লিখেছেন: জুয়েল থিওটোনিয়াস দ্রং

world-indigenous-day-1সংগ্রামী মানুষের সংগ্রাম নিরন্তর। বর্তমান প্রযুক্তির উৎকর্ষতা ও বিশ্বায়নের যুগে তার সংগ্রাম আরও গতিশীল ও ব্যাপক। মানুষ ও মনুষ্যত্ব হয়তো এই পৃথিবী নামক গ্রহটিকে একটি বিশ্বরূপে প্রতিষ্ঠিত করেছে কিন্তু বিশ্বায়নকে সঙ্গী করে প্রযুক্তির উৎকর্ষতা যতই বৃদ্ধি পাচ্ছে, মানুষ ততই হারাচ্ছে তার প্রকৃতস্থতা। এবং সেই সাথে পাল্লা দিয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রতিক্রিয়া স্পষ্ট হচ্ছে দিন দিন। এর প্রভাব শুধুমাত্র প্রাকৃতিক পরিবেশেই নয়, বরং মানুষের জীবনেও পড়ছে, বিশেষ করে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ওপর, যারা প্রকৃতির আদিম ও অকৃত্রিম সন্তান।

বেশ কয়েক দশক ধরেই জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যুটি নিয়ে খুব তোড়জোড় চলছে অথচ যা করণীয় সে ব্যাপারে মানুষ যেন প্রতিবন্ধী। জলবায়ু পরিবর্তন একটি প্রাকৃতিক ও স্বাভাবিক প্রক্রিয়া অথচ মানুষের লোভ, অসহিষ্ণুতা, অজ্ঞতা, অবজ্ঞা, প্রকৃতির এ স্বাভাবিক পরিবর্তনকে মাত্রাতিরিক্ত হারে বাড়িয়ে তুলছে যা ধ্বংস ছাড়া আর কিছুই ডেকে আনছে না। প্রয়োজনের তাগিদে যেদিন থেকে মানুষ জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার শুরু করল, সেদিন থেকেই কার্বন ডাই অক্সাইডসহ অন্যান্য ক্ষতিকর গ্যাস নাছোড়বান্দা হয়ে পড়ল। প্রথমদিকে এর প্রভাব ধীর গতিতে হলেও এখন এর অবস্থা তীব্রতর। অপ্রিয় হলেও সত্য, মানুষ এভাবেই বেঁচে থাকতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছে এবং অভ্যস্তও হয়ে পড়েছে, অথচ এখনও আত্মস্থ করতে পারেনি যে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কতটা আগ্রাসী ও ভয়াবহ। এদিক দিয়ে আদিবাসী জনগোষ্ঠী দারূণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শুধুমাত্র তাদের জীবনযাপনের দিক দিয়েই নয়, বরং সংস্কৃতিঐতিহ্যের দিক দিয়েও; যদিও তারা অনাদি মানবসৃষ্ট পরিবর্তনের অংশীদার নয়। সরকার, আন্তঃরাষ্ট্রীয় সমঝোতা, বহুজাতিক কর্পোরেশন দ্বারা তথাকথিত উন্নয়নের নামে তৈরি বিভিন্ন জলাধার, বাঁধ, ব্যারেজ, খনি আবিষ্কার, সামাজিক বনায়ন, ইকোপার্ক, প্রভৃতি কারণে ক্রমাগত জনজীবন বিশেষ করে আদিবাসীরা চরম প্রান্তিকতার মধ্যে বসবাস করছে। সহজস্বাভাবিকনির্মল জীবন প্রণালী, মুনাফাভিত্তিক ভোগবাদী ব্যবস্থার কাছে মার খাচ্ছে অবিরাম। আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার প্রতিষ্ঠা দিন দিন দুঃসাধ্য হয়ে পড়ছে সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থার কবলে পড়ে।

চাষাবাদের মৌসুমের সময় পরিবর্তন হয়েছে, কৃত্রিম রাসায়নিক সার ও কীটনাশক জমির উর্বরতা নষ্ট করছে, পরিবেশপ্রতিবেশ হচ্ছে দূষিত, খাদ্য নিরাপত্তা হচ্ছে ব্যহত। জীবিকা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, ও অন্যান্য নাগরিক সুবিধার দিক দিয়ে গ্রামীণ জীবন অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় যান্ত্রিক নগরজীবন অনবরত মনোযোগের কেন্দ্রে অবস্থান করছে এবং আদিবাসী জনগণ সহজেই এতে অভ্যস্ত হতে না পারায় মহাফাঁপরে পড়ছে। যাদের কিনা প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড় সখ্য, আত্মিক সহাবস্থান, তারা আজ টিকে থাকার অসুস্থ প্রতিযোগিতায় প্রতিনিয়তই বিপদগ্রস্ত ও বিপর্যস্ত হচ্ছে। নিজস্ব ঐতিহ্যগত জ্ঞান, কৃষ্টি, প্রথা চর্চার চাইতে মূল স্রোতের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলতে বাধ্য হচ্ছে।

অনেকেই বলে, আদিবাসীরা অসভ্য, অভদ্র, দরিদ্র, পিছিয়ে পড়া। ধারণাটি নিতান্তই অমূলক। আদিবাসীরা তাদের জীবনপ্রণালী, কৃষ্টি, মূল্যবোধ, আর্থসামাজিক জীবন দ্বারা অনেক বেশি সভ্যঅগ্রসরসমৃদ্ধ তাদের চাইতে, যারা সর্বদা ভোগবাদ, সাম্রাজ্যবাদ, সন্ত্রাসবাদ, যান্ত্রিকতা, ধর্মান্ধতা, অস্ত্র প্রতিযোগিতা, ক্ষমতা লিপ্সা, প্রভৃতিকে উপজীব্য করে বেঁচে থাকে জীবন্মৃতের মতো। আদিবাসীরাও এ ধরিত্রীর বাসিন্দা, তারা যেমন কারও অধিবার খর্ব করছে না, তেমনি কারও অধিকার নেই তাদের অধিকার খর্ব করার। আদিবাসীরাও মানবাধিকারের রক্ষিত ব্যাপারসমূহের অংশীদার, অথচ এ অধিকারসমূহ লঙ্ঘিত হবার ফলে প্রতিবাদ করতে গিয়ে হতে হয় নিগৃহীতলাঞ্ছিতঅত্যাচারিতঘরহারাস্বজনহারাভূমিহারাপ্রাণহারা।

এই অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে ঐক্যবদ্ধ মেধা, শক্তি, বুদ্ধি, সাহসের বিকল্প নেই। বাইরে থেকে কেউ সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিল কিনা তার জন্যে উদগ্রীব হওয়া চলবে না। নিজেদের সংকট উত্তরণে নিজেদেরকেই এগিয়ে আসতে হবে। আদিবাসীরা তাইই করবে এবং করবেই। কেননা, দুষ্কৃতিকারীদের কুকর্মের ফলে জলবায়ু পরিবর্তন এখন চরম পর্যায়ে, আর আদিবাসীদের অস্তিত্ব বিলীনের পথে। দু’চোখের মাঝখানে সবসময়ই বন্দুকের নল তাক করা, পূর্বপুরুষের ভূমির চারপাশে ডিনামাইট বসানো। এরা এক মূহুর্তও দেরী করবে না এদের কাজ সম্পাদন করতে। এরপরও যদি ইচ্ছা করেই নিজেদের প্রতিবন্ধী করে রাখা হয়, আত্মসমর্পণ করা হয় দুষ্ট বিশ্বায়নের পদতলে, তবে নিজেদের সম্মুখেই এ পৃথিবীর তথা নিজেদের মৃত্যুকে প্রত্যক্ষ করতে হবে। তবে সময় এখনও শেষ হয়ে যায়নি, তাই বলে বিলম্ব করা বোকামির নামান্তর। সচেতনতা ও সে অনুযায়ী পদক্ষেপের সঠিক সমন্বয় খুবই প্রয়োজন যা দ্বারা সংকট উত্তরণের উপচয় পাওয়া যায়। পৃথিবীতে যত আদিবাসী নেতাকে হত্যা করা হয়েছে তারা প্রত্যেকেই বলে গেছেন, “যতদিন পর্যন্ত আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার প্রতিষ্ঠিত না হচ্ছে, ততদিন পর্যন্ত সংগ্রাম চলবে, এবং এর জন্য যদি প্রাণ উৎসর্গ করতে হয় তাও করা হবে।”

পরিশেষে, সবার মনে একটি দৃষ্টান্ত দ্বারা উপলব্ধির বীজ বপন করা যাক। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাদুঘরগুলোতে আদিবাসী রেড ইন্ডিয়ানদের যাবতীয় (যা দ্বারা একটি নৃগোষ্ঠীকে চেনা সম্ভব) যা আছে তা শোভা পাচ্ছে। রেড ইন্ডিয়ানদের অবস্থান ও অস্তিত্ব বিলুপ্ত বলেই তারা জাদুঘরে ঠাঁই পেয়েছে। তেমনি বিশ্বের অন্যান্য দেশেও কতিপয় আদিবাসী জনগোষ্ঠী ছাড়া বাকিদের অস্তিত্ব এখনও আছে অথচ আদিবাসী জনগোষ্ঠী সংক্রান্ত ব্যাপার জাদুঘরে শোভা পাচ্ছে। তাহলে কি অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবেই আদিবাসীদের নিশ্চিন্ন করার পাঁয়তারা চলছে না? একে তো সরকার আদিবাসীদের আদিবাসী বলে স্বীকার করছেই না, তার ওপর আবার এমন চক্রান্ত। আদিবাসীদের জীবনপ্রণালী মূল ধারার জীবনপ্রণালীতে যুক্ত হয় না, আদিবাসীদের মূল্যবোধ সবার মূল্যবোধ হিসেবে বিবেচিত হয় না, আদিবাসীদের খাদ্য সবার খাদ্য হয় না (অন্তত যেগুলো সবাই খেতে পারে), আদিবাসীদের ভাষা রাষ্ট্রভাষা এবং রাষ্ট্রীয় পরিভাষারূপে পরিগণিত হয় না।

দু’দশক ধরে বাংলাদেশে আদিবাসী দিবস পালিত হচ্ছে। প্রতিবারই সরকারীভাবে পালিত হবার বাসনা থাকলেও তা বাস্তবায়ন তো দূরের কথা, আলোর মুখও দেখে না। তাই বলে আদিবাসীদের আশার মাত্রা বিন্দুমাত্র কমে যায় নি। সংগ্রামী মানুষের আশার মাত্রা বেশিই থাকে।।

মেইল: julu_almost_human@yahoo.com

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s