লিখেছেন: দিনমজুর (ব্লগার)

btrc_logo-বাংলাদেশের টেলিকম অপারেটরদের কাস্টমার প্রতি মাসিক আয় ভারতের তুলনায় দেড়গুণ এবং টেলিডেনসিটি ভারতের চেয়ে ১৫ শতাংশ কম (অর্থাৎ ভবিষ্যৎ বিকাশের সুযোগ বাংলাদেশে বেশি) হওয়া স্বত্ত্বেও থ্রিজি তরঙ্গ নিলামের বেলায় ভারতের এক তৃতীয়াংশ ভিত্তি মূল্য ধরে আগামী বছরের মধ্য জানুয়ারিতে থ্রিজি তরঙ্গের নিলাম ডাকতে যাচ্ছে বাংলাদেশ যার ফলে বাংলাদেশের অন্তত ২৪ হাজার কোটি টাকা ক্ষতি হবে!

টেলিযোগাযোগের কাজে ব্যবহৃত তরঙ্গ বা স্পেকট্রামকে আন্তর্জাতিকভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং সীমিত জাতীয় সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হয় যার অর্থনৈতিক মূল্য অপরিসীম। ফলে তেলগ্যাসকয়লার মতোই এই জাতীয় সম্পদ নিয়েও চলে বহুজাতিক ও দালালদের লুটপাটের খেলা। ভারতের সাম্প্রতিক টুজি স্প্রেক্ট্রাম কেলেঙ্কারির পর ভারতের হাইকোর্টের নির্দেশে ভারতীয় টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে আরো কঠোর অবস্থান নিয়েছে। তারা তরঙ্গ বরাদ্দের নতুন নীতিমালা ঘোষণা করার বেলায় ভারতীয় হাইকোর্টের নির্দেশ মেনে তরঙ্গ বা স্পেকট্রামকে “জাতীয় সম্পদ” বলে উল্ল্যেখ করে বলেছে:

Spectrum has been internationally accepted as a scarce, finite and renewable natural resource which is susceptible to degradation in case of inefficient utilisation. It has a high economic value in the light of the demand for it on account of the tremendous growth in the telecom sector.

(সূত্র: Recommendations on Auction of Spectrum, Telecom Regulatory Authority of India, 23rd April, 2012, পৃষ্ঠা ৪)

এই জাতীয় সম্পদের মালিকানা ও ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রের হাতে এই সম্পদ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব থাকলেও এর প্রকৃত মালিক জনগণ, ফলে জনস্বার্থ বা পাবলিক ইন্টারেস্ট ক্ষুণ্ন হয় এমন কিছু রাষ্ট্র করতে পারে না:

Natural resources belong to the people but the State legally owns them on behalf of its people…. The State is empowered to distribute natural resources. However, as they constitute public property/national asset, while distributing natural resources, the State is bound to act in consonance with the principles of equality and public trust and ensure that no action is taken which may be detrimental to public interest.

(সূত্র: Recommendations on Auction of Spectrum, Telecom Regulatory Authority of India, 23rd April, 2012, পৃষ্ঠা ৩)

ভারতে সাম্প্রতিককালে এই বিষয়ে সচেতনতা দেখা গেলেও, বাংলাদেশে বরাবরই অন্যান্য জাতীয় সম্পদের মতো এই তরঙ্গ বা স্পেকট্রামও বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর লুটপাটের জন্য তুলে দেয়া হয়েছে, এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্সকে দুর্বল করে যেমন শেভরন কনোকো ফিলিপস এর হাতে গ্যাস ব্লক তুলে দেয়া হয়েছে, তেমনিভাবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান টেলিটককে দুর্বল করে রেখে বহুজাতিক কোম্পানির হাতে এর আগে টুজি তরঙ্গ সস্তায় তুলে দেয়া হয়েছে, এবার থ্রিজি’র ক্ষেত্রেও একই ধরনের ঘটনা ঘটানোর আলামাত দেখা যাচ্ছে। টেলিটককে পরীক্ষামূলকভাবে প্রথমে থ্রিজি লাইসেন্স দেয়া হয়েছে বহুজাতিকদের স্বার্থে বাজার যাচাই করার জন্য, এরপর যখন বহুজাতিক কোম্পানিগুলো সস্তায় থ্রিজি লাইসেন্স ও সস্তা তরঙ্গ নিয়ে বিপুল বিক্রমে ঝাপিয়ে পড়বে, টেলিটককে তখন পুঁজি ও প্রযুক্তিগত দিক থেকে দুর্বল করে রাখা হবে।

.

বিটিআরসি’র আসন্ন থ্রিজি নিলাম

বিটিআরসি আগামী বছরের শুরুতেই থ্রিজি তরঙ্গ বা স্পেকট্রাম নিলামের আয়োজন করছে। নিলামে প্রতি মেগাহার্টজ তরঙ্গ ফি’র ভিত্তি মূল্য বা বেইজ প্রাইস ২০ মিলিয়ন ডলার বা তারও কম রাখা হবে বলে সংবাদে প্রকাশিত হয়েছে। (সূত্র: ফাইনান্সিয়াল এক্সপ্রেস, ১৯ ডিসেম্বর ২০১২)

যদিও বিটিআরসি কর্তৃক প্রণীত খসড়া নীতিমালায় ৩০ মিলিয়ন ডলার এর কথা বলা হয়েছিলো, বহুজাতিক টেলিকম অপারেটরদের চাপ ও লবিং এ এর পরিমাণ আরো কমানো হচ্ছে।

auction_btrc-

থ্রিজি সার্ভিসের জন্য ২১০০ মেগাহার্টজ রেঞ্জএর মোট ৫০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডউইথ টেলিটক ছাড়াও আরো ৪টি অপারেটরকে বরাদ্দ দেয়া হবে (৩টি পুরাতন ও একটি নতুন অপারেটর), প্রত্যেক অপারেটর নিলামের মাধ্যমে নির্ধারিত সর্বোচ্চ লাইসেন্স ফি’র বিনিময়ে ১৫ বছরের জন্য ১০ মেগাহার্টজ করে তরঙ্গ বা স্পেক্ট্রাম বরাদ্দ পাবে। টেলিকম অপারেটররা বিভিন্নভাবে প্রচার করছে প্রতি মেগাহার্জের এই ভিত্তি মূল্য (অর্থাৎ যে মূল্য থেকে তরঙ্গ নিলামের প্রতিযোগিতা শুরু হবে) নাকি অনেক বেশী হয়ে গেছে, টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়কে দিয়েও তারা লবিং করিয়েছে লাইসেন্স ফি কম রাখার জন্য। অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে পাঠানো প্রস্তাবে টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় বলেছে, ভারত, পাকিস্তান থাইল্যান্ডের তুলনায় নাকি এই ভিত্তি মূল্য বেশি ধরা হয়েছে! অথচ অনুসন্ধান করে খুব সহজেই দেখা যায়, ভারতে তরঙ্গ নিলামে তোলার সময় ভিত্তি মূল্য বা ন্যূন্যতম যে মূল্য থেকে তরঙ্গের নিলাম শুরু হবে, তা কত নির্ধারিত করা হয়েছে এবং জনসংখ্যা, টেলিডেনসিটি, এআরপিইউ ইত্যাদি বিবেচনায় বাংলাদেশের সাথে তার পার্থক্যটাই বা কি।

.

ভারতের তরঙ্গ মূল্যের সাথে তুলনা

বিটিআরিসি যেমন গোটা বাংলাদেশের জন্য একটি লাইসেন্স দেয়, ভারতে তেমনটি ঘটে না, সেখানে গোটা ভারতকে ২২ টি সেলুলার সার্কেল এ ভাগ করে প্রতিটি ভাগের জন্য ৫ মেগাহার্টজ করে বিভিন্ন ভিত্তি মূল্যের একেকটি লাইসেন্সের জন্য নিলাম হয় । তার মানে, কোন টেলিকম অপারেটর যদি ন্যূনতম ৫ মেগাহার্টজ ব্যান্ডউইথ সারা ভারতের জন্য পেতে চায় তাহলে তাকে মোট ২২টি লাইসেন্স কিনতে হবে। নিলাম ডাকার আগে এরকম ২২ টি লাইসেন্সের প্রতিটির তরঙ্গের বা স্পেকট্রামের জন্যই ভিত্তি মূল্য নির্ধারণ করে দেয় ভারতের টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ। ২১০০ মেগাহার্জের জন্য ভিত্তি মূল্য জন্মু ও কাশ্মীরের ক্ষেত্রে ৬.৮৩ কোটি রুপী থেকে শুরু করে দিল্লীর জন্য সর্বোচ্চ ৭৪৭.১৭ কোটি রুপি নির্ধারণ করা হয়েছে। এভাবে গোটা ভারতকে কাভার করবে এরকম ২০ বছর মেয়াদি ২২টি ৫ মেগাহার্টজ করে লাইসেন্সের আওতায় প্রতি মেগাহার্টজ তরঙ্গের ভিত্তি মূল্য হলো সর্বমোট ৩৭৭৩.২৪ কোটি রুপি। আর গোটা বাংলাদেশ কাভার করবে এরকম ১৫ বছর মেয়াদি ১০ মেগাহার্টজ করে লাইসেন্সের আওতায় প্রতি মেগাহার্টজ ভিত্তি মূল্য ধরা হচ্ছে ২০ মিলিয়ন ডলার।

reserve-price-india-

বাংলাদেশ ও ভারতের জনসংখ্যা, আয়তন, লাইসেন্সের মেয়াদ ইত্যাদির ভিন্নতা বিবেচনা নিয়ে তুলনা করার জন্য সহজ ও গ্রহণযোগ্য একটি উপায় হলো Price per MHzPop Multiple টি ব্যবহার করা।

Given the wide range of factors that can impact value, it is commonplace in the industry to convert the prices paid for spectrum into multiples in order to compare prices across bands and in different markets. The most common multiple is a price per MHzPop multiple, calculated as follows:

Price per MHzPop Multiple = Sales Price / (MHz of license x population covered)

সহজ ভাবে বললে, প্রতি মেগাহার্টজ তরঙ্গের দামকে গোটা দেশের জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করে এই তুলনার কাজটি করা সম্ভব। যেহেতু ভারতের লাইসেন্স ২০ বছর মেয়াদি এবং বাংলাদেশের লাইসেন্সে ১৫ বছর মেয়াদি, তাই বছর ওয়ারি হিসাব করলে তুলনাটা আরো নিখুত হবে। এ বিবেচনায় আমরা ব্যবহার করব Price per MhzPop per year মাল্টিপল টিকে।

Price per MHzPop per year = Sales Price / (MHz of license x population covered)/year

ভারতের জনসংখ্যা ২০১২ এর হিসেবে ১২২ কোটি, প্রতি মেগাহার্টজ লাইসেন্সের ভিত্তি মূল্য ৩৭৭৩.২৪ কোটি রুপি বা ৬৮.৯৫ কোটি ডলার(১ রুপি= ৫৪.৭২ ডলার), লাইসেন্সের মেয়াদ ২০ বছর, সুতরাং ভারতের লাইসেন্স ফি’র Price per MHzPop per year = ৬৮.৯৫/(X১২২)/২০ = .০২৮ ডলার।

অন্যদিকে, বাংলাদেশের জনসংখ্যা ২০১২ এর হিসেবে ১৬ কোটি , প্রতি মেগাহার্টজ লাইসেন্সের ভিত্তি মূল্য ২০ মিলিয়ন বা ২ কোটি ডলার, লাইসেন্সের মেয়াদ ১৫ বছর, সুতরাং বাংলাদেশের লাইসেন্স ফি’র Price per MHzPop Multiple per year = /(X১৬)/১৫= .০০৮৩ ডলার যা ভারতের লাইসেন্স ফি ০.০২৮ ডলারের ২৯.৬৪%

অর্থাৎ, প্রতি একক জনসংখ্যার জন্য প্রতি মেগাহর্টজ তরঙ্গের লাইসেন্স ফি বাংলাদেশে যা ধার্য করা হয়েছে তা ভারতের তিন ভাগের এক ভাগেরও কম! কাজেই ভারতকে অনুসরণ করা হলে প্রতি মেগাহার্টজ তরঙ্গের দাম বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ২০ মিলিয়ন ডলার থেকে কম পক্ষে ৩ গণ বাড়িয়ে ৬০ মিলিয়ন ডলার বা ৬ কোটি ডলার করতে হয়।

প্রশ্ন উঠতে পারে, ভারতের অর্থনীতি, মাথাপিছু আয়, টেলিকম মার্কেটের পরিস্থিতি ইত্যাদি তো বাংলাদেশের থেকে আলাদা। সেসব বিবেচনা না করে স্রেফ লাইসেন্স ফি’কে জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করলেই তুলনাটা সঠিক হয়? চলুন দেখা যাক, এসব বিষয় বিবেচনা করলে কি দাড়াতে পারে! এই তুলনাটা করার জন্য আমরা ভারত ও বাংলাদেশের এআরপিইউ এবং টেলিডেনসিটি’র দিকে নজর দেয়া যাক।

প্রতি মাসে কাস্টমার প্রতি আয় বা Average Revenue Per User (ARPU) বাংলাদেশে গড়ে ৩ ডলার (এখানে ক্লিক করুন) আর ভারতে গড়ে ২ ডলার (TELECOM SECTOR: TRENDS & OUTLOOK, sep 2012) অর্থাৎ, বাংলাদেশে গড়ে কাস্টমার প্রতি আয় ভারতের দেড়গুণ।

অন্যদিকে বাংলাদেশের টেলিডেনসিটি ৬৫ % (এখানে ক্লিক করুন) এবং ভারতের ৮০% (এখানে ক্লিক করুন) অর্থাৎ বাংলাদেশের টেলিকম বাজার এখনও ভারতের চেয়ে ১৫ % কম বিকশিত। বাংলাদেশের টেলিকম মার্কেট এই বিবেচনাতেও ভারতের চেয়ে বেশি আকর্ষণীয় কারণ টেলিকম অপারেটরের সামনে বাজার বাড়ানোর সুযোগ অপেক্ষাকৃত বেশি বাংলাদেশে।

.

উপসংহার ও দাবী

কাস্টমার প্রতি বাড়তি আয় এবং বাজার বিকাশের বাড়তি সুযোগ এর কথা বিবেচনা করলে বাংলাদেশে প্রতি মেগাহার্টজ তরঙ্গ ফি’র ভিত্তি মূল্য স্রেফ ভারতের সমান্তরালে আনতে হলেই ২০ মিলিয়ন বা ২ কোটি ডলার থেকে অন্তত ৪ গুণ বাড়িয়ে ৮ কোটি ডলার করা প্রয়োজন।তা না হলে,প্রতি মেগাহার্টজ তরঙ্গে বাংলাদেশের ক্ষতি হবে অন্তত ৬ কোটি ডলার। ফলে ৫০ মেগাহার্টজ এ মোট ক্ষতি হবে ৩০০ কোটি ডলার বা ২৪ হাজার কোটি টাকা। আমরা তাই এই লেখার মাধ্যমে বিটিআরসি’র কাছে দাবী জানাচ্ছি প্রতি মেগাহার্টজ তরঙ্গ ফি’র ভিত্তি মূল্য পুনর্বিবেচনা করে ভারতের টেলিকম রেগুলেটরি কর্তৃপক্ষের বেধে দেয়া নীতি’র অনুরুপ হারে প্রতি মেগাহার্টজ এর দাম কমপক্ষে ৮০ মিলিয়ন বা ৮ কোটি ডলার করা হোক।।

(প্রথম প্রকাশ সামহোয়্যারইনব্লগ)

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.