এলিট বাহিনীর শ্বেত সন্ত্রাস ও রাষ্ট্রের নীরব সমর্থন

Posted: ডিসেম্বর 16, 2012 in দেশ, মন্তব্য প্রতিবেদন
ট্যাগসমূহ:, , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , ,

লিখেছেন: শাহেরীন আরাফাত

Rab-1এই বিজয়ের মাসে এমন একটা লেখা হয়তো অনেকেই আশা করবেন না, কিন্তু লিখছি নিজের তাগিদেই। বিচার বহির্ভুত হত্যাকাণ্ড, আর হয়রানি, গ্রেফতার বাণিজ্য, গুপ্তহত্যা, অপহরণে শঙ্কিত হয়েই লিখছি। হয়তো এই লেখার অপরাধেও হয়রানি বা গ্রেফতারের শিকার আমরা হতে পারি, কিন্তু তবুও বলতে হবে, তবুও লিখতে হবে! রাষ্ট্রীয় এলিট বাহিনীর সন্ত্রাসী কার্যকলাপের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার যে কোনো বিকল্প নাই!

.

২১ শে জুন, ২০০৪ সালে র‌্যাব গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। ২৪ শে জুন, ২০০৪ সালে প্রথম র‌্যাবের হাতে ক্রসফায়ারের ঘটনায় একজন মারা পড়ে। তারপর থেকে ক্রসফায়ার প্রতিনিয়ত ঘটমান একটি বিষয়। যেমন ১৮ ই অক্টোবর, ২০০৪ সালে দেশের ৬৪ টি জেলায় র‌্যাব একযোগে অপারেশনে নামে। ২৬ শে অক্টোবর, ২০০৪ সালে র‌্যাব গঠনের বৈধতা নিয়ে আদালতে একটা মামলা দায়ের হয়। কিন্তু তার ফলাফল শূণ্য। কারণ তার পরপর শুধু র‌্যাবই নয়, দেশের পুলিশ বাহিনীও প্রতিযোগিতামূলকভাবে ক্রসফায়ারের ঘটনা ঘটাতে থাকে এবং সংখ্যাগতভাবে ক্রসফায়ারের ঘটনা বাড়তে থাকে। তা গঠিত হয়েছিল মূলত পুলিশ, সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর সদস্যদের সমন্বয়ে।

নতুন এই এলিট বাহিনীটি গঠনের পর থেকেই বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং হেফাজতে নিয়ে নির্যাতনের জন্য র‍্যাবের সমালোচিত হয়। কিন্তু র‍্যাব গঠনের অন্যতম দেশীয় উদ্যোগতা তৎকালীন আইনমন্ত্রী মওদুদ আহমদএর মতে, “যদিও আপনারা টেকনিক্যালি একে বিচারবহির্ভূত বলতে পারেন। আমি কিন্তু বলবো না হত্যাকাণ্ড, বলবো বিচারবহির্ভূত মৃত্যু। মৃত্যু আর হত্যা কিন্তু এক জিনিস নয়যাই বলুন মানুষ কিন্তু খুশি।” এই কথাগুলো তার আইনমন্ত্রী থাকাকালীন সময়ের।

২৯ শে অক্টোবর, ২০০৪ সালে বাংলাদেশে ক্রাইম রিপোর্টারস অ্যাসোসিয়েশন আয়োজিত এক ইফতার মাহফিলে তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর ঘোষণা দেন, র‌্যাবের জন্য ইনডেমনিটির কোনো প্রয়োজন নেই; কারণ সন্ত্রাসীরা র‌্যাবকে আক্রমণ করলে, তখন আত্মরক্ষার তাগিদে র‌্যাবও পাল্টা গুলি করে, এতে করে সৃষ্ট ক্রসফায়ারে সন্ত্রাসীর মৃত্যু ঘটছে। ফলে আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থায় ইনডেমনিটির কোনো প্রসঙ্গ আসে না। অর্থাৎ স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর ভাষ্যে যে বিষয়টি স্পষ্ট ছিলো তা হলো, ক্রসফায়ারে ঘটা হত্যাকাণ্ডের একটা আইনগত নায্যতা রয়েছে। তবে এখানে আমাদের আরো একটি কথা স্মরণ রাখা জরুরি যে, জোট সরকার আমলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ছিলো সরাসরি প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার অধীন।

৬ই জানুয়ারি ২০০৫ সালে বিএনপির একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্ব, তৎকালীন আইনমন্ত্রী, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ নারায়ণগঞ্জে আইনজীবীদের এক সমাবেশে তাদের সরকারের পক্ষ থেকে আরো স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা দেন, আমরা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছি। সন্ত্রাসীদের সঙ্গে এটি র‌্যাবের যুদ্ধ। ফলে ক্রসফায়ারে নিহত হওয়ার ঘটনা কোনোভাবেই মানবাধিকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়। একটি ভঙ্গুর রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার অজুহাতে রাষ্ট্রের একজন আইনমন্ত্রী একটি এলিট সশস্ত্র বাহিনীকে খুন করার ন্যায্যতা দেন।

র‍্যাব মূলত গঠিত হয় সিআইএ, ‘, আইএসআই সমন্বয়ে, জামাতী মদদে; যার মূল উদ্দেশ্য ছিল বিরুদ্ধ মতের রাজনীতি, তথা মার্কসবাদী বিপ্লবী রাজনীতিকে নিশ্চিহ্ন করা, সেই সাথে শাসকশ্রেণীর সাম্রাজ্যবাদী পিতাদের দেখানো যে, রাষ্ট্রে সন্ত্রাস কমেছে, যা অনেকটা সন্ত্রাস দিয়ে সন্ত্রাস কমানোর মতো রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস। এই বিরুদ্ধ মত, বা কমিউনিস্ট রাজনৈতিক কর্মী নিধনে আরো জড়িত ছিল শাসক শ্রেণীর তৎকালীন ক্ষমতাসীন অংশের মদদপুষ্ট বাংলা ভাইয়ের মতো দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী, অথচ এই র‍্যাব তার ক্ষেত্রে চোখ বন্ধ করে রেখেছে। তবে প্রয়োজন ফুরিয়ে যাওয়ার পর ওই শাসক শ্রেণী বাংলা ভাইদেরও ছাড় দেয়নি, তবে তাদের ফাঁসীতে ঝুলিয়ে মারার নাটক মঞ্চস্থ করেছে। আর দালাল মিডিয়া বরাবরই শাসক শ্রেণীর পদলেহী অবস্থান ধারণ করে হত্যাকাণ্ডের শিকার মানুষগুলোর নামে কতোগুলো মামলা রয়েছে, তারা কতো বড় ডাকাত, কতো বড় সন্ত্রাসী, তা প্রকাশ করে সকল হত্যাকাণ্ডকে জায়েজ করার জন্য সদা উন্মত্ত।

র‍্যাবের পোষাকেও রয়েছে জল্লাদ জল্লাদ আভাস; কালো পোশাক, সানগ্লাস, কালো রুমাল, মাঝে মাঝে তাদের সাথে দেখা যায় কালো কালো ট্রেনিং প্রাপ্ত কুকুর, সবই কালো, যা দেখলে যে কারো বুক কেঁপে যেতে বাধ্য। যেন সাক্ষাৎ যমদূত! এই পোষাকের সাথে সাদৃশ্য রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের সময়কালের হানাদার বাহিনীর এদেশীয় দোসরদের পোষাকের।

বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মের পর রক্ষীবাহিনী, নীল বাহিনী, লাল বাহিনী, পুলিশ, বিডিআর, র‍্যাব, কোবরা, চিতা, নানান বাহিনীর মাধ্যমে এনকাউন্টার, ক্রসফায়ার, নানান নামে এই রাষ্ট্রীয় হত্যাকাণ্ডকে এই রাষ্ট্র জায়েজ করেছে, এবং করে চলেছে

উপমহাদেশে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তি ১৮১৩ সালে প্রথম পুলিশবাহিনী গঠন করে। তখন উপমহাদেশ জুড়ে ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে কৃষকজনতার লড়াই চলছিল। ব্রিটিশ সেদিন এই পুলিশ বাহিনী গড়ে তোলেই মুক্তিকামী জনগণকে প্রতিরোধ এবং নিয়ন্ত্রণের জন্য। পুলিশ প্রশাসন পরিচালনার জন্য যেসব আইন বাংলাদেশেও বিশেষভাবে গণ্য হয়ে আসছে, তার মধ্যে পুলিশ আইন ১৮৬১, ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮, পুলিশ রেগুলেশন অব বেঙ্গল ১৯৪৩ অন্যতম। পরবর্তীতে উল্লিখিত আইনের উপরে ভিত্তি করে মেট্রোপলিটন পুলিশ ‘ল’ ১৯৭৬, ১৯৭৮, ১৯৮৪, ও ১৯৯২ এবং আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন অর্ডিনান্স ১৯৭৯ জারি করা হয়েছে। কিন্তু আজো বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ১৮৬১, ১৮৯৮ এবং ১৯৪৩ সালের পুলিশ আইনই হলো পুলিশ বিভাগের মূল আইন। আমাদের স্মরণ রাখা জরুরি যে, ১৮৬১ সালের ওই আইন রচনা করা হয়েছিল উপমহাদেশের জনগণ প্রথম উপমহাদেশে জুড়ে যে স্বাধীনতার সংগ্রামের সূচনা করেন, ১৮৫৭ সালে, তাকে হিসাবে রেখে। আর ১৯৪৩ সালে পুলিশ রেগুলেশন অব বেঙ্গলও জারি করা হয়েছিল ওই বছরে উভয় বাংলায় কৃষকদের শক্তিশালী তেভাগা লড়াইকে প্রতিরোধ করার জন্য। অর্থাৎ তখনকার দিনে শাসকশোষিতদের মধ্যে সম্পর্ক ছিলো ঔপনিবেশিক শাসক বনাম নিপীড়িত জাতি ও জনগোষ্ঠীর সম্পর্ক। তার ভিত্তিতেই ওইসব আইন রচনা এবং তার প্রয়োগ চলে সেদিন। ওইসব আইনের আরো লক্ষণীয় দিক ছিলো, বাহিনী হিসেবে পুলিশের যেন কোনো ধরনের ঘোষিত মানবাধিকারের প্রতি আনুগত্য নাথেকে ক্ষমতাসীন সরকারের প্রতি অনুগত থাকে। সরকারও যেন তার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সরাসরি ওই সংস্থার তত্ত্বাবধান ও ব্যবহার করতে পারে, সেই ব্যবস্থা করা। সেইভাবে এই সংস্থার কাঠামোগত বিন্যাসও করা হয় এবং সেই ধারা আজো আমাদের দেশে অব্যহত রয়েছে। তাছাড়া ১৮৬১ সালের আইনে পুলিশ যাতে সরাসরি জনগণকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে সেই ক্ষমতা তাদেরকে দেওয়া হয়েছিল। সেই আইনি ধারাবাহিকতা আজো ধরে রাখা হয়েছে। কিন্তু এখানে মৌলিক বিষয়টি হলো এই, একটি রাষ্ট্র যখন নিজেকে স্বাধীন এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে দাবি করে ও ঘোষণা দেয়, তখন ওই রাষ্ট্রের পুলিশ জনগণের নিয়ন্ত্রণকারী শক্তি হিসেবে কোনোভাবেই বিবেচিত হতে পারে না। সংস্থা হিসেবে পুলিশ বাহিনী একটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠান। কিন্তু বংলাদেশের ক্ষেত্রে সেটা ঘটেনি। ফলে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা, সবার জন্য সমভাবে ন্যায় বিচার পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করা, মৌলিক অধিকার হিসেবে মানবাধিকার রক্ষার প্রশ্নে পুলিশের কোনো ধরনের দায়বদ্ধতার প্রশ্ন নেই। রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রের ঘোষিত সংবিধানের কাছেও পুলিশের কোনো ধরনের দায়বদ্ধতা নেই। তার সমস্ত দায়বদ্ধতা ঔপনিবেশিক যুগের মতো হুবহু ক্ষমতাসীন সরকারের স্বরাষ্ট্র বিভাগের কাছে। ঔপনিবেশিক যুগ থেকে একই ধারাবাহিকতা চলে আসছে। ফলে যে সব রাজনৈতিক দল ’৭২ এবং ’৭৫ সালের সংবিধান নিয়ে জনগণকে বিভক্ত করেন এবং কে কতটা গণতান্ত্রিক সেই প্রতিযোগিতায় নামেন। রাজনৈতিক দল হিসেবে তারা কেউই তাদের ঘোষিত সংবিধান ও মানবাধিকারের সঙ্গে সম্পর্কিত করে পুলিশ বাহিনীর কোনো ধরনের কাঠামোগত সংস্কার তো করেইনি, বরং গত ৩৭ বছর ধরে যে লুটেরা শ্রেণী দেশে শাসন করেছে, অবাধে লুঠপাট করেছে, সেই অবৈধ সম্পদ রক্ষা ও বৈধ করার মানসে পুলিশকে তাদের লাঠিয়াল এবং একই সঙ্গে আইনগত মার্ডারার বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলেছে বলে অনেক আইনজ্ঞরা মনে করেন। যার সব থেকে বড় প্রমাণ দেশে চলমান ক্রসফায়ার। আর বিচার বিভাগের নির্বাহী অংশটি গড়া হয়েছে রাষ্ট্রীয় হত্যাকাণ্ডের আইনগত মদতদাতা হিসেবে। এই মতামতটা শুধু দেশের আইনজ্ঞ বা জনগণের নয়। গত ৩০ বছর ধরে আন্তর্জাতিক যে সব সংস্থার সঙ্গে আমাদের সরকারগুলোর দহরমমহরম, সেইসব সংস্থার রিপোর্টেই বলা হয়েছে, বাংলাদেশে সবচেয়ে দূর্নীতিগ্রস্ত খাত হলো পুলিশ ও বিচার বিভাগ।

১৯৭১ সালে আওয়ামী লীগ ধারায় যে মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত হয়েছিল, ওই যুদ্ধেও সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ ছিলো। তাদের নিয়েই গড়ে উঠেছিল মুক্তিফৌজ। যা আজকের মুক্তিযোদ্ধা বা মুক্তিবাহিনী নামে পরিচিত। যদিও এই বাহিনীতে সদস্য বিক্রুটিংয়ের সময় ভারতীয় সেনাবাহিনীর একটা ভূমিকা ছিলো এবং তাদের তত্ত্বাবধানেই তা গড়ে ওঠে। তারপরেও সেখানে ছিল সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ। কিন্তু ’৭১ পরবর্তীতে বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠন হওয়ার পর পর আওয়ামী লীগ সরকার ওই মুক্তি বাহিনীকে অস্ত্রমুক্ত করে তাদের পূর্বের জীবনে ফেরত পাঠায়। যা পৃথিবীর ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা। কারণ জাতীয় মুক্তির আন্দোলন হোক, আত্মনিয়ন্ত্রণের যুদ্ধ হোক বা সাধীনতার সংগ্রাম হোক, এসব সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা সেনাবাহিনী মূলত জাতীয় সেনাবাহিনীর মর্যাদা পায়। চীনভিয়েতনাম লাওসসহ পৃথিবীর অনেকে দেশে তার দৃষ্টান্ত রয়েছে। শেখ মুজিব সেই নতুন জাতীয় চেতনাসম্পন্ন সেনাবাহিনী হিসেবে মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র মুক্ত করে, দেশের প্রতিরক্ষার ভার তুলে দেন কলোনিয়াল এবং একই সঙ্গে পাকিস্তান আমল থেকেই মার্কিন সাম্রজ্যবাদের স্বার্থের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সেনাবাহিনীর হাতে। আর বিরোধী মতালম্বীদের খতম করতে মুজিববাহিনীকে রূপান্তরিত করেন রক্ষিবাহিনীতে। আর সেনাবাহিনী ও রক্ষিবাহিনীর দ্বন্দ্বের খবরাখবর আমাদের অনেকেরই অজানা নয়।

আর এর মধ্য দিয়ে জাতীয় মুক্তির যুদ্ধ থেকে যায় অসমাপ্ত। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরের ১৬ তারিখে আমরা এক নতুন পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ হই, অথচ একে আমরা পালন করি বিজয় দিবস রূপে। প্রকৃতপক্ষে বিজয় আমাদের অধরাই রয়ে গেছে, কারণ আমরা মুক্তিযুদ্ধ করলেও মুক্তিটাই থেকে গেছে অধরা। ঠিক তেমনি ঔপনিবেশিক আইন বলবৎ রেখে, নিজেদের স্বাধীন বলে দাবী করা, বা এই রাষ্ট্রকে গণতান্ত্রিক বলে ঘোষণা করাটা পুরোদস্তুর ভণ্ডামী, যা এই রাষ্ট্র প্রতিনিয়ত করে চলেছে। আর তার ফলাফল আজ আমরা সবাই প্রত্যক্ষ করছি।

.

২০০৯ এর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলোর মাঝে অন্যতম ছিল – “বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ, দোষীদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং মানবাধিকার রক্ষার প্রতিশ্রুতি”, সরকারের এই সুর এখন আর বর্তমান নাই। অথচ নির্বাচনী প্রচারণার একটা বড় অংশ জুড়ে ছিল এই প্রচারণা আর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রচারণা, যা অলশ্রুতিতে বিপুল নির্বাচনী বিজয় অর্জিত হয় এই সরকারের। অথচ, শাসক শ্রেণীর সকল প্রতিশ্রুতিই যে ফাঁকা বুলি, তা সাধারণ জনগণের কাছে বর্তমান সময়ে ক্রমেই সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

ক্ষমতায় আসার পর এই সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দিপু মনি নিরাপত্তা হেফাজতে মৃত্যু সহ্য করা হবে না বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু হত্যাকাণ্ড চলতেই থাকল। পরবর্তীতে সরকারের পক্ষ থেকে এমন হত্যাকাণ্ডের কথা অস্বীকার করা হয়। রাষ্ট্রের সদ্য সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন, যিনি সব ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখেন, তিনি করেন, দেশে কোনো ক্রসফায়ার নেই। কখনো এমন কিছু ঘটেওনি।

এর কদিন পর উচ্চ আদালতের একটি বেঞ্চ স্বতঃপ্রণোদিত এক আদেশে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব ও র‍্যাবকে বিশেষ একটি হত্যাকাণ্ডের ব্যাখ্যা দিতে বলে। এর আগে নিহতদের পরিবারের সদস্যরা আদালতের কাছে প্রার্থনা করেছিলেন যাতে নিহতের পরিজনদের ক্রসফায়ারে দেওয়া না হয়। যদিও সরেজমিনে দেখা গেছে, মার্কসবাদী রাজনীতির সাথে জড়িত যাদের ক্রসফায়ারের নামে হত্যা করা হয়েছে, তাদের অনেক পরিজন মিথ্যা মামলার শিকার হয়ে বাস্তুচ্যুত, কেউ কেউ মামলায় নিঃস্ব হয়ে পালিয়ে ফিরছেন।

কিছুতেই কিছু হয়নি, হত্যাকাণ্ড চলতেই থাকলো। আদালত তা লক্ষ্য করে সরকারের অবস্থান ব্যাখ্যা করার জন্য শুনানির তারিখ ঠিক করেন; কিন্তু এই নির্ধারিত তারিখের ঠিক আগে প্রধান বিচারপতি বেঞ্চটি ভেঙে দিলেন। কারণ হিসেবে যা দেখালেন, তা প্রশাসনিক। কিন্তু মূল কারণ যে ক্ষমতাসীন ব্যর্থ সরকারের লাজবাব কর্মকাণ্ড তা বলাই বাহুল্য।

জেলা শহরগুলোতে অসংখ্য চিহ্নিত অস্ত্রধারী, চাঁদাবাজ রয়েছে যারা কোনো না কোনোভাবে ক্ষমতাসীন দলগুলোর সঙ্গে সম্পর্কিত, তাদের কাউকে ক্রসফায়ারের আওতায় আনা হয়নি। অথচ বিপ্লবী রাজনীতির সাথে জড়িত এমনকি শুভানুধ্যায়ীদেরও ক্রসয়ায়ারের আওতায় আনা হয়েছে অথবা ক্রসয়ায়ারের ভয়ে ভিটেমাটি ছাড়া করা হয়েছে।

উপরন্তু, দেশের কোথাও কোথাও কমিউনিস্টদের উচ্ছেদে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি তাদের স্থানীয় নেতৃত্বদের দিয়ে বাহিনী গঠন করেছে। এসব বাহিনী আজো সক্রিয় রয়েছে এবং র‌্যাবের হয়ে ভূমিকা পালন করছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। এদের হাতেও অনেক মানুষ মারা পড়েছেন।

আরেকটা কথা মাথায় ঘুরঘুর করছে, এই রাষ্ট্রীয় বাহিনীগুলো গঠনের পর তারা হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করেছে, আর প্রায় সবগুলোই অস্ত্র উদ্ধার ও উৎ পেতে থাকা সন্ত্রাসীদের গুলির পাল্টা জবাবের গতানুগতিক নাটক মঞ্চস্থ করে। কিন্তু ওই সন্ত্রাসীদের (!) ছোড়া গুলি কখনো তাদের শরীরে লাগে না, তারা যেন এক একজন রোবোকোপ (এক সময়ে “রোবোকোপ” নামের টিভি সিরিয়ালটি ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল, যার নায়ক একজন রোবট পুলিশ অফিসার)!

.

আজ এই রাষ্ট্রে পালিত হচ্ছে বিজয় দিবস, যদিও বিজয় রয়েছে অধরা। যখন রাষ্ট্র সেজে আছে নানান রঙে, মিডিয়ার প্রভাবে পোষাকী স্বাধীনতা আর দেশপ্রেমের নামে মেতে আছে জনগণের একটা বড় অংশ; ফেসবুক লালসবুজ করে, দেশকে নিয়ে স্ট্যাটাস আপডেট দেওয়াতে যখন আমরা মগ্ন, তখন কেহই বা মনে করছেন কমরেড মুফাখখার চৌধুরীর কথা! এমনি এক দিনে রাষ্ট্র তার এলিট বাহিনী র‍্যাবের দ্বারা ক্রসফায়ারে হত্যা করেছিল এই মুক্তিকামী নেতাকে (সম্পাদক, পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টি এমএল)। এমনি করে প্রতিনিয়ত হত্যা করা হচ্ছে মুক্তিকামীদের। যেমনি করে হত্যা করা হয়েছিল কমরেড সিরাজ সিকদার, কমরেড মনিরুজ্জামান তারা, কমরেড মিজানুর রহমান টুটুলদের। ইতিমধ্যেই কয়েক হাজার বিপ্লবী রাজনৈতিক কর্মীসদস্যকে হত্যা করা হয়েছে, কিন্তু এই অগণতান্ত্রিক রাষ্ট্র তার দায় নিতে অপারগ। রাষ্ট্রের অঘোষিত যুদ্ধটা অনেকটা এমন হয় রাষ্ট্র নির্দেশিত পথে প্রগতিশীলতা মারাও, যেমনটা সংসদমুখী নামধারী বাম রাজনৈতিক দলগুলো করে আসছে; নতুবা তোমাদের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের এই রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড শতভাগ জায়েজ।

.

তবে আশার (!) কথা হলো র‍্যাবের এই নিপীড়ন এখন শুধু ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয়ের উপরেই নির্ভরশীল নয়, বরং তার আকার বৃদ্ধি পেয়েছে বিপুলভাবে, এখন এই নিপীড়নের শিকার হচ্ছে সাধারণ নিরীহ মানুষেরাও। এই নিপীড়ন নিয়ে বিস্তর আলোচনা হলেও আদতে কোন ফলাফল আমরা দেখতে পাইনি। আশা করি, হায়েনা বাহিনী দ্বারা লিমনের পা খেয়ে ফেলার ঘটনা আমাদের কারো অজানা নয়, তাই নতুন করে সে ঘটনার বিবরণ দিচ্ছি না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আব্দুল কাদিরের গ্রেফতার ও নির্যাতনের ঘটনাও আমরা বেশ ভালই জানি। এই কথাগুলো বলার মূল উদ্দেশ্য হলো এই কথাটা বলা যে, এই সাংবিধানিক অগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আমরা কেহই নিরাপদ নয়, যে কেউ যে কোনো সময়ে এই এলিট হায়েনা বাহিনীর শিকারে পরিণত হতে পারে। হয়তো আজকে আরেকজন, কাল বা পরশু আমিআপনিবা যে কেউ!!

.

আন্তরিক কৃতজ্ঞতা:

ক্রসফায়ার’ রাষ্ট্রের রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড

সম্পাদনা: নেসার আহমেদ

(লেখাটির কিছু কিছু অংশ হুবুহু এই বই থেকে তুলে দেওয়া হয়েছে)

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s