ভাল লাগেনি। তাই সংস্কৃতি অর্থে জীবনের, চিন্তার বা মনের কর্ষণ নয়; জীবনের, চিন্তার বা মনের সৃজন অর্থে সংস্কারকেই তিনি গ্রহণ করেছেন, শিল্প সাহিত্যের সৃজনশীলতার এক খাটো ও বাধা নিয়মে। এ থেকে তাঁর মনোজগতের কাঠামোটিও খানিকটা বুঝা যায়। বিশেষ করে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের দৈনন্দিন জীবনের নানা ব্যক্তিগত ও সামাজিক চিন্তা, কর্মকাণ্ড, বিনোদন, দুঃখসুখের সাধারণ অনুভূতিকে অর্থাৎ সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের সংস্কৃতিকে, সংস্কৃতির মর্যাদা দিতে রবি বাবু চাননি; স্থূল চিন্তা রূপেই দেখেছেন। শিল্পসাহিত্যের মতো সূক্ষ্মতম অনুভূতির চর্চাকে তিনি সংস্কৃতির মর্যাদা দিয়েছেন। [সূত্র: কৃষ্টি কালচার সংস্কৃতি, নীহার রঞ্জন রায়]

সংস্কৃতি বলতে মানুষের আচার আচরণ অভ্যাস, জীবন যাপন পদ্ধতির উৎকর্ষতা বুঝলেও সংস্কৃতি সব সময় উৎকর্ষতার দিকে ধাবমান থাকে না। সংস্কৃতির সাধারণ ধারণা বা সংজ্ঞাকে আমরা বুঝতে পারি সমাজবিজ্ঞানী ইবি টেইলরের মতানুসারে, সংস্কৃতি হচ্ছে মানুষের জ্ঞান, বিশ্বাস, আচারব্যবহার, ভাষা, খাওয়াদাওয়া, নৈতিকতা, মূল্যবোধ সব কিছুই সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত”। অথবা নর্থের মতো করে বলা যায়, কোনো সমাজের সদস্যরা বংশ পরম্পরায় যে সব আচার, প্রথা ও অনুষ্ঠান উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করে তাই সংস্কৃতি”। সমাজবিজ্ঞানী ক্লাইড ক্লাকহোন ও উইলিয়াম কেলির মতে, “Historically created designs for living, explicit and implicit, rational, irrational and nonrational which exist at any time as potential guides for the behavior of men”। অর্থাৎ, ঐতিহাসিকভাবে সৃষ্টি হওয়া জীবনযাপনের নানা ছক (ডিজাইন), যা কখনো প্রকাশ্য কখনো গোপন, কখনো যুক্তিসম্মত, কখনো অযৌক্তিক, কখনো যুক্তি নিরপেক্ষ (অর্থাৎ, যেখানে যুক্তিঅযুক্তির প্রশ্ন তোলাই অবান্তর) এবং যা যেকোন সময়ে একটি জনগোষ্ঠীর আচরণকে পরিচালিত করে তাইই হচ্ছে সংস্কৃতি। সংস্কৃতি বলতে একটি জাতির প্রতিটি অনুষঙ্গকেই আমরা বুঝি। যেমন, পোশাকআশাক, পেশা, খাদ্যাভ্যাস, ঘরবাড়ির প্যাটার্ন থেকে শুরু করে তার বিশ্বাসঅবিশ্বাসসংস্কারকুসংস্কার ইত্যাদি সবই সংস্কৃতির অঙ্গ। অবশ্য এই চিন্তাটি নতুন কিছু নয়। সমাজ বিজ্ঞানী হারস্কোভিটস এর মতে, “culture is the man made part of the environment”। বিশ্ব ভারতীর উপাচার্য অধ্যাপক পবিত্র সরকার এটিকে ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে মানুষ আসার আগে পৃথিবী যে অবস্থায় ছিল আর মানুষ আসার পর পৃথিবীর যে অবস্থা দাঁড়ালো, এই দুইয়ের তফাৎ হলো সংস্কৃতির তফাৎ। পৃথিবীর জীবন প্রতিবেশে মানুষের সৃষ্ট যা কিছু সে সবই সংস্কৃতি বাকিটা প্রকৃতি [সূত্র: লোকভাষা লোকসংস্কৃতি, পবিত্র সরকার]। এ সংজ্ঞামতে বলা যায়, মানুষ যা সৃজন করে তাই সংস্কৃতি, তবে অবশ্যই এই সৃজনশীলতা রবি বাবুর শিল্প সাহিত্যের গণ্ডী পেরিয়ে আরও ব্যাপক অর্থে। আর যদি এই সৃজনশীলতায় নেতিকরণ কিছু থাকলে তাই অপসংস্কৃতি। বস্তুত এই রূপ অপসংস্কৃতি নিজ গুনে সৃজনশীলতার বাইরে অবস্থান করে।

সংস্কৃতি হলো নিজের কিংবা নিজেদের আচারআচরণ ও দৃষ্টিভঙ্গির সংস্কার সাধন। সংস্কৃতিতে বদলে যাওয়ার ও বদলে দেওয়ার বিষয় আছে। মানুষের সত্তায় সংস্কৃতি চেতনা রয়েছে। এর বিকার ঘটলেই দেখা দেয় অপসংস্কৃতি”(বাংলা বিভাগের সুপার নিউমারারি আবুল কাসেম ফজলুল হক )। অর্থাৎ মানুষ তার সংস্কৃতি সৃজন করে, বদলে দেয় বা বদলে নেয়। এ ক্ষেত্রে চীনের মহান বিপ্লব বা রুশ বিপ্লবকে উদহারণ রূপে দেখতে পারি, যা সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের সংস্কৃতিকে ঊর্ধ্বে স্থান দেয়ার জন্য বিদ্যমান প্রচলিত সমাজ ও সংস্কৃতিকে আমূল বদলে দিল; রুশ ও চীনের মানুষ এই বদলে দেয়াটা করে দেখাল।

সংস্কৃতির সাথে সভ্যতার সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। সভ্যতাসংস্কৃতির নানা পথ পরিক্রমা শেষে আজকের পুঁজিবাদী সমাজ। এই পথ পরিক্রমাই হল সভ্যতার ইতিহাস, সংস্কৃতির ইতিহাস অন্য কথায় মানুষের শ্রেণী ইতিহাস। একটা সময়ে মানুষ শ্রেণীহীন ছিল, বিকশিত সমাজে কিভাবে মানুষের মাঝে নানা শ্রেণীর জন্ম নিলো? কিভাবে শাসক ও শাসিতের সম্পর্ক তৈরি হলো? এ প্রশ্নের উত্তর জানা না থাকলে ‘সমাজ ও সংস্কৃতি’কে আমূল বদলে দেয়ার কাজটি আর হয়ে উঠে না। মানুষের সমাজ বিকাশের ধারা অর্থাৎ শ্রেণী ইতিহাস সম্বন্ধে কিঞ্চিৎ সম্যক জ্ঞান লাভ করতে পারলে ‘সমাজ ও সংস্কৃতিকে আমূল বদলে’ দেয়ার বিষয়টি অনুধাবন করা সহজ হয়। পূর্বেই উল্লেখ করেছি রাজনীতি, মতাদর্শ ইত্যাদি নিয়ে আলোচনায় সভ্যতা ও শ্রেণীর ইতিহাস, রাষ্ট্রের ও শ্রেণীর সংস্কৃতি, শ্রেণীর সংগ্রাম, পুঁজিবাদ, সাম্যবাদ চলে আসবে; তাই এক্ষেত্রে উপরোক্ত বিষয়সমুহ অনুধাবনে সমাজ ও সভ্যতার বিভিন্ন ধাপের একটা সহজ সরল ও পাঠ নেয়ার দরকার আছে বলেই মনে করছি। অর্থাৎ ধরে নিচ্ছি নিছক মতাদর্শহীন পাঠককুলের কাছে এ পাঠ অজানা বা ভাসা ভাসা বিস্মৃত পাঠ; যার কারণে আদর্শ নিরূপণে তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক সমস্যা হচ্ছে।

তৃতীয় ভাগ সমাজ ও সভ্যতার বিভিন্ন ধাপ ও সমাজতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা:

সংস্কৃতির সাথে সমাজ ও সভ্যতার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। সভ্যতার বিকাশের সাথে সংস্কৃতির বিকাশ ঘটেছে। অতীতের সংস্কৃতি ও সভ্যতা বিবর্তনের পথ পরিক্রমায় আজকের অবস্থানে এসে পৌঁছেছে। প্রত্নতাত্ত্বিকরা সমাজ ও সভ্যতার বিকাশকে ভাগ করেছেন প্রাচীন প্রস্তর যুগ, নব্য প্রস্তর যুগ, ব্রোঞ্জ যুগ, লৌহ যুগ এভাবে ভাগ করে। কিন্তু সমাজ বিজ্ঞানীগন সমাজের বিকাশকে ভাগ করেছেন কালের নিয়মে, মানুষের সংস্কৃতি ও জীবন যাপন পদ্ধতি, উৎপাদন সম্পর্ক সর্বোপরি মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্কের উপর ভিত্তি করে।

() আদিম সাম্যবাদী সমাজ:

৫ লাখ থেকে ১০ হাজার বৎসর পূর্ব পর্যন্ত ছিল আদিম সাম্যবাদী সমাজ। এসময়ে মানুষ মূলত ফল সঞ্চয় ও শিকারের দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করত। কাঠ, পাথর এবং হাড়ের অস্ত্রশস্ত্র ছিল শিকার অর্থাৎ উৎপাদন সাধনের হাতিয়ার। সঞ্চয়ের সুযোগ কম থাকায় সম্পত্তিও সৃষ্টি হত কম। কিন্তু এই কম সম্পত্তিতে সবার অধিকার থাকত কারণ, সবার সম্মিলিত শ্রমে এই সম্পত্তি অর্জিত হত। তাই আদিম সাম্যবাদী যুগে কোন শ্রেণী ছিল না। শ্রেণী শাসন ছিল না। ধর্ম ছিল না। ‘আমি’ জাতীয় ভাষা দ্বারা মানুষের পৃথক কোন অস্তিত্ব ছিল না। নারী ছিল গোত্র প্রধান তাই এ সমাজকে মাতৃতান্ত্রিক সমাজ বলা হয়।

সভ্য মানব সমাজ:

এ যুগে মানুষের নানা রকম শ্রম বিভাগ তৈরি হওয়ায় পণ্যের উৎপাদন ও বিনিময় বৃদ্ধি পায়। সভ্যতার বিশ্লেষণ করতে গিয়ে এঙ্গেলস বলেছেন, সমাজ বিকাশের একটি বিশেষ অবস্থার নাম সভ্যতা; এতে শ্রমবিভাগ, শ্রমজাত পণ্যের বিনিময় ও শ্রম বিভাগের সাথে সম্পর্কিত পণ্যের উৎপাদন পূর্ণতা লাভ করে। এর ফলে আগের সমাজ ব্যবস্থায় এ সময়ে এক বিপ্লবকারী পরিবর্তন উপস্থিত হয়”। পণ্য উৎপাদনের যে অবস্থায় এসে সভ্যতার বিকাশ আরম্ভ হয়, সে সম্বন্ধে এঙ্গেলস উল্লেখ করেছেন, আর্থিক দিক থেকে এর বিশেষত্ব হচ্ছে, () মূল্যবান ধাতুর সাথে মুদ্রা, পুঁজি ও সুদের ব্যবসার আরম্ভ, () উৎপাদক ও ক্রেতার মাঝে নতুন এক মধ্যসত্ত্বাকারী বর্গ বা ব্যবসায়ী শ্রেণীর উদ্ভব, () ভূমির উপর ব্যক্তির মালিকানা বা ভূস্বামী অধিকার () উৎপাদন প্রক্রিয়ার পূর্বের তুলনায় অধিক হারে দাসশ্রম নিয়োজিত করা। সভ্য সমাজে পরিবার, রাজনীতিকে বিশেষত্ব ও ব্যক্তিক সম্পত্তিতে পরিণত হওয়া সম্বন্ধে এঙ্গেলস এর বক্তব্য; সভ্য যুগে পরিবারের যে গতি দেখা যায়, তাহাতে এক বিবাহ, স্ত্রীর উপর পুরুষের শাসন এবং পূর্বের সামুহিক সম্পত্তি বিভিন্ন পরিবারের মধ্যে বণ্টন তথা উত্তরাধিকারের ধারণা জন্ম লাভ করাই এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল। এ সময়েই নিপীড়িত ও শোষিত মানুষকে আয়ত্ত রাখার জন্য কৌশল রূপে সৃষ্টি হয় রাজা ও রাজ্য ব্যবস্থা। এ সভ্য সমাজে এসে ব্যক্তির সাথে ব্যক্তির সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যম রূপে, রাজ্য তাঁর ক্ষমতা প্রয়োগ করে। রাজ্য সকল সময়, সকল অবস্থায় ধনিক শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষা করত এবং ধনিক শ্রেণীর রাজ্যে পরিণত হত। এই সভ্য সমাজের অন্যতম আরও বৈশিষ্ট্য হলো, সামাজিক শ্রম বিভাগের উপর ভিত্তি করে নগর ও গ্রামের মাঝে বিরোধ স্থাপন করা এবং সকল সম্পত্তিকে অপরের অধিকারের বৈধতা প্রদানের ব্যবস্থা করা। আদিম সাম্যবাদী সমাজের পর থেকেই ব্যক্তি সমাজের সমষ্টির স্বার্থ অপহৃত হয়ে এর স্থলে ব্যক্তির স্বার্থ ও ব্যক্তির সম্পত্তি একমাত্র লক্ষ্য হয়ে দেখা যায়। এরূপ ব্যক্তি স্বার্থপূর্ণ সমাজকে সমাজ বিজ্ঞানীরা তিনটি উপরিভাগে ভাগ করেছেন– () দাস সমাজ বা যুগ () সামন্তবাদী সমাজ বা যুগ এবং () শিল্প যুগের পুঁজিবাদী ব্যবস্থা।” (সূত্র: ৯ম ও ১০ম শ্রেণীর পাঠ্য সমাজ বিজ্ঞান)

() বর্বর বা দাস সমাজ:

এই বর্বর সমাজকে অনেক সমাজ বিজ্ঞানী পশু পালন সমাজ নামে অভিহিত করে থাকে। এ পর্যায়ে এসে মাতৃতান্ত্রিকতার স্থলে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠিত হয়। পুরাতন অস্ত্র শস্ত্রের সাথে সাথে তামা আবিষ্কার হওয়ায় যুক্ত হয় তীর ধনুক, বল্লম, তলোয়ার ইত্যাদি। জীবিকার ধরণ কৃষি ও পশু পালন হওয়ায় সঞ্চয় ও সম্পদ বৃদ্ধির মাধ্যমে ব্যক্তিগত সম্পদ সৃষ্টির সুযোগ হয়। মানুষ ব্যক্তির অস্তিত্ব ও ব্যক্তি সম্পত্তির ধারণা লাভ করে। লড়াইয়ে আগে যেখানে শত্রুকে বধ করা হত, শ্রমের উপযোগিতা বাড়ায় এ সমাজেই এসে মানুষ শত্রুকে বন্দী এবং দাস রূপে ব্যবহার করা শিখল। শোষণ রূপে উদ্ভব ঘটে দাস ব্যবস্থার। অর্থাৎ কাজ বা উৎপাদনের ক্ষেত্রে দাসত্বের মাধ্যমেই মানব সমাজে শ্রম বিভাগের সৃষ্টি হয়। দাসের শ্রমেই জগতকে সমৃদ্ধশালী ও রাজ্য গঠন সম্ভব হয়। সমাজে দুই বিরোধী শ্রেণী শাসক ও শোষিতের সৃষ্টি হয়। গোত্র প্রধান হয়ে পড়ে পুরুষ। ধর্ম রূপে আসে প্রকৃতি ও জড় বস্তুর পূজা অর্চনা।

() সামন্তবাদী সমাজ:

প্রধানতঃ খ্রিস্টপূর্ব ৩৫০০ থেকে সতেরশো শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত ছিল সামন্তবাদী সমাজের ব্যাপ্তি। কৃষিকাজের আবিষ্কার পূর্ববর্তী সমাজে বিদ্যমান থাকলেও এ স্তরে এসে মানুষ কৃষিকাজকে জীবিকার প্রধান উপায় রূপে আবিষ্কার করে। যাযাবর মানুষ এ পর্যায়ে এক স্থানে বসবাস করা শুরু করে। এ সময়ের অন্যতম আবিষ্কার হস্ত চালিত ও শক্তি চালিত শিল্প। শাসক ও শোষিতের শ্রেণীতে বিভক্ত হওয়ায় শাসনযন্ত্র ও রাজ্য ধনিদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। বিক্ষিপ্ত ভাবে বসবাস করা ধনিক সম্প্রদায় নিজেদের স্বার্থ ও অন্য অঞ্চলের সম্পদের উপর লোভাতুর হয়ে নিজেদের মধ্যে সামন্ত রাজা বা শাসনকর্তা ঠিক করে নেয়। এ সময়েই অন্যান্য ধনবান গোষ্ঠীর সঙ্গে সংঘর্ষে জয়লাভের নিমিত্তে তৈরি হয় যোদ্ধা বাহিনী বা সৈন্য বাহিনী। লোহা ও তামা সহ বিভিন্ন ধাতুর আবিষ্কারের ফলে নানা ধরণের ধাতুর হাতিয়ার ও অন্যান্য তৈজস পাত্রের প্রচলন ঘটে। পূর্বেকার হাতিয়ার সমূহ আরও সূক্ষ্ম ও কার্যকররূপে ব্যবহৃত হতে থাকে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে পিতৃসত্ত্বা স্থায়ী রূপে শিকড় বিস্তার করে। এক বা বহু বিবাহের সাথে নারীর দেহ বিক্রি বা বেশ্যাবৃত্তির প্রচলন ঘটে। উৎপাদনের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত উৎপাদন পদ্ধতি বজায় থাকলেও সমাজে তৈরি হয় নানা ধরণের শ্রম বিভাগ। এর ফলে সমাজে নানা শ্রেণীর উদ্ভবের সাথে সাথে শ্রেণী বৈষম্য প্রকট হয়। বিভিন্ন প্রাকৃতিক ও জড় পূজার অর্থাৎ বহুঈশ্বরবাদের স্থলে জন্ম নেয় একেশ্বরবাদী ধর্ম। তবে এ সময়ে নাচ, গান, চিত্র কর্ম, উৎসব ইত্যাদি শিল্পকলার আবিষ্কার ছিল অন্যতম ঘটনা।

শিল্প যুগ সমাজ:

পূর্বেকার সমাজ ব্যবস্থার পরিবর্তনের প্রধান কারণ, জীবনধারণের উপযোগী নানা প্রয়োজনীয় বস্তুর উৎপাদন শক্তি ও মানুষের সাথে এর সম্পর্ক পরিবর্তন। আদিম সাম্যবাদী সমাজে শ্রম বিভাগ ছিল না, ধাতব বস্তুর ব্যবহার তাঁর জানা ছিল না। সামান্য দক্ষ হাত ও আদিম কাঠ পাথুরে হাতিয়ারে প্রাথমিক শিল্প সাধন যতটুকু করতে পারত, তাতে উৎপাদন কম হত এবং শ্রম বেশি লাগত। উৎপাদন শক্তি ও মানুষের সাথে এর সম্পর্ক ছিল গোষ্ঠীগত। কিঞ্চিত সম্পদ যা তা ছিল গোষ্ঠীগত। সামন্তবাদী সমাজেও উৎপাদনশীলতার একটা মাত্রা ছিল, ফলে ব্যক্তির অধীনে সম্পদ অর্জনের ক্ষেত্রে উৎপাদন শক্তি ও উৎপাদনের কৌশলগত অন্তরায় ছিল। কিন্তু শিল্প যুগে শিল্প, প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের ব্যাপক বিকাশ ঘটে। ছোট ছোট কল কারখানা থেকে বড় বড় কল কারখানা গড়ে তুলে। শিল্প যুগকে সমাজ বিজ্ঞানীরা আবার তিনটি ভাগে বিভক্ত করেছেন। যথা () পুঁজিবাদী সমাজ () সমাজতান্ত্রিক সমাজ ও () সাম্যবাদী সমাজ। এ তিন যুগে সম্পত্তির প্রকৃতি ও মালিকানা ভিন্ন প্রকৃতির।

() পুঁজিবাদী সমাজ:

পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থায় কিছু মানুষ কল কারখানা ও পুঁজির মালিক হয়ে পড়ে। ফলে সমাজে তৈরি হয় বিভিন্ন ধরণের শ্রেণী ও শ্রেণী বৈষম্য হয়ে পড়ে প্রকট। পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থায় সমাজে দুইটা শ্রেণী গড়ে উঠে, () বুর্জোয়া বা পুঁজিপতি শ্রেণী () শ্রমিক বা উৎপাদক শ্রেণী। শিল্প কারখানা, ব্যাংক, বীমা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি যাবতীয় সম্পত্তির মালিক হলো বুর্জোয়া। এবং এ ব্যবস্থায় বুর্জোয়া মালিকের অধীনে নির্দিষ্ট মজুরীর বিনিময়ে শ্রমিক বা উৎপাদক শ্রেণী উৎপাদন যন্ত্রে তার শ্রম শক্তি বিক্রি করে।

পুঁজিবাদী সমাজ হলো সামন্ততান্ত্রিক সমাজের পচন ও বিনাশের ফল। বিকাশের একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ে মালিকানার সামন্ততান্ত্রিক সম্পর্ক সমূহ উন্নয়নশীল উৎপাদন শক্তির সঙ্গে আর সামঞ্জস্য রাখতে পারে না। উৎপাদন বিকাশের বদলে তাঁরা উৎপাদনের বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এগুলি পরিবর্তিত হলো তার শৃঙ্খলে, সে শৃঙ্খল ভাঙ্গতে হত এবং ভেঙ্গে ফেলা হলো।” (মার্কসএঙ্গেলস, কমিউনিস্ট পার্টির ইস্তেহার)

উৎপাদনের ক্ষেত্রে প্রত্যেকটি নতুন নতুন আবিষ্কারে উৎপাদন শক্তি ও উৎপাদন বৃদ্ধি করেছে আর এরূপ উৎপাদনি শক্তি ও উৎপাদন বৃদ্ধিকরণ পূর্বেকার সমাজকে ভেঙ্গে নতুন সমাজের ভিত্তি স্থাপন করেছে। শিল্পযুগের কথা বলতে গেলে ইঞ্জিন ও বিদ্যুৎ আবিষ্কারের কথা বলতে হয়। বিশেষ করে ১৭৬৮ সালে বাষ্পচালিত ইঞ্জিন আবিষ্কার করেন জেমস ওয়াট নামের স্কটল্যান্ডের এক কারিগর। তারপর থেকেই কৃষি এবং কুটির বাণিজ্যিক ব্যবস্থা হতে আধুনিক শিল্পায়নের বিকাশ শুরু হয়। কয়লার খনি আর ইস্পাতের ব্যাপক ব্যবহারের ফলে অনেক শিল্পশহর আর কারখানা গড়ে উঠে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বিস্ময়কর পরিবর্তন ঘটে। ১৫শ ও ১৬শ শতাব্দীর সমুদ্র পথের আবিষ্কার বিশ্বব্যাপী বাণিজ্যের পথ খুলে দেয়। একেই আমরা শিল্প বিপ্লব রূপে অভিহিত করে থাকি, যার সূচনা হয়েছিল ইংল্যান্ডে। ইংল্যান্ডের শিল্প বিপ্লবে উপনিবেশ ভারত বর্ষের অবদান ছিল শতভাগ। শিল্প বিপ্লবের ফলে ইংল্যান্ডে কাঁচামালের যে চাহিদা দেখা দেয়, তা নেওয়া হয় ভারতের অফুরন্ত ভাণ্ডার থেকে। অন্যদিকে, তাদের পণ্যসামগ্রী এসে ছেয়ে ফেলে ভারতের বাজার। উপনিবেশিকতার যাঁতাকলে পড়ে এ দেশের বস্ত্র তৈরির কারিগররা বিলাতি পণ্যের একচেটিয়া বাজারে টিকে থাকতে পারেনি, ভারতের এই উৎপাদক শ্রেণীটি হারিয়ে যায়। এ প্রসঙ্গে কার্ল মার্কসের একটি মন্তব্য স্মরণ করা যায়, অনধিকার প্রবেশকারী ইংরেজরাই ভারতের তথা বাংলাদেশের তাঁত ও তকলি ভেঙে চুরমার করে। ইংল্যান্ড ভারতের তুলাজাত দ্রব্য ইউরোপের বাজার থেকে বিতাড়িত করতে থাকে, তারপর ভারতকে পাকে পাকে জড়িয়ে ফেলে। যে দেশ তুলার জন্মস্থান বলে চির পরিচিত সে দেশটিকেই তারা শেষ পর্যন্ত তুলা দিয়ে (অর্থাৎ তুলাজাত দ্রব্য দিয়ে) ছেয়ে ফেলে”

শিল্প বিপ্লবের ফলে সমাজের সামন্ত শ্রেণীর একটি অংশ পুঁজির মালিক হয়। পুঁজিবাদের উদ্ভব ও একই সাথে এর বিকাশ তরান্বিত হয়। ১৬৯৪ সালে ব্যাংক অব ইংল্যান্ড স্থাপিত হওয়ার ৫০ বছর পরও ব্যাংকের প্রচলিত নোটের মধ্যে সবচেয়ে বড় নোট ছিল ২০ পাউন্ডের নোট। ১৭৫০ সালেও সমগ্র ইংল্যান্ডে বারোটার বেশি ব্যাংক ছিল না অথচ ১৭৯০ সাল নাগাদ শহরের প্রতিটি বাজারে ব্যাংক গড়ে ওঠে। এভাবেই গড়ে উঠে পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থা এবং এ ব্যবস্থার অধীনেই আমরা প্রবেশ করি সাম্রাজ্যবাদী যুগে। পুঁজিবাদী আগ্রাসনের ফলে সৃষ্ট সাম্রাজ্যবাদী যুগে এসে আমরা উপহার পেলাম প্রথম সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ (১৯১৪১৯১৮) ও দ্বিতীয় সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ (১৯৩২১৯৪৫)

() সমাজতান্ত্রিক সমাজ:

পুঁজিবাদী সমাজের পরবর্তী পর্যায় হলো সমাজতান্ত্রিক সমাজ। মার্কসিয় দৃষ্টিতে একে কমিউনিস্ট সমাজের প্রথম পর্যায় রূপে নির্দিষ্ট করা হয়েছে। এ সমাজ ব্যবস্থায় কল কারখানা ও শিল্প প্রতিষ্ঠানের উপর ব্যক্তির মালিকানা লোপ পায় এবং রাষ্ট্রের মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয়। উৎপাদন ও উৎপাদন উপকরণের উপর তৈরি হয় সামাজিক মালিকানা। ফলে লোপ পায় শ্রেণীর নামে মানুষে মানুষে শোষণ। রুশ বিপ্লব ও পরবর্তীতে চীনের বিপ্লবের ফলে আমরা নতুন এই সমাজ ব্যবস্থার সাথে পরিচিত হই। মার্কসিয় দর্শনে এই নতুন সমাজ ব্যবস্থাকে ‘কমিউনিজম’ বলা হয়।

সমাজতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার বিজ্ঞান ভিত্তিক সূত্রায়ন ঘটে জার্মানির কার্ল মার্কস ও ব্রিটিশ ফ্রেডরিক এঙ্গেলসের মাধ্যমে। তারা উভয়েই ছিলেন বহু প্রতিভার অধিকারী দার্শনিক, অর্থনীতিবিদ, রাষ্ট্র বিজ্ঞানী, সমাজ বিজ্ঞানী। মার্কস ও এঙ্গেলস তাঁদের অন্যতম প্রধান রচনা ‘পুঁজি’ ও ‘কমিউনিস্ট পার্টির ইস্তেহার’সহ নানা লেখনীর মাধ্যমে সমাজতান্ত্রিক সমাজ ও সাম্যবাদী সমাজের মতবাদকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেন। পরবর্তীতে, মার্কসএঙ্গেলস কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত এই মতাদর্শ মার্কসবাদ নামে বিস্তার লাভ করে।

মানব সমাজকে মার্কস ও এঙ্গেলস দেখেছেন ঐতিহাসিক রূপে, গতির মধ্যে। এই গতিরউৎপাদন শক্তি ও উৎপাদন সম্পর্ক বিকাশের দ্বান্দ্বিকতার যে গঠনকৌশল মার্কস এঙ্গেলস উদ্ঘাটন করেন এটা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। মার্কস ও এঙ্গেলস দেখিয়েছেন যে, ঐতিহাসিকভাবে সমাজের বিকাশের যে প্রক্রিয়া বা সভ্যতার যে পরিবর্তন এর মূলে আছে, উৎপাদন শক্তির বিকাশ (যা উক্ত প্রক্রিয়াকে গতি দান করে, অর্থাৎ শ্রমের উপকরণ ও মানুষ) এবং এই পরিবর্তনে সৃষ্টি হয় নতুন উৎপাদন সম্পর্ক বা মানুষে মানুষে নতুন সম্পর্ক যা উৎপাদন, বিনিময়, বণ্টন বা ভোগের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠে। উৎপাদন শক্তির বিকাশের সাথে সাথে তা প্রচলিত উৎপাদন সম্পর্কের বিরোধী হয়ে উঠে। উৎপাদন শক্তির বুনিয়াদ হলো উৎপাদনের উপায়ের উপর মালিকানা সম্পর্ক। উন্নয়নশীল উৎপাদন শক্তির এবং সেই শক্তির শৃঙ্খলস্বরূপ উৎপাদন সম্পর্কের যে ঐতিহাসিক বিরোধ এ বিরোধ শ্রেণী সংগ্রামে অভিব্যক্তি লাভ করে, আর শ্রেণী সংগ্রামের সমাপ্তি ঘটে বিপ্লবে, তথা সমাজের আমূল পরিবর্তনে। এরূপ বিপ্লবের ফলে এক সমাজ ব্যবস্থার বদলে আসে অপেক্ষাকৃত প্রগতিশীল অন্য একটি সমাজ ব্যবস্থা। যেমন করে সামন্তবাদের স্থানে চলে এসেছে পুঁজিবাদ। এভাবেই পুঁজিবাদের পরিবর্তে আসে সমাজতান্ত্রিক সমাজ অতঃপর সাম্যবাদী সমাজ।

পুঁজিবাদের সহজাত বিরোধ বিশ্লেষণ করে মার্কস ও এঙ্গেলস নতুন সমাজ ব্যবস্থা কমিউনিজমের অপরিহার্যতা প্রমাণ করেছেন। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় শ্রমিক মজুরী পায় আর পুঁজিপতি পায় মুনাফা। মজুরী ও মুনাফার অনুপাত একে অপরের বিপরীত। পুঁজির স্বার্থ আর মজুরী শ্রমের স্বার্থ পরস্পরের সম্পূর্ণ বিপরীত। উৎপাদন শক্তি ও শ্রমের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির ফলে শ্রমিকের মজুরি কখনও কখনও বাড়লেও, পুঁজিপতিদের মুনাফা সেই তুলনায় অসম্ভব দ্রুত বৃদ্ধি পায়। এর ফলে শ্রমিক ও পুঁজিপতির মধ্যে সামাজিক ব্যবধান বাড়তে থাকে, সেই সঙ্গে শ্রমের উপর পুঁজির শাসনক্ষমতাও জোরদার হয়ে উঠে। উৎপাদনের শক্তির বিকাশের একটা নির্দিষ্ট ধাপে বুর্জোয়া উৎপাদন সম্পর্ক, উৎপাদন শক্তির ভবিষ্যৎ বিকাশের বাধা হয়ে দাঁড়ায়। পুঁজিবাদ তার কল কারখানায় কোটি কোটি শ্রমিকের সমাবেশ ঘটিয়ে উৎপাদন প্রক্রিয়াকে সামাজিক চরিত্র দান করে এবং উৎপাদনের সামাজিক চরিত্র উৎপাদনের উপায়ের উপর সামাজিক মালিকানাও দাবী করে। কিন্তু মালিকানা থেকে যাচ্ছে ব্যক্তিগত। উৎপাদনের উপায়ের উপর ব্যক্তিগত মালিকানা উৎপাদন শক্তির ভবিষ্যৎ বিকাশের শৃঙ্খলে পরিণত হয়ে পড়ে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় নিপীড়িত হওয়ায় শ্রমিক শ্রেণী, বিপ্লবী শ্রেণীও বটে। বুর্জোয়া শ্রেণীর বিরুদ্ধে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বিকাশের নানা পর্যায় অতিক্রম করে, শ্রেণী সংগ্রাম গড়ে তোলার মাধ্যমে এই বিপ্লবী শ্রেণী সেই শৃঙ্খল ভেঙ্গে ফেলে। এবং যে কোন শ্রেণী সংগ্রামই হলো রাজনৈতিক সংগ্রাম অর্থাৎ, সামগ্রিকভাবে পরিচালিত পুঁজিবাদী শ্রেণীর বিরুদ্ধে, তাদের সেই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে, যে রাষ্ট্র ‘সমগ্র বুর্জোয়া শ্রেণীর সাধারণ কার্যপরিচালনা কমিটি ছাড়া আর কিছু নয়। বিকাশের একটি নির্দিষ্ট ধাপে শ্রমিক শ্রেণীর সংগ্রাম অবশ্যই বিপ্লবের আকার ধারণ করবে এবং এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে শ্রমিক শ্রেণী বুর্জোয়া শ্রেণীর উচ্ছেদ ঘটাবে। কায়েম করবে নিজেদের রাজনৈতিক আধিপত্য। কমিউনিজমের উত্তরণের অত্যাবশ্যকীয় শর্ত হলো শ্রেণী সংগ্রাম এবং সর্বহারা বিপ্লবের, কমিউনিস্ট বিপ্লবের জয়। আগের সমস্ত বিপ্লবের থেকে এই বিপ্লবের পার্থক্য এখানেই যে, তা নিজ শ্রেণীর সাথে সাথে অন্য যে কোন শ্রেণীই হোক না কেন, সকল শ্রেণীর প্রভুত্ব খতম করা। এই কর্তব্য পালন করতে হলে সর্বহারা শ্রমিকমজুরকে অর্জন করতে হবে রাজনৈতিক ক্ষমতা। কমিউনিজমে সমাজের বর্ণনা করতে গিয়ে “জার্মান ভাবাদর্শ” গ্রন্থে মার্কস বলেন, পূর্বেকার সমাজের মানুষকে থাকতে হত স্বতঃস্ফূর্তভাবে সক্রিয় সমাজ বিকাশের শক্তির অধীনে। ঐ সব সমাজের সঙ্গে কমিউনিজমের পার্থক্য এই যে, কমিউনিজমে মানুষ প্রথম উৎপাদন, বিনিময় আর নিজস্ব সামাজিক সম্পর্কের উপর প্রভুত্ব অর্জন করবে। কমিউনিস্ট সমাজে শহর ও গ্রামের, মানসিক ও কায়িক শ্রমের বৈষম্য বিলুপ্ত হবে। বিপ্লবী রূপান্তরের প্রক্রিয়ায় কেবল সমাজ ব্যবস্থার পরিবর্তন নয়, পরিবর্তন ঘটবে মানুষেরও মানুষ তাঁর সমস্ত ক্ষমতা বিকাশের সুযোগ পাবে”। সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাষ্ট্র থেকে যায় ক্ষয় হওয়ার জন্য, কিন্তু থাকে না পুঁজিপতি বা শ্রেণীর শাসন। সমাজে থেকে যাওয়া শ্রেণীসমুহ অগ্রসর হয় ক্রমান্বয়ে শ্রেণী বিলুপ্তির পথে। যেখানে প্রত্যেকে সাধ্যানুযায়ী কাজ করবে এবং প্রয়োজন অনুসারে নয় বরং “নিষ্পন্ন শ্রমের পরিমাণ অনুসারে বণ্টন” ব্যবস্থায় অংশ নিবে।

() সাম্যবাদী সমাজ:

মার্কসিয় দর্শনের মূল লক্ষ্য সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। সমাজতান্ত্রিক সমাজ বা কমিউনিস্ট সমাজের প্রথম পর্যায়ের পরবর্তী পর্যায় হলো সাম্যবাদী সমাজ। মার্কসিয় দৃষ্টিতে একে কমিউনিস্ট সমাজের উচ্চতর পর্যায় রূপে নির্দিষ্ট করা হয়েছে। এ ব্যবস্থায় রাষ্ট্র ও শ্রেণীর বিলুপ্তি ঘটে, প্রতিষ্ঠিত হয় সাম্যবাদ। কমিউনিস্ট সমাজের দুইটি পর্যায়ের সম্পর্ক নির্ণয় করতে গিয়ে লেনিন তার ‘রাষ্ট্র সম্পর্কে মার্কসবাদ’ বইয়ে মন্তব্য করেছেন, প্রথম পর্যায়ে (সমাজতান্ত্রিক সমাজে) প্রত্যেকের কাছ থেকে সমাজ যে পরিমাণ শ্রম পায় সে অনুপাতে ভোগের দ্রব্য সামগ্রী বণ্টন করা হয়। বণ্টনে অসাম্য তখনও যথেষ্ট। এক ধরণের বাধ্যবাধকতা আছে। যে কাজ করে না সে খেতেও পাবে না। ‘বুর্জোয়া অধিকারের সংকীর্ণ দিগন্ত’ তখনও সম্পূর্ণরূপে অতিক্রান্ত হয় নাই। সম্পূর্ণ বুঝা যায়, আধা বুর্জোয়া অধিকার যেখানে বর্তমান, সেখানে আধা বুর্জোয়া রাষ্ট্রও তখন পর্যন্ত সম্পূর্ণ রূপে লোপ পায় নাই। ‘উচ্চতর’ (সাম্যবাদী) পর্যায়ে – ‘প্রত্যেকের কাছ থেকে তার সামর্থ্য অনুযায়ী (শ্রম) নেয়া হবে এবং প্রত্যেককে তার প্রয়োজন অনুযায়ী দেয়া হবে’ কখন এটা সম্ভব? যখন () মানসিক ও কায়িক শ্রমের মধ্যে বৈরিতা লোপ পেয়েছে () শ্রম যখন জীবনের প্রাথমিক প্রয়োজন হয়ে উঠেছে (অর্থাৎ কাজ করার অভ্যাস একটা নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে, এজন্য কাউকে বাধ্য করতে হচ্ছে না)”

সাম্যের সংজ্ঞা ও ধরণ প্রসঙ্গে স্তালিন বলেন, সমাজতন্ত্রের কালেই হোক আর সাম্যবাদের কালেই হোক, গুণের ও পরিমাণের দিক থেকে মানুষের রুচি আর প্রয়োজন একই রূপ নয় এবং হতে পারে না। কমিউনিজম সবার প্রয়োজন ও ব্যক্তিগত জীবন এক করে দিবে এটা একটা ভ্রান্ত ধারণা। অনেক ক্ষেত্রে এটা হয়ে পড়ে স্থূল ও কুৎসা প্রচার করা।” (স্বাধীনতা ও সাম্যের ধ্বনি দিয়ে জনগণকে প্রতারণা করা প্রসঙ্গে, ২৯ শ খণ্ডে) লেনিন বলেছেন, সকল মানুষকে আমরা একে অপরের সমান করে ফেলতে চাই সাম্য সম্পর্কিত এরূপ ধারণাকে ব্যবহার করে আমাদের দোষারোপ করতে চেয়েছে বুর্জোয়া অধ্যাপকরা। এই যে উদ্ভটতা তারা নিজেরাই আবিষ্কার করেছে, তার দোষে তারা আমাদের অভিযুক্ত করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু নিজেদের অজ্ঞতার জন্য তারা জানে না যে কমিউনিস্টরা আর আধুনিক বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের স্থপতি মার্কস ও এঙ্গেলসই বলেছেন সাম্য বলতে যদি শ্রেণীর বিলোপের অর্থে না বুঝা হয় তাহলে সাম্য একটা ফাঁকা বুলি। আমরা শ্রেণীর বিলুপ্তি চাই এবং এই দিক থেকে আমরা সাম্যের পক্ষে দাঁড়াই। কিন্তু সকল মানুষকে আমরা একে অপরের সমান করতে চাই একথা দাবী করাটা হলো বুদ্ধিজীবীদের একটা ফাঁকা বুলি ও বোকামিপূর্ণ উদ্ভাবন মাত্র”

চতুর্থ ভাগ শ্রেণী দৃষ্টিকোণ থেকে সংস্কৃতি ও রাজনীতি:

সমাজ ও সভ্যতার বিভিন্ন ধাপের পর্যালোচনায় আমরা দেখেছি যে, মানব সমাজে শ্রেণী ও শ্রেণীর সংস্কৃতি সৃষ্টি হওয়ার পর থেকে “শ্রেণী বিভক্ত সমাজে সকল মানুষই শ্রেণীর অধীনে বসবাস করে আর মানব সৃষ্ট সংস্কৃতি ও রাজনীতি শ্রেণী নিরপেক্ষ নয়”। অর্থাৎ, শ্রেণীর অধীনে যে মানুষ সেও নিরপেক্ষ নয় বরং একটি শ্রেণীর পক্ষে থাকে এবং শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ও রাজনীতিতে তদ্রূপ নিরপেক্ষ কোন অবস্থান নাই। শ্রেণী রাজনীতি ব্যাখ্যার আগে শ্রেণী দৃষ্টি কোণ থেকে সংস্কৃতির ব্যাখ্যাটা বুঝা দরকার। পূর্বে উল্লেখিত সংস্কৃতির সাধারণ ধারণা বা সংজ্ঞার বাইরে মার্কসিয় দৃষ্টিতে অর্থাৎ, শ্রেণী দৃষ্টিকোণ থেকে সংস্কৃতির সংজ্ঞা নেয়া যেতে পারে বদরুদ্দীন উমরের ‘সংস্কৃতির সংকট’ নামক নিবন্ধ থেকে কোন স্থানের মানুষের আচারব্যবহার, জীবিকার উপায়, সঙ্গীত, নৃত্য, সাহিত্য, নাট্যশালা, সামাজিক সম্পর্ক, ধর্মীয় রীতিনীতি, শিক্ষাদীক্ষা ইত্যাদির মাধ্যমে যে অভিব্যক্তি প্রকাশ করা হয়, তাই সংস্কৃতি। উক্ত বিষয়গুলোকে আবার দু’ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথমভাগ নিত্যদিনকার জীবনযাপনের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত। আর দ্বিতীয়ভাগ জীবন উপভোগের ব্যবস্থা এবং উপকরণের সাথে সম্পর্কিত” (বদরুদ্দীন উমর, সংস্কৃতির সংকট, মুক্তধারা প্রকাশনী, ১৯৮৪, ২৭ পৃ🙂। অর্থাৎ, দ্বিতীয়ভাগে যে জীবন উপভোগের ব্যবস্থা এবং উপকরণের সাথে সম্পর্কিত বলা হচ্ছে, এখানেই চলে আসে মানুষের সামাজিক রাজনৈতিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, নতুন অর্থনৈতিক ও উৎপাদন সম্পর্ক এবং উৎপাদন ব্যবস্থা ও বণ্টন বা ভোগের প্রশ্ন। একটি উদহারণ দেয়া যেতে পারে, আদিম সাম্যবাদের শেষে ব্যক্তিগত সম্পত্তির সৃষ্টি হওয়ার ফলেই মানুষ “আমরা” থেকে “আমি” সংস্কৃতিতে প্রবেশ করল; তাঁর আগ পর্যন্ত আমি বচন ছিল বিমূর্ত ধারণা! আদিম সাম্যবাদে সমষ্টিগত সম্পত্তির ক্ষেত্রে “আমরা”র মাঝে আমি ছিল বিলীন বা লুপ্ত।

মানব ইতিহাসে যখন ব্যক্তিগত মালিকানা সৃষ্টি ও নানা রকম শ্রম বিভাগের প্রচলন হলো, সংস্কৃতি চর্চার বিকাশের শুরু তখন থেকেই। নানা রকম শ্রমবিভাগ উৎপাদন সম্পর্কের মধ্যে পরিবর্তন সৃষ্টি করে যেমন নানা অবসরকালীন সময়ের সুযোগ করে দিলো, তেমনি মালিক শ্রেণী নাচ, গান ইত্যাদি চর্চার সুযোগ দান করে দিল তাদের নিজ স্বার্থেই। শ্রেণী বিভক্ত সমাজে সম্পদশালী ধণবাদী শ্রেণী নিজের শোষণ স্বার্থেই সংস্কৃতিকে গড়ে তোলে, গড়ে তোলে নিজের জীবন যাপন ও জীবন উপভোগের বিশাল ব্যবস্থা। এ কাজ করতে গিয়ে তাদেরকে অবশ্যম্ভাবী রূপে এমন কতকগুলি কাজ করতে হয়, যে কাজগুলি একদিকে সম্পত্তিশালী শ্রেণী হিসেবে তার নিজের অবস্থানের মধ্যে ভাঙন সৃষ্টি করে গড়ে তুলে নতুন অর্থনৈতিক ও উৎপাদন সম্পর্ক, নতুন শ্রেণী ও শ্রম বিভাগ, নতুন সমাজ নতুন সংস্কৃতি। যুগ যুগান্তরের কালিক ব্যবধান ও সামাজিক শ্রেণী বিকাশের ধারায় এই যে নতুন সমাজ বিনির্মাণের জন্য সমাজের নানা শ্রেণী চরিত্র এক রূপ থেকে বিশেষ রূপে হাজির হয়; কিন্তু এরই মিথস্ক্রিয়ায় অন্যদিকে ঘটে চলে সামাজিক অগ্রগতি। এই অগ্রগতির মূল ধারা নির্ণীত হয় উৎপাদন শক্তি এবং উৎপাদন সম্পর্কের মধ্যে পরিবর্তনের দ্বারা।

মানুষের অতীত ইতিহাস শ্রেণী সংগ্রামের ইতিহাস, আমাদের আগামীর ইতিহাসও শ্রেণী সংগ্রামের ইতিহাস; একথা অস্বীকার করার কোন অবকাশ নেই। সমাজ ও শ্রেণী সম্পর্কে যতটুকু জানা গেল, এর দ্বারা বুঝতে পারি যে, মতাদর্শ, রাজনীতি ও সংস্কৃতি সম্পর্কে কোন আলোচনা যেমন সমাজ থেকে বিচ্ছিন্নভাবে করা চলে না তেমনি তাকে বিচ্ছিন্ন করা চলে না শ্রেণী বা শ্রেণী রাজনীতি থেকেও। আজকের সমাজ ইতিহাসের দাস সমাজ বা সামন্তবাদী সমাজ থেকে অগ্রসরমান; কিন্তু এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় একদল লোক যাদের আমরা শ্রমিক বলি এরা উৎপাদন করে আর একদল মানুষ শ্রমের ফল ভোগ করে। এ ধরনের উৎপাদন ব্যবস্থায় এদের মধ্যে গড়ে উঠে দাস ও মালিকের সম্পর্ক। লেনিনের ভাষায় বলতে হয়, সর্বাধিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রেও শ্রমিকের ভাগ্যে জুটে মজুরী দাসত্ব”। পুঁজিবাদের লক্ষ্য এ দাসত্বকে টিকিয়ে রাখা, আর সমাজতান্ত্রিক রাজনীতির লক্ষ্য এ পুঁজির অগ্রসরতা ও অর্জনকে অক্ষুণ্ণ রেখে এ দাসত্বকে বিলোপের মাধ্যমে সমাজে, রাষ্ট্রে বিরাজমান শ্রেণী বিলুপ্ত করা, সাম্য প্রতিষ্ঠা করা। শ্রমিক শ্রেণীর শ্রেণী সংগ্রামের অর্থই হলো শ্রমিক শ্রেণীর সমাজতান্ত্রিক রাজনীতির মাধ্যমে শ্রমিক শ্রেণীর একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠা করা।

পুঁজিবাদ কোন শাশ্বত ধ্রুব সত্য নিয়ম নয়। যেমন একসময় সমাজের মানুষ ভেবেছিল, দাস সমাজ শাশ্বত ধ্রুব সত্য, এর পরিবর্তন জীবন ও জীবিকা ধ্বংস করবে। অন্যদিকে, এই মতের যথেষ্ট বিরোধিতা করে অনেকেই মনে করেছিল, দাস প্রথার বিলোপে যে নতুন সমাজ গড়ে উঠবে; সে নতুন সমাজ হয়ে উঠবে শাশ্বত এবং মানুষের অধিকার, সম্মান রক্ষা করে চলবে। কিন্তু দেখা গেল দাস সমাজের বিলোপে মানুষের জীবন ও জীবিকা ধ্বংস হয়নি; দাস সমাজের স্থলে যে নতুন সামন্তবাদী সমাজ গড়ে উঠেছিল, সেই সামন্তবাদী সমাজও শাশ্বত ধ্রুব সত্য হয়নি। সামন্তবাদের বিলোপে যেমন শিল্প সমাজ তথা এই পুঁজিবাদী সমাজ এসেছে, তেমন পুঁজিবাদের স্থলে শোনা যায় সমাজতন্ত্রের, সাম্যবাদের আগমনী পদধ্বনি।

আজকের যে পুঁজিবাদী সমাজ বাস্তবতা, এই বাস্তবতার মাঝে গড়ে উঠেছে যে রাজনীতি সংস্কৃতি, এ রাজনীতি সংস্কৃতি, গণমানুষের মুক্তি এনে দিতে পারছে না। নিবন্ধের শুরুতে একটি উদহারণ দিয়ে বলেছিলাম পুঁজিবাদ কিভাবে গণমানুষের সংস্কৃতিকে পরিবর্তিত করছে। তেমনি বলা যায়, আমাদের আপ্যায়নের যে চিরায়ত খাদ্যদ্রব্য সেমাই বা শরবতের পরিবর্তে জায়গা করে নিচ্ছে নুডুলস ও কোকাকোলা। একটি গ্রামীণ মেলায় যেখানে বাতাসা, ময়রাসহ হরেক রকম গ্রামীণ খাবার পাওয়া যেত, এখন সেখানে বিভিন্ন কোম্পানির খাদ্যদ্রব্যে সয়লাব হয়ে আছে। সেখানে বাউল গান, লোকজ সংগীত না হয়ে আসর বসছে কনসার্ট, পপ গানের। বাণিজ্য আর মুনাফার সর্বগ্রাসী দৈত্য পুঁজিবাদ হামলে পড়ছে সর্বত্র, পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে আমাদের লোকজ সংস্কৃতি।

পুঁজিবাদে ‘বিশ্বায়ন’ বা ‘বাজার অর্থনীতি’ যাই বলি না কেন একটি নির্দিষ্ট শ্রেণীর ক্রেতা সৃষ্টির মাধ্যমে মুনাফা অর্জনই তার লক্ষ্য। যে নির্দিষ্ট শ্রেণীর টাকা আছে সে ভোগ করবে, আর শোষিত শ্রমিক কৃষক যার টাকা নাই সে বঞ্চিত হবে, প্রয়োজনে না খেয়ে থাকবে। পুঁজিবাদের দ্বারা মানব সমাজ সাম্রাজ্যবাদী যুগে প্রবেশ করল এবং এই সাম্রাজ্যবাদী যুগ বিশ্বকে দুইটি বিশ্ব যুদ্ধ উপহার দিল। সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থরক্ষায় আজও সাম্রাজ্যবাদী শক্তিসমুহ দেশে দেশে যুদ্ধ ছড়িয়ে দিচ্ছে। পুঁজিবাদ মানেই ব্যক্তির মুনাফা, ব্যক্তির শোষণ, ব্যক্তির উন্নতি। এ উন্নতি সমাজের গণমানুষের উন্নতি নয়। পুঁজিবাদী রাজনীতি সংস্কৃতি, গণমানুষের রাজনীতি সংস্কৃতি নয়। সাম্রাজ্যবাদের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক রূপ হচ্ছে পুঁজিবাদ, যা সাম্রাজ্যবাদের অধীনে থেকে আমাদের পরাধীন মানুষে পরিণত করছে। এ থেকে মুক্তির জন্য রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক একটা বিপ্লব অপরিহার্য; যে বিপ্লব সমাজতান্ত্রিক সমাজ কায়েম করবে, মানুষকে মুক্তি দিবে। পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্র পরস্পর বিরোধী মতবাদ, পুঁজিবাদ ব্যক্তির মুনাফা, ব্যক্তির স্বার্থ, ব্যক্তির উন্নতির আদর্শ। পক্ষান্তরে, সমাজতান্ত্রিক মতবাদ কাজ করে সমষ্টির মুক্তির জন্য। সমাজতান্ত্রিক মতবাদ বিশ্বাস করে ব্যক্তির আপাত মুক্তি কোন মুক্তি নয়, যদি না সে সমষ্টিগত ভাবে মুক্তি না অর্জন করতে পারে। পুঁজিবাদের বাহক সাম্রাজ্যবাদী শক্তি তার সকল শক্তি নিয়োজিত রেখেছে মানুষ যেন সমাজতান্ত্রিক সমাজে প্রবেশ করতে না পারে। এর বিপরীতে সমাজতন্ত্রের মূল কথা হলো পুঁজিবাদের সকল অর্জনকে মুনাফায় রূপ না দিয়ে এই অর্জনগুলোকে সাম্যতায় উপভোগ ও বণ্টন করা। আজ বিশ্বের নানা প্রান্তের গনমানুষ এটা অনুধাবন করছে। আমাদেরও তাই একটা রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিপ্লবের প্রস্তুতি নেয়া উচিত। কিন্তু এই প্রস্তুতির জন্য চাই নির্দিষ্ট মতাদর্শ তথা সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শ বা কমিউনিজম।

এই যে গণমানুষের মুক্তির জন্য সমাজ পরিবর্তনের রাজনীতি, এদেশে কি এমন সমাজ পরিবর্তন হয়নি? রাজনৈতিক পরিবর্তন হয়নি? না হয়নি, আবার পরিবর্তন যা হয়েছে সেটা এক শ্রেণীর মানুষের। ইংরেজ তথা উপনিবেশিক সময়ে উপমহাদেশ ভাঙল। উপমহাদেশ ভাগ হলো, বাংলাকে ভাগ করে, বলা হলো সমাজ পরিবর্তন হবে, গণমানুষের মুক্তি আসবে। কিন্তু আসেনি। উপমহাদেশকে টুকরো করে জন্ম নিল পাকিস্তান ও ভারত নামের দুইটি রাষ্ট্র। আবার রাষ্ট্র ভাগ হলো। দেশতো দেশের জায়গায় আগেই ছিল, এবারে রাষ্ট্রের নাম পাল্টে হলো, বাংলাদেশ। কিন্তু এই ভাঙ্গাগড়ার মাঝখানে যা ঘটেছে তা হলো, সমাজের একটি শ্রেণী ব্রিটিশ আমলে সুযোগসুবিধা ভোগ করে এসেছিল, পাকিস্তান আমলে তদ্রূপ একটি শ্রেণী সুযোগসুবিধা ভোগ করেছিল এবং এই বাংলাদেশ হওয়ার পর সেই শ্রেণীর উত্তরাধিকারীরা আরো বেশি সুযোগসুবিধা ভোগ করে আসছে। যে শ্রেণী এককালে মুসলিম লীগ করেছে, পরে তারাই আওয়ামী মুসলিম লীগসহ অন্যান্য সাম্প্রদায়িক ও বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদী দলে ভিড় করেছে, সে শ্রেণীর প্রতিনিধিত্বকারীরাই এখন নানা নামের দলে ভিড়ে শাসক গোষ্ঠীর সহায়ক শক্তি রূপে নিজেদের বিত্তবৈভব বৃদ্ধি করে চলেছে। যারা বাম ধারার রাজনীতিতে এসেছে, তারাও তাদের বুর্জোয়া পেটি বুর্জোয়া পিছুটানের কারণে ও সঠিক শ্রেণী সংগ্রাম থেকে বিচ্যুত হয়ে; মার্কসবাদের বিকৃত রাজনীতিতে সামিল হয়ে ‘বিপ্লবের শিস মেরে’ গণমানুষের সাথে প্রতারণা করে আসছে। ফলে আন্দোলন সংগ্রামে নেতৃত্বে আসার বদলে বুর্জোয়া নেতৃত্বের পিছনে তাঁদের রাজনীতিকে পরিচালিত করেছে। শ্রমিককৃষক শ্রেণীর পক্ষে বা জোটে থাকার চেয়ে এরা বুর্জোয়া রাজনীতির পক্ষে বা জোটে থেকে ক্ষমতার উচ্ছিষ্ট লাভে মরিয়া। ইস্যুভিত্তিক নানা অর্থনীতিবাদী আন্দোলনের জালে নিজেদের আটকে ফেলেছে। ফলস্বরূপ, তাদের রাজনীতির দ্বারা গণমানুষের রাজনৈতিক সামাজিক মুক্তির কোন সংগ্রাম গড়ে উঠেনি। রাজনীতি নিরপেক্ষ নয় যেমন, তেমনি শোষণ মুক্তির রাজনীতি বুর্জোয়া শাসক শ্রেণীর পক্ষে বা জোটে থাকা নয় বরং মার্কসবাদী রাজনীতিটা এখানে সুস্পষ্ট। এটাই প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার রাজনীতি। সমাজতন্ত্র তথা সমাজতান্ত্রিক রাজনীতি ও সংস্কৃতি হবে এর মূল মন্ত্র। গণমানুষের মুক্তির লক্ষ্যে একটা রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক আন্দোলন দরকার, একটা রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক বিপ্লব দরকার।

পঞ্চম ভাগ শিল্প সাহিত্যে সমাজতান্ত্রিক রাজনীতিসংস্কৃতি:

সমাজের সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের সংস্কৃতি, তথা ‘সমাজতান্ত্রিক সংস্কৃতি’র বিপরীতে থাকে বুর্জোয়া বা বেনিয়া সংস্কৃতি। আজকের প্রজন্মের মতাদর্শহীনতার অন্যতম কারণ এই বুর্জোয়া সংস্কৃতি, বুর্জোয়া সাহিত্য। বুর্জোয়া সংস্কৃতি, বুর্জোয়া সাহিত্য প্রজন্মকে একজন ‘হাড্ডি খিজির’ (আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘ চিলে কোঠার সেপাই’ উপন্যাসের একটি চরিত্র) বা ‘অনিমেষ’ ( সমরেশ মজুমদারের ‘কালবেলা’ উপন্যাসের একটি চরিত্র) এর গল্প শুনায় না, প্রজন্মের তরুণ ‘হাড্ডি খিজির’ বা ‘ অনিমেষ’ না হয়ে হয়ে উঠে পাগল কিসিমের ‘হিমু’। যে কিনা উদ্ভট আচরণ করে; ভাবনায়, কল্পনায় মোটেও স্বাভাবিক মানুষ নয়। আমাদের কর্পোরেট মিডিয়া থেকে অন্যান্য প্রচার মাধ্যম এই জাতীয় বুর্জোয়া সংস্কৃতির অন্যতম পৃষ্টপোষকতাকারী, বুর্জোয়া সংস্কৃতিকে গরম গরম পরিবেশন করে যাচ্ছে, যেন ঠাণ্ডা হলেই স্বাদ নষ্ট। আর এর মূলে রয়েছে বেনিয়াদের মুনাফাখোরী লোলুপ দৃষ্টি। বুর্জোয়া সংস্কৃতির দাপট এমনই যে, তরুণ প্রজন্ম ভিনদেশী ‘শিলাকি জাওয়ানী’র আবেদণময়ী যৌবন দেখে বিছানা নষ্ট করে ফেলে। বুর্জোয়া সংস্কৃতির এরূপ নাচগাননাটকচলচ্চিত্রশিল্পসাহিত্য ইত্যাদি অনেক ক্ষেত্রে সংস্কৃতিরই অংশ হলেও এটা যেমন পুরো সংস্কৃতিকে ধারণ করে না, তেমনি সমাজতান্ত্রিক সংস্কৃতির অন্তঃশাস ও অবদান বুর্জোয়া সংস্কৃতির মত নয়। সমাজতান্ত্রিক সংস্কৃতির পৃষ্টপোষকতাকারী, ধারক ও বাহক কোন বুর্জোয়া শ্রেণী নয়; শুধুমাত্র সর্বহারা শ্রেণী, সাধারণ খেটে খাওয়া কৃষকশ্রমিক। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চিন্তাসহ সমাজের সকল মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনের সকল চিন্তা ও কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়েই প্রকাশ পায় ব্যক্তির ও তাঁর শ্রেণীর সংস্কৃতি ও রাজনীতি। ‘সমাজতান্ত্রিক সংস্কৃতি’র প্রভাব বুঝতে হলে পুঁথিগত শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতিতে এই ধারার উদ্ভব ও বিস্তৃতি সম্পর্কে জানা প্রয়োজন।

কার্ল মার্কস ও এঙ্গেলসের রাজনৈতিক দর্শনই হলো শ্রেণী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের সামাজিক পরিবর্তন। এই দর্শনের সফল বাস্তবায়ন হয় রাশিয়ায়, লেনিনের নেতৃত্বে জারতন্ত্রের উচ্ছেদ ও সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। এবং এই আদর্শের ভিত্তিতে জন্ম নেয় সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতার সাহিত্য ও সংস্কৃতি ভাবনা। অর্থাৎ, ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবের মাধ্যমে সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর এই ধারার উদ্ভব ও বিস্তৃতি। পুঁথিগত শিল্পসাহিত্যসংস্কৃতিতে সমাজতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে ‘সমাজতান্ত্রিক বাস্তববাদ বা social realismনামে অভিহিত করা হয়। বিশ্বের শিল্প সাহিত্যে এটি একটি আধুনিক ধারা। মূলতঃ বুর্জোয়া শিল্প সাহিত্যের নানা সীমাবদ্ধতা, বিচ্যুতি ইত্যাদির বিরুদ্ধে শিল্পীর সামাজিক দায়বদ্ধতার তাগিদে এই ধারার উৎপত্তি। বিপ্লবোত্তর সোভিয়েত ইউনিয়নে ম্যাক্সিম গোর্কি, দস্তয়ভস্কি, বালজাক, তুর্গেনেভসহ সোভিয়েত লেখক সংঘের অন্যান্য লেখকের হাত ধরে সমাজতান্ত্রিক বাস্তববাদ গড়ে উঠে। নিছক বাস্তবতার অনুভূতি, পাশবিকতা কিংবা পাপাচারের যথাস্থিতবাদী চিত্রণের মাধ্যমে যে সাহিত্য সংস্কৃতি রচিত হতো, তার বিপরীতে দ্বান্ধিক বস্তুবাদের আলোকে সমাজ বাস্তবতার বিশ্লেষণ এবং সমাজতান্ত্রিক আদর্শে উত্তরণে প্রেরণা, এই ধারার শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতির মূল উপজীব্য বিষয়। শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতিতে মার্কসিয় নন্দন তত্ত্বের সে মূল সুর অর্থনৈতিক ভিত্তির উপরিকাঠামো হিসাবে গড়ে উঠে। মানুষের সামাজিক জীবনে উৎপাদন পদ্ধতি উৎপাদন সম্পর্ক তথা অর্থনৈতিক কাঠামোই মূল, যা নির্মাণ করে সামাজিক পরিবেশ, তার উপর ভিত্তি করেই শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতির উৎপত্তি। সাহিত্য সংস্কৃতি তাই মূল নয়, অবকাঠামো বা উপরিকাঠামো মাত্র অর্থনীতি যার মূল ভিত্তি। কেবল শিল্পের জন্য শিল্প এই ভাবনা থেকে বেরিয়ে এসে সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতার শিল্পতত্ত্ব এক মহান সৃষ্টি, যার মধ্য দিয়ে মানুষ তার নিজের অবস্থা ও অবস্থান সম্পর্কে সজাগ হয়ে উঠতে পারে।

সাহিত্য সংস্কৃতি মানুষের চেতনার বুদ্ধিবৃত্তিমূলক বহিঃপ্রকাশ, অর্থনীতি বা অর্থনৈতিক অবস্থা সেখানে মানুষের বুদ্ধিবৃত্তি আর চেতনাকে নির্ধারণ করে। সেখানে অর্থনৈতিক পরিমণ্ডল তথা নিয়ন্ত্রণের বাইরে কোন শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতি ভাবনা সম্ভবপর নয়। অর্থনৈতিক জীবনধারা যদি কাঠামো হয়, তবে সেই জীবনধারায় প্রতিফলিত সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল হবে তার উপরিকাঠামো। উপরিকাঠামো যেমন মূল কাঠামো কে অতিক্রম করে আপন ইচ্ছায় বিকশিত হতে পারে না, তেমনি মূল কাঠামোও উপরিকাঠামোকে উপেক্ষা বা নির্লিপ্ত থাকতে পারে না। আসলে মূল কাঠামো এবং উপরি কাঠামো সহগামী। ১৯০৫ সালে অর্থাৎ সোভিয়েত প্রতিষ্ঠার বার বছর আগে লেনিন লেখেন, কোন ব্যক্তি সমাজে বাস করে সমাজ থেকে মুক্ত হতে পারে না। বুর্জোয়া লেখক, শিল্পী, বা অভিনেতার স্বাধীনতা নিছকই অর্থ, দুর্নীতি, পতিতাবৃত্তির মুখোশ পরা(ভণ্ডামি) নির্ভরতা”। (Parti organisation & parti literature.Lelin Coll.works Vol-10 Page-48) অর্থাৎ, অর্থ উপার্জনের নিকৃষ্ট মাধ্যম ছাড়া বুর্জোয়া শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতির সাথে গণমানুষের কোন সংযোগ নেই, থাকে না। শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতির ক্ষেত্রে লেনিন গুরুত্ব দিয়েছেন শ্রেণী দৃষ্টি ভঙ্গির উপর; শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতির আঙ্গিক সর্বস্বতার বিরোধিতা করে তিনি সমাজ বাস্তবতা তথা সমাজতান্ত্রিক সংস্কৃতির প্রতি সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। বস্তুত এ জাতীয় সাহিত্য সংস্কৃতিতে উঠে আসে সমসাময়িক সময়ের সমাজ; তার অর্থনীতি, রাজনীতি, উত্থানপতন, দ্বন্দ্বসংঘাত, আশা –হতাশা, ভাল মন্দ সব। টলস্টয়ের উপন্যাস ‘পুনরুত্থান’ (১৮৮৯৯৯) এ আমরা এমনি এক চিত্র দেখতে পাই, উপন্যাসের নায়িকা কাটিউসা যেন রুশ নারী সমাজেরই একজন প্রতিনিধি। তার জীবনের নানা উত্থান পতনের জন্য দায়ী পুরুষেরা ও সেই সময়কার রুশ সমাজ। এক অভিজাত পুরুষ নেখলুদয়েভ তাকে ভোগ করে। উপন্যাসে নায়িকা কাটিউসা হয়ে পরে দাসী থেকে বেশ্যা, বেশ্যা থেকে জেলে নারী বন্দী। এই বন্দী থাকাবস্থায় কাটিউসাকে ভোগকারী নেখলুদয়েভ বিয়ে করার প্রস্তাব দিলেও কাটিউসা তাকে প্রত্যাখ্যান করে। কারণ কাটিউসা ততোদিনে জেনে গেছে রুশ সমাজের ভবিষ্যৎ নির্মাতা নেখলুদয়েভরা নয় বরং কাটিউসারা, সেমিনসনরা। ভবিষ্যৎ রুশ সমাজের নির্মাতাদের একজন রূপে কারাগারে বন্দী বিপ্লবী সেমিনসনকেই সে বিয়ে করবে। রুশ বিপ্লবের আগেই টলস্টয় সাধারণ রুশ নাগরিকের মাঝে নতুন সমাজ গড়ার প্রত্যয় দেখতে পেয়েছিলেন। পুরাতন সমাজ ভেঙ্গে একটি নতুন সমাজ গড়ে তোলার যে রাজনীতি, এটা তিনি শিল্পীর দূরদৃষ্টি দিয়ে অনুধাবন করেছিলেন। শিল্পীর নিজস্ব একটি দৃষ্টি থাকে, দৃষ্টি সীমা যার যত বেশি প্রসারিত, সে ততো বড় শিল্পী। টলস্টয় এতো বড় শিল্পী হতেন না, যদি তিনি শিল্পীর দৃষ্টি দিয়ে সমাজের ভাঙ্গাগড়াকে আগে থেকেই দেখতে না পেতেন। ১৮৯৯তে ডায়েরিতে টলস্টয় লিখেছিলেন, একটি অর্থনৈতিক বিপ্লব যে কেবল সম্ভব তা নয়, বিপ্লব অনিবার্য। বিস্ময়ের ব্যাপার বিপ্লব এখনো ঘটেনি।” শিল্পীর দৃষ্টি শেকসপীয়ারেরও ছিল। ‘রোমিও ও জুলিয়েট’ নাটকের অংক পাঁচের, দৃশ্য এক; আমরা দেখি রোমিও বিষ কিনছেন মান্তুয়া শহরে, এক দারিদ্রজর্জরিত ওঝার কাছ থেকে, যদিও সে শহরে বিষ বিক্রয় নিষিদ্ধ। রোমিও স্বর্ণমুদ্রা (অর্থাৎ টাকা) দিয়ে লোকটির দ্বিধা দেখে বলছেন, এই নাও, স্বর্ণমুদ্রা, আরো ভীষণ এক বিষ। এই ঘৃণ্য জগতে তোমার বেআইনি নিস্তেজ ঔষধের চেয়ে অনেক বেশি হত্যাকাণ্ড ঘটায় এই সোনা। আমিই তোমায় বিষ বেচলাম, তুমি বেচোনি আমায়।” শেকসপীয়ার শিল্পীর দৃষ্টি দিয়ে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ দেখেছিলেন। পুঁজিবাদী সমাজে পুঁজির দাপট, বিষের মতোই এক অস্ত্র, যা দিয়ে একজন দুজন নয় সমগ্র সমাজকে হত্যা করা যায়। পুঁজি মুনাফালোভী মানুষকে পশুতে পরিণত করে। পুঁজি, মুনাফা ও ব্যক্তিবাদের বিপক্ষে ছিল শেকসপীয়ারের অবস্থান।

বাংলা সাহিত্য সংস্কৃতিতেও রুশ বিপ্লব ও সমাজতান্ত্রিক সংস্কৃতির প্রভাব প্রবল হলেও এখনকার শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতিতে রয়েছে এক ধরণের বন্ধ্যাত্ব। মানিক বন্ধ্যোপধ্যায়, সুকান্ত, সমরেশ মজুমদার, মহাশ্বেতা দেবী, সুভাস মুখোপাধ্যায়, শওকত ওসমান, সত্যেন সেন প্রমুখের সাহিত্য রচনাবলীতে সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতার ছাপ সুস্পষ্ট থাকলেও মুনাফালোভী শিল্পীরা আজ আর গণমানুষের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে না। সস্তা স্থূল সাহিত্য রচনাই তাঁদের মূল লক্ষ্য। রবীন্দ্রনাথ থেকে হালের হুমায়ুন আহমেদ, আনিসুল হকরা এই গড্ডালিকা প্রবাহে ভেসে যাচ্ছে। বাঙালির মানসিকতা গঠনে রবিবাবুর বিশাল প্রভাব আছে। তা সে হিন্দু মুসলমান যেই হোক, মোটামুটি সবাই রবীন্দ্র ভাবমূর্তি পূজারী। এদেশের এক শ্রেণীর কমিউনিস্টরাও আছে, এই পূজা আচারে। রবীন্দ্রনাথের সময় সাহিত্যের বাণিজ্যিক রূপ ছিল না। কিন্তু তার ছিল শ্রেণী দুর্বলতা, এক ধরণের আপোষকামিতা। উপনিবেশিক বাস্তবতা সুচারুরূপে ফুটে উঠেনি তার লেখায়। আসেনি সাধারণ গণমানুষের কথা। এ বিবেচনায় রবি বাবু অনেক দুরের নজরুল অনেক কাছের মানুষ, আত্মার আত্মীয়! রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য পড়লে বুঝার উপায় নেই উপনিবেশিক বাস্তবতায় তার জন্ম, বেড়ে উঠা, সাহিত্য রচনা। সাহিত্য সমালোচক ড. আহমদ শরীফ ‘ইতিহাসের নিরপেক্ষ আয়নায় বাংলাদেশ’ প্রবন্ধে উল্লেখ করেন অতএব রামমোহন থেকে রবীন্দ্রনাথ ও রবীন্দ্রনাথ থেকে আজকের সমাজবাদবিরোধী গণমানুষেরবিরোধী যে কোনো মনস্বীমনীষা বা সাধারণ বুদ্ধিজীবী ভদ্রলোক মাত্রই পরোক্ষ গণশত্রু।” (পৃ: ১৭৮)। কথিত বাঙালির পুণর্জাগরণ নিয়ে তিনি বলেছেন অতএব রেনেসাঁসের জন্যে গৌরববোধ করা, সগর্বে রেনেসাঁসের মহিমাকীর্তন করা, রেনেসাঁসওয়ালাদের প্রশংসা করা প্রকারান্তরে গণমানবের দুর্ভোগদুর্দশাকে অস্বীকার করার এবং মুৎসুদ্দি কমপ্রেডরের তারিফ করার শামিল।” ()। এই গণমানবে দুর্ভোগদুর্দশাকে অস্বীকার করার কথার মাধ্যমেই আমরা বুঝতে পারি, দেশের সাধারণ মানুষের সংস্কৃতির প্রতি ড. আহমদ শরীফের ভালোবাসা যেমন ছিল, তেমনি এক শ্রেণীর সাহিত্যসংস্কৃতির প্রতি ছিল তীব্র ঘৃণা। রবীন্দ্র প্রতিভাকে যদি নির্মোহ দৃষ্টিতে দেখা হয়, তবে দেখা যাবে যে, তাঁর কাজেরও একটা গণ্ডি রয়েছে। সেই গণ্ডির কারণে, . আহমদ শরীফ ‘রবীন্দ্রোত্তর তৃতীয় প্রজন্মের রবীন্দ্রমূল্যায়ন’ গ্রন্থে বলেছেন, সমাজ পরিবর্তন যাদের লক্ষ্য, যারা গণমানবের আর্থসামাজিক মুক্তি অর্জনে অঙ্গীকারাবদ্ধ। তারা দেখতে পান যে, রবীন্দ্রনাথ তাদেরকে সাহায্য করছেন না।” তাঁর আরেকটি গ্রন্থ ‘রবীন্দ্রসাহিত্য ও গণমানব’এ তিনি উল্লেখ করেছেন, শ্রেণীস্বার্থের অচেতন কিংবা সচেতন বাধাই সাহিত্যে রবীন্দ্রভূমিকা সীমিত রেখেছিল।” উপনিবেশিকতার সাম্রাজ্যবাদী সমাজব্যবস্থার বাস্তবতায় ১৯৩৬ সালের এপ্রিলে মুন্সি প্রেমচাঁদের নেতৃত্বে ভারতীয় লেখকদের সংগঠন প্রগ্রেসিভ রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশন (পিডব্লিউএ) বা প্রগতিশীল লেখক সংঘ জন্ম লাভ করে। এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রনাথের উপস্থিতি শোনা গেলেও পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টি ও নিজ শ্রেণী অবস্থানের কারণেই রবীন্দ্রনাথ প্রগতিশীল লেখক সংঘের সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত করতে সক্ষম হন নাই। সাহিত্য রচনার উদ্দেশ্য কি? এ প্রশ্নের উত্তর পাবো প্রগতিশীল লেখক সংঘের (পিডব্লিউএ) প্রতিষ্ঠাতা সংগঠক মুন্সি প্রেমচাঁদের উদ্বোধনী বক্তৃতায়। প্রেম চাঁদ বলেন, যে সাহিত্য আমাদের মনে অনুসন্ধিৎসা জাগায় না কিংবা আমাদের আত্মিক প্রয়োজন মেটায় না, যা শক্তিসঞ্চারী এবং গতিশীল নয়, যা আমাদের হৃদয়ে সৌন্দর্যের ফুল ফোটায় না, অন্তরে অঙ্গীকারের শক্তি জাগিয়ে যা আমাদের করালদর্শন বাস্তবতাকে মোকাবিলা করতে শেখায় না আজকের দিনে সে সাহিত্যের প্রয়োজন ফুরিয়েছে। এমনকি এগুলো সাহিত্য পদবাচ্যও নয়”। এ বক্তব্যের আলোকে আমরা হাল আমলের সাহিত্যকে মূল্যায়ন করে দেখে নিতে পারি, এগুলো গণমানুষের সাহিত্য কিনা?

আমাদের দেশের বুর্জোয়া সাহিত্যসংস্কৃতিসেবী যারা, তাদের দ্বারা সৃষ্ট শিল্পসাহিত্যসংস্কৃতি তরুণ প্রজন্মকে স্থূল বিনোদন দিয়ে আসছে। বুর্জোয়া শিল্পীসাহিত্যিকরা গণমানুষের রাজনীতি ও সংস্কৃতিকে শিল্প কর্মের মাধ্যমে যেহেতু বাণিজ্যিক রূপ দিতে পারে না এবং নিজ শ্রেণী স্বার্থের বাইরে আসতে পারে না; সেহেতু তাদের সৃষ্ট সাহিত্যকর্ম গণমানুষের রাজনীতি ও সংস্কৃতি বর্জন করলেও, তাদের দ্বারা সৃষ্ট শিল্পসংস্কৃতি সমাজের সামগ্রিক সাংস্কৃতিক চিত্র নয়। পক্ষান্তরে, এই স্থূল কিন্তু বাণিজ্যিক শিল্প সাহিত্যই একটি প্রজন্ম থেকে আরেকটি প্রজন্মে মতাদর্শহীন প্রতিবন্ধী দর্শকপাঠক তৈরিতে ভূমিকা রাখছে। কিন্তু আজ সময় এসেছে স্রোতের প্রতিকূলে গণমানুষের রাজনীতি ও সংস্কৃতি চর্চার মাধ্যমে শোষণের শৃঙ্খল ভেঙ্গে সামনে এগিয়ে যাওয়ার।

ষষ্ট ভাগ উদারনৈতিকতা, মতাদর্শহীনতার স্বরূপ ও বিপ্লবী মতাদর্শ:

শ্রদ্ধেয় ড. আহমদ শরীফ ‘ইতিহাসের নিরপেক্ষ আয়নায় বাংলাদেশ’ (১৮৮ পৃষ্ঠা)-এ প্রশ্ন করেছেন, আমরা কার পক্ষে? নাকি আমরা নিরপেক্ষ? নিরপেক্ষ তো ধূর্ত, কপট, মিথ্যুক, প্রবঞ্চক, চালবাজ, সুবিধাবাদী, মোনাফেক, মক্কর।” রাষ্ট্রের অধীনে থাকা শ্রেণী বিভক্ত মানুষ স্বস্ব শ্রেণীর অধীনে থেকে রাষ্ট্রে, সমাজে, সংস্কৃতিতে, রাজনীতিতে কোন নিরপেক্ষ ভূমিকা রাখতে পারেনা। এটা সত্য জেনেই জনগণের একটি অংশ ‘নিরপেক্ষ’ বা উদারনৈতিকতার ভান ধরে পুঁজির মতাদর্শকেই প্রচার করে। সে সকল ব্যক্তির এই মতাদর্শহীন রাজনৈতিক অবস্থান আসলে তার নিজের শ্রেণীর অধীনে একটি মতাদর্শগত অবস্থান, যার মূল উদ্দেশ্য মতাদর্শহীন রাজনৈতিক অবস্থানের নামে শাসক গোষ্ঠী ও তার প্রভু সাম্রাজ্যবাদের মতাদর্শ পুঁজিবাদকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরা। এই ধূর্ত, কপট, মিথ্যুক, প্রবঞ্চক, চালবাজ, সুবিধাবাদী, মোনাফেক, মক্কর প্রজাতিটি আমাদের সমাজে সদা দৃশ্যমান। শ্রেণী নিরপেক্ষ, রাজনীতি নিরপেক্ষ এই জাতীয় অদৃশ্য মতবাদের কোন সারাংশ না থাকলেও এই জাতীয় মতবাদের গোঁড়ায় শাসক শ্রেণী, বুর্জোয়া সংস্কৃতি পানি ঢালে। এটা জনগণকে নিঃরাজনীতিকীকরণের দিকে উদ্বুদ্ধ করার একটা বৈশ্বিক ও দেশীয় কার্যক্রমের অংশ। এতে দেশীয় লুটেরা রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্যবাদী রাজনীতি থেকে জনগণের মন ও দৃষ্টি দুরে থাকে, এর ফলে উপকৃত হয় পুঁজিবাদ, শাসক শ্রেণীর শাসন ও শোষণ। রাজনীতি সচেতন হলেই বুর্জোয়া পুঁজিবাদী রাজনীতি ও সমাজতান্ত্রিক রাজনীতির পার্থক্য নির্ণয় করা সম্ভব। এ পার্থক্য নির্ণয়ে যতো বিলম্ব ঘটবে; পুঁজিবাদ ও তাদের মিত্র শাসক শ্রেণীর পতন ততোই বিলম্বে ঘটবে। শোষক শ্রেণীর পক্ষে খুবই স্বাভাবিক সমাজতান্ত্রিক রাজনীতি ও সংস্কৃতির বিরোধিতা করা ও সেইসাথে শ্রেণী নিরপেক্ষ, রাজনীতি নিরপেক্ষ জাতীয় অদৃশ্য অসাড় মতবাদে উৎসাহিত করা। সমাজতান্ত্রিক রাজনীতি ও সংস্কৃতির চর্চা শোষক শ্রেণীর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সংগ্রামের এক অতি শক্তিশালী হাতিয়ার; যে হাতিয়ার দিয়ে সমাজতন্ত্রের সংগ্রামে জয়যুক্ত হওয়া সম্ভব; এটা কোন শাসক গোষ্ঠী চায়না। তেমনি গণমানুষের সংগ্রামে জনগণের সম্পৃক্ততা, সক্রিয় অংশগ্রহণ যেন না থাকে, সে জন্যই শ্রেণী নিরপেক্ষ, রাজনীতি নিরপেক্ষ এসব অদৃশ্য অসাড় মতবাদে উৎসাহিত করা। সাম্রাজ্যবাদী, পুঁজিবাদীসহ সকল অপশক্তির নিঃরাজনীতিকীকরণের যে কার্যক্রম বৈশ্বিক ও দেশীয় কার্যক্রম চালু আছে তা থেকে আমরা মুক্ত নই। “মানুষকে শারীরিকভাবে অস্ত্রের আঘাতে মারতে পারলেও তার চিন্তাকে, তার সংস্কৃতিকে গুলি করে মারা যায় না; কিন্তু যদি মতাদর্শহীন একটি সংস্কৃতি গড়ে তোলা যায়, তবে বিষয়টি মারা বা মেরে ফেলার মত মনে হয় না বটে, তবে এর দ্বারা মানুষের চিন্তা চেতনাকে অসাড় লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যহীনতায় পরিবর্তন করে দেয়া যেতে পারে। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চিন্তা সহ সমাজের সকল মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনের সকল চিন্তা ও কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়েই প্রকাশ পায় ব্যক্তির ও তাঁর শ্রেণীর সংস্কৃতি। যদি কেউ দাবী করে সে কোন মতাদর্শী নয়; তবে সে নিজের ও সমষ্টির মুক্তির জন্য অনুকূলে নয় প্রতিকূলে নিজেকে নিয়োজিত রাখছে। শ্রেণী নিরপেক্ষ, রাজনীতি নিরপেক্ষ কথাগুলি পেটি বুর্জোয়াবুর্জোয়া সুবিধাবাদী ধারণা থেকে উদ্ভূত। সমষ্টির মুক্তির লক্ষ্যে, গণমানুষের মুক্তির লক্ষ্যে; সর্বহারা শ্রমিক শ্রেণীর যে রাজনৈতিক সংগ্রাম ও সাংস্কৃতিক সংগ্রাম উভয়েরই নিশ্চিত ভিত্তি রচিত হয় মতাদর্শের তাত্ত্বিক কাঠামো দ্বারা এবং এই মতাদর্শীক তাত্ত্বিক কাঠামো রচনাই গণমানুষের রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক সংগ্রামের সর্বোচ্চ একটি রূপ। তাই মতাদর্শহীন মানুষ শ্রেণী সংগ্রাম,সাংস্কৃতিক সংগ্রাম, মুক্তির বার্তা বহন করতে পারে না, মুক্তির সপক্ষে কোন ধরনের ভূমিকা নিতে পারে না। আবার সে যে ভূমিকা নেয় সেটা সুন্দর জীবন বা মুক্তির অনুকূলে নয় প্রতিকূলে, প্রকারান্তরে নিজের সাথে গণ মানুষের সাথে প্রতারণা করা।

সমাজতান্ত্রিক রাজনীতি ও সংস্কৃতি বা শোষক শ্রেণীর বুর্জোয়া রাজনীতিসংস্কৃতিতে অর্থাৎ এই দুটি দ্বারা যে রাজনীতিসংস্কৃতি, শিল্পসাহিত্যসঙ্গীত ইত্যাদি যাই বোঝানো হোক, প্রত্যেকটি ক্ষেত্রেই তা একেকটি ভিন্ন ভিন্ন কিন্তু পরস্পর বিপরীত মতাদর্শীক কাঠামো দ্বারা গঠিত। ইতিহাসের গতিপথে শ্রেণীবিভক্ত সমাজ বিশেষ বিশেষ সময়ে এক পর্যায় থেকে অন্য একটি পর্যায়ে অতিক্রম ও উপনীত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা স্পষ্টতর হতে থাকে। শ্রেণী কাঠামোর এরূপ ঐতিহাসিক পর্যায়ের সর্বশেষ পুঁজিবাদী সমাজে এসে শ্রমিককৃষক শ্রেণী যখন প্রস্তুত হতে থাকে শোষণমূলক সমাজ উচ্ছেদের জন্য, যখন তাঁরা নিযুক্ত থাকে শ্রেণী সংগ্রামকে চূড়ান্ত পরিণতির দিকে এগিয়ে নেওয়ার জন্যে; এই চূড়ান্ত সংগ্রামে সুরক্ষিত সুশৃঙ্খলিত মতাদর্শীক কাঠামো নির্মাণই শর্ত হয়ে দাঁড়ায়। এটা শ্রমিক শ্রেণীর শ্রেণী সংগ্রামের এমন এক শর্ত, যে শর্ত পূরণ না হলে শ্রেণী সংগ্রামকে সঠিকভাবে দাঁড় করানো, সঠিক পথে পরিচালনা করা এবং সেই সংগ্রামের মাধ্যমে শোষক শ্রেণীকে উচ্ছেদের লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হয় না। লেনিনের বিখ্যাত উক্তি, বিপ্লবী মতাদর্শ ব্যতিত কোন বিপ্লবী আন্দোলন হতে পারে না” এ কারণেই সর্বহারা শ্রেণীর বিপ্লবী আন্দোলনের ক্ষেত্রে বিপ্লবী মতাদর্শ এত তাৎপর্যপূর্ণ। এই বিপ্লবী মতাদর্শ যদি না থাকে তাহলে শুধু যে সঠিক সমাজতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংগ্রাম শ্রমিক শ্রেণীর পক্ষে অসম্ভব হয় তাই নয়, সর্বহারা জনতাশ্রমিককৃষক শ্রেণীর পক্ষে সমাজতান্ত্রিক তথা গন মানুষের সংস্কৃতি চর্চাও সম্ভব হয় না। শ্রমিক শ্রেণীর রাজনৈতিক সংগ্রাম এবং সাংস্কৃতিক সংগ্রাম উভয়েরই নিশ্চিত ভিত্তি রচিত হয় মতাদর্শের তাত্ত্বিক কাঠামো দ্বারা এবং এই মতাদর্শীক তাত্ত্বিক কাঠামো রচনাই গন মানুষের সংস্কৃতি চর্চা ও সংস্কৃতি সাধনার ও সাংস্কৃতিক সংগ্রামের সর্বোচ্চ রূপ। রাজনীতি ও সংস্কৃতি সম্পর্কে কোন আলোচনা যেমন সমাজ থেকে বিচ্ছিন্নভাবে করা চলে না তেমনি তাকে বিচ্ছিন্ন করা চলে না শ্রেণী বা শ্রেণী সংগ্রাম থেকেও। কাজেই যে কোন সংস্কৃতির, যে কোন মতাদর্শের এবং তার প্রতিনিধিত্বকারী এক অথবা একাধিক ব্যক্তির রাজনৈতিকসাংস্কৃতিক চরিত্র শ্রেণী নিরপেক্ষ নয় এবং তা হতে পারে না।

সর্বহারা শ্রমিক শ্রেণীর রাজনীতিসংস্কৃতি এবং এর থেকে ফলাফল থেকে উদ্ভূত মুক্তি অর্থাৎ মুক্তিকে যেভাবেই প্রকাশ্যে আনি না কেন মুক্তির এ লক্ষ্য অর্জন রাজনৈতিক চেতনা, রাজনৈতিক চিন্তাধারা এবং রাজনৈতিক সংগ্রাম ব্যতিত সম্ভব নয়। “রাজনীতির সঙ্গে সংস্কৃতির এই সম্পর্ক অবিচ্ছিন্ন এবং ওতপ্রোত হলেও সাধারণত এই সম্পর্ক খোলাখুলিভাবে দৃশ্যমান হয় না। এটা দৃশ্যমান হয়ে ধরে পড়ে সমাজের এক এক সংকট মূহুর্তে, ক্রান্তিকালে, এক চরিত্র থেকে অন্য চরিত্রে পরিবর্তিত হওয়ার অথবা উত্তরণের সময়। এক কথায় বলা চলে বিপ্লবী পরিস্থিতিতে(সংস্কৃতি ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের লক্ষ্য : বদরুদ্দীন উমর)। সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিকভাবে বা চিন্তাচেতনাগতভাবে মতাদর্শহীনতায় ব্যক্তির দেউলিয়াত্ব প্রকাশিত হয়। আমাদের স্বাভাবিক জীবনে যাপনের মাঝেই নানা সংকটে নানা আন্দোলন সংগ্রাম চলে আসে; যদি সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শ না থেকে তবে সে সংকটকে যথার্থরূপে মোকাবিলা করতে আমরা অক্ষম হব। আন্দোলন সংগ্রামে ভূমিকা রাখা হয়ে উঠে না। সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের মাধ্যমে গন মানুষের মুক্তি একদিন আসবেই আসতেই হবে। বিপ্লবী পরিস্থিতির সেই আকাঙ্ক্ষিত সময় অব্ধি কোন ব্যক্তি বা সংগঠনের অস্তিত্ব না থাকলেও ইতিহাসে সেই ব্যক্তি বা সংগঠনের ভূমিকা কিরূপে নির্ণীত হবে? কিভাবে মূল্যায়ন করা হবে? বিষয়টি অনাগত ভবিষ্যতের হলেও বিশেষ ভাবে ভাবায় বৈকি!

আমাদের সমাজের গঠন চরিত্রে এই যে নিরপেক্ষ সংস্কৃতি বা নিঃরাজনীতিকীকরণের যে প্রতিফলন; সংস্কৃতি বা রাজনীতির এই বিশেষ চরিত্রকে দুর করতে হবে। রাজনীতির উন্নতি অর্থই হলো পুঁজিবাদের নয় সমাজতান্ত্রিক রাজনীতি ও সংস্কৃতির সর্বাঙ্গীণ উন্নতি, একটি সুন্দর জীবন, এককথায় ‘মুক্তি’! তাই বিরাজমান বুর্জোয়া পুঁজিবাদী রাজনীতিতে কিভাবে সমাজতান্ত্রিক রাজনীতিকে প্রতিষ্ঠাপিত করা যায়, এটাই হওয়া উচিত আমাদের রাজনীতি ও সংস্কৃতি চিন্তার মূল বিষয়। এ অবস্থায় সমাজতান্ত্রিক রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন অপরিহার্য।

আমি, আপনি, সে এই তিনজনে আন্দোলন করলেই কাঙ্ক্ষিত সমাজতান্ত্রিক রাজনীতি বা সংস্কৃতি কি সমাজের উপর অধিষ্ঠিত হবে? হ্যাঁ, এটা শুরু করার একটা উপলক্ষ্য হতে পারে। কারণ একথা সত্য যে, ব্যক্তি বিশেষের কীর্তি চূড়ান্ত বিশ্লেষণে সামাজিক তাগিদেরই প্রতিফলন। বিশেষ ঐতিহাসিক পর্যায়ে বিশেষ সময়ে বিশেষ সমাজের অন্তর্নিহিত তাগিদগুলি সমাজের অবস্থানকারী জনগণের মধ্যে থেকে আমাকে, আপনাকে, তাকে প্রত্যাশা করে। বিশেষ ঐতিহাসিক পর্যায়ের সেই বিশেষ সময়ে এই আমি, আপনি বা সে ব্যক্তি রূপে ইতিহাসের সেই সব তাগিদের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে সমাজে আবির্ভূত হতে পারি। মার্কসলেনিনমাও সেতুঙ তাই বিশেষ ঐতিহাসিক পর্যায়ে বিশেষ সময়ের বিশেষ সমাজের বিশেষ প্রয়োজনের সৃষ্টি। এদের ব্যক্তিগত ভূমিকা ইতিহাসে কোন বিরাট ব্যতিক্রমী ভূমিকা নয়, বরং তারা ঐ সমাজের অন্তর্নিহিত তাগিদগুলি, বিশেষ উপাদানগুলোকে প্রত্যাশা অনুযায়ী ধারণ করেছিলেন; তাই তারা ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন বটে, কিন্তু তারা নিজেরাও নিজেদের সমসাময়িক ইতিহাসেরই সৃষ্টি। একজন ব্যক্তি ইতিহাসের গতিকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অল্প বিস্তর প্রভাবিত করতে সক্ষম হলেও কোন ব্যক্তির অবস্থান বা কৃতিত্ব তার নিজের সমাজের এবং নিজের ঐতিহাসিক কালপর্বের ঊর্ধ্বে নয়! তাই আমাদের এই ভূমিকা যেভাবেই পালন করিনা কেন, আমরাও সেই কাল পর্বে প্রভাব বিস্তারি ক্ষুদে ব্যক্তি মাত্র, বাকিটা নির্ভর করে বিশেষ ঐতিহাসিক পর্যায়ে সমাজের অন্তর্নিহিত তাগিদগুলি, বিশেষ উপাদানগুলোকে কে কতটুকু ধারণ করতে পারে তার উপর।

মার্কসবাদ আমাদের শেখায় যে, মতাদর্শের বাইরে আমাদের কারো কোন অবস্থান নাই; পূর্বেই উল্লেখ করেছি যে, আজকে যারা শ্রেণী নিরপেক্ষ, রাজনীতি নিরপেক্ষ, অথবা নিঃরাজনীতিকীকরণ ইত্যাদি ভাবনায় চালিত তারা অচেতন বা সচেতনভাবে বিশেষ শ্রেণীর মতাদর্শকে ধারণ করেই এসব প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। এ প্রসঙ্গে চলে আসে একটি বিশেষ শ্রেণী, যারা নিজেদের ‘উদারনৈতিক’, ‘প্রগতিশীল’, ‘সুশীল সমাজ’ ইত্যাদি নানা নামে পরিচিত করতে ভালবাসেন, কিন্তু রাজনৈতিক পরিচয়কে লুকিয়ে রাখেন; তারা আসলে কারা? এরা দুটি গোষ্ঠীতে বিভক্ত। লেখক, সাহিত্যিক, পেশাজীবীর সমন্বয়ে প্রতিক্রিয়াশীল একটি গোষ্ঠী সরাসরি শাসক শ্রেণীর দালালীতে নিযুক্ত। পক্ষান্তরে, তদ্রূপ শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, সংবাদকর্মী, এনজিও মালিক, এনজিও কর্মী, মানবাধিকার কর্মী, সুশীল নাগরিক ইত্যাদি নানা মুনির সমন্বয়ে ‘প্রগতিশীল’ নাগরিকের পরিচয়ে এরা ইনিয়ে বিনিয়ে শাসক শ্রেণীকে নানা উপদেশ দেয়। শাসক শ্রেণীর নিজেদের মধ্যকার দ্বন্দ্বে রেফারীর ভূমিকায় দেখা যায় এদের। মূল ধারার রাজনীতির নামে শাসক শ্রেণী ও তাঁদের রাজনৈতিক দল যখন লগি বৈঠার মারামারি, টেন্ডারবাজী, সন্ত্রাস, খুন, গুম করে, এদের কাছে তখন তা হয়ে পড়ে গণতান্ত্রিক রাজনীতির উপাদান। শাসক শ্রেণীর হাতে ও তাঁদের রাজনীতিতে এই উদারনৈতিক প্রগতিশীল সুশীল সমাজ কোন রক্ত খুঁজে পায় না, যেটা পায় তা হলো ‘শিশু গণতন্ত্র’এর বালেগানা প্রাপ্তি। এরাই এনজিওকে জিইয়ে রাখার পক্ষপাতী যাতে মানুষ বিপ্লবী না হয়ে যায়, বিপ্লবী চিন্তা চেতনা ধারণ না করতে পারে। এনজিও মানে এদের কাছে নগদ কিছু, দালালীর বিনিময়ে সম্মানী লাভ করা। এরাই বিনা বিচারে হত্যাকে হালাল ভাবতে শিখায়। পুলিশের সাইরেন এদের কাছে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত। অথচ সাম্প্রদায়িক রাজনীতি, ধর্মীয় ফ্যাসিবাদী গোষ্ঠীর রাজনীতিকে এরা চরমপন্থা নয়, গণতন্ত্রের অংশ মনে করে। এই সাম্প্রদায়িক রাজনীতি, ধর্মীয় ফ্যাসিবাদী অপশক্তির বিরুদ্ধে এরা কালেভদ্রে মৃদু স্বরে কথা বলে; আবার এদের সাথে লিয়াজো করে, জোট বাধে, ক্ষমতার অংশীদারি রাজনীতিকে সমর্থন করে, জনগণের শত্রু রূপে নির্ণয় করে না। সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসনকে মিউ মিউ স্বরে প্রতিবাদ করলেও সাম্রাজ্যবাদের মূল অস্ত্র ‘পুঁজিবাদ’কে নানাভাবে স্বাগত জানায়, সাম্রাজ্যবাদের দালালী ভোগ করে, শাসক শ্রেণীর ক্ষমতার উচ্ছিষ্ট খেয়ে নিজেকে সন্তুষ্ট রাখে। জনগণের পক্ষে এই চুতিয়াশীলরা যখন কথা বলে, তখন জনগণের স্বার্থে নয়; কথা বলে শাসকদের স্বার্থেই। তারা হচ্ছে পুঁজিবাদে বিশ্বাসী শাসক শ্রেণীর অবৈতনিক পরামর্শদাতা। শাসক শ্রেণীর যে মতাদর্শ সে মতাদর্শের ক্যানভাসার হয়ে এরা কাজ করে। তারা জনগণকে নানা উপদেশ দেয় এবং চালিত করে সে মতে চলতে ও মেনে নিতে। শাসকের ক্ষমতার উচ্ছিষ্ট ভোগের জন্য লকলকে জিহ্বা বের করে অপেক্ষায় থাকে, কখন একটু চাটা যায়। দালালীর ছানিযুক্ত এক চোখা চোখে এরা শোষণ দেখে না, কিন্তু উন্নয়নের নানা পরিসংখ্যান হাজির করায় এরা পারঙ্গম। উৎপাদনের সাথে সম্পর্কহীন পরান্নভোজী এই জাতীয় পরজীবী (National Parasites) প্রতিক্রিয়াশীল ও তথাকথিত প্রগতিশীল উভয়ের মাঝে রয়েছে অনেক মিল। দেশটাকে এরাই ভাগ বাটোয়ারা করে চুষে খেয়ে ছোবড়া বানাচ্ছে। শোষিত শ্রমিককৃষক শ্রেণীর শ্রেণী সংগ্রামকে এরাই অস্বীকার করে, নৃশংস পন্থায় তা দমনে জনমত তৈরি করে। তারা একদিকে যেমন কমিউনিস্টদের শ্রেণী সংগ্রামকে সন্ত্রাসবাদিতা উল্লেখ করছেন, অপরদিকে তারা সাম্রাজ্যবাদ ও তাদের দোসর শাসক শ্রেণীর সকল হত্যাযজ্ঞকে ‘হালাল’ মনে করে। স্বাধীনতার পর এরাই রক্ষীবাহিনীর ৩০৩৫ হাজার হত্যাকে সমর্থন করেছিল। বাংলাদেশ রাষ্ট্র জন্মের পর বিভিন্ন সময়ে সেনাবাহিনী কর্তৃক পাহাড়ীআদিবাসীদের উপর গণহত্যা চালানোটাও এরা সমর্থন করেছে সার্বভৌমত্বের বুলি আওড়ে। ২০০১ সালেও অপারেশন ক্লিনহার্টের নামে হাজার হাজার মানুষ হত্যাকে এরাই সমর্থন করেছিল। এরই ধারাবাহিকতায় র‍্যাব দ্বারা এখনো যে হত্যাকাণ্ডগুলো প্রতিনিয়ত সংগঠিত হচ্ছে, এরাই এতে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের জন্য এ সকল হত্যাকাণ্ড তাঁদের কাছে হত্যা নয়। আবার শাসক শ্রেণীর বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলগুলো যখন নিজেদের মধ্যকার ক্ষমতার দ্বন্দ্ব টিকিয়ে রাখতে গিয়ে শত শত মানুষের প্রাণ হরণ করে, এসব প্রাণ হরণ তাঁদের কাছে শাসক গোষ্ঠীর ও তাঁদের রাজনীতির গ্রহণ যোগ্যতা কমায় না। তারা নামে বিভিন্ন হলেও আসলে একই দলভুক্ত, জনগণের শত্রু, পুঁজিবাদের সংরক্ষক। লড়াইটা এদের বিরুদ্ধেও। এ লড়াই যেমন রাজনৈতিক হবে, তেমনি তাকে সাংস্কৃতিকও হতে হবে।

যাইহোক এ প্রসঙ্গে ‘প্রতিক্রিয়াশীল’ ‘উদারনৈতিক’ ‘প্রগতিশীল’ ‘সুশীল সমাজ’ নামধারী এই বিশেষ শ্রেণীর বাইরে যারা নিতান্তই সাধারণ নাগরিক, প্রজাতন্ত্রের সাধারণ প্রজা বিশেষ, কিন্তু কোন মতাদর্শকে ধারণ না করেই নিজেদের নিরাপদ ও মুক্ত স্বাধীন নাগরিক মনে করেন, তাঁদের সম্পর্কে জার্মান কবি আরনেস্ট টলারের নিম্নের কবিতাটি খুবই প্রাসঙ্গিক বার্তা বহন করে

যখন ওরা কমিউনিস্টদের ধরে নিয়ে গেলো,

আমি কিছু বলিনি কারণ আমি কমিউনিস্ট নই।

এরপর ওরা ট্রেড ইউনিয়নিস্টদের ধরে নিয়ে গেলো,

আমি তখনও কিছু বলিনি কারণ আমি ট্রেড ইউনিয়নিস্ট নই।

এরপর তারা এল ইহুদীদের ধরে নিয়ে যেতে

আমি তাঁদের হয়ে লড়লাম না, কারণ আমি তো ইহুদী নই।

একদিন ওরা এলো আমাকে নিয়ে যেতে,

কিন্তু আমার হয়ে লড়বে এমন কেউ আর তখন বাকী নেই।”

এই নিবন্ধের বিষয়বস্তু যেমন সাংস্কৃতিক, তেমনি রাজনৈতিক চেতনাগত। মার্কসের মতে, ‘মানব ইতিহাসের যাবতীয় ঘটনা একমাত্র অর্থনৈতিক বিচারবিবেচনার দ্বারা পরিচালিত হয়ে আসছে। ইতিহাসের ঘটনাবলীকে ধর্মীয়, নৈতিক, আধ্যাত্মিক বা যে কোন কারণের অভিব্যক্তি বলে বর্ণনা করা হোক না কেন সেগুলি আদতে অর্থনৈতিক বিচারবিবেচনা থেকে উৎসারিত।” মার্কসের মতে, সামাজিক উৎপাদনের ফলে সৃষ্ট বিভিন্ন সম্পর্কের যোগফল নিয়েই সমাজের অর্থনৈতিক কাঠামো গঠিত হয়। এই ভিত্তির উপর আইনগত এবং রাজনৈতিক অধিকাঠামোসমূহ প্রতিষ্ঠিত এবং সামাজিক চেতনার বিভিন্ন প্রকাশ এই ভিত্তির সঙ্গে সম্পর্কিত। বস্তুগত জীবনে উৎপাদনের যে পদ্ধতি বিরাজ করে তা সামাজিক, রাজনৈতিক ও আধ্যাত্মিক জীবন প্রক্রিয়ার সাধারণ চরিত্রকে নির্ধারিত করে। মানুষের চেতনা তার অস্তিত্বকে নিয়ন্ত্রিত করে না বরং সামাজিক অস্তিত্বই তার চেতনাকে নিয়ন্ত্রিত করে।” তাই রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে সমাজসংস্কৃতির চেতনাগত বিষয়টি মুখ্য হয়ে উঠে। মানুষের ক্ষেত্রে চেতনাশূন্য কোন চেতনা যেমন নাই, থাকতে পারে না; তেমনি মতাদর্শবিহীন কিছু নাই, থাকতে পারে না।

মার্কস এর ভাবনাকে লেনিন তার ‘ধর্ম’ বিষয়ক নিবন্ধে যেভাবে বর্ণিত করেছেন তা হলো মানুষের চিন্তা যা কিছু সৃষ্টি করেছে সেগুলিকে পুনর্বিবেচনা করে, বিচার বিশ্লেষণ করে শ্রমিক শ্রেণীর আন্দোলনের ক্ষেত্রে যাচাই করে তার থেকে নির্দিষ্ট আকারের এমনসব সিদ্ধান্ত মার্কস নিয়ে আসেন যা বুর্জোয়া সীমাবদ্ধ আটক কিংবা বুর্জোয়া বদ্ধধারণা গ্রস্ত লোকেরা করতে পারেনি। যেমন কিনা যখন আমরা বলি ‘সর্বহারা সংস্কৃতি’ তখন আমাদের মনে থাকা চাই যে, মানব জাতির বিকাশের সমগ্র ধারায় সৃষ্ট সংস্কৃতি সম্বন্ধে আমাদের যথাযথ জ্ঞান থাকলে এবং সেটাকে রূপান্তরিত করলে একমাত্র তবেই আমরা ‘সর্বহারা সংস্কৃতি’ সৃষ্টি করতে সমর্থ হব, এটা স্পষ্ট উপলব্ধি না করলে আমরা আমরা সমস্যার মীমাংসা করতে অপারগ হব। পুঁজিবাদী সমাজ, জমিদারী সমাজ আর আমলাতান্ত্রিক সমাজের জোয়ালে জোতা থাকা অবস্থায় মানব জাতি যে জ্ঞান ভাণ্ডার সঞ্চিত করেছে তারই সুনিয়মিত বিকাশ হতে হবে সর্বহারা সংস্কৃতিকে। এই সমস্ত রাস্তা আর পথ পৌঁছায়, পৌঁছচ্ছে এবং পৌছাতে থাকবে সর্বহারা সংস্কৃতিকে, ঠিক যেমন মার্কসের হাতে নতুন আকারে অর্থশাস্ত্র আমাদের দেখিয়েছে কোথায় পৌছতে হবে মানব জাতিকে, নির্দেশ করেছে শ্রেণী সংগ্রামে উত্তরণ এবং সর্বহারা বিপ্লবের সূচনার দিকে।” তাই সচেতন শৃঙ্খলা ও সচেতন সর্বহারা রাজনীতিসংস্কৃতি, তথা গণমানুষের রাজনীতিসংস্কৃতি ভিন্ন আমাদের এমন স্বপ্নের কোন আশা ভরসা নেই।

সপ্তম ভাগ উপসংহার:

ইদানীং একটা কথা শোনা যায় – ‘পরিবর্তন চাই’। খুব ভালো কথা, কিন্তু কার পরিবর্তন চাই? কিসের পরিবর্তন চাই? বারাক ওবামাও এই change, we need” শ্লোগান তুলে পরপর দুইবার ক্ষমতায় আসীন হয়েছে। পাশের দেশ ভারতেও এই ‘পরিবর্তন চাই’ শ্লোগান তুলে কংগ্রেস ক্ষমতায় এসেছিল। আমাদের বর্তমান শাসক রাজনৈতিক দলটিও ঐ একই কথা তুলে ভোটের আবদার করেছিল। বস্তুত এভাবেই পরিবর্তনের ‘মুলা’ দেখিয়ে বুর্জোয়া রাজনীতি যুগ যুগ ধরে ক্ষমতাকে আঁকড়ে ধরে রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে ‘আরব বসন্তের’ নামে পরিবর্তনের যে বাতাস প্রবাহিত হয়ে গেল, তাতে কোন পরিবর্তন আসেনি। ‘আরব বসন্ত’ গ্রীষ্মের ভ্যাপসা গরম ও ‘লু’ হাওয়ায় পরিণত হয়েছে। সাম্রাজ্যবাদের হাত ধরে সাম্প্রদায়িক শক্তি ক্ষমতা দখল করেছে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় সাম্রাজ্যবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা পাশাপাশি হাত ধরাধরি করে চলে। তিউনিসিয়ায় শরিয়া আইন চালু হয়েছে। মিসরে এর চেষ্টা চলছে। লিবিয়াকে লুণ্ঠন করার জন্য সাম্রাজ্যবাদের তাঁবেদার শক্তিকে ক্ষমতায় বসানো হয়েছে। জনগণ পরিবর্তন চেয়েছিল, কিন্তু উপযুক্ত সংগঠন ও রাজনৈতিক চেতনার অভাবে; জনগণের সংগ্রাম সাম্রাজ্যবাদ ও তাঁদের মিত্র শাসক শ্রেণীর কাছে ক্ষমতার হস্তান্তর ব্যতিত পরিবর্তনের কাজে আসেনি। আমেরিকা, ভারত বা আমাদের দেশেও ‘পরিবর্তন চাই’ এ শ্লোগান ‘ক্ষমতার হস্তান্তর’ ব্যতিত কোন অর্থ বহন করে নাই।

তাই কার পরিবর্তন চাই? কিসের পরিবর্তন চাই? এটা নির্দিষ্ট করা জরুরী! নেতা বা সাম্রাজ্যবাদের পদলেহনকারী শাসক গোষ্ঠীর এক দলের পরিবর্তে অন্য দলের আগমন, ক্ষমতার হস্তান্তর কোন পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারে না। বিরাজমান শাসনতান্ত্রিক পদ্ধতির (Governance System) পরিবর্তন না করে পদ্ধতির শীর্ষে যদি কোন দেবদূত বা ফেরেশতাকেও বসিয়ে দেয়া হয়, তাও সেটা কার্যকর (functioning) কোন পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারে না। পিপলস পাওয়ারের জন্য চাই জনগণের একটি সুসংগঠিত বিপ্লবী বাহিনী ও তার ক্ষমতা দখল। এটা অনুধাবন করে বিপ্লবী রাজনীতিসংস্কৃতির অনুকূলে নিজেকে তৈরি করার মাঝেই আসতে পারে পরিবর্তন, অন্যথায় নয়। তাই বলতেই হয় ‘ফার্স্ট ডিজার্ভ দেন ডিজায়ার’। ড. আহমেদ শরীফ তার ‘বাঙালীর মনন বৈশিষ্ট্য (পৃষ্ঠা২৩২)’-এ বলেছেন, আজকের দুনিয়ায় নিঃস্ব, দুঃস্থ গণমানবের জিগির ও স্বপ্ন হচ্ছে সমাজবাদ ও সাম্যবাদ।” তিনি সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদকে জিন্দাবাদ দিয়ে বলছেন, “কেননা মানবিক সমস্যার সমাধানের এ মুহূর্ত অবধি ওই একমাত্র উপায়।” (‘কমিউনিস্ট বিশ্বের হুজুগে বিদ্রোহ, বিপর্যয় ও মার্কসবাদ’)। মুক্তমনের আহমদ শরীফ নিশ্চিত হয়েছেন যে, স্বনির্ভর হওয়ার ও সার্বভৌম থাকার একমাত্র উপায় হচ্ছে সমাজতন্ত্র অঙ্গীকার করা।” (‘ইতিহাসের নিরপেক্ষ আয়নায় বাংলাদেশ’)। সমাজতন্ত্র ব্যতিরেকে নারী মুক্তি ঘটবে না, নারীমুক্তির প্রশ্নটিকে তিনি দেখেছেন শ্রেণী মুক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত করে (‘সাম্প্রদায়িকতার শেকড় ও শাখা পল্লব’)। অন্যত্র বলেছেন, কমিউনিস্টরাই প্রথম ধর্মনিরপেক্ষ স্বদেশ চেতনার কথা বলে এবং ধর্মনিরপেক্ষ মানববাদী হয়ে ওঠে। তার আগে হিন্দু মুসলমান ছিল, মানববাদী ছিল না।” (‘উনিশ শতকের বাংলার সাহিত্যে জাতিদ্বেষণা’)

নিবন্ধের সবশেষে এসে কোন ন্যায় বোধ, নীতিকথা বা নৈতিকতা থেকে বা নিছক তর্কের খাতিরে যদি এরপরেও কেউ দাবী করে – ‘কোন মতাদর্শ ধারণ না করা’ সঠিক! তবে এটা অবশ্যই বুর্জোয়াপেটি বুর্জোয়া শ্রেণী অবস্থান থেকে সুবিধাবাদী দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ হবে। সে ক্ষেত্রে লেনিনের একটি উক্তি দিয়ে বলা যায় শ্রেণীগত কোন ধারণা থেকে গৃহীত যেকোনো নৈতিকতা (বা তর্ক) আমরা প্রত্যাখ্যান করি। আমরা বলি সেটা প্রতারণা। আমরা বলি আমাদের নৈতিকতা সর্ব তো ভাবেই সর্বহারার শ্রেণী সংগ্রামের বশবর্তী। সর্বহারার শ্রেণী সংগ্রামের স্বার্থ থেকেই আসছে আমাদের নৈতিকতা”

সেই নৈতিক প্রশ্নে মহাভারতের একটি ট্র্যাজিক চরিত্র কর্ণের মতো বলতে হয়

যাকে বলে উদ্যম, চেষ্টা, পৌরুষ যুদ্ধ তারই নামান্তর,

যুদ্ধহীন কোনো কর্ম নেই জগতে।’

এই যুদ্ধ

আমার বহুকালের প্রতীক্ষিত, প্রত্যাশিত।

সে অর্থ দেবে আমাকে, আমার অস্তিত্বকে।

আর বিনিময়ে

নেবে আমার চরম চেষ্টা, অন্তিম উদ্যম,

আমার সব অব্যবহৃত আবেগ।

আমি স্বাগত জানাই

রক্তবর্ণ, ক্ষমাহীন, মুক্তিদাতা এই দেবতাকে”।

আমাদের যুদ্ধ একটাই, পক্ষ দুইটি; শোষিত সর্বহারা শ্রমিককৃষক শ্রেণী বনাম পুঁজিবাদসাম্রাজ্যবাদ ও তার দোসর শোষক শ্রেণী। এ যুদ্ধের সেই মহানায়ক দেবতাঅবতার কে হবে? সেটা হবে ইতিহাসের মহাননির্ণয়। কিন্তু আপনারআমার শারীরিক অংশগ্রহণ থাকুক বা না থাকুক, কিন্তু চেতনাগতভাবে এই যুদ্ধে নিরপেক্ষ কোন অবস্থান নাই, থাকার প্রশ্নই উঠে না।

আমি সর্বহারা মেহনতি মানুষের পক্ষের একজন, আর আপনি??

জয় হোক সমাজতন্ত্রের, জয় হোক সর্বহারা মেহনতি মানুষের, জয় হোক সর্বহারা সংস্কৃতির।।

(তথ্য সুত্রঃ নিবন্ধে উল্লেখিত তথ্য সূত্র ছাড়াও অন্যান্য নিবন্ধ ও গ্রন্থের সাহায্য নেয়া হয়েছে। কৃতজ্ঞতা স্বরূপ উল্লেখ করছি, মার্কস ও এঙ্গেলসের কয়েকটি নিবন্ধ, রাহুল সাংকৃত্যায়নের ‘মানব সমাজ’, হেনরি মরগানের ‘আদিম সমাজ’ লেনিনের ‘রাষ্ট্র ও বিপ্লব’, নেসার আহমেদের ‘ক্রসফায়ার’ সহ শিক্ষাবিদ ড. সিরাজুল ইসলামের নিবন্ধ।

ধন্যবাদ জানাই বন্ধু অনুপ সাদি’কে, সেই সাথে ধন্যবাদ জানাচ্ছি কিছু মতাদর্শহীন ব্যক্তি বর্গকে যাদের প্ররোচনা ছাড়া এ নিবন্ধ লেখা হত না।)

—————————————————–

টিকা

১। ‘বুর্জোয়াজি’ (bourgeoisie) বা বুর্জোয়া (boourgeois) আদিতে ফরাসি শব্দ। ইংরেজিতে ফরাসি ভাষা থেকেই আমদানি হয়েছে। বাংলায় সমাজতান্ত্রিক, কমিউনিস্ট ও অন্যান্য বাম রাজনীতির কারণে নিন্দার্থে ধনী বা পুঁজিপতি শ্রেণী হিসেবে ব্যবহৃত হয়। পুরানো ফরাসি ভাষায় (burgeis) এর অর্থ বাজারকেন্দ্রিক শহরের বাসিন্দা। নাগরিক শব্দটি এসেছে bourg বা বাজারকেন্দ্রিক শহর থেকে। পরে ফরাসি ভাষায় এর মানে হয়ে ওঠে ‘ব্যবসায়ী’ শ্রেণী। এগুলো শব্দটির অর্থনৈতিক মর্ম। রাজনৈতিক দিক থেকে বুর্জোয়া শ্রেণী, সামন্ত শ্রেণীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুবিধার বিরুদ্ধে লড়েছিল। নিজেদের রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত করে রক্ত, আভিজাত্য, গোষ্ঠী, ভূসম্পত্তি ও সামরিক শক্তির বিপরীতে ব্যক্তির ‘মুক্তি’ ও অধিকারের কথা বলে ইউরোপের গণতান্ত্রিক বিপ্লবে নেতৃত্ব দিয়েছিল। সেই কারণে এই কালে রাজনৈতিক শ্রেণী হিসেবে যারা ব্যক্তির অধিকার বা ব্যক্তির সার্বভৌমত্বে বিশ্বাস করে এবং ব্যক্তিতান্ত্রিক সমাজেই মানুষের মুক্তি নিহিত বলে মনে করে এবং নিজের ব্যক্তিস্বার্থকে সামষ্টিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে স্থান দেয় তাদের রাজনৈতিক অর্থে ‘বুর্জোয়া’ বলা হয়। এই দিক থেকে বুর্জোয়া গণতন্ত্র, বুর্জোয়াতন্ত্র বা ব্যক্তিতন্ত্র রাজনৈতিক অর্থের দিক থেকে সমার্থক, বা তাদের শব্দার্থিক ভিন্নতা রাজনৈতিক তাৎপর্যের দিক থেকে বিরাট কোনো ফারাক নয়। সেভাবেই এখানে ‘বুর্জোয়া’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে।।

Advertisements
মন্তব্য
  1. Ivan Orokkhito বলেছেন:

    বলেছেন এই আশপাশের কথা , এদের রাজনীতি ভীতির কথা । আমাদের লোকেরা রাজনীতিকে রাজার নীতি বলেই জেনেছেন কেননা এটা যে নীতির রাজা তা জানতে হলে যা দরকার ছিলো তা হলো রাজা ছাড়া একটা রাজনৈতিক দলের ক্ষমতায় আসা । তো বাংলাদেশিরা সেটা কখনোই পায়নি। হাসিনা খালেদার পরিবার বার বার ঘুরে ফিরে ক্ষমতায় আসায় দেশ হয়ে গেছে বুর্যোয়া গণতন্ত্রের আড়ালে আসলে পারিবারিক রাজতন্ত্র। এরা মাস্তান পুষে আমার ভাই বোন কে এমন নষ্ট করেছে যে যারা তাও কিছু ভাবে বোঝে তারা রাজনীতির চেহারা দেখে সন্ত্রস্ত । এই ধারোনা ভাংবে এমন নেতা দেশে নেই । নেতা বলতে আসলে বলা চাই নেতারা । দুটি বামদলের অবস্থা একপ্রকার মন্দের ভালো । আজকাল বাসদ সি পি বি জোট হওয়ায় কিছু আশা করছি । দেখা যাক কি হয় ।

    খুব চমৎকার লিখেছেন । খুবি চমৎকার। নজর রাখব । এখনো জানিনা কিকরে ব্লগিং করতে হয়। Instruction পড়ে পড়ে যা বুঝি এই আরকি । আপনাকে দাদা ধন্যবাদ । শ্রদ্ধাসহ !

    জয় বাংলা ! বিপ্লব দীর্ঘজীবি হোক !

    পুনশ্চ : যদিও বিপ্লব কেবল বাংলার নয় , তবু আশাকরি বুঝতেই পারছেন । এও আশা করি যে আরো লিখা পাবো । আমাদের আসলে একটা সিলেবাস দরকার । এ নিয়ে কাজ করা চাই । কিছু শক্তিক্ষয় করেছি… দাদা কথা শেষ হবার নয় , একজন শ্রেণীবন্ধু পেয়ে খুব আপ্লুত আমি … কথা হবে … হতে হবে ।

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s