লিখেছেন: তৃষা বড়ুয়া

rape protest-india-5--কেউ কি দুনিয়ার এমন কো্নো জায়গা/জনপদ/রাষ্ট্রের নাম বলতে পারবেন যেখানে নারী নিরাপদ সে শিশু, কিশোরী, তরুণী, মধ্যবয়স্কা, বৃদ্ধা যাই হোন না কেন? যেখানে নারীকে মানুষের মর্যাদা দেয়া হয়? যেখানে জীবনের প্রথম ভাগে পিতার, দ্বিতীয় ভাগে পতির এবং শেষ ভাগে পুত্রের নাম অভিভাবক হিসেবে চর্চা কিংবা ব্যবহারের প্রয়োজন পড়ে না? যেখানে প্রতিটি নারী নিজেই নিজের অভিভাবক?

জন্মগ্রহণের পর থেকে একটি শিশুকে প্রতি পদে পদে directly/indirectly শেখানো হয় টিভিফ্রিজওয়াশিং মেশিনের মতো তুমিও একটা প্রফিটেবল প্রোডাক্ট! এদের যেমন সার্ভিসিংএর প্রয়োজন পড়ে, ঠিক তেমনি তোমারও সার্ভিসিংএর দরকার হয়নইলে যে ভ্যালু এড হবে না তখন যে কেউ তোমাকে কনজিউম করবে না! আর এটা কে না জানেযে পণ্যের কনজিউমার নেই, সেই পণ্যের অস্তিত্বও নেই। ভ্যালু বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় কাজিন/ বান্ধবীদের আদা জল খেয়ে লাগা দেখে সেই ছোট্ট মেয়েটিও ধীরে ধীরে তার ‘জীবনের লক্ষ্য’ অনুধাবন করতে পারে। পারিপার্শ্বিকতা তাকে বুঝিয়ে ছাড়ে দেহই সত্য, দেহ–ই ধর্ম, দেহই সাধনা। চিন্তাভাবনাচেতনাযুক্তিবিবেচনাবোধমানবিকবোধ এসবের কোনো ভ্যালু নেই, তাই এরা পণ্যও না –পুঁজিবাদী লেনদেনের বাজারে এদের প্রবেশ নিষিদ্ধ। অবশ্য একদম নিষিদ্ধ তা না। মুনাফার স্বার্থে, পণ্যের চাহিদা বাড়ানোর জন্য, কনজিউমার তৈরির জন্য মানবতার জয় গান নিচু স্কেলে এই সিস্টেমকে গাইতে হয় বৈকি!

মেয়েদের শেখানো হয়, লাইফ এখন অনেক ফাস্ট! সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হবে নইলে পেছনে পড়ে যাবে তুমি! পুঁজিবাদী সিস্টেমে যেখানে নারীর মাথার চুল থেকে পায়ের নখ, এমনকি যৌনাঙ্গ পর্যন্ত কনজিউমার গুডসএর তালিকায় বেশ লাভজনক পণ্য হিসেবে বিবেচিত হয়, সেই সিস্টেম তখন তাদের বাধ্য করে খাওয়াদাওয়া নিয়ন্ত্রণ করতে, ফিগার সচেতন হতে, বিউটি পার্লারজিমে নিয়মিত যেতে। ব্যায়াম করে যে যত বেশি গলার হাড্ডি স্পষ্ট করতে পারবে, সে তত বেশী fittest’প্রতিযোগিতায় survive’ করার চান্স তার একশো ভাগ নিশ্চিত। তার মধ্যে যদি ‘মাল’ না থাকে তাইলে সে আউট! তাকে সবাই ‘বিপিএল(বুক পাছা লেভেল)’ বলে ডাকতে শুরু করবে। আর ওয়েট বেড়ে গেলে তো কথাই নেই! অনবরত তাকে শুনতে হবে ‘ধুমসি হয়ে গেছো!’ ‘আর কত মোটা হবা?’ ‘এত মোটা হয়েছ, চিনতেই পারিনি!’, ‘শরীরে কার্ভ নাই, ধুর!’ ‘আগের সেই আবেদন আর নাই, বিয়ে করছে, /৩ পোলার মা, ঢলঢলে হয়ে গেছে!’ ‘she is not entertaining any more..need some fresh teen!’ ইত্যাদি ইত্যাদি।এই সিস্টেম তাকে নিয়ে কেনাবেচা ততক্ষন পর্যন্তই করবে যতক্ষন পর্যন্ত সে যুবতী, যৌন আবেদনময়ী। এসব বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হতে ব্যর্থ হলে রদ্দি মালের মত প্রেমিকের/স্বামীর স্টোর রুমে তাকে জীবন পার করতে হবে। শারীরিক মিলনের পূর্বে তার beloved টিভি/সিডিতে লাস্যময়ী পাতলা কোমড়ের নায়িকা দেখে আগে warm up করে নেবে। তারপর তার শরীরকে মডেম হিসেবে ব্যবহার করে ‘পতিপরম গুরু’ নায়িকা/কাছের–দূরের/পরিচিতঅপরিচিত নারীর শরীরে সংযোগস্থাপন করবে। টিকে থাকার লড়াইএ তাকে তাই অনেক শারীরিক পরিশ্রম করতে হয় নইলে যে তার বয়ফ্রেন্ড/ হাজবেন্ডের নজর স্লিম, কার্ভি ‘চিকি’ শিকার করে বেড়াবে। আর পুরুষদেরই বা কী দোষ। After all, they are consumer! ভোক্তা অধিকার আইনের নাম শোনো নি? অন্য প্রোডাক্টের মধ্যে খুঁত পেলে তারা অভিযোগ করে, দরকার পড়লে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়। কারণ it is their right to get ensured the quality of products unconditionally। কিন্তু নারী নামক পন্যের ক্ষেত্রে তারা তো বেশ লিবারেল! কেউ কখনো শুনেছে প্রেমিকা/স্ত্রীর performance-এ কোনো স্বামী অসন্তুষ্ট হয়ে চিল্লাফাল্লা করেছে? যৌন উত্তেজনা জাগাতে ব্যর্থ (বয়স, স্থুলতা, একঘেয়ে যে কারণেই হোক না কেন) প্রিয়তমার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ কখনো কোনো প্রিয়তম করেছে? এই সিস্টেমে when you are no longer attractive to your lover/husband, they will naturally search for new products. The secrecy they maintain is actually for your sake, for your welfare, try to understand baby! হিন্দি ছবির স্বল্পবসনা নায়িকা বুক,কোমড়,পাছা provoking way-তে দোলাতে দোলাতে যখন পুরুষদের উদ্দেশ্যে বলে, ‘এ তো কিছুই নাট্রেলার মাত্র, পুরো ফিল্ম দেখাতে আমি আসছি,’ তখন মানুষতো কোন ছাড়, স্বয়ং ঈশ্বর কি নিজেকে আটকে রাখতে পারবে?

Chikni-Chameli-Poster-

বাসে গণধর্ষিত শিক্ষার্থীর মৃত্যুতে দিল্লীর মুখ্যমন্ত্রী শোক প্রকাশ করে বলেন, “…what happened has shaken our conscience”. ‘সারে জাহা সে আচ্ছা’ ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জী বলেন, “She is a true hero. She symbolizes the best in Indian youth and women.” আরেক কেউকেটা বলেন, “She was a brave girl who fought for her dignity and life.” এসব দিগগজদের কাছে জানতে ইচ্ছে করে, শুধু ভারত নাপুরো বিশ্বে নারীরা যেখানে আপনাদের কারণে, আপনাদের তৈরি করা সিস্টেমের কারণে ঘরেবাইরে প্রতিনিয়ত শারীরিকভাবে, মানসিকভাবে ধর্ষিত হচ্ছে, অপমানিত হচ্ছে, নির্যাতিত হচ্ছে তখন আপনাদের conscience’ shake করে না কেন? আপনাদের রিখটার স্কেলে এই ঝাঁকুনি ধরা পড়ে না কেন? ‘conscience’এর কোনো বাজার দর নেই, তাই এটা পণ্যও না, তাই? পুঁজিবাদের কর্তা আপনারা নারীদের মানুষ নাভোগ করার উপাদান হিসেবে বিজ্ঞাপনে, ফিল্মে, বইপুস্তকে আরো অনেক জায়গায় উপস্থাপন করেন। দাসত্বের mind set সফলভাবে তাদের মনেচিন্তায়চেতনায় রোপণ করতে আপনারা সক্ষম হয়েছেন। দাস যুগে দাসেরা জানতো তারা কি, শেকলের টান তারা উপলব্ধি করতে পারতো। কিন্তু নয়া উদারনৈতিক অর্থনীতির যুগে নারী বুঝতেই পারে না ‘নতুন বোতলে পুরোনো মদ’এর মত নব্য দাস ভিন্ন আর কিছুই না। এখানেই পুঁজিবাদ সামন্তবাদকে ছাড়িয়ে গেছে। পুঁজিবাদী সিস্টেমে নারীদের women empowerment’র আফিম খাওয়ানো হয়। আফিমের নেশায় তারা নিজেদের ‘এ যুগের এগিয়ে থাকা স্বাধীন নারী’ হিসেবে দেখে। পায়ে বাঁধা শেকলের অস্তিত্ব তারা টের পায় না। নারীরা যে আর দশটা পণ্যের মতই বিক্রয়যোগ্য, তারা তা ধরতেই পারে না। এভাবে চলতে চলতে লোহার শেকলে বন্দী নারী ক্ষমতাবান পুঁজিপতিদের দ্বারা manufactured, dominating mind set একসময় own করতে শুরু করে। দাস হয়েও প্রভুর চোখ দিয়ে তারা দুনিয়া দেখে, প্রভুর অপমান মানে তার অপমান, প্রভুর ideology হয়ে যায় তার ideology, প্রভুর উপর আঘাত মানে তার উপর আঘাত। তাই সে সর্বদা পাহারা দেয় প্রভুর মতাদর্শ। কোনোরকম আঘাত সে বরদাস্ত করে না, কোনোরকম আপোষ সে করে না। আজীবন প্রভুকে সে ডিফেন্ড করতে থাকে।

৩৬২৫৩৬ দেহের স্মার্ট, তুখোড় ইংরেজী বলিয়ে নারী যে এই ‘মডার্ন’ পৃথিবীর ‘মডার্ন’ দাস তা বুঝতে সে অক্ষম। তাকে ভোলানোর সব পন্থা এই সিস্টেমের জানা। তাই ফিল্মে ন্যাক্কারজনকভাবে নারীকে উপস্থাপন ধর্ষণের কারণ হতে পারে কিনা জানতে চাইলে চলচ্চিত্র অভিনেত্রীর যেখানে ধর্ষিতার পক্ষে প্রতিবাদ করা উচিত, নারীকে পণ্য হিসেবে দেখানোর তীব্র সমালোচনা করা উচিত, নারীর মর্যাদার জন্য লড়ে যাওয়া উচিত, সেখানে সে তা না করে ক্ষুব্ধ হয়ে জানতে চায়, ‘অভিনেতারা উদম হয়ে সিক্স প্যাক শরীর দেখাতে পারলে আমরা বিকিনি পরে শুট করতে পারবো না কেন?’ বুঝতে তখন কষ্ট হয় না, ক্যাপিটালিস্ট সিস্টেম নারীর চিন্তাচেতনায় দাস মনোভাব প্রতিষ্ঠিত করতে কী পরিমান সফল! ঐ অভিনেত্রীর ভাবনার মধ্যে এক সেকেন্ডের জন্যও কখনো আসে না তার যৌন উত্তেজক পোষাক, অশ্লীল অঙ্গভঙ্গির শিকার প্রতিটি মুহূর্তে হচ্ছে রাস্তাঘাটেট্রামেবাসে চড়া শিক্ষার্থী, চাকরীজীবি, গার্মেন্টস কর্মী, দিন আনে দিন খায় শ্রমজীবি,বেশ্যাযাদের নিরাপত্তার কোনোরকমের দায় পুঁজিবাদী রাষ্ট্র কাঠামো বোধ করে না!

rape and murder of tumching-

সারাদিন টিউশনি করে পড়ার খরচ যোগানো ছাত্রীর, সারাদিন গার্মেন্টসে হাড় ভাঙ্গা খাটুনী খাটা নারীর, অফিসে পুরুষ কলিগের বার বার বুকের সাইজ পরিমাপ করা/ তাদের লুইচ্চামি সহ্য করতে করতে ক্লান্ত নারীর, /৬ জায়গায় বাসাবাড়িতে কাজ করতে করতে অনুভূতিশূন্য হয়ে পড়া নারীর, এক মুঠো ভাতের জন্য সংগ্রাম করা শ্রমজীবি নারীর, দৈহিক যৌন চাহিদা কি জিনিস তা ভুলতে বসা শরীর বিক্রি করতে করতে পরিশ্রান্ত বেশ্যার প্রত্যক্ষ/ পরোক্ষ ট্যাক্সের টাকায় দেশের ‘উন্নয়ন’এর চাকা কোনো লুব্রিকেশন ছাড়াই মসৃনভাবে ঘুরছে। নারীর উপরতা সে সমতল/ পাহাড়ে বসবাসকারী কিংবা আদিবাসী যাই হোন না কেন, অত্যাচারনির্যাতনধর্ষনের গুটিকয়েক ঘটনা (শহরকেন্দ্রিক) যখন comparatably affluent middle class নারী জানতে পারে, তখন সে ফুঁসে উঠে ধর্ষনকারীর বিরুদ্ধে, দোষীদের ফাঁসী দাবি করে রাস্তায় নামে, মিছিলে যোগ দেয়।

rape protest-india-2-

দুখের বিষয়, সামনের অপরাধী তার নজরে পড়ে কিন্তু পেছনে ঘাপটি মেরে থাকা খুনী যারা দেশে দেশে ধর্ষক manufacture করে নিজেদের স্বার্থে, সেই তাদেরকে আঘাত করা আর হয়ে ওঠে না তার। ধর্ষকদের উপযুক্ত শাস্তি দেয়ার জন্য চিতকার করে শ্লোগান দেয়, প্রতিবাদ জানায় কিন্তু নিজের পায়ের শেকলের শব্দ তার কানে পৌছায় না। এই সিস্টেম জানে কিভাবে তার কান বন্ধ করতে হয়, কিভাবে তার চোখে পট্টি পড়াতে হয়, কি দিয়ে তার মন ভোলাতে হয়।

rape protest-india-6-

শ্রেণীর দিক থেকে privileged নারী তার শ্রেণীর বাইরে যে একটা জগত আছে, সেখানে যে নিপীড়িতের মধ্যে আরো নিপীড়িত নারী অনবরত যুদ্ধ করে বেঁচে থাকার জন্য, সেখানে যে সে privileged class থেকে হাজার হাজার গুণ বেশি অত্যাচারিতনির্যাতিতধর্ষিত হয় প্রতিনিয়ত, তা সে জানে না বা জানতে চায় না। রাষ্ট্র তাদের নিরাপত্তা দেয়া তো দূরে থাক, উপরন্তু উদ্যোগী হয়ে শহরেগ্রামেসমতলেপাহাড়েজঙ্গলে বসবাসকারী নারীদের ধর্ষণ করার দায়িত্ব খুব আন্তরিকতার সাথে পালন করে। state sponsored সন্ত্রাস রাস্তায় নামা আন্দোলনরত সেই নারীর চোখে কখনো ধরা পড়ে না। এসব দেখে কে না বলবে, capitalism triumphs and it will…!!!

Privileged class-এর কেউ ধর্ষিত হলে কখন কিভাবে কি করতে হবে শাসকগোষ্ঠী খুব ভালভাবেই জানে। প্রথমে এ ধরনের ঘটনা ধামা চাপা দেয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হবে। তাতে কাজ না হলে tension করার কিছু নেই। আন্দোলনসংগ্রামের (যদি কোন protest আদৌ হয়ে থাকে) হাওয়া বুঝে দ্রুত স্ক্রিপ্ট রচনা করা হয়ে যাবে । তারা ভিক্টিমকে নানা সুন্দর সুন্দর বিশেষণে বিশেষায়িত করবে যেমন braveheart’, ‘true hero,’ ‘India’s Daughter (ভিক্টিমের নাগরিকত্ব অনুযায়ী দেশের নাম পরিবর্তিত হবে),’ ‘brave girl’, ‘symbol of youth and women’ ইত্যাদি ইত্যাদি। আর ভারতে যেহেতু গণতন্ত্র উতপাদনের সর্ববৃহত লাভজনক শিল্প আছেসবসময় supply-demand-এর চিন্তা মাথায় রেখে তাকে এই বিপুল মুনাফার পণ্য উতপাদন করতে হয়, তাই ধর্ষকদের বিচারের জন্য আন্দোলনকারীদের peaceful protest’র অনুমতি দিতে বাধ্য হয়।

পুঁজিবাদী কাঠামোয় বেড়ে ওঠা একটি ছেলে যখন দেখে তার মাকে, বোনকে বাবা এবং পরিবারের অন্যান্য পুরুষ সদস্যরা কিভাবে treat করছেবন্ধুরা রাস্তায় মেয়ে দেখলেই শিষ দেয়, পাস নম্বর দেয়া শুরু করে দশে কোন মেয়ে কত পেয়েছে, ‘hi sexy!,’ ‘she is so coooool’ বলে tease করে, ‘জ্বালাইয়া গেলি বুকের আগুন, নিভাইয়া গেলি না’ বলে কোনো মেয়েকে অভিযোগ করতে থাকেটিভি খুললেই অর্ধ নগ্ন নায়িকা/সেলিব্রেটিরা যৌন উত্তেজক পোশাক পরে অশ্লীল ভঙ্গিতে নৃত্য করতে দেখে কম্পিউটারে ধুমায় পর্ন ভিডিও ডাউনলোড করতে পারে, তখন কিভাবে তার পক্ষে সম্ভব স্কুল/ কলেজ/ ভার্সিটিতে পড়ুয়া সহপাঠীদের, আত্বীয়াদের, অফিসের ফিমেল কলিগদের, এক বা একাধিক প্রেমিকাদের, জীবনসঙ্গিনীকে মানুষ হিসেবে গণ্য করা? মেয়েরা তো তার কাছে fuckable object ছাড়া আর কিছুই না! পুরুষের মনোরঞ্জনের জন্যই তো মেয়েদের জন্ম হয়েছে! masculinity-কে entertain করাই তো তাদের ultimate mission! মেয়েরা তার সামনে আসলেই তো সে vital statistics মাপা শুরু করবে। কোনো মেয়ের সাথে পরিচিত হওয়ার একটু পরে স্বাভাবিকভাবেই তার প্রথম চিন্তা থাকবে তাকে কেমনে বিছানায় নেয়া যায় really সম্ভব না হলেও অন্তত virtually! এক বড় ভাইকে চিনি যিনি নাকি কোনো মেয়ের দিকে তাকিয়ে খুব confidently এক সেকেন্ডের মধ্যে বলে দিতে পারেন মেয়েটির বুকের মাপ কত। কিভাবে পারে জানতে চাইলে বলে, “আরে একটা কাপড়ের নিচে যদি ফুটবল রাখস বাইরে থেকে দেখে কি পিংপং বল মনে হবে? আর যদি পিংপং বল রাখস তাইলে কি ফুটবল মনে হবে? as simple as that!”

পুরুষের সামনে নারী কিভাবে নিজেকে উপস্থাপন করবে, তার সহজপাঠ রাষ্ট্র বাচ্চাকাল থেকেই তাকে শেখানো শুরু করে। শারীরিকভাবে মানসিকভাবে ধর্ষিত নারীদের যখন রাষ্ট্র আত্মহত্যামৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয় তখন কি একবারের জন্যও মনে হয় না এই বর্বর সিস্টেম ভেঙ্গে ফেলি? সেই নিপীড়ক রাষ্ট্র যখন ধর্ষিতাকে মৃত্যুর পর বীরের মর্যাদায় ভূষিত করে তখন কি ইচ্ছে করে না শুধু ধর্ষক না, পুঁজিবাদী ব্যবস্থার জিকির করা সব কটা শুয়োরের বাচ্চাকে খতম করতে? রাষ্ট্র কাঠামো যেখানে নারীকে সম্মান দিতে পারে নাতার জন্য সব ক্ষেত্রে মর্যাদাহানিকর পরিবেশ রচনা করে রাখে, সেই খুনী রাষ্ট্র কাঠামোর এক প্রতিনিধি খুন করার পর বলে, ‘she was a brave girl who fought for her dignity and life”!!! কার dignity’? কিসের dignity’? জীবিত অবস্থায় dignity’ চাহিয়া লজ্জা দিবেন নাইহা শুধুমাত্র মৃতদের জন্য সংরক্ষিত,তাই না? ধর্ষিতাকে রাষ্ট্র যে একটু দেরিতে হলেও মানুষ হিসেবে dignity’ দিল তাতেই তো তার জীবন ধন্য হওয়া উচিত, গর্বিত হওয়া উচিত, রাষ্ট্রের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা উচিত, তাই না? নারীকে অবমাননার, অপমানের, ধর্ষনের সব টুলস বহাল তবিয়তে জারি রেখে বিদ্যমান শোষণমূলক ব্যবস্থাকে যেখানে শিশুরাও নিরাপদ নাতারাও ধর্ষনের শিকার আরো ভালভাবে handle/mature করার জন্য রাষ্ট্রের কর্তাব্যক্তিদের তাই একটুআধটু শোকের নাটক করতে হয়, অভিনয় করতে হয়, ডায়লগ দিতে হয়।পাবলিকের memory তো গোল্ড ফিশের চেয়েও খারাপ! দুদিন পর তো সবাই অন্য issueতে ব্যস্ত হয়ে পড়বে! issue manufacture করার গুরু দায়িত্বও তো রাষ্ট্রের উপরেই বর্তায়!

rape protest-india-4-

মাননীয় রাষ্ট্রনায়ক, আপনি কি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবেন আজকের পর থেকে নারীদের ‘মেয়েছেলে’ না, তাদের মানুষ হিসেবে গণ্য করা হবে? তাদেরকে আর প্রোডাক্ট হিসেবে দেখা হবে না? ফিল্ম, মিডিয়া, চাকরিস্থল কোনো জায়গায় তাদের অসম্মান করা হবে না? ঘরে–বাইরেরাস্তাঘাটে কোথাও তারা ধর্ষণের শিকার হবে না? শ্রেণীহীন সমাজের ভিত্তিস্থাপন করে আত্মমর্যাদাসম্পন্ন মানুষ হিসেবে বেড়ে ওঠার জন্য সমতল/অসমতল/আদিবাসী নারীর যা যা দরকার তার সব বন্দোবস্ত আপনি করবেন? কোনোরকমের শ্রেণী বৈষম্য/লিঙ্গ বৈষম্যের শিকার তারা হবে না? পিতাপতিপুত্রের অভিভাবকত্ব ছাড়াই তারা নির্বিঘ্নে জীবনযাপন করতে পারবে? পারবেন কথা দিতে? কি গলা শুকিয়ে গেলো? পানি খাবেন?

জানি, আপনি পারবেন না। আপনাদের পক্ষে সম্ভব না। বাংলাদেশ, ভারতসহ পৃথিবীর কোনো দেশের রাষ্ট্রনায়কেরা উপরোক্ত অঙ্গীকারগুলো করতে পারবে না। শুধু কাঁঠাল না, কাঁঠালসহ গোটা গাছ তুলে এনে জনগনের মাথায় না ভাংলে, তাদের কষ্টে উপার্জিত হাজার হাজার কোটি টাকা কিভাবে আপনারা লুটপাট করবেন? বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের মালিক হতে গেলে তো আপনাদের এই শোষণমূলক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা দরকার! আপনাদের কোটি কোটি টাকার সম্পদ রক্ষার জন্য, লুটপাটের ঘরোয়া/স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য আপনাদের প্রস্তুতকৃত আন্তর্জাতিক মানের বিভিন্ন নামে বিভিন্ন পরিচয়ে আইনশৃংখলা বাহিনী তো আছেই যাদের কাজই হলো ঝামেলা পাকাতে আসা বেয়াদ্দপশৃংখলিত জনগনকে ‘ডান্ডা মেরে ঠান্ডা’ পদ্ধতিতে শৃংখলা শেখানো।

যেখানে মুনাফা মনুষত্বের চেয়ে পরম পূজনীয় আরাধ্য বস্তু সেখানে ‘আপনাদের সেবায় নিয়োজিত’ অর্থনৈতিক কাঠামো কেন ভাঙবেন? খামোখা ভাঙ্গাভাঙ্গিতে যাওয়ার কি দরকার? বেশীদিন আর নেই অচিরেই নারী চিন্তা করতে শুরু করবে, ভাবতে শুরু করবে। পায়ের শেকলের ঘর্ষণ টের পাবে। বুঝতে পারবে, কেন এই শেকল? কারা পরিয়েছে এই শেকল? তখন আপনারা পালাবার পথ পাবেন না! শুধু ধর্ষকনির্যাতক নয়, মুনাফাসর্বস্ব মানবতাবিরোধী এই পুঁজিবাদী অট্টালিকার প্রতিটা ইট সেদিন আমরা ভেঙ্গে গুঁড়ো গুঁড়ো করবো!! একটা ইটও বাদ যাবে না!!!

Advertisements
মন্তব্য
  1. প্রশান্ত বলেছেন:

    অবশ্যই একদিন কড়ায় গন্ডায় হিসাব চুকানো হবে। পোড়া এই সময়ে জন্ম নেয়ার কারণে আমরা যদি নাও পারি আমাদের ছেলেমেয়েরা অবশ্যই সেই হিসাব চুকাবে। তৃষা বড়ুয়াকে ধন্যবাদ। একটি বিষয় খেয়াল করুন: এই লেখাটিতে যে সব ছবি দেয়া হয়েছে ( যেগুলো নিশ্চয়ই মিডিয়া থেকে নেয়া হয়েছে) তার মধ্যে ১ম ছবিতে ফোকাস করা হয়েছে সুন্দর মুখের মেয়েটিকেই। তার পাশের অসুন্দর সাধারণ চেহারার মেয়েগুলোকে কিন্তু ফোকাস করা হয়নি। কারণ সুন্দর মুখের নারী পাবলিককে খাওয়ানো যায়। সেটা রীতিমতো একটি ভোগ্য পণ্য। এতে মিডিয়ার কাটতি বাড়ে। চতুর্থ ছবিতেও ফোকাস “স্মার্ট” পোশাক পরা নারীটিই। তার কিছু পেছনে নিতান্ত সাধারণ গ্রামীণ কৃষকসুলভ চেহারার বাদামী সোয়েটার পড়া ছেলেটি কি দোষ করল? তাকে ফোকাস করলে মনে হয় কাটতি কমে যেত। পঞ্চম ছবিতেও একই ঘটনা। নারীর উপর এত বড় অবমাননার একটি ঘটনার পরও সেই ঘটনার প্রতিবাদের “স্টোরি” বানাতে গিয়ে মিডিয়া কিন্তু তাকে পণ্য বানাতে ছাড়েনি। এটাই এদের চরিত্র।

  2. যেখানে মুনাফা মনুষত্বের চেয়ে পরম পূজনীয় আরাধ্য বস্তু সেখানে ‘আপনাদের সেবায় নিয়োজিত’ অর্থনৈতিক কাঠামো কেন ভাঙবেন? খামোখা ভাঙ্গা-ভাঙ্গিতে যাওয়ার কি দরকার? বেশীদিন আর নেই – অচিরেই নারী চিন্তা করতে শুরু করবে, ভাবতে শুরু করবে। পায়ের শেকলের ঘর্ষণ টের পাবে। বুঝতে পারবে, কেন এই শেকল? কারা পরিয়েছে এই শেকল? তখন আপনারা পালাবার পথ পাবেন না! শুধু ধর্ষক- নির্যাতক নয়, মুনাফাসর্বস্ব মানবতাবিরোধী এই পুঁজিবাদী অট্টালিকার প্রতিটা ইট সেদিন আমরা ভেঙ্গে গুঁড়ো গুঁড়ো করবো!! একটা ইটও বাদ যাবে না!!!

    অসাধারণ বলেছেন।

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s