লিখেছেন: মোহাম্মদ আরিফুজ্জামান

racist advertise of grameenphone-1

যে জাতি অপর জাতির উপর শোষননিপীড়ন চালায় তারা কখনোই প্রকৃত স্বাধীন নয়’

গ্রামীণফোন সম্প্রতি একটি প্যাকেজ চালু করেছে নাম ‘আমন্ত্রণ’। যে কোন বহুজাতিক ফোন কোম্পানি যত খুশি প্যাকেজ চালু করে করুক তাতে ১৬ কোটি মানুষের পকেটশূন্য হয়ে যাক তাতে রাষ্ট্রের যেমন কোন মাথাব্যাথ্যা নাই; আমারও নেই। কিন্তু সমস্যা হলো এই প্যাকেজটির বিক্রি বাটার জন্য বর্ণবাদী গ্রামীণফোন যে কৌশলটি নিয়েছে তা শুধু ঘৃন্যই নয়, ক্ষমার অযোগ্য।

আমন্ত্রণ প্যাকেজটির বিজ্ঞাপনটি সম্প্রতি সব টিভিতে দেখানো হচ্ছে। টিভির একজন দর্শক হিসেবে অখাদ্য এ বিজ্ঞাপনটি তাই আমারও গিলতে হচ্ছে। বিজ্ঞাপনে দেখা যায় তিনজন ‘সভ্য’ বাঙালি একটি বনের মধ্যে ঘোরাফেরা করছে। এরকম সময় কিছু ‘জংলি’ (বিজ্ঞাপনের দৃশ্যচিত্র অনুযায়ী) আদিবাসী তাদেরকে মধ্যযুগীয় কায়দায় আটক করে। আটকের পর সভ্য বাঙালিদের একটি খাচায় রেখে আদিবাসীরা উৎসবের জন্য নৃত্য শুরু করে। আটক তিন বাঙালির খাচার নিচে গরম পানি। ভাবগতিক দেখে মনে হচ্ছে এই তিন সভ্য বাঙালিকে হত্যা করে তাদের লাশ রাতের খাবার হিসেবে সারবেন আদিবাসীরা। এ কারণে নৃত্য চলছে। এমন সময় আদিবাসীদের রাজা এলেন। সবাই তাকে সম্মান দেখালেন।

খাচার মধ্যে আটক থাকা এক বাঙালি পুরুষ নায়োকোচিত ভঙ্গিতে সম্ভবত রাজার ছেলে রাজপুত্রকে বন্ধু হিসেবে সম্ভাষণ করলেন। রাজার ছেলে রাজপুত্র এই বাঙালি নায়ককে চিনতে পারলেন। এরপর রাজপুত্র বললেন, ‘আমি তাকে চিনি। সে আমার বন্ধু (বিচিত্র ভাষায় এটা বলা হয়)।’ দৃশ্যপট পাল্টে গেলো। তিন আটক বাঙালিকে ছেড়ে দেওয়া হল। ব্যাকগ্রাউন্ড ভয়েজে বলা হলো, ‘কখন যে কোন সম্পর্ক কাজে লেগে যায়, বলা যায় না’। এরপর দেখা যায় বাঙালিরা মনের সুখে বনের মধ্যে টারজান স্টাইলে লতা ঝুলাঝুলি করতে শুরু করলেন।

.

বিজ্ঞাপন প্রতিক্রিয়া

এই বিজ্ঞাপনের সোজা অর্থ হলো ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক আদিবাসীরা হলেন ‘মানুষ খেকো’। তারা মানুষ খায়। আর সভ্য হলেন বাঙালিরা। সোজা বাংলায় এটা চরম ঘৃন্য বর্ণবাদী চিন্তা। রাষ্ট্র একটি সংবিধান দিয়েছে, সেই সংবিধান অনুযায়ী এ ধরনের চিন্তা প্রকাশ্য কেউ করলে বা লিখে বা বক্তব্য দিলে রাষ্ট্র তার বিরুদ্ধে কঠিন শাস্তি নেওয়ার কথা। এ ধরনের চিন্তা হয়তো অনেকে মনে মনে করেন। কিন্তু এভাবে বিজ্ঞাপন দিয়ে ঘৃন্য বর্ণবাদী বিজ্ঞাপন প্রকাশ করার দুসাহস এর আগে কেউ দেখিয়েছেন কিনা বাংলাদেশে আমার মনে পড়ছে না।

রাজনৈতিকদার্শনিক অবস্থার কারণে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি আদিবাসী বলি আর ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক জাতিগোষ্ঠীর কথা বলি; তাদের অবস্থান প্রায় কাছাকাছি। কেউ প্রকাশ্যে বলেন যে আদিবাসীদের জায়গা জমি দখল করে নাও, আর কেউবা অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির ইতিহাস ঐতিহ্যের ভর ও ভারের কারণে তা প্রকাশ্য বলতে পারেন না। কিন্তু তাই বলে এই দুই দলের কেউ এখন পর্যন্ত প্রকাশ্য বলেনি যে আদিবাসীরা অসভ্য, বর্বর, তারা মানুষ খেকো। অর্থ্যাৎ রাজনৈতিকভাবে যা আওয়ামী লীগ বিএনপি দেখাতে পারেনি, সেই সাহস গ্রামীণফোন দেখিয়েছে।

আমার জানামতে গ্রামীণফোনের বিজ্ঞাপন বানায় ‘গ্রে বাংলাদেশ’। এই বিজ্ঞাপন যে প্রতিষ্ঠানের মাথা দিয়ে বেরিয়েছে তাদের বিরুদ্ধেও বর্ণবাদী ঘৃনা ছাড়ানোর কারণে ফৌজদারী অপরাধ সংগঠন করায় মামলা হওয়া উচিত।

৭ আগস্ট ২০০৯ সালে বিবিসির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ১৯৯৭ সালে শান্তি চুক্তিমতে, ৩৫টি সেনাক্যাম্প ও এক ব্রিগেড সেনা প্রত্যাহার করার কথা ওই বছরের সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যেই, কিন্তু বাস্তবতা আমরা জানি। ক্রমশ পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে সেনা প্রত্যাহার করে বেসমারিক প্রশাসনের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর ছিলো শান্তিচুক্তির মূল দাবি।

সে দাবি যে পূরণ হয়নি তা শান্তিচুক্তির পক্ষ ও বিপক্ষ দল অর্থ্যাৎ জনসংহতি সমিতি ও ইউপিডিএফের উভয় নেতারা বিভিন্ন সভা সামবেশে বলেছেন।

এ ধরনের একটি কুৎসিত বর্ণবাদী বিজ্ঞাপন সাধারণ বাঙালিদের মধ্যে যে ভাব মানস তৈরী করবে বা করছে তাহলো আদিবাসীরা এখনো সভ্য হয়নি, ফলে ওখানে সেনা শাসন থাকা উচিত। তারা যখন পশ্চিমা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে পারবে তখন সেনা শাসন তুলে নেওয়া যাবে।

কে আদিবাসী কে উপজাতি বা ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক জাতি সেই কুতর্কের দোকান খুলতে চাচ্ছি না, ইচ্ছেও নাই। কিন্তু সংখ্যালঘু এসব জাতি সত্তার বিরুদ্ধে এভাবে একটি বিজ্ঞাপন দিনের পর দিন প্রচারিত হবে, আর বাঙালিদের মধ্যে একটি জাত্যাভিমান তৈরী হবে অন্তত সংবিধান তা অনুমোদন করে না। আর সবই না হয় বাদই দিলাম। জাতিসংঘের বিভিন্ন কনভেনশন না হয় শিকেয় তুলে রাখলাম। কিন্তু আপনার মন কি বলে?

.

কার রাষ্ট্রে কে পারে

কি বিজ্ঞাপন প্রচার করা যাবে, আর কি যাবে না সে বিষয়ে একটা নীতিমালা আছে। তবে সে সব নীতিমালাকে তার কোন সময় কেয়ার করেছে বলে আমার জানা নেই। তবে তারা একটা ব্যাপারে খুব শেয়ানা তাহলো সংখ্যাগরিষ্ট মানুষের ধর্ম ও জাতি নিয়ে কিছু বলবে না। কারণ তারা জানে এসব করলে সব কিছু করলে তাদের জীবন নিয়ে দৌড়াতে হবে। এ কারণে ইসলাম বা বাঙালির বিরুদ্ধে তারা কিছু বলবে না। যেহেতু আদিবাসীদের কোন ক্ষমতাই নাই এ কারনে আদিবাসীদের এরকম চরিত্রে দেখালে কেউ কিছু বলবে না। আদিবাসীরা রাষ্ট্রের কেউ না, তাদের বিরুদ্ধে কথা বলা যায়, জমি কেড়ে নেওয়া যায়, বিজ্ঞাপনে মানুষ খেকোও বানানো যায়…..

Advertisements
মন্তব্য
  1. যোদ্ধাবাজ্‌ বলেছেন:

    প্রতিবারের ন্যায় এবারো এহেন কুরুচি পূর্ন বিজ্ঞাপনে থু থু সহকারে প্রতিবাদ রেখে গেলাম।
    আর তার সাথে পোষ্টের জন্য ধন্যবাদ।

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s