গার্মেন্টস শ্রমিকদের মৃত্যু – নানা কথা নানা ব্যথা

Posted: নভেম্বর 29, 2012 in আন্তর্জাতিক, দেশ, মন্তব্য প্রতিবেদন
ট্যাগসমূহ:, , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , ,

লিখেছেন: বন্ধুবাংলা

নিঃসন্দেহে শ্রমিক কর্মচারীদের ঐক্য পরিষদের বানারে স্কপ’ ছিল স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম শক্তি। বিভিন্ন ইস্যুতে স্কপে ও বিভিন্ন ট্রেড ইউনিয়নে বামপন্থীরা নীতি নির্ধারকের ভূমিকায় ছিল। কিন্তু তাঁদের আন্দোলনের ফসল ঘরে তুলে পর্যায়ক্রমে ভোগ করেছিল বুর্জোয়া রাজনৈতিক শক্তির দলগুলো। লীগ ও বিএনপি, জামাত এমনকি স্বৈরাচার এরশাদও আছে এই ভোগের তালিকায়। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের পর এভাবেই বামপন্থীরা বুর্জোয়া রাজনৈতিক শক্তির ক্ষমতায়ণ , এবং তাঁদের ক্ষমতা সুসংহত ও সুসঙ্গত করতে ব্যবহৃত হয়েছিল এবং এখনো হচ্ছে। এক্ষেত্রে তাঁদের অর্জন যেমন শূন্য, তেমনি শ্রমিকদের অর্জনও শূন্য।

৯০ এর পর বামপন্থীরা আর কোন শ্রমিক আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেনি। যদিও স্বৈরাচারের ঢালাও বেসরকারিকরণ প্রক্রিয়া ক্ষমতাসীন বুর্জোয়া রাজনৈতিক শক্তিগুলো আরও পূর্ণমাত্রায় চালু রেখেছিল। মিল কারখানা বন্ধ করে পানির দামে বিক্রি করা হলো। ঢালাও বেসরকারিকরণ এজেন্ডার সাথে বরাবরেরে মত অন্যান্য এজেন্ডা যেমন, শ্রম আইনের সংস্কার, বিভিন্ন খাতের শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি, গার্মেন্টসে ট্রেড ইউনিয়ন চালু সহ নানা এজেন্ডা ছিল এবং কিছু এদিকওদিক বাদে এখনো সেই এজেন্ডা সমূহের বাস্তব অবস্থা বিরাজমান।

কিন্তু আমরা এসবের বিপরীতে কিছু মৌসুমী নেতার মৌসুমী আন্দোলন ভিন্ন কোন রূপ কার্যকর সম্পৃক্ততা খুঁজে পাই না। তাও শ্রমিক যখন নিজে থেকে রাস্তায় মিছিলে নামে তখনই তাঁদের রাস্তায় পাওয়া যায়। সেখানেও সমস্যা আছে, এই যে শ্রমিকেরা যখন আন্দোলনে নামে, তখন রাষ্ট্র যন্ত্র, লুটেরা কারবারিরা যেমন দেশিবিদেশি ষড়যন্ত্র খুঁজে, তেমনি এই সব কথিত শ্রমিক সংগঠনের নেতৃত্ব ও দল, প্রকারান্তরে সেই ষড়যন্ত্র গল্পের সাথে গলা মিলিয়ে ফেলে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক যে আজ পর্যন্ত এ ধরনের কোন ষড়যন্ত্রের আবিষ্কার কেউ করতে পারিনি। তার মানে কি? বাস্তব অবস্থা যাই হোক, যতদিন এই ষড়যন্ত্রের আবিষ্কার না হবে, ততদিন মৌসুমী আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে? কোন রূপ শক্ত দৃঢ় কঠিন আন্দোলনসংগ্রাম করা যাবে না? বরঞ্চ যাতে কোন শক্ত দৃঢ় কঠিন আন্দোলনসংগ্রাম না গড়ে উঠে, সেই জন্যই যে এই ষড়যন্ত্র গল্পের অবতারণা। এটা এইসব কথিত শ্রমিক সংগঠনের নেতৃত্ব ও দল না বোঝার মত বোকা নিশ্চয় নয়। কিন্তু তারা বুঝেও না বুঝার ভান করে। ষড়যন্ত্রের গল্পের সাথে গলা মিলিয়ে ফেলে।

বাংলাদেশের শ্রমিক শ্রেণীর একটি দলের জনসভায় বোমা বিস্ফোরণে ৮১০ জন কমরেড শহীদ হয়েছিল। সেই দল এর প্রতিবাদে সারা দেশে হরতাল পালন করেছিল। আমার প্রশ্ন হলো, এই যে নিস্চিন্তপুরে তাজরীন ফ্যাশনের অগ্নিকান্ডে কয়েকশ শ্রমিক আগুনে পুড়ে কাবাব হলো, ১২৪টি লাশ শ্রমিক শ্রেণী উপহার পেল; এর বিপরীতে সরকার শোক দিবস পালন করল, আর শ্রমিক শ্রেণীর পার্টি যারা দাবীদার, তাদের কাছে শোক প্রকাশ, শোভাযাত্রা, মিছিলকে উত্তম কর্মসূচি বিবেচিত হলো; তাহলে সরকারের শোক দিবস ঘোষণা এবং শোক শোভাযাত্রা মিছিল এই দুইয়ের মাঝে তফাৎটা কি? হয়ত তারা বলবে, এর বাইরে কি করতে পারি? তবে প্রশ্ন থাকে, কয় জন শ্রমিকের লাশের সমান একজন কমরেডের লাশ? কয়জন শ্রমিক মরলে শ্রমিক শ্রেণীর পার্টি দাবীদার এই বামপন্থীরা একটা হরতাল ডাকতে পারে? এই প্রশ্নের উত্তরে তারা বলতে পারে, যদি দুর্ঘটনায় মারা যায়, তবে কি হরতাল বা এরূপ জোরালো কোন সংগ্রামে যাওয়া যায়? হ্যাঁ, ঠিক, এ দুর্ঘটনার প্রশ্নটি একটু ওজনদার। এমনটা মেনে নিতে মন নিমরাজি থাকলেও পাল্টা প্রশ্ন থেকে যায়, এ পর্যন্ত কতগুলো ট্রাজেডি শ্রমিক শ্রেণী উপহার পেল; আগুনে পুড়ে শ্রমিকের মৃত্যু নতুন কিছু নয়, তবে স্পেকট্রাম গার্মেন্টস ট্রাজেডিটি অগ্নিকাণ্ডের কোন ঘটনা ছিল না। অবৈধ অনুমোদিত নক্সার স্পেকট্রাম গার্মেন্টস পুরটাই ধ্বসে পড়ল শ্রমিকের উপর, কয়েক শত শ্রমিক মারা গেল, কিন্তু শ্রমিক শ্রেণীর রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা কি ছিল? ভাগ্যিস অগ্নিকান্ড নয় স্পেকট্রাম গার্মেন্টস নিজে ধসে পড়ে প্রমাণ করেছিল সব মৃত্যুর কারণ নাশকতা বা দেশি বিদেশি ষড়যন্ত্র নয়।

শ্রমিক শ্রেণীর পার্টি যারা দাবী করে তারা যদি বলে তাজরীন ফ্যাশনের অগ্নিকাণ্ডকে একটি দুর্ঘটনা বা ষড়যন্ত্রমূলক অন্তর্ঘাত। তবে বলার কিছু থাকে না। শোকশোভাযাত্রার‍্যালি তথাস্থু বলতেই হয়! কিন্তু তারা মুখে বলে এসব গণহত্যা, ফৌজদারি অপরাধের সামিল, মালিকের অপরিণামদর্শী লাভের বলি; কিন্তু এই বলার বাইরে বা শোক শোভাযাত্রার আয়োজন ব্যতীত তারা কিছু করতে পারছে না। কিন্তু কেন?

প্রথমতঃ এখানে শ্রমিক শ্রেণীর পার্টি ও সংগঠন যেটুকু গড়ে উঠেছিল, ঢালাও বেসরকারিকরণের ফলে আদমজীসহ পাটকল, চিনিকল সহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলের শিল্প কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এসমস্ত সংগঠনের বিকাশ রুদ্ধ ও বন্ধ হয়ে যায়। এসব শিল্পের লাখ লাখ শ্রমিক গোল্ডেন হ্যান্ডসেকের নামে চাকুরিচ্যুত হলেও বিকল্প শ্রমিক যারা ছিল; তারা আজকের এই ৪০ লাখ গার্মেন্টস শ্রমিক। কিন্তু এই গার্মেন্টস শ্রমিকদের রাজনীতিকরণ প্রক্রিয়ার মাঝে নিয়ে আসতে এসব দল সক্ষম হয় নাই। যদিও শিল্পীয় শ্রমিক বলতে যা বুঝায় গার্মেন্টস শ্রমিকেরা সেরূপ নয়। শিল্পীয় শ্রমিকদের মতো সংগঠন, রাজনীতি সম্পৃক্ততা, ৪ ঘণ্টা পর পর শিফটিং শ্রম প্রক্রিয়া, সাপ্তাহিক বেতন ভাতাদী উত্তোলন, ইচ্ছা নিরপেক্ষরূপে শ্রম শক্তি দান করার মত স্বাধীনতা গার্মেন্টস শ্রমিকদের নাই। সকালের সূর্য উঠার পর গার্মেন্টসে প্রবেশ করে এবং রাতে গার্মেন্টস থেকে বের হয়ে আসেন। যা পুরোপুরি দাসত্বের পর্যায়ে পড়ে। এরা এদের বাস্তব অবস্থার কারণে কোন শ্রমিক সংগঠন বা তাদের নেতৃত্বে গার্মেন্টস সেক্টরে ট্রেড ইউনিয়ন চালু, নিজের মজুরি বৃদ্ধিসহ অন্যান্য ন্যায্য দাবী সমূহকে আদায় করার ক্ষেত্রে কোনরূপ সংঘবদ্ধতার সুযোগ যেমন পায়নি তেমনি শ্রমিক শ্রেণীর দলগুলো এদের সংঘবদ্ধতার মাধ্যমে কোন আন্দোলন, ট্রেড ইউনিয়ন বা অনুরূপ কিছু গড়ে তুলতে পারেনি। তাছাড়া, গার্মেন্টস শ্রমিকেরা যে শ্রমিক, এই বোধোদয় শ্রমিক শ্রেণীর দাবীদার দলগুলোর অনেক পরে হয়েছে। যখন শিল্পীয় শ্রমিকের স্বল্পতা ঘটল, তাদের সংগঠনের কাজের পরিধি কমে গেল, অন্যদিকে গার্মেন্টস শ্রমিক বৃদ্ধি পেতে থাকল, তখন শ্রমিক শ্রেণীর দাবীদার দলগুলো গার্মেন্টস শ্রমিকদের নিয়ে ভাবতে লাগল। কিন্তু জোরালো অবস্থানে আসতে পারে নাই, কারণ ট্রেড ইউনিয়নের যে দাবী; যা মানা হলে, সংঘবদ্ধতা সহ এই সেক্টরের বেশির ভাগ সমস্যার সমাধান আপনাআপনি হয়ে যেত, সেই ট্রেড ইউনিয়ন এখনো চালু হয়নি। ফলশ্রুতিতে একদিকে যেমন শ্রমিকেরা তাদের দাবী দাওয়ার ব্যাপারে রাজপথ ছাড়া অন্য কোন সমাধান দেখতে পায় না, তেমনি শ্রমিক সংগঠনগুলো রাজপথ বা শোক র‍্যালির বাইরে কিছু করতে পারে না। এটা হল, গার্মেন্টস শ্রমিকের কর্মের ধরণ ও জীবিকার ধরনের বাস্তবতাহেতু শ্রমিক শ্রেণীর দাবীদার দলগুলোর কাছে গার্মেন্টস শ্রমিককে শ্রমিক শ্রেণীরূপে গড়ে তোলার ব্যর্থতার একটা মাত্রা।

দ্বিতীয়তঃ এটা জানা ও বুঝা যে, মুখে যাই বলুক আজকের বাস্তবতায় শ্রমিক শ্রেণীর দাবীদার দলগুলো আসলেই শ্রমিক শ্রেণীর দল কিনা? এ প্রশ্নের উত্তরে যাওয়ার আগে আমাদের একটু ফ্লাশ ব্যাকে যেতে হবে। গত জুনে তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন আশুলিয়া অঞ্চলের কারখানাগুলো অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে; তখন সে পরিপেক্ষিতে একটি রাজনৈতিক দল, যে দল নিজেদের শ্রমিক শ্রেণীর দল দাবী করে, সে দলের সভাপতির আজ থেকে ৫ মাস আগে তার একটি লেখায় মূল্যায়ন তুলে ধরেছিলেন ঠিক এভাবেই,

কমিউনিস্ট পার্টি এদেশের শ্রমিক শ্রেণীর পার্টি, আমরা এভাবে শ্রমিকের মৃত্যু মেনে নিতে পারি না। কমিউনিস্ট পার্টি মনে করে, শ্রমিকদেরকে হত্যা করা হচ্ছে। রাষ্ট্র দেখেশুনে এই হত্যাকাণ্ডে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে”।

সেই লেখায় উপরোক্ত মূল্যায়নের পর তিনি প্রশ্ন করেছিলেন “কীভাবে এই পরিস্থিতি মোকাবেলা করা যেতে পারে?” এবং সমাধানের সমীকরণ করেছিলেন এভাবে,

শ্রমিকদের অসন্তোষ যাতে কোনও স্বার্থান্বেষী মহল কাজে লাগাতে না পারে সে জন্য শ্রমিকদের সমস্যাগুলো সহানুভূতির সঙ্গে সমাধানের চেষ্টা করতে হবে। শ্রমিকের দু:খ ও প্রয়োজনের বিষয়টি যাতে মালিকদের শান্তিপূর্ণভাবে জানানো যায়, সে জন্য দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠন, যা দেশের আইন দ্বারাও সমর্থিত, তাকে অবাধে কাজ করতে দিতে হবে। শ্রমিকদের দাবিকে যাতে সংঘাত ও সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হওয়ার পথে ঠেলে দেওয়া না হয়, সে জন্য আইনের বিধান অনুসারে দ্বিপক্ষীয় ও ত্রিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেয়া জরুরি। যে সব দেশিবিদেশি স্বার্থান্বেষী মহল এবং কায়েমি স্বার্থবাদী গোষ্ঠী পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে নানা অপতৎপরতায় লিপ্তসরকারকে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে, তাদের দমন করতে হবে, শ্রমিকদের নয়”। (সিপিবিএর প্রাক্তন সভাপতি)

অর্থাৎ “দেশিবিদেশি স্বার্থান্বেষী মহল কাজে লাগাতে পারে” বলতে তিনি নিজ অভিজ্ঞতা থেকে বলেছেন নাকি শুনা কথা বলেছেন, সেটা একটা প্রশ্ন সাপেক্ষ বিষয়। কিন্তু তিনি এজন্য সহানুভূতি ‘থেরাপি’র আশ্রয় নিয়েছেন। আর যেহেতু কোন মহলকে নির্দিষ্ট করতে সরকার বা তিনি এখনো সক্ষম হন নাই, তাই এ জাতীয় অচিন্হিত শত্রু দমনের আহবানের দ্বারা উনি বা সরকার উভয়ের যে কেউ; কখন কাকে কোন মহলে যুক্ত করে ফেলেন এবং যুক্ত করে কি পরিমাণ দমন করেন, এ প্রশ্নও রয়ে যায়। “শ্রমিকের দু:খ ও প্রয়োজনের বিষয়টি যাতে মালিকদের শান্তিপূর্ণভাবে জানানো” দ্বারা কি বুঝায়? তার মতে, যে মালিক শ্রমিকের ন্যায্য দাবী মেনে নিবে না, শ্রমিকের বারগেইনিং পক্ষ সেই মালিকদের সাথে যাতে বাইরের ট্রেড ইউনিয়নের মাধ্যমে গান্ধীবাদী’ শান্তিপূর্ণভাবে দ্বিপক্ষীয় ও ত্রিপক্ষীয় আলোচনা করা যেতে পারে। এখানে গার্মেন্টস সেক্টরের জন্য নিজস্ব ট্রেড ইউনিয়ন করার দরকার বা দাবী অনুপস্থিত।

তিনি আরো বলেন, “দেশের বৃহত্তর স্বার্থে ও শিল্পের স্বার্থে অবিলম্বে শ্রমিকমালিক আলোচনা শুরু করা উচিত”। (উল্লেখিত)

এ প্রসঙ্গে লেনিনের কয়েকটি উক্তি মনে পড়ছে। লেনিন বলেছিলেন, “শোষক আর শোষিত কখনো সমান হতে পারে না”– (সর্বহারা বিপ্লব ও দলত্যাগি কাউৎস্কি)

লেনিন আরো বলেছিলেন, “সর্বোচ্চ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রেও মজুরি দাসত্বই জনগণের ভাগ্যলিপি”। (রাষ্ট্র ও বিপ্লব)

এবং লেনিন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা যা বলেছিলেন তা হলো, “শোষক ও শোষিতের মধ্যে, ভুরিভোজি ও ক্ষুধার্তের মধ্যে সাম্য আমরা কখনই স্বীকার করি না; ভুরিভোজি শোষকদের দ্বারা ক্ষুধার্ত শোষিতদের লুণ্ঠন করার স্বাধীনতা আমরা স্বীকার করি না। এবং যে সব শিক্ষিত ভদ্রলোক এই পার্থক্য স্বীকার করতে চান না কাউৎস্কি, চের্নভ বা মার্তব তারা যে কেউই হোন না কেন, গণতন্ত্রী সমাজতন্ত্রী বা আন্তর্জাতিকতাবাদী, যে নামেই তারা নিজেদের অভিহিত করুন না কেনআমরা তাদের গণ্য করবো প্রতিবিপ্লবের রক্ষী বাহিনী হিসেবেই”। (সর্বহারাশ্রেণীর একনায়কত্ব যুগের অর্থনীতি ও রাজনীতি ৩০শ খণ্ড)

লেনিনের উপরোক্ত কথার বোধগম্যতা আরো পরিপূর্ণতা পাবে আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী সমিতির প্রতিষ্ঠানমূলক ইশতেহারে মহান মার্কসের কথায় , “রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জন শ্রমিক শ্রেণীর মহান কর্তব্য”।

যদিও ধর্মঘট ট্রেড ইউনিয়নবাদী আন্দোলন শ্রমিক শ্রেণীকে তার মূল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত করে। পক্ষান্তরে, ধর্মঘট ট্রেড ইউনিয়নবাদী আন্দোলনের ফসল সব সময় শ্রমিক শ্রেণী তার ঘরে তুলতে পারে না। লেনিনের সময় ব্রিটেনে ইন্ডিপেন্ডেন্ট লেবার পার্টি নামক একটি দল ছিল। ব্রিটিশ শ্রমিক আন্দোলনের উত্তাল পরিবেশে ধর্মঘট সংগ্রামের পুনরুজ্জীবন ও বুর্জোয়া পার্টি থেকে প্রভাব মুক্ত থাকার জন্য “নয়া ট্রেড ইউনিয়ন” সমূহের নেতারা এই দল গঠন করেন। ট্রেড ইউনিয়নবাদী শ্রমিক, বুর্জোয়া, পেটি বুর্জোয়া প্রভাবাধীন এই দল গোড়া থেকেই পার্লামেন্টারি দরকষাকষি ও সংস্কারবাদী পথ বেছে নেয়। ‘রাষ্ট্র ও বিপ্লব’ গ্রন্থে লেনিন এ দল সম্পর্কে বলেছিলেন, “বাস্তবে এটা হচ্ছে এমন একটা দল যা সব সময় বুর্জোয়াদের উপর নির্ভরশীল। বুর্জোয়া পার্টি থেকে রাজনৈতিক স্বাধীনতার আস্ফালন করলেও এ দল আসলে ‘স্বাধীন’ ছিল সমাজতন্ত্র থেকে এবং খুবই পরাধীন ছিল বুর্জোয়া উদারনীতির কাছে”। তাদের মতে সর্বহারা শ্রেণীর একনায়কত্ব ‘গণতন্ত্রের বিরোধী’!! এদের আর পেটি বুর্জোয়া গণতন্ত্রীদের মধ্যে সত্যিকার অর্থেই কোন মূলগত পার্থক্য নেই” ১৯২০ সালে এই দল ২য় আন্তর্জাতিক ত্যাগ করে।

তাই বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র, নিপীড়নকারী রাষ্ট্র যন্ত্রের কাছে সিপিবি সভাপতির অমৃত বাণী দাবী বা পরামর্শে কতটুকু শ্রমিক শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষা হলো, কতটুকু “প্রলতারিয়েত সংগ্রাম” করা হলো, এ প্রশ্ন তাদের করা যায়। যুগ যুগ ধরে টুকরো টুকরো সংস্কার, টুকরো টুকরো আলোচনার নামে রাজনীতি করে আসতে পারলে আন্দোলন করার কি দরকার? তারা জানেন যে, মালিকের বা সরকারের দয়ার শরীর; তাই আলোচনা জিন্দাবাদ, আন্দোলন মুর্দাবাদ! শোকর‍্যালি, শোভাযাত্রা রাজনৈতিক সংগ্রামের মহান রূপ!!!

মার্কস ধর্মঘট সংগ্রামের উচ্চ মূল্য নির্ধারণ করেছেন, মার্কসর মতে এটা পুঁজিপতিদের স্বেচ্ছাচারিত্বের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের উপায় যেমন তেমনি শ্রমিকদের ঐক্য ও তাঁদের শ্রেণী চেতনা বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শ্রমিকদের জাতীয় অর্থনৈতিক সংগ্রামের চেয়ে রাজনৈতিক সংগ্রামকে অধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। ইংরেজ পুঁজিপতিরা অতি মুনাফা লুটতে পারত এবং তার এক অংশ দিয়ে শ্রমিক শ্রেণীর উচ্চ শীর্ষ স্থানীয় ব্যক্তিদের উৎকোচে বশীভূত করার কাজে লাগাতে পারত ইংল্যান্ডের শ্রমিক আন্দোলনের নেতা জোন্সের বুর্জোয়া র‍্যাডিকালদের সাথে জোট বাধা প্রসঙ্গে এঙ্গেলস মার্ক্সের নিকট লিখিত এক পত্রে বলেন, ইংরেজ প্রলতারিয়েত এমন উত্তরোত্তর বুর্জোয়া সত্তা প্রাপ্ত হচ্ছে যে , অভিজাত বুর্জোয়ার পাশাপাশি ‘প্রলতারিয়েত’ বুর্জোয়া পাওয়া যায়। ( মার্কস সমীপে এঙ্গেলস ৭ ই অক্টোবর, ১৮৫৮)

এই প্রলতারিয়েতবুর্জোয়া প্রসঙ্গে লেখকশিল্পীশিক্ষক, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক কর্মী এবং নাগরিক জমায়েতএর ব্যানারে গতকালের (২৭১১২০১২) মালিকি অবহেলায় অব্যাহত শ্রমিক পুড়িয়ে মারার প্রতিবাদে সমাবেশ” এর কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। সেখানে গান হলো, নাটক হলো, বিশিষ্ট জনেরা বক্তৃতা দিলেন কিন্তু সমাবেশ শেষে মিছিল নিয়ে বিজিএমইএ ভবনের দিকে কয়েকজনের যাত্রার প্রস্তাবে আয়োজকরা রাজি হয় না। কারণ কি? আয়োজকরা কয়েকটা কারণ দিলেন, যার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ যা তা হলো – “বিজিএমইএ পর্যন্ত মিছিলের জন্য পুলিশের অনুমতি নেয়া হয় নাই। পুলিশকে নাকি আগেই জানাইতে হয়” অর্থাৎ, বিপ্লবী রাজনীতির সীমারেখা শাহবাগ পর্যন্ত। বিজিএমইএ পর্যন্ত মিছিল নিয়ে গেলে কোনরূপ অপ্রীতিকর কিছু ঘটলে এর দায় দায়িত্ব কে নিবে? অর্থাৎ প্রলতারিয়েতবুর্জোয়াদের বিপ্লবী রাজনীতির সীমারেখা শাহবাগ পর্যন্ত। যে সীমারেখার আওতায় শ্রমিক শ্রেণীর দাবীদার গতানুগতিক অন্যান্য দলগুলোও তাদের মহান কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছে বৈকি!

শ্রমিক শ্রেণীর দাবীদার যে কোন কম্যুনিস্ট পার্টির দায়িত্ব হলো, শ্রমিক শ্রেণীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তিকে সামনে রেখে সার্বিক গণতান্ত্রিক আন্দোলনে অগ্রবাহিনীর ভূমিকা পালন করা। রাজনৈতিক সংগ্রামের সাথে অর্থনৈতিক সংগ্রাম অবিচ্ছেদ্য। ধর্মঘট, ট্রেড ইউনিয়ন মার্কসবাদের ধারা হলেও প্রথমে ‘দর্শনের দারিদ্র’ ও পরে ‘মজুরি দাম মুনাফা’ নামে বিবরণীতে তিনি বলেন এ গুলিকে কেবল শ্রমিকের জরুরী স্বার্থরক্ষার উপায় স্বরূপ বিবেচনা না করে পুঁজিবাদের বিনাশ কল্পে “প্রলতারিয়েত সংগ্রাম”এ উন্নীত করার তাগিদের উপর জোর দেয়া। ঐক্যবদ্ধ শ্রেণী সংগ্রামের অবশ্য কর্তব্য রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংগ্রামকে সম্মিলিত করা। কোনরূপ সীমাবদ্ধতায় আটকে থেকে “প্রলতারিয়েত সংগ্রাম” যে হয়ে উঠে না, একথা তারাও জানে এবং একটি ধর্মঘট ডাকার লক্ষণ বা সামর্থ্য শ্রমিক শ্রেণীর দাবীদার দলগুলোর নাই।

আশুলিয়া ট্রাজেডির পরপরই কাকতালীয় রূপে যেটা দেখা যাচ্ছে যে, গত ২৫১১২০১২ থেকে পোশাক শ্রমিকদের ৪০টি সংগঠন তাঁদের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। স্বাভাবিক রূপেই শ্রমিকদের নজর থাকবে এই সংগঠনগুলির কর্মসূচি কতটুকু শ্রমিকদের পক্ষে দাবী আদায় করতে সক্ষম হয়, তার উপর। তাঁদের মূল দাবী গুলো হলো, অবিলম্বে শ্রম আইন২০০৬ সংশোধনসহ শ্রমিক বিরোধী সব কালাকানুন বাতিল করা; রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলসহ (ইপিজেড) সব পোশাক কারখানায় ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার চালু করা; হলমার্ক গ্রুপের মালিকদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া, পাশাপাশি হলমার্কে কর্মরত শ্রমিকদের বকেয়া পাওনা পরিশোধ করা এবং প্রশাসক নিয়োগ করে কারখানা চালু করা।

এখানে উল্লেখ্য যে ,এসব দাবি আদায়ের কর্মসূচি হিসেবে ১ ডিসেম্বর জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে অনশন ধর্মঘট করা ছাড়াও শ্রমিক নেতারা ২৫ নভেম্বর থেকে আগামী ২৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও শ্রেণীপেশার সংগঠন ও ব্যক্তিদের সঙ্গে মতবিনিময়ের করবেন। যার অংশ হিসেবে সেদিনই বিশিষ্ট আইনবিদ কামাল হোসেনের সঙ্গে তাদের মতবিনিময় করার কথা। অর্থাৎ দীর্ঘ এক মাস ব্যাপী আলোচনা। এই আলোচনার ফলাফল কি আগাম ঘোষণা করা যায়?

হ্যাঁ, আগাম ঘোষণা করা যায়, বের্নস্তাইনের বিরুদ্ধে কাউৎস্কি যেমন বলেছিলেন “সর্বহারা শ্রেণীর একনায়কত্বের সমস্যা আমরা বেশ অনায়াসেই ছেড়ে দিতে পারি ভবিষ্যতের দিকে।”

আবার অন্যভাবেও আগাম ঘোষণা করা যায়,

Without the peoples army the people have nothing.”- মাও সেতুং।

পাদটিকাঃ কয়েকটি সাংস্কৃতিক সংগঠনের ডাকে সাড়া দিয়ে নিশ্চিন্তপুর গিয়েছিলাম। গিয়ে দেখলাম, মীটিং চলছে। বক্তারা দাবী করছেন, যে রাষ্ট্র শ্রমিক পুড়িয়ে মারে সে রাষ্ট্র ভেঙ্গে দাও। ভাবলাম, এমন কথা শ্রমিক শ্রেণীর দাবীদার দলগুলো বলতে শিখে নাই। আমার জন্য কথাটা শোনা নতুন বৈকি! যাইহোক এলাকার জনগণ বলেছে, গার্মেন্টসটির অনেক দেনা ছিল, বিক্রির চেষ্টা করা হয়েছিল; বিশাল দেনার কারণে বিক্রি করা হয়ে উঠেনি। কিন্তু আগুন লাগার আগে স্থানীয় শ্রমিক ছিল যারা, তাদের ধাপে ধাপে চাকুরিচ্যুত করা হয়েছিল। সব চেয়ে মারাত্মক অভিযোগ যা কমপক্ষে ৩০০০ শ্রমিকের ফ্যাক্টরিতে একশর মত লাফিয়ে পড়া এবং বাকিদের আটকে পড়া। কিন্তু লাশ উদ্ধার হল ১২৪ টি, তাও যাদের সনাক্ত করা সম্ভব নয়, তাদের লাশ। তবে যাদের শনাক্ত করা যেত সে লাশ কোথায়? আবার যাদের লাশ উদ্ধার হলো সবার ঠাঁই হলো আজিমপুরে, চিতায় কেউ পুড়ল না। প্রশাসন কিভাবে এত নিশ্চিত হল যে, পোড়া লাশের মধ্যে চিতায় পোড়ানোর লাশ নেই? মনকে সান্ত্বনা দিলাম, দোজখের বা চিতার আগুনে যে পুড়ে মরেছে তাকে আবার চিতার আগুনে পোড়ালেই বা কি? কবরস্থ করলেই বা কি?

(বি:দ্র: কার্টুনটি দৈনিক বনিকবার্তার সৌজন্যে, কৃতজ্ঞতা স্বীকার করছি লেখক)

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s